মাঘী পূর্ণিমা ।। সায়মা ইসলাম

 
ঘররে বেড়ার ফাঁক ফোঁকর গলে আসা শিরশিরে হিমে বুকের ভেতর থিরথিরে কাঁপুনি ওঠে, ঠকঠকিয়ে কাঁপতে থাকে মর্জিনার পাঁচ দশকের চিমসে যাওয়া চামড়ায় আবৃত হাড্ডিগুড্ডি। রঙ বেরঙের তালি মারা ভারী তিনখানা কাঁথার নীচে শরীরটা কুন্ডুলি পাকিয়ে সোয়ামির কথা ভাবতে ভাবতে ফেলে আসা জীবনের উষ্ণতায় ডুব দিয়ে ওম খোঁজে মর্জিনাগেল বছর আদুরীর বাপ বাঁইচা ছিল। দুইজনের হাত পা একলগে গিট্টু পাকায়া, শরীরে শরীর মিশায়া কাঁথা মুরি দিয়া শুইলে গায়ের ওমে মাঘের বাঘ কাঁপাইনা শীত বিলাইয়ের লাহান লজ গুটায়া পলাইত।আপন মনে বিরবির করে সে, ‘জম্মের শীত পড়িছে এই বচ্ছর। দিন পনেরো বাদেই আলমের বিয়া, জলদি আর কয় খান খ্যাতার পত্তন না দিলে চলে না।এই মাঘে একলা বিছানে শুয়ে সোয়ামির স্মৃতিতে মনটা বড়ো উতলা হয়ে উঠে মর্জিনা খাতুনের। বুকের গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাস বের করে দিয়ে আবছা অন্ধকারে শূন্য দৃষ্টিতে ঘরের চালার দিকে চেয়ে থাকে মর্জিনা
 
মর্জিনা যেদিন এই বাড়ির বউ হয়ে এল, কতকাল আগের কথা; দিন, মাস, বছরের হিসাব ঠাহর করতে পারে না সে। মর্জিনার বয়স তখন চৌদ্দ কি পনেরো হবে। মাঘ মাসের এক জুম্মারবার, হাড় কাঁপানো শীত পড়েছিল সেইবার।
 
মর্জিনার বাপজান ছিল গরীব দিনমজুর মানুষ। ঋণধার করে মেয়ের জামাইকে যৌতুক বাবদ নগদ দশ হাজার টাকা,  মর্জিনার সঙ্গে চার পাঁচ হাত একখানা লেপ আর দুইখানা শিমুল তুলার বালিশ দিয়েছিল। বালিশ দুইখানা মর্জিনার বাসরে উঠলেও, বাপের দেয়া লাল টকটকে লেপখানা কিন্তু তার বিছানায় উঠেনি। সেই মাঘ মাইসা পূর্ণিমা রাতে, ভাঙা চালার ফাঁক গলে  ঘর ভরা চান্দের আলোয় বাপের দেয়া লেপের কথা ভুলে গিয়ে সোয়ামির বুকের ওমে অচেনা এক উষ্ণ  স্রোতে ভেসে গেল কিশোরী মর্জিনা।
 
নতুন বউ...মানুষজন ঘাটে আইবার আগেই নাইয়া নেও। পাকপবিত্র হইয়া পরথম শাশুড়িরে সালাম কইরা পরে ঘরের কামে হাত দিবা।পরদিন মোরগ ডাকা বিহানে জা রহিমনের ডাকে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে গায়ের কাপড় ঠিকঠাক করে ঘরের কপাট খুলল মর্জিনা। মর্জিনাকে পথ দেখিয়ে ঘাটের দিকে যেতে যেতে মুড়ির মত ফুটতে থাকে রহিমন ,‘বাসর রাইত কেমুন কাটল কও দেহি, আমরার আমজাইদা যে কিছিমের ব্যাটা ছাওয়াল, বউ ঝিগো সামনে তো দেহি শরমে মাথা তুলে না। তুমরার ভাসুর তো পরথম রাইতে...
 
