সীরাত ও প্রাচ্যবাদ : একটি পর্যালোচনা ।। কাজী একরাম

 
সীরাত ও প্রাচ্যবাদ : একটি পর্যালোচনা
কাজী একরাম
 
ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, ক্রুসেড বাহিনী কর্তৃক মুসলিম দুনিয়ার উপর ভয়াবহ আক্রমণ পরিচালনের পিছনে কারণ বা প্রনোদনা ছিল দু’টি।
 
এক হলো ‘ধর্মীয় ঈর্ষাপরায়ণতা, গৌড়ামি ও অন্ধত্ব।’ যার কারণে গীর্জার পুরোহিতদল উত্তেজিত হয়ে ইউরোপের জনসাধারণের মধ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে চরম ঘৃণা ও ক্ষোভের সঞ্চার করতে থাকে। খ্রিস্টান জাতিকে তারা এ বলে ঐক্যবদ্ধ ও উত্তেজিত করে যে, কাফিরদের (মুসলমানদের) অধীন থেকে খ্রিস্টান ভূমি অর্থাৎ ফিলিস্তিন ও বায়তুল মুকাদ্দাসকে মুক্ত করা তাদের প্রথম কর্তব্য। সুতরাং ক্রুসেড বাহিনীর মধ্যে অধিকাংশই ধর্মীয় উন্মাদনা ও গোঁড়ামির শিকার হয়ে যুদ্ধ ময়দানে ঝাপিয়ে পড়ে, আন্তরিকতা ও চরম বিশ্বাস নিয়ে। কিন্তু ময়দানে তারা পেয়েছে মৃত্যু, ধ্বংস, হত্যা, রক্তপাত এবং আঘাতের পর আঘাত।
 
দ্বিতীয় কারণ ছিল 'রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ বা সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব।' ইউরোপের শাসকবর্গ ইসলামী রাষ্ট্রসমূহ এবং বিশেষ করে সিরিয়া ও এর পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র সম্পর্কে শুনতে পায় যে, সেখানে ধন-সম্পদ, শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, সবুজ শ্যামল ও উর্বর ভূমির ফসল উপর্যুপরি বিদ্যমান, যা ছিল তখনকার ইউরোপে অকল্পনীয়। এমনিভাবে ইসলামী রাষ্ট্রসমূহে শান্তি-শৃঙ্খলা, জীবনের নিরাপত্তা ও উচ্চতর সভ্যতা-সংস্কৃতি সংক্রান্ত এমন সব কাহিনী তারা শোনে, যা তারা কখনো স্বপ্নেও দেখে নাই। সুতরাং ইউরোপীয় শাসকবর্গ ‘যীশু খ্রিস্টের’ নাম করে তাদের সৈন্যবাহিনী মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত করে। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও মুসলমানদের ধন-সম্ভার লুটে নেয়ার চরম লালসা, অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব। কিন্তু শেষতক মহান আল্লাহর ইচ্ছারই জয় হলো। দু’শতাব্দীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ক্রুসেড বাহিনীকে বিদেয় নিতে হলো পরাজিত ও লাঞ্ছিত হয়ে।
 
ইসলামী দুনিয়ার উপর সামরিক দিক থেকে পরাজয়ের পর এ কথা নিঃসন্দেহে তারা বুঝে নিয়েছিল যে, ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধের পরিবর্তে তাদের বিশ্বাস, শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতি এবং ইতিহাস পর্যালোচনা করে তাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির উপর নীরব হামলাই ব্যাপক কার্যকর ও ফলপ্রসু হবে। এই বিবেচনাবোধ থেকেই পাশ্চাত্য চিন্তাবিদদের বিভিন্ন দল অদ্যাবধি ইসলাম, ইসলামের নবীর সীরাত এবং মুসলমানদের ইতিহাস, সভ্যতা-সংস্কৃতিকে কলংকিত করার অপচেষ্টায় রত। এতে নিয়োজিত বিশেষ গোষ্ঠী হলো ওরিয়েন্টালিস্ট বা প্রাচ্যবিদ। যারা প্রাচ্যজ্ঞানের চর্চা ও অনুশীলনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানে প্রধানত ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের পিছনে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে। অবশ্য তাদের মধ্যে এমনও অনেক আছে, যারা তাদের জ্ঞান-গবেষণায় ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন করে। সত্যের কাছে নিজের দায়বদ্ধতা বজায় রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করে। তবুও বলতেই হয় যে, প্রথমোক্তদের দলই ভারী।
 
দুই.
হযরত মুহাম্মদ সা. হলেন ইসলামের মৌলসত্তা; যার মাধ্যম হয়ে কুরআন এবং সুন্নাহর অবয়বে ইসলাম মুসলমানদের নিকট এসেছে। খৃষ্টান পাদ্রী, ধর্মপ্রচারক মিশনারী এবং বিশেষত অমুসলিম পণ্ডিত প্রাচ্যবিদশ্রেণী একারণে মুহাম্মদ সা. এর পবিত্র সত্তা এবং সীরাতের উপর আক্রমণ করেছে সবচেয়ে বেশি। যাতে করে দীনে ইসলামের মূল উৎস-সত্তার প্রতি মুসলিমজাতি সংশয়, অনাস্থা ও অবিশ্বাসের শিকার হয়ে পড়ে। যেহেতু মানুষ স্বভাবতই ধর্মগুরুর ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁর অনুসরণ করে থাকে, তাই তারা ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সা. কে নিজেদের যাবতীয় ঘৃণ্য আচরণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের প্রধানতম শিকারে পরিণত করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে!
 
খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। এরপর অল্প সময়, মাত্র ২৩ বছরের জীবনসীমায় হযরত মুহাম্মদ সা. যে অবিস্মরনীয় সাফল্য লাভ করেছেন, তা যে কোনো বিচারে অনন্য সাধারণ অর্জন। হাজার বছরের ব্যবধানে তাঁর আদর্শের স্থায়িত্ব ও বিশ্বসভ্যতায় তাঁর দুর্দমনীয় প্রভাব, যুগোপযোগীতায় তাঁর সমাধান, আধুনিকতায় তাঁর ব্যাখ্যা, বিজ্ঞানে তাঁর অর্জন, প্রজ্ঞায় তাঁর অধিকার, হৃদয়ে হৃদয়ে তাঁর আসন–কোনটাই ম্লান হয়ে যায়নি। কী মহিমা ছিল তাঁর জীবনে, কিভাবে তিনি এত শক্তিশালী, কেন তিনি আজও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, তা চলমান গবেষণার বিষয়। বিশ্বব্যাপী তাঁকে নিয়ে যে উৎসাহ ও আলোচনা, তার ধারেকাছেও নেই অন্য কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব।
 
মুহাম্মদ সা. এর জীবনী ঐতিহাসিক বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত। তিনি এমনই একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর তুলনা বস্তুনিরপেক্ষ ইতিহাসের বিচারে বলা যেতে পারে একক। তাঁর জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটনাগুলোও বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। এ পর্যন্ত অন্য কোনো মনীষীর জীবনী এত সতর্কতা ও বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি, আর হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। তাঁর জীবনী সংগ্রহের পর্যায়ে হাজার হাজার সাহাবায়ে কেরামের জীবনীও অনেকটা বিশুদ্ধভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এত অধিক সংখ্যক মানুষের বিশুদ্ধ জীবনী সংগৃহীত হওয়ার ঘটনা আর নেই। ইসলামী জ্ঞানকলায় জীবনীশাস্ত্র তথা “আসমাউস রিজাল” শীর্ষক বিজ্ঞান মুসলমানরাই প্রতিষ্ঠিত করে, যার ফলে বর্তমানে ৫ লক্ষেরও বেশী মানুষের জীবনী জানা যায়। বিশিষ্ট ইসলামী স্কলার আল্লামা শিবলি নুমানি লিখেছেন : “কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের এই গর্বের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে না যে, তারা স্বীয় পয়গাম্বরের জীবনী ও ঘটনার এক একটি অক্ষর এমন ভক্তি ও গুরুত্বের সাথে সংরক্ষণ করে রেখেছে যে, কোনো মনীষীর জীবনী আজ পর্যন্ত এমন পূর্ণাঙ্গ এবং সতর্কতার সঙ্গে লিপিবদ্ধ হয়নি, আর না ভবিষ্যতে সম্ভব হবে। এর চেয়ে অধিক আর কি আশ্চর্যের বিষয় হতে পারে যে, রাসুলুল্লাহ এর কর্ম ও বাণীর পর্যালোচনা ও গবেষণার উদ্দেশ্যে তাঁকে দর্শনকারী এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎকারীর মধ্য হতে প্রায় তেরো হাজার লোকের নাম ও জীবনী লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।” এই আশ্চর্যের বিস্মিত অভিব্যক্তি শুনতে পাই ইসলামের কঠোর সমালোচক বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ স্প্রেংগারের ভাষায়- “এমন কোনো সম্প্রদায় হয় নাই, এখনো নাই যারা তাদের (মুসলিমদের) মতো বারোটি শতাব্দী যাবৎ প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তির জীবনী লিপিবদ্ধ করেছে। যদি মুসলিমগণের রচিত জীবন- চরিতমূলক গ্রন্থগুলো সংগ্রহ করা হয়, আমরা খুব সম্ভব অর্ধ মিলিয়ন কৃতি পুরুষের জীবনবৃত্তান্ত লাভ করব।”
 
