আলিফ লায়লা : আরব্য রজনী_পর্ব-৬৫


ইংরেজি অনুবাদ : ডঃ জে. সি. মারদ্রুস
বাংলা অনুবাদ : ক্ষিতিশ সরকার
 
দুশো ষোলতম রজনী :
আবার সে গল্প শুরু করে :
এতক্ষণ অবাক বিস্ময়ে এই দৃশ্য সে প্রত্যক্ষ করছিলো। এবার সে উঠে দাঁড়ালো। আবার বাগানের ভিতরে এসে দাঁড়ালো। খুনী পাখীটার কাছে। পেটের নাডিতুডি সব বেরিয়ে পড়েছে। কি বীভৎস দৃশ্য। চোখে দেখা যায় না। হঠাৎ কামার-আল-জামানের বুক দুলে ওঠে। পাখীটার পেটের নাডির্ভুডির মধ্যে লাল রঙের কি যেন একটা বস্তু ঝকমক করছে। আরও একটু কাছে আসতেই পরিষ্কার দেখতে পায়, বন্দরের সেই গ্বহরত্ন পাথরখানা। কামার-আল-জামানের মাথাটা বৌ করে ঘুরে ওঠে। কোনও রকমে বসে পড়ে সে পাথরখানা তুলে নিয়ে শক্ত মুঠিতে চেপে ধরে। ভাবখানা, আবার যদি কেউ ছিনিয়ে নিয়ে পালায়। কোন রকমে টলতে টলতে দেহখানা টেনে নিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ে।
বেশ কিছুক্ষণ পরে নিজেকে সহজ স্বাভাবিক করতে পারে কামার আল-জামান। নতুন একটা কার বেঁধে নিজের গলায় পরে নেয় পাথরখানা। আল্লাহ আমার দুঃখ ব্যথা বুঝেছেন। তাই তিনিই আমাকে ফেরৎ দিয়ে দিলেন। আর আমার কোনও দ্বিধা নাই। এবার আমি বদরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারবো। বদর-আমার চোখের মণিআমার কলিজা।
কামার-আল জামানের চোখ বেয়ে নামে জলের ধারা। পাথরখানায় বার বার চুমু খায় সে। ভাবে, না, এভাবে গলায় ঝুলিয়ে রাখা ঠিক হবে না। তাতে লোকের নজর লাগবে। গলা থেকে খুলে একখানা রেশমী রুমালে ভালো করে জড়িয়ে বাঁ হাতের বাহুতে তাগার মতো করে বাঁধে।
বৃদ্ধ মালী বলেছিলো, জ্বালানীর কাঠ নাই। বাগানের মধ্যে একটা মারা গাছ আছে। ওটা কাটা দরকার। তার গায়ে এখন তেমন শক্তি নাই, কুড়ুল চালাতে পারে। অথচ শহরের সব মানুষ কোথায় ছন্নছাড়া হয়ে পালিয়েছে। একটা জনমজুরও পাওয়া যায় না।
জামান বলেছিলো, তার জন্যে আপনি কেন চিন্তা করছেন, চাচা। আমি তো আছি, হতে পারি। সুলতানের ছেলে, তা বলে কি শরীরে তাগদ নাই? নিজেদের কাজ নিজেরা করবো তাতে লজ্জা কিসের। আপনি কিছু ভাববেন না, বিকেলে আমি কেটে দেবো আপনার গাছ।
জামান একখানা কুঠার হাতে নিয়ে আবার বাগানের ভিতরে আসে। মরা গাছটার গোড়ায় কুঠারের কয়েক ঘা মারতেই ঝন ঝন করে একটা আওয়াজ বাজে। ঠিক যেনকোনও লোহার পাতের উপর আঘাত করলে যেমন শব্দ হয়, তেমনি। মাটি আর পাথরের টুকরো সরাতেই চোখে ফেললো সে। একটা সিডি নেমে গেছে মাটির নিচে। শাহজাদা জামান-এর আর তাঁর সয় না। সিডি বেয়ে নিচে নেমে যায় সে। দশটা ধাপ নামার পর সে দেখতে পায়, একটা বিরাট পাতালপুরীর গুহা। গুহার সামনে খোদাই করে লেখা আছে আদি এবং থামুদের নাম আর সোল তারিখ। জামান ঝুকে পড়ে দেখলো, গোটা কুড়ি ইয়া বড় বড় তামার জ্বালা। ভিতরে ঢুকে একটা জ্বালার ঢাকনা তুলে দেখতে পেলো, সোনার মোহরে ঠাসা। আর একটার ঢাকনা খুললো। সেটাতে সোনার তাল। এইভাবে সব কটা জালারই সে মুখ খুলে দেখলো, দশটায় মোহর আর দশটায় সোনার তাল- ভর্তি।
