আলিফ লায়লা : আরব্য রজনী_পর্ব-১০২
ইংরেজি অনুবাদ : ডঃ জে. সি. মারদ্রুস
বাংলা অনুবাদ : ক্ষিতিশ সরকার
সুলতান মনে মনে মতলব ভাঁজে। যুবকের এই প্রস্তাবই মেনে নিতে হবে। তার সঙ্গে দ্বন্দ্ব-যুদ্ধে নামা বুদ্ধিমানের কাজ না। বয়সের ভারে সে এখন ক্লান্ত, ’যৌবনের শক্তি এবং সিংহবিক্রমে যখন ভাটা পড়েছে, এ অবস্থায় এই রকম এক নওজোয়ান যোদ্ধার সঙ্গে এক এক লড়াই-এ নামা উচিত হবে না। কিন্তু আমার গোটা সৈন্য-বাহিনীর সঙ্গে সে লড়বে? লোকটা কী পাগল? যাক নিজের নিবুদ্ধিতাতেই সে খতম হবে, কোনও চিন্তা নাই। সুলতান নিশ্চিন্ত হয়ে ভাবে, কাল সকালেই বাছাধনের গর্দান গড়াগড়ি যাবে আমার প্রাসাদ-প্রাঙ্গণে। জাত মান কুল সবই রক্ষা পাবে। সুতরাং এই পথই অনুসরণ করা শ্রেয়ঃ মনে করলেন তিনি।
-ঠিক আছে, আজ রাতটা তুমি যে ভাবে কাটাতে চাও কাঁটাও, আমি কোনও বাধা দেব না। কিন্তু কাল সকালে তোমার মউৎ কেউ রুখতে পারবে না।
সুলতান সদৰ্পে সেখান থেকে নিজের কক্ষে চলে গেলেন। খোজাকে বললেন এখুনি উজিরকে খবর দে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই উৎকণ্ঠিত উজির হাজির হলে, সুলতান তাকে সব ঘটনা খুলে বলে বললেন, আর তিল মাত্র দেরি করবে না, এখুনি যাও, সেনাবাহিনীকে তৈরি হতে বলে। সকালেই তারা যেন আমার প্রাসাদ-প্রাঙ্গণে হাজির থাকে। আমি ঐ উদ্ধত শাহাজাদাকে সমুচিত সাজা দিতে চাই।
উজির আশ্বাস দিয়ে বলে, আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে নিদ্ৰা যান, জাঁহাপনা। যা করার সব আমি করছি। লোকটার নিশ্চয়ই মাথা খারাপ, না হলে গোটা ফৌজের সঙ্গে লড়াই করার কথা বলে। আপনার সৈন্যবাহিনীতে এমন সব জাঁদরেল যোদ্ধা আছে, তাদের একজনের সঙ্গেই সে লড়তে পারবে না, তা আবার গোটা বাহিনী! ছোঃ!
উজির আর কথা বাড়ায় না, আপনি যখন বলছেন, তাই হবে, জাঁহাপনা। উজির সোজা চলে যায় ফৌজ দপ্তরে। সেখানে প্রধান সেনাপতির সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে ব্যবস্থা সব পাকা করে রাখে।
সুলতান শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকেন, ছেলেটি ভারি সুন্দর। যেমন তার রূপ, তেমনি তার বীরের মতো সুঠাম দেহ। আর কী সুন্দর কথা বলার কায়দা। এমন খানদানী ব্যবহার রক্তে না থাকলে রপ্ত করে হয় না। আহা, এমন সুন্দর চাঁদের মতো ছেলেটা যদি তার জামাই হতো, কী-ভালোই না হতো! কিন্তু সবই নসীবের লেখা, তাকে আজ হাতের মুঠোয় পেয়েও চিরদিনের মতো হারাতে হচ্ছে। কাল সকালেই আমার ফৌজদের তলোয়ারের ঘায়ে লুটিয়ে পড়বে তার গর্দান! উফ, ভাবতেও কষ্ট লাগে। কিন্তু উপায়ই বা কী? তার মতো গোয়ার ছেলের এ ছাড়া আর কী পাওনা থাকতে পারে? সে যদি আমার কাছে ক্ষমা চাইতো। না না, তাই বা কী করে সম্ভব? ক্ষমা করাই সে শিখেছে, ক্ষমা চাওয়ার কথা সে ভাববে কী করে? সে তো বাদশাহজাদা!
ভোর না হতেই যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। রণসাজে সজ্জিত হাজার হাজার সৈন্য-সামন্ত এসে প্রাসাদ-প্রাঙ্গণে জমায়েত হতে থাকে।
শাহাজাদা কামার অলকে সঙ্গে নিয়ে সুলতান দরবার কক্ষে প্রবেশ করে তখতে আরোহণ করেন। বান্দাদের হুকুম করেন, এই শাহজাদার জন্য আমার আস্তাবলের সবচেয়ে সেরা তাজা ঘোড়াটা নিয়ে এসে জমকালো যুদ্ধ সাজে সাজিয়ে দে।
সুলতানের এই হুকুম শুনে কামার অল বলো, আমার জন্যে কোন যুদ্ধের ঘোড়া দরকার হবে না।
সুলতান অবাক হয়ে তাকান, তবে কী তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করবে নাকি?
সুলতান আরও অবাক হন, তোমার ঘোড়া? কোথায় তোমার ঘোড়া?
— কোথায় তোমার ঘোড়া? কোথায় রেখে এসেছ?