তিন.
পৃথিবীর সব প্রান্তেই কোন-না-কোনভাবে মুহাম্মদ সা. এর জীবন ও শিক্ষা এবং মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে। ইসলাম সম্পর্কে চর্চা ও গবেষণা হয়েছে নানাভাবে। বিশেষত রাসূল সা. কে নিয়ে রচিত হয়েছে অজস্র গ্রন্থরাজি। এর মধ্যে যেমন গুণগানধর্মী ইতিবাচক গ্রন্থ রয়েছে, তেমনি তাঁকে বিরোধিতা ও সমালোচনা করেও লেখা হয়েছে অসংখ্য নেতিবাচক গ্রন্থ। আবার তাঁকে নিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে রচিত অপপ্রচারমূলক ও নেতিবাচক গ্রন্থের জবাবে রচিত হয়েছে অনবদ্য এবং কালজয়ী সব রচনা। উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে বলা যায়, এখানে বস্তুনিষ্ঠ সীরাত রচনার ধারা সূচিত হয়েছে খ্রিস্টান পণ্ডিত ও মিশনারীদের বিভ্রান্তিমূলক রচনার জবাবের প্রণোদনা থেকেই। ভারতীয় উপমহাদেশে এক্ষেত্রে সর্বপ্রধান যিনি এগিয়ে আসেন, তিনি হলেন স্যার সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭-১৮৯৮ খ্রি.)। ইংরেজ লেখকদের অসাধুতার জবাবে স্যার সৈয়দ আহমদ রচনা করেন Essays on life of muhamet গ্রন্থটি। শুধু ভারতেই নয়, গোটা মুসলিম দুনিয়ায় স্যার সৈয়্যদের এই উদ্যোগ ছিল সর্বপ্রথম। উর্দু ভাষায় তাঁর বিশালায়তন ‘খুতবাতে আহমদিয়া’ এদেশীয় ভাষায় প্রথম প্রতিবাদমূলক সীরাত গ্রন্থ। ভারতে খ্রিস্টান মিশনারীমহল উনিশ শতকে ইসলাম ও হযরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে প্রচুর বিভ্রান্তিমূলক প্রচারপুস্তিকা লিখে প্রচার করে। এদের অন্যতম ছিলেন পাদ্রী ফান্ডার। ফান্ডার হিন্দুস্তানের সেরা আলেম ও মুসলিম স্কলারদের প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ করতেন। 'মিজানুল হক' নামে একটি বই লেখেন এবং তার বদ্ধমূল ধারণা, এই বইয়ের জবাব দেওয়ার মত সামর্থ্য মুসলমানদের নেই! তারই উপযুক্ত জবাব হয়ে হাজির হন আল্লামা রহমতুল্লাহ কিরানভি রহ. (১৮১৮-১৮৯১ খ্রি.)। তিনি ফান্ডারকে সর্বধর্মের মানুষের বিশাল জনসমক্ষে এক ঐতিহাসিক বিতর্কে পরাজিত করেন। ফান্ডার এতে এতটাই অপমানবোধ করেন যে, ভারতবর্ষ ছেড়ে তিনি পালিয়ে বিলেত চলে যান। ঐতিহাসিক এই বিতর্কটি রজব ১২৭০ হি. মোতাবেক ১০ ই এপ্রিল ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে আগ্রাস্থ আকবরাবাদে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিরানভি রহ. এরপর এ বিষয়ে ‘ইজহারুল হক’ নামে আরবি ভাষায় একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করেন। চারখণ্ডের এই অসামান্য গ্রন্থে তিনি ইসলাম ও মুহাম্মদ সা. এর বিরুদ্ধে মিশনারি কর্তৃক আরোপিত সকল অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণ করেন। একইসাথে বাইবেলের অসংখ্য স্থানে যে পরিবর্তন ও বিকৃতি ঘটেছে, তার প্রমাণ উপস্থাপন করেন। বস্তুত কিরানভির এই গ্রন্থটির প্রকাশ খ্রিস্টান দুনিয়ার প্রতি ছিল এক বড় দুঃসংবাদ। লন্ডন টাইমসের গ্রন্থটি সম্পর্কে মন্তব্য ছিল–‘এ গ্রন্থের প্রকাশনা ও প্রচারণা অব্যাহত থাকলে বিশ্বে খ্রিস্টান ধর্মের অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে যাবে।’
 
চার.
হযরত মুহাম্মদ সা. এর জীবন, কর্ম এবং ঐতিহাসিক সাফল্যের মূল্যায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাপী লেখালেখির যে বিষয়-বৈচিত্র পরিলক্ষিত হয়, তার অন্যতম ক্ষেত্র পাশ্চাত্য দুনিয়া। ইউরোপের অধিকাংশ প্রভাবশালী ভাষায় বহু দশক ধরে মুহাম্মদ সা. -এর জীবনী ও আদর্শ চর্চার বিষয়টি মানুষের সামনে এসেছে। নানা উদ্দেশ্য, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে সীরাত বা নবীজীবনী চর্চার এই প্রেক্ষাপট তৈরী হয়েছে। ইসলামকে হেয় এবং মহানবীর অনুপম চরিত্রে কালিমা প্রক্ষেপনের উদ্দেশ্য নিয়ে পাশ্চাত্যে প্রথমে নবীজীবনী চর্চার যে ধারার সূচনা হয়, তা যেমন একটি কলংকময় অধ্যায়, তেমনি এ হীন প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে পাশ্চাত্যে তো বটেই, প্রাচ্যেরও অনেক ভাষায় কালজয়ী সীরাত গ্রন্থ রচিত হয়েছে। বলা যায়, আধুনিককালে সমৃদ্ধ, বস্তুনিষ্ঠ ও উন্নত গবেষণালব্ধ সীরাত গ্রন্থের যে রেনেসাস, তা শুরু হয়েছিল তথাকথিত প্রাচ্যবিদদের সীরাত চর্চার অসাধুতার রেশ ধরেই। বস্তুত, অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এ যাত্রা শুরু হয়েছে এবং ঘটনাক্রমে তা শাপেবর হয়েছে।
 
প্রাচ্যে এবং পাশ্চাত্যে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসে রাসূল সা. এর বিস্তারিত জীবনী রচনা ছাড়াও, স্বতন্ত্রভাবে সীরাতে রাসূলের উপর যত গ্রন্থ রচিত হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত হয়ে চলছে, তার সীমা পরিসীমার পূর্ণাঙ্গ হদিস পাওয়া এবং তার যথাযথ পরিসংখ্যান তুলে ধরা সম্ভব নয়। সাইয়েদ সোলায়মান নদভী তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতাগ্রন্থ ‘খুতবাতে মাদরাস’-এ লিখেছেন, আজ থেকে এক শতাব্দীরও অধিককাল পূর্বে দামেশকের 'আল মুকতাবিস' পত্রিকায় একটি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয় এ পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় হযরত মুহাম্মদ সা. এর সম্পর্কে ১৩’শ পুস্তক লিখিত হয়েছে। তারপর থেকে এ যাবৎ যত সংখ্যক গ্রন্থ রচিত হয়েছে, সেগুলিকেও শামিল করা হলে এ সংখ্যা কোথায় গিয়ে থামবে, তা বলাই বাহুল্য।
 
