ড. ইয়াহ্ইয়া মান্নান প্রণীত প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর সাহিত্য সাধনা ও চিন্তাধারা ।। রায়হান আজাদ

 
বিংশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলার অসহায় মুসলিম সম্প্রদায় যখন অদ্ভূত আঁধারে নিমজ্জমান, ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়, বঞ্চনা আর হতাশার বেড়াজালে ত্রাহি ত্রাহি এবং সঠিক নেতৃত্বের অভাবে দাসত্বের নিগড়ে নির্বিকার তখনই শিক্ষা সাহিত্যের প্রদীপ জ্বেলে যামানার মুয়ায্যিনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আশার আলো সঞ্চার করেন প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ (১৮৯৪-১৯৭৮) তিনি কেবল হেড মাস্টার প্রিন্সিপাল ছিলেন না, ছিলেন অসংখ্য স্কুল-কলেজের প্রতিষ্ঠাতা রূপকার। পূর্ব বাংলা মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট হিসেবে এতদাঞ্চলে তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে নবযুগের সূচনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবেও তার ভূমিকা অগ্রগণ্য। প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ গবেষক . ইয়াহ্ইয়া মান্নানের ভাষায়- “ইবরাহীম খাঁ একাধারে শিক্ষক, শিক্ষা আন্দোলনের সংগঠক-আয়োজক-সংস্কারক পরিচালক। সমাজসেবা সাহিত্যচর্চা ছিল তাঁর প্রিয় কাজ। দেশ কালের প্রয়োজনে তিনি রাজনীতির সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট ছিলেন। পশ্চাতগামী সমাজকে অগ্রগামী উন্নতির  শীর্ষে আরোহণ করানোর লক্ষ্যেই ছিল তাঁর প্রয়াস। মানুষের কল্যাণ সাধনাই ছিল তাঁর ব্রত। তাঁর হৃদয় দখল করেছিল সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষের ভাষা   মেজাজ দিয়ে তিনি সহজ-সাবলীলভাবে তাদের জন্যই সাহিত্য চর্চা করেছেন। তাদের দু:-দুর্দশা লাঘবে আজীবন তিনি  সাধনা করেছেন। তৎকালিন খিলাফত আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন, ভারত বিভাগ আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাপূর্ব সমাজ ব্যবস্থায়  বাঙালি  মুসলমানের পূনর্জাগণের ক্ষেত্রে তার প্রয়াস  এক শক্তিমান পৌরুষের অবয়বে চিহিৃত 
 
প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ৮২টি। অপ্রকাশিত পান্ডুলিপির সংখ্যা-২৪, সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা-২১, এছাড়া বাঁধাই করা খাতায়ও তার বিপুল পরিমাণ অপ্রকাশিত রচনা রয়েছে। . ইয়াহইয়া মান্নান কর্তৃক প্রণীতপ্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর সাহিত্য সাধনা চিন্তাধারাবইয়ে তাঁর প্রতিনিধিস্থানীয় ১৮টি গ্রন্থের পর্যালোচনা বিশ্লেষণ সংযুক্ত হয়েছে। ছয় অধ্যায়ে বিভাজিত গ্রন্থের ১ম অধ্যায়ে প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর সময়কালের সামাজিক,রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক পটভূমি বিধৃত হয়েছে। লেখকের জীবন চিত্র বিবৃত হয়েছে দ্বিতীয় অধ্যায়ে। তৃতীয়,চতুর্থ, পঞ্চম ষষ্ঠ অধ্যায়ে লেখক প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ প্রণীত কথাসাহিত্য,নাটক, স্মৃতিকথা, ভ্রমণসাহিত্য, প্রবন্ধসাহিত্য পত্রসাহিত্যের পরিচয় চিন্তাধারা উপস্থাপিত হয়েছে। বিংশ শতকের শুরু থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত কালসীমার পটভূমি সাহিত্য সাধনা . ইয়াহ্ইয়া মান্নানের গ্রন্থে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
 
প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ একজন কর্মবীর সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি নিরলস সাহিত্য সাধনা করে গেছেন। তার ধমনিতে ছিল শিক্ষা বিস্তার সাহিত্যচর্চার অদম্য চেতনা। তিনি বাঙ্গালি মুসলমানদের কাংখিত উন্নয়নের লক্ষ্যে রাজনীতির সাথেও সম্পৃক্ত হন। তিনি রুটিন মাফিক জীবন ধারণ করতেন। সাহিত্যে নীতি আদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে তিনি এয়াকুব আলী চৌধুরী ডা. লুৎফুর রহমানের অনুসারী ছিলেন। মহাকবি কায়কোবাদ অসাধারণ বাগ্মী কবি ইসমাঈল হোসেন সিরাজী হলেন তাঁর প্রেরণার উৎস। তিনি শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন অতিবাহিত করলেও  রাজনীতির ময়দানেরও অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য,১৯৫৩ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য এবং ১৯৬২ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত  হয়েছিলেন।
 
