সেলাই করা স্বপ্ন ।। সামিয়া আক্তার সাফা
সামিয়া
আক্তার
সাফা
কাঁচের
বিশাল জানালার ওপারে ঝুলছে টুকটুকে লাল একটি জামা।
সকালের রোদ এসে পড়েছে
তার গায়ে, ঝলমলিয়ে চারদিকে।
কলি বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে আর বলে-
“আহহা কী সুন্দর এ জামাডা! বাপজান আইলে তারে কমু আমারে এবারের ঈদে যেন এ জামাডা কিনে দেয়।”
: ওই সর দোকানের সামনে থেকে, তোদের জন্য আমার দোকানে কাস্টমার ঢুকবার পারতাছে না, বাইর হ।
দোকানদারের ধমক খেয়েই হাতে পলির বস্তা নিয়ে কাঁচের জানালা থেকে দূরে সরে গেলো কলি। কিন্তু মনে তার কষ্ট নেই, সারাক্ষণ সে সেই লাল জামার কথা ভাবতে থাকে যে কতই না অপূর্ব তা,
না জানি তাকে পড়লে কেমন লাগবে! ভাবে আর খিলখিল হাসে।
হাসতে হাসতে কলি দেখতে পেলো সামনে তার বন্ধুদের জমাট বেঁধেছে।দূর থেকে তা বিরাট গোল মিটিং মনে হয়। কলিও সেখানে দৌড়ে যেতে বিন্দুমাত্র সময় নেয়নি।
একবন্ধু বলে উঠল: “জানিস! আজ মায়ে মালিকের বাসার থেকে আমার লাগি জামা আনিছে, জামাগুলা যে কত ভালো লেগেছে মোর, বড়লোকের মানুষেরা নি এডি ফেলায় দেয়, মালিকের মাইয়ারা এডি আর পরব না এল্লায় আমার মা রে দিয়ে দিছে। আমি তো মহা খুশি এবার ঈদে একখান জামা হয়েছে আমার!”
সঙ্গে সঙ্গে তাল দিলো আরেক বন্ধু: “আরে হ ভাই, এ মানুষগোর আল্লায় ট্যাকাই দিছে কিনে আর ফালায়। আমরা তো দুখান কিছু পাইও না। তবে বাপে এবার রিক্সা চালাইয়া যা পাইছে সব সংসারে ভাঙছে এবার মনে হয় না আমার কোনো জামা আইবো।”
:কিরে কলি! চুপ হয়ে রইলি যে... এমনে সময় তো তাইরেনাইরে করস খালি। আজ কথা কস না ক্যারে।
কথা শুনে কলি বলে উঠলো: “আমার বাপে দেহিস এবার আমারে একটা লাল টুকটুকে জামা কিনে দিবেনে, তোদের সক্কলের সামনে পরে আমি ঘুরব সারাদিন।”
: কি কস! তু জামা কিনেছিস? আমাগর দেহাবি না রে ??
: হেহে না, দেখালে তো আমার ঈদ পুরান হয়ে যাবে রে।
বলেই কলি আবারও তার পলির বস্তা নিয়ে চলে গেলো ময়লা টুকাতে।
বিরাট বড় এ শহর।বড় বড় অট্টালিকা আর যানবাহনের চাপে যেনো একজনের মাথা আরেকজনে খায় বোধ করে কলি।
সে নিজের মতো গল্প সাজায়, নিজে নিজেই কথা বলে, আবার নিজে নিজেই হাসে। তার প্রাণোজ্জ্বল হাসি যেনো থমকে দেয় সকল কোলাহল, সকল ব্যস্ততা। সবাই থমকে শুধু তাকেই দেখে আড়চোখে।
সূর্য অস্তমিত হলো, সন্ধ্যে গাঢ় হতে লাগল। আজ সারাদিন কলি তেমন কোনো ময়লা টুকাতে পারেনি, তাই কলির পেটে পরেনি কোনো দানাপিনা। শুধু মনুষ্যক্ষুধা মেটাতে রাস্তার পাশে স্যাতস্যাতে মরিচা ধরা টিউবওয়েল থেকে পানি চেপে, খেয়ে কলি শুয়ে পড়ল। তারপরেও কলির মনে কোথা থেকে যেনো সুখ আচ্ছন্ন করেছে। শুধু একটাই কথা-
“বাপজানেরে কমু আমারে যেন ওই জামাডাই আনি দেয়।”
আসসালাতু খইরুম মিনান্নাউম- শোনার সাথে সাথে কলির চোখ খুললো।
দেখলো প্রতিদিনের মতো আজোও সূর্য উঠেছে- ধীর গতিতে, আশেপাশে কেমন লাল আভা আর সাথে আকাশের নীল আবরণ মিশে এক নিদারুণ রূপ ধারণ করেছে। পাখিরা সব বেরিয়ে পড়েছে, আকাশে ডানা মেলে এদিকসেদিক ঘুরাঘুরি করছে। তবে আকাশের পাখিদের সাথে বেরিয়েছে আরো একটি পাখি যা জমিনে বিচরণ করে ঠিক একইভাবে খাদ্য সন্ধানে এদিকসেদিক ঘুরেফিরে, তারপর...
