“জীবন্ত মুজিজা আল কোরআন” ইসলামি চেতনা জাগরণের প্রদীপ্ত মশাল ।। আবদুল হালীম খাঁ

 
তমসুর হোসেন শুধু কবি নন, একজন উচ্চাঙ্গের প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক। সম্প্রতি প্রকাশিত তার “জীবন্ত মুজিজা আল কোরআন” এবং ইতোপূর্বের ‘বিশ্বনবীর প্রতিচ্ছবি” তাকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে। সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় তিনি স্বচ্ছন্দে বিচরণ করছেন। পেশায় তিনি চিকিৎসক। নাড়ি টিপে রোগ নির্ণয়ের সাথে সাথে মানুষের অন্তরের ব্যথা বেদনা নিখুঁতভাবে সাহিত্যে তুলে ধরেছেন। ছাত্রজীবন থেকে লেখালেখি শুরু। চারপাশের প্রকৃতি ও মানুষই তাকে লিখতে অনুপ্রাণিত করে। তার রচনায় অন্য কারো চিন্তা, বিষয় ও ভাষা রেখাপাত করেনি। তার প্রত্যেকটি গ্রন্থ নিজস্ব হৃদয়েরই প্রতিচ্ছবি। এটি তমসুর সাহিত্যের বড় ও প্রধান বৈশিষ্ট।
 
আলোচ্য গ্রন্থ “জীবন্ত মুজিজা আল কোরআন” এ তমসুর হোসেন উচ্চমানের গভীর চিন্তাশীল একজন সাহিত্যিক হিসেবে তার কর্মের আরেক দিগন্তকে উন্মোচন করেছেন। অনেকে গল্প উপন্যাস লিখে খ্যাতিলাভ লাভ করলেও আদর্শ ঐতিহ্য ইতিহাস নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেননি। কবি গোলাম মোস্তফা “বিশ্বনবী” লিখে প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেছেন। আমরা কবি তমসুর হোসেনের নাম তার সাথে উল্লেখ করতে পারি সহজেই। তার “জীবন্ত মুজিজা আল কোরআন” ও “বিশ্বনবীর প্রতিচ্ছবি” সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৭৬ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থটি যত না বড়, বিষয়বস্তুর দিক থেকে তার চেয়ে বিশাল, গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই। অনেক পরিশ্রম করে নানা দিক থেকে নানারকম মূল্যবান মণিমুক্তায় ভরিয়ে তুলেছেন গ্রন্থটি। সহজেই অনুমান করা যায় দীর্ঘদিনের কঠোর শ্রম ও ত্যাগের ফসল এটি। প্রবন্ধগুলোর নাম বললেই সম্মানিত পাঠক গ্রন্থটির গুরুত্ব অনুভব করতে পারবেন। প্রবন্ধগুলো হচ্ছে ঃ জীবন্ত মুজিজা আল কোরআন, আল্লাহর অস্তিত্ব, আকাশ এবং পৃথিবী সৃষ্টির রহস্য, শয়তান ও তার দোসর, খাতামুন্নাবিয়্যিন স., আল কোরআন ও আরবী ভাষা, আল কোরআনে একত্ববাদ, আল কোরআনের সার্বিক জ্ঞান ও কবিতা প্রসঙ্গ, আল কোরআনের সত্যতা, আল কোরআনের নৈতিকতা ও সামাজিক আইন, হৃদয় দিয়ে কোরআন বোঝা, আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয়, কুফরীর অন্ধকার, পরপারে সুখের সন্ধান, অভিশপ্ত মুশরিক, আত্মঘাতী মুনাফিক, মুনাফিকের প্রথম দৃষ্টান্ত, মুনাফিকের দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত, পার্থিক জীবনের নশ্বরতা ইত্যাদি।
 
মহান আল্লাহ মানুষের মস্তকে চিন্তা করার ক্ষমতা দিয়েছেন। এ ক্ষমতায় আল্লাহ কাউকে বাঁধা দেন না। একেকজন জ্ঞান ও রুচি মোতাবেক একই বস্তু থেকে পৃথক উপাদান সংগ্রহ করে বিভিন্ন আঙিকে প্রকাশ করতে পারে। এটি আল্লাহপাকের অনন্য সৃষ্টিবৈশিষ্ট। কোরআন পাঠ সম্পর্কে লেখক একটি কথা স্বাধীনভাবে প্রকাশ করেছেন। লেখক বলেছেন ঃ “পবিত্র কোরআনের উপমা সম্বলিত আয়াতগুলো আমার হৃদয়কে মোহিত করে। এগুলোর মর্মার্থ উদ্ধারে আমি বিভিন্ন তাফসির গ্রন্থের দ্বারস্থ হয়েছি। কিন্তু তাফসীর সমূহের ব্যাখ্যা আমাকে পরিতৃপ্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। অধিকাংশ তাফসীরে আয়াতের অতলস্পর্শী ভাবার্থ ও প্রচ্ছন্ন দাবীকে পরিচ্ছন্নভাবে উদঘাটন করা হয়নি। কোরআন নাযিলের প্রাক্কালে উদ্ভুত সমস্যার সমাধানে মহান আল্লাহপাক সুচিন্তিত উপমার অবতারণা করেছেন। তাই এসব আয়াতের বিশেষত্ব প্রকাশ এবং এর সৌন্দর্য ও শিক্ষা জগতময় ছড়িয়ে দিতে প্রজ্ঞার স্ফুরণ ঘটানো দরকার। আমি লক্ষ্য করেছি উপমা সম্বলিত আয়াতের বিষয়বস্তু অধিকাংশই ভাবাত্মক। তাই আমি এসবের তত্ত্বগত আবেদনের পাশাপাশি ভাবগত দাবীকে গুরুত্ব দেয়া যথার্থ মনে করেছি।” 
 
