বাংলাদেশের সংস্কৃতি_মুহম্মদ মতিউর রহমান
স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে ১৯৭১ সনের ১৬ ডিসেম্বর। কিন্তু মানবগোষ্ঠীর বসবাস হিসাবে এ ভূখণ্ড অতি পুরাতন। সুপ্রাচীনকালে এ অঞ্চলে যারা বসবাস করতো তারা দ্রাবিড় নামে খ্যাত। দ্রাবিড়রা ছিল সেমেটিক বংশোদ্ভূত। পরবর্তীকালে এখানে আর্যদের আগমন ঘটে। এরপর বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন জাতি, গোত্র ও ধর্মের লোক এ শষ্য-শ্যামলা-সুজলা-সুফলা-উর্বরা পলিমাটির দেশে এসেছে রাজ্য বিস্তার, ধর্ম প্রচার ও জীবিকার নানা প্রয়োজনে। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলার একক কোন পরিচয় ইতিহাসে পাওয়া যায় না। এ সম্পর্কে বিভিন্ন গবেষকের ধারণা নিচে উদ্ধৃত হলো। বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ডক্টর মুহম্মদ আব্দুর রহিমের মতে :
“মুসলমান আমল হইতে বাংলা ভাষাভাষী ভূভাগ বাঙ্গালা বা বাংলা নামে পরিচিত হয়। হিন্দু ও বৌদ্ধ যুগে ইহার বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন নাম ছিল। পশ্চিম বাংলা রাঢ় এবং উত্তর বাংলা বরেন্দ্র, লক্ষণাবতী ও পুন্ড্রবর্ধন নামে অভিহিত হইত। উত্তর ও পশ্চিম বাংলার কতক অংশ গৌড় নামে সুপরিচিত ছিল। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা বঙ্গ, সমতট ও বাংলা নামে খ্যাত ছিল। বঙ্গ একটি প্রাচীন জনপদ ছিল, আরণ্যক ব্রাহ্মণে ইহার উল্লেখ পাওয়া যায়। বৌদ্ধধর্ম গ্রন্থগুলিতে যে ষোলটি জনপদের উল্লেখ করা হইয়াছে ইহাদের মধ্যে বঙ্গ জনপদের নাম আছে। মুসলমান শাসনের প্রথম দিকে মুসলমান শাসক ও ইতিহাস লেখকেরা বঙ্গ ও বাঙ্গালা (বাংলা) বলিতে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা বুঝাইয়াছেন। সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ লক্ষণাবতী, রাঢ়, বাঙ্গালা প্রভৃতি অঞ্চলগুলির রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন করেন এবং নিজে শাহ-ই-বাঙ্গালা ও সুলতান-ই-বাঙ্গালা উপাধি ধারণ করেন। এই সময় হইতে সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী ভূভাগ বাঙ্গালা নামে পরিচিত হয়। ইহার পূর্বে শুধু বাঙ্গালার (পূর্ব বাংলার) অধিবাসীদিগকে বাঙ্গালা বা বাঙ্গালী বলা হইত। ইলিয়াস শাহের সময় থেকে রাঢ় ও লক্ষণাবতীর লোকেরাও বাঙ্গালী নামে অভিহিত হয়।” (ডক্টর মুহম্মদ আব্দুর রহিম : বাংলাদেশের ইতিহাস, প্রথম পরিচ্ছেদ, পৃ. ১)।
বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ববিদ ডক্টর আহমদ হাসান দানীর মতে :
“বাংগালাহ” বলতে এক সময় কোন অঞ্চল বোঝাতো না, বরং এদেশের শতকরা তিরানব্বই ভাগ মানুষেরই পরিচয় ছিল ‘বাংগালাহ’ নামে। সংস্কৃতভাষী মাত্র সাত ভাগ মানুষ নিজেদেরকে ‘উচ্চ শ্রেণী’ পরিচয় দিত এবং সে পরিচয়ে আধিপত্য চালাতো তিরানব্বই ভাগ সাধারণ মানুষ যাদের পরিচয় ছিলো ‘বাংগালাহ’, তারাই ছিলো সত্যিকার অর্থে বাংগালী সংস্কৃতির ধারক। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে বাকী সাত ভাগ সংখ্যালঘু মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির মিল ছিলো না। এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বাতন্ত্র্যজ্ঞাপক ‘বাংগালাহ’ পরিচয়টিই কালক্রমে তাদের দেশের ভৌগোলিক পরিচয়ে রূপ লাভ করে।”
বিশিষ্ট গবেষক আব্দুল মান্নান তালিবের মতে :
“প্রাচীন বাংলার সীমানা নির্দেশ মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। কারণ আজকের যুগে বাংলা বলতে আমরা যে সব এলাকাকে বুঝি প্রাচীন যুগে সেসব এলাকার কোনো একটি মাত্র নাম ছিল না। এসব এলাকার বিভিন্ন অংশ ভিন্ন ভিন্ন নামে আখ্যায়িত হতো। এসব এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ছিল একাধিক স্বাধীন রাজ্য। আবার বিভিন্ন সময়ে এদের নামের মধ্যে পরিবর্তন দেখা গেছে যেমন উত্তরাংশে পুন্ড্র ও বরেন্দ্র দক্ষিণ ও পূর্বাংশে বঙ্গ, সমতট, হরিকেল ও বঙ্গাল এবং পশ্চিমাংশে রাঢ়, তাম্রলিপি ও কজঙ্গল প্রভৃতি দেশ ছিল। পশ্চিমাংশ সূক্ষ্ম ও দণ্ডভূক্তি নামেও অভিহিত হতো। আবার উত্তর ও দক্ষিণাংশ এক সময় সাধারণভাবে গৌড় নামেও পরিচিত ছিল।” (আব্দুল মান্নান তালিব : বাংলাদেশে ইসলাম, প্রকাশক : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ, ২য় সংস্করণ, ১৯৯৪, পৃ. ১৫)।
বাঙালি, বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের প্রাচীন সংস্কৃতি সম্পর্কে উপরোক্ত তিনটি মূল্যবান উদ্ধৃতির আলোকে এটা স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশ একটি সুপ্রাচীন দেশ হলেও রাজনৈতিকভাবে এটা ঐক্যবদ্ধ হয় মুসলিম শাসনামলে এবং বাঙালি জাতি হিসাবে এর পরিচিতি ঘটে সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের আমলে (১৩৪২-১৩৫৮ খৃ.) এবং তাঁরই প্রত্যক্ষ চেষ্টায়। অতএব, তিনিই বাঙালি জাতির প্রথম রূপকার ও প্রতিষ্ঠাতা। অবশ্য তা ছিল এক বৃহত্তর বাংলা। কিন্তু নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হয়েছে ১৯৭১ সনের ১৬ ডিসেম্বর। এতৎঞ্চলে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগোষ্ঠির অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকায় এ দেশের সংস্কৃতির মধ্যেও নানা বৈচিত্র্য ও বিবর্তন ঘটেছে। প্রথমে এখানে দ্রাবিড় বা অনার্য সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে, এরপর আর্যদের আগমন ঘটলে এখানে আর্য সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। কিন্তু তখনও অনার্য সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল। কালক্রমে আর্য-অনার্যের সংমিশ্রণে এক মিশ্র সংস্কৃতির জš§ হয়।
