অতীতকে উদ্ধার_তমসুর হোসেন

পৌষের গভীর রাতে পাতাচোয়া শিশির পতনের শব্দে কথাটা মনে পড়লো সূরতজামালের। আধো ঘুম আধো জাগরণের মধ্যে তার স্পষ্ট মনে পড়লো বিগত জীবনের একটা কথা। যা সে ভূলেই গিয়েছিলো। আজ অনেকদিন পর তা ঝকঝকে ছবির মতো মনে পড়ছে। যূদ্ধের বছর প্রতিবেশি মকবুল একখানা রূপার মালা বন্ধক রেখেছিলো তার কাছে। মাত্র আশি টাকায় বন্ধক রেখেছিলো সে মালাখানা। যা খুলে নেয়ার সময় সে পঞ্চাশ টাকা বাকি রেখেছিলো। সে টাকাটা কোনদিন সে শোধ করেছে বলে মনে পড়ছেনা তার। 
দেশে তখন তুমুল যূদ্ধ চলছে। সেই যুদ্ধের অবিরাম গোলাগুলির এক রাতে মকবুলের ছেলের দারুণ অসুখ হলো। তার হাতে তখন কোন টাকা ছিল না। নিরুপায় হয়ে সূরতজামালের কাছে টাকা নিয়ে ছেলের চিকিৎসা করেছিলো মকবুল । ছয় মাস পর সেইমালা খুলে নেয়ার সময় মাত্র তিরিশ টাকা পরিশোধ করেছিলো সে। বাকি পঞ্চাশ টাকা সে কখনও শোধ করেছে বলে তো মনে পড়ে না। কথাটা এতোদিন কী করে ভুলে ছিল সূরতজামাল। যূদ্ধ শেষ হবার বুঝি তিরিশ বছর গত হয়ে গেলো । 
পাশে স্ত্রী রহিমা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। তাকে জাগিয়ে তোলে সূরতজামাল। একটা কাজের কথা মনে পড়েছে তার। অন্ধকারের আড়াল থেকে জোনাকির ঝিলিমিলির মতো সে কথাটি যেন আঁধারে হারিয়ে গিয়েছিেেলা। ঘুম ভেঙ্গে গেলে রহিমা ধড়ফড় করে উঠে বিছানায় বসে। তার চোখে তখন ভীতিময় আতঙ্ক। স্বামী তো এমন করে তাকে কোনদিন ডাকে না। পেটে চনচনে ক্ষুধা নিয়ে ঘুমিয়েছে রহিমা। তুলে রাখা একমুট চাল সে স্বামীকে সিদ্ধ করে দিয়েছিলো। নিজের উপোষ থাকার বিষয় সে গোপন রেখেছিলো স্বামীর কাছে। ক্ষুধার বাঘকে ঘুমের খাঁচায় বন্দি করে বশীভূত রাখতে চেয়েছিলো সে। জেগে উঠে রহিমা ক্লান্তিতে থরথর করে কাঁপতে থাকে। শীতের লম্বা রাত কখন ফুরাবে কে জানে। সূরতজামাল দ্বিধাজড়িত কন্ঠে স্ত্রীকে বলে,-
‘যুদ্দ হবার কয় বচর হইল ?’
‘হইল তো ম্যালা বচর।’
‘মকবুল কয় ট্যাকা দিচিল মালা বাবদ?’
‘সেটা মকবুল আর তোমরায় জানেন। মোক সে কতা কইচেন কোনদিন।’
‘ক্যানে একদিন বাইরা খুলিত তোর সামনত সুদায় তিরিশ ট্যাকা দেয় নাই?’
‘দিচে না নাই দ্যায় তাক ঠিক মত মনে নাই।’
‘মনে নাই মানে, তুই না ওটাই আইগনাত বসি মাচ কুটিস। কালা বকরিটার সেদিন বাচ্চা হয় নাই বাইরা খুলির জিগা গাছটার তলোত?’
‘হয় হয় এ্যালা সেন মনে পইচ্চে। সেদিন উলিপুরের হাটবার আচলো।’
‘মালা তো নিয়া গেইল। বাকি ট্যাকা দিয়া গেইচে কোনদিন ?’
‘বাজারোত যদি নাগাইল ধরি দিচে তোমাক?’
