তবু তারাউজিয়াল গ্রামের বৃষ্টি ফুরোয় না ।। তাজ ইসলাম

 
অশ্রু প্রজেক্টের অতি মুল্যবান কিছু অশ্রু যা আইভরি কোষ্টের হীরার চেয়েও খাঁটি, ওয়াটারফোর্টের ক্রিস্টালের চেয়েও স্বচ্ছ, কিছু অশ্রু নিয়ে
"সেই গভীর গহীন মধ্যরাত থেকে/
অশ্রুগুলো চোখের সামনে নিয়ে বসে আছি।
অথচ কাউকে পাচ্ছি না,
যার কাছে জলরঙে আঁকা এই সব মহার্ঘ রচনা রেখে-
আমি ঘুমুতে যাব।(অশ্রু প্রজেক্ট)।
অশ্রু নিয়ে অপেক্ষমান এরকম খাঁটি আর স্বচ্ছ অশ্রু দিয়ে গড়েছেন (অশ্রু প্রজেক্ট) এবং অশ্রু দিয়ে বহমান করছেন কবির নিজস্ব ছোট নদী।কবি আবদুল হাই শিকদার যখন জানতে পারলেন "তারাউজিয়াল গ্রামে বৃষ্টি নামলো" তখন তিনি "প্রাকৃতিক অশ্রুর রিংটোন" বাজাতে বাজাতে ছুটে চললেন তারাউজিয়াল গ্রামে। "তারাউজিয়াল কি কেন কোথায় কীভাবে- এসম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিল না।" এই স্বীকারোক্তি কবি আবদুল হাই শিকদারের। কবি আবদুল হাই শিকদার তারাউজিয়াল না চিনলেও আমরা কাশবন প্রকাশনের সৌজন্যে প্রকাশক আমিনুল ইসলামের মাধ্যমে খুব ভাল করেই জানতে পারলাম, এটি বইমেলা ২০১৬ এ প্রকাশিত "তারাউজিয়াল গ্রামে বৃষ্টি নামলো" শীর্ষক একটি কাব্য গ্রন্হ। কবি আবদুল হাই শিকদারের  কততম গ্রন্হ এটি তা বলা যাচ্ছে না, কারণ ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে তার শতাধিক গ্রন্হ।
 
কবি আবদুল হাই শিকদার বাংলাদেশে একজন জনপ্রিয়ও পরিচিত ব্যাক্তিত্ত্ব। বহুমাত্রিক বিশেষণের অধিকারী। বিশিষ্ট নজরুল গবেষক, সুবক্তা, খ্যাতিমান কবি, কলামিষ্ট, সাংবাদিক, সাংবাদিক নেতা, রাজনীতিবীদ, বুদ্ধিজীবি ইত্যকার অনেক পরিচয়েই তাকে পরিচিত করা যায়। এক কথায় সমগ্র বাংলাদেশের ব্যাপক পরিচিত এমন একজন ব্যাক্তি যিনি নিজেই একটি প্রতিষ্টান তুল্য। "তারাউজিয়াল গ্রামে বৃষ্টি নামলো" তারই নির্মিত হৃদয় নিংড়ানো কিছু কাব্য পঙক্তির মলাটবদ্ধ অবয়ব।
 
আবদুল হাই শিকদার আপাদমস্তক কবি এবং রাজনীতি তার অস্হিমজ্জায়, তাই তিনি উচ্চারণ করতে ভয় পান না "প্রফুল্ল মারা গেছেন ক্রস ফায়ারে" (পশ্চিম কিনারের পরিস্হিতি) রাজনীতি করেন বলেই তিনি লিখতে পেরেছেন "লাশ রাষ্টের মনতাজ"। একবারও ভাবেননি এতে তিনি হতে পারেন বিদ্রোহী অথবা রাজদ্রোহী। দুটোই বর্তমান অসহিষ্ণু সময়ে ডেকে আনতে পারে ভয়ংকর পরিনতি। কবি অবলিলায় বর্ননা করেন-
"রাষ্ট তাকে রক্ষা করেনি দাঁড়ায়নি পাশে এসে
নদীতে ভাসছে লাশ
… সংসার তার ভেঙেছে হৃদয়
রাষ্ট তাকে করেছে গুম
… ক্ষত বিক্ষত নদীতে ভাসছে লাশ।

রাষ্ট তাকে ফিরিয়ে দেয়নি
ফিরিয়ে দিয়েছে নদী
--নদীর জন্য রিমান্ড চেয়েছে র‌্যাব! একটি সময়ের কঠিন বাস্তবতাকে, একটি মহলের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে, একটি ভয়ংকর অবস্হাকে কবিতায় চিত্রিত করা অবশ্যই সাহসিকতার কাজ। কবি লাশ রাষ্টের ছত্রে ছত্রে সেই সাহসের বীজই বুনন করেছেন। তিনি পরোয়া করেননি বিদ্রোহী অথবা রাজদ্রোহীর পরিনতিকে। এতে হয়তো হতে পারে ক্ষতি বা বিনাশ তবু ভয় নেই। সত্য তিনি বলবেন, মিথ্যা হয়তো করতে পারে তার সাময়িক ক্ষতি, তবু কবি সাহসের ডানা মেলে উড়বেন আকাশে। তার জানা হয়ে গেছে  "ধ্বংস চিরকাল সৃজন সঙ্গী (ধ্বংস ও সৃজন)।
 
