বিভূতির বিষণ্নতা ।। নুরুল্লাহ মাসুম

 
আরিফের ঘুম ভাঙ্গে হট্টগোলের শব্দেবেলা ৭টা  হবে হয়তোগত রাতে দম দেয়া ঘড়িটা অচল হয়ে আছেসময় দেখাচ্ছে দুটো- এর মানে হলো রাত দুটোর দিকে ঘড়ির দমটা শেষ হয়েছেচৌমাথার চায়ের দোকানটায় না যাওয়া পর্যন্ত সময় মেলানো যাবে না
বিছানা ছেড়ে পুকুর পাড়ে যেতে যেতে শুনতে পায় ঘটনার বিবরণবাড়ীর মহিলারা খানিকটা তারস্বরেই মাতম করছে-
-কি হবে, কি হবে! গজব নাজিল হলো নাকি‍!
পাশের বাড়ী চাচী তো আরো এক কদম এগিয়ে, তিনি প্রায় চিৎকার করে বলে চলেছেন
-আল্লাহর গজব পড়ছেজমিদারগো পাপের ফল এইডালগে আমরাও শ্যাষ হইয়া যামু
 
আরিফ বাড়ীর মহিলাদের কথায় কান দেয় নাজানে, এখানে তিলকে তাল করার জন্য সকলে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়পুকুরঘাট থেকে ফিরতে ফিরতে ছোট বোনটাকে ডাকে
-কই রে রুনু, মুড়ি-টুরি কিছু দিবি?
রান্নাঘর থেকে রুনু উত্তর দেয়
-দিতাছি ভাইজান, আপনে ঘরে যান
মা নেই সংসারেইন্তেকাল করেছেন বছর দুয়েক হলোচাচীই সংসার সামলানরুনু তাকে সাহায্য করার মতো বয়সে পা দিয়েছেএ বছর রুনু চৌদ্দতে পা দিলো
মুড়ি আর এক গ্লাস বেলের সরবত নিয়ে রুনু আরিফের ঘরে আসে
-ভাইজান, ঘরে মাছ নাইবাজারে যাইবেন? টাকা-কড়ি আছে কিছু?
-চিন্তা করিস নাদুপুরের আগেই বাজার নিয়া আসমু
 
শ্যামলালের চায়ের দোকানে এসে এককাপ লাল চা দিতে বলে আরিফধ্রুব, শমসের, শশাঙ্ক, অরবিন্দ- অনেকে সেখানেআরিফকে দেখে সকলে একসাথে কাছে আসেওরা চা খাবে, না খেয়েছে জানতে চায় আরিফশশাঙ্ক ছাড়া কেউই চা খাবে না জানায়; তার মানে খানিক আগে ওরা চা-পর্ব শেষ করেছে
শশাঙ্কই জানায়, অবাক করা সেই কান্ডটার কথাবিষ্ময়ে সকলে হতবাক! ওরা জানে এর ব্যাখ্যা, ভাল-মন্দ কেবল আরিফই বুঝতে পারবে বা বলতে পারবে
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ শুনতে শুনতে আরিফ চা শেষ করেসকলে একসাথে সামনে এগোয়বাড়ীতে বাজার নেই, প্রথমেই আরিফ বাজারের দিকে এগায়কেনাকাটা শেষ করে শমসেরকে বলে বাজারের ব্যাগটা বাড়ী পৌঁছে দিতেশমসের ওর চাচার ছেলে
এবার দলটার গন্তব্য দত্ত বাড়ীর দিকে-‍‌ সন্ধ্যা নদীর তীরেবাজার থেকে প্রায় মাইল দেড়েক পথগাঁয়ের কাচা রাস্তা ধরে ওরা এগিয়ে চলেজ্যৈষ্ঠের প্রায় শেষবেশ গরমদখিনা হাওয়ার বেগটাও বেশবেলা বাড়ছে, তাপও বাড়ছেঘাম ঝরলেও পথ চলতে খুব একটা কষ্ট হয় না ওদের
কিছু দূর যাওয়ার পর আরিফের সাথী কেবল ধ্রুববাকীরা যে যার বাড়ীর দিকে পা বাড়ায়
-কেন এমন হয় রে আরিফ?  প্রশ্ন করে ধ্রুব?
-আগে তো যাই ওখানে, পরে ভাবা যাবেউত্তর আরিফের
পথ চলতে গিয়ে দুচার জন পথচারীর দেখা মেলেঅবাক বিষয় হলো, প্রায় সকলেই পরিচিত হলেও কারো মুখে কোনো কথা নেইএকটা নিরব আতঙ্ক বিরাজ করছে সকলের মাঝে
ধ্রুব বেশ চিন্তিতআরিফ নির্বিকারসে কি কিছু ভাবছে? ধ্রুব কথা বলার বা প্রশ্ন করার সাহস পায় না
আরিফ বয়সে যুবক হলেও গ্রামের মুরুব্বীরা পর্যন্ত তাকে মান্য করেহিসেবে মধ্যে রাখে, কেবল সরকার মশাই ছাড়া
সরকার মশাই, আসল নাম বিভূতি শীলদত্তবাড়ীর সরকারযখন জমিদারী ছিল, তখন তার দাপটের কথা একালের সকলেই শুনেছেআরিফও জেনেছে বিভূতি শীলের দাপুটে স্বভাবের কথা
জমিদারীর অবসান হয়েছে প্রায় বছর পঞ্চাশ হলোবিভূতি সরকার এখন জীবনের শেষ প্রান্তেজমিদার অরূপ দত্ত দেহত্যাগ করেছেন, তাও তিন যুগ হতে চললোছোট বাবু, জীবন দত্ত কলকাতায় থাকেনপৈত্রিক সম্পত্তি থেকে আয়ের একটা অংশ এখনো সরকার মশাই নিয়মিত সেখানে পাঠিয়ে দেনযদিও আয়ে ভাটা পড়েছে অনেক দিন হলোএখন আর রায়ত নেই, আছে বর্গাদারএটাই এখন দত্ত বাড়ীর একমাত্র আয়ের বড় উপায়বাগানের ফল-ফলাদি বেঁচে কিছুটা আয় হয় বটেজমিদারী হিসেবে সেই অঙ্কটা বেশী কিছু নয়তবে আরিফদের মত একটা বনেদী পরিবারের বার্ষিক আয়ের অন্তত দশগুন হবে-  ওদের বাগানের ফল বিক্রির আয়
 
