শিকল ভাঙার গল্প: ফ্যাসিবাদের রক্তচক্ষু ও আমাদের প্রাপ্তি ।। ফাহিম ফয়সাল
সংগ্রামমুখর
এই জীবনে কত মিছিলের ভিড়েই
না হারিয়ে গিয়েছি, বুকের ভেতর শাহাদাতের তামান্না
নিয়ে। কিন্তু শৈশব পেরিয়ে যখন
চারপাশকে বোঝার মতো বয়স হলো,
তখন থেকেই স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের তীব্র
অন্যায়-নির্যাতন দেখতে দেখতেই বড় হয়েছি।
২০১৩:
ধাওয়া, মেঠোপথ আর গ্রামের ভালোবাসা
সালটা ২০১৩। আমি তখন পঞ্চম
শ্রেণির ছাত্র। নড়াইল জেলা শহরের নড়াইল
ইসলামিয়া ক্যাডেট হোমে আবাসিক থেকে
পড়াশোনা করতাম। প্রতি মাসের শেষ তিন দিন
ছুটি পেলেই বাড়ি ফেরার জন্য
এক ব্যাকুল আকুলতা কাজ করত। বাবা
নিজেই বাইকে করে আমাকে ও
আমার বড় ভাই মাহির
ফয়সালকে বাড়িতে নিয়ে আসতেন।
রাজনৈতিক
কারণ দেখিয়ে তখন থেকেই প্রায়ই
আমাদের বাড়িতে চলত পুলিশের তল্লাশি
ও হানা। এমনই একদিন, ছুটি
শেষে বাড়ি থেকে ক্যাডেট
হোমে ফেরার পথে হঠাৎ পুলিশ
আমাদের ঘিরে ফেলে।
আমাদের
গ্রামটি ছিল প্রকৃতির অপরূপ
ক্যানভাস—রাস্তার দুপাশে দিগন্তবিস্তৃত সবুজে ঘেরা ধানক্ষেত। কোনো
উপায় না দেখে আমরা
ধানক্ষেতের ভেতর দিয়েই বাইক
চালিয়ে নেমে পড়লাম।
গ্রামের
মানুষ আমাদের খুব ভালোবাসতেন, স্নেহের
চোখে দেখতেন। তাঁরা কালবিলম্ব না করে নিজেদের
বাড়ির ভেতরের গলি ও ধানক্ষেতের
আড়াল দিয়ে আমাদের নিরাপদ
স্থানে বের করে দিলেন।
সেই
বিপদের দিনে গ্রামবাসীর অকৃত্রিম
ভালোবাসা ও সার্বিক সহযোগিতা
আজীবন স্মরণ রাখার মতো। মাঝরাতের আতঙ্ক
ও সেহরির থালা আমাদের জীবনে
এই নিপীড়ন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা
ছিল না; বরং তা
ধীরে ধীরে নিয়মিত আতঙ্কে
পরিণত হয়েছিল। কত শত মাঝরাতে
যে আমাদের বাড়িতে পুলিশ রেইড দিয়েছে, তার
হিসাব নেই।
কখনো
জানালা ভেঙে ঘরে ঢুকে
বাবাকে তুলে নিয়ে যাওয়া
হতো, আবার কখনো পবিত্র
রমজানে সেহরি খাওয়ার মুহূর্তেও হামলা চালানো হতো। রাতের ঘুম
কিংবা খাবারের শান্ত পরিবেশ—কোনোটিই ফ্যাসিবাদের রক্তচক্ষু থেকে রেহাই পেত
না।
২০১৮:
বাবার কারারুদ্ধ হওয়া ও বোনের
জন্ম। ২০১৮ সালে এসে
আমাদের ওপর জুলুমের মাত্রা
চরমে পৌঁছায়। বাবাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাজানো একটি মিথ্যা মামলায়
গ্রেপ্তার করা হয়।
ভাগ্যের
নির্মম পরিহাস—সে বছরই জানুয়ারি
মাসে আমার ছোট বোনের
জন্ম হয়। আর তার
ঠিক পরের মাস, ফেব্রুয়ারিতে,
বাবাকে অন্ধকার কারাকক্ষে বন্দি করে ফেলা হয়।
একটি
পরিবারের প্রধান অভিভাবকের অনুপস্থিতি যে কতটা শঙ্কা,
অসহায়ত্ব ও নিদারুণ কষ্টের
হতে পারে, তা আমরা প্রতি
মুহূর্তে হাড়ে হাড়ে টের
পেয়েছিলাম। বাবা ছাড়া আমাদের