সারা দরবার কক্ষ ক্ষণ-কালের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। কারো মুখে কোনও কথা সরে না। ছেলেটা বলে কী? সত্যিই ওর মাথার গোলমাল আছে। সুলতান ভাবে, শেষ পর্যন্ত একটা উন্মাদকে হত্যা করে কী সে মহাপাতক হতে যাচ্ছে?
কামার অলকে সঙ্গে নিয়ে সুলতান দরবার ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। হাজার হাজার বর্মশিরস্ত্ৰাণ পরা অসি-বর্শা হাতে সৈন্যসামন্ত জড়ো হয়েছে প্রাসাদের সামনে পোলো-খেলার মাঠে। পুরাভাগে সেনা-বাহিনীর প্রবীণরা ঘোড়ার পিঠে চেপে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে। সুলতান বললেন, এই আমার সমগ্র সেনা-বল। এদের সঙ্গে একা তুমি লড়বে বলে বড়াই করেছ। সে যাক, এখন তৈরি হয়ে নাও। আমার সৈন্যরা প্রস্তুত।
তারপর তিনি তার সেনাপতিদের ডেকে বললেন, এই যুবক এসেছে আমার কন্যাকে শাদী করবে বলে। জামাতা হবার পক্ষে উপযুক্ত পোত্র, সন্দেহ নাই। যেমন এর রূপ-যৌবন তেমন তার সাহস বিক্রম। কিন্তু এ আমার কাছে মাথা নোয়াতে রাজি নয়। বলে, এমনি না দিলে, জোর করে নিয়ে যাবে আমার মেয়েকে। এর ধারণা, আমার এই বিশাল সৈন্য-বাহিনীকে একই জব্দ করতে পারবে। আমি একে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছি, আমার সৈন্যবল অসীম। কিন্তু সেকথা কানেই তুলতে চায় না। এই বীরপুরুষ। যাক, এবার তোমরাই তৈরি হও। এখনই শক্তি পরীক্ষা হয়ে যাবে। একটা কথা, তোমরা সংখ্যায় অনেক, আর এ একা। তোমাদের একমাত্র কাজ হবে, একে প্রতিহত করা—নিহত করা নয়!
কামার অল বলে, কিন্তু সুলতান, একি আপনার আচরণ! আমি মাটিতে দাঁড়িয়ে, আর আপনার সেনাপতিরা ঘোড়ায় চেপে যুদ্ধ করবে? একি মহারথী প্রথা?
কামার আল বলে, আপনার কোনও ঘোড়া আমার প্রয়োজন নাই। আমার নিজের ঘোড়াতে চেপেই আমি লড়াই করতে চাই।
–কিন্তু কোথায় সে ঘোড়া?
–ছাদের ওপরে রাখা আছে? তোমার ঘোড়া?
সুলতান সেনাপতিদের বলেন, যাও তো, দেখে এসো। ছাদের ওপরে ঘোড়া কী করে যেতে পারে! তাজ্জব কি বাত!
একি, সত্যিই তো একটা তাগড়াই ঘোড়া ছাদের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে? কুচকুচে কালো, গা বেয়ে যেন তেল ঝরে পড়ছে এমন চমৎকার ঘোড়া তারা আগে কখনও দেখেনি। সেনাপতিরা আরও নিকটে যায়। কিন্তু একি, এতো একটা কাঠের ঘোড়া-খেলনা মাত্র! সবাই সমস্বরে হো হো করে হেসে ওঠে।
—যুবকটি নিশ্চয়ই এক বদ্ধ উন্মাদ। আহা, হয়তো কোনও সুলতান বাদশাহরই সন্তান। মাথাটা একেবারেই খারাপ হয়ে গেছে। প্রধান সেনাপতি বলে, সবাই মিলে ধরাধরি করে ঘোড়াটাকে সুলতানের সামনে নিয়ে চলো। তামাশাটা তিনি বুঝতে পারবেন।
সেনাপতিরা ঘোড়াটাকে কাঁধে করে নিচে নামিয়ে আনে। সুলতানের সামনে রেখে বলে, সব বুজরুকী, জাঁহাপনা। এটা একটা কাঠের খেলনা ঘোড়া।
রাত্রির অন্ধকার কেটে যায়। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।
চারশো বাইশতম রজনী :
সুলতান থামিয়ে দিয়ে বলেন, থামো, আত্ম গর্বে ফুলে উঠে না। শক্রকে কখনও খাটো করে ভাবতে নাই।
তারপর কামার অলকে উদ্দেশ করে বললেন, এই তোমার ঘোড়া? একটা কাঠের খেলনা? এই দিয়ে তুমি লড়বে আমার এই বিপুল বাহিনীর সঙ্গে?
