সোনার দেশ বাংলাদেশ_মোহাম্মদ আবদুল মান্নান : মন পবনের নাও-পর্ব-১


 উজান ভাটির দেশ
নদ নদী খাল ও বিল হাওড়ের দেশ বাংলাদেশ। পদ্মা মেঘনা সুরমা যমুনা ব্রহ্মপুত্র বুড়িগঙ্গা। ইছামতি মধুমতি আত্রাই করতোয়া। কানফুল কর্ণফুলী। হাজারো নদী। 
নদীর বুকে পাল তোলা নাও। নীল সাদা লাল সবুজ হলুদ পাল। নিশানের মতো পাল ওড়ে। পতপত। এ দেশের নদী পাড়ের সাহসী ছেলে। মেঘনা নদীর নেয়ে। পদ্মা নদীর মাঝি।
নাওয়ের মাঝি হাল ধরে শক্ত হাতে। গান গায় ভাটিয়ালি সুরে। দাঁড় টানে হেঁইওরে হেঁইও। গুন টানে। কাশবনের ধার ঘেঁষে।
নাও কখনো উজানে যায়। কখনো যায় ভাটির দেশে। নাওয়ে চড়ে নাইয়র যায় গাঁয়ের মেয়ে। সওদা বোঝাই নাও যায় গঞ্জ থেকে গাঁও-গেরামের হাটে। বাড়ীর ঘাট থেকে নদীর বন্দরে। দেশ থেকে দেশান্তরে।


সয়ফল মুলুক যায় কো’কাফের জঙ্গলে
বাংলাদেশের সয়ফল মুলুক। মস্ত বড় সওদাগর। তার ছিল হাজার মাল্লার নাও। সওদা নিয়ে সে নাও যায় বন্দর থেকে বন্দরে। সাত সাগর পাড়ি দিয়ে যায় কো’কাফের জঙ্গলে। লাল পরী আর নীল পরীর দেশে। সেখানে বন্দী আছে রাজকন্যা। দেও-দানবের ঘরে। সয়ফল মুলুক যুদ্ধ করে। মুক্ত করে রাজকন্যাকে। 
আমাদের চাঁদ সওদাগর। তার সপ্তডিঙ্গা মধুকর। সওদা নিয়ে যায় দেশ থেকে দেশান্তরে। সাগরে ঝড় ওঠে। ঝড়ে ভাঙ্গে জাহাজের মাস্তুল। ঢেউয়ে ভাঙ্গে হাল। সপ্তডিঙ্গা তলিয়ে যায় কালিধর সাগরে।
পাটাতনের মতো চওড়া তার বুক। বাংলাদেশের নাওয়ের মাঝি। হালের বৈঠার মতো শক্ত তার পেশী। মাস্তুলের মতো উন্নত শির। শত বিপদে মাঝি পিছপা হয় না। অজগরের মতো গর্জন করে নদী। সেই রাগি অজগরের সাথে পাঞ্জা লড়ে মাঝি। পাহাড় সমান ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ তার।

ঢেউয়ের সঙ্গে খেলা
এ দেশের নদী পাড়ের এক কবি। আহসান হাবিব। তাঁর কবিতায় আছে সেই সাহসী মাঝির কথাঃ
আমার ঢেউয়ের সঙ্গে গলাগলি
         ঢেউয়ের সঙ্গে খেলা
আমি ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে
         কাটাই সারা বেলা
আর দেশ হতে যাই দেশান্তরে
          মনের নৌকা বেয়ে
আমি মেঘনা নদীর ছেলে
আমি মেঘনা নদীর নেয়ে।
আমাদের ছড়ায়, কবিতায়, গানে, কথায়, কল্পনায় আছে নৌকা। আমাদের হৃদয় জুড়ে আছে নাওয়ের কথা।

সোনার নাও পবনের বৈঠা
পড়ায় যখন মন বসে না তখন কল্পনায় উড়ে বেড়াতে ইচ্ছা করে। সে জন্যও চাই নৌকা। মনটা তখন পবনের নাও হতে চায়। সে ইচ্ছার কথা লিখেছেন নদী পাড়ের আরেক কবি। আল মাহমুদ।
আর কি এখন লাগবে ভালো
         গণিত কিংবা গদ্য
তার চেয়ে ঐ অঙ্ক খাতায় 
        বানাও নতুন পদ্য।
মন পবনের নাও হয়ে যাও
           বন্ধ রেখে বইটা
শতেক মাঝির পাল খাটানো
          জল ফাটানো বৈঠা।
ছোট্ট সোনামনি দাওয়াত করেছে টিয়া পাখিকে। মিষ্টি সবুজ টিয়া পাখি। দাওয়াত খেতে আসবে নায়ে ভরা দিয়ে।
আয় রে আয় টিয়ে
নায়ে ভরা দিয়ে।
টিয়া পাখির নাও দরকার। মাঝপথে গোল বাধালো বোয়াল মাছটা। নাওয়ের প্রতি তারও ভীষণ লোভ। বোয়ালটা তার ইয়া লম্বা গোঁফে বেঁধে নাও নিয়ে দে ছুট! টিয়া পাখির বুঝি আর দাওয়াত খাওয়া হলো না!

টিয়া পাখি ও নূহ নবীর কিশতী
টিয়া পাখি নায়ে চড়েই একবার প্রাণে বেঁচেছিল। সেটা হযরত নূহ নবীর সময়। সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। আল্লাহর হুকুমে হযরত নূহ (আঃ) একটি নৌকা বানালেন। নিজ হাতে কাঠ কেটে। হাতুড়ি পিটিয়ে। মস্ত বড় নাও।
সেবার খুব বড় প্লাবন হলো। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। মাটির নিচ থেকে, উপর থেকে, চারদিক থেকে পানির প্লাবন। মাঠ ঘাট বন বাদাড় পাহাড় পর্বত সব ডুবে গেল পানিতে।
যারা ভালো মানুষ, যারা আল্লাহকে মানে, তারা আশ্রয় পেল নূহ নবীর নৌকায়। আর উঠল সব জাতের প্রাণী। পশু-পাখি। তাদের জোড়া-জোড়া তুলে নেয়া হলো কিশতীতে। নৌকায় যারা ঠাঁই পেলো, তারা প্রাণে বাঁচল। খারাপ লোকেরা ডুবে মরল পানিতে। এটা ছিল আল্লাহকে না মানার ফল।

নূহের কিশতীর খোঁজে চাঁদের নাবিক
প্লাবন শেষে নূহ (আঃ)-এর নৌকা ভিড়ল জুদী পর্বতের চূড়ায়। আর্মেনিয়া থেকে কুর্দিস্তান। বিরাট এলাকা জুড়ে আরারাত পর্বতমালা। তারই একটি চূড়ার নাম জুদী। জুদী পর্বতের কথা আছে আল-কোরআনে। হযরত নূহের নৌকার জন্য বিখ্যাত এই পর্বত। এই কিশতীতে চরেই বেঁচেছিলেন আমাদের পূর্ব পুরুষেরা। দুনিয়ার সব মানুষই সেই মানুষদের বংশধর।
আর সেই টিয়া পাখি। যাকে দাওয়াত করেছে ছোট্ট সোনামনি। সে পাখির আদি পিতা-মাতাও ঠাঁই পেয়েছিল নবীর নৌকায়। নূহের সেই বিখ্যাত নাও খুঁজে পাবার চেষ্টা হয়েছে অনেক। আজো চলছে অভিযান।
১৯৮৬ সালের আগস্ট মাসে একটি খবর ছাপা হলো। নূহ নবীর নৌকার খোঁজ করছেন বিখ্যাত এক লোক। তার নাম জেমস আরউন। মার্কিন নভোচারী। ১৯৭১ সালে চাঁদে নেমেছিলেন তিনি। রকেটে চড়ে। ‘চাঁদের কিশতী’র সেই ‘নাবিক’ তালাশ করেছেন নূহের ঐতিহাসিক নাও। বিমান থেকে অনেক ছবি তোলেন। জুদি পর্বত চূড়ার ছবি। তারপর আরো অনেক অভিযান। অবশেষে উদ্ধার হয়েছে নূহ নবীর কিশতীর নিশানা। সেই এক মস্ত খবর।

