মানুষ ।। আহসানুল ইসলাম
একটা লোক পড়িমরি করে দৌঁড়ে সরু গলির মধ্যে প্রবেশ করলো করলো। তার পেছনে ক্ষিপ্র গতিতে আরো দু’জন। সম্ভবত প্রথম লোকটিকে ধরার জন্য পেছনের দুজন ছুটে।
আঞ্জু পাগলা সিগারেট ফুঁকে, দৌঁড়ের শব্দ শুনে পিট পিট বরে তাকায়। ঘুম থেকে ওঠার পর তীক্ষè নিয়ন চোখে পড়লে চোখ যেমন জ্বালা ধরে, পাগলার চোখ সব সময় ঠিক তেমনই জ্বালা ধরা। চোখের প্রকৃতি অনেকটা শেষ রাতের আসামানের নিবু নিবু তারার মতো। আসমানের নিবু নিবু দুটো তারা যেন তার কপালে গেঁথে রাখা কিন্তু কখনো কখনো ওই চোখ জোড়াই দারুণ ঝকঝকে হয়ে ওঠে। তবে কখনোই বোঝা যায় না সে আসলে কোন দিকে তাকিয়ে পাগলাকে ঘিরে একটা কুকুর আতিপাতি করে, পাগলা কুকুরটার সঙ্গে কথাবার্তা বলে। কুকুর খুব মনে দিয়ে মাথা নিচৃ করে কথা শোনে।
বিষয়টা এমন, মুরব্বি যেন ছোটকে উপদেশ দিচ্ছে। বড় কঠিন সেই উপদেশ। পাগলা উপদেশ
কুত্তাগো, আমার কথা শোন। কথা হইলো, তুই কিন্তু ইহজীবনে মানুষ হইতে পারবি না।
কুকুর এই কথা শোনে, তার মাথা আরো পাঁচ ইঞ্জি নিচু করে ভীষণ চিন্তা মগ্নভাবে তার মুখে ফুটিয়ে তোলে।
কিছুক্ষণ পর পর পেস্রাব করার কথা ভুলে যায়। এমন (জ্ঞানময়) কথা সে জীবনে শোনেনি, তার কানের ওপর, চোখের পাতার ওপর বিছু মাছি বিরক্ত করছে। মিনিটে মিনিটে বিমানের মতো ফ্লাই করছে আবার ল্যান্ড করছে। কুকুরের চোখ কুঁচকে আসে। কিন্তু এরপরও মাছি তাড়াবার চেষ্টা করে না। মাছি ক্রমেই সাহসী হয়ে ধীরে ধীরে নাকের গর্তের ভেতর প্রবেশ করার স্পর্ধা দেখায়।
ঝট করে পাগলা তার চোখ খুলে, উপদেশ দেয়। কুত্তাগোÑ মন দিয়া কথা হোন। তুই কুত্তাই থাক, কুত্তা অওনেরই চেষ্টা কর।
কুকুর এ কথার কি মানে বুঝলো কে জানো। সে তড়িৎ গতিতে নাকের কাছে আসা দুটো মাছিকে একসঙ্গে মুখে পুরে নেয়। জিহবার পেছন দিয়ে সোজা পেট চালান করে।
পাগলা দীর্ঘ মোচের ফাঁক গালিয়ে হেসে ওঠে। নি:শব্দ রসহীন সৌন্দর্য্য বিবর্জিত হাসি। এই বর্ণহীন হাসিরও একটা মানে দাঁড়িয়ে যায়। যার অর্থ, এই তো কোন প্রাণী খাই না। তোমারা রান্নাবান্না ছাড়াই খাও কারণ তোমরা কুত্তা। আমরা কুত্তা না। মুহূর্তে পাগলা হাসি থামিয়ে কপালে গেথেঁ রাখা তার চোখ দুটো প্রক্ষেপ করে, তার কাছ ঘেষে একটা লোক দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করছে ময়লাযুক্ত খোলা ড্রেনে। আছড়ে পড়া প্রস্রাবে এক ধরনের দুর্গন্ধযুক্ত শব্দ হচ্ছে বুটবাট বুটবাট। সেই শব্দ এবং দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা লোকটার পাশ দিয়ে স্কুলের ছেলেমেয়েরা আসা-যাওয়া করছে। কেউ কেউ পাগলার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকায়। কিন্তু পাগলার কুকুর দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা লোকটার দিকে আশ্চর্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে। লোকটা চলে যাবার পরই কুকুরটা চঞ্চল হয়ে ওঠে।
পাগলা প্রশ্ন করে, কিগো কুত্তা, মুতবানি?