এই বলে সে ঘোড়াটার দিকে এগিয়ে যায়। তার গলায় হাত রাখে। শুনুন সুলতান, এই কাঠের ঘোড়ায় চেপে আমি আপনার সেনাবাহিনীকে–ডাইনে বাঁয়ে ঘায়েল করতে থাকবো।
সুলতান হাসতে হাসতে বলে, একশোবার। সব বীরপুরুষই তাই করে। শত্রুকে শায়েস্তা করাই বীরের ধর্ম। সেখানে কেউ কাউকে রেহাই দেবার কথা ভাবে না। তুমিও কাউকে রেহাই দেবে না, মনে রেখ, তারাও তোমাকে রেয়াত করবে না।
এরপর কামার অল এক লাফে ঘোড়াটার পিঠে উঠে বসে। হাজার হাজার সৈন্য-সামন্ত, শত সহস্র প্রাসাদ-পুরবাসী নরনারী–সবাই উৎসুক হয়ে তাকিয়ে থাকে ঘোড়সওয়ার কামার অল-এর দিকে। সবাই সংশয়ে দোদুল্যমান। একটা কাঠের ঘোড়া সজীব হয়ে লড়াই করবেএমন তাজ্জব কথা কী-শুনেছ। কেউ? সেই অভাবনীয় অলৌকিক দৃশ্য আজ তারা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করবে। দারুণ কৌতূহলের চাপা গুঞ্জনে প্রাসাদ-প্রাঙ্গণ গমগম করতে থাকে।
তাকে প্রতিরোধ করার জন্য অশ্বারোহীরা আরও সামনে এসে সারিবদ্ধ-ভাবে তলোয়ার বাগিয়ে দাঁড়ায়। একজন নির্দেশ দেয়, যখনই সে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করবে: আর তিল মাত্র অপেক্ষা করবে না তোমরা। ঝোপ বুঝে কোপ মেরে একেবারে সাবাড়ি করে দেবে।
কিন্তু অন্য একজন বলে, ইয়া আল্লাহ, এমন চাঁদের মতো ছেলে, একে আমরা হত্যা করবো কি করে? এমন সুন্দর ফুলের মতো নরম শরীরে খাড়ার ঘা বসাবো কি করে? সারা আরব দুনিয়া টুডিলে এমন সুঠামদেহী সুন্দর সুপুরুষ কটা পাওয়া যাবে?
জিনের ওপর ঠিক হযে বসে, রেকবীতে পা ঢুকিয়ে, লাগাম হাতে ধরে কামার অল আকমর। তারপর ডানদিকের বোতামটায় আঙ্গুল রাখে। অল্প একটু চাপ দিতেই, সকলকে স্তব্ধ বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়ে ঘোড়াটা ঈষৎ কেঁপে উঠে। শো শোঁ করে উধ্বাকাশে উঠে যেতে থাকে। সুলতান, উজির আমির এবং তাবৎ সৈন্যবাহিনীর সকলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাঁ করে চেয়ে থাকে আকাশের দিকে। সকলেরই বাহ্যজ্ঞান তখন লোপ পেয়ে গিয়েছিলো।
স্বল্পক্ষণের মধ্যে সুলতান সম্বিত ফিরে পান। চিৎকার করে ওঠেন। তিনি, পালিয়ে গেলো, পাকড়াও! জলদি–
সেনাধ্যক্ষ শান্ত কণ্ঠে বলে, কিন্তু জাঁহাপনা, ডানাওলা পাখীকে কি তাড়া করে ধরা যায়? সে তো আমাদের তীর বর্শার পাল্লা ছাড়িয়ে অনেক-অনেক ওপরে উঠে গেছে। তাকে পাকড়াও কী ভাবে করা সম্ভব।
সমগ্র সৈন্য-বাহিনী আকাশের দিকে চোখ রেখে দেখতে থাকলো, ঘোড়াটা উঠতে উঠতে এক সময় তীরবেগে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেলো।
উজির বললো, এ কোনও সাধারণ মানুষের কর্ম নয়। নিশ্চয়ই কোনও জিন আফ্রিদি অথবা কোনও যাদুকর। যাক, চলে গেছে, বাঁচা গেছে। আল্লাহ রক্ষা করেছেন।
দুর্বোধ্য এক বিস্ময় নিয়ে সুলতান প্রাসাদের অন্দরে যান। সামস অল নাহারকে সমস্ত ঘটনাটা বিস্তারিতভাবে বলে বোঝাবার চেষ্টা করেন, আসলে সে কোনও মনুষ্যসন্তান নয়, মা। হয় কোনও জিন আফ্রিদি, নয় কোনও যাদুকর।
কিন্তু শাহাজাদী সে কথা বিশ্বাস করে না। অঝোের নয়নেকাঁদতে থাকে। কপাল বুক চাপড়াতে চাপড়াতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। সুলতান তাকে আদর করে শান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করতে থাকেন;।
–আল্লাহকে শত সহস্র ধন্যবাদ জানাও, মা। তিনি আমাদের এই অলৌকিক দৈব-দুর্বিপাক থেকে উদ্ধার করেছেন। কে জানে, তার খেয়াল হলে এক লহমাতে সে আমার গোটা সৈন্যবাহিনীই খতম করে দিতে পারতো। কিনা! লোকটা একটা আস্ত শয়তান, ঠগ, মিথ্যেবাদী, জোচ্চোর, শূয়ার!
