মাঝরাতে বৃদ্ধার ঘুম ভেঙে গেলো। এটা নতুন কিছু নয়। প্রতিদিনকার রুটিন। আর একবার ঘুম ভাংলে ঐ রাতে আর ঘুম আসে না। তখন বৃদ্ধা হয় চলে যান স্মৃতির ভুবনে নতুবা আনমনা হয়ে চেয়ে থাকেন অদেখা অর্থহীন কোন কিছুর দিকে। হয়তো বা ভাবতে থাকেন তার পরবর্তী গন্তব্যের কথা। যে গন্তব্য অবশ্যম্ভাবী। মানুষ যেতে চায় না, তবু সে হার মানে স্রষ্টার নিয়মের কাছে।
বৃদ্ধা হাত বাড়িয়ে শিয়রের কাছ থেকে তার লাঠিটি নিলেন। বৃদ্ধার শরীর তেমন দুর্বল নয়। অনুমান শক্তিও ভালো। লাঠি ঠুকে ঠুকে দরজা পর্যন্ত গেলেন। তিনি কখনো একা একা রাতে বের হন না। প্রয়োজন হলে কেউ সাথে যায়। আজ তিনি কাউকে ডাকছেন না। আসলে তার ডাকতে ইচ্ছে করছে না। তার একাই বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে। দরজায় হাত দিয়ে তিনি ইতস্তত করছেন। তারপর সিটকিনি ধরে নিস্তব্ধে খোলার চেষ্টা করলেন। তিনি সফল হলেন।দরজা খোলার শব্দে কেউ জেগে উঠলো না। বাইরে গিয়ে দরজাটা চাপিয়ে দিলেন। উঠানে নেমে আসতেই তার মনে হলো আজকের এই রাতটির জন্যই তিনি বহু বছর অপেক্ষা করে আছেন। এই রাতটিই দিতে পারে তাকে একটু শান্তি। ভুলিয়ে দিতে পারো যন্ত্রণা।
আকাশে ষোড়শী চাঁদ। তার সমস্ত প্রেম নিঝুম রাতের জন্যে সে উজাড় করে দিচ্ছে। এতটুকু কৃপণতা নেই। রাতের আঁধার দূর করার মধ্যেই চাঁদ খুঁজে পায় নিজ জীবনের স্বার্থকতা। চাঁদের আলোয় বৃদ্ধার সাদা শাড়ি ঝলমল করে উঠলো। লাঠি ঠুকে ঠুকে বৃদ্ধা আস্তে আস্তে হাঁটছেন। উঠান পেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চললেন তিনি। দীঘির পাড়ে এসে গম্ভীরভাবে দাঁড়ালেন। দেখলেন দীঘির শান্ত জলে চাঁদের আলোর খেলা। হঠাৎ একটি ব্যাঙ পানিতে লাফিয়ে পড়লো। ব্যাস তাতেই দীঘির চাঁদ উদ্ভ্রান্তের মতো নাচতে শুরু করলো। পাড়ের নারিকেল গাছগুলোর ছায়া এসে পড়েছে দীঘির জলে। বৃদ্ধা তার বহু বছরের চোখ দিয়ে যেন দেখলেন এক অপূর্ব আলো আঁধারির খেলা । এই দীঘির পাড়েই কত চাঁদনী রাত বৃদ্ধা তার স্বামীর হাত ধরে কাটিয়েছেন । কত জোছনায় ভিজে স্বামীর মুখে শুনেছেন রাজা রানীর কাহিনী। তাদের হাসি খুশি মুখ দেখে চাঁদ হয়তো ভাবতো চিরকাল যদি এদের জোছনা দেয়া যেতো। চাঁদ ঠিকই আলো দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বৃদ্ধার মুখের সেই হাসি আর দেখা যায়নি।
