বিভোর বেদনার শ্রাবণ ।। রওশন রুবী

 
মাসখানেক পার হতে চললো রেশন বন্ধ, গতবছর থেকে এব্যবস্থা চালু হওয়ায় কিছুটা শ্বাস ফেলতে পারছিলো জলোচ্ছাসের কবলে পড়ে সর্বহারা বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে বেড়ে উঠা হাসমত গ্রাম। পদেপদে বাঘ, বন্যপ্রাণী, ঝড় জলোচ্ছাসের ভয় তাদের। কাঠকেটে, মৌচাক ভেঙে, মাছ ধরে এরা জীবন ধারণ করে পূর্বপুরুষদের মতো,  ইদানিং কেউ কেউ ইটের ভাটায়ও কাজ করছে। এদের কাছে বিলাসিতা শব্দটি অচল মুদ্রার মতো, আহারের জন্য মোটা ফর্দ নিয়েও বাজারে দৌড়া দৌড়ি নেই। গোলপাতা বাঁশ কাঠ দিয়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু করে ঘর তৈরি করে এরা দূর্যোগের কথা ভেবেই। এরা স্বভাবজাত ভাবেই সরল রোখা। গ্রামবাসী অপেক্ষা করে হাফিয়ে উঠেছে, ওদের পেটে কাকের মতো ক্ষুধা নোংরা ডাস্টবিনে নিয়ে ফেলতেও দ্বিধা করছেনা। রেশন বন্ধে ভীষণ চিন্তায় পড়েছে বলে বসে নেই কেউই, কিছু না কিছু করে এই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থায় টিকে থাকছে। গ্রামের মানুষগুলো গ্রামপ্রধানের কাছে গিয়ে কোন ফয়দা পায়নি। শুধু ফাঁকি বাজির কথাবার্তা, বলেআরে এই একটু রেশনে জন্য মরে যাচ্ছো নাকি? সবুর করো, সবুরে মেওয়া ফলে, রেশন চালুর আগে কি তোমরা চলোনি? না খেয়ে মরেছো? এখন বেড়ালের মতো অলস হয়েছো সবাই? ” ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললোবড় কর্তা দিন বাদেই যে ঈদ, বউ, পোলাপানগুলার মুখের দিকে তাকাতে পারছিনা, একটা ব্যবস্থা করুন কর্তা...” খেকিয়ে উেঠলেন গ্রাম প্রধানকে! কে! কার এতো বড় স্পর্দা ! সামনে আয় দেখি বেকুব!” পুরো সভা স্তব্দ হয়ে গিয়েছিলো। সব উপর ওয়ালাদের মুখে এমন বুলি শুনে অসহায় মানুষগুলো বুঝে এরা একঘাটের মাঝি, গরিবের সুখ দুঃখের ছিটেফোঁটা দাম নেই এদের কাছে। দশটাকা দরে চাল দেবে বলে কিছু কার্ড করা হয়েছে, সেই কার্ডে অনেক স্বচ্ছল পরিবারের নাম ডুকিয়েছে,  এখন শুনা যাচ্ছে এগুলো বাছাই হচ্ছে, বাছাই এরপর যাদের কার্ড হয়ে আসবে তারাই পাবে। এখবরে দুঃশ্চিন্তার শেষ নেই পাকিয়া বেগমের, ঘরের মানুষটার শরীরে গ্রামপ্রধানের মতো গেড়ে বসেছে কুষ্ঠের ঘা, তার উপর বাতের ব্যথায় আজ দুদিন ডান পা বোধহীন, সে পায়ে সন্ধ্যায় শেয়ালের তেল ঘষতে ঘষতে প্রার্থনা করেন আল্লাহ্ গরিবের দিকে চাইয়ো গো।তিন মেয়ে আর দুবছরের এক ছেলে স্বামী নিয়ে অভাবের সংসার, সেই সংসার থেকে পাঁচশত টাকা দিতে পারেননি বলে হানিফ প্রধান রেশনের অর্ধেক কেটে নিতো টাকা বাবদ, এতোমাস পেরুনোর পরও কার্ড হাতে না পেয়ে বড় অস্থির লাগছে, এই লোকগুলা লোভের নেকড়ে, এদের লোভের কোন শেষ নেই, কি জানি আর কি চেয়ে বসে তারপর।
 