—খোদা মেহেরবান, সে আর যদি ফিরে না আসে, এই আমি বলে রাখলাম, আব্ববাজান, নাওয়া-খাওয়া কিছুই আমি করবো না। যতদিন না সে এসে আমাকে গ্রহণ করে, আমি না খেয়ে শুকিয়ে মরবো।
সুলতান ভাবলেন, বৃথাই তাকে সান্ত্বনা দেওয়া। কোনই ফল হবে না। সারা দুনিয়া তার চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে আসতে লাগলো। বিড়বিড় করে কী সব আবোল তাবোল। আওড়াতে থাকলেন।
এই সময় রাত্রি শেষ হতে থাকে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে রইলো।
চারশো তেইশতম রজনীতে আবার সে বলতে থাকে :
বলতে গেলে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বায়ু বেগে ছুটতে ছুটতে, ঘোড়াটা তার নিজের শহর-সীমায় এসে পড়ে। বিরাট একটা চক্কর দিয়ে সে নিচে নেমে পড়ে। একেবারে তার নিজের প্রাসাদের ছাদের ওপর। ঘোড়াটাকে সেইখানেই দাঁড় করিয়ে তরতর করে সে নিচে নেমে যায়-সিডি বেয়ে।
সারা প্রাসাদে তখন কবরের নিস্তব্ধতা। কামার আল বুঝতে পারে না, কেন এই নীরব নিঃঝুম আবহাওয়া! এ-ঘর ও-ঘর সে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু কোথাও কোনও টু শব্দটি নাই। মনে হয় এক নিদারুণ শোকের ছায়া ছড়িয়ে গেছে সর্বত্র। কামার অল ভাবে, নিশ্চয়ই কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে। হয়তো কেউ মারা গিয়েছে। আর ভাবতে পারে না সে। হন হন করে সে তার বাবার একান্ত ব্যক্তিগত কামরায় ঢুকে পড়ে। বাবাকে জীবিত দেখে খানিকটা আশ্বস্ত হয়। সেই একই ঘরে তার মা এবং তিন বোনও শোকে দুঃখে কাতর হয়ে পড়েছিলো। কামার দেখলো, তার মায়ের চোখ থেকে অবিরল ধারায় অশ্রু নিৰ্গত হয়ে চলেছে। বাবা সন্দিগ্ধ চোখে মুখ তুলে তাকালেন। নিজের চোখকে নিজেই তিনি বিশ্বাস করতে পারেন না-এই কী তার কামার অল? কিন্তু তাই বা কী করে সম্ভব! তিনি হয়তো জেগে জেগেই খোয়াব দেখছেন।
–আব্বাজান, আমি কামার অল, আমি ফিরে এসেছি।–হঠাৎ কামার আল-এর আবেগ উচ্ছসিত কণ্ঠস্বরে সারা প্রাসাদ গম গম কর ওঠে। সুলতান সবিস্ময়ে উঠে বসে চোখ রাগড়াতে থাকেন। তাইতো এতো কোনও স্বপ্ন নয়। এ যে তার বুকের কলিজা-কামার আল। বাদশাহ সাবুর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না-পুত্রের বুকে কাঁপিয়ে পড়েন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদেন তিনি। অনেক-অনেক্ষণ ধরে।
মা এবং বোনরা আকুল হয়ে উঠে এসে কামার অলকে জড়িয়ে ধরে, হাউ মাউ করে।কাঁদতে থাকে। ছেলের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করেন মা। কপালে চিবুকে চুমায় চুমায় ভরে দিতে থাকেন।
অনেকক্ষণ পরে যখন তারা খানিকটা ধাতস্থ হলো, কামার অল তার অদ্ভুত লোম-হৰ্ষক এবং রোমাঞ্চকর অভিযানের কাহিনী বলতে লাগলো তাদের কাছে। সে কাহিনী আবার এখানে পুনঃ উল্লেখ করা নিম্প্রয়োজন।
বাদশাহ সাবুর ছেলেকে ফিরে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেছেন। সারা দেশে চাঁড়া পিটে জারি করা হলো, সুলতানের প্রাসাদে সাত দিন ব্যাপী খানাপিনা গান-বাজনা নৃত্যের উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। বাদশাহজাদা কামার আল আকর্মর সশরীরে সুস্থ অবস্থায় ফিরে এসেছে—এ উৎসব তারই জন্য। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা আপামর সকল মানুষের সাদর নিমন্ত্রণ রইলো প্রাসাদের এই উৎসবে।
সারা শহর, প্রাসাদ, জলপথ সুন্দর করে সাজানো হতে লাগলো। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসানো হলো তোরণ-মঞ্জিল। দোকানপাট উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো আলোর মালায়।
প্রাসাদকে সাজানো হলো এক মনোহারী সাজে। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেলো দেওয়াল কার্নিশ। হাজারো বাতির ঝাড় ঝুলিয়ে দেওয়া হলো সদর ফটকের সামনে। লোকে লোকারণ্য। মহা ধূমধামে দান ধ্যান খানা পিনা নাচ গান হৈ-হল্লা চলতে থাকলো সাত দিন ব্যাপী। শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যে নানা মর্যাদার খেতাব বিলি করলেন সুলতান। কয়েদীদের মেয়াদ কমিয়ে দেওয়া হলো। যাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে ছিলো তাদের অনেককে খালাস করে দেওয়া হলো।
বাদশাহ সাবুর শাহজাদা কামার-অল-আকমরকে সঙ্গে নিয়ে শহরের প্রতিটি বাড়ির দরজায় দরজায় ঘুরে এলেন। সবাইকে জানিয়ে এলেন তার হারানো মণি কামার আল আবার বহাল তবিয়াতে ফিরে এসেছে!
তারপর একদিন আনন্দ উৎসব শেষ হয়ে যায়। কামার অল বাবাকে জিজ্ঞেস করে, যে-পারসী-পণ্ডিত আপনাকে এই ঘোড়াটা দিয়েছিলো, সে কোথায় গেলো, আব্বাজান?
