আমার দ্বিতীয়বার ইংল্যান্ড সফর_মুহম্মদ মতিউর রহমান : পর্ব-১৩


 ৩১ জুলাই, জুমা বার
জুমার নামায পড়তে গেলাম সিডার র‌্যাপিড্স ইসলামিক সেন্টারে। কয়েক বিঘা জমির উপরে ক্রয়কৃত একটি ভিলা বাড়িতে  কিছুটা সংস্কার সাধনের মাধ্যমে মসজিদ ইসলামিক সেন্টারটি গড়ে উঠেছে। এখানে আগেও কয়েকবার জুমার নামায আদায় করেছি। সেন্টারের প্রতিষ্ঠা ১৯৩৪ সনে। অনেকের ধারণা, এটি আমেরিকার সর্বাধিক পুরাতন ইসলামিক প্রতিষ্ঠান। মসজিদের পাশে ইমামের অফিস, লাইব্রেরি একটি হলরুম। নিচের তলায় জিমনিসিয়াম বা খেলাধূলার জায়গা। সেন্টারে উইক এন্ডে কোরআন ক্লাস হয়। এলাকার মুসলিম ছেলেমেয়েরা সেখানে কোরআন পড়ে। গ্রীষ্মকালে যখন দীর্ঘকালের জন্য (প্রায় দুই মাস) স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি থাকে, তখন এখানে বিশেষ সামার ক্লাস চালু করা হয়। তাতে মুসলিম ছেলেমেয়েরা ইসলামী বিষয়ে শিক্ষালাভ করে। এবারের সামার ক্লাসে ৫০ জন ছাত্র-ছাত্রী যোগদান করে বলে ইমাম সাহেব জানালেন। আমেরিকার বিরূপ পরিবেশে শুধু নিজেদের মুসলমান থাকাই যথেষ্ঠ নয়, ছেলেমেয়েদেরকে কোরআন শিক্ষা দেয়া এবং জরুরী ইসলামী বিষয়ে জ্ঞানদান  করে তাদেরকে ইসলামী চাল-চলন, আচার-আচরণ বোধ-বিশ্বাসে গড়ে তোলার  গুরুত্ব অপরিসীম।
মসজিদের সাথে একটি বড় হল রুম। তাতে নানা রকম ইসলামী সামাজিক অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করা হয়ে থাকে। সব অনুষ্ঠানে অনেক সময় স্থানীয় অমুসলমানদেরকেও দাওয়াত দেয়া হয়, যাতে তাদের সঙ্গে পারস্পরিক বন্ধুত্ব সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়, ইসলাম মুসলমানদের সম্পর্কে তাদের ভুল বোঝাবুঝি দূর হয়। অনেক সময় অমুসলমানের মধ্যে এর ফলে ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ সৃষ্টি হয় এবং ক্রমান্বয়ে তারা ইসলামী আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মুসলমান হয়ে যায়। এখানে ইসলামী সেন্টারে যে লাইব্রেরী আছে, সেখানে ইসলাম বিষয়ক বহু গ্রন্থাদি রয়েছে। বিনামূল্যে তা আগ্রহী পাঠককে প্রদান করা হয়। এসব বই পড়েও অনেক অমুসলিম ইসলাম সম্পর্কে জানতে পারে এবং ইসলাম গ্রহণে উদ্বূদ্ধ হয়। স্থানীয় মুসলমানগণ নিজেরা চাঁদা তুলে ইসলামিক সেন্টার মসজিদ নির্মাণ এবং এর বিবিধ কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করে থাকে।
মসজিদের পাশে একটি রুম আছে, সেখানে বসে ইমামের খুৎবা শোনা যায় এবং নামায পড়ার নিয়ম-নীতি সব প্রত্যক্ষ করা যায়। স্থানীয়, অমুসলমানÑযারা ইসলাম মুসলমানদের সম্পর্কে জানতে আগ্রহী-তারা নামাযের সময় ঘরে বসে। অনেক সময় তাদের দাওয়াত দিয়ে আনা হয়। দেশে বসবাসকারী অনেক মুসলমান নিজেরা ধর্ম-কর্ম পালনে যেমন নিষ্ঠাবান, ইসলামের দাওয়াত মাহাত্ম্য বিধর্মীদের সামনে তুলে ধরতেও তেমনি সদাসচেতন সবিশেষ আগ্রহী। অন্যদের নিকট ইসলামকে উপস্থাপন করার পদ্ধতিও বেশ আকষর্ণীয়। ফলে অনেক অমুসলমান ইসলাম গ্রহণ করেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের মোট সংখ্যা প্রায় আশি লক্ষ। দিন দিনই সংখ্যা  বৃদ্ধি পাচ্ছে। এদেশে মুসলমানদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রধান কারণ তিনটিÑ প্রথমত বহিরাগত মুসলমানদের আগমন, দ্বিতীয়ত মুসলমানদের মধ্যে জন্মহার তুলনামূলকভাবে অধিক এবং তৃতীয়ত অমুলমানদের ইসলাম গ্রহণ।
মসজিদ থেকে বের হয়ে দেখলাম, সেখানে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসানো আছে। এর মাধ্যমে মসজিদের ভিতরে বাইরে অনুষ্ঠিত সকল কার্যক্রম বক্তৃতা রীতিমত মনিটর করা হয়। সম্ভবত নাইন ইলেভেনের পরে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মুসলমানরা এদেশে অনেকটা সন্দেহের পাত্র, তাই তাদের সকল কার্যক্রম বক্তৃতা-বিবৃতি মনিটর করা হয়। তবে সৌভাগ্যবশত আজ পর্যন্ত আমেরিকার কোন মসজিদ বা ইসলামিক সেন্টারেই কোনরূপ অবৈধ বা রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে প্রধানত ইহুদী উগ্র মুষ্ঠিমেয় খ্রীস্টানদের ইসলাম মুসলিম বিরোধী ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণার অন্তঃসারশূন্যতা ক্রমান্বয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইসলাম মুসলমান সম্পর্কে আমেরিকানদের বিভ্রান্তি ধীরে ধীরে অপসৃত হচ্ছে। বরং সন্দেহের বশবর্তী হয়ে মুসলমানদের কার্যক্রম ঘনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করতে গিয়ে তারা অনেকেই এখন ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে নিজেদের ধর্ম পরিত্যাগ করে ইসলামে দীক্ষিত হচ্ছে। ফলে নাইন ইলেভেনের পর আমেরিকায় মুসলমানদের উপর যে অন্যায় আচরণ করা হয়, তাতে সাময়িকভাবে মুসলমানদের উপর বিপর্যয় নেমে এলেও ধীরে ধীরে ইসলাম মুসলমানদের সম্পর্কে আমেরিকানদের ভুল ধারণার অবসান ঘটায় বর্তমানে সেখানে ইসলামের প্রচার মুসলমান হবার সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
 
আগস্ট, শনিবার
আমেরিকার প্রায় প্রত্যেকটি শহরেই উইক এন্ডে অর্থ্যাৎ শনিবারে হাট বসে। এসব হাট ঈরঃু সধৎশবঃ নামে পরিচিত। ছুটির দিনে শহরের একপ্রান্তে চারপাশের রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়ে রাস্তার উপরে গ্রামের লোকজন তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য, শিল্পজাত দ্রব্য নানা ধরনের জিনিসপত্র নিয়ে বিক্রি করতে বসে যায়। দুপুর বারটা পর্যন্ত কেনাকাটা চলে। তারপর আবার যে যার ঘরে ফিরে যায়। সিডার র‌্যাপিডস-এর শহরতলীন হাটে গিয়ে দেখলাম সেখানে সর্বমোট ১৫০টি বিভিন্ন ধরনের দোকান। সবগুলোই রাস্তার উপরে মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য অস্থায়ীভাবে তৈরি করা। কিন্তু হরেক রকম পণ্য, বিশেষত গৃহে তৈরি বা ক্ষুদ্র শিল্পজাত দ্রব্য।
আমরা সকাল সাড়ে দশটায় সেখানে গেলাম। কিন্তু হাটের কাছাকাছি পৌঁছা গেলো না। হাট থেকে অনেকটা দূর পর্যন্ত অসংখ্য গাড়ি পার্ক করা। তাই আমাদের গাড়ি বেশ খানিকটা দূরে রাস্তার উপর পার্ক করে আমরা সবাই হেঁটে গেলাম হাট দেখতে। নানা রকম তরি-তরকারী, শাক-সবজি, পাতাসহ ভূট্টা, পিয়াজ-রসুন, মদ, মধু ইত্যাদিসহ ঘরে বানানো হরেক রকম কৃষি শিল্পদ্রব্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সকল শ্রেণীর অসংখ্য মানুষ এসে ভীড় জমিয়েছে। প্রায় প্রত্যেকের সাথে তাদের পোষা কুকুর আছে। কুকুর এদের অবসর জীবনের একান্ত সাথী। শিশুরা বেলুন ওড়াচ্ছে, বাাঁশি বাজাচ্ছে, অনেকে রাস্তার একপাশে লোক জমিয়ে বাদ্যযন্ত্র সহকারে গান গাইছে, নিকটবর্তী শিশুপার্কের মঞ্চে একদল গায়ক-গায়িকা নানা বাদ্যযন্ত্র সহকারে গানের আসর বসিয়েছে। বহুলোক সেখানে ভীড় করে গান শুনছে, হাততালি দিচ্ছে, নানারূপ আমোদ-প্রমোদে ব্যস্ত রয়েছে।