হরেক রকম নাও
নাও আমাদের হরেক রকম। নৌকা, কোষা, বজরা। ডিঙ্গি, ছিপ। পানুয়া, পটল, সরেঙ্গা, কোলান্দিয়া। 
পলওয়ার, নাওধুরী, সেরদারী। খেলনা, জংভেদী, সুলুপ ও সাম্পান, আরো কত বিচিত্র নাম। বিচিত্র রকম। সংখ্যায় নাও অগণন। যেন নদীর ঢেউ। গুণে শেষ করা যায় না।

নাওয়ের জীবন কাহিনী
নাওয়ের জীবন কাহিনী গৌরবের। রোমাঞ্চকর অভিযানের। শক্তি আর সাহসের। আবার কখনো দুঃখ আর হতাশার। তবুও নাও সুখে-দুঃখে সব সময় সাথি আমাদের।
নাওয়ের বৈঠা হাতে নিলে আনন্দে নেচে ওঠে মন। এ বৈঠা যেন যাদুর কাঠি। ছুঁলেই আমাদের কণ্ঠে জাগে শিহরণ। দরাজ গলায় নাচে ভাটিয়ালি সুর। এ নৌকার কাহিনী অনেক লম্বা।

ডোঙ্গা আর ভেলার মাঝিরা
আমাদের দেশে নাওয়ের ব্যবহার শুরু হয় কয়েক হাজার বছর আগে। গাছের গুঁড়ি খোদাই করে ডোঙ্গা নৌকা বানানো হতো। কয়েকটি গাছ একসাথে বেঁধে তৈরি হতো ভেলা। ডোঙ্গা আর ভেলায় চরেই চলত পারাপার। ডোঙ্গা আর ভেলায় চরে আমাদের পূর্বপুরুষেরা বড় বড় নদী পাড়ি দিতেন।
তালগাছের গোড়ার অংশ দিয়ে বানানো তালের নৌকা বা ডোঙ্গা এখনো বাংলাদেশের লোকেরা ব্যবহার করে।
ডোঙ্গা আর ভেলার উন্নতি হলো নৌকায়। ধীরে ধীরে গড়ে উঠলো নৌ শিল্পের কেন্দ্র। দেশের নানান। আমাদের নৌশিল্পীরা দক্ষ কারিগর। তাদের সুনাম ছড়িয়ে পড়লো দেশ-বিদেশে। সবখানে।
সংস্কৃত ভাষার প্রাচীন কবি কালিদাস। ভিনদেশী এই কবিও আমাদের নৌশিল্পের উল্লেখ করেছেন। কালিদাস তাঁর কাব্যে আমাদের পরিচয় লিখলেনঃ বাঙালী নৌশিল্প বিশারদ।  

কোলান্দিয়া জাহাজ ও মসলিনের বাণিজ্য
প্রায় দু’হাজার বছর আগে লেখা প্রাচীন একটি বই। বইটির নাম ‘পেরিপ্লাস অব দি ইরিথ্রিয়ান সী’। ষাট খ্রিষ্টাব্দে লেখা এ বইটিতে আছে আমাদের জাহাজের কথা।
আমাদের প্রাচীন ‘গাঙ্গে’ বন্দর। সে বন্দর থেকে সুদূর অতীতে ‘কোলান্দিয়া’ জাহাজ যেতো নানান দেশে। বয়ে নিতো মসলিন, রেশম, পিপুল, তেজপাতা। আরো নানান বেসাতি। দুনিয়ার নানান বন্দরে।

চীন জাপান আরব সফর
দু’হাজার বছর আগে এ দেশ ছিল বৌদ্ধ রাজত্ব। বৌদ্ধদের প্রাচীনতম বই ‘মিলিন্দ পান হো’। লেখা হয় প্রথম খ্রিস্টাব্দে। এই বইতে আছে নৌ চলাচলের জন্য বিখ্যাত কয়েকটি দেশের নাম আর সে তালিকায় আছে বাংলাদেশের নাম আর বাংলাদেশের নৌকার কথা।
দেশী-বিদেশী অনেক নৌযান ভীড় করতো আমাদের বন্দরে। সাগর পাড়ি দিয়ে এখানে ভিড়তো আরবদের পাল তোলা জাহাজ। আরব বণিকরা আসতেন আমাদের দেশে। তারাই আমাদের দেশে প্রথম ইসলাম প্রচার করেছিলেন।
সেই সুদূর অতীতে আমাদের দেশের বহু লোক দূর দেশ সফর করতেন। তখন কলের জাহাজ ছিল না। ছিল পাল তোলা জাহাজ। সওদাগররা নানান জাতের সওদা নিয়ে যেতেন চীন, জাপান, কোরিয়া, জাভা, সুমাত্রা আর শ্রীলঙ্কার বন্দরে। আরব দেশেও পাড়ি জমাতেন তারা।

বরোবুদুর মন্দিরে
জাভাতে বিখ্যাত একটি মন্দির। নাম তার বরোবুদুর। সেই প্রাচীন মন্দিরের গায়ে আঁকা আছে আমাদের নৌকার ছবি। আমাদের নৌকা প্রাচীনকালে বিদেশে যেত। এ ছবি তার প্রমাণ।
আগের দিনে বড় বড় ঘটনা লিখে রাখা হতো তামার পাতে। তেমনি একটি প্রাচীন তাম্রলিপি পাওয়া গেছে ফরিদপুরে। সেই লিপিতে আছে আমাদের ‘নবাত ক্ষেণী’ বা জাহাজ নির্মাণকেন্দ্রের কথা।

মার্কোপোলোর চোখে বাংলাদেশের নাও
বাংলাদেশের নৌশিল্প সম্পর্কে বিবরণ পাওয়া যায় বিশ্বখ্যাত বিদেশী পর্যটকদের কাছেও। দুনিয়ার নানান দেশের সাথে বাংলাদেশের চমৎকার যোগাযোগ ছিল। সে সুযোগে অনেক পর্যটক এসেছেন এদেশে। তারা লিখেছেন আমাদের সোনালী অতীতের কথা।
সাত শ’ বছর আগের কথা। তেরো শতকে বাংলাদেশ সফর করেন মার্কোপোলো। মার্কোপোলোর কাছে থেকেই তখনকার নৌকা সম্পর্কে সবচে’ বেশী তথ্য জানা যায়।
আমাদের বিদেশগামী জাহাজগুলো তৈরি হতো দুই প্রস্থ কাঠের আচ্ছাদন। চুন আর শোন গুঁড়া করা হতো। সেই সাথে মিশানো হতো এক প্রকার গাছের তেল। সে তেল মাখা হতো জাহাজের তলায়। বড় বড় জাহাজ তৈরির জন্য ব্যবহার হতো ফার জাতের কাঠ।
সে জাহাজ কেমন হতো? পাহাড় সমান ঢেউয়ের বুকে কিভাবে রক্ষা পেত! সে কথাও লিখেছেন মার্কোপোলো। জাহজের ডেকের নিচে থাকতো সারি সারি কেবিন। একেকটি কেবিন ব্যবহার করতেন একেকজন সওদাগর। জাহাজের আয়তন অনুযায়ী কেবিনের সংখ্যা কম-বেশি হতো। মার্কোপোলো একটি জাহাজে দেখেছেন ষাটটি কেবিন।
প্রতিটি জাহাজের থাকতো কয়েকটি অংশ। যেনো ট্রেনের আলাদা বগি। একটি অংশ কোন কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হলেও জাহাজের বাকী অংশ রক্ষা পেত। বিধ্বস্ত অংশের যাত্রী ও মাল সরানো যেতো অন্য ভাগে। যত বড় জাহাজ, তত বেশি অংশ থাকতো। মার্কোপোলো কোন কোন জাহাজে তেরোটি অংশ দেখেছেন। একেকটি জাহাজে নাবিক থাকতো দেড়শ’ থেকে তিনশ’। প্রতি দাঁড়ে চারজন করে মাল্লা। একেকটি জাহাজ পাঁচশ’ থেকে ছয় হাজার বস্তা পর্যন্ত জিনিশ বহন করতো। প্রতি বস্তায় দুই-আড়াই মণ মাল। সে হিসাবে পনেরো হাজার মণ পর্যন্ত মাল বহন করতো একেকটি জাহাজ। 
প্রতিটি জাহাজের সাথে থাকতো কয়েকটি ছোট নৌকা। জাহাজের নোঙ্গর ফেলা এবং আরো অনেক কাজ করতো এসব ডিঙ্গি নৌকা।