শাহজাদা অবাক হয়ে ভাবে। এত বিশাল ধন-দৌলত মাটির তলায় গচ্ছিত রেখে এখানকার সুলতানরা দেহ রেখেছে। এখন শহর বিদেশী ম্লেচ্ছদের কবলে। তারা সন্ধান পেলে এখুনি ছিনিয়ে নিয়ে চলে যাবে। জামান উপরে উঠে এসে গর্তটার মুখ ব্রোঞ্জের পাতখানা দিয়ে ঢেকে মাটি চাপা দিয়ে বাগানের এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে ফুলের গাছে জল দিতে থাকে।
সন্ধ্যার প্রাক্কালে মালী ফিরে আসে। আজ তার মুখ হাসিতে ভরা। সুখবর আছে বাপজান, খুব শিগ্গিরই আপনি দেশে ফিরে যেতে পারবেন। আমি একটা জাহাজের কাপ্তেনের সঙ্গে কথা বলে এলাম। তিনি আপনাকে এবনী দ্বীপ অবধি নিয়ে যেতে পারেন। সেখান থেকে হামেশাই খালিদানের জাহাজ ছাড়ে। এবনী পৌঁছতে তিন দিন লাগবে। তারপর ওখান থেকে খালিদানের জাহাজে চেপে বসবেন। বাস, একেবারে দেশে পৌঁছে যাবেন।
জামান আনন্দে লাফিয়ে ওঠে, চমৎকার। এদিকেও একটা সুখবর আছে, চাচা। অবশ্য আপনি এখন এই দুনিয়ার ভোগ লালসার অনেক ঊর্ধ্বে চলে গেছেন। সংবাদ আপনাকে হয়তো পুলকিত করবে না। আসুন আমার সঙ্গে।
জামান বৃদ্ধকে সঙ্গে নিয়ে সেই মরা গাছতলায় এসে দাঁড়ায়। মাটি সরিয়ে ব্রোঞ্জের পাতখানা সরিয়ে গর্তের নিচে নেমে গেলো দুজনে।
এই সময় রজনী অতিক্রান্ত হতে থাকে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।
দুশো উনিশতম রজনীর দ্বিতীয় প্রহরে আবার সে গল্প শুরু করে :
কুড়িটা জালা ভর্তি সোনার মোহর আর সোনার তাল দেখে বৃদ্ধের চোখ ছানাবড়া হয়ে ওঠে। কী সর্বনাশ! এত ধনদৌলত দিয়ে মানুষ কি করে বাবা?
জামান বলে, কেন, ভোগ করে। এগুলো সব আপনার। যে কটা দিন বাঁচেন দুহাতে দেদার খরচাপাতি করে ওড়ান।
না। বাবা, এসবে আমার কোনও লোভ নাই। জঞ্জাল অশান্তিই বাড়ায়। আজ বাদে কাল মরে যাবো। এখন আর ভোগবাসনার দরকার নাই আমার। আপনার এখনও কচি বয়স। অনন্ত ভবিষ্যৎ পড়ে রয়েছে সামনে। আপনি ওগুলো নিয়ে যাবেন, বাবা। আমার অভাব আছে সত্যি, কিন্তু দৌলতের দেমোক আমার সহ্য হয় না। আপনি বরং যাবার আগে গোটা কয়েক পয়সা দিয়ে যাবেন। একখানা কফিন কিনে রাখবো। আমার মরার পরে যাতে ওরা ওই কাপড়ে জড়িয়ে কবর দেয়। সেই আমার যথেষ্ট পাওয়া হবে।
জামান বলে, কিন্তু অর্ধেকটাও যদি আপনি না নেন, আমিও কিছু নেব না। বৃদ্ধ বলে, যা ভালো বোঝেন করুন।
কামার আল-জামান সারা রাত ধরে গোটা কুড়ি কাঠের বাক্স বানায়। হাতে বাঁধা বদরের গ্বহরত্নটার দিকে তাকায়। নাঃ, এই অমূল্য রত্ন এমন ভাবে হাতে বেঁধে রাখা ঠিক না। একটা বাক্সের নিচে পাথরটা সযত্নে রেখে তার উপর সোনার মোহর ঢেলে দেয়। প্রায় ভর্তি হয়ে এলে উপরে কতক গুলো জলপাই দিয়ে ডালা এটে দেয়। লোকে ভাববে। ফলের বাক্স। এই ভাবে সব বাক্স গুলো সোনার তাল আর মোহরে ভর্তি করে ডালা এটে দেয়। প্রথম বাক্সটার ওপরে এক টুকরো চামড়া এঁটে দিয়ে চিহ্ন রাখেএইটায় আছে সেই গ্বহরত্ন পাথর খানা। তারপর প্রতিটি বাক্সের গায়ে স্পষ্টাক্ষরে লিখে দেয় জামানের নাম-ধাম। বৃদ্ধ মালীকে বলে, চাচা, খুব ভোরে আপনি জাহাজের খালাসীদের কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে আসবেন। তারা না এলে এই ভারি বাক্স নিয়ে যাবে কে?