ইসলামের বিশ্বজয়ী বিস্তারে এবং মুসলিম শক্তির অভ্যুত্থানে খ্রিস্টান ইউরোপ যে ভীতি ও বিদ্বেষ তখন জন্ম নিয়েছিল, তার ফলে সংঘটিত হয় দীর্ঘস্থায়ী ক্রুসেড-যুদ্ধ, যা ছিল অন্ধ খ্রিস্টীয় মৌলবাদের ফলশ্রুতি, যা ইতোপূর্বে আলোচিত হয়েছে। নিজেদের তৈরি যুদ্ধে নিজেদের সম্মিলিত পরাজয়ের ফলে খ্রিষ্টানদের মুসলিম বিদ্বেষ আরও জঘন্য রূপ লাভ করে। দ্বন্দ্ব-যুদ্ধে পরাজিত লড়াকু যেভাবে প্রতিপক্ষের প্রতি খিস্তি এবং কানে কামড় বসাতে দ্বিধা করে না, তেমনি খ্রিস্টান বিশ্ব মুসলিমদের ইতিহাস এবং ইসলামের প্রকৃত পরিচয়ের উপর ইচ্ছাকৃত আবর্জনা নিক্ষেপে বদ্ধপরিকর হয়। বেশ পরিকল্পনা নিয়েই তারা ইসলামের ইতিহাস ও মহানবী সা. এর নিষ্কলুষ চরিত্রে কালিমা লেপনের কার্যক্রম হাতে নেয়। এই কারণে, মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে যত বিদ্বেষমূলক রচনা প্রকাশিত হয়েছে, তার অধিকাংশই ইউরোপে হয়েছে।
 
এপ্রসঙ্গে ফরাসী প্রাচ্যবিদ এমিল দরমেঁগেম, ইংরেজি এমেল ডারমিংহাম লিখেছেন, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার (ক্রুসেড) সাথে সাথে উভয় সম্প্রদায়ের মতবিরোধ ও বিদ্বেষের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। দিন দিন তা বেড়েই চলে। পশ্চিমা জগত তাদের জামার আঁচল দ্বারা বায়ু সঞ্চার করে তা আরো বাড়িয়ে তোলে। কোনো প্রকার তথ্যানুসন্ধান ছাড়াই খ্রিস্টজগত ইসলামের বিরুদ্ধে জঘন্য বিষোদগারে সীমা ছাড়িয়ে যায়। খ্রিস্টান কবিরাও এতে যোগ দেয়। তারা চরম ধৃষ্ঠতা প্রদর্শন করে মুহাম্মদ সা. কে লুণ্ঠনকারী, দস্যুদলের সর্দার, কপট, ইন্দ্রীয় পূজারী, লোভী ও যাদুকর প্রভৃতি অমার্জনীয় শব্দ ব্যবহারেও কুণ্ঠিত হয়নি।
 
ফরাসি পণ্ডিত হেনরী ডি কাস্ট্রী মধ্যযুগের ইউরোপে ইসলাম, ইসলামের নবী মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে ভয়ংকর অজ্ঞতা ও বিদ্বেষচর্চার বিবরণ দিচ্ছেন এভাবে- “মধ্যযুগে ইসলাম সম্পর্কে ইউরোপে যত কাহিনী ও গীত প্রচলিত ছিল, সে সব দেখে-শুনে মুসলমানরা আমাদের সম্পর্কে কী মন্তব্য করবে, তা বুঝে উঠতে পারছি না। মুসলমানদের ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতাপ্রসূত এসব কাহিনী এবং গীতসমূহ হিংসা ও বিদ্বেষে পরিপূর্ণ। ইসলাম সম্পর্কে যত ভুল বোঝাবুঝি ও বিরূপ মনোভাব আজতক বিরাজমান আছে, তার মূলেও এসব ভুল তথ্য কার্যকরী রয়েছে। প্রত্যেক খ্রিস্টান কবিই মুসলমানদেরকে পৌত্তলিক ও প্রতিমাপূজারী মনে করতেন এবং ক্রমপর্যায় অনুসারে তাদের তিন খোদা আছে বলে মনে করতেন। তিন খোদার একটি হলো- মাহুম, মাকুমেত বা মহামেত, দুই, উপলিন, তিন- টুরগাম্যান। তাদের ধারণা ছিল, মুহাম্মদ সা. নিজের খোদায়ী দাবির উপরই তার প্রচারিত ধর্মের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। সবচাইতে আশ্চর্যজনক কথা হচ্ছে এই যে, যে মুহাম্মদ মূর্তিপূজার চরম বিরোধী ও শত্রু ছিলেন এবং যিনি পৌত্তলিকতা তথা মূর্তি পূজাকে ‘আকবারুল কাবায়ের' বা কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সর্বাধিক গুরুতর গুনাহ বলে ঘোষণা করলেন, তাঁর সম্পর্কে এরূপ ধারণা পোষণ করা হতো যে, তিনি তাঁর নিজের মূর্তিকে পূজা করার জন্য সকলকে আহ্বান জানাতেন। এর চাইতে বড় মিথ্যাচার আর কী হতে পারে?”
 
পাঁচ.
ইসলাম ও ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে পশ্চিমামানস এমন অজ্ঞতা, বৈরিতা আর বিদ্বেষ ভাবাপন্নতাকে আশ্রয় করেই গড়ে উঠেছে। বর্তমানেও আমরা দেখি, অধিকাংশ পশ্চিমা নাগরিক ইসলাম ও মহানবী সা. এর প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে সাধারণত অজ্ঞ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের যা শেখানো হয়েছে, যা বুঝানো হয়েছে, তার প্রভাববলয় থেকে তারা আজও বেরিয়ে আসতে পারছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, পর্যাপ্ত তথ্যের উপস্থিতি, চিন্তা ও মতের স্বাধীনতা এবং উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেন মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অনীহার অবস্থা এখনও বজায় রয়েছে সেখানে। মিশরীয় পণ্ডিত ড. আব্দুর রহমান আযযাম (১৮৯৩-১৯৭৬ খ্রি.) এর কার্যকারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন। তিনি তাঁর “আর-রিসালাহ আল-খালিদাহ” গ্রন্থে লিখেছেন, আমাদের কাছে ঐতিহাসিক তথ্যের যথেষ্ট সম্পদ থাকা সত্ত্বেও পাশ্চাত্য জগৎ মুহাম্মদ সা. ও ইসলাম সম্পর্কে এত কম জানে বা বুঝে যে, সম্ভবত অন্য কোনো নবী এবং তাঁর ধর্মের বেলায় তা প্রযোজ্য নয়। আজকের পাশ্চাত্য জগতে চিন্তার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্য। এছাড়াও রয়েছে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, মানবীয় জীবন ধারার সর্বক্ষেত্রে সীমাহীন জ্ঞানের ভান্ডার। অথচ একজন নবী ও মানুষের নেতা হিসেবে মানব ইতিহাসের বিপুল প্রভাব বিস্তারকারী হযরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে আলেকজান্ডার বা সীজারের তুলনায় তারা অনেক কম জানেন। অথচ আলেকজান্ডার এবং সীজারের প্রভাব ইসলাম বা মুহাম্মদ সা.-এর তুলনায় নিতান্তই কম। বর্তমান দুনিয়ায় জানা এবং বোঝার জন্যে এতো আগ্রহ ও কৌতুহল থাকা সত্ত্বেও ইসলাম সম্পর্কে এই অনীহার কারণ কী? এ প্রসঙ্গে ড. আযযামের মতে, দু’টি কৈফিয়ত বিবেচ্য হতে পারে। প্রথম কৈফিয়তটি প্রখ্যাত সুইডিশ পন্ডিত টর আঁদ্রের লেখা থেকে জানা যায়। তিনি তাঁর ‘মুহাম্মদ দি ম্যান এ্যান্ড হিজ ফেইথ’ গ্রন্থে লিখেছেন– কারণটা সম্ভবত একটি প্রবাদের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়েউঠবে “আত্মীয়েরা পরম্পরকে অন্য সবার চাইতে কম বোঝে।” একজন খ্রিষ্টান ইসলামে এমন অনেক কিছু দেখেন, যা তাকে তার নিজের ধর্মের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু তা উপস্থাপিত হয়েছে অত্যন্ত বিকৃতরূপে। এখানে তিনি এমন কতগুলো ধারণা এবং বিশ্বাস সম্পর্কিত বিবরণ পান যা তার নিজের ধর্মের সাথে স্পষ্টরূপে সম্পর্কযুক্ত। তা সত্ত্বেও সেগুলো আশ্চর্যজনকভাবে ভিন্ন পথ বেয়ে চলে। ইসলাম আমাদের কাছে এত সুপরিচিত যে, আমরা অত্যন্ত অসতর্ক ও উদাসীনতার সাথে তাকে এড়িয়ে চলে যাই এবং এতে করে আমরা এমন একটা বিষয়কে উপেক্ষা করি যা আমরা জানি এবং খুব ভাল করেই জানি। তথাপি ইসলাম আমাদের কাছে যথেষ্ট পরিচিত নয়। আমরা প্রকৃতই এর অনন্যতা এবং মর্ম উপলব্ধি করতে পারি না। কি কারণে ইসলাম ধর্মীয়জগতে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে এবং অতি সঙ্গত কারণে এখনো সে স্থানটি জুড়ে রয়েছে। সম্পূর্ণ নতুন এবং অপরিচিত ধর্মকে যেন আমরা সহজেই বুঝতে পারি যেমন ভারত ও চীনের ধর্মসমূহ। আরব দেশের নবী ও তাঁর কিতাবকে বুঝতে হলে প্রয়োজন আরো গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা। দ্বিতীয় কৈফিয়তটা দিয়েছন উইলফ্রেড কান্টওয়েল স্মিথ। তাঁর ‘ইসলাম ইন মর্ডান হিস্ট্রি’ (১৯৫৭) গ্রন্থে। ইতিপূর্বে আমরা এ বিষয়ে আলোকপাত করে এসেছি। স্মিথ উক্ত গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ১০৯) লিখেছেন, ইতিহাসের গতিধারায় ইসলামের সাথে পাশ্চাত্য ও অন্যান্য সভ্যতার সম্পর্ক শুরু থেকেই বিপরীতধর্মী হিসেবে গড়ে উঠেছে। তেরশ বছর ধরে ইউরোপ ইসলামকে প্রায়শ শত্রু এবং তার নিজের জন্যে হুমকি হিসেবে জেনে এসেছে; তাই এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই যে, পৃথিবীর অন্য ধর্মীয় নেতার তুলনায় পাশ্চাত্যের সংবাদ মাধ্যমগুলো মুহাম্মদ সা.-কে নগণ্য স্থান দিয়েছে এবং পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মের তুলনায় পাশ্চাত্যে ইসলাম কমই গুরুত্ব পেয়েছে।
 
