নবাঙ্কুর ।। সৈয়দ সাইফ উল্লাহ

 
দমকা দক্ষিণা হাওয়ায় শহীদমিনারের পেছন দিকটার জঙ্গল থেকে শুকনো পাতা উড়ে আসছে। শহীদমিনারের মেঝের টাইলস, মাঠের সবুজ ঘাস সব ঝরাপাতায় ঢাকা পড়েছে। চমৎকার দৃশ্য। বাতাসে ঝরাপাতাগুলো নড়ে অপূর্ব মড়মড় আওয়াজ সৃষ্টি করছে। মহাব্যস্ত শহরের কোলাহল সেই আওয়াজ গোগ্রাসে গিলে ফেলছে।
ফাল্গুনের এই চকচকে বিকেলে মাহির হাতে কোনো কাজ ছিল না; তাই সে তার স্কুল মাঠ সংলগ্ন শহীদমিনারের পাশে বসে আছে। চোখ মেলে চারপাশটা দেখছে। মাহি প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ। রোজ ভোরে ফজরের নামাজ শেষে চায়ের পেয়ালা হাতে উঠে আসে ছাদে। ছাদে বসে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ শুনতে শুনতে সূর্যোদয় দেখে। দুপুরে গাছের নিচে কাঠের বেঞ্চিতে বসে-শুয়ে অলস সময় কাটায়। আবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে পথে হাঁটাহাঁটি করে। বিস্তৃত ধানের জমির ওপারের অপূর্ব সূর্যাস্ত দেখে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বিশ্বস্ত যে বন্ধুটি পাঁচ বছর ধরে তাকে সঙ্গ দিচ্ছে, সে হলো তার সাইকেল। পূর্ণিমার রাতে মাহি সুযোগ পেলেই বাইরে বেরিয়ে পড়ে। সুযোগ না পেলে ঘরে মিথ্যা বলে সুযোগ সৃষ্টি করতেও দ্বিধা করে না। প্রিয় গান, কানে যন্ত্র আর মনে অসংখ্য স্মৃতি-কল্পনা সঙ্গে নিয়ে নেমে যায়। রাস্তায় রাস্তায় হাঁটে। যতক্ষণ না মনের সাধ আর ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি মেটে, ততক্ষণ পর্যন্ত।
মাহির বন্ধুরা প্রায় সকলে পরীক্ষা শেষে ছুটি কাটাতে চলে গেছে। কেউ গ্রামের বাড়ি আবার কেউ সিলেট, রাঙামাটি, কক্সবাজার এইসব জায়গায়। তাই আজকে মাহি একা একাই বসে আছে। মাহি নিজে কোথাও ছুটি কাটাতে যায়নি। তার ধারণা সে পরীক্ষার আগেও তেমন পড়াশোনা করেনি। অন্তত অন্যদের মতো না। বলতে গেলে সে এতদিন নাকি ছুটিতেই ছিল। তাই আর আলাদা করে ছুটি কাটাবার কোনো প্রয়োজন মাহি বোধ করে না।
সহসা শুকনো ঝরাপাতা মাড়িয়ে কারও দ্রুত চলার শব্দে মাহি চমকে পেছনে তাকায়। মাহি যেখানে বসে আছে, সেটা শহীদমিনার নয়। শহীদমিনারের পাশ ঘেঁষেই মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নাম-পরিচয় সংবলিত একটা স্মৃতিসৌধ। তার মেঝেতে একটা পথশিশু লাফালাফি করছে। ছয়-সাত বছর বয়সী ছেলেটির গায়ে হাফপ্যান্ট আর ময়লা একটা গেঞ্জি। গেঞ্জিটা পিঠের দিকটায় কিছুটা ছেঁড়া আর বেশ কয়েকটা জায়গায় বেমানান সুতোয় সেলাই করা। শহরে এরকম পথশিশুর অভাব নেই। এই বয়সেই তারা ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে। কিংবা করতে বাধ্য হয়েছে। তবে এই ছেলেটিকে সেরকম বলে মনে হচ্ছে না। তার চেহারায় দারিদ্র্য-দুঃখের কোনো চিহ্ন নেই। সারাক্ষণ মুখে হাসি লেগে আছে। মহানন্দে সে একা একা খেলছে, দাপাদাপি করছে। নিজের ভুবনে একদম ডুবে আছে। মাহির কেন জানি না পথশিশুটিকে নিজের মতোই নিঃসঙ্গ মনে হলো। হয়তো ছেলেটিরও খেলার, গল্প করার কোনো সঙ্গী নেই। একসময় ছিল, এখন নেই। কিংবা কখনোই ছিল না।
‘এই-যে ছেলে, এদিকে এসো।’
নিজের অজান্তেই কথাটা মাহির মুখ থেকে বেড়িয়ে পড়ল।
ছেলেটা খেলা থামিয়ে অবাক দৃষ্টিতে মাহির দিকে তাকিয়ে আছে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে সে ধীরে ধীরে দু’বার চোখের পাতা ফেলল। মাহি হঠাৎ খেয়াল করল ছেলেটার চোখের আইরিশ একজন সাধারণ বাংলাদেশীর মতো বাদামি নয়- তার আইরিশ ধূসর বর্ণের।
মাহি হাসিমুখে বলল, নাম কি তোমার?
ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ক্ষীণ স্বরে কি একটা যেন বলল।
কি নাম?
শুয়েল।
সোহেল, তুমি কি এই চকলেটটি খাবে?
সোহেল খানিকক্ষণ চকলেটের দিকে তাকিয়ে থেকে মাহির হাত থেকে আলতো করে চকলেটটা নিল।
মাহি যেখানটায় বসেছে, তার পাশে হাত রেখে বলল, বসো এইখানে।
সোহেল কিছু না বলে তার পাশে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ল।
সোহেল ব্যস্ত ভঙ্গিতে চকলেটের প্যাকেট খোলার চেষ্টা করছে। সেটা দেখে মাহি বলল, দাও আমি খুলে দেই?
সোহেল থেমে গিয়ে ডানদিকে মাথা কাত করে সম্মতি দিল।
 