তারপর যা পায় তাই খায়।
পেটে গুড়গুড় শব্দ হলো, কলি বুঝল কাল থেকে না খাওয়ার কারণে তার বড্ড খিদে লেগেছে কিন্তু এতো সকালে সে খাবার পায় কই! চিন্তা না করেই চটের পাশে ময়লা পলিথিনের বস্তা নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ল কলি, জীবনের তাগিদেৃ.
বিশাল ঝকঝকে কাঁচের জানালা, জানালায় উঁকি দিলে দেখা যায় পিছে পুতুলে পরে আছে কলির সেই প্রিয় লাল জামাটি।
কলি আবারও থমকে গেলো ভাবতে থাকল- “কি অদ্ভুত দুনিয়া! মানুষ পায় না জামা পরতে আর এ —পুতুল হয়ে নাকি সবার আগে জামা পরে ফেলল।পুতুলেরও বড়ই সৌভাগ্য কিন্তু পুতুল কি তা জানে?”
পুতুলকে দেখে কলি বরাবরই হিংসে করত “ইশ আমি যদি পুতুল হতাম!”
পরক্ষণেই পানির ছিটা পড়লো তার ছোট্ট শরীরে। সামনে তাকিয়ে দেখে দোকানদার মশাই তবে কি যেনো গজগজিয়ে বলছে তাকে, তা কলির এক কান দিয়ে ঢুকছে আরেক কান দিয়ে বের হচ্ছে.. না না! বরং এরও বেশি তার কোনো কানেই ঢুকছে না।
: হতচ্ছেড়ি তুই আবার আসছিস! চুরি করার ধান্দা নাকি তোর। তোদের মতো রাস্তার মানুষগুলা তো এগুলা ছাড়া কিছু পারস না। আজ তো পানি দিছি কাল যদি আবারও দেখি তোরে আমার দোকানের গ্লাসের পাশে দাঁড়ায় থাকতে তোকে লাঠিপেটা করব আমি - এ বলে রাখলাম। দূর হো অকল্যানী।
কলি চলে আসল, এবার কেনো যেনো মনে হালকা বেদনা অনুভব হচ্ছে তার। কি আজব! কখনো তো এতো ভার লাগেনি অন্তরটা। তা আজ হঠাৎ এমন কাঁদতে কেনো ইচ্ছে করছে?
সে যাক গে অনেক বোতল আর ময়লা টুকিয়েছে কলি। সবগুলো বিক্রি করে ২৫০টাকা পেয়েছে যা কলির কাছে ঢের বেশি। কাল ঈদ বিধায় মালিকে তাকে আরো ৫০টাকা বেশি দিয়েছে এখন কলির নিকট ৩শ টাকা জমেছে।
খুশিতে কলি আটখানা, যেনো প্রখর খড়ায় জমি মরে ছাই আর ঠিক তখনই আকাশ থেকে রহমতের বৃষ্টি অকস্মাৎ পড়ে আর সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের জমি চোখের পলকেই প্রাণ সঞ্চার করে উজ্জীবিত হয়ে উঠে ঠিক তেমনই খুশি আজ কলি।
দৌড়ে চলে যায় সেই দোকানে, কিন্তু পুতুলের গায়ে জামাটা কলির দৃষ্টিতে পড়ছে না, সে তৎক্ষণাৎ দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করলো-
“ভাই এ পুতুলের জামাখান কই গেছে, এইযে আমি ৩শ টিয়া লইয়া আইছি এ জামাখান কিনুম। জামাডা কই ভাই লইয়া আহেন আমি কাল ঈদে ফিনদুম।”
কথা শুনে দোকানের সব কর্মচারীরা অট্টহাসিতে গড়াগড়ি খেলো। কলির কানে তা বড়ই বিচ্ছিরি শব্দ লাগল যেনো পাতালপুরের রাক্ষস খকখক করে হাসছে। ছিহ এতো বাজে হাসিও বুঝি মানুষের হয়!