ছয়.
প্রথম দিকের প্রাচ্যবিদরা যেভাবে উম্মুক্তভাবে ইসলাম ও মুহাম্মদ সা. এর নিন্দা-সমালোচনা করতে ব্যস্ত ও অভ্যস্ত ছিলো, আধুনিক যুগে তাতে অনেকটা পরিবর্তন আসে। এসময় দেখা যায় এমন লেখক এবং গবেষকদের আবির্ভাব ঘটেছে প্রাচ্যবাদের এলাকায়, যারা তাদের পূর্বসূরীদের কর্মধারা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এমনকি তাদেরকে নিয়ে করেছেন তীব্র সমালোচনাও। কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেখুন :
 
ভ্যাটিকানের ‘নন খ্রিশ্চিয়ান এ্যাফেয়ার্স' দপ্তর দ্বিতীয় ভ্যাটিকান কাউন্সিলের পর একটি তথ্যমূলক পুস্তিকা প্রকাশ করে। এর নাম হচ্ছে ‘মুসলিম-খ্রিস্টান আলাপ আলোচনার দিক নির্দেশিকা।’ প্রকাশক অ্যানকোরা, রোম। ১৯৭০ সালে ফরাসী ভাষায় এর তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এই পুস্তকে ইসলাম সম্পর্কে খ্রিস্টানদের প্রতি অতীত থেকে প্রাপ্ত যাবতীয় বাতিল ধারণা ও কুসংস্কার এবং বিদ্বেষপ্রসূত বিকৃত মতামত পরিহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। ভ্যাটিকান প্রচারিত এই দলীলে স্বীকার করা হয় যে, এই পর্যায়ে আমাদের অবশ্যই একটা দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশেষত এই পর্যায়ে আমরা একটা বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করেছি। আর তা হলো, ইসলাম সম্পর্কে আমাদের মনের মধ্যে এক চিরাচরিত বিবেচনা আমরা জিইয়ে রেখেছি এবং ইসলাম সম্পর্কে যখন-তখন যেন-তেন প্রকারে সেই বিভ্রান্তিকর মতামত প্রকাশ করেও চলেছি। আমাদের উচিত হবে, অন্তরের ভেতর ইসলাম সম্পর্কে এ রকম কোনো ধারণা পোষণ না করা এবং সে ধারণা যাতে এরকম সহজিয়া ও একতরফা না হয়, সেদিকে আবশ্যিক দৃষ্টি রাখা ...ইসলাম সম্পর্কে সেই পুরাতন ভাবধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ব্যাপারে সবার আগে খ্রিস্টানদেরই এগিয়ে আসতে হবে।... স্বীকার করতেই হবে যে, অতীতে ইসলামের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে, আর এই অন্যায়ের জন্য দায়ী হলো পাশ্চাত্য জগৎ, বিশেষত তার খ্রিস্টীয় শিক্ষাব্যবস্থা।' ফরাসী প্রাচ্যবিদ ডারমিংহাম তো নাম উল্লেখ পূর্বক স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “এটা সত্যিই দুঃখজনক যে, কিছু সংখ্যক প্রাচ্যবিদ সমালোচনার ক্ষেত্রে সীমালংঘন করেছেন। যেমন মারগোলিয়াথ, নওলডেকী, স্প্রেংগার, ডোজী, কায়তানী, মাসীন, গোল্ডজিহার, গোল্ড ফরোয়া প্রমুখ । তাদের গ্রন্থসমূহ মূলত নেতিবাচক। তারা যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে থাকেন তাও মূলত নেতিবাচক। অথচ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কোনো জীবনী রচনা সম্ভব নয়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, পাদ্রী ল্যামানসের মতো একজন উঁচু মাপের প্রাচ্যবিদও ধর্মীয় গোড়ামী ও অন্যায় পক্ষপাতিত্ব থেকে মুক্ত থাকতে পারেন নি। তিনি তার উন্নতমানের গবেষণা পুস্তকসমূহ ইসলাম বিদ্বেষ ও ইসলামের নবীর প্রতি বিদ্বেষের দ্বারা কলংকিত করেছেন।”
 
এ্যনমেরী শিমেল লিখেছেন- “এ সত্যকে অকপটে স্বীকার করতে হয় যে, মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ইউরোপের বিতর্কিত বই-পুস্তক, প্রবন্ধ -নিবন্ধ এবং সাহিত্য সমালোচনাতে হযরত মুহাম্মদ সা. এর আদর্শ ও চরিত্রকে সম্পূর্ণ বিকৃত করে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁকে এবং তার মিশনকে ইনসাফের সাথে তুলে ধরতে অমুসলিম বিশ্বের কয়েক শতাব্দি লেগেছে। মুসলমানদের ধর্মীয় জীবন পদ্ধতি বুঝতে শুধু এই অপচিন্তা ধারাই অমুসলিম জ্ঞানপিপাসু এবং মনীষীদের কি অন্ধকারে ডুবিয়ে রেখেছে।”
 
দি পার্মানেন্ট এলিমেন্ট ইন রিলিজিওন গ্রন্থে বিশপ বয়েড কার্পেন্টার মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে তাদের চিরায়ত অবস্থান ও মনোভাবের পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে লিখেছেন–“হযরত মুহাম্মদ সা. এর বিষয়ে অপপ্রচারের যে ঘৃণ্য চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তার ফলে অসংখ্য লোক তাঁর বিষয়ে বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছে। তাদের ধারণায় তিনি এমন মারাত্মক ঘৃণ্য ব্যক্তি, যত প্রকারের অন্যায় আছে, সবই তার বিষয়ে ফিট হতে পারে। তবে আক্রোশের ধেয়ে আসা কালবৈশাখীর কালোমেঘ দূর হয়ে আকাশ স্বচ্ছ হয়ে গেছে। এজন্য আমরা ইসলামের প্রচারককে আলোকচ্ছটার মধ্যে দেখছি।
 
সাত.
আধুনিক কালের প্রাচ্যবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বক্তব্যের মধ্যে একতরফা সমালোচনা ও কুৎসারটনার বদলে মুহাম্মদ সা. এর প্রশংসা ও তাঁর সম্পর্কে ইতিবাচকতার নিদর্শন প্রত্যক্ষ্য করা যায়। তাদের এই ইতিবাচক মুল্যায়নের হাত ধরে অনেকসময় নবীজীবনের নানা দিক ও বিষয় ফুটে উঠেছে অত্যন্ত চমৎকারভাবে এবং তা এতটাই যে, যে কেউ তাতে মুগ্ধ হবে এবং ইসলামের নবীর প্রতি সশ্রদ্ধ সম্মান প্রদর্শন করতে বাধ্য হবে। কিন্তু, একইসাথে এটাও স্বীকার্য সত্য যে, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের বিচারে পূর্ববর্তীদের থেকে তারা বদলে গেছেন এমনটা বলা যায় না। বরং বদল হয়েছে কেবল তাদের বাহ্যিক খোলস। সুন্দর সুন্দর বাক্যের আড়ালে, চাতুর্যময় ভাষাভঙ্গিতে তারা এমন সব ‘অমৃত বিষ’ ছড়িয়ে দেয়, যা সরল চোখে ধরা পড়তে চায় না, ফলত পাঠক আরও বেশি বিভ্রান্তির শিকার হয়! এ প্রসঙ্গে আবুল হাসান আলী নদভীর বক্তব্য প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘সাধারণত এশ্রেণীর প্রাচ্যবিদরা তাদের রচনায় বিষের পরিমাণ পরিমিত মাত্রায় রাখেন। এ থেকে কম যাতে না হয়, খেয়াল রাখেন। আবার এত বেশি যেনো না হয় যা পাঠকের মনে ঘৃণা, বিরক্তি ও সন্দেহ সৃষ্টি করবে৷ এমতাবস্থায় তাদের রচনাবলী খুবই বিপজ্জনক বলে প্রমাণিত। একজন মধ্যম পর্যায়ের শিক্ষিত লোকের জন্যে এই বিষের প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। এবং বলতে গেলে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।’
 