অনেক দোকানে ঘরে বানানো মদ দিয়ে পথচারীদেরকে আপ্যায়িত করা হচ্ছে, অনেকে কেকের টুকরা, পিঠা বা ঘরে বানানো অন্যান্য খাদ্য-সামগ্রী বিলিয়ে ক্রেতাদের আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। এরই মাঝে চলছে বেচাকেনা। একটা আনন্দমুখর পরিবেশ চারদিকে। পরিবারের সবাই মিলে হাটে এসেছে। কেনাকাটা যতটাই হোক, ঘুরে ঘুরে সব দেখা, পরখ করা এবং এর মাঝে পরিচিত জনদেরকে হাই-হ্যালো বলা, ঘনিষ্ঠদেরকে আবেগে জড়িয়ে ধরা এসবের মাধ্যমে তাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। সপ্তাহের পাঁচদিন এরা কাজে-কর্মে ব্যস্ত থাকে। কেউ কারো বাড়ি গিয়ে আত্মীয়তা-মেহমানদারী করারও  তেমন সুযোগ পায়না। কখনো ক্লাবে, কখনো কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে অথবা ধরনের কোন আনন্দ-মেলায় এসে তারা বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের সাথে কিছুক্ষণের জন্য হলেও  দেখা-সাক্ষাৎ করার সুযোগ পায়।
নগর-কর্তৃপক্ষ এসব হাটের ব্যবস্থা করে থাকে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় কৃষক কুটিরশিল্পীদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য শিল্পজাত দ্রব্যের বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা। তাদের উৎপাদিত দ্রব্যের প্রতি সাধারণ ক্রেতা ভোক্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। স্থানীয় কৃষক উৎপাদনকারীদেরকে উৎসাহ প্রদান করাই এর মূল লক্ষ্য। কৃষিজাত পণ্য বিশেষত শাক-সবজি, ফলমূল ইত্যাদি এসব হাটে টাটকা পাওয়া যায়। সুপার মার্কেটে সাধারণত হিমায়িত বাসী ফলমূল, শাক-সবজি ইত্যাদি বিক্রি হয়। তরতাজা টাটকা খাবারের লোভেই অনেকে হাটে আসে।
প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে পুরো হাট ঘুরে ঘুরে দেখলাম। শিশুরা আনন্দ করছে, বুড়ো-বুড়িরা পরস্পর হাই হ্যালো বলছে, যুবক-যুবতীরা ফিসফাস কথাবার্তা বলছে। চারদিকে গান-বাজনা চলছে, এরই মধ্যে চলছে কেনাবেচা। সুন্দর আনন্দ-মুখর জমজমাট পরিবেশ। এটাকে বাংলাদেশের মেলার মতই মনে হলো আমার কাছে।
 
আগস্ট, রবিবার
আজ দুপুরে আমরা দাওয়াত খেতে গেলাম হায়াতের বাড়িতে। হায়াৎ এনামের সহকর্মী এবং তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। হায়াৎ বাংলাদেশী এক তরুণ শিক্ষিত যুবক, সে  বিয়ে করেছে এক থাই তরুণীকে। হায়াতের বউ মুসলমান হয়েছে এখন সে শিরীন নামে পরিচিত। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই খুব ভাল মুসলমান। নিয়মিত নামায পড়ে, রোজা রাখে, হালাল-হারাম মেনে চলার চেষ্টা করে। তারা দুজনেই এখন আমেরিকান নাগরিক। তাদের তিন বছর বয়সী একটি মেয়ে মিন্নাহ এবং দুই বছর বয়সী এক ছেলে হারিৎ। সম্প্রতি দুই লাখ ডলারে তারা চার বেডরুম বিশিষ্ট একটি বাড়ি কিনেছে। দুমাস আগে তারা নিজেদের বাড়িতে উঠেছে। রাস্তার পাশে সুন্দর ছিমছাম বাড়ি। পিছনে ঘন সবুজ অরণ্যে আচ্ছাদিত অনুচ্চ পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে সমতল ভূমিতে তারা বিভিন্ন সবজির বাগান করেছে। বিকালে শিশুরা সেখানে খেলাধুলা করে।
শিরীন খুব সাদাসিধা সহজ-সরল মেয়ে। তার পোষাক-আশাকও খুব সাধারণ। সে কোন প্রসাধনী ব্যবহার করে বলে মনে হল না। সে রীতিমত হিযাব পরে। ইসলাম গ্রহণের পর সে ইসলাম সম্পর্কে জানতে যেমন আগ্রহী, তেমনি ইসলামের বিধি-বিধান পালনেও খুব নিষ্ঠাবতী। স্বামীর সঙ্গে সে কয়েকবার বাংলাদেশে গেছে। বাংলাদেশকে সে ভালবাসে। কিছু বাংলা কথাবার্তাও শিখেছে। তার শ্বশুর-শাশুড়ি ঢাকা শহরের ধানমন্ডি এলাকায় নিজেদের বাড়িতে বসবাস করে।
হায়াতের বাড়িতে গিয়ে দেখি, রান্না-বান্নার কাজ শেষ। আমরা বাসায় ঢুকে জামাতে জোহরের নামায আদায় করলাম। ইতঃমধ্যে খাবার যথারীতি মাইক্রোওয়েভে গরম করে টেবিলে সাজানো হয়েছে। নামায শেষ হতেই আমাদের ডাক পড়লো খাবার টেবিলে। নানা রকমের থাই খাবার। থাইদের নিকট রান্না একটি শিল্পকর্ম। নানারকম সুস্বাদু খাবার প্রস্তুতে তাদের সুনাম আছে। আমি ১৯৮৫ সনে একবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বেড়াতে গিয়েছিলাম। তখন দেখেছি, নানা রকমারি খাবার তৈরি করে রাস্তার দুপাশে তারা হোটেল বানিয়ে বসে আছে। অনেকটা ঢাকার সদরঘাট এলাকার ইটালী হোটেলের মতো। খাবার দেখে খুব লোভ লাগত। কিন্তু অনেক কষ্টে আমি সে লোভ সংবরণ করেছি, কারণ খাবারগুলো হালাল কিনা, আমার জানা ছিল না। কিন্তু এখানে হায়াৎ শিরীন দুজনেই এত ভাল মুসলমান এবং হালাল-হারামের ব্যাপারে তারা এতটা সচেতন যে, তাদের তৈরি থাই খাবার খেতে আমার কোনই দ্বিধা বা সংকোচ হল না। বাংলাদেশী খাবার থেকে এর স্বাদ ভিন্ন। তবে খারাপ লাগল না, পেট ভরে খেলাম।
প্রথমে গরম গরম খাই স্যূপ পরিবেশন করা হলো। চিংড়ি মাশরুমের সাথে মনে হলো এক জাতীয় সাদা আদা, পিয়াজ, রসুন ইত্যাদি দিয়ে মজাদার স্যূপ তৈরি করা হয়েছে। থাই খাবারে একটু ঝাল বেশি থাকে। মরিচ আদার ঝাঝ্টা একটু কড়া মনে হলেও খেতে মন্দ নয়। আমি একবার শেষ করে স্যূপের প্রশংসা করতেই আমার বাটিতে আরো চামচ স্যূপ দেয়া হলো। দেশে মেজবানের সামনে কোন খাবারের প্রশংসা করলে মেজবান খুশি হয়ে সে খাবার আরো মেহমানের পাতে তুলে দেয়। সে ট্রিকসটা এখানেও কাজে লাগলো। আমি সৌজন্য দেখাবার জন্য মুখে না না করলেও আসলে মনে মনে খুশিই হলাম।
স্যূপ শেষ করে কিছুটা সাদা ভাত প্লেটে তুলে নিলাম। ভাতের সাথে মাছ। তেলাপিয়া মাছ নারিকেল বেগুন দিয়ে রান্না করা। নারিকেল কোলোস্টরাল বৃদ্ধি করে। আমার কোলোস্টরাল হাই। তাই ঝোল না নিয়ে বেছে বেছে শুধু মাছ বেগুন তুলে নিলাম। এরপর নিলাম মুরগির গোশত। পিয়াজ স্যালারি নামক এক জাতীয় পাতা দিয়ে গোশত রান্না করা। স্যালারি পাতা এবং আরো দুএকরকম লতা-পাতা থাই তরকারির অপরিহার্য উপাদান। ঐসব পাতার এক ধরনের স্বাদ আছে, যা ভোজন-বিলাসীদের রসনা নিবৃত্ত করে থাকে। অনভ্যাসের জন্য অবশ্য আমাদের বাসনাকে স্বাদ তেমন একটা তৃপ্তি দিতে পারল না। এরপর গরুর গোশতের কিমা দিয়ে মাশরুম রান্না পাতে তুলে নিলাম। গরুর গোশত মাসরুম দুই- আমার প্রিয়। তবে আমি  গরুর গোশত মাসরুম আলাদাভাবে খেয়ে অভ্যস্থ। সবজির সাথে মাশরুম রান্নাও খেয়েছি। কিন্তু গরুর গোশতের সাথে মাশরুম রান্না কখনও খাইনি। এই প্রথম খেলাম। ভালই লাগলো। ভাত শেষ করে একটু নুডুলস নিলাম।