: আরে ছেমড়ি ওই জামা বেইচ্চা দিছি। লাস্ট পিছ আছিলো। কাল ঈদ একজনের পছন্দ হইছে লগে লগে লইয়া গেছে গা। আর ওই জামার দাম ৪ হাজার টাকা তুই আনছিস মাত্র ৩০০টাকা দিয়া কিনতে হাহাহাহাহাৃ
এই নে এই পুরান জামাটা রাখ কাল ঈদে পড়িস নে একটু ছিড়া আছে সেলাই করে নিস।সেলাই করলে নতুন লাগবে নে।”
নিস্তব্ধতা কলিকে আঁকড়ে ধরল। দোকানটা এতো সাজানো, এতো আলো, এতো ঝলক– আজব তো হঠাৎ এমন ঘুটঘুটে অন্ধকার লাগছে কেনো? মনে হচ্ছে চোখে কিছু দেখছে না, কিছু শ্রবণ করতে পারছে না। সারাদিন শুধু একটা হোটেলের বাশি রুটি খেয়েছে তারপরেও পেটে কষ্ট না পেয়ে মনে কেমন ভার অনুভব হচ্ছে, আমার কি কষ্ট লাগছে?
সে যাক গে সেই পুরান জামাটা নিয়ে কলি ফিরল তার স্যাতস্যাতে ছালার বস্তার ঘরে। মাথাটা কেমন যেনো ব্যথা করছে সারাদিন এতো খাটনি খেটেছে যে চোখ বন্ধ করতেই ঘুমের দেশে তাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যায় ।
: কলি... কলি... কলি মা কই তুই। দেখ তোর জন্য কি এনেছি।
: কি এনেছো বাবা! ও মা গো!! এটাতো সেইইই লাল জামা। বাবা তুমি জানলে ক্যাম্নে আমি এডাই কিনবার চাইছিলাম।বাবা জানো না আমি কত্ত খুশিই, তুমি সেরা বাবা আমার।
: আমার মেয়ে বায়না করেছে আমি কি না দিয়ে পারি। কাল পরে দেহাইস তোর বন্ধুগোর। সবাই কইবেনে কলিরে খাসা লাগতিছে দেখতে, পরী পরী পুরাই একটা পরী।
: যাও বাবা তুমি যে কি বলো না!
: ভুল কি বলছিরে, তুই তো পরীই, আমার সোনা মা। আয় একটু আদর করি তোরে।
আসসালাতু খইরুম মিনান্নাউম— কলির চোখ দুটো আলতো করে খুলল। কই পাশে তো বাবা নেই।
বাবার একটা ফটো সে বালিশের নিচ থেকে বের করল।
দেখে বলতে লাগল —- “ বাবা কেনো যে তুমি চলে গেলে, তোমার পরীরে এহন কেউ যত্ন নেয় না গো। মাও আমায় রাখি গেছে গা সংসার ছাড়ি। তুমি দুনিয়ায় থাকিলে আমার দুনিয়াডাই স্বর্গ হইত গো বাবা! ও বাবা... বাবা...”