এবার দেখুন এই সত্যের কিছু নমুনা:
(১) Half Hours with Muhammad গ্রন্থে আর্থার এন উলাস্টন লিখেছেন, ‘আরবের পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ সা. এর আদেশে হাজার হাজার মানুষ বশ্যতা স্বীকার করতো। তাঁর আনুগত্য প্রদর্শনে তারা সদাপ্রস্তুত থাকতো। কোটি কোটি অনুসারীর অন্তরে তার স্মরণ সদাজাগ্রত।’
(২) এডওয়ার্ড এ ফ্রীম্যান তার 'The History and Conquest of the Saracenes' গ্রন্থে (পৃ. ৩৬) লিখেছেন, ‘হযরত মুহাম্মদ সা. হলেন সংবিধান রচনাকারী ‘আরবীয়’ এক মহান ব্যক্তি। তৎকালে বিশ্বব্যাপী বিপ্লব ঘটান এবং পরবর্তী সমস্ত যুগে প্রভাব বিস্তার করা তাঁর ভাগ্যে লিখে দেওয়া হয়েছিল। তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়ার দাবি করতেন না। তাঁর আচার -ব্যবহার সদা মুগ্ধকর এবং সাম্যের বাস্তব চিত্র হতো। বিপদে সাহায্যকারী কল্যাণকামীদেরকে তিনি কখনো মন থেকে ভুলতে দেননি। তাঁর কোনো রাজমুকুট বা শাহী দাপট ছিল না। তাঁর কোনো শাহী দরবার ছিল না। এমনকি কোনো রাজমহলও তাঁর ছিল না। আরবের এই মহান নেতা ছোট্ট এক কুঠুরীতে থাকতেন। আর একদম সাধারণ মানের খানা খেতেন, যা অসহায় দরিদ্র মুসলমানদের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব হতো। যার আঙুলের ইশারায় সবাই উঠতে বসতে সদা প্রস্তুত থাকতো, সেই মহান নেতা নিজের জুতা নিজেই সেলাই করতেন এবং নিজস্ব পশুগুলোর দুধ নিজেই দোহন করতেন।’
(৩) C. Snouk Hurgronje Mohammedanism গ্রন্থে (পৃ. ১৩) লিখেছেন: ‘অন্ধকারে হাবুডুবু খাওয়া ‘নিজ জাতিকে’ আলোয় আনতে এবং তাদের মধ্যে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সফল হবেন এ বিষয়ে তার দৃঢ়বিশ্বাস ছিল।’
 
উদাহরণগুলোয় খেয়াল করুন, মুহাম্মদ সা. এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন প্রাচ্যবিদগণ। কিন্তু প্রশংসা করতে গিয়ে তারা মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. কে ‘আরবের পয়গম্বর’ বা ‘আরবীয় নবী’, ‘নিজ জাতির পয়গম্বর’ প্রভৃতি অভিধা দিয়ে অভিহিত করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে এতে তেমন কোনো বিপত্তিবোধ হয় না। এমনকি কারও সরল মন এমনও ভাবতে পারে যে, ভৌগোলিক বিচারে এমনটা বলা হয়েছে। কিন্তু, সত্য হচ্ছে যে, সত্য আসলে ততটুকু নয়। এর মধ্য দিয়ে তারা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে বলতে চাচ্ছে যে, মুহাম্মদ একজন সফল সংস্কারক মাত্র, আর যদি নবী হনও, তবে সেটা একান্তই আরবজাতির জন্য। আরববাসী ছাড়া বাকি দুনিয়ার পক্ষে তাঁর রিসালাত ও নবুওয়ত বিস্তৃত নয়, স্বীকারযোগ্য নয়!
 
জন্মস্থান হিসেবে প্রত্যেকেই কোন- না-কোন এলাকার সাথে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু তাই বলে মুহাম্মদ সা. কে ‘আরবীয় নবী’ কিংবা ‘আরবজাতির নবী’ ইত্যাদি বলে অভিহিত করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, কুরআন মুহাম্মদ সা. কে শুধু রাসূল বা নবি বলে ক্ষান্ত দেয়নি, বরং ‘রাহমাতুল লিল আলামীন’ তথা সার্বজনীনতা ও আন্তর্জাতিকতার পদবি প্রদান করে সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্য প্রেরিত হিসেবে ঘোষণা করেছে। কুরআন বলেছে, তাঁর রিসালাত ও নবুওয়ত বিশ্বব্যাপী এবং কিয়ামত অবধি চিরস্থায়ী। তাঁর রিসালাতের উপমা পুবাকাশে উদয়মান আলো-ঝলমল সূর্যের ন্যায়, যা তার উদয়স্থলে স্থির হয়ে থাকে না, বরং সর্বপ্লাবী আলো নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র পৃথিবীর সর্বত্রে। আধুনিক সময়ের শিক্ষিত মুসলমানদের মধ্যেও অনেকটা অসতেচনভাবে, ‘রাসূলে আরাবী’, ‘আরবীয় নবী’ কিংবা ‘মুহাম্মদে আরাবী’ ইত্যাদি প্রজাতের শব্দ-পদের ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যা নিঃসন্দেহে প্রাচ্যবিদদের প্রভাবের ফলশ্রুতি।
 
আরেকটি উদাহরণ লক্ষ্য করুন, জন. জে. পল “স্টাডিজ ইন মোহাম্মেডানিজম” এ লিখেছেন, ‘দুনিয়ার আজব হলো, এক দরিদ্র ব্যক্তি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যান। তিনি অখ্যাত এবং দরিদ্র ছিলেন। তিনি তরতর করে সফলতার সিঁড়ি বেয়ে সবার শীর্ষে পৌঁছে যান। তিনি হন পয়গম্বর, ধর্মীয়নেতা এবং বাদশাহ। তিনি এমন এক ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে এবং চিরদিন থাকবে।’
 
এখানে জন. জে. পল মুহাম্মদ সা. কে ইসলাম ধর্মের ‘প্রতিষ্ঠাতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেছেন। অথচ এ আখ্যা আদৌ যথাযথ নয়। কেননা, অন্যান্য নবি -রাসূলগণের ন্যায় মুহাম্মদও (সা.) ছিলেন একজন রাসূল। যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী বা প্রত্যাদেশ লাভ করে গোমরাহির অন্ধকারে নিমজ্জিত মানবতাকে হেদায়েতের শ্বেতশুভ্র আলোক বিতরণ করেছেন। সে হিসেবে একদিকে তিনি যেমন আল্লাহর ওহিপ্রাপ্ত রাসূল, তেমনি আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসেবে খোদ ইসলামের অনুসারীও বটে। কুরআ ও হাদীসে তাঁকে বান্দা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে বহুবার। এ হিসেবে মুহাম্মদ সা. ইসলামের অনুসারী প্রথম মুসলিম এবং ইসলামের প্রচারক মাত্র, কোনোভাবেই নতুন ধর্ম কিংবা মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা বা পত্তনকারী তিনি নন।
 
আট.
ইউরোপের লেখক-সাহিত্যিক-গবেষকগণ যেমন মুক্তকণ্ঠে মহানবী সা. এর বিমল ব্যক্তিত্ব, সফলতা ও অবদানের কথা স্বীকার করেন, তেমনি বিভিন্ন কৌশলে অস্বীকার করার পাল্লা যে আরো ভারী, তা সহজেই অনুমেয়। পুরো পাশ্চাত্যের সকলে না হোক, অন্তত অর্ধেক মানুষ যদি ইসলাম ও ইসলামের নবীর সঠিক ইতিহাস ও সত্যিকার রূপ জানতে পারতো, তাহলে তাদের সাথে ইসলাম ও মুসলিম জাহানের সম্পর্ক কখনো আজকের মতো হতো না। মহানবী সা. এর বিশ্বজনীনতা এবং ইসলামের প্রকৃত স্বরূপকে পাশ্চাত্যের সচেতন মহল নানা উপায়ও কৌশলে তাদের জনগণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। পাশ্চাত্যের লেখকদের মধ্যে যারা মহানবী সা. এর জীবন ও কর্ম নিয়ে কাজ করছেন এবং করেছেন, তাদের কাছে এ বিষয়টি অজানা নয়। তাই কেউ কেউ নিজের সততা ও দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সত্যকে অকপটে স্বীকার করেছেন। মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে সাহসী মন্তব্য করেছেন। টামস কার্লাইল তার ‘হিরোজ এন্ড হিরো ওরশিপ’ গ্রন্থের বিশেষ শিরোনাম 'দি হিরো এজ প্রফেট’-এ হযরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে লিখেছেন– The word of such a man is a voice direct from nature's own heart man do and must listen to that as to nothing else. All else is wind in comparison.
 