খাবার শেষে মিষ্টি দেয়া হলো। আম দিয়ে এক ধরনের মিষ্টি তৈরি করা হয়েছে। ডায়াবেটিসের কারণে আমি তার স্বাদ গ্রহণে বঞ্চিত হলাম। তবে অন্যদের খাওয়া দেখে মনে হচ্ছিল তা বেশ রসনা-তৃপ্তিকর হয়েছে।
রবিবার ছুটির দিন হলেও  খেতে খেতেই এনামের অফিস থেকে টেলিফোন এল, জরুরি কাজে তাকে এখনই অফিসে যেতে হবে। তাই খাওয়া শেষ করেই সে তার গাড়ি নিয়ে অফিসে চলে গেল। অবশ্য খাওয়া শেষে কিছুক্ষণ গল্প-গুজব করে আমি, আমার স্ত্রী নাতি-নাতনি মেয়ে সুমাইয়ার গাড়িতে করে ঘরের দিকে রওয়ানা হলাম। রাস্তার দুপাশে গাছপালার ফাঁকে সাদা রঙের বাড়িগুলো পড়ন্ত বিকালের সোনা রঙ লেগে চিক চিক করছে। দুপাশের শস্যক্ষেত সবুজ লতা-গুল্ম বাতাসে দুলছে। দুচোখ ভরে সে মনোহর দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা ঘরে ফিরে এলাম।
 
আগস্ট, সোমবার
আমেরিকায় খাওয়া-দাওয়া খুব যাচাই-বাছাই করে খেতে হয়। এখানে অধিকাংশ খাদ্যেই শুয়োরের গোশত মদের মিশ্রণ থাকে। অন্যান্য গোশতের তুলনায় শুয়োরের গোশতের দাম অনেক সস্তা। তাই শুয়োরের গোশতে যাদের আপত্তি নেই, তাদের জন্য শুয়োরের গোশত বা গোশত দিয়ে বানানো নানা জাতীয় মুখরোচক খাদ্য খুবই আকষর্ণীয় সন্দেহ নেই। কিন্তু মুসলমানদের জন্য তা একান্তভাবে পরিত্যাজ্য। সরাসরি শুয়োরের গোশত তো আছেই তাছাড়া, স্যান্ডউইচ, সমুসা, বার্গার ইত্যাদি সব খাবারের মধ্যেই এখানে শুয়োরের গোশত ব্যবহার করা হয়। শুয়োরের গোশতে প্রচুর চর্বি থাকে। সে চর্বিও নানাভাবে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহৃত হয়। ফলে সে সব খাবারও মুসলমানদের জন্য হারাম। সম্প্রতি পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশেসোয়াইন ফ্লু প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। শুয়োরের গোশত থেকেই রোগের উদ্ভব। শুয়োরের গোশত ইসলামে হারাম করা হয়েছে যেসব কারণে তার মধ্যে এটিও একটি। সরাসরি শুয়োরের গোশত তো আছেই, তাছাড়া শুয়োরের গোশত বা চর্বি আরো নানাভাবে এখানকার বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে মিশ্রিত করা হয়। এর দুএকটি নমুনা তুলে ধরছি।
১৯৮৪ সনে ইউরোপ সফরে গিয়ে আমি একবার আমার এক বন্ধুর সাথে লন্ডনের বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া স্টেশনে গিয়েছিলাম। অনেকক্ষণ এখানে-ওখানে ঘুরে ফিরে আমরা কিছুটা ক্লান্ত ক্ষুধার্ত। আমার বন্ধু বললেন, চলুন একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে কিছু খাওয়া যাক। আমি বললাম, চলুন। রেস্টুরেন্টে গিয়ে সব দেখেশুনে  একান্ত নিরাপদ ভেবে মাছ ফ্রাই পটেটো চিপ্স বা আলু ভাজির অর্ডার দিলাম। কারণ দুটি জিনিসের মধ্যে কোনরূপ হারাম বস্তুু নেই। অর্ডার দিয়ে আমরা অপেক্ষা করছি। আমাদের সামনেই মাছ আলু ফ্রাই করা হলো। পাশে শুয়োরের গোশত অন্যান্য জিনিসও বিভিন্ন কড়াইতে ভাজা হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর আমার বন্ধু ইঙ্গিতে আমাকে বললেন যে, দেখেছেন দোকানদার বিভিন্ন কড়াইতে একই চামচ ব্যবহার করছে। যে চামচ দিয়ে শুয়োরের গোশত তুলছে সেই একই চামচ দিয়ে আলু মাছ ফ্রাইও কড়াই থেকে প্লেটে তুলে আমাদেরকে খেতে দিল। আমরা দেখে তো হতবাক! আমরা খাবার খেতে অস্বীকার করলাম। রেস্টুরেন্টের লোক বলল, কেন? আপনারা যা অর্ডার দিয়েছেন, সেটাই পরিবেশন করা হয়েছে। খাবেন না কেন? ওকে আর বুঝাবো কী করে যে, আমাদের খাবারের মধ্যে কিছু নিষিদ্ধ দ্রব্য ঢুকে পড়েছে। হালাল-হারাম সম্পর্কে ওকে বুঝাতে যাওয়া নিরর্থক। তাই বেশি কথা না বলে আমরা নীরবে সে স্থান পরিত্যাগ করলাম।
অন্য আরেকটি ঘটনার কথা বলি। ১৯৮৪ সনে আমার ইউরোপ সফরের প্রাক্কালে জার্মানীর ন্যূরেমবার্গ শহরে রাত্রি বেলায় এক হোটেলে আশ্রয় নিলাম। তখন রাত অনেক। পেটে ক্ষুধার আগুন জ্বলছে। খাবার টেবিলে বসে খাবার আনতে বললাম। বেয়ারার সাদা ভাতের সাথে শুয়োরের গোশত নিয়ে এল। দেখে তো বমি আসার যোগার। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, মাছ, সবজি বা অমলেট আছে? বলল না, এসবের কিছুই নেই। ক্ষুধাও লেগেছে দারুণ, তাই বললাম তাহলে শুধু সাদা ভাত নিয়ে এস আর কিছু লাগবে না। অর্ডার পেয়ে সে আমাকে এক প্লেট ভাত এনে দিল। দেখি ভাতের মধ্যে ঝোল। জিজ্ঞাসা করলাম এটা কী? সে নির্বিকারভাবে বলল, শুধু সাদা ভাত খাবেন কীভাবে, তাই ভাতের সাথে কিছুটা পর্কের (শুয়োর) ঝোল মিশিয়েছি। আমার মনের অবস্থা তখন খুব খারাপ। মনে হচ্ছিল, ভাতের প্লেটটি ওর মুখে ছুড়ে মারি। কিন্তু হাঙ্গামা করে কোন লাভ নেই, বরং বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। তাই কিছু না খেয়ে নীরবে টেবিল ছেড়ে উঠে বাইরে গেলাম। ভাবলাম, রাস্তার কোন দোকানে যদি কলা বা ফলমূল জাতীয় কিছু পাওয়া যায়, তাহলে তাই দিয়ে ক্ষুধা নিবৃত্ত করবো। কিন্তু দুর্ভাগ্য, দোকান-পাট সব বন্ধ। রাস্তার পাশে দুএকটা সরাইখানায় কেবল মদ খাওয়ার আড্ডা বসেছে। সেখানে ঢুকতেও ভয় লাগে। তাই আবার হোটেলে ফিরে এসে আমার নির্দিষ্ট রুমে ঢুকে এক গ্লাস পানি খেয়ে এশার নামায পড়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। পেটে তখন রাজ্যের ক্ষুধা।
আরেকবার আমেরিকার সিডার র‌্যাপিডস শহরের একটি বড় দোকানে ঢুকেছি কেনাকাটা করার জন্য। সঙ্গে স্ত্রী, ছোট ছেলে, বড় মেয়ে, জামাই নাতি-নাতনি সবাই আছে। দোকানের একপাশে নানাজাতীয় ফল, বিস্কুট, কেক ইত্যাদি টেস্ট করার জন্য ক্রেতাদের অফার করা হচ্ছে। আমি দুটি বিস্কুট হাতে নিলাম। আমার ছোটছেলে আবিদ তখন আমার সাথেই ছিল। সে লক্ষ্য করেছে, যে প্লেটে বিস্কুট রাখা হয়েছে তাতে কিছু তৈলাক্ত জিনিস লেগে আছে। সে সেলসম্যানকে জিজ্ঞাসা করল, তৈলাক্ত পদার্থটা কী? দোকানী বললো এতে আগে শুয়োরের গোশত দিয়ে বানানো কিছু একটা রাখা ছিল, তাই কিছুটা চর্বির দাগ লেগে আছে। এরপর আমরা আর বিস্কুট মুখে না পুরে তা ওয়েস্টপেপার বাস্কেটে ফেলে দিলাম। পাশ্চাত্য জগতের সর্বত্র এই হলো অবস্থা। সর্তক না থাকলে হালাল-হারাম চেনাও কঠিন।