কামার অল বলে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো আমি ফিরেই এসেছি আব্বাজান! তাছাড়া দোষটা যে পুরোপুরি তারই, তাই বা কী করে বলা যায়? আমারও তো উচিত ছিলো, ঘোড়াটা চালাবার সব কায়দা কৌশল তার কাছ থেকে জেনে নেওয়া। তখন সে-ধৈর্য তো আমার ছিলো না। ঘোড়াতে চেপেই, তার কথা শেষ না হতেই, আমি বোতাম টিপে ধরেছিলাম। দোষ বলতে গেলে পুরোটাই আমার বাবা। আপনি ওকে জানে মারবেন না, ছেড়ে দিন, এই আমার আর্জি।
কামার অল-এর ইচ্ছায় না করতে পারলেন না বাদশাহ। পারসী-পণ্ডিতকে কারাগার থেকে মুক্ত করে প্রচুর অর্থ ও এক নতুন সাজপোশাক উপহার দিয়ে বললেন, এবার তুমি দেশে ফিরে যেতে পার।
কিন্তু ছোট কন্যার সঙ্গে শাদীর কথাটা বেমালুম চেপে গেলেন তিনি। পণ্ডিতও সে ব্যাপারে। আর কোনও কথা তুললো না। বাদশাহ ভেবে রেখেছিলেন, পণ্ডিত যদি তার ছোট কন্যাকে শাদী করতে চানও তৎক্ষণাৎ তিনি ‘না’ বলে দেবেন, তাতে জ্বান যদি নষ্ট হয়, হবে। কিন্তু তাই বলে একটা যাদুকর শয়তান শঠের হাতে মেয়েকে তুলে দেবেন না তিনি। পণ্ডিত জেনে শুনে তার পুত্রকে ঘোড়ায় চাপতে দিয়েছিলো—মেরে ফেলার জন্য। না হলে, গোড়াতেই সে বলতে পারতো। সব কিছু না শিখে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চাপাই চলবে না। কিন্তু তা সে করেনি। যেহেতু কামার অল তার ছোট বোনের সঙ্গে পণ্ডিতের শাদীতে বাধ সেধেছিলো সেই কারণে, প্রতিশোধ নেবার জন্যে, সে তাকে মরণের ফদে ফেলে দিয়েছিলো। আল্লাহ মেহেরবান, তাই কামার অল ফিরে আসতে পেরেছে। অন্য কেউ হলে জ্বলন্ত সূর্যের গোলার মধ্যে ঢুকে পড়ে নিমেষে পুড়ে ছাই হয়ে যেত। এমন শয়তানের হাতে কেউ মেয়ে দেয়!
—বল তো বাবা, ঐ অপয়া কালো-ঘোড়াটাকে নিয়ে কী করা যায়? আমার মনে হয়, আমন সর্বনেশে জিনিস ঘরে না রাখাই ভালো। ভেঙ্গে গুড়ো করে দিই, কী বলো?
বাদশাহ সাবুর কিন্তু পুত্রের কথায় সায় দিতে পারে না।
–না বেটা, আমার মনে হয় এখনও ওর অর্ধেক কলাকৌশল তোমার জানা হয় নি। তার চেয়ে বলি কি, ওটার পিঠে তুমি আর চেপো না। ও আমার আতঙ্ক, আমার দুশমন। ওতে চড়া মোটেই নিরাপদ নয়, বাবা।
কামার অল তখন সানার সুলতান প্রাসাদে শাহজাদীর সঙ্গে এক রাতের সহবাস, সুলতানের ক্ৰোধ, এবং তার হাত থেকে, এই কালো-ঘোড়ার দৌলতে, অব্যাহতি পাওয়া-সব খুলে বললো।
বাদশাহ সাবুর। তবু বুঝতে চান না, সবই নিয়তির খেলা, বাবা। মৌৎ যেভাবে লেখা থাকে, কেউ খণ্ডন করতে পারে না। তাঁ। তোমার মৃত্যু সানার সুলতানের হাতে ছিলো না বলেই সে তোমাকে হত্যা করতে পারে নি। অথবা এরপর অন্য কোনও সময় তারই হাতে তোমার মৃত্যু নির্ধারিত হয়ে আছে! তখন তুমি যে খানেই থাকো, ঘটনাচক্ৰে তার সন্মুখে তোমাকে যেতেই হবে। এবং সে তোমাকে নিহত করবেই। সুতরাং তুমি যা বলছে, সে কোনও কথা নয়। যাই হোক, আমি চাই না, ঐ ঘোড়াটায় তুমি আবার কখনও চড়ো।
দিন যায়। কিন্তু সামস অল নাহারকে কিছুতেই ভুলতে পারে না কামার আল আকমর। প্রতিটি পল স্মৃতি কুরে কুরে খায় তার বুকের পাঁজর। কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারে না—সেই একটা রাতের মধুর মিলন-স্মৃতি। এক হলেও, সহস্র রজনীর স্বাদ সে কামার অলকে দিয়েছে। তার হ্রদয়াকে উন্মুক্ত করে খুলে ধরেছিলো সামস অল নাহার। সেই রাতের আধো আলো আধো অন্ধকারে সব সে দেখেছে, সব সে চেখেছে। সামস নিজেকে সঁপে দিয়েছে তার হাতে। এখন সে তার। সুতরাং এইভাবে, তাকে ছেড়ে দূরে দূরে থাকা তো তার পক্ষে সম্ভব না। যে ভাবেই হোক, যেমন করেই হোক, তাকে ওখান থেকে নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু সেখানে সে যাবে কেমন করে। তার বাবা বাদশাহ সাবুরের নির্দেশ সে যেন আর ঐ কালো ঘোড়ায় না চাপে। সে ঘোড়ায় না। চেপে সে কী করে যাবে তার প্রাসাদে? তাকে চুরি করে আনা ছাড়া অন্য কোনও পথ নাই। কারণ তার বাবা সানার সুলতান এবং সারা শহরবাসী। তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। তাকে একবার কোজায় পেলে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে দেবে।
