সোহেল মাহবুব’র কবিতা

আলোয় আলোয় দোলা
 
জানালার শার্শিতে মৃদু বাতাস দোলে
তারই ফাঁকে ওপারে নীল আকাশ ঝরে
দুটি দেহের তপ্ত দাপাদাপি
সারাদিনরাত বয়ে যায় ঘন চুম্বন বন্যায়,
 
তোমার আমার অন্ধ ভালেবাসা
ছোট্ট ঘরে ছোট ছোট সঙ্গম
আছড়ে পড়ে সুখের অনেক বড় বড় ঢেউ
তোমার সফেদ উরু
আমার হিংস্র বাহু
যেন মাইল মাইল দীর্ঘ বালিশ...
 
আমার উতরানো শক্ত লোমশ বুকে ওঠে
তোমার নরম বুকের সুরেলা ঢেউ
সাদা সাদা বালির ঘাটে নামে জোছনা
সারা অঙ্গে তোমার জ্বলে ওঠে নক্ষত্র
সাথে সাথে ঝুলে যায় আকাশ।
 
তোমার খোলা ঠোঁট, নামা চোখ দেখি
আকাশের সে আয়নায়,
সন্ধ্যে নামিয়ে রাখি ছোট সে ঘরে
উরুর নাগোর দোলায় জ্বলে থাকে
আমার সারা জমিন...
..................................................
 
স্বীকার
 
অজস্র উন্মাদনা জাগে প্রতি শিরায়, লোমকূপে
গিরির গহীনে, মেলে ধরা ছাদের কার্নিশেÑ
লেলিহান যৌনতা আর উন্মাদ প্রেম ঝুলে থাকে
বাদুড়ের মত।
 
আতুর ঘর থেকে গোলাপী আলো সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায়
নরম পালকের গায়ে, আর মেঘেরা চিৎকার দেয়
দেয় বৃষ্টি ঝরানোর পূর্বাভাস...
 
সেই যে অবাক করা জোছনা জমিন!
সেই যে বিস্ময়কর কাদামাটির ঘর
সেই যে কৃষ্ণধাম কেশরাশির আড়ালে অনন্ত পথ
সেই যে স্বীকার করা গাঢ় চুম্বন...
 
মেলে ধর প্রেম, মেলে ধর দেহ
উড়ে যাক জ্বালা, আসুক ঘরে স্বর্গের রিনিঝিনি।
..................................................
 
আরতি
           
এখন প্রয়োজন কড়কড়ে আঁধার
কিন্তু কেন জানি নেতিয়ে পড়েছে রাত
খাপে থাকে না পুরুষ তলোয়ার
এখন প্রয়োজন তুলকালাম নির্জনতা,
 
হিমালয়ের মাথায় খাঁজকাটা মুকুট
যেন একটাই পথ একটাই মত
দিঘীর ধারে দিগম্বর জল বালকÑ
অপেক্ষায় থাকে জল বালিকার,
যে সমুদ্রের শাড়ি পড়ে হাঁটে লোমশ গালিচায়।
 
এখন প্রয়োজন রজনীগন্ধার তন্বীশরীর
ভাঁজ করা পাখার নীচে আছে ভাদ্রের পূর্ণিমা
তাজা ঠোঁটে থাকে উচ্চারিত হাসির ঝলকানি
রাঙা ডালিমের মত বুকে লুকানো থাকেÑ
শত শত জটিল অরণ্যের করতালি
 
এখন প্রয়োজন চিতাবাঘের উষ্ণ কবিতা
যে চোখের সমুদ্রে ঝাঁপ দেয় অবলিলায়
সাজ ঘরে বৃষ্টি ঝরার আগে আকাশেরÑ
তপ্ত নি:শ্বাস গায়ে মাখতে
এখন প্রয়োজন আদিম সরলতা...
..................................................
 
মেঘের গহনা
 
খোপা খুলতেই খোলা পিঠে ওঠে ঘনায়িত মেঘের ঢেউ
যেন বর্ষার আকাশ থেকে একটুকরা জলের ওড়না
ছুঁয়ে দিল বাসন্তি চিবুক
চমকানো স্রোতের শেকড়ে ছায়ারা ঢালে গাঢ় জল
প্রশান্তির তীরে রূপালী সোহাগ জাগে ধাপে ধাপে।
 
অমৃত শয্যায় চিত হয়ে শুয়ে থাকে দেবী
সুগন্ধি সাবানে ধোয়া চোখে তখন পতনের দৃশ্য
সোনার শিকলে বাঁধা বাতাসের নিষিদ্ধ অঙ্গ
শয়নের খাট-পালঙ্ক সাজায় প্রার্থিত আলোরা...
 