মদের ব্যাপারেও তাই। সরাসরি মদ না খেলেও এখানকার কেক, বিস্কুট, পাউরুটি, বার্গার ইত্যাদি নানা জাতীয় খাদ্যে মদের মিশ্রণ ঘটানো হয়। তাই এসব খাদ্য খেতে সতর্কতা অবলম্বন করা একান্ত প্রয়োজন। এখানে অনেক কিছুতেই মদ কীভাবে ব্যবহার করা হয় তার একটি নমুনা বলছি। একবার আমার ছেলে ঔষুধের দোকান থেকে ফিশওয়েল নামক একটি ঔষধ নিয়ে এল। শিশির গায়ের লেখা পড়ে জানা গেল এতে জিলেটিনের মিশ্রণ রয়েছে। এরপর সারা বাজার ঘুরেও কোন দোকানে জিলেটিনমুক্ত ফিশওয়েল পাওয়া গেল না। আমার ছেলে শেষ পর্যন্ত ঔষধ প্রস্তুতকারী কোম্পানীতে টেলিফোন করে জানলো যে, তারা জিলেটিন মুক্ত কোন ফিশওয়েল তৈরি করে না। অতএব, আমার আর ফিশওয়েল ঔষধ খাওয়া হল না। আমেরিকা বসবাসকারী অনেক মুসলমান হয়তো না জেনে এসব নিষিদ্ধ দ্রব্য বক্ষণ করে। কিন্তু ঈমানদারদের হালাল খাবার ব্যাপারে সর্তক হওয়া একান্ত বাঞ্চনীয়। সৌভাগ্যের বিষয়, এখানকার নিষ্ঠাবান অনেক মুসলমানই ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন।
 
আগস্ট মঙ্গলবার
আমেরিকা ধনীদের দেশ। আয়তনের দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। রাশিয়া এবং ক্যানাডার পরেই এর স্থান। কিন্তু অর্থনৈতিক শিল্পোন্নয়নের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্থান এক নম্বরে। যুক্তরাষ্ট্রের মোট আয়তন ,৮২৬,৬৩০ বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যা ৩০,৭১,১২,০০০ এবং বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৪৬,৮৫৯ ডলার। পৃথিবীর এত বড় ধনী দেশ এখানকার একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক বিলিয়নীয়ার হওয়া সত্ত্বেও দরিদ্র, নিঃস্ব এমন কি ভিক্ষুকের  দেখাও পাওয়া যায় এখানে। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় ভিক্ষুক আছে, একথা অনেকের নিকট অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু যত অবিশ্বাস্যই হোক, বাস্তবে এখানেও ভিক্ষুক আছে, অনেক নিঃস্ব দরিদ্র লোক আছে। অবশ্য তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান আছে বলে আমার জানা নেই।
এখানে প্রথম যেদিন আমি একজন ভিক্ষুকের সাক্ষাৎ পেলাম সেদিন রীতিমত অবাক হয়েছিলাম। আমেরিকার তৃতীয় বৃহত্তম শহর শিকাগোতে আমি প্রথম একজন ভিক্ষুক দেখলাম। আমি, আমার স্ত্রী, জামাই, মেয়ে নাতি-নাতনি গাড়িতে করে যাচ্ছিলাম। একটি ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে দেখি একজন ভিক্ষুক দাঁড়িয়ে। তার হাতে পিয়ানো। পিয়ানো বাজিয়ে সে পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছে। অবশ্য মুখে সে কিছুই বলছে না, কাপড়ে সাইনবোর্ড  লিখে শরীরে আঁটকিয়ে রেখেছে। তাতে সাহায্যের আবেদন লেখা। বয়স মনে হলো পঞ্চাশোর্ধ। দেখে আমি রীতিমত অবাক! জামাইকে সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলাম, এদেশেও ভিক্ষুক আছে নাকি? সে বলল, হাঁ। তবে আমাদের দেশের মত সবাই রাস্তায় বের হয় না, এখানে অল্পসংখ্যক ব্যক্তিকেই কখনো-সখনো ভিক্ষা করতে দেখা যায়।
আরেকদিন আমেরিকার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শহর আমেরিকার অন্যতম ধনী রাজ্য ক্যানসাসের সিটি মার্কেটে বাজার করে আমি, আমার স্ত্রী ছেলে আবিদের গাড়িতে করে ক্যানসাসের বিখ্যাত আর্ট মিউজিয়াম দেখতে যাচ্ছিলাম। তখন রাস্তার মোড়ে দেখলাম একজন পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তি পিয়ানো হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তারও গায়ে সাহায্যের আবেদনযুক্ত সাইনবোর্ড লেখা। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সে একজন প্রাক্তন  সৈনিক, দরিদ্র, নিঃস্ব বেকার। দয়া করে যেন তাকে কেউ চাকরি দেন অথবা সাহায্য করেন। আমি ভাবলাম, এদেশে সৈনিকদের তো উচ্চহারে বেতন-ভাতা  দেয়া হয়, তাহলে তাকে এভাবে শেষ বয়সে এসে ভিক্ষা করতে হচ্ছে কেন? আবিদের কাছে প্রশ্নটা রাখতেই সে বলল, এখানে চুক্তিতে অনেকেই তিনমাস, ছয়মাস, একবছর, দুবছর বা এরকম স্বল্প মেয়াদের জন্য  সৈন্য বাহিনীতে ঢোকে। সৈন্যবাহিনীতে কাজ করে তখন তারা প্রচুর বেতন-ভাতা পায়। কিন্তু চাকরি ছাড়ার পর অনেকেই বেকার হয়ে পড়ে। আবার অনেকেই মদ খেয়ে নানা রকম অনৈতিক কাজে টাকা উড়িয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এখানে বেকার ভাতা আছে বটে, কিন্তু তা এক বছরের জন্য। সরকার থেকে এক বছরের জন্য বেকার ভাতা দেয়া হয়, সময়ের মধ্যে তাকে  চাকুরি নিতে বা অন্য কোনভাবে স্বনির্ভর হবার চেষ্টা করতে হবে। কারণ অনির্দিষ্ট কালের জন্য বেকার ভাতা দেয়া হলে, বেকাররা কখনও কর্মসংস্থানে উৎসাহী হবে না। তাতে জাতীয় অর্থের যেমন অপচয় হবে , তেমনি বেকার থাকতেও অলস শ্রেণীর লোকদেরকে উৎসাহী করা হবে।  দরিদ্রদের স্বনির্ভর হওয়ার জন্য এটা এক ধরনের প্রণোদনা। কিন্তু এক বছরের মধ্যে যদি কেউ কর্মসংস্থানে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের রাস্তায় নেমে অথবা অন্যভাবে মানুষের কাছে হাত পাতা ছাড়া কোন উপায় নেই।
তৃতীয় আর একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। আইওয়া রাজ্যের সিডার র‌্যাপিডস এর সিটি মার্কেটেও দেখলাম একজন প্রৌঢ় বয়সের লোক পিয়ানো হাতে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গান গাইছে। কেউ দাঁড়িয়ে তার গান শুনছে,  গান শুনে কেউ দয়াপরবশ হয়ে তার হাতে দুএকটি ডলার তুলে দিচ্ছে। আনমনে সে গান গেয়েই যাচ্ছে, আর এদিকে তার পকেটে ডলার এসে জমা হচ্ছে। তবে সবাই যে ভিক্ষাদানে অভ্যস্থ তা মনে হলো না। অধিকাংশ পথচারী আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে যে যার কাজে  চলে যাচ্ছে। তাকে দেখে আমাদের দেশের বাউলদের কথা মনে পড়লো। তারাও তো অনেকেই এভাবেই রাস্তার পাশে লোক জমিয়ে গান গেয়ে পয়সা কামাই করে। আমাদের মত দরিদ্র দেশের ট্রাডিশন আমেরিকার মত ধনী দেশেও সমানে চলছে। আমেরিকার পুঁজিবাদী সমাজ-ব্যবস্থায় বিলিয়নীয়ার যেমন আছে, তেমনি দরিদ্র নিঃস্বরাও রয়েছে। তবে বিলিয়নীয়রদের সংখ্যার তুলনায় নিঃস্ব দরিদ্রদের সংখ্যা হয়ত অনেক কম।
সংখ্যায় অল্প হলেও আমেরিকায় গরীব ভিক্ষুক দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। কোটি কোটি বিত্তবানদের জন্য কি এটা চরম লজ্জা দুর্ভাগ্যের বিষয় নয়? পররাষ্ট্র আক্রমণ করে অবৈধ দখলদারিত্ব কায়েম পৃথিবীতে আধিপত্য বজায় রাখার জন্য প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ডলার যারা খরচ করে তাদের পক্ষে কি স্বদেশের দারিদ্র্র্য দূর করা কোন অসম্ভব ব্যাপার? নৃশংসভাবে মানুষ মারার কাজে অন্যদেশ, জনপদ ধ্বংস করার কাজে তারা যে টাকা খরচ করে তার শতকরা একভাগ টাকা খরচ করলেই নিজ দেশের অসহায় মানুষদের দারিদ্র্য তারা অতি সহজেই দূর করতে পারে। কিন্তু চরম বস্তুতান্ত্রিক পুঁজিবাদী সমাজ-ব্যবস্থায় এধরনের চিন্তার অবকাশ কোথায়?