একাত্তরের কোন এক চন্দ্রিমায় বৃদ্ধার স্বামী ঢলে পড়লো মৃত্যুর কোলে। সেদিনও তারা দুজন হাত ধরাধরি করে বসে ছিলো দীঘির পাড়ে । হঠাৎ কয়েকটা পিশাচ (পাকিস্তানি মিলিটারি) এসে আক্রমণ করলো তাদের উপর। স্বামীর হাত থেকে বৃদ্ধার হাতের দূরত্ব বেড়ে গেলো। শোনা গেলো পিশাচের অশালিন ও ভয়ানক হাসি। শোনা গেলো গুলির শব্দ। তীব্্র আর্তনাদ করে বৃদ্ধার স্বামী ঝাঁপিয়ে পড়লো দীঘির জলে। সাথে সাথে শোনা গেলো অজস্র ব্যাঙের লাফিয়ে পড়ার শব্দ । সারা দীঘির পানি লালাভ হয়ে গেলো। তা দেখে চাঁদ হয়তো ভয় পেয়েছিলো। সে রাতেই আকাশ ঢেকে গিয়েছিল ভয়ংকর কালো মেঘে।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে কেমন যেন তন্ময় হয়ে গেলেন বৃদ্ধা। হঠাৎ তিনি একটি শব্দে সচকিত হয়ে তাকালেন চারদিকে। একটি নীরব গোঙানির শব্দ। এ শব্দের মানে তিনি জানেন। এ অনাকাঙ্খিত শব্দ তার কাছে অতি পরিচিত। তার মনে হলো একটি সাপের মুখ গহ্বরে একটি ব্যাঙ কত না যন্ত্রণায় ছটফট করছে। তার মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠলো। বাঁচাতে হবে ব্যাঙটাকে। শব্দের রেশ ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকলেন তিনি। সামনেই পাটক্ষেত। চিকন আইল ধরে সতর্ক পদক্ষেপে পাটক্ষেতের ওপাশে পৌঁছেন তিনি। দেখলেন কয়েকটা পিশাচকে। নৃশংস ধর্ষণ খেলায় মত্ত। বৃদ্ধার শরীর ঘামে ভিজে গেছে। হাঁপাচ্ছেন তিনি। লাঠিটি উঁচিয়ে ধরলেন তিনি। শক্তহাতে। মনে হলো কোন অদৃশ্য শক্তি ভর করেছে তার হাতে। পিটাতে লাগলেন তিনি অবিরামভাবে। যখন থামলেন প্রাণ খুলে হাসলেন। যেনো কোনো এক বিজয়ের হাসি।
হাসি থামিয়ে তিনি দেখলেন রক্তাক্ত এক তরুণীকে। অন্তরে অনুভব করলেন পূর্ব থেকে পশ্চিমে গমন করা প্রচন্ড লাল আগুনের সূর্যকে। যে সূর্যের মতোই রক্তাক্ত আজ প্রতিটি কিশোরী। প্রতিটি তরুণীর দেহ। যে দেহকে কলুষিত করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মতোই কিছু নরপিশাচ। বৃদ্ধার আবার মনে পড়ে সেই রাতের কথা। যে রাতে আকাশ ঢেকে গিয়েছিলো কালো মেঘে। চাঁদ তার ক্ষত বিক্ষত শরীর নিয়ে আর উঠতে পারেনি। তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল সারারাত ধরে। দিনের পর দিন। রাতের পর রাত।
বৃদ্ধা তার সর্বস্ব হারিয়েছেন। লালসবুজ পতাকার মুখে এনেছেন হাসি। বিনিময়ে পেয়েছেন কলংকের অভিশাপ। চাঁদের কলঙ্ক থাকার পরও সবাই তাকেই পেতে চায় । তেমনি বৃদ্ধাও ঐ চাঁদের মতোই বেঁচে থেকে বিলিয়ে দেন আলো ও হাসি। যুগে যুগে তাকে প্রয়োজন হয় মাটি আর মানুষের।
⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN
🔗 MY OTHERS CHANNELS
🔗 FOLLOW ME
🔗 MY WEBSITE
🔗 CALL ME
+8801819515141
🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com
#গল্প
#ছোটগল্প
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#Molakat
#ShortStory
#Story
#Literature
#Bengali_Literature
#রেজা_কারিম
No comments