বাংলাদেশী জাহাজে ইবনে বতুতার চীন সফর
মরক্কোর ইবনে বতুতা। চৌদ্দ শতকের ভূ-পর্যটক। দুনিয়া-জোড়া নাম তাঁর। দুনিয়ার বহু দেশ ঘুরে তিনি আসেন বাংলাদেশে। ইবনে বতুতা সিলেট সফর করেন। সাক্ষাত করেন হযরত শাহজালাল-এর সাথে। সফর করেন রাজধানী সোনারগাঁও। প্রথম স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ তখন বাংলার শাসক। ইবনে বতুতার দেখা সোনারগাঁও তখন এক সমৃদ্ধ বন্দর।
প্রাচীনকাল থেকে দেশী-বিদেশী বাণিজ্য জাহাজ ভিড়তো এই বন্দরে। ইবনে বতুতা এখানে দেখেছেন তলাচ্যাপ্টা পাল তোলা জাহাজ। মাল বোঝাই করে জাভা যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাগর পাড়ি দিয়ে এসব জাহাজ যেত চীন, জাভা, পেগু আর সুমাত্রার বন্দরে।
ইবনে বতুতা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আমাদের জাহাজে করেই জাভা ও চীন সফর করেন।

চিড়িয়াখানার সমুদ্র ভ্রমণ
১৪১৪ সালের কথা। সোনারগাঁওয়ের সুলতান চীনের সম্রাটের জন্য উপহার পাঠালেন। জীরাফ আর বিখ্যাত তাজী ঘোড়াসহ ছোটখাট একটা চিড়িয়াখানা। সুলতানের দেয়া এই চিড়য়াখানা সাগর পাড়ি দিল এদেশে তৈরী পাল তোলা জাহাজে চড়ে। এছাড়া মাহুয়ানও দেখেছেন সোনারগাঁও থেকে জাভা পর্যন্ত নিয়মিত জাহাজ চলাচল।

নিকোলকন্টির দেখা ‘বাংলাদেশের টাইটানিক’
পনেরো শতকে এ দেশ সফর করেন নিকোলকন্টি। বাংলাদেশে তখন মুসলিম শাসনের স্বর্ণযুগ। এ সময় নিকোলকন্টি দেখেছেন বড় বড় জাহাজ। এ সব জাহাজের কোন কোনটি কুড়ি থেকে চব্বিশ জাহাজর মণ মাল বয়ে নিত। ইউরোপে এতবড় জাহাজ তিনি কখনো দেখেননি। সে কথাও বলেছেন নিকোলকন্টি। সে বিশাল জাহাজ যেন বাংলাদেশের টাইটানিক। এসব বড় জাহাজে পাঁচটি পাল আর পাঁচটি মাস্তুল থাকতো।
নিকোটকন্টির দেখা আমাদের জাহাজ। সে জাহাজের খোল তৈরি হতো তিন প্রস্থ মোটা কাঠ দিয়ে। জাহাজের এক অংশ ধ্বংস হলে বাকি অংশ ভেসে বেড়াতো সাগরে। দু’শ বছর আগের মার্কোপোলোর তথ্যের সাথে নিকোলকন্টির বিবরণের অনেক মিল।
নিকোলকন্টি লিখেছেন এদেশের অনেক বড় বড় সওদাগরের কথা। তাদের কারো কারো চল্লিশটি নিজস্ব জাহাজ ছিল। প্রতিটির দাম পনেরো হাজার স্বর্ণমুদ্রা। একেক জাহাজে করে তারা নানা দেশে পাড়ি দিতেন একেক পণ্য নিয়ে। এই বিবরণ বাংলার স্বাধীন মুসলিম সুলতানী আমলের।  

চট্টগ্রামের বালামী
বাংলাদেশের নৌ শিল্পের প্রধান এক কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম। জাহাজ তৈরিতে চট্টগ্রামের সুনাম ছিল দুনিয়ার নানা প্রান্তে। চট্টগ্রামে জাহাজ নির্মাণে সবচে দক্ষ ছিল ‘বালামী’ সম্প্রদায়। এই বালামীদের নামে আজো চালু আছে বালাম নাও। বালাম নাও আমাদেরকে সেই প্রাচীন নৌশিল্পীদের কথা মনে করিয়ে দেয়।
চট্টগ্রামে তৈরি হতো নানা ধরনের নৌকা ও জাহাজ। বালাম, গোঠা, সুলুপ। সারেঙ্গা, সাম্পান, কোন্দা। সাগরগামী জাহাজ।
সাগরে চলার জাহাজে লোহার পেরেক থাকতো না। তক্তা আর কাঠ জোড়া লাগানো হতো গোল্লা বেত দিয়ে। বেত দিয়েই আটকানো হতো জাহাজের নানা অংশ।
খুবই মজবুত আর সুন্দর ছিল সে কাজ। দক্ষ শিল্পী ছিল আমাদের সে সব নৌকার কারিগর। লোহার পেরেক না থাকায় লোনা পানি কোন ক্ষতি করতে পারতো না জাহাজের। কাঠের জোড়া, ছিদ্র বা শ্যামা বন্ধ করা হতো দড়ি, তুলা আর ধুনার সাহায্যে। এ কাজেও দক্ষ ছিল কারিগরদের হাত। ফলে জাহাজে পানি চুয়াতে পারতো না।

সন্দ্বীপের জাহাজের তুরুস্ক যাত্রা
জাহাজ তৈরির বড় ও বিখ্যাত কেন্দ্র ছিল সন্দ্বীপ। সন্দ্বীপের কারগিরদের নাম-ডাক আর যশ ছড়িয়ে পড়েছিল দুনিয়ার নানান দেশে।
সন্দ্বীপে প্রচুর কাঠ পাওয়া যেত। তাই জাহাজ বানানোর সুবিধা ছিল অনেক। এখানকার জাহাজের দাম পড়ত কম। আর মানে-গুণে এ জাহাজ ছিল সেরা।
তুরুস্কের সুলতান তখনকার দুনিয়ার নেতা। তিনিও জেনেছিলেন সন্দ্বীপের জাহাজের খ্যাতি। সন্দ্বীপ থেকে অনেক জাহাজ তৈরি করিয়ে নেন তুর্কী সুলতান। এর আগে তুরুস্ক জাহাজ সংগ্রহ করতো মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া থেকে। আলেকজান্দ্রিয়ার জাহাজ সুলতানকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। কিন্তু বাংলাদেশের জাহাজ সুলতানকে মুগ্ধ করলো। জাহাজ নির্মাণের প্রতিযোগিতায় সন্দ্বীপ জয়ী হলো আলেকজান্দ্রিয়ার ওপর।
সন্দ্বীপের জাহাজের কথা লিখেছেন বিখ্যাত পর্যটক সিজার দি ফ্রেডারিক। ষোল শতকের এই পর্যটক সন্দ্বীপে দেখেছেন জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র। দেখেছেন জাহাজরে বিরাট বহর।
সন্দ্বীপ থেকে তখন লবণ রফতানি হতো। লবণ নিয়ে নানা জায়গায় যেত আমাদের জাহাজ। প্রতি বছর লবণ যেত দু’শ জাহজের বহরে।