রহিমনের মুখের আগলহীন কথায় ভোরের কনকনে শীতেও মর্জিনার দুকান দিয়ে গরম হাওয়া বের হতে থাকে। শরমে জায়ের দিকে মুখ তুলে চাইতে পারে না। মাথার ঘোমটা আরও একহাত সামনে টেনে মুখটা ঢেকে লাল গামছা হাতে রহিমন বু পিছন পিছন পা টিপে নিঃশব্দে হাঁটতে থাকে মর্জিনা।
 
রহিমন কথার ফাঁকে ফাঁকে পিছন ফিরে চায় আর কুটকুট করে হাসে, ‘আমরার আমজাদ সাদাসিধা মনের পোলা, তয় তুমরার শাশুড়িরে এট্টু সামলাইয়া চইলো, বুঝলা নতুন বউ।
 
চারদিক তখনো ফরসা হয়ে সারে নাই। ঘন কুয়াশার পর্দা ভেদ করে দুই হাত দূরের জিনিসও ভালো দেখা যায় না। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে কুয়াশার চাদরে ঢাকা পুকুরের বরফ শীতল পানিতে ধীরে ধীরে গা ডুবায় মর্জিনা। রহিমন মুচকি হেসে বিয়ের কসকো সাবানখানা এগিয়ে দেয় মর্জিনার দিকেন্যাও, গাও গতরে ভালা কইরা বাস্না সাবান ডইলা গোসল করো
 
মর্জিনা ডুব সেরে পানি থেকে উঠতে তার গায়ে সান্নিক লেগে যায়, দাঁতে দাঁতে বাড়ি খায় মুখের বুলি বু... বেজায় শীত করতাছে।
 
তা তো এট্টুখানি করবই, সোয়ামির আদর সোহাগ খাইবা, তার বদলা এইটুকুনি কষ্ট কি আর কষ্ট? মাঝরাইতে কুয়ায় ঝাঁপ দেওনও কিচ্ছু না। ঠিক কইছি না নতুন বউ ?’ মর্জিনার থরথরানি কাঁপন দেখে ঘাটে বসে হেসে মরে রহিমন। রহিমনের দেঁতো হাসি দেখে শ্বশুরাড়ির সব মানুষজনকে সেদিন বড়োই নিষ্ঠুর ঠেকেছিল কিশোরী মর্জিনার চোখে।
 
ঘাট থেকে ফিরে বাপের বাড়ির দেওয়া হলুদ তাঁতের কাপড়খানা আনাড়ি হাতে কুঁচি দিয়ে পরে নেয় মর্জিনা। গামছায় চুল ঝেড়ে  চৌকির এককোণে রাখা বিয়ের ট্রাঙ্ক থেকে আয়না, চিরুনি, সাজগোজের জিনিসপত্র ছড়িয়ে চৌকির উপরে বসে। মায়া ভরা চোখে ছোট্ট ঘরটা দিনের আলোয় ভালো করে তাকিয়ে দেখে। একচালা ঘরের চাঁচের বেড়া চারটে নতুন হলেও টিনের চালটা জায়গায় জায়গায় ভাঙা। হোক ভাঙা, তবু তার নিজের ঘর। ছোট্ট আয়নাটা বেড়ায় ঝুলিয়ে মুখে ক্রিম ঘসে দুই চোখে মোটা করে কাজল আঁকে মর্জিনা। ঠোঁটে বিয়ের লাল টকটকে লিপস্টিকখানা একটু ছোঁয়াতে না ছোঁয়াতেই দাওয়ায় ডাক পড়ে  নতুন বউ, ঘর থিকা আইজ বুঝি আর বাইর হইবা না, বাপের বাড়ি থিকা কি কিচ্ছু শিখায়া পড়াইয়া দেয়  নাই তোমারে...
 
কপালের সামনের চুলে কোনামতে চিরুনি বুলিয়ে মাথায় একহাত ঘোমটা টেনে ভীত পদে ঘর থেকে বের হয়ে আসে মর্জিনা। পাক ঘরের চালার নীচে গিয়ে শাশুড়িকে কদমবুসি করে সোজা হয়ে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই  মর্জিনার হাতে নতুন একটা শলার ঝাঁটা ধরিয়ে দিলেন শাশুড়ি আম্মা। লম্বা উঠোনের আনাচকানাচ ঝাঁট দিয়ে গোটা কয়েক পিঁয়াজ আর আলু খুঁজে পেয়ে টোনায় তুলে নিয়ে মর্জিনা পাকঘরের সামনে গিয়ে মাথা নত করে দাঁড়াল। মর্জিনার ননদ আলু পিঁয়াজ গুনে নিলে মর্জিনার শাশুড়ি কড়া স্বরে বললেনআরও তিনখান পিঁয়াজ ছড়ান আছে উঠানে, খুঁইজা পাও নাই। কামে কাজে মন নাই। চোখকান খুইলা মন দিয়া কাম না করলে সংসার সামলাইবা ক্যামনে? গাঁয়ের ব্যাবাক মানুষজন বউ দেখতে আসতিছে, মাথার ঘোমটা ভালা কইরা টানো। ন্যাও, এহন বিসমিল্লাহ কইয়া তরাতরি চুলায় আগুন দ্যাও দেহি।
 