বৃদ্ধ বলে, আপনি কিছু ভাববেন না, মালিক। আমি ভোরেই তাদের ডেকে আনবো।
জামান তখন যাত্রার আয়োজনে ব্যস্ত। বৃদ্ধ মালীর জ্বর এসেছে তা সে বুঝতেই পারলো না। মালীও কিছু বললো না। সারারাতে জ্বর আরও বাড়তে থাকে। মালী। কিন্তু জামানকে কিছু বলে না। আহা বেচারী, কতকাল দেশ ছাড়া, এতদিন বাদে একটা আশার আলো দেখা গেছে, এই শুভ সময়ে নিজের অসুখের কথা বলে তার মন খারাপ করে দিতে চায় না সে। জীবনে তার কবে অসুখ করেছিলো মনে পড়ে না। আজ সে বুঝতে পারে, যাবার ডাক পড়েছে।
খুব ভোরে উঠে বৃদ্ধ চলে যায় বন্দরে। কুড়িজন খালাসীকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসে। জামান ওদের বাক্সগুলো দেখিয়ে বলে, ভালো জাতের দামী জলপাই আছে বাক্সগুলোয়। দেখ, ভাই, একটু যত্ন করে নিয়ে গিয়ে জাহাজে নামাবে। আছড়ে দিয়ে ফেলো না, তা হলে সব যাবে। তোমাদের যা ন্যায্য ইনাম তার চেয়ে অনেক বেশিই দেব আমি।
খালাসীদের সর্দার সেলাম ঠুকে বললো, ঠিক আছে, হুজুর। আপনি বেশি দেরি করবেন না। তাড়াতাডি জাহাজে চলে আসুন। মনে হচ্ছে, কাল সকাল নাগাদ হাওয়ার নিশানা আমাদের পথের দিকে ঘুরে যাবে। হাওয়া পেলে আমরা আর অপেক্ষা করবো না। সঙ্গে সঙ্গে পাল তুলে দেব, হুজুর। তাই বলছি, আপনি তাড়াতাডি জাহাজে চলে আসুন।
জামান বললো আমার জন্য তোমাদের জাহাজ ছাড়তে এক পলকও দেরি হবে না। সর্দার। আমি একটু বাদেই আসছি, তোমরা যাও।
খালাসীরা বাক্সগুলো মাথায় নিয়ে চলে গেলো।
এই সময় রাত্রি শেষ হয়ে আসে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।
দুশো বাইশতম রজনী:
আবার কাহিনী বলতে থাকে সে। বৃদ্ধ মালীর ঘরে ঢুকে দেখে জুরে ঠক ঠক করে কাঁপছে সে। চোখ মুখ কেমন পাণ্ডুর হয়ে গেছে। জামান কাছে এসে মাথায় হাত রাখে, সেকি, আপনার এত জুর-কখন এলো।
কিছু না বাবা, আপনি তৈরি হয়ে জাহাজে চলে যান।
আপনি এই জ্বর গায়ে খালাসী ডাকতে গিয়েছিলেন অতটা পথ হেঁটে?