তামার পাতে সিলেটের নাম
বাংলাদেশের জাহাজ তৈরির আরেকটি প্রাচীন কেন্দ্র সিলেট। সিলেটের রয়েছে বিপুল বন-সম্পদ। ভালো কাঠ পাওয়া যেত এসব বনে। এসব কাঠ দিয়ে তৈরি হতো উন্নত মানের জাহাজ। জাহাজ নির্মাণে সিলেট ছিল খুবই বিখ্যাত।
ভাটেরার তাম্রফলক। তাতে আছে সিলেটের ঈশানদেবের যুদ্ধ জাহাজের কথা।
মোগল আমলের নৌশিল্পেও সিলেটের খুব সুনাম ছিল। সিলেটের লাউরের রাজা কর দিতেন মোগল সম্রাটকে। মোগলরা সিলেটের রাজার কাছ থেকে টাকা-পয়সা কর নিতেন না। কর হিসেবে নিতেন যুদ্ধ জাহাজ। সিলেটের জাহাজ ছিল মোগলদের প্রিয়।

ঢাকার জাহাজ শিল্প
জাহাজ নির্মাণে ঢাকা বিখ্যাত ছিল মোগল আমলে।
সতেরো শতকের ভূপর্যটক টেভারনিয়া শায়েস্তা খানের আমলে ঢাকায় বিশাল জাহাজ তৈরি হতে দেখেছেন। তার বিবরণ থেকে জানা যায়, সে আমলের জাহাজ শিল্পের চরম উন্নতির কথা।
সে সময় ঢাকা সফর করেন টমাস বাউরি। তিনিও ইংরেজ পর্যটক। ঢাকার জাহাজ নির্মাণ কারখানা সম্পর্কে বাউরি জানিয়েছেন অনেক চমৎকার তথ্য।
তিনি লিখেছেন ‘পাতেলা’ নামক তলা চ্যাপ্টা জাহাজের কথা। চার থেকে ছয় হাজার মণ মাল নিয়ে এ জাহাজ সাগর পারি দিত।
নদীপথে সে সময় চালু ছিল অনেক জাহাজ। ওলোয়াকো, বাজেরো, পারগু, ভূরা, মাসুল, কাঁটামারণ। আরো কত কি!
শায়েস্তা খানের আমলে বড় বড় জাহাজ বিপুল পণ্য নিয়ে পাড়ি দিত শ্রীলঙ্কা ও মধ্যপ্রাচ্য।
চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, সিলেট, ঢাকা ছাড়াও নৌশিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল শ্রীপুর, বরিশাল, যশোর, আর চিলমারী বন্দর।

নছর মালুমের কিচ্ছা
আমাদের নৌকার বর্ণনা আছে প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে। আমাদের লোকগীতি, পালা গান, মঙ্গল কাব্যে আর গানে আছে নৌকার কাহিনী
পূর্ববঙ্গ গীতিকায় আছে নছর মালুমের কথা। এসব পালা গানে সাগর পাড়ি দেওয়া জাহাজের কথা আছে।
কুল-কিনারাহীন অথৈ সাগর। সেই সাগরে পাহাড় সমান ঢেউ। সেই ঢেউয়ের সাথে লড়াই করে দরিয়ার মাঝি নছর মালুম।
বাহির দরিয়ায় যখন
আসিল দুলুপ।
ঝাপটাইন্যা বয়ারে পড়ি
রইল ডুপ ডুপ।।
নছর মালুম যাইয়া 
ধরিল ছুয়ান।
সাইগরে উঠিছে ঢেউ
মুড়ার সমান।।
আমাদের প্রাচীন সাহিত্যের পাতায় পাতায় আছে সাহসী নাবিকদের কথা। নছর মালুমের মতো সাহসী মানুষের কথা। নাবিক আর নাওয়ের কাহিনী। তাদের সাহসী অভিযানের কথা। আমাদের পাল তোলা জাহাজের কথা। সপ্তডিঙ্গা মধুকরের কথা।

চাঁদ সদাগরের কাহিনী
বিজয় গুপ্তের মনসা মঙ্গল কাব্য। তাতে আছে চাঁদ সদাগরের কাহীনি। সপ্তডিঙ্গা নাও সাজায় চাঁদ সদাগর। সপ্তডিঙ্গা মধুকর ডুবে যায় কালিধর সাগরে।
চাঁদ সদাগরের এক-একটা ডিঙ্গা মানে এক-একটা বিশাল জাহাজ। এই বাণিজ্য বহরের এক জাহাজের নাম গুয়ারেখী। তার মাস্তুল যেন পর্বত সমান। মাস্তুলে চরে রাবণের লঙ্কা দেখা যায়। বিজয় গুপ্ত লিখেছেনঃ
তার পাছে বাওয়াইল ডিঙ্গা
নামে গুয়ারেখী
যার উপরে চরিয়া
রাবণের লঙ্কা দেখি।।
পাহাড়ের মত উঁচু যার মাস্তুল-সে জাহাজের আকার কত বড়! দৈর্ঘ্যে হাজার গজ। একদিকে সওয়ার হলে অন্যদিকে দেখা যায় না। যেন একটা ভাসমান শহর।

আগে চলে জলপলারী পাছে জলহার
নাম না জানা এক লেখকের ‘পাঁচালী’। সে পাঁচালীতে আছে আমাদের পুরনো দিনের জাহাজ চলার রীতি। বিশাল জাহাজ। তার আগে পানি মেপে মেপে চলতো ছোট ছোট নৌকা। তার নাম ‘জল পলারী’ নাও।
বড় জাহাজ যাতে কোন চোরা দ্বীপে আটকে না পড়ে সে জন্য এই ব্যবস্থা। জল পলারীর পরে চলতো আরো একটি ছোট্ট নৌকা। পথ দেখাত সে। নাম তার ‘জল হার’।
পাঁচালীতে সে কথাই বলা হয়েছে :
আগে চলে জলপলারী
পাছে জলহার
সেই অনুসারে নৌকা
বাহে কর্ণধার।
আমাদের পাল তোলা জাহাজ চলতো সাগরের ঢেউ কেটে কেটে। ছন্দের তালে তালে। সে ছন্দ দোলা দিত জাহাজীদের মনে। মাঝি মাল্লা আর সওদাগরের বুকে।
আমাদের জাহাজের ছিল সুন্দর ছন্দময়, কাব্যিক নাম। পুরনো সাহিত্যের ধুসর পাতা থেকে জানা যায় সে সব নাম। মধুকর, ময়ূরপঙ্খী। রাজহংস, রাজবল্লভ, রতœপতি। শঙ্খচূর, সমুদ্রফেন। উদয়তারা, কাজলরেখা। গুয়ারেখী, টিয়াঠুটি। বিজুসিজু, ভাড়ার পটুয়া। মিষ্টি মধুর সব নাম।
কোন কোন নাম থেকে সময় সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। গুয়ারেখী, টিয়াঠুটি, বিজু সিজু, ভাড়ার পটুয়া। এগুলো প্রাকৃত যুগের নাম। আমাদের নৌশিল্পের আরো প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী এসব শব্দ আর নৌকার বাহারী নাম।