কুকুর চোখ বন্ধ করে মনিবের কথা অবশ্যই পালনীও জেনে, সব কথা না বুঝেই মেনে নেয়।
পাগলা তার ময়লাযুক্ত পুঁটলার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কিছু খুঁজতে থাকে। বহু বছর ধরেই সে কি যেন খোঁজজে নিজেই জানে না।
মুখে গুনগুনিয়ে গান গান। গানটা কুকুরকে নিয়েই।
কুত্তারে তুই এই জগতের আজব কারবার বুঝবি না। কেমনে বুঝবি মানুষ অইয়া আমি তো বুঝি না ...। হঠাৎ করে গান থেমে যায়, থেমে নয় থমকে যায়। গান রেখে নিজের সঙ্গে ভিশস তর্কে লিপ্ত হয়, আচ্ছা আমি কি মানুষ?
কুকুর লজ্জা পাবার মতো চোখ বুজে। পাগলার গা ঘেঁষে সামনের পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে। এই ব্যস্ত শহরে বেওয়ারিশ জীবনের নিরাপত্তা গোছতে মধ্যবয়সি মনিব পেয়ে বড়ই তৃপ্ত। মালিক বড়ই গরিব, ঘর-বাড়ি নেই। সে যতই গরিব হোক, ঘর-বাড়ি না থাক, মনিব সে তো মনিবই। মনিবের খেয়াল খুশি মতো চলতে হয়। মনিব ধ্যনমগ্নতা পছন্দ করে। তাই মধ্যযৌবনের উদ্যমতা বিসর্জন দিয়ে মনিবের মতো ধ্যানমগ্নতা করতে হয়, মনিব প্রকৃতিক কর্মগুলো প্রকাশ্যে করে না। সে বিষয়টাও কুকুর আয়ত্ব করেছে সুচারু ভাবে। পাগলা বিষয়গুলো বুঝতে পেরে টিপ্পনি কাটে, মানুষ অওনের চেষ্টা করোছরে কুত্তা ... ? কিন্তু মানুষ অওন এত সহজ না। এই দেখ, আমরা চান্দের দেশে যাইতে পাড়ি, এমন কি মইংগল দেশেও ... আমরা সব পাড়ি, কিন্তু মানুষ অইতে পাড়ি না।
দুপধাপ শব্দে পাগলা তার অসম্ভব নিবু নিবু চোখ জোড়া খুলে ধরে, শব্দটা ততক্ষণে কুকুরও শুনতে পেয়ে গা-ঝারা দিয়ে দাঁড়িয়ে বুঝার চেষ্টা করছে। পাগলা বুঝিয়ে দেয়, শব্দটা সাভাবিক নয়রে ...