দারিদ্র্য-বিমোচনে শুধু টাকা নয়, চাই বিবেকের তাড়না, মানবিকবোধের উন্মেষ। তাদের সে শুভবুদ্ধির উদয় হবে কবে? সারা বিশ্বে গণতন্ত্র মানবাধিকারের মুখরোচক সওদা নিয়ে ফেরি করে বেড়ানোর আগে তাদেরকে স্বদেশে মানবাধিকার পুরাপুরি প্রতিষ্ঠা করার দিকে অধিক মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। কারণ দারিদ্র্য-বিমোচন মানবাধিকারের এক নম্বর শর্ত। কিন্তু আমেরিকার পুঁজিবাদী সমাজ-ব্যবস্থায় দরিদ্র নিঃস্ব লোক থাকলেও, তাদের দাবি তেমন সোচ্চার নয়। ফলে আমাদের দেশে যেমনকেউ খাবে, কেউ খাবে না, কেউ শোবে দশতলায়, কেউ শোবে গাছ তলায়ইত্যাদি জাতীয় শ্লোগান শোনা যায়, রাস্তায় মিছিল বের হয় কিংবা কবিতার ভাষায় নানাভাবে তাদের দাবি উচ্চারিত হয়, এখানে সে ধরনের কিছুই দেখা যায় না। কারণ এদেশের শতকরা নিরানব্বই ভাগ বা তারও বেশি সংখ্যক মানুষ অঢেল প্রাচুর্য্যরে মধ্যে জীবনযাপন করে। মদ খেয়ে, নাইটক্লাবে ফূর্তি করে, জুয়া খেলে, কিছুদিন পর পর ল্যাটেস্ট মডেলের গাড়ি কিনে এবং এখানে-ওখানে ভ্রমণ করে তারা অঢেল পয়সা উড়ায়। এমনকি, কুকুর-বিড়ালের ভরণ-পোষণ যত্ন-আত্তিতেও তারা বছরে ১২/১৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করে। চরম বস্তুবাদী সমাজের বিবেকহীন, মানবতাহীন সমাজে শুভ বুদ্ধির কোমল অনুভূতিগুলো কঠিন পাথরের আস্তরণে ঢাকা পড়ে যায়।
 
আগস্ট, বুধবার
আমেরিকায় আইনের দৃষ্টিতে ধর্ম-বর্ণ-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে সমান। লেখাপড়া, স্বাস্থ্য-সেবা, চাকরি-বাকরিসহ সমাজের সর্বক্ষেত্রে সকল মানুষের সমানাধিকার। অবশ্য বাস্তবে বর্ণ-বৈষম্য, নারী-পুরুষের বেতন-ভাতা প্রাপ্তি ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখনো কিছু কিছু বৈষম্য দ্বন্দ্ব-সংঘাত পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু সেটাকে কেউ প্রকাশ্যে স্বীকার করতে চায়না এবং আপাত দৃষ্টিতে আইনকে সবাই মান্য করে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ মানুষকে অনেকটা বিবেকবান, সুশৃংখল সহনশীল করে তোলে। একারণে জাতি হিসাবে আমেরিকা একটি সভ্য উন্নত দেশ হিসাবে গণ্য হয়ে থাকে।
এদেশে সহশিক্ষা চালু থাকায় ছেলে এবং মেয়ে উভয়েই খোলামেলা চলাফেরা করে অভ্যস্থ। স্কুল জীবনেই তাদের পরস্পরের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়, অনেক সময় প্রেমের বন্ধনেও আবদ্ধ হয়ে পড়ে। কর্মক্ষেত্রে এবং পরবর্তী জীবনেও ধারা অর্থ্যাৎ জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাদের একসাথে  মেলামেশা হাত ধরাধরি করে চলতে দেখা যায়। ফলে দাম্পত্য জীবনে অবিশ্বাস সন্দেহ সকলের মনেই বাসা বাঁধে। দাম্পত্য-কলহ বিবাহ-বিচ্ছেদ এখানে একেবারেই সাধারণ ব্যাপার। এজন্য ছেলেমেয়েদের রক্ষণাবেক্ষণ পরিচর্যায় অনেক বিপত্তি ঘটে। মা-হারা, পিতৃস্নেহ বঞ্চিত শিশুরা অনেকেই মনস্তাত্ত্বিক বিকারগ্রস্ততার শিকার হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে এখানকার সমাজ-চিত্র ঠিক রকম ছিল না। যুদ্ধের সময় এখানে ব্যাপকহারে  কর্মক্ষম যুবকদের বাধ্যতামূলকভাবে সেন্যবাহিনীতে যোগদান করতে হয়। ফলে অফিস-কারখানায় সর্বত্র কাজের লোকের অভাব দেখা দেয়। সময় নারীরা ব্যাপকহারে অফিসে, কারখানায় বাইরের সবরকম কাজে নিযুক্ত হয়। যেসব মেয়ে আগে প্রধানত গৃহকর্মে নিয়োজিত থাকতো, প্রয়োজনের তাগিদে যুদ্ধের সময় তারা বিভিন্ন অফিস, কারখানা, সরকারী-বেসরকারী কাজ-কর্ম এমনকি অস্ত্র-নির্র্মাণ কারখানাতেও কাজ করা শুরু করে। এভাবে ধীরে ধীরে গৃহকর্মের বাইরে নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি প্রাধ্যান্য পরিলক্ষিত হয়। যুদ্ধের সময় তারা যে বাইরে এসেছে, তারপর আর তাদের ঘরে ফেরা হয়নি। যুদ্ধের পর অনিয়িমিত সৈন্যরা যখন দেশে ফিরে আসে, তখন দেখা যায়, অফিস-আদালত-কারখানায় কোথাও তাদের চাকরি নেই। হঠাৎ করে এতগুলো লোকের কর্ম-সংস্থান করা সহজ ব্যাপার ছিলনা। ফলে আমেরিকায় এক অভূতপূর্ব বেকার সমস্যা দেখা দেয়। যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। সমস্যা সমাধানে ১৯২০ সনে তৎকালিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার এক বিপ্লবী দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বিশাল দেশের উত্তর-দক্ষিণ পূর্ব-পশ্চিম লম্বালম্বি সমান্তরালভাবে সুপ্রশস্ত অসংখ্য হাজার হাজার মাইল দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণ করে। এগুলোকে বলা হয় হাইওয়ে। হাইওয়েগুলো যেমন সুপ্রশস্ত তেমনি অন্য রাস্তা থেকে কিছুটা উঁচু। বৃষ্টি বা বন্যাÍ পানিতে যাতে তা কখনো ডুবে না যায়, সেজন্য ব্যবস্থা। হাইওয়েতে কোন ক্রসলাইন নাই, এখানে গাড়ি নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে না পৌঁছা পর্যন্ত কখনো থামতে হয় না
হাইওয়ে নির্মাণের বিশাল কর্মকান্ডে হাজার হাজার বেকার মানুষকে কাজে লাগানো হয়। প্রায় চার-পাঁচ বছর ধরে রাস্তা নির্মাণের কাজ চলে। এরফলে যেমন লক্ষ লক্ষ বেকারের কর্ম-সংস্থান হয়, তেমনি ব্যাপক অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতির এক নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হয়। সারা দেশের সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক উন্নয়ন সাধিত হয়। সড়ক-ব্যবস্থা উন্নয়নের সাথে সাথে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এক অভাবিতপূর্ব উন্নয়নের জোয়ার সৃষ্টি হয়।
এভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সারা বিশ্বের জন্য অভিশাপ বয়ে আনলেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা শাপে বর হয়ে দেখা দেয়।
 
আগস্ট বৃহস্পতিবার
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন কয়েকদিন আগে আফ্রিকার কঙ্গোতে সফরে গিয়ে সেদেশের সরকারের প্রতি দেশকে দুনীর্তিমুক্ত করার আহ্বান জানান। নীতিগতভাবে এটা খুবই ভাল কথা এবং প্রত্যেক দেশের সরকার জনগণের জন্যই তা গ্রহণ করা বাঞ্চনীয়।