দাঁড়াবিন্দা উৎসব
এক একটি নৌকা তৈরির পেছনে ছিল বিপুল আয়োজন। নৌকা তৈরি হতো উৎসবর মাধ্যমে। জাঁকজমকের সাথে। এমনি এক অনুষ্ঠানের কথা লিখেছেন মধ্যযুগের কবি বংশীদাস।
এখন যেমন আমাদের দেশে বড় ভবন, কারখানা বা ব্রীজ তৈরির আগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। সে যুগে নৌকার জন্য তেমনি ছিল ‘দাঁড়াবিন্দা’ অনুষ্ঠান। জাহাজের মালিক রূপার হাতুড়ি দিয়ে কাঠে সোনার পেরেক ঠুঁকে দিতেন। এভাবেই শুরু হতো জাহাজ তৈরির কাজ।

যুদ্ধ জাহাজ ও নাওয়ারা বাহিনী
সওদাগরী জাহাজের মতই বিখ্যাত ছিল এদেশের যুদ্ধ জাহাজ। ভৌগোলিক কারণেই এ দেশের প্রতিরক্ষায় নৌ-জাহাজের গুরুত্ব সব সময় বেশী ছিল।
নদীমাতৃক দেশ আমাদের। নদ-নদীর গতিপথ যুগে যুগে এ দেশের সীমানা চিহ্নিত করেছে। এদেশ সোনার দেশ; চিত্তে-বিত্তে সমৃদ্ধ। তাই বিদেশী হামলা হতো। বেশির ভাগই নৌ পথে। আমাদের সীমানা পাহারা দিত আমাদের যুদ্ধ জাহাজ। পাল তোলা নাও।
তারপর বৌদ্ধ পালদের রাজত্ব। প্রায় চারশ’ বছর স্থায়ী হয় পাল শাসন। সে আমলে গড়ে ওঠে পৃথক নৌ বিভাগ। বেড়ে ওঠে নৌ বাহিনী। তখন নৌ বাহিনী প্রধানের পদবী ছিল ‘তারিক’।
পাল রাজত্বের পর বিদেশী সেন রাজাদের আমল। প্রাচীন তাম্রলিপি থেকে জানা যায় সে যুগের নৌ বাহিনীর কথা। সেনরা খুব অত্যাচারী ছিল। তাদের শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
সেনদের সংক্ষিপ্ত শাসনের পর এ দেশে চালু হয় মুসলিম শাসন। সদাগরী জাহাজ কিংবা যুদ্ধ জাহাজ-সব ধরনের নৌ শিল্পের উন্নতি হয় মুসলিম রাজত্বকালে। মুসলিম শাসন এদেশে নৌশিল্পের সোনালী যুগ। এ সময় গড়ে ওঠে নৌশিল্পের নতুন ইাতহাস। সোনার হরফে লেখা সে কাহিনী।
সুলতানী আমলের কথা। সে আমলে নৌবহর বা নাওয়ারা বাহিনীর কদর বাড়ে। গড়ে ওঠে শক্তিশালী নৌ বাহিনী। নতুন নুতন জাহাজ তৈরি হয়। বিদেশী হামলা মুকাবিলা, দেশের ভিতরের বিদ্রোহ দমন। মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের প্রতিরোধ। এসব প্রয়োজনে গড়ে ওঠে নাওয়ারা বাহিনী।
আমাদের প্রাচীন রাজধানী কিংবা দুর্গ সবই গড়ে ওঠেছিল নদীর ধারে। বুড়িগঙ্গার তীরে রাজধানী ঢাকা। ব্রহ্মপুত্রের তীরে এগারো সিন্দুর দুর্গ। যাতায়াতের সবচে’ সুবিধা ছিল নৌ পথে তাই নদী তীরেই সব নগর-বন্দর।
দিল্লীর সুলতান ফিরুজ শাহ তুগলক। তিনি দুবার বাংলাদেশ অভিযানে আসেন। একবার ১৩৫৩ খৃষ্টাব্দে, আরেকবার ১৩৬০ সালে। তার সাথে ছিল বিরাট সেনাবাহিনী। এই সৈন্যরা নৌকাযোগে নদী পার হয়ে একডালা দুর্গ ও সোনারগাঁও আক্রমণ করেছিল।

মানসিংহের জাহাজ ও কোষাকান্দা গ্রাম
বিখ্যাত বীর ঈসা খাঁ। বাংলার বারো ভুঁইয়াদের নেতা। তাঁর রাজধানী সোনারগাঁও। ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা আর শীতলক্ষার মোহনায় অবস্থিত।
 নারায়ণগঞ্জের অদূরে শীতলক্ষার তীরে তাঁর খিজিরপুর দুর্গ আর সুবিখ্যাত এগারো সিন্দুর। ব্রহ্মপুত্রের কোল ঘেঁষে দুর্গের অবস্থান।
নদীর অপর তীরে কাপাসিয়ার সুপ্রাচীন টোক বন্দর। কিশোরগঞ্জের এগারো সিন্দর। অল্প দূরে কোষাকান্দা গ্রাম।
দিল্লীর সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ। তিনি ঈসা খাঁ’র বিরুদ্ধে অভিযানে এসেছেন। যুদ্ধে মানসিংহের একটি ‘কোষা’ জাহাজ উল্টে যায়।
কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ী ও এগারোসিন্দুর-এর মধ্যবর্তী স্থানে উল্টে যাওয়া সেই কোষা জাহাজের ওপর মাটির স্তর জমা হয়। বহু দিন সেখানে ছিল বিরাট ঢিবি।
এখন সেখানে গড়ে উঠেছে গ্রাম। তবে কোষা উল্টে যাওয়ার সে স্থানে কোষার আকৃতিটি এখনো লোকে ধরে রেখেছে। আগ্রহীরা এখনো তা দেখতে যায়।
কোষা নামক সেই যুদ্ধ জাহাজ থেকেই আজ সেই গ্রামের নাম কোষাকান্দা। এসব আমাদেরই নৌবাহিনীর গৌরব-গাথা।
মোগল বাহিনীর সাথে ঈসা খাঁ’র যুদ্ধ। নৌপথেই ছিল সে যুদ্ধের অধিক বিস্তার। ঈসা খাঁ’র নেতৃত্বে বাংলার বারো ভুঁইয়ারা মোগলদেরকে দীর্ঘদিন প্রতিরোধ করেন।
ঈসা খাঁ’র মৃত্যুর পর দিল্লীর সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ইসলাম খাঁ বাংলাদেশে অভিযান চালান। তার সাথে যুদ্ধ হয় ঈসা খাঁ’র পুত্র মুসা খাঁ’র। সেটাও ছিল ঘোরতর নৌযুদ্ধ। শীতলক্ষা নদীর বুকে।           

আড়াইহাজার নামের উৎপত্তি
নারায়গঞ্জের আড়াইহাজার থানা। বস্ত্রশিল্পের জন্য বিখ্যাত এক প্রাচীন জনপদ।
এক সময় এখানে মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র মিলিত হয়েছিল। সেই মিলন মোহনায় আড়াইহাজার সৈন্যের ঘাঁটি বা দুর্গ ছিল ঈসা খাঁ’র। ছিল নিজস্ব শক্তিশালী নৌবহর। ‘নাওয়ারা’ বাহিনী। এই আড়াই হাজার নৌসেনা থেকেই জায়গার নাম হয়েছে ‘আড়াইহাজার’।
আমাদের প্রাচীন নৌবাহিনী আর নৌ জাহাজের এমনি কত গৌরবময় স্মৃতি ছড়িয়ে আছে দেশের নানা জায়গায়।

নাওয়ারা জায়গীর
মোগল আমলে নৌশিল্পের নতুন বিকাশ ঘটে। তখন নৌকা নির্মাণে বাংলাদেশ ছিল সবার সেরা। আবুল ফযলের আইন-ই আকবরীতে একথার উল্লেখ আছে।
১৫৮২ সালের কথা। নৌবাহিনীর উন্নয়নের জন্য আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয় বেশ কিছু পরগনা। এই পরগনাগুলিকে বিভিন্ন তালুকে ভাগ করা হয়। সে তালুকগুলি জায়গীর হিসাবে বিতরণ করা হয়। নাবিক আর জাহাজ গড়ার কারিগররাই ছিলেন এসব তালুকের জায়গীরদার।
এসব তালুক পরিচিত হয় ‘নাওয়ারা জায়গীর’ নামে। বিভিন্ন এলাকার বাছাই করা জমি ছিল এই নাওয়ারা জায়গীরের অধীন।

