শর্মা লুনা’র কবিতা

 
ভালোই হলো
 
তোমার ভেলভেটের মত ঝলমলে ব্যক্তিত্ব দেখে
ক্ষণিকের জন্য মুগ্ধ হয়েছিলাম,
কিন্তু আমার প্রয়োজন ছিল
আটপৌরে সুতি শাড়ির মলমলে নরম আঁচলের মত
ছোট ছোট স্নেহ মাখা শাসন আর যত্ন,
ঐটুকুতেই আমি রাজার সম্মান পেতাম।
ভালই হল,
তোমার আলোর ঝলকানিতে
ঝলসে গিয়েও বেঁচে গেলাম,
ভালই হল
কূড়িয়ে পাওয়া ঝর্ণা জলে
চোখ কিছুটা ভিজিয়ে নিলাম।
ভালই হল
মুখ ফিরিয়ে তোমার থেকে
নতুন করে পুরোনোকে
ফিরে পেলাম।
ভালই হল
চোখ-ধাঁধানো রঙ্গিন আলোয়
খেই হারিয়ে
পথ হারিয়ে
পথের খোঁজে দাঁড়িয়েছিলাম।
ভালই হল
মেঘের মত বন্ধু আমায়
হাত বুলিয়ে ডেকে নিল
ভালই হল,
সব হারিয়ে বেঁচেই গেলাম
ভালয় ভালয় ভাল থেকো।।
..................................................
 
চিরন্তন মন উচাটন
 
মাঝে মাঝে কবিতাকে মনে হয় ছেঁড়া কাঁথা
শীত কাটেনা;
ফেসবুকটা একটা খাঁটি উজবুক,
গাঁজাখোর আর পার্টটাইম দার্শনিকদের আস্তানা
কিছুতেই আর মন লাগে্না।
 
ল্যাপটপটাকে লাগে ককটেল-ককটেল
ইচ্ছে হয় যার তার গায়ে
ছুঁড়ে দিয়ে ঝটপট দৌড় লাগাই।
 
বসের স্বরচিত আসনটাকে মনে হয় রোলার কোস্টার
দু'মিনিটেই স্বাধ মিটে যায়।
বাঁধাধরা নটা-পাঁচটার কল্পনায় আঁতকে উঠি,
উফ্ কী যন্ত্রণা!
 
পড়ার বইটা যেন একটা খাঁচা
শব্দগুলো বন্দী পাখির মত ডানা ঝাপ্টায়,
আর আমার আত্মা?
বাস্তবতার মাঠের গ্যালারিতে
প্রেম প্রেম চোখ নিয়ে ঘুরে ঘুরে খুঁজে বেড়ায়!
যদি মেলে কোন সফেদ সরল অনল,
পুড়ে মরবার!
..................................................
 
সব চুপ
 
সব চুপ
ঘর, মন জানালায় ডুব
রোদ ঘুম
আকাশের ব্যাথা আছে খুব
তাই সব চুপ।
সব চুপ
শুধু মেঘেদের পায়ের নুপুর
বেজে যায় ঝুম
পৃথিবীতে প্রেম আছে খুব
তাই সব চুপ।
সব চুপ
শুধু গান ঝুপ ঝুপ
বাতাসে অশ্রুর চুম
আভাসে সৃষ্টির রূপ
দেখে সব চুপ
খুব খুব চুপ।
..................................................
 
এখানে
 
এখানে
ফুল ফোটে
বুকে কাঁটা নিয়ে,
এখানে
আবেগ আসে
মনে ব্যথা নিয়ে।
 
এখানে,
এই মরুর দেশে
কেউ কাউকে ভালবাসে না,
খুলে রাখে সবাই আকাঙ্ক্ষার খাঁচা।
ভালবাসা মানে এখানে শুধু ধুধু বালি
গড়ে তোলে কীটেদের শরীর।
 
কীটগুলো মানুষের মত
কথা কয়
বুকে ব্যাথা বয়,
নির্মাণ করে মিথ্যের পাহাড়
অন্ধ প্রকোষ্ঠে শূণ্যতার অহং জমে,
মানুষগুলো দ্বীপহীন মোম হয়ে
গলে পড়ে
ঢলে পড়ে
সেখানে।
তবু এখানেই,
এখনো প্রেম আসে
কখনোবা আসে গান
কীটেদের শরীরে ঘুম নামে
সূর্যকে সাথী করে হয় অম্লান।
..................................................
 
এইসব মুহুর্ত
 
বাতাস এসে বুকের ঠিক মাঝখানটাতে
থমকে দাঁড়ায়,
মর্মাহত এক রোদ্দুর এসে জানান দেয়
যাবার বেলা হল।
নদীর ওপারে একলা মেঘ ডেকে যায়
ঠিক তার পাশে,
মরণের কাছে।
মাঝরাতের স্টিমার তন্ত্রাকে তার অসুর সুরের
মালায় গেঁথে বাজায় এক মোহাচ্ছন্ন সঙ্গীত,
ভাসিয়ে নিয়ে যায় দূরে
অনেক দূরে
নামহীন ভাবনার দেশে।
..................................................
 