অর্থাৎ “এরূপ মহাপুরুষের বাণী প্রকৃতির হৃদয় থেকে সরাসরি উৎসারিত। মানব সমাজের এইসব বাণী শোনা এবং অনুসরণ করা ব্যতীত আর কিছুই করার নেই। এগুলোর সাথে তুলনা করলে অন্যগুলো শুধু বায়বীয় পদ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।”
 
হিস্ট্রি অফ টারকস্ এর ফরাসি লেখক ও ইতিহাসবেত্তা লা মার্টিন সংক্ষেপে হযরত মুহাম্মদ এর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে লিখেছেন : “দার্শনিক, বাগ্মী, ধর্মপ্রবর্তক, সেনা নায়ক, আইন প্রণেতা, ভাবের বিজয়কর্তা, যুক্তিসঙ্গত ধর্ম মতের প্রবর্তক ও প্রতিমাবিহীন ধর্মপদ্ধতির সংস্থাপক, কুড়িটি পার্থিব সাম্রাজ্য ও একটি ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ সা . এর দিকে তাকিয়ে দেখ। যেদিক থেকে মানুষের মহত্বের মান নির্ধারণ করা যায়, সেই দিক থেকে আমরা প্রশ্ন রাখতে পারি তাঁর চেয়ে মহান ব্যক্তি আর কে হতে পারে? লেখক লা মার্টিন তার প্রশ্নের মাঝেই মূলত উত্তর রেখেছিলেন, “না, তাঁর চেয়ে মহান ব্যক্তি আর কেউ হতে পারে না।”
 
 
মার্টিন অগ্রসর হয়ে আরো লিখেছেন : “উদ্দেশ্যের মহত্ত , উপায় উপকরণের ক্ষুদ্রতা এবং বিস্ময়কর ফলাফল—এই তিনটি বৈশিষ্ট্য দ্বারা যদি মানবীয় প্রতিভার বিচার করা হয়, তবে আধুনিক ইতিহাসে মুহাম্মদের সমতুল্য মহামানব আর কে আছেন? অধিকাংশ খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গ শুধুমাত্র সেনাবাহিনী গঠন করেছেন, আইন সৃষ্টি করেছেন এবং সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। তারা যদি কিছু প্রতিষ্ঠা করেই থাকেন, তা পার্থিব ক্ষমতার নামান্তর মাত্র যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের চোখের সামনেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এই মহান পুরুষ কেবল সৈন্য বাহিনীই পরিচালনা করেন নি, আইনই প্রদান করেন নি, রাজত্ব প্রতিষ্ঠাই করেন নি, জনগণকে সংগঠিতই করেন নি এবং কেবল সাম্রাজ্যই প্রতিষ্ঠা করেন নি বরং সেই সঙ্গে সেই সময়কার পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ কিংবা তারও বেশী জনঅধ্যুষিত এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষের পরিবর্তন সাধন করেছেন, বহু দেবতার হাত থেকে তাদেরকে উদ্ধার করেছেন, ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা, চিন্তা - ভাবনা ও বিশ্বাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়ন করেছেন এবং আত্মার বিকাশ ঘটিয়েছেন। একটি কিতাবের ভিত্তিতে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি রূহানী জাতীয়তা, যা প্রতিটি ভাষাভাষী ও গোত্রের মানুষকে এক ঐক্য বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। সেই কিতাবের প্রতিটি হরফ পরিণত হয়েছে আইনে।” ⠀
 
১৯৭৪ সালের ১৫ জুলাই -এ প্রকাশিত ‘টাইম ম্যাগাজিনে আমেরিকার প্রখ্যাত মনঃসমীক্ষক জুলে ম্যাসারম্যান তাঁর ‘হোয়ার আর দি লীডারস’ প্রবন্ধে ইতিহাসের বিভিন্ন মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রবন্ধের উপসংহারে উল্লেখ করেছেন, Perhaps the greatest leader of all times was Muhammad. “বোধ হয় সর্বকালের জন্য মুহাম্মদ সা. ছিলেন সবচেয়ে মহান নেতা।” সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, নিজে একজন ইহুদী হওয়া সত্ত্বেও ম্যাসারম্যান তাঁর নবী হযরত মুসা আ. কে দ্বিতীয়স্থানে রেখেছেন। তাঁর বিচারে যীশু (ঈসা আ.) এবং বুদ্ধের স্থান অনেক নীচে।
 
আমেরিকার জ্যোতির্বিজ্ঞানী, ইতিহাসবেত্তা এবং গণিতশাস্ত্রবিদ মাইকেল এইচ হার্ট ৫৭২ পৃষ্ঠার ‘দি হানড্রেড’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। হযরত আদম আ. থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্য থেকে ইতিহাসের ১০০ জন মহান প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নির্বাচন করে হার্ট গ্রন্থটি রচনা করেন। উক্ত বইয়ে তিনি হযরত মুহাম্মদ সা. কে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। এবং বিস্ময়করভাবে হার্ট তাঁর নবী যীশুকে তার বইয়ে তৃতীয়স্থানে স্থাপন করেছেন! এবং হার্ট তার রচনার উপসংহার টেনেছেন এই বলে–
 
“বর্তমান অশান্ত বিশৃঙ্খল ও দ্বন্দ্বমুখর আধুনিক বিশ্বে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর আদর্শকে অনুসরণ করা হলে বিশ্বে শান্তি ও একটি অপরাধমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা নিঃসন্দেহে সম্ভব।”
 
নয়.
বাস্তবতা হচ্ছে, উপরোক্ত মনীষীগণ সহ এভাবে আরও অসংখ্য অমুসলিম মনীষী ও পণ্ডিতবর্গ হযরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে যে অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন, যে উচ্ছসিত ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন, তা বিবৃত করে শেষ করা যাবে না। তাদের মধ্যে কেউ বলেছেন, “তিনি ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মহান ব্যক্তি।” কেউ বলেছেন, “মুহাম্মাদ লক্ষ জনের মধ্যে একজন। ” আবার কেউ বলেছেন, “ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ধর্মপ্রচারকদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সফলকাম। বোধহয় তার মতো পৃথিবীতে আর কেউ জন্মাবে না।” নি:সন্দেহে এই সব উক্তি হযরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে সর্বতোভাবে সত্য। কিন্তু অমুসলমানদের দ্বারা এই সব ভক্তিকথন ও শ্রদ্ধা নিবেদন মুসলমানদের জন্য একধরণের সংশয় তৈরি করে। তা হলো, এত সুন্দর সুন্দর উক্তির মাধ্যমে শ্রদ্ধা বা ভক্তি দেখানোর পরও কেন তারা হযরত মুহাম্মদের সা. অনুসারী হলেন না, কেন তারা ইসলাম গ্রহণ করলেন না? এর নেপথ্যে রহস্য কি? প্রখ্যাত মুসলিম স্কলার আহমদ দিদাত (১৯১৮-২০০৫ খ্রি.) সেই কারণ ও রহস্যের সন্ধান করেছেন। তিনি তাঁর  'আল কুরআন দ্যা আল্টিম্যাট মিরাকল’ গ্রন্থে লিখেছেন– প্রথম প্রথম আমি মনে করেছি এইসব অমুসলমানরা ভণ্ড বা কপট। কিন্তু আমার বিচারে ভুল ছিল। কুরআন সম্পর্কে বর্তমানে নতুন নতুন বিস্ময়কর তথ্য আবিষ্কারের পর এইসব বিখ্যাত অমুসলমান লেখক, দার্শনিক ও ঐতিহাসিকদের সম্পর্কে আমার মত বদলাতে বাধ্য হয়েছি। একথা সত্য যে, তাঁরা হযরত মুহাম্মদ সা. কে তাদের অনেক নবীর চেয়ে উচ্চে স্থান দিয়েছেন। কিন্তু তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলেন না। কারণ, তারা মনে করতেন এবং বিশ্বাস করতেন, ইসলাম ধর্ম মুহাম্মদের তৈরি এবং কুরআনের রচয়িতা হচ্ছেন হযরত মুহাম্মদ সা.। ঐসব বিখ্যাত লেখকরা অনেকে সন্দেহজনক বা দ্ব্যার্থক উদ্দেশ্যে বলেছেন যে, ইসলাম মুহাম্মদের ধর্ম। আবার কেউবা চতুরভাবে উল্লেখ করেছেন যে, পবিত্র কুরআন মুহাম্মদের রচনা। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে তারা বিচার করেছেন যে, মুহাম্মদ সা. ছিলেন ইতিহাসের একজন প্রতিভাশালী ও প্রভাবশালী মানুষ।
 