গুপ্ত যুগে (ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিস্তৃত) যে প্রাচীন হিন্দু সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে তারও রূপ-বিভিন্নতা ছিল। উচ্চবর্ণের আর্য হিন্দু সংস্কৃতি ও নিম্নবর্ণের হিন্দু সংস্কৃতি যা লোকজ বা অনার্য সংস্কৃতি নামে পরিচিত, তা রূপে ও আচার-আচরণে ছিল ভিন্ন প্রকৃতির। আর্য সংস্কৃতি বহিরাগত সংখ্যালঘিষ্ঠ শাসক সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তাদের ভাষাও ছিল বহিরাগত অর্থাৎ সংস্কৃত ভাষা। কিন্তু নিম্নবর্ণীয় হিন্দুগণ ছিল এ দেশেরই মাটির সন্তানÑ অনার্য জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তাদের ভাষাও ছিল দেশীয়। তাদেরকে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা ম্লেচ্ছ, অচ্ছূত ইত্যাদি ঘৃণাবোধক শব্দে সম্বোধন করত। ধর্মীয়ভাবেও তারা এদেরকে উচ্চবর্ণীয়দের দাস (শূদ্র) মনে করত। অতএব, তাদের উভয়ের ধর্ম এক হলেও সে ধর্ম উচ্চবর্ণীয় ও নিম্নবর্ণীয় হিসাবে বিভক্ত ছিল এবং তাদের সংস্কৃতিও ছিল ভিন্ন।
বৌদ্ধ পাল আমলে (ষষ্ঠ শতকের মধ্যভাগ হতে ১০৪৯ সন পর্যন্ত) বৌদ্ধ সংস্কৃতির ব্যাপক বিকাশ ঘটে। কিন্তু ঐ সময় পূর্ববর্তী হিন্দু ও অনার্য সংস্কৃতি যেমন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় নি, তেমনি জৈন ও অন্যান্য বহিরাগত ধর্ম-সংস্কৃতিও বাংলাদেশে যুগপৎ বিকাশ লাভ করেছে। আবার আর্য-অনার্য-হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন ইত্যাদি সকল সংস্কৃতির সংমিশ্রণে এক সংকর সংস্কৃতিরও উদ্ভব ঘটেছে। ব্রাহ্মণ সেন আমলেও (১০৪৯-১২০৪) সাংস্কৃতিক দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থা প্রায় আগের মতই ছিল। তবে পাল আমলে যেখানে বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রাধান্য ছিল, সেন আমলে সেখানে আর্য-ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রাধান্য সৃষ্টি হয় এবং ব্রাহ্মণ্য সেন রাজাগণ বৌদ্ধধর্মের প্রভাব খতম করার উদ্দেশ্যে বৌদ্ধদেরকে নির্বিচারে হত্যা করার সাথে সাথে বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃতি-সাহিত্য-শিল্প-ভাস্কর্য ইত্যাদি সবকিছু সমূলে ধ্বংস করার চেষ্টা করে। অবশ্য কোন ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা যায় না, তার ছিটে-ফোঁটা নিদর্শন কোন না কোনভাবে থেকে যায়। তাই সেন আমলে এমনকি, বর্তমানেও বাংলাদেশে বিশেষত বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব এখনও বিদ্যমান।
মূলকথা, বাংলাদেশের সংস্কৃতি বৈচিত্রময়। এখানে কখনও অনার্য সংস্কৃতি, কখনও আর্য সংস্কৃতি, কখনও জৈন, আবার কখনও বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে, এবং সর্বদাই এক মিশ্র বা সংকর সংস্কৃতি এখানে বিদ্যমান ছিল এবং আছে। এককভাবে অবিমিশ্র কোন বাঙালি সংস্কৃতির অস্তিত্ব এখানে কখনো বিদ্যমান ছিল না। যা ছিল, এবং এখনও আছে, তা হল বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতি, বাঙালি বৌদ্ধ সংস্কৃতি, হিন্দু-বৌদ্ধ সংকর সংস্কৃতি এবং পরবর্তীতে বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতি বা ইসলামী সংস্কৃতি ইত্যাদি।
ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর ফারূকের (রা.) সময় থেকে বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ঘটে। আরব বণিক ও ধর্ম-প্রচারক পীর-দরবেশ-আউলিয়াদের মাধ্যমে সমগ্র উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের সূত্রপাত। মুবাল্লিগ বা ইসলাম-প্রচারকদের ব্যক্তিগত স্বভাব-চরিত্র ও আরচণে মুগ্ধ হয়ে এ দেশীয় জনগণ বিশেষত নিম্নবর্ণীয় হিন্দুরা, যারা জাতিভেদ প্রথা ও নানা বৈষম্যমূলক ধর্মীয় ব্যবস্থার কারণে সংখ্যালঘু উচ্চবর্ণীয় হিন্দুদের হাতে অমানবিক আচরণ বা নির্যাতনের শিকার হয়, তারা দলে দলে সাম্য ও মানবতার ধর্ম ইসলামে দীক্ষিত হতে থাকে। আরব বণিকদের দ্বারা চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমেই বাংলাদেশে প্রথম ইসলামের আগমন ঘটে বলে ঐতিহাসিকগণের ধারণা। ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবাদে আরব বণিকরা সুপ্রাচীনকাল থেকে উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষত বন্দর এলাকায় যাতায়াত করতো। ইসলামের আগমনের পর বাণিজ্য-পণ্যের সাথে ইসলামের সওদাও যুক্ত হয়। এভাবে ধীরে ধীরে ইসলামের সংস্পর্শে এসে এদেশের মানুষ মুসলমান হতে থাকে। এ সম্পর্কে বিশিষ্ট লেখক আবুল মনসুর আহমদ বলেন :
“চাটগাঁ বন্দর হইয়া ইসলাম বাংলায় প্রবেশ করে সর্বপ্রথম। প্রথমেই আসে সুফী সুলতান বায়যিদ বোস্তামীর কথা। ইনি ৭৭৭ খৃষ্টীয় সালে ইরানে জš§গ্রহণ করেন এবং ৮৭ খৃষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। তিনি ইরান, ইরাক ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে ইসলাম প্রচার করিতে করিতে সম্ভবতঃ আরব বণিকদের সাথে চাটগাঁয়ে আসেন। এখানে তিনি বেশ কিছুদিন অবস্থান করে ইসলাম প্রচার করেন।... সুলতান বায়যিদের পরেই মীর সৈয়দ সুলতান মাহমুদ শাহ মাহিসওয়ার (মৃত্যু ১০৪৭ খৃ.), শাহ মোহাম্মদ সুলতান রুমী (মৃত্যু ১০৫৩ খৃ.), বাবা আদম শহীদ (মৃত্যু ১১১৯ খৃ.), শাহ নিয়ামতুল্লাহ বুৎশিকান প্রমুখ ইতিহাস-বিখ্যাত ওয়ালি-আল্লাগণ বাংলার বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ইসলাম প্রচার করিয়া হাজার হাজার মুরিদান রাখিয়া গিয়াছেন। এঁরা সকলেই বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের এক হইতে তিন শ’বছর আগে বাংলাদেশে লক্ষ-লক্ষ লোককে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দিয়াছিলেন।” (আবুল মনসুর আহমদ : বাংলাদেশের কালচার, বর্দ্ধিত দ্বিতীয় মুদ্রণ, ১৯৭৬ পৃ. ১৪৫-১৪৬)।
ঐতিহাসিক ডক্টর আব্দুল মমিন চৌধুরীর মতে :
“পাহাড়পুর ও ময়নামতীতে প্রতœতাত্ত্বিক খননের ফলে আব্বাসীয় খলীফাদের মুদ্রা আবিষ্কৃত হইয়াছে। পাহাড়পুরে প্রাপ্ত মুদ্রাদি আব্বাসীয় খলীফা হারুনর রশিদের।... এই মুদ্রার আবিষ্কার আরব মুসলমানদের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথাই প্রমাণ করে।