শিক্ষা সাহিত্যের উন্নয়নে প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ বহু সংগঠন প্রতিষ্ঠা পরিচালনা করেন।  তিনি ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত  প্রাদেশিক প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দুদুবার বাংলা একাডেমীর পরিচালনা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি টাঙ্গাইলে করটিয়া কলেজ, ভুয়াপুর কলেজ ঢাকায় বাংলা কলেজ প্রতিষ্ঠায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন। আমৃত্যু তিনি সাহিত্য সাধনা করে গেছেন। সাহিত্যের অধিকাংশ শাখায় বিচরণ করেছেন। নাটক, ছোটগল্প, উপন্যাস, স্মৃতিকথা, ভ্রমণসাহিত্য, প্রবন্ধ, রস-রচনায় তার পারঙ্গমতা পরিলক্ষিত হয়।
 
ইবরাহীম খাঁর উল্লেখযোগ্য নাটক হচ্ছে কামাল পাশা (১৯২৬), আনোয়ার পাশা (১৯২৭), ঋণ পরিশোধ (১৯৫৫) কাফেলা (১৯৫৬) এসব নাটকের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলার মুসলিম যুব সমাজকে জাগিয়ে তোলার কসরত করেছেন। . মুহাম্মদ ইয়াহইয়া তার গবেষণাগ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ে উল্লেখিত নাটকের আবেদন আলোচনা-সমালোচনা বিশদভাবে ফুটিয়ে তোলেন।
 
ছোটগল্প সাহিত্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় শাখা। কেবল ছোটগল্পই স্বল্প পরিসরে পাঠকের মন জুড়াতে সক্ষম হয়। ইবরাহীম খাঁরআলু বোখারানামক গল্পগ্রন্থ যেখানকার ৩৩টি গল্পই সুখপাঠ্য রসবোধে পরিপূর্ণ।  . মুহাম্মদ ইয়াহইয়া তার গবেষণাগ্রন্থের ৩য় অধ্যায়ের ২য় পরিচ্ছেদে এসব গল্পের একটি স্বার্থক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। অধ্যায়ের ১ম অনুচ্ছেদে লেখক ইবরাহীম খাঁর সাড়া জাগানো উপন্যাস বৌ বেগমের ব্যবচ্ছেদ করেন। বৌ বেগমের চরিত্র লায়লা, মাছুমা ওমর বেগ চরিত্র সৃষ্টিতে ইবরাহীম খাঁ যে পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন তার সম্পর্কে প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক মোহাম্মদ মাহফুউল্লাহর মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য: “বৌ বেগমের আদল সমাজ থেকে, বাস্তব জীবন থেকে নেয়া হলেও, তা অনেকটাই ইবরাহীম খাঁর নিজস্ব সৃষ্টি। আদর্শবাদী সমাজকল্যাণকামী এই লেখক সচেতনভাবেইবৌ বেগমএর চরিত্র গড়ে তোলেছেন, মহিমান্বিত করেছেন তাকে,হয়তো চিত্রায়ণ কোথাও কোথাও বেশ চড়া এবং অন্তরঘেঁষা হয়ে গেছে এবং রচনার শিল্পগুণ ক্ষুন্ন করেছে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ইবরাহীম খাঁর বৌ বেগম উপন্যাসকে একটি বিশিষ্ট রচনা হিসেবেই গণ্য করতে হবে। কেননা এতে সমাজের নিখুঁত আলেখ্য আছে, আছে অনেকগুলি চরিত্রের ব্যবহারিক জীবন অন্তর সত্তার পরিচয়, সমাজ-ইতিহাসের প্রচুর উপাদান
স্মৃতিকথা ভ্রমণ সাহিত্য রচনায় ইবরাহীম খাঁর দক্ষতা পরিস্ফূটিত। তিনি পাকিস্তান আমলে তুরস্ক, মধ্যাপ্রাচ্য, নিউইয়র্ক চীনে  সরকারি দায়িত্ব পালনে ভ্রমণ করেন। ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র, নয়াজগতের পথে নয়াচীনে এক চক্কর তার উল্লেখযোগ্য ভ্রমণ সাহিত্য।বাতায়নহলো ইবরাহীম খাঁর স্মৃতিকথামূলক রচনা। এতে ছোট ছোট  চারশ একত্রিশটি পরিচ্ছেদ রয়েছে।  এখানে লেখকের  সারাজীবনের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ, বিভিন্ন খ্যাত-অখ্যাত  ব্যক্তির প্রসঙ্গ, সমাজ-সংস্কৃতি-শিক্ষা-সাহিত্য, রাজনীতি-অর্থনীতি বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা রয়েছে। . ইয়াহইয়া মান্নান তার গবেষণার পঞ্চম অধ্যায়ে নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষকের উক্ত বইয়ের ষষ্ঠ তথা সর্বশেষ অধ্যায়ে রয়েছে  প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর  প্রবন্ধ সাহিত্য পত্র সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা। ইছলামের মর্মকথা (১৯৬৩) ইবরাহীম খাঁ রচিত একটি তত্ত্ব সমৃদ্ধ প্রবন্ধ সাহিত্য। গ্রন্থে ২৩টি প্রবন্ধ রয়েছে। . মুহাম্মদ ইয়াহইয়া উল্লেখ করেন, “প্রবন্ধগুলোতে মুক্তবুদ্ধি আর গোঁড়ামিরহিত কান্ডজ্ঞানের আলোকে শাশ্বত শান্তির ধর্ম ইসলামের মর্মবাণী উপস্থাপন করা হয়েছে এছাড়া ইবরাহীম খাঁরলিপি সংলাপ’ (১৯৭৬) পত্রসাহিত্য হিসেবে সুধীমহলে সাড়া জাগিয়েছে। 
 