কলির বাবা সামান্য একজন ফেরিওয়ালা ছিলেন। একবার এক বাড়ি থেকে জিনিস নেওয়ার সময় কে যেনো বলে উঠল- “এই লোক এ বাসা থেকে ফোন চুরি করছে, শালা চোর বাটপার!! ধরেন এরে যেনো না পালাইবার পারে.. মারেন এরে সবাই মারেন।”
কাশেম মিয়া চিৎকার করে বলতে লাগল-
: আমি চুরি করি নাই স্যার, চুরি করি নাই। আমারে ছাইড়া দ্যান, মাইরেন না আর আমি চুরি করি নাই।
: তবে রে- ছোটোলোকের বাচ্চা আবার মিথ্যা কথা কস। তুই চুরি না করলে এই ফোন তোর ভাঙ্গারিতে কেম্নে যায় ক আমায়।
: সত্যি কইতিছি ম্যাডামে আমায় দিছে বেচার লাগি আমি নিজের থে লই নাই।
: দেখছেন সবাই! আবার মিথ্যা কথা কয় ব্যাটা! ধরেন এরে, বান্ধেন এরে খাম্বার লগে দড়ি দিয়া। চোরার ঘরে চোর।
জনগণ যাচাই-বাছাই করার আগেই সবাই তাকে চোর অপবাদ দিয়ে খাম্বার সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধে আর তার চুল কামিয়ে দিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়।
মানুষের ভিড় যখন বিচারকের আসনে বসে, তখন সত্য সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়ে।
কেউ প্রশ্ন করেনি...
কেউ প্রমাণ চায়নি-
শুধু মারতে শুরু করেছিল।
অবহেলায় অপমানে জর্জরিত কাশেম মিয়া বাড়ি ফিরে। আশেপাশে সবাই তাদেরকে থু থু করছিলো। কাশেম মিয়ার বউ তা দিনের পর দিন সহ্য করতে না পেরে এ সংসার ছেড়েছে। তবে বেশ করুণভাবেই ছেড়েছে সোজা পাতাললোকে।
কাশেম মিয়ারও শরীর আর চলে না। আর বের হয় না লজ্জায়- আত্মগ্লানিতে। পাড়া-প্রতিবেশীরা সবাই দূরে থাকে এদের থেকে। ফলস্বরূপ খাবার জুটে তো জুটে না। না খেয়ে খেয়ে অন্তরের ভার যেনো পাহাড় তুলে এনেছে। অতঃপর এ গল্পের ইতি টানে- কালোজ্বরে।
কলিকে একা রেখে বাবা-মা সব পলাতক হয়ে গেলো কিভাবে কিভাবে জানি!
পরবর্তীতে জানা গিয়েছিলো সেই ফোন ম্যামসাহেবই দিয়েছিলো বেচতে। স্বামীর থেকে নতুন মডেলের ফোন নিবে বলে। ম্যামসাহেব বুদ্ধি এঁটেছিলো এ ফোন হারিয়ে গেছে বলে নতুন একখান ফোন স্বামীর থেকে ফুসিয়ে নিতে পারবে।
কিন্তু সমাজ ম্যামসাহেবের বিচার করল না আর করবেই বা কেনো? তারা যে ধনী সম্প্রদায় তাদের উপর কি আঙুল তোলা যায়!
আশেপাশের প্রতিবেশীরা কলির জন্য আফসোস করছিলো- “আহহারে মাইয়াডারে এহন কেডা দেখব? এ কেমন মা! সন্তান রাইকখা কেউ গলায় ফাঁস দেয়। ছিহ! তার লাইগগাই তো তার স্বামীডাও গেলো আর এহন এই মাইয়াডাও যাইবো মনে হয়। এ ধরনের মহিলা মানুষ দিয়া কি সংসার চলে... ছিহ!”