আরিফের পিতামহের পিতামহ- যাকে সাধারণভাবে বলা হয় বড়দাদা, শাহ আজিম-উশ-শান ছিলেন মোঘল আমলের বিশিষ্ট ব্যক্তিবড় জ্ঞানী মানুষ ছিলেন তিনিদশ গাঁয়ের লোকজন তাঁকে মান্য করতোআরিফ জেনেছে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া এক চাচার কাছে- বড় দাদা এক সময়ে ঢাকা দেওয়ানের উপদেষ্টা ছিলেনশান-শওকত ছিল বেশগাঁয়ে এলে পালকীতে চড়ে বেড়াতেন
সেই শান-শওকত ধুলোয় মিশে যায় ইংরেজরা এদেশে আসার পরশাহ আজিম-উশ-শান নিহত হন ১৮৫৭ সালের মহা বিদ্রোহের সময় বেনিয়া ইংরেজদের হাতেঢাকা থেকে সন্ধ্যা তীরের এই পল্লী অনেক অনেক দূরে হওয়ায় বেঁচে যায় তার পরিবারতবে হারাতে হয় বহু সম্পত্তি ও সম্পদমুসলমান জমিদারদের স্থান দখল করে নেয় হিন্দু জমিদারগণবেদখল হয় বহু জমি-জিরাতএত কিছুর পরও শাহ পরিবারের সম্পত্তিতে খুব একটা কমতি ছিলো না
ওদের অঞ্চলের বড় ব্যবসায়ী, গয়না নৌকার মালিক দত্ত পরিবার ইংরেজদের কাছ থেকে জমিদারী স্বত্ত্ব লাভ করেএক সময় শাহ পরিবারের কাছে দায়বদ্ধ ছিলো যে দত্ত পরিবার; জমিদারী লাভ করে শাহ পরিবারকে কোনভাবে অসম্মান করেনি তারা
দিন বদলের সাথে বাণিজ্যে দখলদারিত্বে দত্ত পরিবারের আধিপত্য বাড়তে থাকে- কেননা জমিদারী এখন তাদের হাতেসময়ের সাথে সাথে অন্যান্য মুসলিম সচ্ছল পরিবারগুলোর মতো আভিজাত্যের দিক থেকে শাহ পরিবারের আভিজাত্যও ম্লান হতে থাকে; ধ্বস নামে তাদের পারিবারিক ঐতিহ্যেরএর যৌক্তি কারণও খুঁজে পেয়েছে আরিফদিনে দিনে আয়ের পথ সংকুচিত হলেও ব্যয়ের মাত্রা কমেনি কখনোপারিবারিক আভিজাত্য বজায় রাখতে গিয়ে প্রত্যেক সামর্থ পুরুষের চার-চারটে বিবি ঘরে থাকতে হবে; ফলে সন্তান-সন্ততির সংখ্যা বাড়ছিলো আগের মতোইঅভাবের দিন খুব দ্রুত এগিয়ে আসে শাহ পরিবারের উত্তরাধিকারদের মধ্যে
আভিজাত্য ছেড়ে সাধারণ মানুষ হিসেবে নিজেদের মানিয়ে নিতে শাহ পরিবারকে দু-দুটো জেনারেশন অতিক্রম করতে হয়েছে
আরিফের পিতা ইংরেজি পড়েছিলেন পারিবারিক ঐতিহ্য ক্ষুন্ন করেকলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে পাশ করেছিলেপিতার সেই সার্টিফিকেট আরিফ সযতত্ন আগলে রেখেছে আজোপিতা বৃটিশ প্রবর্তিত ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন একসময়েদশ গাঁয়ের হিন্দু মুসলমানরা তাকে মান্য করতোআরিফ শুনেছে এসব কথাদেখলেও মনে থাকার কথা নয়আরিফের বয়স যখন ছয় বছর তখন তার পিতা মারা যানসে বছর নাকি মহামারি আকারে কলেরা দেখা দিয়েছিল
পিতার কথা মনে হতেই আরিফের মনটা বিষন্ন হয়ে যায়
 