প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ যেখানে গিয়েছেন সেখানেই হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়তোবা সাহিত্য সমিতি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি যেমনি একজন লব্ধ প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাবিদ সাহিত্যিক তেমনি তাঁর হাতের ছোঁয়ায় গড়ে উঠেছে স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত কৃতি ব্যক্তিত্ব যারা পরবর্তীতে সমাজ দেশের উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখেছেন। এসব মনীষীদের মধ্যে রয়েছে  কবি ঐতিহাসিক অধ্যাপক কাজী আকরাম হোসেন, অধ্যাপক গোলাম মাকসুদ হিলালী, অধ্যাপক আজিমুদ্দীন, মাওলানা আহসান উল্লাহ, আবুল হাশিম, . আবদুল কাদির, কবি নূরুন্নাহার, কবি তালিম হোসেন, অধ্যাপক মোফাখ্খারুল ইসলাম, কবি গবেষক . আশরাফ সিদ্দীকী, কবি খোন্দকার আবু বকর, জাদুকর পি.সি সরকার, অধ্যাপক ইদরিস আলী,  প্রবন্ধকার . আলীম আল রাজী, শামসুজ্জামান, মোকছেদ আলী,.এস.এম আবদুল জলিল প্রমুখ। ইবরাহীম খাঁ ১৯৬৩ সালে কামাল পাশা নাটকের জন্য বাংলা একাডেমী নাট্য পুরস্কার লাভ করেন আর ১৯৭৭ সালে তাকে সাহিত্য সাধনার জন্য দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। এছাড়া  একই বছরকায়কোবাদ সাহিত্য মজলিশ উদ্যোগে ঢাকার কলাবাগানে তাকে গণসংবর্ধনা প্রদান করা হয়।
 
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক . ইয়াহ্ইয়া মান্নানইবরাহীম খাঁর  সাহিত্য সাধনা চিন্তাধারানামক অনবদ্য গবেষণা গ্রন্থে এতদাঞ্চলের বৃটিশ, পাকিস্তান বাংলাদেশ আমলের শিক্ষা-সংস্কৃতি সমাজ-সাহিত্যের একটি নির্মোহ ভাষাচিত্রের পূনর্বিন্যাস করতে সক্ষম হয়েছেন। ইবরাহীম খাঁর সাহিত্য সাধনার মাঝেই রয়েছে বিংশ শতকের বঙ্গীয় মুসলিম সমাজের জীবনধারার বর্ণাঢ্য ইতিহাস। . ইয়াহইয়া নিজস্ব গবেষণা সাধনা বলে এসব সুখ-দু:খের কালপঞ্জি একজন দক্ষ শব্দশিল্পীর তুলিতে সুবিন্যস্ত করে বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিকধারাকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। মূলত এখানেই . ইয়াহ্ইয়া মান্নানের গবেষণা সাহিত্যচর্চার স্বার্থকতা। অফসেট কাগজে ছাপানো ৩৭ ফর্মার সাহিত্য গবেষণামূলক সমৃদ্ধ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে রাজধানী ঢাকারইত্যাদী গ্রন্থ প্রকাশ বাংলা সাহিত্যের ছাত্র কিংবা সমাজ-সংস্কৃতি সচেতন যে কোন ব্যক্তির কাছে বইটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য।      
 
লেখক: এম.ফিল.গবেষক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গাজীপুর।

 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

#গ্রন্থালোচনা
#বইআলোচনা
#বইপত্র
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#Molakat
#Book_Review
#Book_Discussion
#Literature
#Bengali_Literature
#রায়হান_আজাদ
#_ইয়াহ্ইয়া_মান্নান

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.