কলির মাথায় সব স্মৃতি ঘুরপাক খেলো। প্রতিদিনই সে তার বাবাকে কল্পনা করে- নানান গল্প বানায়, বাবা আমায় এটা দেয় ওটা দেয়। তারপরৃ
হাতে সে সেলাই বাক্স নিলো আর পুরোনো জামার ছেঁড়া অংশগুলো যত্ন করে সেলাই করল।
সূঁচের ফোঁড়ের সঙ্গে সঙ্গে যেন নিজের ভাঙা স্বপ্নগুলোকেও জোড়া লাগাচ্ছিল সে।
বাইরে তখন ঈদের চাঁদ উঠেছে।
শহরের অট্টালিকাগুলো আলোয় ঝলমল করছে। মসজিদে মাইকিং হচ্ছে —-
“ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক।”
আর শহরের এক কোণে, স্যাতস্যাতে ছালার বস্তার ঘরে বসে একটি মেয়ে ফিসফিস করে বলছে-
“এইতো আমার ঈদের নতুন জামা”
কলি বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে আর বলে-
“আহহা কী সুন্দর এ জামাডা! বাপজান আইলে তারে কমু আমারে এবারের ঈদে যেন এ জামাডা কিনে দেয়।”
: ওই সর দোকানের সামনে থেকে, তোদের জন্য আমার দোকানে কাস্টমার ঢুকবার পারতাছে না, বাইর হ।
দোকানদারের ধমক খেয়েই হাতে পলির বস্তা নিয়ে কাঁচের জানালা থেকে দূরে সরে গেলো কলি। কিন্তু মনে তার কষ্ট নেই, সারাক্ষণ সে সেই লাল জামার কথা ভাবতে থাকে যে কতই না অপূর্ব তা,
না জানি তাকে পড়লে কেমন লাগবে! ভাবে আর খিলখিল হাসে।
হাসতে হাসতে কলি দেখতে পেলো সামনে তার বন্ধুদের জমাট বেঁধেছে।দূর থেকে তা বিরাট গোল মিটিং মনে হয়। কলিও সেখানে দৌড়ে যেতে বিন্দুমাত্র সময় নেয়নি।
একবন্ধু বলে উঠল: “জানিস! আজ মায়ে মালিকের বাসার থেকে আমার লাগি জামা আনিছে, জামাগুলা যে কত ভালো লেগেছে মোর, বড়লোকের মানুষেরা নি এডি ফেলায় দেয়, মালিকের মাইয়ারা এডি আর পরব না এল্লায় আমার মা রে দিয়ে দিছে। আমি তো মহা খুশি এবার ঈদে একখান জামা হয়েছে আমার!”
সঙ্গে সঙ্গে তাল দিলো আরেক বন্ধু: “আরে হ ভাই, এ মানুষগোর আল্লায় ট্যাকাই দিছে কিনে আর ফালায়। আমরা তো দুখান কিছু পাইও না। তবে বাপে এবার রিক্সা চালাইয়া যা পাইছে সব সংসারে ভাঙছে এবার মনে হয় না আমার কোনো জামা আইবো।”
:কিরে কলি! চুপ হয়ে রইলি যে... এমনে সময় তো তাইরেনাইরে করস খালি। আজ কথা কস না ক্যারে।
কথা শুনে কলি বলে উঠলো: “আমার বাপে দেহিস এবার আমারে একটা লাল টুকটুকে জামা কিনে দিবেনে, তোদের সক্কলের সামনে পরে আমি ঘুরব সারাদিন।”
: কি কস! তু জামা কিনেছিস? আমাগর দেহাবি না রে ??
: হেহে না, দেখালে তো আমার ঈদ পুরান হয়ে যাবে রে।
বলেই কলি আবারও তার পলির বস্তা নিয়ে চলে গেলো ময়লা টুকাতে।
বিরাট বড় এ শহর।বড় বড় অট্টালিকা আর যানবাহনের চাপে যেনো একজনের মাথা আরেকজনে খায় বোধ করে কলি।
সে নিজের মতো গল্প সাজায়, নিজে নিজেই কথা বলে, আবার নিজে নিজেই হাসে। তার প্রাণোজ্জ্বল হাসি যেনো থমকে দেয় সকল কোলাহল, সকল ব্যস্ততা। সবাই থমকে শুধু তাকেই দেখে আড়চোখে।
সূর্য অস্তমিত হলো, সন্ধ্যে গাঢ় হতে লাগল। আজ সারাদিন কলি তেমন কোনো ময়লা টুকাতে পারেনি, তাই কলির পেটে পরেনি কোনো দানাপিনা। শুধু মনুষ্যক্ষুধা মেটাতে রাস্তার পাশে স্যাতস্যাতে মরিচা ধরা টিউবওয়েল থেকে পানি চেপে, খেয়ে কলি শুয়ে পড়ল। তারপরেও কলির মনে কোথা থেকে যেনো সুখ আচ্ছন্ন করেছে। শুধু একটাই কথা-
“বাপজানেরে কমু আমারে যেন ওই জামাডাই আনি দেয়।”
আসসালাতু খইরুম মিনান্নাউম- শোনার সাথে সাথে কলির চোখ খুললো।
দেখলো প্রতিদিনের মতো আজোও সূর্য উঠেছে- ধীর গতিতে, আশেপাশে কেমন লাল আভা আর সাথে আকাশের নীল আবরণ মিশে এক নিদারুণ রূপ ধারণ করেছে। পাখিরা সব বেরিয়ে পড়েছে, আকাশে ডানা মেলে এদিকসেদিক ঘুরাঘুরি করছে। তবে আকাশের পাখিদের সাথে বেরিয়েছে আরো একটি পাখি যা জমিনে বিচরণ করে ঠিক একইভাবে খাদ্য সন্ধানে এদিকসেদিক ঘুরেফিরে, তারপর...