“আরব ভৌগোলিকদের লেখনি হইতে এ বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হওয়া যায়। সুলায়মান, ইবনে খুর্দাদবেহ, ইদ্রিসি ও মাসুদীর লেখনিতে আরবদের পূর্বাঞ্চলীয় দেশসমূহের সহিত বাণিজ্যের, বাণিজ্যপথের ও পণ্যদ্রব্যের যে বিবরণ আছে তাহা হইতে এই কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, আরব বণিকগণ সমুদ্রপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপসমূহের সহিত বাণিজ্য করিত এবং তাহাদের যাত্রা পথে তাহারা পণ্য দ্রব্যের ক্রয়-বিক্রয় করিত। আরবদের বর্ণনা হইতে মনে হয় যে, বঙ্গোপসাগরীয় বন্দর চট্টগ্রামে তাহাদের বাণিজ্যতরী ভিড়িত। ফলে আরবদের সহিত বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়িয়া উঠিয়াছিল সেই বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নাই।
“... যে সমস্ত সুফি বখতিয়ারের পূর্বে একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে আসিয়াছিলেন বলিয়া মনে করা হয় তাঁহাদের মধ্যে ঢাকা জেলার রামপালের বাবা আম শহীদ, ময়মনসিংহ জেলার মদনপুরের শাহ্ সুলতান রূমী, বগুড়ার মহাস্থানের শাহ সুলতান মাহিসাওয়ার এবং পাবনার (বর্তমান সিরাজগঞ্জ) শাহজাদপুরের মখদুম শাহ্দৌলা শহীদের নাম উল্লেখযোগ্য।” (ডক্টর আব্দুল মমিন চৌধুরী : বাংলাদেশের ইতিহাস, ৪র্থ সংস্কৃরণ, মার্চ ১৯৯২, পৃ. ১৩০-১৩১)।
বাংলায় ইসলাম প্রচার ও মুসলিম রাষ্ট্র-শক্তির প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে আবুল মনসুর আহমদ আরও বলেন :
“বাংলায় মুসলিম রাষ্ট্র-শক্তির রূপ তুর্কী, পাঠানী ও মোগলাই রূপ। পক্ষান্তরে বাংলার ইসলামী ধর্মীয় রূপ খাঁটি আরবী রূপ। পাক-ভারতে অপরাপর অঞ্চলের মুসলমানদের তুলনায় বাংগালী মুসলমানদের আড়ম্বরহীন, অপ্রদর্শনবাদী, সতেজ ধর্মীয় চেতনাই বাংগালী মুসলমানদের এই ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের স্বাক্ষর বহন করিতেছে। বাংগালী মুসলিম জনসাধারণের কথ্য ভাষা, মুখের যবানে ফারসী-উর্দুর চেয়ে আরবী শব্দের প্রাচুর্য দেখা যায় বেশী।... অতি প্রাচীন কাল হইতেই আরব জাতি ব্যবসা-বাণিজ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করিয়াছিল। উত্তরে ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণে আরব সাগরসহ ভারত মহাসাগরের সর্বত্র, এবং পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জে আরব বাণিজ্যতরির একাধিপত্য ছিল।... আরব বণিকরা ভারতীয় উপকূলের সুরাট, কোচিন, কালিকট, তাম্রলিপ্ত ও চাটগাঁ ইত্যাদি বন্দর ব্যবহার করিতেন। এইসব বন্দরের মধ্যে চাটগাঁ বন্দরই আরবদের প্রধান বাণিজ্য-কেন্দ্র ছিল। আরব বণিকরাই এর নাম রাখিয়াছিলেন শাতিল-গংগা। শাতিল-গংগা নামই যে কালক্রমে পরিবর্তন হইতে হইতেই চাটিগাং হইয়াছিল, এটা ধরিয়া নেওয়া যাইতে পারে।” (আবুল মনসুর আহমদ : ঐ, পৃ. ২৪৮-২৪৯)।
বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ও ইসলাম ধর্মের প্রচার-প্রসার সম্পর্কে আবুল মনসুর আহমদ বলেন :
“সাত শতক শেষ হইবার আগেই বাংলার বহু অধিবাসী মুসলমান হইয়া গেল। আট শতকে ইসলাম যে উত্তরবংগে প্রসারিত ছিল তার আরেকটি প্রমাণ এই যে, রাজশাহী জিলার পাহাড়পুরে খলিফা হারুনর রশিদের আমলের (৭৮৪-৮০৯ সন) একটি মুদ্রা আবিষ্কৃত হইয়াছে। সুতরাং এতে স্পষ্টই প্রমাণিত হইল, বার শতকের শেষ সালে (১১৯৯) বখতিয়ার খলজীর আগমনের বহু আগেই ইসলাম বাংলায় সুপ্রতিষ্ঠিত ও তিন শ’বছরের পুরাতন ধর্ম হইয়া গিয়াছিল।” (পূর্বোক্ত, পৃ. ২৫৩-২৫৪)।
উপমহাদেশের বিশিষ্ট আলেম ও লেখক আল্লামা সৈয়দ সুলায়মান নদভীর মতে, মিসর থেকে সুদূর চীন পর্যন্ত দীর্ঘ সমুদ্রপথে আরব বণিকগণ নৌ-পরিচালনা করতেন। মালাবার উপকূল হয়ে তাঁরা চীনের পথে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করতেন। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও সিলেটে তাঁদের বাণিজ্য বহর নোঙ্গর করত। (দ্র. সৈয়দ সুলায়মান নদভী/আরবোঁকা জাহাজরাণী)।
বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক মাহুয়ানের বর্ণনা মতে, বর্তমান চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বণিকদের জাহাজ এই বন্দরে যাত্রা-বিরতি করত। আরব বণিকগণ এখানে যাত্রা-বিরতি করে ইসলাম প্রচার করতেন বলে সহজেই অনুমান করা যায়। (বাংলাদেশে ইসলাম- কয়েকটি তথ্যসূত্র, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, এপ্রিল-জুন, ১৯৮৮)।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইসলামী চিন্তাবিদ ডক্টর হাসান জামানের মতে : “হযরত উমরের (রা.) খিলাফতকালে (সপ্তম শতাব্দীতে) কয়েকজন প্রচারক (মু’মিন) বাংলাদেশে আসেন। এঁদের নেতা ছিলেন হযরত মা’মুদ ও হযরত মুহায়মিন। দ্বিতীয় বার প্রচার করতে আসেন হযরত হামেদ উদ্দীন, হযরত মুর্তাজা, হযরত আব্দুল্লাহ ও হযরত আবু তালিব। এই রকম পাঁচটি দল পরপর বাংলাদেশে আসেন। তাঁদের সংগে কোন অস্ত্রসস্ত্র বা বই-কিতাবও থাকত না। তাঁরা রাজ-ক্ষমতার সাহায্যও নিতেন না।... এঁরা গ্রামে বাস করতেন ও সফর করে ধর্ম প্রচার করা এঁদের প্রধান কাজ ছিল। এরপর আরও পাঁচটি দল মিশর ও পারস্য থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন। এঁদের বলা হত ‘আবিদ’। এঁরা বিভিন্ন স্থানে ‘খান্কা’ বা প্রচার-কেন্দ্র স্থাপন করে ধর্ম প্রচারকার্য চালিয়ে যেতেন।” (ডক্টর হাসান জামান/সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্য, পৃ. ২১১)।