একদিন বাদশাহ সাবুর এক গান বাজনার মাইফেলের আয়োজন করেছিলেন। শহরের নামকরা বাঈজীরা এসেছিলো মুজরো করতে। মাইফেলের আসরে বসে সেদিন সন্ধ্যায় একখানা বিরহ-সঙ্গীত শুনে কামার আল-এর হৃদয় উদ্বেলিত হয়ে উঠে সামস অল নাহার-এর বিরহে আরও বেশি কাতর হয়ে পড়ে সে। শত চেষ্টা করেও মনকে প্রবোধ দিতে পারে না। তাই বাবার নির্দেশ অমান্য করেই সে আবার কালো ঘোড়ায় চেপে বসে। ডান দিকের বোতাম টিপে ধরতেই ঊর্ধ্বাকাশে উঠে চলে যায় এক নিমেষে। তারপর উড়তে উড়তে এক সময় সে চলে আসে সানায়। সেই প্রসাদের ছাদে গিয়ে নামে। রাত তখন গভীর। সবাও ঘুমে অচেতন! কামার অল সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে নিচে। তারপর পায়ে পায়ে চলে আসে নিগ্রো খোঁজটার পাশে। সেই একই দৃশ্য। দৈত্যের মতো বিশাল লাসখানা এলিয়ে দিয়ে সে বিকট আওয়াজ তুলে নাসিকা গর্জন করছে। মাথার কাছে সিকেয় ঝোলানো খাবার-দাবার এবং দেয়ালে দাঁড় করানো একখানা তরোয়াল।
কামার এবার আর সিকেটাও খুলে নিলো না, নিলো না তারোয়াল খানাও। পা টিপে টিপে সে পেরিয়ে গেলো দ্বিতীয় দরজার সামনে। যথারীতি সেই মখমলের পর্দা ঝুলছিলো। কামার অল পর্দা সরিয়ে ভিতরে ঢোকে। শয্যার চারপাশে বসে দাসী মেয়েগুলো সামস অল নাহারকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, দুঃখ করবেন না। শাহজাদী, আমাদের বিশ্বাস তিনি আবার আসবেনই। যে ভালোবাসার স্বাদ তিনি পেয়েছেন, তা কখনই ভুলতে পারবেন না। আপনি কেঁদে কেঁদে সারা হচ্ছেন। এ ভাবে না খেয়ে না ঘুমিয়ে যদি কাটাতে থাকেন। কদিন বাঁচবেন? কিন্তু বঁচতে যে আপনাকে হবেই, মালকিন? আপনার ভালোবাসার জন্যই আপনাকে ভালোভাবে বাঁচিতে হবে। আর বাঁচতে গেলে খেতে হবে, ঘুমাতেও হবে। নিন, উঠুন, কিছু একটু মুখে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। আমরা বলছি, তিনি বেশিদিন আপনাকে ছেড়ে থাকতে পারবেন না।
এই সময় রাত্রি প্রভাত হয়ে আসে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।
চারশো চব্বিশতম রজনী। আবার সে কাহিনী শুরু করে :
সাবুর মনে মনে ঠিক করলেন, এবার কামার অল ফিরে এলে ঐ ঘোড়াটাকে আগে তিনি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করবেন, তার পরে অন্য কথা। তার মনের সব শান্তি নষ্ট করে দিয়েছে ঐ ঘোড়াটা।
পর্দা উঠিয়ে কামার আল কান পেতে শুনতে থাকে দাসী মেয়েদের সন্তুনার কথাগুলো। কিন্তু সে সাত্ত্বনায় সামস অল নাহার একতটুকু শান্ত হতে পারে না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে কাঁদতে থাকে; না না, তোরা আমাকে মিথ্যে স্তোক দিচ্ছিস, সে আর ফিরে আসবে না। আমার বাবা তাকে পছন্দ করে না। সে জানো-এখানে এলে আর তাকে আস্তা রাখবে না। আমার বাবা।
কামার অল পায়ে পায়ে পালঙ্কের পাশে দাঁড়ায়। কেউ তাকে লক্ষ্য করতে পারে না। সবাই তখন সামস অল নাহারকে নিয়ে ব্যস্ত।
শাহজাদীর মুখের কথা মুখেই রয়ে গেছে, কামার আল মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বললো, এই তো আমি এসেছি পিয়ারী। তুমি কি ভেবেছিলে, তোমার বাবার ভয়ে আমি আসবো না? কিন্তু আসল মহব্বাৎ কোনও কিছুর তোয়াক্কা করে না। মৃত্যুভয়ে সে ভীত হয় না। জন্মালে একদিন মরতেই হবে। এতো সবাই জানে। তাই বলে কেউ কি সমরক্ষেত্রে যুদ্ধ করে না?
বাঁদীরা সব পলকে সরে যায়। সামস অল নাহার মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে কামার অল-এর মুখের দিকে। ভাবতে পারে না সে-এ দৃশ্য আবার সে দেখবে। কামার আল—তার প্রিয়তম আবার এসে দাঁড়াবে তার পালঙ্কের অতি পাশে, তা সে ভাববেই বা কি করে? তার বাবা কামার অলের ওপর খড়গ হস্ত হয়ে আছে। একবার সে তার কিন্তুজা থেকে পালিয়ে গেছে, কিন্তু আর একবার যদি সে ফিরে পায়। তবে জ্যান্ত কবর দিয়ে দেবে। একথা কামার আলও খুব ভালো করেই জানে। তাই, সে যে আবার ফিরে আসতে পারে, ভাববে কি করে!