দারিদ্র্য মানুষের জন্য এক চরম অভিশাপ। দুর্নীতির কারণে দারিদ্র্য দ্রুত প্রসার লাভ করে। তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য অনুগ্রসরতার মূলেও দুর্নীতি মূলত দায়ী। যেসব দেশ বর্তমানে দরিদ্র দেশ হিসাবে পরিচিত, সেসব অনেক দেশই আসলে সম্পদের দিক দিয়ে দরিদ্র বা নিঃস্ব নয়। তাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রাকৃতিক, খনিজ, বনজ অন্যান্য সম্পদ সর্বোপরি বিপুল পরিমাণ মানব-সম্পদ রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত সে সম্পদের সদ্ব্যবহার হয় না। অনেক সময় সে সম্পদের সদ্ব্যবহারের নামে বিভিন্ন দালাল শ্রেণীর লোক, সরকারী আমলা, মন্ত্রী-মিনিস্টার এমনকি বিদেশী এজেন্টগণ উন্নয়নের নামে দেশী আন্তজার্তিক সাহায্য তহবিলের টাকা কৌশলে এমনভাবে বানরের পিঠা ভাগের মত লুটপাট করে নেয় যে, ফলে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তেমন একটা হয় না। উপরন্তু  বৈদেশিক সাহায্যের টাকা জনগণের মাথার উপর ঋণের বোঝা হয়ে চেপে বসে। এভাবে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে প্রাপ্ত বৈদেশিক সাহায্যের নামে প্রাপ্ত ঋণের টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দরিদ্র দেশের জনগণের উপর তা জগদ্দল পাথরে পরিণত হয়। ঋণ-দাতারা তখন ঋণের টাকা চায় না, শুধু বাৎসরিক সূদের পরিমাণ আদায়ে বেশি আগ্রহী হয়। এভাবে দেখা যায়, শুধু সূদের টাকা পরিশোধেই ঋণ-গ্রহীতা দেশের জাতীয় আয়ের একটা বিরাট অঙ্ক ব্যয় হয়। সুদের টাকা শোধ করতে নতুন করে ঋণ নিতে হয়। ঋণ নেয়া ছাড়া তখন গরীব দেশের আর কোন উপায় থাকে না। ফলে ঋণদাতারা নিজেদের শর্তে অধিক সুদে ঋণ দেয়। এভাবে গরীব দেশ ঋণের ফাঁসে এভাবে আটকে পড়ে যে, সে ফাঁসের রশি ছিড়ে মুক্তি পাবার আর কোন উপায় থাকে না। দরিদ্র দেশের ঋণগ্রস্ততার মূলে সে দরিদ্র দেশের দুর্নীতিপরায়ণ সরকার, এক শ্রেণীর আমলা, পুঁজিপতি, কনট্রাকটর, দালাল-ফরিয়া ঋণদাতা গোষ্ঠীর ধূরন্দর এজেন্টগণ-যারা সকলে মিলে গরীব দেশের জনগণের নামে নেয়া ঋণের টাকার সিংহভাগ লুটপাট করে খায়, তারাই প্রধানত দায়ী।
এছাড়া তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশের প্রায় সকল ক্ষেত্রে দূর্নীতি এভাবে বাসাা বেঁধেছে যে, সমাজ-দেহকে তা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। সেসব দেশের একশ্রেণীর আমলা সুযোগ-সন্ধানী স্বার্থ-লোলুপ মানুষ সম্পদের বাহাড় গড়ছে, অন্যদিকে দেশের সাধারণ জনগণ দারিদ্র্যের নিমর্ম কষাঘাতে নিষ্পেসিত হচ্ছে।
আমেরিকা-ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর বিশ্বের-দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকা প্রকাশ করে থাকে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই প্রতিষ্ঠানের শাখা আছে। সেসব শাখার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের দুর্ণীতির একটি খতিয়ান  তৈরি করা হয় এবং আমেরিকার হেড অফিসের মাধ্যমে যথাযথ পর্যালোচনার পর তা একযোগে প্রকাশ করা হয়। জরিপ অনুযায়ী ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সন পর্যন্ত একাদিক্রমে পাঁচ বছর বাংলাদেশ বিশ্বের এক নম্বর দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসাবে চিহ্নিত হয়। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত সোমালিয়া কঙ্গোসহ আফ্রিকার অনেকগুলো দেশ বরাবর তালিকায় শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। ফলে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন সঙ্গতভাবেই কঙ্গোকে দুর্নীতিমুক্ত হবার আহ্বান জানিয়েছেন। আহ্বানে সাড়া দিলে নিশ্চয়ই কঙ্গোরই এতে কল্যাণ হবে। তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশই দরিদ্র। দুর্নীতি তাদের  দারিদ্র্যের মূল কারণ। তাই দুর্নীতিমুক্ত হলে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র জনগণ অবশ্যই দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারে।  শুধু দারিদ্র্যমুক্ত নয়, উন্নত দেশে পরিণত হওয়াও তাদের পক্ষে সম্ভব। মালয়েশিয়া এর উৎকৃষ্ট নির্দশন।
অবশ্য যেসময় ক্লিনটন কঙ্গোকে দারিদ্র্যমুক্ত হবার আহ্বান জানালেন সে সময়টিতে দুর্ভাগ্যবশত তাঁর নিজের দেশের অভাবিতপূর্ব দুর্নীতির খবর বিশ্ববাসীকে চরমভাবে হতাশ হতবাক করেছে। ১৯০৮ সন অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের ক্ষমতায় থাকার শেষ বছরে আমেরিকা পৃথিবীর সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসাবে রেকর্ড করেছে বলে অনেক অর্থনীতিবিদের ধারণা। এখানকার দুএকজন অর্থনীতিবিদ অভিজ্ঞ ব্যক্তির সাথে আলোচনা করে বিষয়টি জেনে আমি নিজেও হতবাক হয়েছি।  আমেরিকার ইতিহাসে সর্বাধিক নিন্দিত প্রেসিডেন্ট হিসাবে সমালোচিত জর্জ বুশ মুষ্ঠিমেয়  উগ্র খ্রীস্টান প্রভাবশালী ইহুদী লবীর প্ররোচনায় কেবল আফগানিস্তান ইরাককে ধ্বংস করে এবং মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র ইসলামি মৌলবাদ জঙ্গিবাদের ধূয়া তুলে মুসলমানদেরকে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত করে তাদেরকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে তাই নয়, নিজের দেশেও চরম অর্থনৈতিক বির্পযয় সৃষ্টি করেছে।
জর্জ বুশের আক্রমণাত্মক বিধ্বংসী নীতির ফলে আজ বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি হয়েছে, তার ফলে বিশ্বের সব দেশই যেমন আতঙ্কগ্রস্ত, আমেরিকার জনগণও তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকে রেহাই পায়নি। অবশ্য সববিষয়ে অযাচিত উপদেশ খয়রাত করা মোড়লী করা যাদের অভ্যাস, সে আমেরিকা তার লজ্জা ঢাকার জন্য বছর বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশসমূহের তালিকা প্রকাশে বিরত রয়েছে। ফলে বিশ্ববাসী আমেরিকার কলঙ্কের ইতিহাস অফিসিয়ালী জানার সুযোগ পাবে না। তাছাড়া, এটা জানলে বিশ্বের যেসব ধনী দেশ ধনী ব্যক্তি আমেরিকায় টাকা লগ্নী পুঁজি বিনিয়োগ করে, তারা হয়ত হতাশ হয়ে তা প্রত্যাহার করে নিতে পারে, সেজন্য ঢাক-ঢোল পিটিয়ে আমেরিকা তার কলঙ্কের ইতিহাস ধামা-চাপা দেয়ার প্রয়াস পেয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশসমূহ সেসব দেশের  অসংখ্য ধনী ব্যক্তি আমেরিকায় বিপুল পরিমাণ টাকা লগ্নী করে। সেসব দেশ ব্যক্তিরা যদি একসাথে তাদের টাকা প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে আমেরিকার অর্থনীতি চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এমনকি, এককালে আমেরিকানরা যে চীনকে বৈরী দেশ মনে করত, বর্তমানে সে চীনে  উৎপাদিত বিভিন্ন প্রকার দ্রব্য-সামগ্রী আমেরিকার বাজার এমনভাবে সয়লাব করে দিয়েছে যে, চীনের সাথে বাণিজ্য-ঘাটতি পুরণে আমেরিকাকে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই বিভিন্ন কারণে আমেরিকা তার দুর্বলতার বিষয়গুলো ধামাচাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