২.
বিকেলের লাল টুকটুকে সূর্য খানিকটা নিচে নেমে আবহাওয়া টাওয়ারের নিকটে চলে এসেছে। স্মৃতিসৌধের মেঝেতে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা মাহি আর সোহেলের শরীরের ঊর্ধ্বাংশের ছায়াও সমানুপাতিক হারে লম্বা হচ্ছে। আবহাওয়া টাওয়ারের উপরে একটা প্রকাণ্ড পৃথিবীর গোলক। তার ঠিক উপরে অবিকল ডিমের কুসুমের মতো সূর্য রক্তিম আলোর ফোয়ারা ছড়াচ্ছে।
 
কয়েকজন মেয়েমানুষের সমন্বিত কণ্ঠস্বর কানে আসতে মাহি মাথা ঘুরিয়ে দেখে শাড়িপরিহিতা জন চারেক মহিলা। ঠিক মহিলা নয়- বালিকা। শাড়ি পড়লে বালিকাদের আর বালিকা সম্বোধন করতে ইচ্ছে করে না। তখন তারা হয়ে ওঠে ‘রমণী’। তবে সময় এখন অনেক বদলে গেছে। এখন কোনো বিশেষ উপলক্ষ কিংবা অনুষ্ঠান ছাড়া বাঙালি মেয়েরা শাড়ি পড়ে না। এই মেয়েদেরও আজ সেরকম কোনো উপলক্ষ নিশ্চয়ই আছে। মেয়েগুলো এদিকেই উঠে আসছে। খুব সম্ভবত স্মৃতিসৌধের সামনে ছবি-টবি তোলার জন্য। মাহি অস্বস্তিবোধ থেকে বাঁচতে সেখান থেকে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নেমে এসে শহীদ মিনারের মেঝেতে গিয়ে বসল। সোহেল এখনো একমনে চকলেটটি খাচ্ছে। তার দুটো হাতে, ঠোঁটে, গালের এক পাশে চকলেট লেপ্টে আছে। মাহি দৃশ্যটা দেখে মৃদু হেসে পকেট থেকে মোবাইল বের করল। চোখের সামনে কোনো সুদর্শন দৃশ্য দেখলে সেটাকে ফ্রেমবন্দী করা মাহির আশৈশব লালিত শখ। যথারীতি সে এই মুহূর্তটিকেও ফ্রেমে আবদ্ধ করল।
ঐ মেয়েদের মধ্যে একজনের হঠাৎ সেটা চোখে পড়ল। কালো ও সোনালি রঙের চমৎকার শাড়ি পড়া মেয়েটি খানিকক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল। মাহিকে কেন জানি খুব চেনা চেনা লাগছে ওর। মনে হলো এর আগেও যেন তাকে অনেকবার দেখেছে। এমন সময় তার পাশের মেয়েটির স্পর্শে সে বাস্তবে ফিরে আসে ; তারপর তাদের সাথে আবার ব্যস্ত হয়ে যায়।
মাহির কাঁধের উপর উঁকি দিয়ে সোহেল আগ্রহ নিয়ে মাহির ফোন টিপা দেখছিল। তার নিজের ছবি চোখের সামনে ধরতেই আগ্রহটা অনেক গুণ বেড়ে যায়। প্রথমবারের মতো ওর মুখ ফুটে হাসি বেরিয়ে আসে। চোখ বড়বড় করে ভালো করে দেখতে থাকে। বেশ লাগছে মাহির। সে ফোনের ফ্রন্ট-ক্যামেরা অন করে সোহেলের হাতে ফোনটা ধরিয়ে দেয়। যন্ত্রের ভেতর নিজের জীবন্ত প্রতিলিপি দেখতে পেয়ে সে একই সঙ্গে আনন্দিত, বিস্মিত আর কিছুটা ভীত হয়। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা কালো শাড়ির মেয়েটি আড়চোখে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সমস্ত ঘটনাটি লক্ষ করছে। তার আগের সন্দেহটি এতক্ষণে বিশ্বাসে রূপ নিয়েছে। এখন সে নিশ্চিত যে ছেলেটিকে সে আগে কোথাও দেখেছে। তবে কোথায় দেখেছে সেটা মনে করতে পারছে না।
‘এই, এই শুয়েল’
বারো-তেরো বছরের একটা ঝি শ্রেণির মেয়ে গেইটে দাঁড়িয়ে হাঁক দিচ্ছে। তার সাথে সোহেলের বয়সী আরেকটি মেয়ে। ডাক শুনে সোহেল সচকিত হয়ে উঠে দাঁড়াল। মেয়েটি আবার বলল, আয়, যাইবি না?
সোহেল মুখে কিছু না বলে দৌঁড়ের ভঙ্গিতে ওদের দিকে যেতে লাগল। মাহি উঠে দাঁড়িয়ে চাতক পাখির মতো ওর যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে আছে। সোহেল হঠাৎ থেমে গিয়ে পেছন ফিরে মাহির দিকে তাকাল। মাহির ঠোঁটের কোণায় হাসি; সে হাত উঁচিয়ে সোহেলকে বিদায় জানাল। সোহেল আবার দৌঁড়ে গেল মেয়ে দুটোর কাছে। ও চলে যাচ্ছে। ফিরে যাচ্ছে আবার সেই নোংরা জায়গায়, নোংরা পরিবেশে। মাহি শুধু চেয়ে থাকল। সে ভাবল তার কি এ ব্যাপারে কিছুই করার নেই? না। তার কিছুই করার নেই।
লম্বা সারির বিল্ডিংয়ের পেছনে সূর্য ডুবছে। পুরোপুরি অস্ত যেতে এখনো খানিক বাকি। মাহি পশ্চিমাকাশে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। কিন্তু রওয়ানা দেয়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ওর সমস্ত পৃথিবী থমকে দাঁড়াল। ওর পা থেমে গেল নিজের অজান্তেই। আশেপাশে মানুষের চলাফেরা, গাড়িগোড়ার কোলাহল-আন্দোলন কিছুই সে শুনতে পাচ্ছে না, দেখতে পাচ্ছে না। শুধু একটাই শব্দ শুনতে পাচ্ছে ; সেটা হলো স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা বেড়ে যাওয়া নিজের হার্টবিটের শব্দ। কারণ, তার সামনেই চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে— মালিশা। সেই চিরচেনা মুখ, সেই অস্থির মায়াবী চেহারা। সেই কালো-সোনালি রঙের শাড়ি পরিহিতা মেয়ে!
 
