সব্যসাচী লেখক মিতুল সাইফ। সাহিত্যের সব শাখাতেই যার সমান বিচরণ। তবে শিশুসাহিত্য রাজ্যে তিনি একজন স্বতন্ত্র রাজা। তার লেখার স্বাতন্ত্রতা তাকে পৌঁছে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতায়। তিনি হয়ে উঠেছেন সর্বজন গ্রাহ্য ব্যক্তিত্ব, শিশুদের মনিকোঠার প্রিয় লেখক। শিশুদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, চাওয়া পাওয়া, সফলতা ব্যর্থতা তিনি সুনিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তোলেন তার লেখায়। তিনি সুবিধাবাদী লেখক নন। তার কলম সর্বদা সত্যের পক্ষে কথা বলে। তার লেখায় শিশুরা খুঁজে পায় তাদের বাস্তব জীবনের চিত্র, ভবিষ্যৎ পথের নির্দেশনা।
মিতুল সাইফের সাথে আমার পরিচয় ২০০৪ সালে।তখন থেকে তার অনেক লেখা পড়েছি, শুনেছি।তার লেখা বরাবর মুগ্ধ করে আমায়।অনেকদিন পরে গত ৬/৮/২০ তারিখে দেখা হয়েছিলো তার সাথে।আমাকে উপহার দিলেন এ বছর প্রকাশিত তার তিনটি বই। সেখান থেকে একটি বই নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন বোধ করছি। একুশে বইমেলা ছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময়ে তার বই সুনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত। তেমনি একটি ছড়ার বই-"তিনটে
দাঁত নয়টা বই"। বইটি প্রকাশিত হয়েছে মহান একুশে বইমেলা ২০২০। বইটির নজরকাড়া প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন আসমাউল হুসনা।বইটিতে স্থান পেয়েছে সর্বমোট ১৬টি মনমাতানো ছড়া।
অস্থির সময়, অসুস্থ প্রতিযোগিতার যুগে বসবাস করছি আমরা। যেখানে প্রতিটি ধাপে আমাদের গ্রহন করতে হয় নতুন চ্যালেন্স। নিজেকে
নয়, অপরকে টপকে যাওয়ায় আমাদের লক্ষ্য এখন। এই হীন প্রতিযোগিতার ছোবল থেকে আমাদের কোমলমতী শিশুরাও রেহাই পায়নি। কথা বলতে শেখার আগেই তাদেরকে শিখতে হয় কিভাবে অন্যকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হবে।প্রকৃতি থেকে নয় কিভাবে বইয়ের পাতা থেকে শিখতে হবে সবকিছু। কবি বইটির প্রথম ছড়াটিতে ফুটিয়ে তুলেছেন সেই চিত্র-
ও পিচ্চি ছোট্ট খোকা/দাঁত উঠেছে কয়টা?
:দাঁত উঠেছে তিনটে তবে/বই পেয়েছি নয়টা।
এত্ত পড়া ছোট্ট মাথায়/রাখিস কেমন করে?
:বুঝি না ছাই অত্ত কিছু /কেবল মাথা ঘোরে।
(তিনটে দাঁত নয়টা বই)
পাঁচ জনে যা পারে, কেন/আমারও তা পারতে হবে?
সবাই যদি হারে তবে/আমারও কি হারতে হবে?
আমার মতই পারবো আমি/জিতবো আমি হারবো আমি
সবাই যদি ফেলটু মারে/আমারও কি মারতে হবে?
(পাঁচ জনে যা পারে)
এক সময়ের শিশুরা খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে পড়তো। খোলা আকাশ, অবারিত খেলার মাঠ, মুক্ত বাতাস তাদের মনকে ভরিয়ে তুলতো। আজকের শিশুরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তারা আজ ক্লান্ত হয় বস্তা বস্তা বইয়ের ভারে,পড়ার চাপে। কবি খুব সুন্দর ভাবে বলেছেন-
ব্যাগের ভারে পড়ছে নুয়ে/চলছে তবু ছুটে
দেখলে তুমি ভাবতে পারো/যাচ্ছে কুলি-মুটে।
মুটে নয়গো কুলি নয়গো/খোকা খুকু যায়
নিজের চেয়ে ওজন বেশি/বইয়ের বোঝা গায়।
(মুটে নয়গো কুলি নয়গো)
আমাদের শিশুরা আজ প্রকৃতি থেকে শেখার সুযোগ পায় না। আকাশের রঙ কেমন তারা বই পড়ে শেখে আকাশ দেখে শেখেনা। কোন পাখি কিভাবে ডাকে, নদী কেমন হয় এসব তারা বই পড়ে আত্তস্থ করে। আমরা আমাদের শিশুদেরকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছি। কবি বড় আক্ষেপ করে বলেছেন-
বই এর পড়া খতম খোকার/শিক্ষা মূলক জার্নি চার
'ধান গাছে কি তক্তা হবে/ কলা গাছের ফার্নিচার?'