সহজ চাওয়া
 
একটু যদি সহজ হও,কী ক্ষতি হয়!
নীল যদি বেগুনী হয়,
একটু সময়,
কী ক্ষতি হয়!
একটু যদি সহজ হাসো
একটু যদি সহজ বল
কী ক্ষতি হয়!
একটু যদি কঠিন চাওয়া
ছেড়ে ধর সহজ পাওয়া।
কী ক্ষতি হয়!
একটুখানি সহজ ভাবন
কিংবা চোখের সহজ কথা
গড়তে পারে সহজ বাঁধন
কিংবা ভালবাসার গাঁথা।
তাই এসো সহজ হই
সহজ ছাড়া উপায় কই?!
..................................................
 
তোমার কাঁধ
 
কী অদ্ভূত এক ঝিলিমিলি ছায়া সেখানে
দখিনা বাতাসের কলরোলে
মুখরিত ভালবাসায় আন্দোলিত অনুভূতিরা
মুখ গুজে
চোখ বুজে
বসে থাকে
চুপচাপ
লক্ষ্মী পাখিটির মত।
 
দীর্ঘশ্বাসেরা আনুভূমিক হয়ে শুয়ে থাকে যেখানে
নির্ভরতার ভ্রমর গুনগুনিয়ে গেয়ে যায়
অবিশ্রাম শ্রাবণঘন মেঘনাম,
টেনিসনের পদ্যখেকোরা বড় বড়
চোখে তাকিয়ে দেখে
মানব মানবীর ঐতিহাসিক বিজয়।
 
আর কিছু নয় সেখানে
না কাম
না অস্থিরতা
না কোন বৈষয়িক অধিকার;
 
শুধু মগ্নতা
নিবিড়তা
ঐশী এক মধুর ব্যথাময় সুখের দ্বার
উন্মিলিত চোখে চেয়ে থাকে ওখানে,
কী শান্ত বিষন্ন প্রসন্নতা
ঐ দারুণ দূর্বিনীত মায়াময়
ছায়াময় কাঁধ।
 
কাঁধ, ঐ বিশাল সুধাময় মানস প্রান্তর,
এ যুগের মানব মানবীরা
যার নেয় না খবর
পৃথিবীর এ সুগম্য সৌন্দর্য ভুলে
খুজে ফেরে সব প্রাচীন গুহা
বিকলাংগ হৃদয় নিয়ে স্বেচ্ছায় মেনে নেয়
সেখানে
নিস্তেজ অনুভূতির অকাল মরণ।
উফ কী বিভৎস করুণ মরণ!
..................................................
 
হ্যালো
 
হ্যালো, বিবেক স্টেশন
আমি বাংলাদেশ বলছি,
কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না
শুধু নীতিহীনতার অন্ধকার
আর লাভ ও লোভের বালির আস্তরণ,
হায়নার মত পিলারের নিচে
চাপা পড়ে আছি।
 
চারপাশে কর্পোরেটের রড ঢোকা শরীরের তীব্র চিৎকার
কিছু নিরপরাধ দুর্ভাগ্যের লাশ গলছে
কিছু ভাংছে আবার
আদর্শের ম ম পচা গন্ধে নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে এসেছে আমার
হ্যালো, বিবেক স্টেশন
আমাকে বাঁচান।
 
এই বীভৎস করুণ ষড়যন্ত্র
রানা প্লাজা রোগাক্রান্ত
মুমূর্ষু পড়ে আছি আমি বাংলাদেশ,
শীঘ্রই আসুন
আমাকে বাঁচান
হ্যালো, বিবেক স্টেশন...
 
এ অসহ্য খুন আর ধ্বংসের দহন
শুধু নিরপরাধের নয়
শুধু চেয়ে দেখা দর্শকের নয়
শুধু বিবেকের কিংবা বিপ্লবের নয়
শুধু শকুন ও খুনির;
হ্যালো...বিবেক স্টেশন
এখনই আসুন, এখনই জাগুন
হ্যালো...শুনছেন?
হ্যালো...
..................................................
 
ডাক
 
তুমি কি বাইশ কিংবা পঁচিশ?
কিংবা সাতাশ অথবা তিরিশ?
আমি তোমার রৌদ্র ঘামে
শুকনো পাতার দৃপ্ত দিনে
ইটের কুচির পিকেটিংয়ে
দিন বদলের স্লোগান নিয়ে
পথের ধুলো,
ডাকতে তোমায় এসেছিলাম
আমাকে কি চিনতে পারো?
 
আমি তোমার ঠোঁটের কাছে
তোমার হাতার রঙ্গিন ভাজে
বজ্র নামা গলার আঁচে
গনগনে মন সূর্য নাচে
মশাল মিছিল,
ডাকতে তোমায় এসেছিলাম
আমাকে কি চিনতে পারো?

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.