‘আরে কোনটে দিচে বাজারোত। এটাই তো মোটে মোল্লার হাট আর ওয়াপদা বাজার।’
‘সেটা মুই কি জানোঙ, এদ্দিন বাদে ট্যাকার উদ্দিশ।’
‘ক্যানে উদ্দিশ হবার নয় ক্যানে? এটা কি চোরের পাইশা?’
‘কার আগোত ফাল পাড়েন তা। পুচ কর যায়া হাড্ডিচোষা মকবুলক। এইগলা হইচে মানুষ হাসা কতা।’
আর কোন কথা হয়না দু’জনের মধ্যে। টুপটুপ করে টিনের চালে শিশির চুয়ে পড়ে। কার যেন শোকার্ত অশ্রুর নিরব পতন হচ্ছে জঙধরা টিনে আর গাছের পাতায়। তিন ছেলে এক মেয়ে সূরতজামালের। মেয়ে পরের ঘরে। বিয়ে করে তিন ছেলেই যার যার মতো পৃথক হয়ে গেছে। বিঘা দেড়েক চাষের জমি। তাই নিয়ে বুড়াবুড়ির কষ্টের সংসার। ছেলেরা দিনরাত নিজেদের ধান্দায় ব্যস্ত। বাপ মায়ের খোঁজ-খবর নেয় না বললেই চলে। একটা মাত্র হালের গোরু। তারও ধরেছে খুরাই রোগ। পনের দিন ধরে চিকিৎসা চললেও গোরুটা সেরে উঠছে না। তা না হলে গাঁথা করে অন্যের সাথে জমি চাষবাস করা যেতো। একদিন অন্তর একখানা হাল বিক্রি করতে পারলেও চল্লিশ টাকা পাওয়া যেতো। দূর্বল শরীর। আগের মতো খাটতেও পারেনা সূরতজামাল। এখন চারদিকে ধুম আকাল। বড় ছেলে হোসেন আলীকে ডেকে সে বলেছিলো খাওয়া দাওয়ার কষ্টের কথা। জবাবে সে বলেছিলো জমিজমা সমেত তার দিকে থাকতে। ওর বউ যা দাহাবাজ। কিপটে উমর দালালের বেটি। পেটের ভাত আঙুল দিয়ে খুকড়ে মুখে এনে ছাড়ে। কিছু টাকা কর্জ চেয়েছিলো সে বড় ছেলের কাছে। মওসুম শেষে ফেরত দিতে চেয়েছিলো। বিরক্ত হয়ে ছেলেটা জবাব দিয়েছিলো,‘ অতো ট্যাকা ট্যাকা করেন ক্যানে। দুনিয়াত আর কদ্দিন বাঁইচপেন। যা আছে একনা দুকনা করি ব্যাচে ব্যাচে খাও।’
মধ্যম ছেলে আমির পোনাধরা জাল নিয়ে রাতদিন নদীতে পড়ে থাকে। কখন বাড়ি আসে কখন যায় পাত্তাই পাওয়া যায় না। ছোট ছেলে হাশেমের উপর একটা অন্যরকম আশা ছিলো তার। কিছু লেখাপড়াও তাকে শিখিয়েছে সূরতজামাল। কিন্তু ক্লাশ এইট পর্যন্ত পড়ে সে বখে গেলো। গোপনে বিয়ে করে শ্বশুর বাড়ির সাথে ভাব রেখে চলে। হাশেমকে সংসার থেকে নিজেই আলাদা করে দিয়েছে সে। এমন বেয়াদব ছেলেকে একান্নে রাখার কোন মানেই হয় না। কিছুদিন শ্বশুর বাড়িতে নালাঢুলা করে থেকে এখন সে চকে একখানা ঘর তুলেছে। একটা বাচ্চাও জন্মেছে গেলো বছর। গুড়গুড় করে হেঁটে এসে নাতিটা তার পাতের ভাত খায় । 