জলদস্যুর মুকাবিলা
দেশে এক সময় জলদস্যুদের উৎপাত বেড়ে যায়। সুযোগ পেলেই হামলা চালাতো পর্তুগীজ আর আরাকানী জলদস্যুরা। তাদরে হামলা ঠেকানোর জন্য প্রয়োজন ছিল শক্তিশালী নৌবাহিনীর।
জনগণকে জলদস্যুদের হামলা থেকে বাঁচাতে হবে। তাই রাজস্বের বিরাট অংশ ব্যয় করা হলো নৌ বহরের পিছনে।
নৌবাহিনীর ব্যয় বহনের আরো ব্যবস্থা ছিল। নাওয়ারা জায়গীর ছাড়াও ছিল বিশেষ ধরনের খাজনা বা কর। সেই করের নাম ‘মীরবাড়ী’।
এই ট্যাক্স থেকে আসতো নৌ বহরের খরচ। আমাদের নৌ ঘাঁটিগুলিতে নোঙর করতো বাইরের অনেক জাহাজ ও নৌকা। তাদের কাছ থেকেও কর আদায় করা হতো। সে করের হার ছিল চার আনা, আট আনা ও এক টাকা। জাহাজের আকার অনুসারে এই হার নির্ধারিত হতো।
তখনকার বাজার দর অনুযায়ী চার আনা, আট আনা কম নয়। ফলে এই করের মাধ্যমে আয় হতো প্রচুর।
আমাদের দেশে নৌ বাহিনীর গুরুত্ব সবচে’ বেশি বাড়ে মোগল আমলে। সম্রাট জাহাঙ্গীর থেকে আওরঙ্গজেবের আমলে নৌ শিল্পের সবচে’ বেশি উন্নত হয়।
মোগল আমলে ঢাকার নৌ বহরে জাহাজের সংখ্যা ছিল তিন হাজার। এ থেকে বোঝা যায় তখনকার নৌ বাহিনীর বিশালত্বের কথা। এই তিন হাজার জাহাজ তো ছিলই। এছাড়া যুদ্ধের সময় জায়গীরদারগণও রণতরী সরবরাহ করতেন।

শায়েস্তা খাঁ’র যুদ্ধ জাহাজ
ইসলাম খাঁ চিশতী। মীর জুমলা। শায়েস্তা খাঁ। মোগল আমলের বিখ্যাত তিন সুবেদার। বাংলাদেশে নৌবহর সবার ওপরে। 
শায়েস্তা খাঁ’র নৌবহর গড়ে তোলার বিবরণ লিখেছেন শিহাবুদ্দীন তালিশ। এক বিখ্যাত ঐতিহাসিক। ফারসী ভাষায় লেখা তার বই থেকে জানা যায় শায়েস্তা খাঁ’র অনেক কীর্তির কথা।
জাহাজ তৈরি আর মেরামতের কারিগর দেশের যেখানে যত পাওয়া যায়, সবাইকে শায়েস্তা খাঁ ঢাকায় ডেকে আনেন। দেশের সকল স্থান থেকে জাহাজের জন্য ভালো কাঠ সংগ্রহের নির্দেশ দেন তিনি।
ঢাকার জাহাজ নির্মাণ কারখানাকে তিনি কর্মব্যস্ত করে তোলেন। সৃষ্টি করেন নতুন প্রেরণা। হুগলী, বালাসোর, মুরাং, চিলমারী, যশোর, করিবাড়ী। জাহাজ তৈরির জন্য বিখ্যাত ছিল এসব গুরুত্বপূর্ণ নৌ বন্দর। শায়েস্তা খাঁ এসব বন্দরেও হুকুম জারি করেন- বেশি বেশি নৌযান তৈরি করে ঢাকায় পাঠানোর জন্য।

তিনশ’ যুদ্ধ জাহাজ
নৌবহর সংস্কার ও পুনর্গঠনের জন্য শায়েস্তা খাঁ তাঁর সকল শক্তি কাজে লাগান। নাবিকদেরকে তিনি সংগঠিত করেন। তাদের খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজন মিটানোর ব্যাবস্থা করেন।
জাহাজ তৈরির জন্য প্রয়োজন নানা রসদ। সেই সাথে দরকার দক্ষ কারিগর। সবকিছুর দিকেই নযর ছিল শায়েস্তা খাঁ’র। নৌবহর গড়ে তোলা ছিল তার বিরাট সাধনা। শায়েস্তা খাঁ এক মুহূর্তও ভুলতেন না তার স্বপ্নের কথা।
হাকিম মোহাম্মদ হোসেন ছিলেন মনসবদার। মোগল বাহিনীর দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মচারী। তিনি ছিলেন ধর্মপরায়ণ; বিশ্বস্ত। শায়েস্তা খাঁ তাকেই জাহাজ নির্মাণ বিভাগের অধ্যক্ষ নিয়োগ করেন।
নৌ বিভাগের প্রতিটি পদে নিয়োগ করা হয় বাছাই করা কর্মচারী। শায়েস্তা খাঁ’র চেষ্টা ও পরিশ্রমে অল্পদিনের মধ্যেই তৈরি হয় বিরাট আকারের তিনশ’ যুদ্ধ জাহাজ। প্রতিটি জাহাজ ছিল উপযুক্ত যুদ্ধ সাজে সজ্জিত।

টাকায় আট মণ চাল
দেশীয় সামন্ত রাজাদের বিদ্রোহ। কিংবা মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের হামলা। শক্তিশালী নৌবাহিনীর সাহায্যে এসব সফলভাবেই মোকাবিলা করেন শায়েস্তা খাঁ। পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, বুড়িগঙ্গা, কর্ণফুলি ও বঙ্গোপসাগরে বহু নৌযুদ্ধ হয়। সব যুদ্ধে শায়েস্তা খাঁ’র বাহিনী সাফল্যের পরিচয় দেয়।
শায়েস্তা খাঁ দেশে শান্তি স্থাপনে সক্ষম হন। শায়েস্তা খাঁ’র আমলে মানুষ সব দিক থেকেই শান্তিতে বাস করতো। জিনিস-পত্রের দাম ছিল খুব সস্তা। তখন এক টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। আর জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য ছিল কম। ফলে দেশের মানুষ ছিল সুখী। এর পেছনেও বড় অবদান ছিল নৌকা ও জাহাজের। শায়েস্তা খাঁ’র জাহাজগুলির আকার কেমন ছিল? সে সম্পর্কেও লিখেছেন শিহাবুদ্দিন তালিশ।
সবচে’ বড় জাহাজের নাম ছিল সলব। তারপর ঘ্রাব, জলবা, কোশ। এছাড়া ছিল খালু ও ধুম। শায়েস্তা খাঁ’র নৌবহরের সবচে’ ছোট জাহাজটিও ছিল ‘বিশাল রণতরী’। এ থেকে বোঝা যায় বড়গুলি কত প্রকা- ছিল।
চট্টগ্রামের নৌযুদ্ধে এসব রণতরী ছাড়াও আরো কয়েক ধরনের জাহাজ ব্যবহার হতো। সে সব জাহাজের মধ্যে ছিল জঙ্গী, বাচারী ও পারেন্দা।