ইতিহাস-গবেষক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান লিখেছেন : “সম্প্রতি (১৯৮৬ সনে) রংপুর শহর থেকে প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে লালমনির হাট সদর উপজেলার ... মজদের আড়া গ্রামে ৬৯ হিজরীতে প্রতিষ্ঠিত একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।... (খলীফা) আব্দুল মালিকের শাসনামলের এই মসজিদ বাংলাদেশে এ যাবত প্রাপ্ত ইসলামের প্রাচীনতম নিদর্শন। ‘মজদের আড়া’ নামে পরিচিত ৩০ শতাংশ জমিতে একটি বাঁশ ঝাঁড়ের উঁচু মাটির টিলা সমতল করতে গিয়ে এ মসজিদটি আবিষ্কৃত হয়। এর গম্বুজ থেকে প্রাপ্ত ৬ ৬ ১ ১৪ আকৃতির বিশেষ ধরনের ইটগুলিতে নানা প্রকার ফুল, নকশা ও আরবী হরফে কালেমা তাইয়্যেবাসহ হিজরী ৬৯ সন লেখা আছে। এছাড়া ১৭ হাত দীর্ঘ ও ১৫ হাত প্রস্থের একটি দালানের ছাদের ছক মাটির নীচে দেখা যায়, যা মসজিদের ছাদ বলে মনে হয়। এ স্থানটি থেকে মাত্র দু’শ গজ দূরে প্রায় দশ গজ উঁচু প্রাচীরবেষ্টিত প্রায় এক হাজার গজ দীর্ঘ ও এক হাজার গজ প্রস্থ একটি গড় ছিল বলে জানা যায়।... গ্রামের নাম ‘মজদের আড়া’ আসলে ‘মসজিদের আড়া’র অপভ্রংশ বলে মনে হয়।... এ মসজিদকে ঘাঁটি করে ইসলাম প্রচারের প্রথম যুগে এখানে একটি মুসলিম জনপদ গড়ে উঠেছিল এবং এ অঞ্চলটি ‘মসজিদের আড়া’ নামে পরিচিত হয়েছিল বলে মনে হয়। এ স্থানটি থেকে মাত্র সিকি মাইল দূরে ফকিরের তকেয়া নামে একটি জায়গা এবং মুস্তবীর হাট নামে একটি হাট রয়েছে। এই মুস্তবীর হাট মুস্তপীর কিংবা ইসলাম-প্রচারক কোন মস্ত বীরের নামে হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। মজদের আড়া গ্রামের চারদিকে তিন চার মাইলের মধ্যে অনেক প্রাচীন মাযার রয়েছে।... মসজিদটি ৬৯ হিজরীর বলে স্বীকৃতি লাভ করলে তার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাবে যে, এ মসজিদ প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার শুরু হয়েছিল এবং মুসলিম জনপদও গড়ে উঠেছিল। এমনি ধরনের মুসলিম জনপদ এবং তাদের দীনী কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসাবে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও সে সময় মসজিদ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না।” (মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান : বাংলা ও বাংগালী : মুক্তি সংগ্রামের মূলধারা, ১ম সংস্করণ, ফাল্গুন, ১৩৯৭, পৃ. ১০৮-১০৯)।
অতএব, উপরোক্ত উদ্ধৃতিসমূহ থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, আরব বণিক ও মুবাল্লিগদের দ্বারা সপ্তম শতকের শেষ অথবা অষ্টম শতকের প্রথম দিক থেকেই বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার শুরু হয়। মুবাল্লিগ বা ইসলাম-প্রচারকদের ব্যক্তিগত আমল-আখলাকে মুগ্ধ হয়ে ধীরে ধীরে ব্যাপক হারে এ দেশীয় লোকেরা ইসলাম কবুল করে। এভাবে ইখতিয়ারউদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজীর বঙ্গ-বিজয়ের পূর্বেই এদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে।
তুর্কী বীর বখতিয়ার খলজীর বাংলায় আগমনের সন-তারিখ নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি আছে। খ্যাতনামা ঐতিহাসিক মিনহাজউদ্দীন সিরাজের ‘তবকাৎ-ই-নাসিরী’ গ্রন্থ এক্ষেত্রে একমাত্র নির্ভরযোগ্য সূত্র। তিনি তাঁর গ্রন্থে কোন নির্দিষ্ট সনের উল্লেখ করেন নি। তবে তিনি যে সব তথ্য ও বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন তারই সূত্র ধরে ঐতিহাসিকগণ ১১৯৯ সন থেকে ১২০৪ সন পর্যন্ত যে কোন সনকে বখতিয়ারের বঙ্গ-বিজয়ের তারিখ হিসাবে উল্লেখ করে থাকেন। বখতিয়ারের বঙ্গ-বিজয় তথা বাংলাদেশে মুসলিম শাসন কায়েম হওয়ার ফলে এদেশে ইসলাম প্রচারে বিশেষ গতি সঞ্চারিত হয়। তবে তা মুসলিম রাজা-বাদশাহ-সুলতান-নবাবদের প্রত্যক্ষ মদদে নয়, পরোক্ষভাবে। রাজশক্তি মুসলিম হওয়ার কারণে ইসলাম-প্রচারকগণ স্বভাবতই অনুকূল পরিবেশে দ্রুত ইসলামের প্রচার-কার্য চালিয়ে যেতে সক্ষম হন। রাজ-শক্তি মুসলিম এবং তাঁরা ইসলামের অনুসারী হওয়ায় এবং সাধারণভাবে প্রজাগণ রাজানুগ্রহ লাভের প্রত্যাশী হওয়ায় মুসলিম শাসনামলে বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবেই ইসলাম প্রচারে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মুসলিম মুবাল্লিগগণ সেই সুযোগটা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে সচেষ্ট হন। তবে এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মুবাল্লিগগণ কখনও রাজানুগ্রহের প্রত্যাশী ছিলেন না। তাঁরা সকলেই স্বাধীনভাবে দ্বীনী কর্তব্য মনে করেই ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। মূলত তাঁদের নিরলস চেষ্টাতেই বাংলাদেশের সর্বত্র ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।
ফলে সেন আমলের বাঙালি হিন্দু সমাজ মুসলিম শাসনামলে দ্রুত ধর্মান্তরিত হয়ে অত্যল্পকালের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজে পরিণত হয়। ইসলামের উদার সাম্যবাদী মানবিক আবেদনই এজন্য প্রধানত দায়ী। জাতিভেদ প্রথার ফলে শতধাবিভক্ত হিন্দু সমাজে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল স্বাভাবিক। উচ্চবর্ণের লোকেরা নিম্নবর্ণীয়দেরকে ন্যূনতম মানবিক মর্যাদাও দিতে প্রস্তুত ছিল না। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে পূর্ণ আধিপত্য ও কর্তৃত্ব ছিল উচ্চবর্ণীয়দের হাতে। নিম্নবর্ণীয় হিন্দুরা এ সকল ক্ষেত্রে ছিল চরমভাবে বঞ্চিত ও অবহেলিত। ফলে নিম্নবর্ণীয়রা মানবেতর জীবন যাপন করছিল। ইসলামের সাম্য-ভ্রাতৃত্ব ও উদার মানবিক আদর্শের সন্ধান পেয়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে সত্যিকার মানবিক মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়, পরিপূর্ণ মুক্তির স্বাদ গ্রহণ করে।
ইসলাম প্রচারের ফলে বাংলাদেশে ক্রমান্বয়ে একটি নতুন সংস্কৃতির উদ্ভব হয়, যার মূল উৎস ও প্রাণশক্তি হল ইসলাম। এ যাবৎকাল বাংলাদেশে উদ্ভাবিত ও প্রচলিত সব সংস্কৃতি থেকে এ নতুন সংস্কৃতি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। ইসলাম গতানুগতিক কোন ধর্ম নয়, এটা একটি সামগ্রিক জীবন-বিধান। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটি-নাটি থেকে শুরু করে পারিবারিক-সামাজিক-রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষেত্রে ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। এ বিধান অনুসরণ করার ফলে নবদীক্ষিত বাঙালি মুসলিম সমাজে স্বভাবতই এক স্বতন্ত্র সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটেছে। এককথায়, তৌহিদ-রিসালাত-আখিরাতের ভাবধারায় পুষ্ট বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি বাংলাদেশে প্রচলিত অন্য সকল সংস্কৃতি থেকে ভিন্নতা লাভ করেছে।