মহাগ্রন্থ আল কোরআন বুঝতে অনুবাদ বা তাফসীর পাঠ যথেষ্ট নয়। মায়ের আদরের ভাষা যেমন সন্তান বোঝে আর সন্তানের অনুরাগ অভিমান যেমন বোঝে মা, তেমনি আল্লাহর কালাম বোঝার জন্য তার সাথে হৃদয়ের একান্ত সংযোগ সৃষ্টি প্রয়োজন। আর সেই সাথে প্রয়োজন ত্যাগ ও সাধনা। এ প্রসঙ্গে লেখক ইবনু হাদীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিমত উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন ঃ “কোরআনের ইজাজ তথা বাক্যচ্ছটার শৈল্পিক সৌন্দর্য ও লালিত্য সম্যক উপলব্ধি করতে হলে পূর্ণ সাহিত্যিক অভিরুচি থাকা একান্ত প্রয়োজন। সাহিত্যবোধ অর্জন করা যে নিতান্ত সহজ কাজ তা কিন্তু নয়। এর পেছনে থাকা চাই অক্লান্ত পরিশ্রম ও একনিষ্ঠ সাধনা। অভিরুচি শুধু ইলমে নাহাত, লুগাত, ফিকহ ইত্যাদির বুৎপত্তির দ্বারাই অর্জিত হয়না, বরং তা হাছিল হয় ইলমে বায়ান, বাদীয়, দ্বর্থহীন রূপক, দ্বান্দিক অলংকার ও বাকপটুতা ইত্যাদিতে রীতিমত প্রজ্ঞা এবং নৈপূন্য অর্জন করার পর।” ( প ৃঃ ১১-১২)
 
সর্বকালের মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহর দেয়া পাঠ্যসিলেবাস হল আল কোরআন। কাজেই এটাকে না বুঝে উপেক্ষা করে ফেলে রাখা কোন বুদ্ধিমান মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আল কোরআন কার বাণী, কার প্রতি এবং কেন, এ প্রসঙ্গে মহা দার্শনিক ইমাম গাজ্জালী বলেছেন ঃ “আল কোরআনের একটা অনন্য ও একক লক্ষ্য রয়েছে। সেটা হচ্ছে এই যে, পাক কোরআন মানুষকে সব সময় প্রেরণা যোগায় তার সৃষ্টিকর্তার সাথে যোগসূত্র স্থাপন করার জন্য। আর তা অনুপ্রেরণা প্রদান করে এই জড়জগতের প্রতিটি বস্তুর ওপর আধ্যাত্বিকতা ও পরজগতকে প্রাধান্য দেয়ার জন্য।” (পৃ -১২)
 
গ্রন্থভুক্ত প্রত্যেকটি প্রবন্ধের পৃথক আলোচনা প্রয়োজন কিন্তু তা সম্ভব না। তবু কিছু বিষয় না বললেই নয়। সবাই তো সব কথা বুঝতে পারেনা। একশ্রেণির মানুষ চোখ থাকতেও দৃষ্টিহীন। তাদের অন্তর থাকলেও তা বিবেকহীন। এদেরকে দেখিয়ে দেয়া সাহিত্যিকের কাজ। আর এই কাজটি করেছেন তমসুর হোসেন তার গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে। তার প্রবন্ধ পাঠ করলে তা উপলব্ধি করা যায়। গ্রন্থটি ধীরে ধীরে পড়লে পাঠক অনেক কিছু লাভ করবেন এবং তাদের জ্ঞানের দিগন্ত সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করা যায়। গ্রন্থকারের ভাষাশৈলি চমৎকার, চিত্তাকর্ষক এবং কাব্যময়। “জ্ঞানী ও অজ্ঞানী” প্রবন্ধ থেকে তা উল্লেখ করা যায়। ‘জমাট আঁধারের বুক ছিঁড়ে উষার আলোর তিনিই প্রকাশ ঘটান। আঁধারে ডুবে যাওয়া সূর্যটাকে তিনিই প্রত্যহ স্থাপন করেন পূর্ব দিগন্তের উদয়াচলে। নিশুতি রাতের নির্জন আকাশে চাঁদের মসৃণ কিরণ তিনিই দান করেন সুপ্তিময় ঘুমের জন্য। জীবনের স্বাচ্ছন্দের জন্য কালপরিক্রমার নির্ণায়ক করে চন্দ্রসূর্যের আবর্তন জাগতিক অপরাপর বস্তুর সাথে সংযুক্ত করেছেন যাতে বিবেকবাণ মানুষ অসীমকে নক্ষত্রের খেয়ায় বাঁধতে পারে।” (পৃ-৯২) অনুরূপ আর একটি পঙতি ঃ ‘যখন তরঙ্গিত নির্ঝরের মত ছন্দময় প্রবাহে কোরআনের আয়াত নাজিল হতে লাগল তখন এর বাণীর স্বাদ এবং বর্ণনার নতুনত্ব, ভাবের দ্যোতনায় শ্রবণকে সচকিত করল। নিপীড়িত মানুষ তাতের কাঙ্খিত মুক্তির সন্ধান পেয়ে তার দিকে ছুটতে লাগল। মনে হল এ যেন বিরল মরু কুসুমের হৃদয় মোহিত করা সুগন্ধ। সবুজ সতেজ মরুদ্যানে বিকেলের কাব্য বিনোদন।” (পৃ-৩৯)
 