শাশুড়ির কথায় লম্বা আঁচল আরও লম্বা করে মাথায় টেনে দাঁতে কামড়ে ধরে বেড়া ছাড়া ছনের চালার নীচে বসে চুলায় আগুন দিল মর্জিনা। উনুনের লকলকে শিখা সান্নিক লাগা শরীরটাকে উষ্ণ আদরে জড়িয়ে নতুন বউকে বরণ করে নিল শ্বশুরবাড়ির পাকের ঘরে সেই ভালোবাসার আঁচে মর্জিনার শ্যামবর্ণ কপোল লালচে আভায় রক্তিম হয়ে উঠল, ঠান্ডায় জমে যাওয়া শরীর গরম হয়ে উঠল ধীরে ধীরে।
 
বাড়ির সকলের খাওয়ার পাট চুকে গেলে সেদিন সন্ধ্যার পর পর শাশুড়ির সাথে খেতে বসেছিল মর্জিনা। এক লোকমা মুখে দিতে না দিতে শাশুড়ির কথায় মর্জিনার থুতনি বুকে গিয়ে ঠ্যাকেতোমার বাপের দেওয়া ল্যাপখানায় তুলা বলতে নাই, খ্যাতার লাহান পাতলা। জাড় মানে না। আমজাদরে কইও ল্যাপখান তোমরার ঘরে নিয়া যাইতে।দুই ননদ তখন নতুন লেপের ভেতর থেকে কুপির ম্লান আলোয় নতুন ভাবির ভয় পাওয়া মুখটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে আর ফিচফিচ করে হাসে।
 
আম্মা, এইডা আফনার চৌকিতেই থাউক।ডরে স্পষ্ট করে স্বর ফুটে না মর্জিনার গলায়। বাপের বাড়ি থেকে আনা লেপ সেই মাঘের শীতে নিজের গায়ে না উঠলেও মনে মনে সান্ত্বনা খুঁজে নিয়েছিল মর্জিনাবুড়া মানুষটা যদি এই জাড়ে আরাম কইরা ঘুমাইতে পারে, তয় আল্লায় চাইলে পরের বছর একটা ল্যাপ তারা কিনা লইতে পারব।কিন্তু জীবনের এত এত মাঘ পার হয়ে গেলেও, মর্জিনার শীতের বিছানায় আর লেপের জোগাড় হয়ে সারে নাই। পরপর দুই মেয়ের পর একখান ছাওয়াল এল মর্জিনার কোল আলো করে, এর মধ্যেই দুই ননদের বিয়ের জোগাড়যন্ত্র।
 
রাজমিস্ত্রির জোগালদারের কাজ করত আদুরীর বাপ। রুজি রোজগার খুব একটা ভালো না থাকলেও মানুষটা খারাপ ছিল না। অভাব অনটনে মাথা গরম হলে মাঝে মধ্যে বউ এর গায়ে দুএকটা কিল, চড় দিত। আবার মর্জিনারে ভালোও পাইত। হাতে কিছু টাকা পয়সা এলে গঞ্জ থেকে বাসনা তেল, তিব্বত স্নো, ব্লাউজের ছিট কাপড় কিনে এনে মায়ের চোখের আড়ালে মর্জিনার হাতে দিত সময় সময়।
 