ইসলামের প্রভাবে মুসলমানদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনধারা পরিবর্তিত ও ভিন্নরূপ পরিগ্রহ করায় সমাজে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সুস্থ জীবনাচার, রীতি-নীতি গড়ে ওঠে। সামাজিক উৎসব, শরীয়ী আইন-কানুন, বিবাহ-শাদী, শিক্ষা-সাহিত্য-শিল্প ইত্যাদিও ভিন্নরূপ পরিগ্রহ করে। একথা সত্য যে, মুসলিম শাসনামলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে নি, কিন্তু ইসলামের প্রচার-প্রসার ও বাস্তবায়নে এ দেশের মুবাল্লিগ ও আলেম সমাজের নিষ্ঠাপূর্ণ তৎপরতা সর্বদা বজায় থাকার কারণে বাঙালি মুসলিম সমাজে ইসলাম এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা ও শক্তি হিসাবে কাজ করেছে। এমনকি, সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যে ভাষা, সাহিত্য, শিল্প-স্থাপত্য তাও ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও আদর্শ অনুযায়ী নতুন ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণভাবে গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ ভাষার ক্ষেত্রে আরবি-ফার্সি-তুর্কি ইত্যাদি ভাষার শব্দরাজি সমন্বয়ে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধতর হয়ে ওঠে। বাঙালি মুসলমান সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে ইসলামী ভাব-আদর্শ-ঐতিহ্য ও আরবি-ফার্সি সাহিত্যের প্রভাবে ভিন্ন ধরনের সাহিত্য সৃষ্টি শুরু করে। শিল্প-স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও ইসলামী আদর্শ-ঐতিহ্যের ব্যাপক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
মুসলিম-শাসনের পূর্বে সেন আমলে রাজ-দরবারের ভাষা ছিল সংস্কৃত। সেন রাজাগণ ছিলেন আর্য ব্রাহ্মণ। তাঁদের ধর্মীয় ভাষা ছিল সংস্কৃত। তৎকালিন অভিজাত সমাজের ভাষা তথা শিক্ষা-সাহিত্য ও জ্ঞানানুশীলনের মাধ্যমও ছিল সংস্কৃত। দেশীয় বাংলা ভাষা পরিত্যক্ত হয়েছিল। এটাকে ইতর জনের ভাষা, পক্ষী ভাষা ইত্যাদি নানা তুচ্ছাত্মক শব্দে অপাংতেয় করে রাখা হয়। দেশীয় ভাষায় অষ্টাদশ পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি শ্রবণ করলে ‘রৌরব’ নামক ভয়াবহ দোযখে ঠাঁই হবে বলে ব্রাহ্মণগণ কঠোর ধর্মীয় বিধান জারি করেন। পরবর্তীতে মুসলিম শাসনামলে মুসলিম রাজা-বাদশাহদের উৎসাহে ও পৃষ্ঠপোষকতায় রামায়ণ ও মহাভারতের অনুবাদক কৃত্তিবাস ও কাশীরাম দাসকেও ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ ‘সর্বনেশে’ উপাধি প্রদান করেন। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ইখতিয়ারউদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের পর মুসলমানদের হাতে বাংলা ভাষার নবজš§ ঘটে। ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনের ভাষায় : “মুসলমান কর্তৃক বঙ্গ বিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হইয়াছিল।”
বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ডক্টর আব্দুল করিমের মতে :
“বাংলা সাহিত্যের উৎপত্তি মুসলমান শাসনের অবদান।... বাংলাদেশে মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠিত না হইলেও হয়ত বাংলা সাহিত্য গড়িয়া উঠিত, কিন্তু নিঃসন্দেহে ইহা আরও অনেক দিন বিলম্বিত হইত। মুসলমান শাসকদের নিকট ব্রাহ্মণ শূদ্রে কোন পার্থক্য ছিল না... অন্যদিকে নির্যাতিত বৌদ্ধ ও শূদ্ররা সূফী-সাধকদের চরিত্রে এবং মুসলমানদের বর্ণ-বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থায় মুগ্ধ হইয়া ইসলাম ধর্মের দিকে আকৃষ্ট হয়। ইসলামের প্রভাব রোধ করার জন্য ব্রাহ্মণেরা তাহাদের বিধি-নিষেধ শিথিল করিতে বাধ্য হয় এবং ফলে গোটা হিন্দু সমাজ-ব্যবস্থায় পরিবর্তনের সূচনা হয়। সুতরাং অন্য কারণ বাদ দিলেও শুধু মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়াতেই বাংলা সাহিত্য বিকাশের পথ সুগম হয়।” [আব্দুল করিম : বাংলার ইতিহাস, সুলতানী আমল, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৭৭, পৃ. ৫২৫-৫২৬]।
দেশীয় ভাষা বা মাতৃভাষার প্রতি মুসলমানদের অনুরাগের পিছনে ইসলামের শিক্ষাই মুখ্যত দায়ী। ঐশী গ্রন্থ আল-কুরআনে আল্লাহ বলেন : “তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিক্ষা দিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে। (সূরা আর রাহমান : আয়াত-২-৩)।
আল-কুরআনের অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে : “আমি (আল্লাহ) প্রত্যেক রাসূলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য। (সূরা ইবরাহিম : আয়াত-৪)।
এভাবে আল-কুরআনের অন্যান্য আয়াতেও ভাষার সৃষ্টি, ভাষার প্রয়োজনীয়তা ও মাতৃভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে। ফলে মুসলমানরা যখনই যে দেশে গিয়েছেন, তখন সে দেশের ভাষার যথাযথ চর্চা করেছেন, অন্যদেরকেও সে চর্চায় শরিক হবার সুযোগ করে দিয়েছেন। অবশ্য ধর্মীয় ভাষা হিসাবে আরবি ভাষার স্বতন্ত্র মর্যাদা মুসলমানদের নিকট সর্বদাই বিদ্যমান। বাংলাদেশে মুসলিম আধিপত্য কায়েম হবার পর শাসক মুসলমানরা বাংলা ভাষাকে যথাযথ মর্যাদা দিয়েছেন শুধু তাই নয়, বাংলা ভাষার লালন, বিকাশ ও আরবি-ফারসি-তুর্কি-উর্দু বিভিন্ন ভাষার অসংখ্য শব্দরাজিতে সুসজ্জিত করে এ ভাষাকে অধিকতর সম্পদশালী ও বিবিধ ভাব প্রকাশের উপযোগী করে তুলেছেন। ফলে বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক জীবনধারা বিকাশে এ ভাষা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
বাংলা ভাষার মত বাংলা সাহিত্যের বিকাশেও মুসলমানদের অবদান বিপুল। ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনের ভাষায় : “It was the Muslim Sultan rather than the Hindu Raja that encouraged vernacular Literature.”