তাতে কি হয়েছে বাবা। এতদিন বাদে একটা জাহাজ পাওয়া গেলো, কত আনন্দের কথা। তার জন্য আমার কী কষ্ট। আপনি রওনা হয়ে যান বাবা। আমার কোনও অসুবিধে হবে না। আর তা ছাড়া আজ বাদে কাল তো তার কাছে যেতেই হবে। ডাক যত তাড়াতাডি আসে ততই उछव्।
জামান বলে, আপনি সব কথা ভাববেন না। আমি কিছু টোটকা জানি! গাছগাছড়ার রস করে আপনাকে খাইয়ে দিচ্ছি। আজ রাতেই আপনার জ্বর ছেড়ে যাবে।
কিন্তু কিছুতেই কিছু ফল হলো না। রাত যত বাড়ে জুরও তত বাড়তে থাকে। সারারাত ধরে জামান বৃদ্ধের পাশে বসে শুশ্রুষা করে। কিন্তু নিয়তির লেখা কেউ এড়াতে পারে না। ভোর হতে না হতেই বৃদ্ধ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলো।
কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো জামান। এতদিন তার স্নেহছায়ায় সে কাটিয়েছে। আজ দেশে ফিরে যাওয়ার সময় সে- আগে চলে গেলো।
নিজে হাতে কবর খুঁড়ে জামান তাকে যথাবিহিত রীতি অনুসারে সমাহিত করলো। বেলা তখন অনেক। সূর্য মাথার উপরে এসে পড়েছে। এতক্ষণ জামানের অন্য কোনও দিকে খেয়াল ছিলো না। আজ সকালে যে তার জাহাজজছাড়ার কথা, তাও তার মনে ছিলো না। এবার খেয়াল হলো সময় উৎরে গেছে। হাওয়ার নিশানা ফিরেছে। হয়তো বা জাহাজটা ছেড়েই চলে গেছে।
হন হন করে সে হেঁটে চলে সমুদ্রের ধারে। কিন্তু হায়, বড় দেরি হয়ে গেছে। সমুদ্র-সৈকতে সে যখন পৌঁছল জাহাজ তখন মোঝ দরিয়ায় পাল তুলে দিয়ে তাঁর তরী করে বয়ে চলেছে।
একরাশ হতাশা আর দুঃখ চেপে বসলো তার বুকে। ক্লান্ত-অবসন্ন দেহখানা টেনে নিয়ে ফিরে এলো সে বাগানে। এখন এই বাগিচা এই ছোট্ট বাড়িখানা সবই তার দখলে। ঘরে গিয়ে বিছানায় পড়ে অঝোর নয়নে কাঁদতে থাকে জামান, এমনই তার দুর্ভাগ্য, বদরকে সে আর ফিরে পাবে না। বন্দরের পাথরখানা পেয়েও সে আবার হারালো।
কামার আল-জামান বুঝতে পারে, এই অজানা অচেনা বিদেশে বেঘোরে তাকে প্রাণ হারাতে হবে। অথবা কতকাল এই নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে হবে কে জানে। জামান মনে মনে ভাবে, পাথরটা হারাবার সঙ্গে সঙ্গেই দুৰ্ভাগ্যও তার পিছনে লেগেছে। যখন ওটা ফিরে পাওয়া গেলো, ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়ে উঠলো। কিন্তু আবার সে হাতের নাগালের বাইরে চলে গেলো। না জানি এখন তার ভাগ্যে কি বিপদের খাড়া ঝুলছে। এখন মেহেরবান আল্লাহর দেয়া ছাড়া কোনও ভরসা নাই।
বাজারে গিয়ে কুড়িটা বাক্স কিনে আনলো জামান। জালার অর্ধেকটা সোনা সে বৃদ্ধিমালীর জন্য সেই গুহার মধ্যেই রেখে দিয়েছিলো। প্রতিটি বাক্সের অর্ধেকটা মোহর আর সোনার তাল- ভর্তি করে, বাকী অর্ধেক জলপাই সাজিয়ে ডালা এটে দিলো।
মনে মনে আশা করতে থাকলো, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুখ তুলে চাইবেন! দু-একদিনের মধ্যেই একটা জাহাজ তিনি পাঠাবেন।
এরপর আবার সে আগের মতো বাগানের টুকিটাকী কাজকর্ম ফুলের গাছে জল দেওয়ার কাজে নিজেকে ডুবিয়ে দিলো। বাকী সময় বদর-এর বিরহে গান গেয়ে গেয়ে কাটায়।
পালের হাওয়া অনুকূলে ছিলো। জাহাজখানা তার তর করে বয়ে এবনী দ্বীপের বন্দরে এসে ভিড়ে নোঙর ফেলা হলো।
বন্দর-সর্দার বদরকে খবর পৌঁছে দিলো, একটা জাহাজ এসে ভিড়েছে। জাহাজে কুড়িটা বাক্স আছেপ্রতিটি বাক্সে কামার আল-জামানের নাম লেখা!