এবার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে জিইয়ে রাখা সে চাঁদ বলেÑ
আমি নারী হব, কিছু দূরে দাঁড়িয়ে বৃক্ষ বলেÑ আমি জল হব
 
সুরেলা মৃত্তিকার এই নিঘাদ শ্রাবণে কে বলবেÑ
                                  আমি শিরা হব
সারা অঙ্গে রোপণ করবো পুষ্পিত জলের গহনা।
..................................................
 
রেশমী বর্ণমালা
 
দগদগে ঘুমের পালঙ্কে শুয়ে চারু শিল্পীর মত রাত আঁক
বসন্তের লেলিহান শিখারা গলে পড়ে ঠোঁটের পাহাড়ে
ভাবছ কত রাত শুয়ে আছে তোমার নরম পাদানীতে
এদিকে নদীরা সাঁতরে পার হয় ফুলসজ্জার লোহিত মোহনা,
 
তোমারও শৈল্পিক চিবুক ছুঁয়ে জোছনা নামে জন্মের বাগানে
কী এক অচেনা ঘোর ঘিরে রাখে রাতের গোপন তীর
জল রং নেচে যায় তোমার অদেখা খাতার শরীরে
ক্যান ভর্তি ঘুম হাতে দাঁড়িয়ে নেশার চুমু আঁকে ইতিহাস...
 
কুমারী আলো নরম বুকে প্রিয় মুগ্ধতা সাজায়
মৌচাকে ঢিল মারার পর উড়ে উড়ে আসে সেই সুবাস
লতায় জড়ানো সুবর্ণ গাছ দেখে কামারশালায়
ঠোঁট বুক আর নিতম্বের কালো তিল গড়ার প্রবল ইচ্ছা জাগে।
সে তৃষ্ণা ভরা গলায় রোদের বারান্দা সাজিয়ে
ফাঁকি দিয়ে হাতের তালুতে এঁকেছো কাঁচা মরিচ...
অথচ পাতায় পাতায় মাদল বাজিয়ে নবীন ছলকে ধুয়ে যায়
তোমার রেশমী সূতায় বোনা সাদা বর্ণমালা।
..................................................
 
উজান
 
ছাদের কার্নিশ থেকে রেলিং বেয়ে ঝুলে পড়েছে শাড়ি
যেন বিল্ডিংটার খোলা বুক ঢেকে রাখা তার খুব জরুরী।
 
প্রবল স্রোত উছলালেও জীবনের নদী উজানে যায় না
এক গলা রোদ্দুরে পুড়ে যায় ঘাস উড়ে যায় তাজা দিন,
লাল রক্তের ভেতর চেঁচিয়ে জোঁক সাদা জল কী পায় না?
নরম বুকের মাঝে উঁকি মেরে যেন শোধ করে খুশির ঋণ।
 
সকাল দুপুর সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলে ফিরে আসে জোনাকী
স্মৃতির রোদ মুখে মেখে বাগানে বসে মৃৎ শিল্পী গড়ে জোছনা
ঝড়ের নখে আকাশ ছিঁড়ে, শো-কেসে আটকে থাকা সয় কী?
উরুর খাদে নেতিয়ে পড়ে মৌমাছি সাগরে ধোয় মনের আঙিনা।
 
বহমান মাঝির সুর না পেয়ে মেঘের ফাটলে গুমরে মরে জল
পুষ্ট বোধের সীমায় সীমায় এবার ফল ফোটে পথ চলে অবিচল।
..................................................
 