ব্রাহ্মণ সেন রাজাগণ দেশীয় ভাষায় সাহিত্য চর্চার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় মুসলিম শাসনামলের পূর্বে বাংলা ভাষায় রচিত কোন সাহিত্যের নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায় না। একমাত্র যে চর্যাপদের নিদর্শন পাওয়া যায় তা বৌদ্ধ পাল যুগে রচিত এবং তা নেপালের রাজ-দরবার থেকে ১৮১২ সনে পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী পাণ্ডুলিপি আকারে সংগ্রহ করেন। সেন আমলে বাংলা চর্চা তো দূরে থাক, বাংলা ভাষার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এবং বাংলা ভাষাকে নানাভাবে অবজ্ঞা-অবহেলা করা হয়।
ইখতিয়ার উদ্দীনের বাংলা বিজয়ের পর মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন করে বাংলা সাহিত্যের চর্চা শুরু হয়। হিন্দু-মুসলমান উভয়েই সমানভাবে এ পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। তবে মুসলমান ও হিন্দু উভয়েই একই দেশের একই আবহাওয়ার মধ্যে বসবাস করে একই ভাষায় সাহিত্য রচনা করলেও তাদের উভয়ের সাহিত্য দু’টি ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়। হিন্দুরা যেমন রামায়ণ-মহাভারতের অনুবাদ করে, মঙ্গলকাব্য, নাথ সাহিত্য, বৈষ্ণবকাব্য, শ্রীচৈতন্য চরিত কাব্য ইত্যাদি রচনা করে, মুসলমানরা তেমনি নবী-রাসূল, সাহাবায়ে কেরাম, মুসলমান বীর-যোদ্ধা ও ইসলামের মাহাত্ম্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে বিভিন্ন কাব্য-গাথা রচনা করে। সাহিত্যের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও উভয়ের সাহিত্যের বিষয়বস্তু, ভাব, অনুপ্রেরণা ও আবেদন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। ইসলামী আদর্শ তথা তৌহিদ, রিসালাত ও আখিরাতের ধারণা থেকেই এ স্বাতন্ত্র্যের সৃষ্টি। বাংলাদেশে ইসলামী সংস্কৃতির রূপায়ণে মুসলিম-রচিত এ সাহিত্যও এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অবশ্য ভাষার ক্ষেত্রে একটি কথা বলা আবশ্যক। হিন্দু-মুসলিম উভয়ের সাহিত্য চর্চার মাধ্যম বাংলা হলেও উভয়ের বাংলা সম্পূর্ণ এক নয়। ধর্মীয় কারণে ইসলামী পরিভাষা হিসাবে অসংখ্য আরবি-ফারসি শব্দ বাঙালি মুসলমানরা সহজেই রপ্ত করে- যা বাঙালি হিন্দুদের জন্য স্বাভাবিক ছিল না। ফলে বাঙালি মুসলমানদের ব্যবহারিক ও সাহিত্যের ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দের আধিক্য পরিলক্ষিত হয়।
শিল্প-ভাস্কর্য-স্থাপত্য সকল যুগে, সকল দেশে, সকল জাতির সভ্যতা-সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলাম পূর্ব যুগে বাংলাদেশের শিল্প-ভাস্কর্য-স্থাপত্যে পৌত্তলিকতার আধিক্য পরিলক্ষিত হয়। হিন্দুরা তাদের দেব-দেবীর মূর্তি ও বৌদ্ধরা গৌতম বুদ্ধের মূর্তির পূজা করত। তাদের শিল্প-ভাস্কর্য-স্থাপত্যেও এর নিদর্শন সর্বত্র পরিলক্ষিত হয়। ইসলাম প্রচারের পর বাংলাদেশের প্রচলিত শিল্প-স্থাপত্য-ভাস্কর্যের পাশাপাশি একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়। এক্ষেত্রেও নিরাকার তৌহিদবাদী চিন্তার অনিবার্য প্রকাশ লক্ষণীয়। আরবি ক্যালিগ্রাফি ও মসজিদ-কেন্দ্রিক স্থাপত্য বাংলাদেশের দিগন্ত-রেখায় নতুন বৈচিত্রময় দৃশ্যপট সংযোজন করে। ইসলামে মূর্তি-প্রতিমা, অশ্লীল চিত্র, প্রতিকল্প ইত্যাদি হারাম। কিন্তু রঙ ও রেখার বৈচিত্রপূর্ণ ও বিমূর্ত শিল্প-নৈপুণ্য ইসলামে উচ্চ প্রশংসিত ও ইসলামের প্রাথমিক কাল থেকেই তার চর্চা চলে আসছে। মসজিদের বিশেষ স্থাপত্য-রীতি, এর দেয়াল-গাত্রে আরবি ক্যালিগ্রাফি তথা রঙ ও রেখার বিচিত্র খেলা এবং অভ্রভেদী মিনারের নয়নাভিরাম দৃশ্য তৌহিদী চেতনার দৃপ্ত প্রতীকী অভিব্যক্তি। এ বিশেষ চেতনা ও অভিব্যক্তি ইসলামী সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ দিক। এর চেতনা ও অভিব্যক্তি বাঙ্গালি মুসলমানের শিল্প-ভাস্কর্য ও স্থাপত্য-কর্মে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত।
ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আকার-আকৃতি বদলায় না, ভৌগোলিক পরিবেশ, আবহাওয়া ইত্যাদি কোন কিছুই বদলায় না, যা বদলায় তা হলো জীবনবোধ ও জীবনাচার। আর এটারই ফল হিসাবে গোটা সংস্কৃতিই বদলে অন্য আর একটি বিশিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করে। ইসলামের ক্ষেত্রে এ পরিবর্তন অতি সুস্পষ্ট ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলাম শুধু একটি ধর্মমতের নাম নয়। এটা স্রষ্টার দেয়া একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান। এটার মূলভিত্তি তৌহিদ ও রিসালাত। তাই ইসলাম গ্রহণের পর পূরা জীবনটাই সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে যায়। মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অর্থাৎ জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা রয়েছে। ইসলাম গ্রহণের পর প্রতিটি মুসলমানকে এ দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হওয়া কর্তব্য হয়ে পড়ে। ফলে মুসলমানের শাসনামলে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যদিও ইসলামের পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হয় নি তবু অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষত ব্যক্তিগত আচরণ, সামাজিক-ধর্মীয় বিধি-বিধান ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসলামের অনুশাসন মেনে চলার ফলে যে বিশিষ্ট জীবনায়ন গড়ে ওঠে তারই নির্যাস হলো বাংলাদেশের সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতির মূল প্রেরণা যে ইসলাম তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
ইসলাম মানুষের জš§-মৃত্যু, বিয়ে-শাদী, উৎসব-অনুষ্ঠান, ব্যক্তিগত আদব-কায়দা, আচার-আচরণ, সামাজিক রীতি-নীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, লেন-দেন, শিল্প-সাহিত্য, বিচার-শালিস, আইন-আদালত ইত্যাদি সকল ব্যাপারেই সুনির্দিষ্ট নিয়ম-পদ্ধতি বা বিধি-বিধানসর্বস্ব এক পরিপূর্ণ জীবন-ব্যবস্থা। এমনকি, ব্যক্তিগত জীবনে খাওয়া-পরা, পায়খানা-পেশাব, হাঁটা-চলা থেকে শুরু করে চিরুনী দিয়ে মাথা আঁচরানোর ব্যাপারেও ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ইসলাম যে একটি নিছক শাস্ত্রীয় ধর্ম নয়, বরং এটা স্রষ্টা-প্রদত্ত এক বাস্তব ও পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা এগুলি তারই প্রমাণ। ইসলাম শুধু কলেমা, নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাতÑ এ পাঁচ ফরয ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কলেমার অর্থ ও তাৎপর্য অতি ব্যাপক। এর অর্থ নিজেকে পরিপূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্দেশের নিকট সমর্পণ করে দেয়া এবং এর তাৎপর্য আল্লাহর অনুগত বান্দা ও পৃথিবীতে তাঁর খলীফা বা প্রতিনিধির দায়িত্ব যথাযথ রূপে পালন করে শান্তি, শৃংখলা ও কল্যাণময় জীবন ও সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইহ-পরকালীন নাজাত বা মুক্তি লাভ করা। কলেমার দাবী হলো আল্লাহ ও রাসূলের উপর দৃঢ় ঈমান আনার পর তার উপর অবিচল থাকা এবং আল্লাহর বিধান ও রাসূলের সুন্নাত মুতাবিক জীবন পরিচালনা করা। এ কারণেই বাংলাদেশের জনগণ ইসলামে দীক্ষা গ্রহণ করার পর তাদের জীবনাচারে আমূল পরিবর্তন সংঘটিত হয়। এর ফলে বাঙালি মুসলমানদের সংস্কৃতি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র রূপ পরিগ্রহ করে। বাঙালি হিন্দু বা অন্যান্য ধর্ম-সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি থেকে বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির রূপ ও পরিচয় ভিন্ন হয়ে পড়ে এবং যেহেতু বাংলাদেশে মুসলমানরা বিপল সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেহেতু বাংলাদেশের একমাত্র না হলেও, প্রধান সংস্কৃতি হলো ইসলামী ভাবধারাপুষ্ট।