এমনি হাজার প্রশ্নে খোকা/পায়না খুঁজে কুল কিনারা
খোকার জাহাজ ভিড়লো এসে/এ কোন দেশে ভুল কিনারা।
(ধান গাছের তক্তা)
ইংরেজি আর অংক শেখান/ছ'জন আমায় চারবেলা
মানুষ হবার ইচ্ছে মাগো/কে শেখাবেন তারবেলা!
পাঠ্যবই -এ সব কি আছে? /তাতেই কি মা শিক্ষা জাগে?
বলতে পারো মানুষ হতে/কয়টা সনদ পত্র লাগে?
(মানুষ হ'তে)
আমাদের শিশুরাও এখন আর পিছিয়ে নেই। তারাও তাদের আনন্দময় শৈশবকে বিসর্জন দিয়ে এগিয়ে চলেছে অভিভাবকদের দেখানো তথাকথিত সফলতার পথে। সবকিছু থেকে তারা নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করে বুঁদ হয়ে থাকে বইয়ের ভিতর। কঠিন কঠিন শব্দাবলী মুখস্ত করে উগলে দিয়ে আসে পরীক্ষার খাতায়। এভাবেই যাচাই হয় তাদের মেধা, সৃজনশীলতা। তবু অভিভাবকেরা তৃপ্ত নন।প্র তিযোগিতার যাতাকলে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছে আমাদের কোমলমতী শিশুরা। কবির কলমে সেই চিত্র ফুটে উঠেছে এভাবে-
অনেক খেটে পেলো খোকা/ একশোতে একশত
তাও ভরেনা মায়ের পরাণ/হয়না মনের মত।
বলেন মায়ে এটাও ভালোই/মানছি এটাও দামি,
পরের বছর এরচে বেশী/নম্বর চাই আমি।
(একশোতে আর কত)
ছুটছি আমি ছুটছে বাবা/ছুটছে বোনে ছুটছে মায়ে
গা থেকে ঘাম পড়ছে গলে/হদ্দ রকম ছোটার ঘায়ে।
জিপিএ-তে ফাইভ পেতে/এমনতর ছোটার গুতো
যাচ্ছে ছিঁড়ে মাথার সুতো/যাচ্ছে ছিঁড়ে পায়ের জুতো।
মায়ের চাওয়া বেশী বেশী/বাবার চাওয়া আরো আরো
সবার চাওয়া করতে পূরণ/আমার শুধু বাজছে বারো
(জিপিএ ফাইভ)
আমাদের শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। সেই শিশুদের শৈশব কেড়ে নিয়ে আমরা তাদেরকে পরিনত করছি যান্ত্রিক মানবে। আবেগ, অনুভূতিহীন করে তুলছি তাদের চারপাশ। বিষিয়ে তুলছি তাদের মনোজগত। আসুন শিশুদের প্রতি আমরা মানবিক হই। তাদেরকে ফিরিয়ে দিই একটি দুরন্ত শৈশব। তারা বেড়ে উঠুক হাসি আনন্দ আর জ্ঞানের সাথে। আমাদের ইশকুলগুলো হয়ে উঠুক আনন্দ নিকেতন। শিশুদের হাতে গড়ে উঠুক অনাবিল শান্তিময় সবুজ পৃথিবী।
MY OTHERS CHANNELS
🔗 FOLLOW ME
🔗 MY WEBSITE
🔗 CALL ME
+8801819515141
🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com
#গ্রন্থালোচনা
#বইআলোচনা
#বইপত্র
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#Molakat
#Book_Review
#Book_Discussion
#Literature
#Bengali_Literature
#শাহিন_আলম
#মিতুল_সাইফ
No comments