এতক্ষণ ধ্রুব নিরবে আরিফের সাথে পথ চলছিলোধ্রুবর কথায় আরিফ ইতিহাসের পরিক্রমা ছেড়ে ফিরে আসে বাস্তবে
-কি করবো আমরা ওখানে গিয়ে? জানতে চায় ধ্রুব
-আগে তো যাই সেখানে
-চলেই তো এসেছি
-আচ্ছা
দত্ত বাড়ীর দক্ষিিণ দিকে বিশাল কালী মন্দিরসেখানটায় বেশ কয়েকজন দাঁড়িয়ে- এই তপ্ত রোদের মধ্যেও; অবশ্য বড় বট বৃক্ষের ছায়ায়দত্ত বাড়ীটা দূর থেকে ভুতুরে বাড়ী বলে মনে হয়কালী পূজা ছাড়া সারা বছরই মন্দিরটা ফাঁকা পড়ে থাকেপারত পক্ষে কেউ ও দিকটা মাড়ায় না
গত রাতে অবাক ঘটনা যেটা ঘটেছে আরিফ তা শুনলো বিভূতি সরকারের মুখে-
গত রাতে, গভীর রাতে মা বাসন্তী মহাদেবসহ সন্ধ্যা নদীতে আত্মাহুতি দিয়েছেনসরকার বাবু তার কথার প্রমান হিসেবে মন্দির থেকে সন্ধ্যা নদী পর্যন্ত- দূরত্ব প্রায় আধা মাইল, মায়ের পায়ের চিহ্ন দেখালেনআরিফ দেখে, মায়ের কথিত পায়ের চিহ্ন বেশ বড় আকারের, হয়তো কোনো শ্রমজীবী মানুষের- কোনো ভাবেই তা কোন নারী পদচিহ্ন নয়
মন্দির চত্তরে যে-ই আসছে, সরকার বাবু কেঁদে কেঁদে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন আর ধুতির আঁচলে চোখ মুছছেনসকাল থেকে এতোবার তিনি চোখ মুছেছেন যে, তার চোখ দুটো লাল হয়ে আছেআরিফের মনে হলো যতটা না চোখ মোছার কারণে, তার চেয়ে বেশী নির্ঘুম রাত কাটানোর কারণে সরকার বাবুর চোখ লাল হয়ে আছে
সরকার বাবু এবার দত্তবাড়ীর মুরুব্বীদের নিয়ে মন্দিরের সিঁড়িতে বৈঠকে বসলেনআলোচনার মূল বিষয়- মা চলে গেলেনআত্মাহুতি দিলেনএটা দত্ত বাড়ীর অমঙ্গল বয়ে আনার সুস্পষ্ট লক্ষণপরোক্ষভাবে তিনি ছোট বাবুকেই দায়ী করলেনদুকলম ইংরেজি শিখে সে নাকি মাকে অবজ্ঞা করতো! বাবা-ঠাকুরদার ভিটে ছেড়ে কলকাতায় বাবুদের সাথে থাকার কারণেই নাকি মা আত্মাহুতি দিয়েছেন; অন্তত সরকার বাবু তাই বিশ্বাস করেন এবং বৈঠকে উপস্থিত সকলকে বিশ্বাস করাতে চাইছেন
আরিফ জানে, বিভূতি শীল তথা সরকার মশাইয়ের তিন-তিনটি পুত্র বনগ্রাম তাকে, সেখানে তাদের মস্ত ব্যবসা রয়েছে ইংরেজ বেনিয়াদের সাথেশুনেছে লবনের ব্যবসা করে ওরা বেশ ফুলে ফেঁপে উঠেছেওদের লবনের সব আড়ৎ ইছামতি নদীর তীরে হাসনাবাদের গাঁয়ে
আরিফ সব বোঝে, কাউকে বোঝাতে পারে না, বলতে পারে নানিজের পায়ের তলাতেই যে মাটি নেইছোট বোনটাকে বেশী পড়াতে পারে নি চাচার কারণেচাচা বলেন, মেয়েদের বেশী পড়াতে নেইকোরান শিখে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারলেই বেহেস্ত নিশ্চিতমেয়েদের আর কি চাওয়ার আছে! অর্থ সংকটের কারণে মেয়েটাকে পাত্রস্থও করা যাচ্ছে না
আরিফ ভাবে বোনটার একটা গতি করতে পারলে সে গ্রাম ছেড়ে ঢাকা চলে যাবেকলকাতা তার পছন্দ নয়, তবে হুগলি গেলে মন্দ হয় নাবাবাও একসময় হুগলি থাকতেন- মনের অজান্তে হুগলি নিয়ে নস্টালজিয়ায় ভোগে সেতবে বোনটাকে ফেলে যায় কি করে!
 