হাশেমকে এক মন ধান কর্জ দিতে বলেছে সে। দিনগুলো বেশ কষ্টে যাচ্ছে। কথা শুনে কিছুই বলেনি ছেলেটা। তারপর থেকে বউটাও আর এদিকে আসে না । সবাই তার পর হয়ে গেলো। দু’চোখে সীমাহীন অন্ধকার দেখে সূরতজামাল। সামান্য একটু আলোর ঝলকানিও সে দেখতে পায়না এই সঙ্কটময় অবস্থায়। এ সময় মকবুল যদি পাওনা টাকাটা দিতো। তাহলে কতো উপকারই না হতো। তার মন জোর দিয়ে বলছে মকবুলের কাছে সে পঞ্চাশ টাকা পাবেই। ছোটবেলা থেকে জীবনের সব ঘটনা তার স্মৃতিতে উজ্জল হয়ে আছে। কোন দিন সে কী করেছে, কোন সনে কেমন আবাদ হয়েছে, সব আলবৎ মনে আছে। মকবুল যদি টাকা দিতো সে কথা কী তার খেয়াল থাকতো না।
এই এলাকাটা ছিলো মুক্ত। পশ্চিমে খরস্রোতা ধরলা নদি থাকায় শহর থেকে মিলিটারি এদিকে আসতে পারতো না। তাছাড়া এখানে এমন কোন উলে¬খযোগ্য স্থাপনা ছিল না যে তা দখল করার জন্য ওদেরকে এদিকে আসতে হবে। তবু মোগলবাসা বুড়াবুড়িতে মুক্তিফৌজের সাথে রাতের বেলা তাদের গোলাগুলি হতো। লোক মুখে শোনা কথা মিলিটারি নাকি বুড়াবুড়ি দিয়ে ধরলা পার হতে চেয়েছিলো। এমন কানাঘুষার মধ্যে একদিন হঠাৎ গ্রামের দক্ষিণ দিকে হিন্দুদের পরিত্যক্ত বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প বসায়। পরের দিন থেকে গ্রামের চেহারা একদম বদলে গেলো। তাদের যাওয়া আসা, ব্যস্ততা আর বাঙ্কার খোড়া দেখে গ্রামের মানুষ ভড়কে গেলো। এই অজপাড়াকে দেশের অংশ বলে মনেই হতো না কোনদিন। একমাত্র চৌকিদারি ট্যাক্স আদায় করা ছাড়া সরকারি লোক এদিকে আসত না কোনদিন । সেই গ্রামে বেয়নেট উঁচিয়ে উর্দিপড়া মুক্তিকামি সৈন্যরা সদলবলে চলাফেরা করলে কার ধড়ে প্রাণ থাকে। রাত বিরাতে কিছু গোলাগুলি হলেও আগে মনে হতো না যে মিলিটারি এদিকে আসবে। কিন্তু পরে এ কথা দিবালোকের মতো পরিষ্কার হতে লাগলো যে মুক্তি যখন এসেছে তখন ওরা না এসে পারে না। অনেকে ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলো। সূরতজামাল অবশ্য বাড়ি ছাড়ল না। অনেকের মতো সেও আতঙ্কের মধ্যে বাস করতে থাকলো। 
এখনও সব ঘটনা মনের পর্দায় স্পষ্ট দেখতে পায় সে। চারদিকে যুদ্ধ চলছে। একরাতে প্রবল প্রতাপে মিলিটারি পাটেশ্বরি ঘাট দিয়ে ধরলা পার হলো। তারপর থেকে তারা দেদারছে মারছে মানুষ, জ্বালাচ্ছে বাড়িঘর। এ অবস্থায় কারও মনে স্বস্তি নেই। এই টান টান উত্তেজনার মধ্যে অগ্রহায়নের এক কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে মকবুল এসে তাকে চাপা গলায় ডাকতে লাগলো। 
‘সূরত ভাইয়ো,দজ্জা খোলো।’
‘কাঁইরে,মকবুল ! কোন খারাপ খবর নাকিরে ?’ 
‘না ভাইয়ো, অন্য দরকার আছে। ছোট ছওয়াটা বাঁচে না মোর।’ 
‘কী হইচে ছওয়ার ?’  
‘খালি কাশে আর উপদ্দম নেয়। ছওয়াটা মোর বাঁচে না বুঝি।’
‘মোক কি কইরবার কইস। মুই কি দাক্তার না কইবরাজ ?’