আনন্দে বদর-এর বুক দুরু দুরু করে। এতদিন পরে তাঁর প্রিয়তম স্বামী ফিরে এসেছে! দরবারের পদস্থ কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে সে জাহাজে এলো। কাপ্তেনকে একান্তে ডেকে মৃদুকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো, কামার আল-জামান কোথায়?
কাপ্তেন বললো, তিনি জাহাজে নেই। তার আসার কথা ছিলো, কিন্তু কেন জানি না, আসেন নি। আমরা তার জন্যঅনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিলাম। জাহাজ ছাড়ার কথা ছিলো খুব সকলে, শুধু তীর জন্যেই আমরা অনেক দেরিতে ছেড়েছি।
বদর জিজ্ঞেস করে কী ধরনের সওদা আছে জাহাজে?
কাপ্তেন বলে, নানা দেশের সুন্দর সুন্দর সূতী আর রেশমী কাপড়, কাজ করা মখমল, চমৎকার সব দেখতে সেকেলে এবং আধুনিক ঢংএর ছবি আঁকা কাপড়। চীনা এবং ভারতীয় দাওয়াই পত্র, হীরা, মুক্তা, নানা জাতের সুগন্ধী আন্তর, নানা রকম ফুলের নির্যাস, কপূর আর আছে কয়েক বাক্স উৎকৃষ্ট জাতের জলপাই, -ভারি সুন্দর খেতে।
রাত্রি শেষ হয়ে আসে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।
দুশো পাঁচশতম রজনী :
আবার সে বলতে শুরু করে।
বদর কাপ্তেনের ফর্দ শুনতে শুনতে বাধা দিয়ে বলে, আমি জলপাই- কিনতে চাই কিছুটা। কতটা আছে।
কাপ্তেন বলে, কুড়িটা বাক্স।
সবগুলো বাক্সতেই কি একই ধরনের জলপাই আছে।
তা বলতে পারবো না। তবে মনে হয়, ভিন্ন ভিন্ন বাক্সে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের জলপাই- থাকতে পারে।
বদরের জিভে জল এসে যায়। বলে, আমি একটা বাক্স কিনতে চাই। ஜி হুজুর। যে মালিকুসু জাহাজ ধরতে পারেনি। অবশ্য জীহাপনা যদি ইচ্ছে প্ৰািজ করেন তবে যা খুশি নিয়ে যেতে পারেন।
খালাসীদের সে হুকুম করলো, এইজলপাই-এর বাক্সগুলো সব এদিকে নিয়ে আয়।
তৎক্ষণাৎ বাক্সগুলো সামনে এনে রাখা হলো। কপ্তেন একটা বাক্সের ডালা খুলে জলপাই-এর চেহারা দেখালো।
বদর আনন্দে লাফিয়ে ওঠে, আমি সবগুলো বাক্সই কিনবো। বাজারে কি দাম হতে পারে?
আপনার দেশে জলপাই-এর খুব চাহিদা, জাঁহাপনা। আমার মনে হয় এক একটা বাক্স একশো দিরহাম হবে।
বদর তার এক কর্মচারীকে বললো, প্রত্যেকটা বাক্সের জন্য এক হাজার দিরহাম করে ইনাম দিয়ে দাও কাপ্তেনকে।
বদরের পিছনে পিছনে খালাসীরা বাক্সগুলো মাথায় নিয়ে জাহাজ থেকে নামে। বদর কাপ্তেনকে উদ্দেশ্য করে বলে, ফলের মালিক এর সঙ্গে দেখা হলে দামটা তাকে দিয়ে দিও।
প্রায় ছুটতে ছুটতে বদর হায়াতের কাছে আসে। বাক্সগুলো সব নিয়ে আসা হলো হারেমে।
দুখানা রেকবী। এনে দিলো বাদীরা। একটা বাক্সের ডালা খোলা হলো। টসটসে পাকা জলপাই। পাকা সোনার মত রং।দাসীরা খোস ছিলে ছিলে রেকবী সাজিয়ে দিতে থাকে। কিন্তু কি অবাক কান্ড, জলপাই গুলোর গায়ে সোনার গুড়ো মাখামাখি হয়ে আছে। মুখে দিতে গিয়েও নামিয়ে রাখে বন্দর। বলে, অন্য দুখানা রেকবী নিয়ে এসো। আর একটা বাক্স খোলো।
সে বাক্সটাও খুলে দেখা গেলো। সেই একই অবস্থা। তখন বন্দর হুকুম দেয়, সব বাক্স খুলে সব জলপাই ঢেলে দেখ।
এক এক করে সবগুলো উপুড় করে ঢালা হতে থাকে। সোনার তাল আর সোনার মোহর গুলো দেখে তো সবারই চোখ ছানাবড়া! একি তাজ্জব কান্ড। সব শেষের বাক্সটা যখন উপুড় করা হলো, বদর চিৎকার করে ওঠে, একি ব্যাপার! আমার এই দৈব পাথরখানা। এর মধ্যে এলো কি করে?