—জন সামস, তোমার জন্য সারা দিন-রাত কী ভাবে কেটেছে আমার। মুখে খানা রুচেনি, শুয়ে ঘুম আসেনি একদিনও। তুমি কেমন ছিলে?
—কেমন ছিলাম, কেমন থাকতে পারি বুঝতে পারছো না মণি, তোমার বিরহে আমার কী চেহারা হয়েছে একবার চেয়ে দেখ। আর কদিন যদি তোমাকে না দেখতে পেতাম, তাহলে তুমি ফিরে এসে আর আমাকে দেখতে পেতে না, সোনা। তোমাকে ছাড়া আমি এক মুহূর্তও বাঁচতে চাই না। জীবনে যদি ভালোবাসা এলো আর সে ভালোবাসাকে যদি ধরেই না রাখতে পারলাম, তবে কাজ কী বলে এই ব্যর্থ জীবনে? তাই ঠিক করেছিলাম তুমি যদি আর ফিরে না আস জহর খেয়ে খতম করে দেব এ ছার জীবন।
কামার অল, সামস-এর মুখে হাত চাপা দেয়, ওকথা মুখে আনতে নাই সামস। আমি যেখানেই থাকি আর যত দূরেই থাকি, তুমি নিশ্চিত জেনো, আমি তোমারই আছি-তোমারই থাকবো। আমাদের এই নিখাদ ভালোবাসায় কোনও দিন চিড় খাবে না।
এক অব্যক্ত আনন্দের শিহরণ খেলে যায় সামস অল নাহারের সারা শরীরে। আরো নিবিড় করে কামার অলকে জড়িয়ে ধরে সে।
কামার আল বলে, সামস, বড় খিদে পেয়েছে, অনেকদিন খাওয়া-দাওয়া নাই। খিদেও ছিলো না, কিন্তু এখন পেট চুই চুই করছে। মেয়েদের বলো, কিছু খানাপিনা আনুক। আমরা দু’জনে একসঙ্গে খাবো, কেমন?
হাসি আনন্দ আদর সোহাগে রাতের প্রহর কাটাতে থাকে। খুশিতে উপচে ওঠে দু’জনের হৃদয়। একসময় কামার আল বুঝতে পারে, রাত্রি প্রায় শেষ হতে চলেছে এবার বিদায়ের পালা। পুষ্ট ভারাক্রান্ত মনে সে সামসকে বলে, ভোরের আগেই আমাকে পালাতে হবে। না হলে খোঁজটা জেগে গেলে মুসকিল হবে। তবে কথা দিয়ে যাচ্ছি, সোনা, প্রতি সপ্তাহে একবার এসে তোমাকে দেখে যাবো।
–না না, সে হবে না নয়নমণি, আর আমি তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারবো না। একটি দিনও না-একটি মুহূর্তও না।
সামস অল নাহারের এই আকুলতায় সব গোলমাল হয়ে যায় কামার অল-এর। বলে, কিন্তু এখানে আমার থাকা কি নিরাপদ হবে সামস। তোমার বাবার রোষ তো তুমি জান।
সামস অল বলে, জানি, খুব ভালো করেই জানি এখানে তুমি আমার কাছে রয়ে গেলে, কাল সকালেই তোমাকে চিরকালের মতো হারাবো আমি। সে-কথা আমি বলবো না, কামার আল। কিন্তু তোমাকে ছেড়েও আমি থাকতে পারবো না। আমি তোমার সঙ্গেই যাবো। তা সে যদি আমাকে জাহান্নামেও নিয়ে যাও, আমার কোনও আপত্তি নাই। তোমার সঙ্গে যাওয়ার জন্য আমি কোন কষ্টই কষ্ট বলে মনে করি না। সোনা, আমাকে তোমার সঙ্গে নিয়ে চল। তোমার বাবা পারস্যের শাহেনশাহ, তার মান-ইজৎ আমি খোয়াতে চাই না। তিনি যদি আমাকে ঘরে নিতে নারাজ হন। কোনও দুঃখ করবো না। তুমি আমাকে অন্য কোথাও রাখবে। তা সে যত কষ্টকর জায়গাই হোক, সুলতান-দুহিতা প্রথম প্রথম হয়তো একটু আমার অসুবিধা হবে, দেখে নিও, হাসিমুখে আমি সব সয়ে নেবো। তোমার মহব্বতের কাছে আমার সে কষ্ট তুচ্ছ হয়ে যাবে।
কামার আল আনন্দে প্রায় লাফিয়ে ওঠে, তুমি যাবে সামস? আমার সঙ্গে যাবে তুমি? এই বিত্ত-বৈভব, এই অঢেল সুখ-সাচ্ছন্দ্য, তোমার বাবা, তোমার সালতানিয়াৎ সব ছেড়ে যেতে পারবে আমার সঙ্গে? আমি সত্যিই কোনও কথা দিতে পারি না। সামস আঁল। আমার বাবা তামাম পারস্যের শাহেন শাহ, একথা ঠিক। কিন্তু আমার তো নিজস্ব কোনও সম্পদ নাই, তিনি যদি আমাকে গ্রহণ না করেন। তবে আমি অতি সাধারণ এক বিত্তহীন কামার আল। সে ক্ষেত্রে তুমি বাদশাহজাদী, আদরের দুলালী, হয়তো সত্যিই অনেক কষ্ট সহ্য করতে হবে।
সামস অল নাহার কামার অলকে থামিয়ে দিয়ে বলে, সে সব কথা আমিই তোমাকে বললাম, সোনা। ভালোবাসার জন্য আমি সব হাসিমুখে কেমন করে সইতে পারি, একবার, না হয় পরীক্ষা করে দেখ।
কামার আল বলে, ভোর হতে চললো; তাহলে আর দেরি নয় সামস, তৈরি হয়ে নাও, এখনই আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে। না হলে খোঁজটা জেগে গেলে, বিপদ হবে।
শাহজাদী শয্যা ছেড়ে উঠে পড়ে। সিন্দুকের তালা খুলে বের করে কিছু সাজ-পোশাক, রত্নাভরণ এবং মহামূল্যবান বিলাস-বস্তু। একটা থলেয় ভরে বলে, চলো, আর কিছু নেবার नाङ्ग्रे।
দাসী-মেয়েরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ কোনও বাধা দিতে পারে না-সোরগোল তুলে সাড়া জাগাতেও পারে না।
সামস অলকে হাতে ধরে কামার আল। ছাদের ওপর ওঠে আসে। ঘোড়াটার জিনের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয় থলেটা। তারপর দু’হাতে তুলে শাহজাদীর হাল্কা দেহখানা ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে দিয়ে নিজেও বসে তার পিছনে। সামসের পাতলা শরীরটা কামার অল-এর বিশাল বিস্তুত বক্ষপটের মধ্যে হারিয়ে যায়।
ডানদিকের বোতামটা টিপে ধরতেই শোঁ শোঁ করে ওপরে উঠতে থাকে কালো ঘোড়া। উল্কার বেগে। কামার অল সামসের কানের কাছে মুখ রেখে বলে, খুব ভয় করছে!