আহমদ দিদাত অতঃপর বর্তমান যুগের অন্যতম প্রশংসাকারী হিসেবে খ্যাত মাইকেল এইচ হার্টের উদাহরণ টেনে বলেন –ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করার কারণ হিসেবে মিঃ হার্ট বোধহয় তার অবচেতন মনের একটি অভিব্যক্তি গ্রন্থের ৩৯ পৃষ্ঠায় প্রকাশ করে ফেলেছেন। আর তা হলো, ... “এর পরেও তিনি ছিলেন মুসলমানদের পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ কুরআনের রচয়িতা। এটা মোহাম্মদের অন্তদৃষ্টির কতকগুলো বাণী, যা তিনি আল্লাহর নিকট থেকে প্রাপ্ত হয়েছেন বলে বিশ্বাস করতেন।” এখানে হার্ট কথিত ‘কুরআনের রচয়িতা’ , টমাস কার্লাইল এর ‘এইরূপ মানুষের বাণী’ এবং রেভারেন্ড আর. বসওয়ার্থ স্মিথের লেখা, ‘তবুও তিনি একটি গ্রন্থের রচয়িতা’ ইত্যাদি কথাগুলি লক্ষ্য করলে সহজেই বোঝা যাবে, তাদের ইসলাম গ্রহণ না করার কারণ। ড. আব্দুর রহমান আযযামের একটি অভিজ্ঞতার বিবরণে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে সামনে আসে। তিনি বলেন, ‘ত্রিশ বছর আগে লন্ডন স্কুল অব স্টাডিজের তৎকালীন ডীন স্যার ডিনিসন রসকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, মুহাম্মদ সা.- এর সরলতা ও বিশ্বস্ততায় আস্থা পোষণ করেন কিনা। তিনি বলেন, আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে, তিনি মিথ্যা বলেননি বা প্রতারণা করেন নি। তিনি সরল ও সত্যবাদী ছিলেন। আমি তাঁকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, তিনি আল্লাহর নবী ছিলেন? এর উত্তরে তিনি বললেন, ‘সেটা আলাদা ব্যাপার।’ বলা বাহুল্য, হযরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে এটাই ছিল আসল ব্যাপার! 
 
দশ.
হযরত মুহাম্মদ সা. যে শেষ নবী হয়ে জগতের বুকে আবির্ভূত হবেন তা কেবল কুরআন মাজীদই নয়, বরং পূর্ববর্তী সকল ধর্মগ্রন্থের মাঝে তাঁর নবুওয়তের পূর্বাভাস প্রদান করা হয়েছে। ধর্মগ্রন্থসমূহের বহুসংখ্যক জায়গায় মুহাম্মদি রিসালাতের সাক্ষ্য ও স্বীকৃতির ভুরি ভুরি উদাহরণ বিদ্যমান। কল্কি পুরাণ হিন্দুদের অন্যতম ধর্মগ্রন্থ। কল্কি পুরাণের ভবিষ্যৎ বাণীতে হযরত মুহাম্মদ সা. এর আবির্ভাব ও তাঁর জীবনের কতিপয় ঘটনার উল্লেখ করা হয়। লক্ষ্য করুন কল্কিপুরাণের নিম্নোক্ত ভাষ্যটি :
 
‘বিষ্ণু ভগত, ও ‘সুমতির’ ঔরসে ‘জগত গুরু’ জন্মগ্রহণ করবেন। ১২ ই বৈশাখ, সোমবার সূর্য উঠার দু'ঘন্টা পর তাঁর আবির্ভাব ঘটবে। জন্মের পূর্বে তাঁর পিতা মারা যাবেন এবং পরে তার মাও ইহধাম ত্যাগ করবেন। ‘সলমাল’ দীপের রাজনন্দিনীর সাথে ‘জগত গুরুর বিবাহ হবে। বিবাহ অনুষ্ঠানে তার চাচা ও তিন ভাই উপস্থিত থাকবেন। ‘পরস রাম’ এক গুহায় তাকে শিক্ষা দেবেন। সলমাল দীপ থেকে ‘সামবালা’ এসে যখন তিনি প্রচার কাজ শুরু করবেন, তখন তার আত্মীয়-স্বজন তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। নিপীড়ন-নির্যাতন তাকে উত্তর পাহাড়ে যেতে বাধ্য করবে। কিন্তু কিছুদিন পর তিনি তলোয়ার হাতে ‘সামবালা’ শহরে ফিরবেন এবং সমগ্র দেশ জয় করবেন। ‘জগত গুরু’ ঘোড়ায় চড়ে পৃথিবী ও সাতস্বর্গ ঘুরবেন।”
 
এভাবে যীশুখ্রিস্ট তাঁর উম্মতকে মুহাম্মদ সা. এর আগমনের যে পূর্বাভাস দিয়ে গেছেন, কুরআনে তা হুবহু এরকম এসেছে “আমি আমার পরে তোমাদেরকে এক মহান রাসূল আবির্ভাব হওয়ার সুসংবাদ দিয়ে যাচ্ছি। তার নাম হবে আহমদ।” (সূরা সফ : ৬) ইঞ্জিলের ভাষা এ বিষয়ে নিম্নরূপ : “ইয়াহইয়া তার বিষয়ে জোর গলায় স্বাক্ষী দিয়ে বললেন, “উনিই সেই লোক যার বিষয়ে আমি বলে ছিলাম। যিনি আমার পরে আসছেন। তিনি আমার চেয়ে মহান। কারণ, তিনি আমার অনেক আগে থেকেই আছেন।” (ইউহান্না, পৃ. ১৪৫ অনুচ্ছেদ, ১৫)
 
এভাবে গৌতম বুদ্ধ জীবনের শেষ মুহুর্তে বলেছিলেন, যখন তাঁর একনিষ্ট সহচর নন্দা তাঁকে জিজ্ঞেস করছিল, “গুরুজি! আপনার পর পৃথিবীবাসীকে কে ধর্ম শিক্ষা দেবে?” তাঁর প্রত্যুত্তরে বুদ্ধ বলেছিলেন , “নন্দা! আমিই পৃথিবীর প্রথম বুদ্ধ নই; আর আমি শেষ বুদ্ধও না। আমার পর আরেকজন আসবেন পবিত্র, স্বচ্ছ অন্তরধারী, কার্যক্ষেত্রে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী, কল্যাণকর, বিশ্বের সব বিষয়ের জ্ঞানী, অতুলনীয়! যেসব বাস্তব সত্য তুলে ধরি, তিনিও তাই প্রকাশ করবেন। আমার মত তিনিও পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভেজাল একটি ধর্মীয় নীতি প্রচার করবেন। তখন নন্দা বললেন, “আমরা তাঁকে কীভাবে চিনব?” জবাবে গুরুর বললেন, তাঁর নাম হবে ‘মিত্রিয়া’। ১৬ অক্টোবর, ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত এলাহাবাদের প্রসিদ্ধ ইংরেজি পত্রিকা 'লিডার এর সাত নম্বর পৃষ্ঠার তিন নম্বর কলামে একজন বৌদ্ধের লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। উক্ত বৌদ্ধ লেখক গৌতম বুদ্ধ কথিত ‘মিত্রিয়া’ শব্দের অনুবাদ করেছেন, “তাঁর নাম হবে রহমত।” যেমনটা কুরআনের আম্বিয়া সূরায় (আয়াত: ১০৭) মুহাম্মদ সা. কে রহমতরূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে– ‘এবং আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।'
 