আমেরিকার অর্থনীতিকে প্রেসিডেন্ট বুশ এমন বিপর্যস্ত অবস্থায় রেখে যায় যে, নতুন প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন।  ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথে তিনি আমেরিকার বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য তাড়াহুড়া করে ৭০০ বিলিয়ন ডলারের এক রেসকিউ প্লান (জবংপঁব চষধহ) ঘোষণা  করেন। ফলে যেসব ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান চরম সংকটে পড়ে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে গিয়েছিল, ধীরে ধীরে সেগুলো আবার চাঙ্গা হয়ে উঠতে শুরু করে এবং আমেরিকার অর্থনীতিতে অচিরেই তার শুভ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়। প্রেসিডেন্ট ওবামার ক্ষমতা গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সূচকসমূহ আগের নেতিবাচক অবস্থা থেকে ইতিবাচক হয়ে ওঠে।
প্রেসিডেন্ট বুশের শাসনামলের শেষ বছরে দুর্নীতির ফলে আমেরিকার অনেকগুলো ব্যাংক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান একযোগে বন্ধ হবার উপক্রম হয়, এর মধ্যে কয়েকটি নিজেদেরকে যথারীতি দেউলিয়া ঘোষণা করে। দেউলিয়া ঘোষণা করার মূলে দেখা যায়, সকল ব্যাংক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মালিক বড় বড় কর্তাব্যক্তিগণ একযোগে বর্ধিত হারে বেতন-ভাতা-বোনাস-লভ্যাংশ ইত্যাদির নামে এক একজন মোটা অংকের টাকা তুলে নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে। ফলে সেসব  ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান চরম লিকুইডিটি ক্রাইসিসে পড়ে। দেউলিয়া ঘোষণা করার ফলে শেয়ারহোল্ডারগণ সব ফতুর হয়েছে, জমাকারীদের কোটি কোটি টাকা উধাও হয়ে গেছে। শেয়ারহোল্ডার জমাকারীদের মধ্যে হায় হায় রব উঠেছে। অর্থনীতির চালিকা-শক্তি হিসাবে যারা কাজ করে, সেসব প্রতিষ্ঠান বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় আমেরিকার অর্থনীতিতে ধস নামে এবং সামগ্রিকভাবে সেখানে এক  চরম মন্দাভাবের সৃষ্টি হয়। এখানে একটি বিশেষ বিপর্যস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করা হলো।
নিউইয়র্কের একটি নামকরা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিক বার্নাড লরেন্স বেনি ম্যাড্ফ, যিনি বেনি ম্যাডফ নামেই বেশি পরিচিত, তার একটি অর্থ-লগ্নীকারক প্রতিষ্ঠান ছিল। তিনি বড় বড় বিত্তবান পুঁজিপতিদের সাথে কারবার করতেন। ছোট বা অল্প টাকার মালিকদের তিনি পাত্তাই দিতেন না। এভাবে তিনি তার প্রতিষ্ঠানকে একটি বিত্তশালী অভিজাত প্রতিষ্ঠান হিসাবে সর্বমহলে পরিচিত করেন। উচ্চবিত্তরাও সহজেই  তার প্রতিষ্ঠানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে টাকা জমা রাখে। মুলত তার নিজের কোন পুঁজিই ছিল না। তার কাছে যারা টাকা রাখতো তা থেকেই তিনি অন্যদেরকে ধার দিতেন এবং লগ্নীকৃত টাকা থেকে যে মুনাফা বা সুদ পেতেন তা থেকে লগ্নীকারীদের সুদের টাকা পরিশোধ করতেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বুশের আমলে ২০০৮ সনে চরম অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হলে সব লগ্নীকারকগণ একসাথে তাদের জমাকৃত টাকা প্রত্যাহার করতে চাইলে বেনি ম্যাডফ নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেন। পরে তাকে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করা হয়। তার স্ত্রী ছেলেমেয়েরাও আদালতে তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়। লগ্নীকারীদের  মোট পাওনা দাঁড়ায় ৬৫ মিলিয়ন ডলার। প্রতারণার দায়ে  কোর্ট তাকে মোট ১৭০ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করে ১৫০ বছরের জেল দেয়। জরিমানার টাকা আদায় করার মত অবস্থা না থাকায় তাকে আজীবন জেলের ঘানি টানতে হবে। কিন্তু তিনি জেলে পচে মরলেও লগ্নীকারীগণ তাদের লগ্নীকৃত টাকা তো আর কখনও ফেরত পাবে না।
এভাবে আরো কয়েকটি ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে পড়ে। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, জেল-জরিমানাও হয়েছে, অনেকে ফেরার রয়েছে। কিন্তু তাতে জমাকারী শেয়ারহোল্ডারদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার তো আর ফেরত পাবার কোন উপায় নেই। তাছাড়া, অনেকে হাউজিং লোন নিয়ে বাড়ি-ঘর না করে সে টাকা ব্যাংকের কর্মচারীদের সঙ্গে যোগ-সাজসে মেরে দিয়েছে। অনুরূপভাবে ব্যবসার নাম গন্ধ নেই, অথচ ব্যবসার নামে লোন নিয়ে অথবা অন্যকোন নামে লোন নিয়ে তা মেরে দেয়া হয়েছে। এভাবে ২০০৮ সনে বুশের আমলে আমেরিকার অর্থনৈতিক প্রায় সকল সেক্টরে আর্থিক জালিয়াতি, দুর্নীতি নানা ধরনের বিশৃংখলার ফলে আমেরিকা সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসাবে চিহ্নিত হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় পুঁজিপতি, ব্যাংক ইনস্যুরেন্স কোম্পানীর মালিক একশ্রেণীর উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিগণ ফুলে ফেপে অধিকতর বিত্তবান হলেও সাধারণ মানুষ, জমাকারী শেয়ারহোল্ডারগণ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে আমেরিকার অর্থনীতির চাকা থেমে যায়, বেকার সমস্যাও বড় আকার ধারণ করে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও মুখ থুবড়ে পড়ে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, এর ফলে বিভিন্ন ব্যাংক, অর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রাইভেট সেক্টরের প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ লোক বেকার হয়ে পড়ে। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। আমেরিকার অর্থনীতি প্রায় অচল হয়ে পড়ে। পৃথিবীর সর্বাধিক বড় অর্থনীতির যখন এরূপ দৈন্যদশা, তখন বিশ্বের অন্যান্য দেশেও কমবেশি এর প্রভাব পড়ে। আমেরিকার সাথে যেসব দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেশি গভীর, যেসব দেশে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া অধিকতর প্রবল হয়ে দেখা দেয়।