৩.
বাড়ি ফিরে মাহি ঘরে না ঢুকে সরাসরি চলে গেল ছাদে। আকাশে মিটমিট করা তারাগুলো ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। পশ্চিমে লাল আলোর রেখা ক্রমে মিলিয়ে যাচ্ছে। মাহি দেয়ালে হেলান দিয়ে কাঠের বেঞ্চিতে বসে পড়ল। তারপর কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। একটু আগেই যা ঘটে গেল, সেটা সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না। মনে হচ্ছে যেন চমৎকার একটা স্বপ্ন দেখছে। তার জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্ন।
সে যে কতক্ষণ মালিশার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল তার আন্দাজ দেওয়া কঠিন। হয়তো চার-পাঁচ সেকেন্ড। কিন্তু সেটাও যথেষ্ট বেশি। ওর চোখে চোখ তুলে তাকাবার মতো দুঃসাহসিক কাজ এর আগেও দু-একবার করেছে মাহি। তবে এইবারের ব্যাপারটা ভিন্ন। ভিন্ন আকস্মিকতার কারণে, সময়ের ব্যাপ্তির কারণে। সেজন্যই মাহি ভীষণরকম অপ্রস্তুত হয়ে গিয়ে সেখান থেকে চলে এসেছিল। কথাটা ভেবে মাহি নিজের ঊরুতে দুবার ঘুষি মারল।
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার রেশটা ধীরে ধীরে কাটলে মাহি ভাবল যেই মেয়ের চোখে চোখ রাখতেই এত ব্যাকুলতা, এত উথালপাথাল, তাকে হৃদয়ের কথা কীভাবে জানাবে? প্রশ্নটার উত্তর সে গত দেড় বছর ধরে খুঁজছে। এত আনন্দের মধ্যেও তার মনে দুশ্চিন্তার ছায়া পড়ল।
কিন্তু সে তো জানে না, ঐ চার-পাঁচ সেকেন্ডেই তার হৃদয়ের কথা চোখের ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে মালিশাকে। সে জানে না যে, তার রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকার, সামনের সিট থেকে আড়চোখে তাকানোর, ধরা পড়ায় অপ্রস্তুতবোধের মানে মালিশা বুঝে গেছে ঐ চার-পাঁচ সেকেন্ডেই। সে এও জানে না তার এতদিনের যত্নে বোনা স্বপ্ন এবার সত্যি হতে চলেছে।

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.