শাশুড়ির আপত্তি সত্ত্বেও মর্জিনা ব্র্যাক থেকে প্রশিক্ষন নিয়ে ঋণ নিল। ঘরগৃহস্থালির পাশাপাশি মুরগির ছোট খামারটা দেখশোন করে বছর পাঁচেকের মধ্যে সংসারের চেহারা অনেকটা ঘুরিয়ে ফেলল। বাড়িতে টিপকল বসল। শাশুড়ির ঘরে হোগলার বেড়ার বদলে টিন লাগল। ঘরে ঘরে কারেন্টের বাতিও জ্বলল। ধীরে ধীরে পয়মন্ত বউ এর উপরে শাশুড়ির মন নরম হলেও, বউ এর সম্মুখে তার মুখের বুলি নরম হয়নি কোনোদিন। শ্বশুরঘরে নিজের বুড়া বাপ, ছোট ভাই দুইটা মর্জিনাকে দেখতে এলে, তাদের কাছে বসিয়ে যত্ন করে চারটে ভালোমন্দ খাওয়ানোর শখ জীবনে আর পূরণ হয়নি মর্জিনার। মর্জিনার শাশুড়ি ছিল বড়োই ডাটের, যমের মতন ডর খেত মর্জিনা।
 
তার শাশুড়ি মেয়ের শ্বশুরবাড়ির কুটুমদের সাধ্যমতো যত্নআত্তি করলেও ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকে আসা লোকজনকে খাতির যত্ন করে বাড়ির বউকে তার বাপের বাড়ি নিয়ে আহ্লাদ করার সুযোগ দিত না কখনও। তবে  আমজাদ বউ নিয়ে শ্বশুুরবাড়ি গেলে গরম গরম ভাঁজা মাসকলাইয়ের জিলাপি নয় লাড্ডু, মিষ্টি বিস্কুট কিনতে কিপটেমি করত না মোটেও। ছোট শালা দুটোকে নিয়ে হাটে গিয়ে প্রথম প্রথম দুচারবার বড়ো মাছও কিনে এনেছিল। হাতে বড়ো মাছ ঝুলিয়ে বাজার থেকে দুলামিয়ার সাথে গাঁয়ের পথ ধরে ফিরতে ছোট ভাই দুটোর সে কি নাচন! মর্জিনার মা মাছ কাটতে কাটতে পাশের বাড়ির চাচিগো লগে জামাইয়ের কইল্জা কত্ত বড় সেই নিয়ে গপ্পো জুড়তো। মায়ের গপ্পে বাপের বাড়িতে মর্জিনার চক্ষুদুটো সোয়ামি গরবে জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকতো দিনভর।
 
মর্জিনাকে বড়ো ভালোবাসত রহিমন, ধান সেদ্ধ থেকে শুরু করে গোবর মুঠি বানানো, সংসারের কাজে হাতে হাতে মর্জিনাকে এগিয়ে দিত সবসময়। মর্জিনাও তার শাশুড়ির  আড়ালে নিজের পাতের ভালোমন্দ খাবারের ভাগ রহিমন ুরে না দিয়ে মুখে তুলত না কখনও। রহিমনের সোয়ামি, আমজাদ মিয়ার চাচাত ভাই গফুর শহরে রিকসা চালায়। সেখানে আর একখান বিয়ে করে ঘরসংসার পেতেছে সে। বছর ঘুরে যায়, গফুর ভাই বাড়ি আসে না। সোয়ামিরে একটাবার কাছে পাবার আশায় চাতক পাখির মতো দিনের পর দিন পথ চেয়ে বসে থাকে রহিমনবু। ঘুঘু ডাকা দুপুরে গাছের ছায়ায় বসে চুলে বিলি কাটতে কাটতে বা কাঁথায় ফোঁড় তুলতে তুলতে রহিমনবুর অন্তর্দহনের নীরব সাক্ষী হয়ে কত চোখের পানি মুছেছে মর্জিনা। মর্জিনা কতো করে বোঝাত, ‘ বু... যে সোয়ামি বছরে একটাবার খবর লয় না তোমার, তার লাইগা ক্যান কাইন্দা মরো! বাচ্চাকাচ্চা নাই, ঝাড়া হাত পা তোমার, ভাসুরের সংসারে দাসীবাদির মতন পইড়া আছ। বড়ো ভাবিও তো তোমারে খালি খালি সন্দেহ করে। গাঁয়ের মাইনষে মন্দ কথা কয়। গফুর ভাই যদি তোমারে ছাইড়া বিয়া করতে পারে, তুমি ক্যান তার লাইগা জীবনডা নষ্ট করতাছ? আমি কই কি, অমন মিনসেরে তালাক দিয়া তুমি নতুন কইরা বিয়া বসো।
 