প্রেসিডেন্ট ওবামার ক্ষমতা গ্রহণের পর যুক্তরাষ্ট্রের বিপর্যস্ত অর্থনীতি নতুন প্রশাসনের জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দেখা দেয়। বুশের আমালে আফগানিস্তান ইরাক আক্রমণ এবং সেখানে অবৈধ অনৈতিক যুদ্ধে  ইতিহাসের নিষ্ঠুরতমপোড়ামাটি নীতিঅবলম্বন করার ফলে সারা বিশ্বে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। খোদ আমেরিকায় পেট্রোলের দাম সত্তর সেন্ট থেকে ক্রমানয়ে বেড়ে চার ডলারে উন্নীত হয়। বাজারে অন্যান্য দ্রব্য-সামগ্রীতেও এর প্রভাব পড়ে। ফলে জীবনযাত্রার খরচ অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পায়। এর অনিবার্য পরিণতি হিসাবে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয় এবং বিশ্ব-বাজারে ডলারের মূল্য ক্রমাগত হ্রাস পেতে শুরু করে। ডলারের মূল্য হ্রাসে সারাবিশ্বের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, বিশেষত যেসব দেশের মুদ্রা ডলারের হারের সাথে সংযুক্ত, তাদের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ছাপ পড়ে। বিশ্বব্যাপী মানুষের মধ্যে চরম হতাশা অস্থিরতা দেখা দেয়। আমেরিকার সাধারণ মানুষ এর যথার্থ প্রতিশোধ গ্রহণ করে ২০০৮ সনের নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থী বারাক হোসেন ওবামাকে জয়যুক্ত করার মধ্য দিয়ে। ওবামা যুক্তরাষ্ট্রে পরিবর্তন আনার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। আমেরিকার জনগণ মনে-প্রাণে সে পরিবর্তন চেয়েছিল এমন কি, সারা বিশ্বের বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের অগণিত মানুষÑযারা বুশের পাশবিক নির্যাতন, গণহত্যা, সত্যতা ধ্বংস, দমননীতি অযাচিত মোড়লিপনায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলÑতারাও আমেরিকার সাধারণ মানুষের সাথে একাত্মতা পোষণ করে। ইতঃপূর্বে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সারা বিশ্বে এভাবে কখনো আলোড়ন সৃষ্টি এবং কোন একটি বিশেষ দলের প্রার্থীর প্রতি সমর্থন লক্ষ্য করা যায়নি। এটা এবার প্রথম পরিলক্ষিত হলো এবং এর দ্বারা বোঝা যায়, বিশ্ব অর্থনীতি রাজনীতির এখন অনেক মেরুকরণ হয়েছে বৃহৎ শক্তিবর্গ অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র দরিদ্র দেশগুলোর উপর নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে।
প্রেসিডেন্ট ওবামা ক্ষমতা গ্রহণের পর দ্রুততম সময়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধে যে সাত কোটি ডলারের রেসকিউ প্লান ঘোষণা করেন এবং অর্থনীতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য অন্যান্য যেসব কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তার দ্বারা তিনি আমেরিকার সমূহ বিপর্যয় রোধ করে মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই মানুষের আস্থা বিশ্বাস ফিরিয়ে আনেন। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি আজ কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াত তা কে জানে ? এটা ওবামার জন্য ছিল একটি বড় রকম চ্যালেঞ্জ। অনেকে বিশেষত ওবামা-বিরোধীদের ধারণা ছিল, নতুন প্রেসিডেন্ট এত বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে অক্ষম। কিন্তু আমেরিকার সৌভাগ্য, ওবামা অত্যন্ত সাহসিকতা দূরদৃষ্টিসহকারে কঠিন চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করেন এবং বলতে গেলে আমেরিকার সমূহ অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধে সক্ষম হন।
আমেরিকায় যে কতভাবে দুর্নীতি হয়, তার হিসাব নেই। তৃতীয় বিশ্বের যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্টকমার্কেটে নিরাপদ ভেবে মুনাফার আশায় বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রাখে বা লগ্নী করে, অনেক সময় আমেরিকার ধুরন্ধর পুঁজিপতি ব্যবসায়ীগণ কৌশলে স্টকমার্কেটে কৃত্রিম ধস সৃষ্টি করে সেসব অর্থ বেমালুম গায়েব করে দেয়। শত শত কোটি ডলার এভাবে মুহূর্তে হাওয়া হয়ে যায়। অনেক সময় যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য মেনে না নেয়ায় নানা অজুহাতে তৃতীয় বিশ্বের দুর্বল রাষ্ট্রের উপর নিষেধাজ্ঞা (ঊপড়হড়সরপ ঝধহপঃরড়হ) জারি করে। এভাবে যেসব দেশের উপর ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, আইন করে সেসব দেশের সরকারি ব্যক্তিগতভাবে লগ্নীকৃত টাকা বাজেয়াপ্ত করে, যা নৈতিকতার দৃষ্টিতে চরম অন্যায়, অবৈধ বর্বরোচিত। শক্তির জোরেই তারা দীর্ঘকাল ধরে ধরনের অন্যায়, অবৈধ বর্বরোচিত কর্মকান্ড চালিয়ে আসছে।
আমেরিকা ধনীদের দেশ। ধনীরা এখানে সর্বক্ষেত্রে প্রভাবশালী। দেশের সরকারও সব সময় ধনীদের স্বার্থরক্ষায় তৎপর। অন্যথায় সরকারের গদি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারের উপর প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে ধনীরা বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে। দুর্ভাগ্যবশত ধনী শ্রেণীর মধ্যে ইহুদীরা বিশেষ প্রভাবশালী। আমেরিকায় ইহুদীরা সংখ্যায় অতি নগণ্য, এমনকি মুসলমানদের তুলনায়ও তাদের সংখ্যা অনেক কম। কিন্তু অর্থ-বিত্ত-প্রপাগাণ্ডা মেশিনারী ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে ইহুদীরা সংঘবদ্ধ অত্যন্ত শক্তিধর। আমেরিকার সংবাদপত্র, রেডিও-টিভি, ব্যাংক-বীমা কোম্পানী, স্টকমার্কেট ইত্যাদি সবখানেই তাদের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। এসবের মাধ্যমে তারা যেমন আমেরিকার জনমতকে প্রভাবিত করে, আমেরিকার সরকারকেও তেমনি, নাকে রশি দিয়ে ঘুরাবার চেষ্টা করে। আমেরিকার সাধারণ মানুষ প্রভাবশালী ধনীদের কাছে অনেকটা অসহায়। তবে প্রেসিডেন্ট ওবামার নির্বাচনের সময় থেকে আমেরিকার অধিকার-বঞ্চিত কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়, নতুন ইমিগ্রান্টস সাধারণ মানুষ আজ যেভাবে জেগে উঠেছে এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে সজাগ হয়েছে, সেটাকে আগামী দিনের সামাজিক বির্বতনের এক তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত বলে মনে করা চলে। অবশ্য প্রতিক্রিয়াশীল আধিপত্যবাদী ধনিক-বণিক শ্রেণী, মুষ্ঠিমেয় উগ্র খ্রীস্টান সম্প্রদায় বিশেষ সুবিধাভোগী ইহুদীরা তা অতটা সহজে মেনে নেয় কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।

⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN

🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.