তারপর যা পায় তাই খায়।
পেটে গুড়গুড় শব্দ হলো, কলি বুঝল কাল থেকে না খাওয়ার কারণে তার বড্ড খিদে লেগেছে কিন্তু এতো সকালে সে খাবার পায় কই! চিন্তা না করেই চটের পাশে ময়লা পলিথিনের বস্তা নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ল কলি, জীবনের তাগিদেৃ.
বিশাল ঝকঝকে কাঁচের জানালা, জানালায় উঁকি দিলে দেখা যায় পিছে পুতুলে পরে আছে কলির সেই প্রিয় লাল জামাটি।
কলি আবারও থমকে গেলো ভাবতে থাকল- “কি অদ্ভুত দুনিয়া! মানুষ পায় না জামা পরতে আর এ —পুতুল হয়ে নাকি সবার আগে জামা পরে ফেলল।পুতুলেরও বড়ই সৌভাগ্য কিন্তু পুতুল কি তা জানে?”
পুতুলকে দেখে কলি বরাবরই হিংসে করত “ইশ আমি যদি পুতুল হতাম!”
পরক্ষণেই পানির ছিটা পড়লো তার ছোট্ট শরীরে। সামনে তাকিয়ে দেখে দোকানদার মশাই তবে কি যেনো গজগজিয়ে বলছে তাকে, তা কলির এক কান দিয়ে ঢুকছে আরেক কান দিয়ে বের হচ্ছে.. না না! বরং এরও বেশি তার কোনো কানেই ঢুকছে না।
: হতচ্ছেড়ি তুই আবার আসছিস! চুরি করার ধান্দা নাকি তোর। তোদের মতো রাস্তার মানুষগুলা তো এগুলা ছাড়া কিছু পারস না। আজ তো পানি দিছি কাল যদি আবারও দেখি তোরে আমার দোকানের গ্লাসের পাশে দাঁড়ায় থাকতে তোকে লাঠিপেটা করব আমি - এ বলে রাখলাম। দূর হো অকল্যানী।
কলি চলে আসল, এবার কেনো যেনো মনে হালকা বেদনা অনুভব হচ্ছে তার। কি আজব! কখনো তো এতো ভার লাগেনি অন্তরটা। তা আজ হঠাৎ এমন কাঁদতে কেনো ইচ্ছে করছে?
সে যাক গে অনেক বোতল আর ময়লা টুকিয়েছে কলি। সবগুলো বিক্রি করে ২৫০টাকা পেয়েছে যা কলির কাছে ঢের বেশি। কাল ঈদ বিধায় মালিকে তাকে আরো ৫০টাকা বেশি দিয়েছে এখন কলির নিকট ৩শ টাকা জমেছে।
খুশিতে কলি আটখানা, যেনো প্রখর খড়ায় জমি মরে ছাই আর ঠিক তখনই আকাশ থেকে রহমতের বৃষ্টি অকস্মাৎ পড়ে আর সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের জমি চোখের পলকেই প্রাণ সঞ্চার করে উজ্জীবিত হয়ে উঠে ঠিক তেমনই খুশি আজ কলি।
দৌড়ে চলে যায় সেই দোকানে, কিন্তু পুতুলের গায়ে জামাটা কলির দৃষ্টিতে পড়ছে না, সে তৎক্ষণাৎ দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করলো-
“ভাই এ পুতুলের জামাখান কই গেছে, এইযে আমি ৩শ টিয়া লইয়া আইছি এ জামাখান কিনুম। জামাডা কই ভাই লইয়া আহেন আমি কাল ঈদে ফিনদুম।”
কথা শুনে দোকানের সব কর্মচারীরা অট্টহাসিতে গড়াগড়ি খেলো। কলির কানে তা বড়ই বিচ্ছিরি শব্দ লাগল যেনো পাতালপুরের রাক্ষস খকখক করে হাসছে। ছিহ এতো বাজে হাসিও বুঝি মানুষের হয়!