‘একনা ওটো ভাইয়ো। হাত পাঁও ধরি কওঁ। ছওয়াটাক মোর বাঁচান।’ 
সেই ভীতিপূর্ণ শীতের রাতে দু’জনে গিয়ে অনেক দূরের গ্রাম থেকে তারা ডাক্তার ডেকে আনে। ছেলেকে দেখেশুনে ঔষধ দেয় ডাক্তার। মকবুলের হাতে সেদিন কোন টাকা ছিল না। ঔষধের দামসহ ডাক্তার বিদায় সূরতজামালকেই করতে হয়েছে। নিদানের জন্য জমিয়ে রাখা সম্বল থেকে আশিটা টাকা সে মকবুলকে হাওলাত দেয়। বিনিময়ে মকবুল তার কাছে বন্ধক রাখে একখানা রূপার মালা। বিশ ভরি ওজনের সে মালা এনে সে সূরতজামালের হাতে তুলে দেয়। মালা দিয়ে কী হবে! দরকার নগদ টাকা। স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তখন মূল্যহীন। কে কেনে কার জিনিষ। তবু সূরতজামাল মকবুলের পিড়াপিড়িতে মালাখানা নিয়ে বাক্সের কোটায় ফেলে রাখে। সেদিন যদি সে মকবুলকে টাকাটা না দিতো। নিউমোনিয়ায় মারা গেলে আজ সে চাকরান্দার ছেলে কোথায় পেতো। বড় হয়ে পড়া শিখে সেই ছেলে এখন হাইস্কুলের মাস্টার। বিয়ে করে এবার বুঝি ছেলের বাপ হলো সে। ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে তাকে অবশ্য দাওয়াত করেছিলো মকবুল। খেয়ে দেয়ে দোয়া করে এসেছে সে। সব কথা তার সুন্দর মনে আছে। কিন্তু মকবুল মালার বন্ধকি বাবদ বাকি পঞ্চাশ টাকা কখন ফেরত দিয়েছে তা সে মনে করতে পারছে না। তখন তো আর এখনকার মতো সংসারে খাউ খাঊ ছিল না। হোসেন তখন বড়শি দিয়ে মাছ ধরে বেড়ায়। আমিরও তার সাথে সাথে মাছ কূড়াতে  যায় । হাশেম তখন হামাগুড়ি দেয়। মেয়েটা আমির আলীর ছোট। সে তখন সবার সাথে ফুচকি ফুচকি করে দু’একটা কথা বলতো। কতো সুখ ছিল তখন! যে আবাদ হতো সারাবছর খেয়ে দেয়ে বেচে যেতো। নদি থেকে একবেলা মাছ ধরে আনলে খাবার লোক ছিল না। অতএব পঞ্চাশটা টাকার জন্য মকবুলকে তাকাদা দেয়ার কোন গরজ ছিল না তার। মকবুল যদি নিজ ইচ্ছায় টাকা ফেরত দিয়ে থাকে তা তো মনে করতে পারবে। কই নাতো! সে পূরোদস্তুর সন্দেহমুক্ত হয় যে মকবুল তাকে টাকা ফেরত দেয়নি। নিজের মনকে সে ধিক্কার দেয়। আজ কতোটা বছর পার হলো। এমন বুরবক তার মন। এমন একটা কাজের কথা খেয়াল করে দিল না। আছোদ্দা নাউপেচালি মন যাকে বলে। এতোদিন পরে টাকার কথা তুললে লোকেই বা তাকে কী বলবে! আর মকবুল যা চিমা। আর ওর বউটা যা পাড়া ঝাঁপানি। এসব কথা শুনলে না জানি কী তোলপাড় কা- শুরু করে তারা!
সূরতজামালের বয়স এখন সত্তুরের কোটায়। সে যতোটা দূর্বল নয় অভাব তার চেয়ে বেশি ছায়া ফেলেছে দেহের ভাঁজে ভাঁজে। আড়ালে অগোচরে কখন জানি সে সমাজচ্যুত হয়ে পড়েছে। বৃক্ষের ডালপালা কেটে দিলে যে অবস্থা হয়, দূর্বহ শূন্যতায় শীর্ণ তনু নিয়ে যেমন সে নিজের অবস্থানকে অর্থবহ করতে পারে না, সূরতজামালের অবস্থাও তাই। কিষাণ খাটার জন্য তাকে প্রায়ই দূরের গ্রামে যেতে হয়। রোদ-বৃষ্টিতে কষ্ট পেয়ে তাকে হাল ঠেলতে হয়। তিক তিথিতেও তার বসে থাকার সূযোগ নেই। একমুঠো অন্ন যোগাড় করার জন্য হাড়ভাংগা পরিশ্রম করতে হয় তাকে। শূন্য মাঠে বসে সে চোখের তপ্ত অশ্রুতে স্নান করে। অন্তর্যামি জানে কতো আদরে সে তার সন্তানদের লালন করেছে। একটা ছেলেও যদি তার দুঃখ বুঝতো। কেউ কী বোঝেনা পিতৃ-হৃদয়ের হাহাকার। এই বয়সে একমুঠো খাবার সংগ্রহের জন্য যদি তাকে এতো মেহনত করতে হয় তাহলে তার তিন তিনটে যোয়ান ছেলে বেঁচে আছে কীসের জন্য! খোদার কাছে এ জন্য তার কোন নালিশ নেই। এই যদি হয় তার কর্মের প্রাপ্তি তাহলে বলার কিছু থাকে না। তার চোখে অনেক অন্ধকার ঢুকে পড়েছে। ললাটের বলিরেখায় প্রকাশ পেয়েছে গ্রহপৃষ্ঠের দৃশ্যমান ফাটল। কোঠরাগত চক্ষুজোড়ায় নক্ষত্র প্রচ্ছায়ার করুণ ছাপ। এক মুহুর্তের জন্য তার অবসর নেই। একটি দিনের জন্য তার আরাম নেই। এ পরিস্থিতিতে অনেক ভেবেচিন্তে সে মকবুলের কাছে কথাটা বলে । নদীর গভীর তলদেশ থেকে উত্থিত বুদ্বুদের মতো নিস্তরঙ্গ পানির উপর কথাটা ঠাস করে ফেটে পড়লো।
‘মকবুল কতাটা মনে আচে তোর?’