দত্ত বাড়ীর আহাজারী কমে নাছোট বাবুও কলকাতা ছেড়ে গাঁয়ে আসেন নাঅন্তপুরে কান্নার রোল ক্রমাগত বাড়তে থাকেদিনে দিনে অন্তপুরে জনসংখ্যা কমতে থাকেসন্ধ্যাপাড়ে চিতার উত্তাপও বাড়ে ক্রমাগত- সংখ্যাতত্ত্বে
বিভূতি শীল ওরফে বিভূতি সরকারের দেহটাও ধীরে ধীরে নরম হতে থাকেতবে বাড়ে তার মুখের উজ্জলতাইদানিং তার হাসিটা আরিফের  কাছে বেশ রহস্যময় মনে হয়বিভুতি আরিফকে একদম পছন্দ করেন নাতবে জমিদার বাড়ীর ঐতিহ্য মেনে আরিফকে অসম্মানও করেন না
 
বাসন্তী মায়ের চলে যাবার পর দত্ত বাড়ীতে ঘটতে থাকে একের পর এক অঘটনবড় রাণীমা নদীতে ডুবে মরলেনঅথচ এই নদীতেই তিনি গা ভাসিয়েছেন ছোট বেলা থেকেসাঁতার কেটেছেন নদীতে- জমিদার বাড়ী থেকে মাইল পাঁচেক দক্ষিণের এক গ্রামে১৪ বছর বয়সে জমিদার বাড়ীর বড় বউ হওয়ার পরও তার স্নান নিয়মিত সম্পন্ন হতো এই সন্ধ্যা নদীতেইতিনি তার চির পরিচিত সন্ধ্যা নদীর ঘাটে ডুবে মরতে পারেন, সকলে বিশ্বাস করলেও বিশ্বাস হয় না আরিফেরএ নিয়ে কোন কথা বলে লাভ নেই জেনে আরিফ কিছু বলে নাবিভতি বাবুর একটা সুনাম আছে দশ গাঁয়েদত্ত বাড়ীর বিপদে আপদে সব সময় তিনি আছেননিজের সংসারের সদস্যদের চেয়ে তিনি জমিদার পরিবারে বেশী সময় দেনএনিয়ে সরকার বাবু বলেন, “এই দত্ত বাড়ী আমার অন্নদাতাএই বাড়ীর কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিমরতে হলেও এই বাড়ী ছাড়বো না
বাহবা দেয় সকলে
 