পুরো পরিবারটাই যেন থমকে গিয়েছিল।
কারাগারের
কপাট ও একটি শিশুকাল
প্রতিদিন
আম্মু ছোট বোনকে কোলে
নিয়ে বাবাকে দেখতে কারাগারে যেতেন। সেখানে বন্দিশালার সামান্য এক চিলতে সংকীর্ণ
ও স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে বাবা শুয়ে থাকতেন।
যে
সময়ে একজন বাবার কোল
হওয়ার কথা ছিল কন্যাসন্তানের
সবচেয়ে বড় নিরাপদ আশ্রয়,
সেই সময়েই তাঁকে কাটাতে হয়েছে জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে।
বাবার
সেই একটুখানি আদর ও উষ্ণ
ছোঁয়া থেকে আমার ছোট
বোনটি বঞ্চিত হয়েছিল। সেই অন্ধকার দিনগুলোর
গল্প কিংবা বাবার সেই কষ্টের কথা
শুনলে আজও আমার ছোট
বোন কান্নায় ভেঙে পড়ে।
জেলগেটের
নাটকীয়তা ও ভাইয়ের ঢলে
পড়া অবশেষে আইনি লড়াইয়ের পর
বাবার জামিন মঞ্জুর হলো। আমরা ভেবেছিলাম,
এবার বুঝি অন্ধকারের অবসান
ঘটল। কিন্তু ফ্যাসিবাদের নিষ্ঠুরতা তখনও শেষ হয়নি।
জামিনে মুক্ত হয়ে জেলগেট থেকে
বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাবাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রকাশ্য
রাজপথে, প্রখর রোদের নিচে চোখের সামনে
বাবার সঙ্গে এমন চরম অন্যায়
হতে দেখে বড় ভাইয়া
মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। সেই
অসহনীয় যন্ত্রণা ও ক্ষোভ সহ্য
করতে না পেরে ভাইয়া
রাজপথেই সংজ্ঞাহীন হয়ে ধসে পড়েছিলেন।
এরপর
আবারও বাবাকে এক মাসেরও বেশি
সময় কাটাতে হয় কারাগারের অন্তরালে।
সব মিলিয়ে সেই অন্যায় মামলায়
বাবাকে দীর্ঘ তিনটি মাস কাটাতে হয়েছিল
জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে।
অবশেষে
স্বস্তির নিঃশ্বাস অবশেষে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের পতনের পর আজ আমরা
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছি।
দীর্ঘ
লড়াই, আতঙ্ক ও অমানসিক যন্ত্রণার
দিনগুলো পেরিয়ে আজ পরিবারের সবাইকে
নিয়ে একসঙ্গে শান্তিতে সময় কাটাতে পারছি—এটাই এখন আমাদের
জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
যে
শিকল আমাদের শৈশবকে আতঙ্কে বন্দি করেছিল, যে ভয় আমাদের
রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল,
যে অন্যায় আমাদের বাবাকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে রেখেছিল—আজ
তার অনেকটাই পেছনে ফেলে আমরা সামনে
এগিয়ে চলেছি।
এই
পথ আমাদের শিখিয়েছে—অন্যায় যত শক্তিশালীই হোক,
মানুষের ঐক্য, সাহস ও প্রতিরোধের
কাছে একদিন তাকে নত হতেই
হয়।
শিকল
ভাঙার সেই গল্প তাই
শুধু আমাদের পরিবারের গল্প নয়; এটি
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা অগণিত মানুষের
গল্প।

No comments