মীর জুমলার রণতরী
মোগল সুবাদার মীর জুমলার নৌ বাহিনীতেও ছিল অনেক জাহাজ। কোশ, জলবা, জেলিয়া, ঘ্রাব, পারেন্দা, বজরা। সলব, ভূরা, পাতেলা। বহর, বালাম, পাতিল। রথগিরি, মহালগিরি, পালওয়ার। আরও কত নামের রণতরী।
ইংরেজ পর্যটক বাউরির কাছে আমরা জেনেছি, ‘পাতেলা’ নামক পণ্যবাহী জাহাজ চার থেকে ছয় হাজার মণ মাল বহন করতো। আরো বড় জাহাজগুলোর আয়তন এ থেকে আন্দায করা যায়।
পর্তুগীজ নৌবহরেও ছিল বিভিন্ন রকম জাহাজ। ফান্তেজ, কার্তুজ, বার্কেন ইত্যাদি। এছাড়া দেশীয় রাজাদের বহরেও এ ধরনের রণতরী ছিল।
‘রিয়াজুস সালাতিন’ এক বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ। গোলাম হোসেন সলিম ১৭৮৮ সালে লিখেছেন এ বই। সেখানে আছে উঁচু গলুইওয়ালা এক প্রকার রণতরীর কথা। এই গলুই দুর্গের প্রাচীর থেকেও উঁচু ছিল। ফলে যুদ্ধের সময় প্রাচীর ভেদ করা সহজ হতো।

পাড়ি দিয়ে তুমি এসেছ দরিয়া কত...
আমরা জানলাম আমাদের হরেক রকম নাওয়ের কাহিনী। শুনলাম নাওয়ের সোনালী দিনের কথা। আমাদের নাওয়ের শত হাজার বছরের ইাতহাস। সোনার হরফে লেখা সে ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি পাতা। ডোঙ্গা আর ভেলা দিয়ে যাত্রা শুরু। তারপর বিরাট বিরাট পাল তোলা নাও। তৈরি হয়েছে টাইটানিকের মতো বিশাল জাহাজ। আমাদের পাল তোলা জাহাজ পাড়ি দিয়েছে এক সাগর থেকে আরেক সাগরে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে। 
হাজার হাজার মণ সওদা নিয়ে সাগর পাড়ি দিয়েছে আমাদের সপ্তডিঙ্গা মধুকর। ময়ুরপঙ্খী। সমুদ্র ফেন। কাজল রেখা। গুয়ারেখী। ভাড়ার পটুয়া।
পাহাড় সমান ঢেউয়ের তালে নৃত্য করেছে আমাদের পাল তোলা নাও। শক্ত হাতে হাল ধরেছে আমাদের সিন্দাবাদ নাবিক। আমীর সওদাগর। আর নছর মালুম। আমাদের নাওয়ের ইতিহাস দীর্ঘ। সে ইতিহাসের পাতায় পাতায় আছে জীবনের নোনা স্বাদ। আমাদের মাঝি-মাল্লাদের শক্তি আর সাহসের কাহিনী। সেই দুরন্ত মাঝি-মাল্লাদের কথা লিখেছেন কবি ফররুখ আহমদ। তাঁর অমর কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ -তে।
পাড়ি দিয়ে তুমি এসেছ দরিয়া কত,
কিশতীর মুখ বাঁচায়ে এনেছ
বহু টাইফুন যুঝি’,
ছিঁড়ে গেছে শিরা, উড়ে গেছে এক হাত;
আর হাতে তুমি হাল ঘোরায়েছ
তুফানের সাথে যুঝি’!
দরিয়ার মাঝি! তোমার ওজুদে
পাথর গলানো খাঁক!
পাথর পারানো কুঅত তোমারে 
দিয়াছে আল্লা পাক!

হাওয়া বদলের পালা
তারপর ধীরে ধীরে চাপা পড়ে গেল আমাদের গৌরবের নৌকা। সাত সাগরের সিন্দাবাদ নাবিক সাগর ভুলে কূয়ার ব্যাঙে পরিণত হলো। লবঙ্গ ফুল, এলাচের সুবাস আর হাতীর দাঁতের সওদা ফেলে আমীর সদাগর হলেন আদার ব্যাপারী।
কে ছিনিয়ে নিল আমাদের নৌকার বাহাদুরী? কে কেড়ে নিল আমাদের হাজার মাল্লার সদাগরী? সোনার দেশের সাহসী ছেলেদের বুক থেকে সাগরের নেশা কেড়ে নিল কোন্ হার্মাদ? কেমন করে আমরা এমন বদলে গেলাম? বড়ই করুণ সে কাহিনী।

ইংরেজ এলো বণিক সেজে
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ভেক ধরে ইংরেজ আমাদের দেশে এলো বাণিজ্য করতে। এই দুষ্ট ইংরেজরা আমাদের দেশ দখল করে নিল। ষড়যন্ত্রের দ্বারা। সে এক কূটিল ইতিহাস।
উমিচাঁদ আর জগৎশেঠরা জোট বাঁধলো ইংরেজদের সাথে। তারা দলে ভিড়ালো সেনাপতি মীর জাফর আলী খানকে। সবাই মিলে দেশটা তুলে দিল বিদেশীদের হাতে। শহীদ হল বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদদৌলা। সেটা ১৭৫৭ সালের কথা।
ইংরেজরা এদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য কেড়ে নিল। দেশের সওদাগররা ধ্বংস হলো। ধ্বংস হলো অর্থনীতি, মূল্যবোধ, প্রেম-ভালোবাসা, সম্প্রীতি আর সম্মানবোধ। সেই সাথে ধ্বংস হলো আমাদের নৌকা আর নৌ-শিল্প। ইংরেজ শাসনের শুরুর দিনগুলোতেও আমাদের দেশে কিছু জাহাজ ছিল। সে কথা লিখেছেন ইংরেজ লেখক কেরী। ১৭৮০ সালে ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে দুর্ভিক্ষ হয়। খাদ্যের অভাবে তখন মারা যায় বহু লোক। সেখানে খাদ্য পাঠাতে হতো। তখন সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকার অনেক জাহাজ তৈরি কার হয়।

রেনেলের বিবরণ
সিলেটের কলেক্টার ছিলেন লিগুসে নামক একজন ইংরেজ। তিনি সিলেট থেকে কুড়িটি জাহাজ বোঝাই করে চাল পাঠান মাদ্রাজে। এই নৌবহরের একেকটি জাহাজে চাল ছিল চারশ টন। মানে, বারো হাজার মণ।
১৭৮৮ সালের কথা। কালো দিনের ফরমান 
১৭৮৯ সাল। তারিখ ১৪ ই জানুয়ারি। আমাদের নাওয়ের ইতিহাসের কালো দিবস। এই তারিখে ইংরেজ সরকার একটি ফরমান জারী করলো। তারা আইন করে দিল, বড় নৌকা তৈরি করা চলবে না।
দশটির বেশি দাঁড় আছে যে নৌকায়। চাঁদপুরের সেই ‘পঞ্চ ওয়েস’ নৌকা তৈরি নিষিদ্ধ হলো।
চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাত লম্বা। আড়াই থেকে চার হাত চওড়া। নাম তার ‘লুখা’ নৌকা। সে নৌকা তৈরিও বন্ধ হলো।      
তিরিশ থেকে সত্তুর হাত লম্বা। তিন থেকে পাঁচ হাত চওড়া জেলিয়া নৌকা। তার বিরুদ্ধেও একই হুকুম।
আইন করা হলোঃ এসব নৌকা কোথাও দেখা গেলে ইংরেজ সরকার সেগুলো দখল করে নেবে।
আরো বলা হলোঃ কোন জমিদার তার এলাকায় ইংরেজ সরকারের লিখিত আদেশ ছাড়া নৌযান তৈরি করতে পারবে না। মেরামত করতে পারবে না। হুকুম অমান্য করলে নৌকা ইংরেজ সরকার দখল করে নিতে পারবে।
তখনো বাংলাদেশের নৌশিল্পে নিয়োজিত ছিল তিরিশ হাজার কারিগর। লিখেছেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ভূমি জরিপ কর্মকর্তা জেমস রেনেল।