পাকিয়া বেগম সেহেরি খেয়ে ঘুমান না, রমিজ মিয়ার ইটের ভাটায় কাজ করতে যায় বড় মেয়ে রাবেয়াকে নিয়ে, ওখানে শ্রমিকরা রোজা থাকতে পারে না বলে প্রতিবছর প্রথম রমজান থেকে কাজ বন্ধ রাখলেও এবছর পারেননি কি বিশেষ কারণে। এখন রান্নার করার জন্য ছুটছেন মা মেয়ে, দুদিন পর চাঁদরাত, সেইদিন থেকে ঈদের ছুটি দিবেন পাঁচদিনের, কর্মচারিরা মাসের শ্রম বেচে কাজ শুরু করে জন্য সেসময় ঈদবোনাস ছাড়া বেতন পায় না। পাকিয়া রাঁধুনি বলেই ওর মসিক বেতনে কাজ, মেয়েরও তাই। বেতন বোনাসসহ দুজনে প্রায় চার হাজার টাকা পাবে। ফিতরা যাকাতের টাকাও চেয়েছেন মালিকের কাছে, গরিবের অভাবে স্বভাব নষ্টের বলে নয়, ঘরের বিমর্ষ ছাউনিটার পরির্তনের জন্য। দূর্যোগে বারবার ঘর ভাঙলেও ঘরের টান পালাতে দেয় না, ঠিক করতে হয় মাথা গোজার জন্যই। দাউ দাউ ¦লছে চুলা ভর্তি আগুন। গরম তেল, ভাতের বুটবুট, হাড়িপাতিলের ঠোকাঠুকি সব মিলে বিচিত্র রকমের শব্দ নিত্যদিনের মতো শেষ করে কাপড়ের খুঁটে মুখ মুছতে মুছতে দেখেন মাছরাঙার চোখে উঠান ঝাড়রত চৌদ্দবছরের রাবেয়ার বুকের দিকে তাকিয়ে আছে রমিজ মিয়া। পাকিয়ার চোখে চোখ পড়তেই প্রশান্তির হাসি হেসে পরিতৃপ্তির ঢেকুর তোলেআহ্!” মুখে বলেরোজাখান ভাঙাই ফেলবো লাগে তোর মাইয়া, লকলকে হইছে বেশ। তোর ঘরের কাম ধরবি কইছিলি না? ধর, বাড়াই টাড়াই দিবানে কিছু,  দুহাজার টাকা আছে এহন দেহি, সাঁইঝে রাবুরে বাইত পাডাইছ বাকিগুলান দিয়া দিমু।এতোক্ষণ চুলায় ¦লা আগুন এবার ¦লে পাকিয়ার সমস্ত শরীরে, অসংখ্য নদীতে ঝাঁপ দেয় নদী শুকায় তবু আগুন নেভেনা। গরিবের মান অপমান দেখাতে নেই ফলে হিতে বিপরীত হয় তাই পাকিয়া রমিজ মিয়ার হাত থেকে টাকাগুলো নেয়। ফের মনে করিয়ে দেয় রমিজ মিয়াপাডাইচ মনে কইরে।মনেমনে বেকুবের গুষ্ঠি উদ্ধার করে মুখে একদলা থুথু ছিটিয়ে বাড়ির পথ ধরে যখন পাকিয়ারা তখন মাথার উপর গনগনে সূর্য প্রাণঢেলে তাপ দিচ্ছে।
 