হলুদবৰ্ণ জলপাইগুলোর মধ্যে লাল রঙের গ্বহরত্নখানা জুলজুল করে জুলছে। হাঁয়া, হ্যাঁ, এই পাথরখানাই একটা করে বাধা ছিলো তার কোমরে। বদর নির্ভুলভাবে চিনতে পারে। আর সে ভাবতে পারে না। মাথাটা কেমন ঘুরে ওঠে। হায়াতের কাঁধে মাথা রেখে বদর চোখ বন্ধ করে থাকে।
কিছুক্ষণ পরে নিজেকে সামলে নিয়ে মাথা তুলে দাসী বাঁদীদের চলে যেতেইশারা করে। দৈব পাথরখানা তুলে নিয়ে চুমু খেয়ে হায়াৎকে বলে, জািন হায়াৎ, এটা কী?
হায়াৎ কিছুই বুঝতে পারে না। বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। বদর বলে, মন্ত্রপুতঃ দৈব পাথর। এই পাথরখানা যেদিন খোয়া যায়। সেই দিনই আমার স্বামীকেও হারিয়েছি আমি। আজ আবার ফিরে পেলাম। তুমি দেখে নিও, সে- এবার ফিরে আসবে আমার কাছে। আবার আমাদের জীবনে বসন্তের ফুল ফুটবে, হায়াৎ।
জাহাজের কাপ্তেনকে ডেকে পাঠালো বন্দর। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে এসে কুর্নিশ জানালো, বদর জিজ্ঞেস করে, এই ফলের মালিককে তুমি চেন? সে কোথায় থাকে? কী করে। সে কি এখানকার আদি বাসিন্দা?
কাপ্তেন বলে, তা তো বলতে পারবো না, হুজুর। তবে এটুকু জানি তিনি ওখানকার একটা বাগানের বৃদ্ধমালীর সঙ্গে থাকেন। আমার জাহাজে তার আসার কথা ছিলো। কিন্তু সময়মতো তিনি এসে পৌঁছতে পারেন নি। আমি জাহাজ ছেড়ে চলে এসেছি।
বদর বললো, বেশির ভাগ জলপাইই বেশ টসটসে পাকা। খেয়ে দেখেছি, ভারি মিষ্টি। কিন্তু মুসকিল হয়েছে, আমার বাবুৰ্চিটা কদিন হলো বেপাত্তা হয়ে গেছে। লোকটা কাজ জানে ভালো, কিন্তু বড় কামাই করে। এখন এমন সুন্দর জলপাইগুলো ভালো করে বানানোর মতো লোক নাই। বদমাইশটা ফিরে আসুক, তারপর তাকে এমন শায়েস্তা করবো, বাছাধন জীবনে বদমাইশটা ফিরে আসুক, তারপর তাকে এমন শায়েস্তা করবো, বাছাধন জীবনে ভুলতে পারবে না। কিন্তু সে তো পরের কথা, এখন লোক অভাবে এই সুন্দর জলপাইগুলো সব নষ্ট হয়ে যাবে যে। তুমি এক কাজ কর, আজই জাহাজ ছেড়ে চলে যাও। যে-ভাবে পার ফলওয়ালাকে এখানে ধরে নিয়ে এসো। যদি আমাকে খুশি করতে পোর, অনেক ইনাম পাবে, আর যদি না পোর তবে আর কোনও দিন আমার বন্দরে জাহাজ ভেড়াতে পারবে না; এই বলে দিলাম। আর যদি আমার কথা গ্রাহ্য না করে জাহাজ ভেড়াও, তোমার গর্দান যাবে। শুধু তোমার না তোমার জাহাজের সঙ্গী-সাথী সক্কলের।

⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN

🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.