: আরে ছেমড়ি ওই জামা বেইচ্চা দিছি। লাস্ট পিছ আছিলো। কাল ঈদ একজনের পছন্দ হইছে লগে লগে লইয়া গেছে গা। আর ওই জামার দাম ৪ হাজার টাকা তুই আনছিস মাত্র ৩০০টাকা দিয়া কিনতে হাহাহাহাহাৃ
এই নে এই পুরান জামাটা রাখ কাল ঈদে পড়িস নে একটু ছিড়া আছে সেলাই করে নিস।সেলাই করলে নতুন লাগবে নে।”
নিস্তব্ধতা কলিকে আঁকড়ে ধরল। দোকানটা এতো সাজানো, এতো আলো, এতো ঝলক– আজব তো হঠাৎ এমন ঘুটঘুটে অন্ধকার লাগছে কেনো? মনে হচ্ছে চোখে কিছু দেখছে না, কিছু শ্রবণ করতে পারছে না। সারাদিন শুধু একটা হোটেলের বাশি রুটি খেয়েছে তারপরেও পেটে কষ্ট না পেয়ে মনে কেমন ভার অনুভব হচ্ছে, আমার কি কষ্ট লাগছে?
সে যাক গে সেই পুরান জামাটা নিয়ে কলি ফিরল তার স্যাতস্যাতে ছালার বস্তার ঘরে। মাথাটা কেমন যেনো ব্যথা করছে সারাদিন এতো খাটনি খেটেছে যে চোখ বন্ধ করতেই ঘুমের দেশে তাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যায় ।
: কলি... কলি... কলি মা কই তুই। দেখ তোর জন্য কি এনেছি।
: কি এনেছো বাবা! ও মা গো!! এটাতো সেইইই লাল জামা। বাবা তুমি জানলে ক্যাম্নে আমি এডাই কিনবার চাইছিলাম।বাবা জানো না আমি কত্ত খুশিই, তুমি সেরা বাবা আমার।
: আমার মেয়ে বায়না করেছে আমি কি না দিয়ে পারি। কাল পরে দেহাইস তোর বন্ধুগোর। সবাই কইবেনে কলিরে খাসা লাগতিছে দেখতে, পরী পরী পুরাই একটা পরী।
: যাও বাবা তুমি যে কি বলো না!
: ভুল কি বলছিরে, তুই তো পরীই, আমার সোনা মা। আয় একটু আদর করি তোরে।
আসসালাতু খইরুম মিনান্নাউম— কলির চোখ দুটো আলতো করে খুলল। কই পাশে তো বাবা নেই।
বাবার একটা ফটো সে বালিশের নিচ থেকে বের করল।
দেখে বলতে লাগল —- “ বাবা কেনো যে তুমি চলে গেলে, তোমার পরীরে এহন কেউ যত্ন নেয় না গো। মাও আমায় রাখি গেছে গা সংসার ছাড়ি। তুমি দুনিয়ায় থাকিলে আমার দুনিয়াডাই স্বর্গ হইত গো বাবা! ও বাবা... বাবা...”