বাড়ি ঢুকার পথে দেখে ছোট ছেলে আহাদ পাশের বাড়ির করিমদের গরুর দুধে মুখ রেখে গরুর বাচুরের সাথে দুধ খাচ্ছে, একাজটা প্রায় করতে দেখে আহাদকে তাই বিচলিত না হয়ে কলতলার দিকে গেলো পাকিয়া। গোসলে ঢুকে শাড়িটা কেঁচে রাবেয়াকে দিলো শুকাতে, গোসল সারতে সারতে যতটুই শুকাক ফের পরবেন, আসলে ঘরে পরার মতো আর শাড়ি নেই। আধঘন্টা পর আধ ভেজা শাড়ি প্যাঁচিয়ে তিনি বেরুতেই দেখলেন চৌকির খুঁটিতে হেলান দিয়ে জিমুচ্ছে রাবেয়ার বাপ, মুখে শিশুর সরলতা, তার কোলে মাথা রেখে ছোট মেয়ে মিনা ঘুমাচ্ছে, ওর গালে নোনতা জলেরধারার চিহ্ন। ঠিক সেসময় চিৎকারটা একটু দূরের বন থেকে ভেসে এলে কিশোরীর তেজে সেদিকে দৌড়ালেন পাকিয়া বেগম, গিয়ে দেখেন একটি বুনোঝোপের পাশে মাটিতে শুয়ে কাটা গরু মতো চটফট করছে মেঝোমেয়ে তিন্নি, তার আশেপাশের পাতাগুলো যেন ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়েছে, ওর ডানহাতে দুটি দাঁতের চিহ্ন, পাশে কয়েকটি সাপ, কাঁকড়ার গর্ত, মেয়ের কোঁচড়ে কয়টি কাঁকড়াও, তিনি বুঝলেন কাঁকড়া ভেবে তিন্নি সাপের গর্তে হাত ঢুকিয়ে বিপদ ডেকে এনেছে, আঁচল ছিঁড়ে ভীষণ শক্ত করে ক্ষত স্থানের উপরে বাঁধ দিয়ে মেয়েকে কোলে তুলে বাড়ির দিকে ছুটলেন, প্রায় এক কিলো দূরে নদীর ধারে যাযাবররা থাকে, রাবেয়া বারান্দায় ওগলপাতার পাটিটা বিছিয়ে দিয়ে মায়ের নির্দেশে সাপুড়ে ডাকতে ছুটে, সেসময় হানিফ প্রধান এসে একটা হলুদকার্ড বাড়িয়ে বলেনে, তোর মুখের দিকে চাইয়া কামখান কইরা দিছি, তয় এর লাইগা দুহাজার টাকা দিবি নয় তোর লায়েক মাইয়ারে...”  এটুকু বলেই পিচাশের মতো হাসে। ঝড় উঠে পাকিয়া বেগমের ভেতরে, তিনি বুঝতে পারেন না এরা এতো নিচে নামে কি করে? এতোগুলো মাস রেশনের অর্ধেক নেয়ার পরও লোভ শেষ হয়নি। সরকার কি গরিবের পাশে দাঁড়ায় না এই অসুরদের পাশে? এখন পাকিয়া বেগমের মনে হয় এদের মতো অসুরের পাশেই থাকেন, অন্যায় করেও তো এরাই মুক্তি পায়, কই কোন গরিব তো কখনও মুক্তি পায়নি? ওর হাতে থাকা কার্ডটার দিকে তাকিয়ে গলার ভেতর নানান কথাই পাক খায়, তবু কোন কথা না বলে ঘরে থাকা দুহাজার টাকা এনে ওকে দিয়ে কার্ডটি নেয়, জানে এদের চোখ থেকে মেয়েদের রক্ষা করা কঠিন হবে। ওঝা এসে তিন্নির শরীরের বিষ নামিয়ে কিছু লতাপাতার ঔষধ দিয়ে যখন টাকা চেয়ে বসে তখন গা কাঁপতে থাকে পাকিয়া বেগমের, তিনি জানেন ওঝাদের অসন্তুষ্টি হলে তারা উল্টা ঔষধ দেয় যা অন্য কেউ বুঝবে না সে ছাড়া, তখন রোগী হয় মারা যাবে নয় কোন অঙ্গ হানি হবে। মরার উপর ফাঁড়ার ঘা। কি করে ভাবতে ভাবতে রমিজ মিয়ার মুখখান ভেসে উঠলো, তিনি ওঝাকে রেখে ছুটলেন। রমিজ মিয়ার বউ এর সামনে পড়াতে কাইকুঁই করে টাকাটা দিলেও পাকিয়া জানে রমিজ মিয়া আঘাত হানবেই। ঘরের স্বপ্ন মাটি দিয়ে সেদিন সিংহভাগ টাকাই তুলে দিলেন ওঝার হাতে, বাকি টাকায় সবার জন্য জামাকাপড় কিনে ঘরের দরকারী জিনিসগুলো কিনেছেন। সেদিন থেকে রাতে পাকিয়া শুয়ে থাকে ঘুম আসে না, কতো নাদান চিন্তা তাকে খায়। আজ ঈদ নতুন জামাপরে সন্তানরা সেমাই খাচ্ছে, হাসছে ওদের আনন্দ দেখে পাকিয়ার মন ভরে যায়,আনন্দের জল গড়ায় চোখে। সে মুরগির মাংস কসাতে কসাতে বলেনআল্লাহ্ আমরার জীবন থেইকে মুইছে দাও বিভোর বেদনার শ্রাবণ।

⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN

🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

#গল্প
#ছোটগল্প
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#Molakat
#ShortStory
#Story
#Literature
#Bengali_Literature
#রওশন_রুবী

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.