ত্রিশ ঘা বেত
নৌকার ব্যাপারে ইংরেজদের মনে ছিল ভয় ও আশংকা। তারা ভেবেছে, এসব নৌকার মাঝি-মাল্লারা সুযোগ পেলেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে।
এদেশের মানুষকে ইংরেজরা বিশ্বাস করতো না।
 নৌকা ছিল এদেশের শক্তি ; সাহস। তাই নৌকার ব্যাপারে তাদের ভয়। জোর করে যারা অন্যের দেশ দখল করে তারা এমনই করে। ইংরেজরা আমাদের নৌ-শিল্পীদেরকে ভয় দেখাল। হুকুম ছাড়া কেউ নৌযান তৈরি বা মেরামত করলে শাস্তি হবে। এক মাসের জেল। কিংবা কুড়ি ঘা বেতের আঘাত। নৌকার কারিগররা কাজ হারাল; পথও হারাল।
পরাধীন দেশে কোন কিছুরই স্বাধীনতা নেই। ইংরেজদের ষড়যন্ত্রে আমাদের নৌশিল্পের এ ভাবেই সর্বনাশ হলো। সাত সাগরের ওপার থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছিল ইংরেজ। তারা ধ্বংস করলো আমাদের নৌকার গৌরব।

ছিপ-খান তিন দাঁড়
নৌকা, কোষা, ভাওয়ালী। ছিপ, ডিঙ্গি, জেলে ডিঙ্গি। পটল, পানসী, ঘাষী। গেরদারী, কুমারিয়া, পানুয়া। গয়না, নাওধুরী, ডোঙ্গা। খেলনা আর সাম্পান।
তিনশ’ মাল্লার বিরাট পাল তোলা জাহাজে হাল ধরতো যে দুরুন্ত নাবিক- সে এখন পিঠ বাঁকা করে গুণ টানতে শুরু করলো কাশবনের ধার ঘেঁষে।
আমাদের সাহিত্যে গুয়ারেখীর কথা আর থাকলো না। আমাদের সিন্দাবাদ নাবিক, আমীর সওদাগর আর নছর মালুম হলেন ডিঙ্গি নৌকার মাঝি।
ছিপ খান তিন দাঁড়
তিন জন মাল্লা
চৌপর দিন ভর
দেয় দূর পাল্লা।
আমাদের নৌ শিল্পের পরিণতি হলো এই!

তারপরও পাল ওড়ে
তারপরও আমাদের জীবনের বিরাট অংশ জুড়ে থাকলো নাওয়ের প্রভাব। আমাদের মালামাল কিংবা মানুষ। এক স্থান থেকে অন্যখানে বয়ে নিতে লাগে নাও।
আজো দেশের হাট-বাজার, শহর-গঞ্জ কিংবা শিল্প গড়ে ওঠে নদীর ধারে। নৌকায় করে মালামাল বয়ে নেয়া সহজ। এ জন্যই নদীর পাড়ে সব আয়োজন।
পালের নাওয়ের পাশাপার্শি অনেক আগেই এদেশে চালু হয়েছে কলের জাহাজ। গড়ে উঠেছে লঞ্চ আর স্টীমার তৈরির কারখানা। ঢাকার জাহাজ শিল্পের ঐতিহ্যের রেশ ধরে নারায়ণগঞ্জের ডকইয়ার্ডে এখন বড় বড় জাহাজ তৈরি হয়; মেরামত হয়। রাজধানী ঢাকার বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে সদরঘাটের অপর পাড়ে গড়ে উঠেছে জাহাজ নির্মাণ শিল্প। দেশী কারিগররা আলিশান সব জাহাজ তৈরি করছেন। নদী খননের জন্য ভারি ড্রেজারও তারা তৈরি করতে সক্ষম। তবু কিন্তু নৌপথের আশি ভাগ মাল এখনো বয়ে নেয় পাল তোলা নাও।
নাও ছাইড়া দে
পাল উড়াউয়া দে
ছলছলাইয়া চলুক নৌকা
মাঝ দইরাতে।

কত নাও, কত বাও
আমাদের দেশে এখন কত নৌকা আছে? ১৯৫৮ সালে একবার হিসাব হয়েছিল। আমাদের নাওয়ের সংখ্যা ছিল তখন এক লাখ তেরো হাজার চারশ’ তেত্রিশ।
এদেশের প্রায় সত্তর হাজার নাও ভাড়ায় মাল বয়। এক বছরে এসব নৌকা বয়ে এক কোটি তিরিশ লাখ মণ শস্য। দেড়শ’ থেকে পনেরো শ’ মণ মাল নেয়ার মতো নৌকা আছে এদেশে তিরিশ হাজার। দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথেই চলে এসব নাও। বর্ষাকালে এই নৌপথের বিস্তার প্রায় আট হাজার মাইল।  
বর্ষায় ডুবে যায় এ দেশের পথ-ঘাট-মাঠ। বিরাট অঞ্চল। নৌকা তখন চলাচলের প্রধান বাহন। নৌপথই তখন হয়ে ওঠে রাজপথ। সিরাতুল মুস্তাকিম।

আলকরন ও সুলুক বহরের কথা
আমাদের নৌকার দেহে নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। একেকটির একেক নাম। আগের দিনে হাইলকে বলা হতো দাঁড় বা পাটওয়ালা। মাস্তুলকে বলা হতো মালুম কাষ্ঠ। ছইকে বলা হতো ছইঘর। এছাড়াও পাল, দাঁড়, নোঙ্গর, তলা। এসব নাম চালু আছে অনেক আগ থেকে। হাজার বছর পাড়ি দিয়ে এসব শব্দ আজো মানুষের মুখে মুখে চালু।
নাওয়ের ঐতিহ্যের সাথে আমাদের ভাষায় চালু হয়েছে অনেক বিদেশী শব্দ। মাস্তুল, ডাবু, তুরুব। কাবিস্তান, গারাবীল। সুলুব, বাহরা, মৌজ্জা। দৈবান, সর, লশকর। খালাসী, সারেং। 
এসব শব্দ আমাদের নৌ চলাচলের নিজস্ব ভাষা।
চট্টগ্রামে এসব শব্দের চল সবচে’ বেশি। আরবী ম’আল্লিম শব্দ পাল্টে মালুম হয়েছে। সুক্কান হয়েছে সুয়ান বা সুকানী। আরবী জলীবুত থেকে আমরা নেমেছি জালীবোটে। এমন আরো কত শব্দ!
এসব বিদেশী শব্দ নৌশিল্পের সাথে যুক্ত হয়ে আমাদের ভাষায় মিশে গেছে। আরবী ছাড়া অন্যান্য ভাষার শব্দও এসছে আমাদের ভাষায়। সেগুলোও নাও বেয়ে ভিড়েছে আমাদের বন্দরে। যেমন, সাম্পান এসেছে বার্মার থাম্মান থেকে।

নাও-নদী-জীবন
নৌকার সাথে জড়িয়ে আছেন অসংখ্য মাঝি-মাল্লা- জেলে। আর নৌকার কারিগর। এছাড়া আছেন আরেক দল মানুষ। নায়ে যাদের বসতি। 
নৌকাই যাদের একমাত্র ঠিকানা। নৌকা আর নদীকে কেন্দ্র করে বেদে আর বেদেনীর বিচিত্র সংসার। 
নৌকা আর মানুষ। কখনো কখনো এক দেহ, একপ্রাণ। দার্শনিক বা ভাবুকদের চোখে মানুষের দেহটাও একটা নৌকা। মানুষের জীবন যেন এক বহমান নদীর উপমা।
জীবন নামক এই নদীতে নাও ভাসায় মন নামক মাঝি। নাও বাইতে বাইতে কখনো সে গেয়ে ওঠেঃ
মন মাঝি তোর বৈঠা নে-রে
আমি আর বাইতে পারলাম না...।

⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN

🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.