রহিমন বু উদাস স্বরে বলতনতুন ঘরেও তো একটা পোলাপানের মুখ দেখল না আটকপালে মরদটা। দেখিস, একদিন তারে ঠিকই ফিরতে হইব এই রহিমনের কাছে।সেই শক্তপোক্ত রহিমন বু সোয়ামির জন্য সারাটা জীবন ছটফট করতে করতে বুকের ধড়ফড়ানি ব্যামোতে হঠাৎই একদিন চোখ বুজল মর্জিনার কোলের পরে। সেই কথা মনে পড়লে মর্জিনা বুকের ভেতরটা এখনো মোচড়ায়।
 
বছর তিনেক আগে কাজে গিয়ে কোমর ভেঙ্গে ঘরে ফিরল আদুরীর বাপ। কবিরাজী চিকিৎসা হলো ম্যালা, তারপরও কামপাগলা মানুষটা নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াতে পারল না আর। গত মাঘের শেষের দিকে, আদুরীর বাপের হাঁপানীর টান এমন বাড়া বাড়ল! গঞ্জ থেকে সাধনার বোতল বোতল সিরাপ এনে বাপকে খাওয়ালো আলম। তবু শেষ রক্ষা হলো না। গত বছর এই চান্দের রাতেই, সোয়ামির হাতে পায়ে সরিষার তেল ডলতে ডলতে চোখদুটো দুটো লেগে এসেছিল  মর্জিনার। শেষরাতে আদুরীর বাপের ঘড়ঘড় করে শ্বাস টানার শব্দে তন্দ্রা ভাঙল তার। ফজরের আযানের আগে আগে কুয়োর পাড়ের আমগাছে একটা কাঁক একলা বসে কাঁ কাঁ করে বাড়িটা মাথায় তুলল। সেই ডাকে মর্জিনার বুকের ভিতরটা হিম হয়ে হাত পা কেমন ভেঙ্গে আসতে লাগল। হুস হুস করে লক্ষ্মিছাড়া কাঁকটাকে তাড়িয়ে আলমকে ডেকে এনে বাপের মাথার কাছে বসিয়ে মর্জিনা কলমা পড়তে লাগল দুরুদুরু বুকে। সেই বিহানেই মর্জিনার গায়ে সাদা থান উঠল। মাইয়া দুইটারে শ্বশুরঘরে বিদায় দিয়ে একমাত্র ছাওয়ালের বউ ঘরে আনবার জন্য কত্তো সাধ করেছিল মানুষটা। কিন্তু ছাওয়ালের বউ এর মুখ দেখা তার কপালে নাই!
 
 
 
আলমের বউ তুলে আনা হলো গত সপ্তায়। বৌভাত, ফিরানি, পাও ফিরানি শেষে আত্মীয় স্বজনভরা বাড়িটা আজ কেমন খালি খালি। নাতি নাতনির স্কুল কামাই যায়, মেয়ে দুটোও তাই বিয়ের ঝামেলা শেষে দুটো দিন বেশি থাকল না বাপের বাড়ি। তবে বাড়িতে কুটুম আছে, নতুন বউ এর লগে তার ছোট দুই ভাই আসছে। ফজর নামাযের পর দুই পাতা কোরআন পড়ে উঠেই বেলা ওঠার আগেই পিঠার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল মর্জিনা। ঢেঁকির নোটে চালের গুঁিড় পড়তে না পড়তেই বরই পাতার ফাঁক গলে পাকঘরের খড়ের চালায় লুটোপুটি খেলতে শুরু করল কুয়াশা ভেজা টুকরো টুকরো রোদ। নুন জলে মাখানো আতপ চালের গুঁড়ি চালুনীতে ফেলে মর্জিনা নতুন বউকে শুধায় বউ,পুতুরারা ঘুম থিকা উঠছেনি?
 
চুলার পাশে বসে নারকেল কোরাচ্ছিল নতুন বউ, চোখ তুলে মিষ্টি হাসেউঠছে আম্মা, বাংলা ঘরের দাওয়ায় বইসা রোদ তাপায়। 
 
রাইতে পুতুরা দুইটার জাড়ে খুব কষ্ট হইল বুঝি?
 
না আম্মা কষ্ট হইব ক্যান? আরামেই ঘুমাইছে দুই ভাইয়ে।
 
বেলা হইয়া গেল, তাগো গুঁড়মুড়ি কিছু দিছ সকালে?
 