‘কোন কতা কবার নাইগচেন ভাইয়ো।’
‘যুদ্দের বচর তোর ব্যটাকোনার অসুক হইচলো, সেই কতা।’
‘সে কতা কি মনে না থাকে ভাইয়ো, পষ্ট মনে আচে।’
‘মোর টাঁই ট্যাকা নিয়া অইষদ কিনচিলু সে কতা তোর মনে আচে ?’
‘হ্যা ভাইয়ো, সেই বিপদের কতা যদ্দিন বাঁচি থাকিম তদ্দিন মনে থাইকপে। তা আইজ ক্যানে তুললেন কতাটা?’
‘দরকার আচে। যদি আগ না হইস কতাটা কঙঁ তাহইলে।’
‘ইয়াতে আগের কি আসিল ভাইয়ো। দুপর আইতে কোচের ট্যাকা দিয়া মোর নিদান তরাইচেন তোমরা।’
‘সেই বাদে মুই তোর টাই পঞ্চাশ ট্যাকা পাইম।’
‘ক্যামন করি পান ? ট্যাকা তো মুই শোদ করি দিচঙ।’ 
‘তিরিশ দিচিস আর পঞ্চাশ। বাকি ট্যাকা দেওয়ার কতা মুকোত তুলচিস কোনদিন?’
‘এটা ক্যামন কতা কন ভাইয়ো। কতা শুনি মোর মাতা ঘুরবার নাইগচে।’
‘আরে দেইস নাই, ভাল করি খেয়াল কর । দিলে মুই কি চাবার পাঙঁ তোর টাই।’
কথাটা শুনে মকবুল চিন্তায় পড়ে গেলো। সূরত ভাই এটা কেমন কথা বলে। পাশে খুলিতে বাড়ি। এ রকম লেনদেন তো প্রতিবেশির মধ্যে সব সময়ই চলে। কোন একসময় হয়ত সে টাকাটা শোধ করেছে। তিরিশ বছর পর তা ত আর খেয়াল থাকার কথা নয়। খেয়াল না থাকার কারণই বা কী ! তিরিশ টাকার কথা তো মনে আছে। বাকি পঞ্চাশ টাকার কথা তো মনে নেই। এতো দিন কী সে টাকাটা    সূরতজামালকে না দিয়ে ফেলে রেখেছে ! নিশ্চয় কোন না কোনদিন সে শোধ করেছে টাকাটা। মনে করতে পারছে না এই আর কি। মকবুলের স্ত্রী কথাটা শুনে পাড়া মাত করলো। তার কারণে ঝগড়াঝাটির উপক্রম হলো। মকবুল তার স্ত্রীকে বোঝালো সূরত ভাইয়ো যদি সে রাতে টাকা হাওলাত না দিতো তাহলে ফরহাদের ভাগ্যে কী হতো কে জানে। ‘টাকা ধার দিয়েছে,কথা এটুকুই তো নয়। সাথে করে নিয়ে ডাক্তার ডেকে এনেছে। হাতে জান নিয়ে সেই হাড়কাঁপা শীতের রাতে ডাক্তার কী সহজে আসতে চেয়েছিলো। ছোট গ্রামখানায় ঘটনাটা বেশ সাড়া তুললো। যে যার মত মন্তব্য ছুঁড়ে দিতে লাগলো। তবে সবাই একটা বিষয়ে একমত হলো যে অভাব অনটনে সূরতজামালের হায়া শরম মারাত্মকভাবে কমে গেছে। তা না হলে এতদিন পরে কেউ পাওনা টাকার কথা উল্লেখ করে। ছেলেপুলেরা যদি ভরণপোষণ না দেয় তাহলে তো বুড়োবাপ এ রকম মনভুলো পাগল হতেই পারে। 