কামার অল-এর বুক ভরে যায়। ভালোবাসার কথা এত ভালো করে বলতে পারে সামস—
একটুক্ষণের মধ্যেই তারা পারস্যের প্রাসা-শিখরে এসে নেমে পড়ে।
কামার অল-এর ঘোড়া আকাশে ওড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাসী মেয়েরা চিৎকার করে কাঁদতে থাকে : ওরে বাবারে, কী সর্বনাশ হলো রে, কই গো, কে কোথায় আছ, ছুটে এসো, শাহজাদীকে চুরি করে পালিয়ে গেলো সেই লোকটা–
ধড়মড় করে উঠেই তলোয়ারখানা বাগিয়ে ধরে খোজাঁটা। হুঙ্কার ছাড়তে ছাড়তে, ছুটে আসে। ছুটে আসে সুলতানও, আলু থালু বেশবাস, খালি পা, ঘুমে চোখ জড়ানো।
-কী? হয়েছেটা কী? এত চোঁচামেচি চিৎকার কেন এই রাতে?
সুলতান হুঙ্কার ছাড়ে, তোরা কোথায় ছিলি?
আর এই বাঁদর খোজাটা—
নিগ্রোটার হাতে তখন ইয়া বড় তরোয়ালখানা ঠক ঠক করে কাঁপছিলো।
সুলতান ক্ষণকাল আর অপেক্ষা করলেন না সেখানে। ছুটতে ছুটতে ছাদের ওপরে উঠে এলেন। কিন্তু বড় দেরি হয়ে গেছে। ঘোড়াটা ততক্ষণে মেঘের কাছাকাছি। সুলতান চিৎকার করে বলতে রথাকেন, শোন শাহজাদা কামার অল, আমার একটা মিনতি শোনো, দোহাই বাবা, আমার একমাত্র নয়নের মণি বুকের কলিজাকে এইভাবে ছিনিয়ে নিয়ে যেও না। ফিরিয়ে দিয়ে যাও, ফিরিয়ে দিয়ে যাও। নেমে এসো, আমি কথা দিচ্ছি, তোমার সঙ্গে শাদী দিয়ে দেব। ফিরিয়ে দাও তাকে।
কিন্তু সুলতানের সে আকুল আবেদনে সাড়া দিলো না কামার আল। কী করেই বা দেবে? তখন তারা মানুষের কণ্ঠস্বরের নাগাল ছাড়িয়ে আরো অনেক ওপরে উঠে গেছে।
সুলতান ভাবেন, কামার অল তার কথায় সাড়া দেবেন না। তারপর তিনি আরও জোরে চিৎকার তোলেন, সামস আল-ফিরে আয় মা, তোমার বুড়ো মায়ের মুখ চেয়েও একটিবারের জন্য ফিরে আয়, বাছা। আজ বাদে কাল সে দেহ রাখবে, একবার তাকে দেখে যা। আমি কথা দিচ্ছি মা, তোরা যা চাইবি তাই হবে। শুধু একটি বারের জন্য ফিরে আয়।
কিন্তু ফিরে এলো না কেউ। শুধু নিজেরই প্রতিধ্বনি বার বার ফিরে ফিরে এসে বিদ্রুপ করতে থাকলো।
রাত্রি শেষ হয়। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।
⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN
🔗 MY OTHERS CHANNELS
🔗 FOLLOW ME
Facebook: facebook.com/molakat
Facebook: facebook.com/afsarnizam
Instagram: instagram.com/molakat
Instagram: instagram.com/afsarnizam
Twitter: twitter.com/afsarnizam
🔗 MY WEBSITE
🔗 CALL ME
+8801819515141
🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com
#উপন্যাস
#অনুবাদ
#মোলাকাত
#মোলাকাত
#Molakat
#Novel
#Translation
#BanglaLiterature
#Literature
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#বাংলাসাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#আলিফ_লায়লা
#সাহিত্য

No comments