আরিফ জানে কিছুটা, তবে বোঝে পুরোপুরিবিভতির পরিবার থাকে বনগ্রামেবছরে দুবার সেখানে যান বিভতি সরকারআরিফ এও জানে বিভূতি শীল কি করে বিভতি সরকার হয়েছেনদশ গাঁয়ের শীল স¤প্রদায়  বিভতিকে আগে হিংসে করলেও এখন মান্য করেভুল করে না, ইচ্ছে করে নরসুসন্দরের কাজ করতে গিয়ে ঘারের উপর ছুরিটা একটু দাবিয়ে দেয়ার কৌশল বিভূতি ভালই রপ্ত করেছিলেন তরুণ বয়সেএই যোগ্যতাই তাকে শীল থেকে সরকার হতে সহায়তা করেছিলো বলে আরিফের মতো আরো দুচারজন জানেবাকীরা এনিয়ে মাথা ঘামায় নি কখনো
বড় রাণীমার সৎকারের সময় বাড়ীর কাউকে তার মরদেহ ছুঁয়ে দেখতে দেয়া হয়নিপুরুত ঠাকুর বলেছেন, শাস্ত্রমতে তাকে শেষ যাত্রায় সজ্জিত করতে পারবে কেবল নির্দিষ্ট কয়েকজন দাসীজমিদার পরিবারের কেউ নয়রহস্যটা আরিফের মনে দাগ কাটে দারুন ভাবে
ঠাকুমার সৎকারে ছোট বাবু এসেছিলেমাত্র তিন প্রহর থেকে যে গয়না নৌকায় এসেছিলেন সেটিতে করেই ফিরে যানশ্রাদ্ধ করার সমস্ত দায়িত্ব দিয়ে গেলেন সরকার বাবুকেপুরুত ঠাকুরকে দিয়ে বিধান করিয়ে নিয়েছিলেন তিনি
 
বড় রাণীমার শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পর দত্ত বাড়ীতে একটা থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করেছোট বাবুর আচমকা চলে যাওয়া নিয়ে যে অস্থিরতা দেখা দেয় তা দত্ত বাড়ীর সীমানা ছাড়িয়ে প্রজাদের মনেও ক্ষোভের সঞ্চার করেযদিবা মুখ ফুটে কেউ কিছু বলার সাহস পায় নাবামন ঠাকুর তো অনেক আগেই মুখে কুলুপ এঁটে বসে রয়েছেন
অন্যান্য জমিদারীর মতো দত্ত বাড়ীর পাইক-পেয়াদাদের মধ্যেও সবকিছুতে একটা প্রাধান্য বিস্তারের লক্ষণ ফুটে ওঠে এই সময়েএতদিন পাইক-সরদার বিভূতি বাবুর কথামতো চললেও সে এবার প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেউষ্কে দেয় পাইক-বরকন্দাজদেরএদের অধিকাংশই নিম্নবর্ণের হিন্দুজন দশেক দরিদ্র মুসলমানও রয়েছে তাদের মধ্যেপাইক-সরদার জাতে ক্ষত্রিয়রক্তে তার আগুন জ্বলেক্ষেপে ওঠে পাইকরামুসলমান পাইকদের কেউ কেউ আরিফের স্মরণাপন্ন হয়
সব বুঝেও আরিফের কিছু করার থাকে না প্রকাশ্যেওদের বোঝাতে চেষ্টা করে, বিভূতি সরকারের ক্ষমতার পরিসীমাক্ষত্রিয় পাইক-সরদার নিজেই এতদিন আরিফের দারস্থ হয়
পাইক সরদার কাজে ইস্তফা দিয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে যায় জমিদারী এলাকা থেকেকোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না তাকেএই সুযোগে বিভতি নতুন পাইক-সরদার নিয়োগ করে বামন ঠাকুরদের সাথে পরমর্শ করেঅবস্তা শান্ত হয়
 
বছর কয়েক বাদে-
থানা চৌকি থেকে এক দারোগা দুজন সেপাই নিয়ে নৌকা ভেড়ায় দত্ত বাড়ীর ঘাটেসাথে বিশ্বজিৎ, উধাও হয়ে যাওয়া সেই পাইক-সরদারবেলা দ্বিপ্রহরের মধ্যে ঘটনাটা চাউর হয়ে হয়ে যায় এলাকায়
 