কথা যখন উঠলো তখন একটা বিহিত তো হওয়া দরকার। সূরতজামালও টাকার জন্য তাকিদ দিতে লাগলো। এতোদিন খেয়াল না থাকায় সে টাকা চায়নি। এখন চায়। মকবুলের উচিত খুশি মনে তা দিয়ে দেয়া। আর যদি টাকা দিয়ে থাকে তাহলে কার সামনে দিয়েছে সত্য করে বলুক। তাহলে সে আল্ল¬¬ার নামে টাকার দাবি ছেড়ে দেবে। মীমাংসার জন্য গ্রামের লোকজন জড় হলো। সূরতজামাল সবার সামনে সব ঘটনা খুলে বললো। অত্যন্ত ধীরে সুস্থে সে বলতে লাগলো মুক্তি-যুদ্ধের সে ভয়াবহ দিনের কথা; অন্ধকার রাতে দূরের গ্রাম থেকে ডাক্তার ডেকে আনার কথা। হাতের শেষ সম্বল দিয়ে অসুস্থ শিশুর জীবন বাঁচানোরর কথা সে সবিস্তারে বর্ণনা করলো। তখন চারদিকে হাহাকার। কে বন্ধক রাখে কার মালা।
মকবুল কিছু বলার আগে ফরহাদ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। সূরতজামালকে সে ছোটবেলা থেকে জেঠা বলে ডাকে। যেহেতু অবোধ বয়সে জেঠা তার জান বাঁচাতে সাহায্য করেছে, টাকা কর্জ দিয়েছে, অতোএব ঘটনাটা তাদের দূ’জনের ব্যাপার। শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধারাই দেশ স্বাধিন করেছে একথা ফরহাদ বিশ্বাস করে না। তার বিশ্বাস সমগ্রতার ওপর। যুদ্ধের সময় যারা পরের জন্য কোনোকিছু ত্যাগ করেছে তারা সবাই কমবেশি মুক্তিযোদ্ধা। সেদিক থেকে সূরতজামাল একজন সফল মুক্তিযোদ্ধা। ফরহাদ তার দু’হাত চেপে ধরে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে আবেগভরা কণ্ঠে বলে,
‘জেঠা কয় ট্যাকা পান আব্বার টাঁই?’
‘আরে কোটে কয় ট্যাকা।’
‘মোক কন, মুই দেইম তোমাক সেই ট্যাকা।’
‘তুই ক্যানে দিবু। যার টাই পাঙঁ তায় দিবে।’
‘জ্যাঠা, মুই যদি সেই ট্যাকা গাও খাটি শোদ করঙ। তোমার তাতে বাদা আছে ?’
‘পাগলা ছওয়া কয় কী! তোর এক দিনকার মাইনায় নোয়ায়।’
একদিনের কথা ফরহাদের মনে পড়ে। তখন সে সম্ভবতঃ চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। নৌকায় চড়ে সেদিন সে গিয়েছিলো যাত্রাপুরের হাট। সাথে জ্যাঠা সূরতজামালও ছিলো। ফেরার সময় হঠাৎ মেঘ করে জোরে বাতাস বইতে শুরু করলো। এদৃশ্য দেখে সূরতজামাল ব্যস্ত হয়ে ওঠে। একখানা ভাংগা বৈঠা নিয়ে জোরে জোরে নৌকা বাইতে লাগলো সে। আর বলতে লাগলো,‘হ্যারে মকবুল, ইগ্লা কী হবাইঁঙচেরে! হামরা না হয় সতরিবার পামো। এই কাচুয়া ছওয়াটার কি হইবে ? দেওয়ার মক্কর বুঝিও কেমন করি তোমরা হাত গোটে বসি আচেন ?’ 