মহান আল্লাহপাক প্রত্যেক নবীকে অসংখ্য মুজিজা দান করেছেন। সেগুলো ছিল তাঁদের জীবদ্দশায় কার্যকরী। সেই নবীদের ওফাতের সাথে সাথে তাদের মুজিজা বিলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু আমাদের নবীকে স. যে মুজিজা দান করা হয়েছে তা কখনও বিলুপ্ত হবেনা বরং কিয়ামাত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। এই শ্বাশ্বত মুজিজা আল কোরআন মরুচারী বেদুইনদের করেছিল পৃথিবীর শাসক। তারা হয়েছিল মানুষের শিক্ষক। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-সভ্যতায় তারা অন্ধকার পৃথিবী করেছিল আলোকিত। কী আশ্চর্য ও শক্তিশালী এই আল কোরআন এই কথাটি ব্যক্ত করতে লেখক এত শ্রম সাধনা করেছেন। প্রত্যেক প্রবন্ধে ঘুরে ফিরে এসছে আল কোরআন ও হাদীসের অমিয় বাণী।
 
“কালেমা তাইয়্যেবার দাবী” অতি গুরুত্বপূর্ণ রচনার মধ্যে একটি। কারণ কালেমা তাইয়্যেবা শুধু মুখে পাঠ করলে এর দাবী পূরণ হয়না। এ কালেমা না পড়লে কেউ ইসলামের সীমায় প্রবেশ করতে পারেনা। এই কালেমা উচ্চারণে মুশরিক ঈমানদারে পরিণত হয়। কুফরীকে অগ্রাহ্য করে ইসলামের বিশাল কর্মনীতি দ্বারা জীবন যাপনের একনিষ্ঠ প্রতিজ্ঞাই কালেমার দাবী। এ কালেমা পাঠে হৃদয়ে বিশ্বাসের অমিয় পুলক অনুভব করে স্রষ্টার আনুগত্য ও প্রশংসায় অধির হয়ে যাওয়াই কালেমার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য। কালেমার বিশ্বাসী হওয়ার পর সৎকর্ম সম্পাদন না করলে বিশ্বাসের কোন মূল্য থাকেন॥ লেখক তমসুর হোসেন বলেছেন ঃ “ঈমান ও সৎকর্ম একটি ছাড়া অন্যটি অচল। ইসলামি আদর্শের সার্বজনীন রূপটি প্রতিষ্ঠার জন্য এ বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা নতুন করে খতিয়ে দেখার মধ্যেই আছে পূনর্জাগরণের চেতনা, যা অর্জন করা সম্ভব হবে কালেমা তাইয়্যেবার সঞ্জিবনী মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়ার মাধ্যমে।” (পৃ-১৩৯)
 
সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে “জীবন্ত মুজিজা আল কোরআন” একটি উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা তাতে কোন সন্দেহ নেই। কভারের তৃতীয় পৃষ্ঠায় লেখকের দৃষ্টিনন্দন ছবিসহ সংক্ষিপ্ত পরিচিতি গ্রন্থটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। নির্ভুল ছাপা। দুধের মতো সাদা ধবধবে কাগজ। চার রঙা আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ গ্রন্থের বিষয়বস্তুর মানানসই। দেখলেই হাতে নিতে ইচ্ছে করে। আশালতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ পাঠককে উপহার দেয়ার জন্য লেখককে মুবারকবাদ জানাই। এ ধরণের ভাল গ্রন্থ যত বেশি বেশি প্রকাশিত হবে ততই সমাজের কল্যাণ। “জীবন্ত মুজিজা আল কোরআন” গ্রন্থটির ব্যাপক প্রচার কামনা করছি।
 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

#গ্রন্থালোচনা
#বইআলোচনা
#বইপত্র
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#Molakat
#Book_Review
#Book_Discussion
#Literature
#Bengali_Literature
#মোহাম্মদ_জসিম_উদ্দিন
#আবদুল_হালীম_খাঁ
#তমসুর_হোসেন

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.