বাংলাদেশে হিন্দু ও মুসলমান সহস্রাধিক বছর ধরে একত্র বসবাস করা সত্ত্বেও তাদের উভয়ের সংস্কৃতি এক নয়। মুসলমানদের জীবনাচার, খাওয়া-পরা, সামাজিক রীতি-নীতি হিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যেমন অতি প্রত্যূষে মসজিদে মুয়াজ্জিনের কন্ঠে আযানের সুললিত উদাত্ত আহ্বান শুনে মুসলমানের নিদ্রা ভঙ্গ হয়। গাত্রোত্থানের পর অযু করে অথবা প্রয়োজনে গোসল করে সে পাক-পবিত্র হয়ে মসজিদে গিয়ে ইমামের পিছনে জামায়াতবদ্ধভাবে নামায আদায় করে। নামাযের পর পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত শেষ করে সে নাস্তা-পানি সমাপনান্তে দিনের কাজ-কর্ম শুরু করে। দিনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় ও বিভিন্নভাবে এক আল্লাহর নাম স্মরণ করে থাকে। একজন মুসলমান প্রতিটি কাজের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ এবং শেষে ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘সুবহানআল্লাহ’, ‘মাশায়াল্লাহ’, ইনশায়াল্লাহ’ ইত্যাদি স্রষ্টার প্রশংসাসূচক শব্দ উচ্চারণ করে থাকে।
অন্যদিকে, একজন বাঙালি হিন্দু কাঁসার ঘন্টাধ্বনি শুনে গাত্রোত্থান করে তুলসী তলায় অথবা পূজা মণ্ডপে গিয়ে পূজা-আহ্নিক সেরে লোটা-ঘটি হাতে স্নানের জন্য গমন করে। স্নান সমাপনান্তে জলযোগ করে বিভিন্ন দেব-দেবী, ঈশ্বর-ভগবান ইত্যাদি নাম তপজপ করে দিনের কাজের শুভ সূচনা করে।
একজন মুসলমানের সাথে অন্য একজন মুসলমানের মুলাকাত হলে সালাম আদান-প্রদান, কোলাকুলি, মুসাহাবার পর কুশল বিনিময় হয়। মুসলমানের জীবনে কলেমা, নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি ফরয ইবাদত ছাড়াও দুই ঈদের উৎসব, কুরবানী, ফিত্রা বিতরণ, মিলাদুন্নবী, সীরাত মাহফিল, শবে মিরাজ, শবে বরাত, মহররম, ওয়াজ মাহফিল, দাওয়াত-জিয়াফত, বিবাহ-শাদী, আক্দ-রুসুমত, নবজাতকের কানে কলেমার পবিত্র বাণী উচ্চারণ, ইসলামী নামকরণ, আকিকা, খৎনা, প্রথম ছবক হিসাবে ‘আলিফ-বা’ ইত্যাদির মাধ্যমে ‘বিসমিল্লাহখানি’, ইসলামী আদব-কায়দা, লেহাজ-তমিজ ইত্যাদি বাঙালি মুসলমানের জীবন ও সমাজে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে। মুসলমানের উৎসবে গাওয়া হয় হামদ্, নাত, জারী, ভাটিয়ালী, মুর্শিদী, মর্সিয়া ইত্যাদি ইসলামী বা মুসলিম ঐতিহ্যমণ্ডিত, গান-গজল। মুসলমানের মৃত্যুর সময় মুখে কলেমার পবিত্র বাণী উচ্চারণ করা হয়, কুরআন তিলাওয়াত করা হয়। মৃত্যুর পর উত্তমরূপে লাশ গোসল করিয়ে, পাক-সাফ কাপড় পরিয়ে, আতর-সুরমা মেখে লোবান জ্বালিয়ে পরিবেশকে সুগন্ধময় করে সকলে মিলে জানাযার নামায পড়ে কলেমা শাহাদত উচ্চারণ করতে করতে গোরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। পরম ভক্তি ও তা’জিমের সাথে লাশ কবরে রেখে মাটি চাপা দিয়ে আবার মৃত ব্যক্তির মাগফিরাত কামনা করে সকলে গৃহে প্রত্যাবর্তন করে। মৃত্যুর তিন দিন পর সকলে মিলে আবার দোয়ায়ে মাগফিরাত এবং চল্লিশ দিন পর কুলখানির অনুষ্ঠান করা হয়। এভাবে মৃতের সৎকার করা মুসলমানের জন্য ফরযে কিফায়া বা আবশ্যকীয় ইবাদত হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। সর্বোপরি, মুসলমানের ইবাদত-বন্দেগী, দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড, ব্যক্তিগত, সামাজিক সকল কাজ ও আয়োজনে মহান রাব্বুল আলামীনকে স্মরণ করার, তাঁর শুকরগুজার করার এবং তাঁর নিকট মদদ বা সাহায্য প্রার্থনা করার ব্যবস্থা রয়েছে। এটা ইসলামী সংস্কৃতির বিশিষ্ট দিক।
অন্যদিকে, একজন হিন্দুর সাথে অন্য একজন হিন্দুর সাক্ষাত হলে আদাব-নমস্কার বিনিময়, অল্প বয়স্করা বড়দের এবং নিম্নবর্ণের লোকেরা উচ্চবর্ণের লোকদের আভূমি নত হয়ে চরণ-ধূলি গ্রহণান্তে কুশলাদি বিনিময় হয়। বাঙালি হিন্দুর জীবন ও সমাজে দুর্গা পূজা, লক্ষ্মীপূজা, স্বরস্বতী পূজা, শিবপূজা, কালীপূজা, মনসা পূজা, এমনকি, লিঙ্গ পূজা ইত্যাদিসহ তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে সংবৎসর অসংখ্য পূজা-পার্বণ, মেলা, গঙ্গাস্নান, জপ-তপ, চন্দন-পৈতার ব্যবহার, ভাইফোঁটা, রাখি-বন্ধন, মঙ্গল-সূত্র, মঙ্গল-প্রদীপ, যাগ-যজ্ঞ, আহ্নিক, উপবাস, নানারূপ আচার-অনুষ্ঠান, জাতিভেদ প্রথা মান্য করা, বিয়ে-শাদীতে বিশেষ ধরনের অনুষ্ঠান, নেমতন্ন দেয়ার ক্ষেত্রেও জাতিভেদ প্রথা মেনে চলা, নবজাতকের কানে মন্ত্রোচ্চারণ ইত্যাদি বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির বিশেষ পরিচয়। হিন্দু উৎসব-আনন্দে গীত হয় সাধন, ভজন, কীর্তন, শ্যামাসঙ্গীত, ‘হরে কৃষ্ণ’ ইত্যাদি শব্দোচ্চারণ করতে করতে মৃতদেহ শশ্মানঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মৃত ব্যক্তিকে শুকনো খড়ির বিছানায় শুইয়ে নিজ পুত্রের হাতে মুখাগ্নি করিয়ে দগদগে আগুনে পুড়িয়ে ভষ্মীভূত করা হয়।
বাংলাদেশী মুসলমানরা যেখানে বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় এক অদ্বিতীয় মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর নিকট দোয়া করে ও তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করে, হিন্দুরা সেখানে জীবনের বিভিন্ন অবস্থায়, বিভিন্ন প্রয়োজনে তাদের অসংখ্য দেব-দেবীর নিকট করুণা যাঞ্চনা করে। মুসলমানের যেমন নবী-রাসূল, পীর-আউলিয়া, ধর্মীয় সাধক, জাতীয় বীর ও মহান ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, হিন্দুদেরও তেমনি রয়েছে অসংখ্য দেব-দেবী, মুনি-ঋষি, যোগী-সাধক, জাতীয় বীর ও মহান ব্যক্তিত্ব। মুসলমানদের সামাজিক রীতি-নীতি, পোষাক-পরিচ্ছদ, আদব-কায়দা, সালাম-কালাম, জানাজা, দাফন-কাফন ইত্যাদি সকল কিছুই বাঙালি হিন্দুদের থেকে স্বতন্ত্র। এমনকি, খাদ্য-খাওয়া, হালাল-হারাম, এমনকি খাদ্য পরিবেশন ও গ্রহণ পদ্ধতিতেও হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে আসমান-যমীন ফারাক। ভাষার ক্ষেত্রেও বাঙালি মুসলিম ও বাঙালি হিন্দুর মুখের ভাষায় বিস্তর ফারাক রয়েছে। খ্যাতনামা লেখক আবুল মনসুর আহমদের লেখা থেকে এর একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি। তিনি তাঁর ‘বাংলাদেশের কালচার’ গ্রন্থে লিখেছেন :
“মুসলমান বাংগালীর মুখের বাংলার দৃষ্টান্ত এইরূপঃ ‘ফজরের আউয়াল ওয়াকতে উঠিয়া ফুফু আম্মা চাচাজীকে কহিলেনঃ আমাকে জল্দি এক বদনা পানি দাও। আমি পায়খানা ফিরিয়া গোসল করিয়া নামাজ পরিয়া নাশ্তা খাইব।’ হিন্দু বাংগালীর মুখের বাংলার দৃষ্টান্ত এইরূপঃ ‘অতি ভোর বেলা উঠিয়া পিসিমা খুড়ামসাইকে বলিলেনঃ আমাকে শীগগীর এক গাড় জল দাও। আমি প্রাতঃক্রিয়া সারিয়া চ্যান করার পর সন্ধ্যা করিয়া মাধাগ্নি খাইব।”