প্রলয়ে প্রলয়ে বসন্ত
 
বর্ষায় নদীতে জল বাড়ে স্পর্শে তর তর করে বাড়ে যৌবন
বসন্তে ফোটে ফুল আলিঙ্গনে ফুলে ফেপে ওঠে বক্ষের স্বর্গ।
 
নিশি, প্রবল বিগলিত টানে তোমার যৌবন জোড়া আলোয়
দোলে কানের দুলে...
সকালের রোদ বিপন্ন হতে হতে বৃষ্টি হয়ে ঝরে রোপিত চারায়
সে চোখ থেকে যৌবন আছড়ে পড়ে বিমুগ্ধ দর্শকের শাটের কলারে
করতলে পাহাড়ের ঢেউ জলের সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে আসা স্বর্গ উঁকি মারে
উত্তাপ ছড়ায় শিল্পীর তুলিতে।
 
নিশি, অদৃশ্য চিত্রশিল্পীর আশ্চর্য তুলিতে আঁকা আপেলÑ
তুলে রাখো অন্ধ কবুতরের কোমল খোপে
ঠোঁটের কোণে বন্দর সাজাও
উপচে পড়া মাল নিয়ে জাহাজ ভিড়ুকÑ
সাদা শেকড় উড়িয়ে...
..................................................
 
আগলে রাখা স্বপ্ন
 
কপালের নীল টিপ আর কপোলের কালো তিল
দুয়ের পার্থক্য কোথায়, দুয়ের দূরত্ব কত?
নরম শয্যার ওম আর বুকের উষ্ণতা
কী করে আগলে রাখে সরপড়া দুধের বাটি...
 
শাড়ির আঁচলে পোষমানা রোদ
আর উপোসী গন্ধে পেখম মেলে ময়ূর
খোসা ওঠা পিঁয়াজের ঝাঁঝে স্তিমিত হয়
সখের কলসে আঁকা মুখচ্ছবি...
জোনাকির বিছানো আলোয় গেলাশ ভর্তি সুদ
ছাগলের নতুন বাচ্চার মত নাচানাচি করেÑ
উল্কি আঁকা উঠোনে
তারাদের গোপন বৈঠকে উঁকি মারে
এক কাপ ধূমায়িত স্বপ্ন।
..................................................
 
রাতচর পাখি
 
সে দিন আমার কাছ থেকে দস্যুতা আশা করেছিলে
আমি বুঝিনি, কোনো ঝর্নার জলে লুণ্ঠিত হবার মত
এতটা সাহস ছিল না আমার, কিন্তু মুগ্ধতা চেয়েছিলাম
অন্ধ মালার প্রথম চুম্বনের মত...
 
তাকিয়ে থাকতাম দূরে, অথচ কাছেই কেউ একজন
চুল ছড়িয়ে বসে থেকেছে সংকোচ করে ছুঁতে পারিনি 
যখন আকাশের কোলে মাথা রেখে সূর্যটা চোখ বুঁজছিল
তখন তুমি আমার প্রেমিক শাবকের গলায় চুড়িÑ
পরানোর জন্য ফুলের কাছ থেকে গন্ধ চাইছিলে
সে সময় কোথা থেকে যে সন্ধ্যা এলো আমি তাও বুঝিনি
 
এখন আমি রাত্রিচর
মরুময় এসব রাতে অন্ধ পাখির মত খুঁজি
তোমার অসমাপ্ত চুম্বন
পৃথিবী দেখে আমি বসে থাকি প্রকাশ্যে ঝর্নায় ভিজতে
হয়ত তুমি এসে বলবেÑ
এই দেখো অক্ষত রেখেছি রোমাঞ্চিত যমুনা...
..................................................
 
চালাঘর
 
ঝর্না পেটে ধরেছে তোমার হাসি
আমি অজস্র নয়নে চেয়ে থাকি ঠোঁটের সীমান্তে।
 
একরাত দুরাত করে অনেক রাত বসে থাকি
খুব ভোরে তোমার ঘুম ভাঙ্গার পর
মিষ্টি হাসিটা ধরব বলে-
ছাদের উপর মেঘ এসে দাঁড়াত
আমি আপত্তি করেছি কতবার
তারপরেও হাতছানি দিয়ে ডেকেছে পরকিয়ার মত
আমি সে ঝর্নার পাশে বসে সূর্যাস্ত চেয়েছি
তোমার সে হাসির ফর্সা আভা ঢাকার জন্য
যাতে কাঁটাতার ঝাঁপিয়ে মেঘ এসে
লুন্ঠন না করতে পারে ঠোঁটের ঝলক।
 
অজস্র ঢেউ তোলে যুগল ঠোঁট
স্রোতের টানে সৌরভের সিঁড়ি বেয়ে
উঠতে চাই শেষ অবধি...
 
হাসির উঠোনে চালাঘর বাঁধতে দেবে তো আমায়?

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.