বস্তুত, ইসলামের মহান পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ সা. এর আশীর্বাদপূর্ণ আবির্ভাব সম্পর্কে বহুভাবে বহু ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল পূর্ববতী ধর্মগ্রন্থগুলিতে এবং তিনি আবির্ভূত হবার পরেও বহু স্পষ্ট নিদর্শন (মুজেজা) প্রদর্শন করেছেন। আসলে তার গোটা জীবনটাই শুরু থেকে শেষ অবধি ছিল বিরাট এক মুজেজা। সকল প্রকার প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জের  বিরুদ্ধে তিনি সংগ্রাম করেছেন এবং জয়ী হয়েছেন। কোনো মানুষের নিকট থেকে কোনপ্রকার শিক্ষা গ্রহণ না করেও তিনি জগতকে দান করে গেছেন সর্বোত্তম জ্ঞান। যে সকল হৃদয় ছিল পাষাণের মত কঠিন তাঁর সংস্পর্শে এসে সেগুলি হয়েছে দ্রবীভূত; এবং যেসব হৃদয় ছিল দুর্বল ও পরমুখাপেক্ষী, তিনি সেগুলিকে করেছেন সবল ও সম্পূর্ণ। বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষ মাত্রই তাঁর প্রতিটি কথায় ও কাজে আল্লাহর কুদরতের ক্রিয়াশীলতা দেখতে পেতেন। এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতেন।
 
এগার.
প্রাচ্যবিদরা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষায় মুহাম্মদ সা. এর জীবন চরিত নিয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করে চলছেন। আরবি ভাষা না জানার ফলে কিংবা মুসলিম লেখকদের রচনার মাধ্যমে ইসলাম সম্বন্ধে জানার সুযোগ না পাওয়ায় মানুষ তাদের বইগুলি পড়েই ইসলাম সম্পর্কে নানাবিধ ধারণা ও জ্ঞান লাভ করে থাকে, সঙ্গতকারণেই যা হয় অসম্পূর্ণ এবং ত্রুটিপূর্ণ। আদতে প্রাচ্যবিদদের কলমে উপস্থাপিত ইসলামের যে প্রতিচ্ছবি, তাতে ইসলামের স্বরূপ-সত্য কমই থাকে। ফলশ্রুতিতে কুরআন, হাদিস, সীরাত, ইসলামের ইতিহাস, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং মুসলিমদের জীবনাচার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা এবং বিরূপ প্রতিক্রিয়া জন্ম নেয় একজন পাঠকের ভেতর। এর ফলে ক্ষতি হয় দ্বিবিধ। একদিকে অমুসলিমরা যেমন ইসলামের প্রকৃত পরিচয় লাভ করা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অপরদিকে ইসলাম সম্পর্কে জানাশোনাহীন  তথাকথিত আধুনিক শিক্ষিত মুসলিমদের মধ্যেও সৃষ্টি হচ্ছে নানারকম সংশয় ও সংকট।
 
প্রাচ্যবিদদের ইসলামবিষয়ক রচনা-গবেষণার মারফত তাদের বিভ্রান্তিকর চিন্তা-ধারার যে বিষাক্ত প্রভাব ইতোমধ্যেই মুসলিম বিশ্বে এবং আধুনিক শিক্ষিত মুসলিম মানসে ছড়িয়ে পড়েছে, এর উপযুক্ত  মোকাবিলায় সচেতন মুসলিম আলেম ও চিন্তকগণ নানা নির্দেশনা ও প্রস্তাবনা পেশ করে আসছেন। উম্মুল কুরা ইউনিভার্সিটি'র বিশিষ্ট প্রাচ্যবাদ-গবেষক ড. আমাল উবাইদ সুবাইতি তাঁর “আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফী কিতাবাতিল মুসতাশরিকীন আল বিরিতানিয়্যীন” গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে আমাদের কর্তব্য-করনীয় প্রস্তাব করে লিখেছেন, প্রাচ্যবিদদের সীরাতচর্চায় আমরা বিন্দুমাত্র ভরসা রাখব না। বিশেষত সিলেবাস, পাঠ্যক্রম এবং সংস্কৃতিমূলক কার্যক্রমগুলোতে তাদের সীরাত বিষয়ক গবেষণাসমূহকে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত না করা সমীচীন। কারণ, এসব রচনা রাসূল সা. এর মর্যাদাহানি, অসুস্থ ভাবনা-চিন্তা আর মিথ্যাচারে ভরপুর। সুবাইতির মতে, সাধারণ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন সেমিনার আয়োজন করা জরুরি,  যেখানে প্রাচ্যবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মধারা নিয়ে পর্যালোচনা হবে, গবেষণার ভিত্তিতে তাদের বক্তব্য ও চিন্তার যথাযথ খণ্ডন হবে, কুরআন ও সীরাতশাস্ত্র এবং হাদীস সম্পর্কে তাদের জ্ঞান-পাপ ও সেসব বিষয়ে তাদের নানামাত্রিক অপব্যবহার ও অপব্যাখ্যার হাল-হাকিকত স্পষ্ট করা হবে। সমর্থ হলে শরীয়াহ এবং সীরাত বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা বিতর্ক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন। এসব বিতর্ক অনুষ্ঠানে অ্যাকাডেমিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতির অনুসরণ করা হবে। শরিয়তের উসূল ও নীতিমালা এবং কুরআন-সুন্নাহর সূত্রধারার আলোকে আলোচনা হবে।
 
বরাত :
 
১. ইসলামী শরিয়াহ ও সুন্নাহ, ড. মুসতফা আস- সিবায়ী, এ. এম. এম. সিরাজুল ইসলাম অনূদিত, ইফাবা, ২০০৪।
২. ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, সীরাত শব্দ দ্রষ্টব্য ।
৩. ইস্তিশরাক আওর মাগরিবী মুস্তাশরিকিন আওর মুসলমান মুসান্নিফীন, আবুল হাসান আলী নদভী,  মাজলিসে তাহকীকাত ও এশায়াতে ইসলাম, লৌখনো।
৪. বৃটিশ প্রাচ্যবিদদের সীরাতচর্চা, ড. আমাল উবাইদ সুবাইতি, আদনান মাসউদ অনূদিত, ২০২১, শিবলী প্রকাশনী।
৫. সীরাতে রাসূল সা. রচনায় প্রাচ্য বিশেষজ্ঞগণ, ড. আ ছ ম তরিকুল ইসলাম, প্রবন্ধ, সীরাত স্মরণীকা, ইফাবা, ১৪১৯ হি.।
৬. প্রাচ্যবিদদের দাঁতের দাগ, মুসা আল হাফিজ, মাকতাবাতুল আযহার, ২০১৫।
৭. পয়গামে মুহাম্মাদী, সোলাইমান নদভী, আবদুল মান্নান তালিব অনূদিত, ইফাবা, ১৯৯২।
৮. ইসলামের আহবান, প্রবন্ধ : আর-রিসালাহ আল-খালিদাহ, ড. আব্দুর রহমান আযযাম, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন।
৯. পাশ্চাত্য মনীষীদের দৃষ্টিতে রাসূলে আকরাম, শহীদুস সালাম কাসেমী অনূদিত, মদীনা পাবলিকেশন্স, ২০০৬।
১০. অলৌকিক কিতাব আল কুরআন, আহমদ দিদাত, এ কে মুহাম্মাদ আলী অনূদিত, রিসার্চ একাডেমী ফর কুরআন এন্ড সাইন্স, আহসান পাবলিকেশন্স, ২০০৫।
১১. বিশ্বের শ্রেষ্ঠ একশ মনীষীর জীবনী, মাইকেল এইচ হার্ট, সম্পাদনা, এস এম শুভ্রত, হিমু প্রকাশন  ২০০৫।
১২. বিশ্বনবী আগমনের পূর্বাভাস, মোহাম্মদ আবুল কাসেম ভূঁইয়া, ইফাবা, ২০১৬।
১৩. বিশ্ব সাহিত্যে বিশ্বনবী, মুহাম্মদ নুরুল আমীন, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন্স, ২০০৫।
১৪. আননাবিয়্যুল খাতিম, লেখক মানাজিরে আহসান গিলানী।
১৫. মাজাল্লাহ আল ওয়াকিয়াহ, প্রবন্ধ, মুসতাশরিকীন আওর তাহকীকাতে ইসলামী, আব্দুল কুদ্দুস হাশেমী, করাচি, সংখ্যা ১০, ২০১৩।
১৬. দি চয়েস, আহমদ দিদাত, আখতারুল আলম অনূদিত, জ্ঞানকোষ প্রকাশনী, ২০০৯।
 
 
লেখক : গবেষণারত, সেন্টার ফর ইসলামি থ্যট এণ্ড স্টাডিজ, ঢাকা। 

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.