পাগলা প্রশ্ন করে, লজ্জিত কন্ঠস্বর, কিরে কিছু জিগাবি? কুকুর নেতিবাচক শব্দ তোলে, যার মানে, তুমি কি মানুষ? পাগলা কুকুরের প্রশ্নের উত্তর খোঁজে পায় না, সে আসলে কে? সে কি মানুষ? বিষয়টা নিয়ে মহাচিন্তায় পড়ে, হঠাৎ মল্টা মল্টা বলে কেউ ডাকে। কুকুরটা জেল পালানো কয়েদির মতো আতঙ্কিত দৃষ্টিতে খোঁজে, কে ডাকে? তার স্মৃতি উজ্জীবিত হয়ে ওঠে, দ্রুত অডিও ফাইল অপেন হতে হতে মনে পড়ে এই নামে কেউ তাকে ডাকতো এবং মনে পড়ে তার আসল মনিবের কন্ঠস্বর, একজন লোক ভির ঠেলে সামনে আসতেই কুকুর কু-কু শব্দ তোলে সামনের পা দুটো ছড়িয়ে দিয়ে লোকটার পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি শুরু করে, পাগলার সাথে এই জীবনে তার যেন কোন দেখা হয়নি।
প্রধান সড়কে দিনের মধ্যভাগে লাশ দেখতে আসা বহু মানুষের মধ্যে কুকুর তার প্রাক্তন মনিবকে পেয়ে খুশিতে ডগমগ, পাগলার হিংসা হয়। আবার ভেতরে ভেতরে খুশিও হয়। আপদটা চলে গেলে সে মানুষ কি না এ প্রশ্ন আর কেউ করবে না।
কুকুরের প্রাক্তন মনিব, আঙুলে তুড়ি দিয়ে হাঁটা শুরু করে, কুকুরও লোকটার পেছনে পেছনে ছুটতে থাকে। কিছু দূর গিয়ে কি যেন ফেল যাচ্ছে ভেবে পেছনে করুণ দৃষ্টিতে তাকায়, একবার থেমে, আবার তার মনিবের গা ঘেঁসে ছুটে চলে, ঠিক তখন পাগলার মন হাহাকার করে ওঠে, হোক না কুত্তা, তবুও সেই তো ছিল সুখ-দুখের সাথি, অন্তত ঝগড়া বা তর্ক করার মতো একটি সাথীতো ছিলো। দু:খ চাপা দেবার জন্যই, আবারও মানুষ বিষয়ক চিন্তায় মগ্ন হয়, মানুষ নিয়ে গিয়ে কুকুর বিষয় এসে যায় বার বার, আচ্ছা মন আমার। তুমি কও, দুইটা কুকুর মিলে কি অন্য একটা কুকুরকে বধ করেছে? অথবা দুটো কাক মিলে অন্য এক কাক? ওরা পশু, ওরা জানোয়ার বলেই কি স্বজাতি হত্যা করে না? অথচ মানুষ সে কাজটি করে! আমরা কি মানুষ? না মানুষ হবার চেষ্টা করেছি? পাগলা গান ধরে, আবার কান্না করে, আবার হেসে ওঠে, আবার মানুষ বিষয় গান ধরে, ‘আমি মানুষ হবোরে’ সামনে বহু লোকের ভির, কিন্তু মানুষের সংখ্যা শূন্যের কোঠায় ... পাগলার মরু প্রাণ ঠা-ঠা শব্দে কেঁদে ওঠে, পাগলার চোখে তারা ভেজা পানি, পাথড়ের টুকরোর মতো ঝরে পড়ে। এই ক্রন্দন কার জন্য?
‘আমি মানুষ হবোরে, বহু লোক পাগলার গান শুনে ফিরে তাকায়, কারো কারো মনে প্রশ্নের উদয় হয়, কি গান গায় পাগলা, গানের মাত্র একটাই কলি।
আমি মানুষ হবোরে ... একজন কাছে এসে পাগলাকে প্রশ্ন করে, এই পাগলা, তুমি কি গরু নাকি? পাগলা তার ময়লাযুক্ত দাঁত, বিশাল গোঁফের মধ্যে হতে প্রকাশ করে অট্টহাসি দেয়, যে হাসির মানে, মিয়া, তুমি কি মানুষ? লোকটা পাগলার অট্টহাসিতে ভয় পায়। সে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। পাগলা আবারো তার গান ধরে।
‘আমি মানুষ হবোরে’
⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN
🔗 MY OTHERS CHANNELS
🔗 FOLLOW ME
Facebook: facebook.com/molakat
Facebook: facebook.com/afsarnizam
Instagram: instagram.com/molakat
Instagram: instagram.com/afsarnizam
Twitter: twitter.com/afsarnizam
🔗 MY WEBSITE
🔗 CALL ME
+8801819515141
🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com
#গল্প
#ছোটগল্প
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#Molakat
#ShortStory
#Story
#Literature
#Bengali_Literature
#আহসানুল_ইসলাম
No comments