ঘুম ভাঙ্গার পর গত রাতের কথা আরিফের মনে হয়বিভতি বাবু এসেছিলেন গভীর রাতে- রাত ত্বিপ্রহরের পরে, একাকীসাধারণত রাতে তিনি একাকী চলাফেরা করেন না
বিভূতি আরিফকে যথেষ্ট সম্মান দেখিয়ে কিছু কথা বলেনতিনি স্মরণ করেন শাহ পরিবারের দয়ালু স্বভাবের কথাকৃতজ্ঞতা জানান আরিফের পূর্ব পুরুষদের প্রতিআরিফ অবাক হলেও বিশ্লেষণ করার সুযোগ পায়নিহঠাৎ বিভূতির এই পরিবর্তন কেনকেনই বা এত রাতে তিনি আরিফের সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন! আপাত দৃষ্টিতে সৌজন্য সাক্ষাৎ মনে হলেও আরিফ বোঝে- এর অন্তর্নিহিত কারণ একটা রয়েছেহিসাব মেলাতে চেষ্টা করে বিছানায় গিয়ে
বিভূতির একটা কথা আরিফের কানে পরিস্কার বাজে- হাঁটু সোজা রেখে চললে সামনে এগুতে পারবেন না বাবাকথাটার অর্থ বোঝার চেষ্টা করে আরিফবিদায় নেয়ার সময় বলা বিভূতির আরেকটা কথার মানে খোঁজে আরিফ- এই গাও-গেরাম আপনার জয়গা নয়, পথ খুঁজে নিন সময় থাকতে
নাস্তা শেষ হতে না হতেই দত্ত বাড়ীতে দারোগা পুলিশের আগমনের সংবাদ চলে আসে আরিফের কানেস্থানীয় চৌকিদার মান্নান মিয়া সংবাদ বয়ে আনেদারোগা বাবু আরিফের সাক্ষাতরে অপেক্ষারত, সেই সংবাদটাও দেয় আরিফকে
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, সাবেক পাইক-সরদার বিশ্বজিৎ কলকাতা গিয়ে ছোট বাবুর সাথে দেখা করে বিভূতির নামে নালিশ করে, ছোট বাবুকে দিয়ে বিভূতির বিরুদ্ধে বড় রাণীমাকে হত্যার অভিযোগ এনে আদালতে মোকাদ্দমা দাখিল করায়দারোগা এসছেনে বিভূতির নামে পরোয়ানা নিয়ে
আরিফ জানতে পারে, বিভূতি বাবু গত সন্ধ্যা রাতে দত্ত বাড়ীতে শেষবারের মতো এসেছিলেনসকাল থেকে তাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না
শংকিত হয় আরিফ! তাহলে কি পালাবার পথে বিভূতি তার সাথে দেখা করেছিলো? আরিফকে এলাকা ছেড়ে চলে যাবার পরার্মশ কি তাহলে নিজেকে রক্ষা করার জন্য! বিভূতি জানতো, তার অপকর্ম কেউ না বুঝলেও আরিফ বুঝতোবিভূতি কি জানতে পেরেছিলো বিশ্বজিৎ কলকাতা গেছে? কি ঘটতে যাচ্ছে, চতুর বিভূতি নিশ্চয়ই আঁচ করতে পেরেছিলোনইলে দারোগা আগমণের আগেই সে গা-ঢাকা দিলো কি করে!
চৌকিদার মান্নানের সাথে আরিফ রওয়ানা দেয় দত্ত বাড়ীর উদ্দেশ্যেদারোগা বাবু অপক্ষো করছেন যে
দারোগা কিংবা অন্য কেউ কি জানতে পেরেছে, গত রাতে আরিফের সাথে বিভূতির সাক্ষাতের কথা! কি জানতে চাইবেন দারোগা বাবু? কি জবাব দেবে আরিফ? আরিফকে ফাঁসানোর মতলব করেনি তো কেউ?
এমন সব ভাবনা মাথায় নিয়ে আরিফ দত্ত বাড়ীর দিকে বা বাড়ায়- বাড়তে থাকে রোদের তীব্রতা
 
রচনাকাল: জুলাই-নভেম্বর ২০১৮, খুলনা

⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN

🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

#গল্প
#ছোটগল্প
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#Molakat
#ShortStory
#Story
#Literature
#Bengali_Literature
#নুরুল্লাহ_মাসুম

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.