তার কথা শুনে সবাই সচকিত হয়ে যে যা পারলো তাই দিয়ে নৌকা বাইতে লাগলো। তারা যখন বাড়ির ঘাটে পৌছলো তখন শুরু হলো তূমুল ঝড়। সেদিনের কথা মনে হলে এখনও ফরহাদের হাত পা শীতল হয়ে যায়।
‘জেঠা তোমরা না থাইকলে সেদিন হুড়কাত কী হইল হয় আল্লায় জানে।’
‘মুই জানজীবন দিয়া কাউরাইচঁঙ খোদার অকমতে সবাই বাঁচি গেইচি।’
‘আর একদিন যে মোক পাগলা কুত্তায় কামরেবার ধচ্চিল। তোমরা দোলাবাড়িত কুশ্শি দিয়া
ইটা ডাংগান। তোমাক আইসপার দেকি কুত্তাটা ভাগি গেইল।’
‘তুই দেকঙ ত্যাপুরানি কতা ভাস্পার ধল্লু। মাইন্ষে কোনটে খায়াদায়া ন্যাংটিত হাত মোচে।’
‘জেঠা, মুই তোমাক খোয়াইম পেন্দাইম। মোর কতা আইকপার নন ?’
‘উগলা করা নাইগবার নয়। বাঁচিম আর কয়টা দিন। আল্লায় নিবে কোনমতে। আচ্চা ক্যানে কইস তোর জেঠিক পুচ করোঁঙ। উয়ার গব্বোত তো জন্মিচে একগুলা কুত্তাডাংগা শাবদুল।’ 
সূরতজামালে সমবয়সি একজন বসে ছিল পাশে। সে বললো,‘ সূরত ভাইয়ো,ফরহাদ বাপোর কতাটা বুঝি দ্যাকো। ক্যানেবা কাউলায় ছওয়াটা।’
‘আরে কি বুজি দ্যাকোঁঙ। যামার পোষার তামরা না পোষে। শ্যাষকালে ভাসানি বাওয়াই হইম?’
মকবুল চেপে বসে সূরতজামালের পাশে। ছেলেকে সে খুব ভালবাসে। ছেলের কথায় সূর তুলে সেও বলে ,‘ভাইয়ো অমত না করেন। বাপোইর কতাত মত দ্যাও। দুই ভাইয়ে আয় বায় দিন কাটামো।’
মকবুলের কথা শুনে লোকের ভীড় থেকে সামনে আসে সূরতজামালের বড় ছেলে হোসেন। সে ইতস্তত কণ্ঠে বলে,‘কারো পোষা নাইগবার নয়। মোর বাপোক মুই পুষিম। যে দুইটা হয় মোরে ওটাই খাইবে ’ হোসেনের  কথার পিঠে কথা বলে মকবুল।
‘এদ্দিন তো পুষিষ নাই। এ্যালা ক্যানে অত তাকদা ধরিল ?’
‘মুই কঙঁ চইলবার নাইগচে চলুক। যকোন ঠেইকপে তকোন দ্যাকা যাইবে।’
এই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে সূরতজামাল আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। ফরহাদ যা বলছে তা মেনে নেয়া সম্ভব নয় তার পক্ষে। নিজের ছেলেরা যেখানে স্বার্থের টানে আলাদা সংসার পেতেছে, সেখানে পরের কথা কী ভাববে সে। সে শুধু একা একা গোলকধাঁধাঁয় ঘুরপাক খায় আর উদ্দেশ্যহীনভাবে মাথা নাড়ে যাতে হাঁ বা না কিছুই বুঝা যায় না। ফরহাদ তার হাত চেপে ধরে তার প্রস্তাবের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে। সূরতজামাল কিছুই বলে না। সে যেন অচেনা জগতের মানুষ। সে ভিন্ন এক পৃথিবীর সন্ধান পায়। এক বিস্ময়কর আনন্দরাজ্য যেন তার সামনে দ্বার উন্মোচন করে। এক মায়াময় গভীর সমুদ্রে সে তলিয়ে যেতে থাকে। সহসা এক সজোর পিছুটানে সে বুঝতে পারে ফরহাদের হাতের সাথে যুক্ত হয়েছে আরও ছ’খানা হাত। স্রোতের বিপাকে তলিয়ে যাওয়া একজন মানুষকে উদ্ধার করার জন্য তারা যেন মহা তৎপর হয়ে ওঠেছে।

⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN


🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.