কলির বাবা সামান্য একজন ফেরিওয়ালা ছিলেন। একবার এক বাড়ি থেকে জিনিস নেওয়ার সময় কে যেনো বলে উঠল- “এই লোক এ বাসা থেকে ফোন চুরি করছে, শালা চোর বাটপার!! ধরেন এরে যেনো না পালাইবার পারে.. মারেন এরে সবাই মারেন।”
কাশেম মিয়া চিৎকার করে বলতে লাগল-
: আমি চুরি করি নাই স্যার, চুরি করি নাই। আমারে ছাইড়া দ্যান, মাইরেন না আর আমি চুরি করি নাই।
: তবে রে- ছোটোলোকের বাচ্চা আবার মিথ্যা কথা কস। তুই চুরি না করলে এই ফোন তোর ভাঙ্গারিতে কেম্নে যায় ক আমায়।
: সত্যি কইতিছি ম্যাডামে আমায় দিছে বেচার লাগি আমি নিজের থে লই নাই।
: দেখছেন সবাই! আবার মিথ্যা কথা কয় ব্যাটা! ধরেন এরে, বান্ধেন এরে খাম্বার লগে দড়ি দিয়া। চোরার ঘরে চোর।
জনগণ যাচাই-বাছাই করার আগেই সবাই তাকে চোর অপবাদ দিয়ে খাম্বার সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধে আর তার চুল কামিয়ে দিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়।
মানুষের ভিড় যখন বিচারকের আসনে বসে, তখন সত্য সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়ে।
কেউ প্রশ্ন করেনি...
কেউ প্রমাণ চায়নি-
শুধু মারতে শুরু করেছিল।
অবহেলায় অপমানে জর্জরিত কাশেম মিয়া বাড়ি ফিরে। আশেপাশে সবাই তাদেরকে থু থু করছিলো। কাশেম মিয়ার বউ তা দিনের পর দিন সহ্য করতে না পেরে এ সংসার ছেড়েছে। তবে বেশ করুণভাবেই ছেড়েছে সোজা পাতাললোকে।
কাশেম মিয়ারও শরীর আর চলে না। আর বের হয় না লজ্জায়- আত্মগ্লানিতে। পাড়া-প্রতিবেশীরা সবাই দূরে থাকে এদের থেকে। ফলস্বরূপ খাবার জুটে তো জুটে না। না খেয়ে খেয়ে অন্তরের ভার যেনো পাহাড় তুলে এনেছে। অতঃপর এ গল্পের ইতি টানে- কালোজ্বরে।
কলিকে একা রেখে বাবা-মা সব পলাতক হয়ে গেলো কিভাবে কিভাবে জানি!
পরবর্তীতে জানা গিয়েছিলো সেই ফোন ম্যামসাহেবই দিয়েছিলো বেচতে। স্বামীর থেকে নতুন মডেলের ফোন নিবে বলে। ম্যামসাহেব বুদ্ধি এঁটেছিলো এ ফোন হারিয়ে গেছে বলে নতুন একখান ফোন স্বামীর থেকে ফুসিয়ে নিতে পারবে।
কিন্তু সমাজ ম্যামসাহেবের বিচার করল না আর করবেই বা কেনো? তারা যে ধনী সম্প্রদায় তাদের উপর কি আঙুল তোলা যায়!
আশেপাশের প্রতিবেশীরা কলির জন্য আফসোস করছিলো- “আহহারে মাইয়াডারে এহন কেডা দেখব? এ কেমন মা! সন্তান রাইকখা কেউ গলায় ফাঁস দেয়। ছিহ! তার লাইগগাই তো তার স্বামীডাও গেলো আর এহন এই মাইয়াডাও যাইবো মনে হয়। এ ধরনের মহিলা মানুষ দিয়া কি সংসার চলে... ছিহ!”
কলির মাথায় সব স্মৃতি ঘুরপাক খেলো। প্রতিদিনই সে তার বাবাকে কল্পনা করে- নানান গল্প বানায়, বাবা আমায় এটা দেয় ওটা দেয়। তারপরৃ
হাতে সে সেলাই বাক্স নিলো আর পুরোনো জামার ছেঁড়া অংশগুলো যত্ন করে সেলাই করল।
সূঁচের ফোঁড়ের সঙ্গে সঙ্গে যেন নিজের ভাঙা স্বপ্নগুলোকেও জোড়া লাগাচ্ছিল সে।
বাইরে তখন ঈদের চাঁদ উঠেছে।
শহরের অট্টালিকাগুলো আলোয় ঝলমল করছে। মসজিদে মাইকিং হচ্ছে —-
“ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক।”
আর শহরের এক কোণে, স্যাতস্যাতে ছালার বস্তার ঘরে বসে একটি মেয়ে ফিসফিস করে বলছে-
“এইতো আমার ঈদের নতুন জামা”

No comments