ক্ষমতার রক্তচক্ষুকে বৃদ্ধাঙ্গুল, অথবা অপশক্তির মুখোশ উন্মোচনই যেন তার কবিতা লেখার অন্যতম অনুসঙ্গ। কবির সাহসি উচ্ছারণের দৃষ্টান্ততুল্য পঙক্তি এই বইয়ের প্রায় পৃষ্টায় মুদ্রিত। তার একটি,
"যত্রতত্র কাশিম বাজার
আকাশে কেবল উমিচাঁদ,
জগৎশেঠের ড্রাকুলা দম্ভে
সবকিছু বরবাদ
........চারদিবে আজ মীরজাফর আর
ক্লাইভের চাপরাসীরা
ঘোর চক্করে সর্ষে দেখছে
ক্ষুব্ধ দেশের বাসীরা
(আর কোন পলাশী নয়)।
 
কবি অনলবর্ষী বক্তা, বক্তব্যের অনলপ্রবাহ কবিতার শরীরেও লেপ্টে আছে। বেশ কয়েকটি দীর্ঘ কবিতা স্হান পেয়েছে এই বইয়ে, এর একটি ইবাদতগুলি প্রার্থনাগুলি, আরেকটি- পাকিস্হান: প্রক্ষিপ্ত উৎক্ষিপ্ত বিক্ষিপ্ত পঙক্তিমালা। তার দীর্ঘ কবিতা গুলোতে এত বেশী বক্তব্য এসেছে যে এর একেকটি আলাদা আলোচনার দাবী রাখে।
        
কবিতার শরীর রাঙিয়েছেন মুন্সিয়ানার সাথে উপমা উৎপ্রেক্ষা আর চিত্রকল্পের সাজে। ছন্দের সাবলিলতা দীর্ঘ বক্তব্য প্রধান কবিতাকেও করে তুলেছেন সহজ এবং আবৃত্তিযোগ্য। কুড়িগ্রামের ভুরিঙ্গামারীর কৈশোর স্মৃতি কবিকে ব্যাকুল করে তুলে। তার ব্যাকুলতা কবিতা হয়ে ঝরে পড়ে ঝরনার জলের মত। তার মমতা জড়ানো বাণী "এ নদী নদীতো নয়, মমতা ও সমতার ঢেউ" (দুধ কুমার)। কবি'র এই বইখানা পাঠ করে আমার কেন জানি মন বলতে লাগল আহ আমার স্বদেশ!  আমার স্বদেশেও যদি তারাউজিয়ালের মত একটা গ্রাম থাকতো যে গ্রামের "বৃষ্টি ইহুদিদের মত সন্দেহপ্রবন নয় / কিংবা নয় জাপানী সাহিত্যের মত অতিমাত্রিক জ্যামিতিক। (তারাউজিয়াল গ্রামে বৃষ্টি নামলো)।
 
আবদুল হাই শিকদার কবিতার মানুষ, প্রাজ্ঞজন, বিশিষ্ট ব্যাক্তিত্ব। তার কবিতায় শালা সুমুন্দদির উৎপাত, কবিইবা কি করবেন, তারতো "শ্যাম্পেইন নাই শালা সুমুন্দি আছে"। কবি'র পরিচিতিতো সর্ব মহলে, কি করে বলি কিছু কথা "শ্যামলীর মতো বিরক্তিকর"।
 
আবদুল হাই শিকদারের কবিতা মানেই শ্রুতি মধুর, আবৃত্তির মেজাজে পূর্ণ, প্রতিবাদী আওয়াজ, সময়ের বলিষ্ট কন্ঠস্বর, দেশপ্রেমের উজ্জল শব্দমালা ভালবাসা আর স্মৃতির রোমন্হন। সব মিলিয়ে "তারাউজিয়াল গ্রামে বৃষ্টি নামলো" কাব্য পুস্তকখানা বাংলা ভাষাভাষী কাব্য রসিকদের জন্য অন্য মাত্রার একটি বই। বইটি প্রকাশ করেছে কাশবন প্রকাশন, ঢাকা। প্রচ্ছদ করেছেন আফসার নিজাম। প্রকাশ কাল একুশে বইমেলা ২০১৬। মুল্য ১৫০ টাকা, পৃষ্টা ৮০। বইটি পৌছে যাক পাঠকের হাতে হাতে। প্রয়োজনে হোক তার পুনঃমুদ্রন।
 
কবি, ছড়াকার, সাহিত্য সমালোচক, সংগঠক ও চিকিৎসক
 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

#গ্রন্থালোচনা
#বইআলোচনা
#বইপত্র
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#Molakat
#Book_Review
#Book_Discussion
#Literature
#Bengali_Literature
#তাজ_ইসলাম
#আবদুল_হাই_শিকদার

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.