এ পার্থক্য ও স্বাতন্ত্র্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য সুস্পষ্ট। এ সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের কারণে একই ভূখণ্ডে, অভিন্ন আবহাওয়ায় লালিত ও একই ভাষার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও উভয়ে যুগ যুগ ধরে দু’টি ভিন্ন জাতি-সত্তার উত্তরাধিকারিত্ব বহন করে চলেছে। বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের পর থেকে ধীরে ধীরে এ বিশেষ সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশ পরিলক্ষিত হয়। তৌহিদ, রিসালাত ও আখিরাতের ধারণা থেকে ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও ইসলামী সংস্কৃতির রূপ ও পরিচয় তা থেকে ভিন্ন নয়।
অবশ্য একথা সত্য যে, দীর্ঘকাল একত্র সহাবস্থানের ফলে ইসলাম যেমন অন্য সংস্কৃতিকে খানিকটা প্রভাবিত করেছে, অন্য সংস্কৃতিও তেমনি মুসলমানদের সমাজে কোন কোন ক্ষেত্রে কিছুটা প্রভাব বিস্তার করেছে। তবে সেটাকে ইসলামী সংস্কৃতির অংশ বলা সমীচীন নয়। কারণ ইসলামী সংস্কৃতির মূল উৎস, অনুপ্রেরণা ও উপাদান সর্বকালে, সকল দেশে এক ও অভিন্ন। এক্ষেত্রে একটি কথা সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন যে, মুসলিম সংস্কৃতি ক্ষেত্র বিশেষে সর্বাংশে ইসলামী সংস্কৃতি নাও হতে পারে, তবে ইসলামী সংস্কৃতি একান্তভাবেই মুসলমানদের সংস্কৃতি- অন্য কোন জাতির বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ সংস্কৃতির বিকাশ সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে মুসলিম, হিন্দু, খ্রীস্টান, বৌদ্ধ ও বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়ের বসবাস। তাই বাংলাদেশের সংস্কৃতির রূপ ও পরিচয় কী সে সম্পর্কে প্রশ্ন উঠতে পারে। যে কোন দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি সে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের পরিচয়েই নিরূপিত হয়। তবে আধুনিক বিশ্বে সকল রাষ্ট্রেই কম-বেশি সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব বিদ্যমান। সংখ্যালঘুদের ধর্ম-বিশ্বাস, ঐতিহ্য-সংস্কৃতির সংরক্ষণ, লালন ও বিকাশের অধিকার ও স্বাধীনতাও জাতিসংঘ তথা সভ্য-সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত। বাংলাদেশের শতকরা নব্বই জন অধিবাসী মুসলিম। অতএব, বাংলাদেশের সংস্কৃতিও অনিবার্যরূপে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের পরিচয়েই নিরূপিত হবে এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে সংখ্যালঘুদের জান-মাল-ধর্ম-সংস্কৃতি ইত্যাদির অধিকার ও স্বার্থ এখানে যথাযথরূপে সংরক্ষিত।
জাতিসংঘের সনদ ছাড়াও বাংলাদেশের সংবিধানেও সংখ্যালঘুসহ সকল নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান প্রতিপালন, নিজ নিজ ঐতিহ্য-সংস্কৃতির সংরক্ষণ, লালন ও চর্চার পূর্ণ স্বাধীনতা ও অধিকার প্রদান করা হয়েছে। উপরন্তু বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু জনগণের ধর্ম ইসলামী সংখ্যালঘুদের পূর্ণ মানবিক অধিকার, মর্যাদা ও ধর্মাচরণের পূর্ণ অধিকার সুনিশ্চিত করায় এদেশে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বিশ্ববাসীর সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। পার্শ্ববর্তী দেশে সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর প্রতিনিয়ত নির্মম অত্যাচার-নির্যাতন, হত্যা-লুন্ঠন, অবিচার-বৈষম্য, মসজিদ-মাদ্রাসা দখল ইত্যাদি বর্বরোচিত আচরণ সত্ত্বেও বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আদর্শ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এটা শুধু জাতিসংঘ সনদ বা বাংলাদেশের সংবিধানের কারণে নয়, মূলত বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী মুসলমানদের আচরিত ধর্ম ইসলামের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে।
ইসলাম সকল প্রকার জুলুম-নির্যাতন, অন্যায়-অবিচার, বৈষম্যের চরম বিরোধী। ইসলামের মৌলনীতি হলো, ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য ন্যায়বিচার ও সমমানবিক অধিকার নিশ্চিতকরণ। ইসলামের মহান নবী সা. মদীনায় যখন প্রথম ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেন, তখন সেখানে মুসলমান, ইহুদী, খ্রীস্টান ও মুশরিক ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্মের লোক বসবাস করতো। মহানবী সা. যে ‘মদীনা সনদ’ (Charter of Madina) প্রণয়ন করেন, তাতে সকল ধর্মের লোকদের নাগরিক অধিকার ও ধর্মাচরণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। তিনি তাতে সকলের প্রতি ন্যায়ানুগ আচার-আচরণ, সমদর্শিতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছিলেন। মহানবীর সা. পর খোলাফায়ে রাশেদীন ও বিভিন্ন যুগে মুসলিম শাসকগণও ইসলামের এ নীতি সমুন্নত রেখেছেন। বাংলাদেশেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানগণ সর্বদা সংখ্যালঘিষ্ঠদের প্রতি অনুরূপ আরচণ করে আসছেন। এ কারণেই এদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজমান। বাংলাদেশের উদার, মানবিক সংস্কৃতির এটাও এক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দিক।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম। আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাষ্ট্রিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে ইসলামের প্রতিফলন ও রূপায়ণ তাই সর্বতোভাবে কাম্য। একমাত্র এর দ্বারাই বাংলাদেশে শান্তি-সমৃদ্ধি ও সর্বশ্রেণীর মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত হতে পারে।
বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের পর বাঙালি মুসলমানের যে বিশিষ্ট জীবনধারা গড়ে ওঠে, তার ভিত্তিতে এক ভিন্ন সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে। বাঙালি মুসলমানরা যুগ যুগ ধরে সে সংস্কৃতি লালন করেছে, সে সংস্কৃতির ভিত্তিতেই কালক্রমে সৃষ্টি হয়েছে এক স্বতন্ত্র জাতিসত্তা। ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক নানা টানাপড়নের মধ্য দিয়ে সে জাতিসত্তা দিন দিন পরিপুষ্ট হয়ে উঠেছে। এরই ক্রমপরিণতি হলো সাতচল্লিশে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা এবং একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যূদয়। বাংলাদেশের অস্তিত্বের মূলে আমাদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সত্তার অবদান অপরিসীম। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচও আমাদের গৌরবোজ্জ্বল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। অতএব, এ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ করা ও তার বিকাশে যত্নবান হওয়া আমাদের জাতীয় কর্তব্য।
প্রত্যেক দেশ বা জাতির প্রকৃত পরিচয় তার ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ ও আচরণে। এ সকল ক্ষেত্রে আমাদের রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল অতীত, সমৃদ্ধ বর্তমান ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত। ইসলামের অতুলনীয় আদর্শে সে অতীত গৌরব, সমৃদ্ধ বর্তমান ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতকে অধিকতর সমুজ্জ্বল করে তুলতে হবে। এর ফলে আমরা কেবল নিজেদেরকেই নয়, বিশ্ববাসীকেও এক আলোকোজ্জ্বল পথের সন্ধান দিতে পারবো। বর্তমান সময়ের এটা এক অনিবার্য দাবি।
No comments