আফনার পুতের লগে হাঁটতে বাইর হইছিল, পেট ভইরা খেঁজুরের রস খাইছে দুইজনেলজ্জায় মাাথা নোয়ায় নতুন বউ।
 
ধোঁয়া ওঠা কলসের মুখে পিঠা বসিয়ে দিয়ে নূরীকে খেয়াাল করে মর্জিনা। এই বছর মেট্রিক পরীক্ষা দিবে তার ছেলের বউ। সংসারের কাজেকামে খুব অভ্যাস নাই বুঝা যায়।  চুলা থেকে গরম ভাঁপা পিঠা বাশের চালায় নামিয়ে রেখে ছেলের বউকে তাড়া দেয় মর্জিনা, ‘যাও বউ, ঘর থিকা কড়ির বাসন আইনা ভাইগো পিঠা দিয়া আসো। নিজের সংসারে ভাইরে কাছে বসাইয়া আদর কইরা খাওয়াইবা, শরম করবা না। আর আলম দোকানে চইলা গেলে ঘরে বইসা বইসা পড়বা। সংসারের কাম আস্তে আস্তে শিখা যাইবা, তাড়াহুড়ার কিছু নাই আম্মা।’ ’
 
গ্রেড নিয়ে মাধ্যমিক পাশ দিল আলমের বউ। পরীক্ষার ফল বের হওয়ার পর থেকে মেয়েটা মুখ শুকনো করে ঘুরে বেড়ায় কয়দিন হলো, চোখে পড়ে মর্জিনার। কথায় কথায় জিজ্ঞেস করতে নূরী মাথা নীচু করে ওড়নায় চোখের পানি মুছেকলেজে পড়ার খুব ইচ্ছা ছিল আম্মা, আফনের পুতের মত নাই।
 
রাতে ছেলে আর বউকে একসাথে খেতে বসিয়ে মাছের সালুন পাতে দিতে দিতে মর্জিনা কথা পাড়েবউ' কলেজে ভর্তির খোঁজ খবর কিছু লইছস বাপ?  আলম কিছুক্ষন ঘাড়গোঁজ করে চুপ হয়ে থাকে। তারপর বলেনা মা, সংসারের কাজকাম ফেলাইয়া কলেজে দৌড়াইয়া কি ফায়দা? চাকরি বাকরি তো আর করব না।আলম মাথা নুইয়ে কই মাছের কাঁটা বাছতে মনোযোগ দেয়।
 
নিজের ছাওয়ালের মনের পীড়া বুঝতে পারে মর্জিনা, পোলাটা স্কুল পাস দিয়া কলেজে ভর্তি হওয়ার পরই তার বাপ ঘরে পড়ল। বি পাস দেবার খুব ইচ্ছা ছিল তার। সংসারের হাল ধরতে পড়াশোনা বাদ দিয়া গঞ্জে মুদির দোকান দিয়া বইতে হইলো ঘরের বউ তার থেকে বেশি পাস দিব, মাইনা লইতে কষ্ট হইতাছে ছাওয়ালের।
 
চাকরি বাকরি না করলে না করব, বিদ্যা কি আর ফেলানি যায় বাপ? বিপদে আপদে ঠিকই কামে আইব। নিজের ছাওয়াল মাইয়ারে কলেজে পড়াইতে পারি নাই। এখন আল্লায় আমরার দিগে মুখ তুইলা চাইছে। আমার খুব আশা যে নূরী কলেজ পাস দিব। তুমি কি কও বাপজান?’
 
মাথা নীচু করে বাসনে ভাত মাখতে মাখতে মনোযোগ দিয়ে শাশুড়ি আম্মার কথা শুনে নুরী। গামছায় হাত মুছতে মুছতে জোর গলায় উত্তর দেয় আলমঠিক আছে, তোমার যখন ইচ্ছা কাইল লইয়া যামুনে নুরীরে, কলেজে ভর্তির ফরম তুলতে।আলম নুরীর মলিন মুখের উপর চোখ রেখে মুখ টিপে হাসেতয় সকাল সকাল তৈয়ার হইয়া লইও কাইল।
 
নুরী মাথা তুলে জল চিকচিকে চোখে তাকায় শাশুড়ি আম্মার মুখের দিকে। ছেলের বউ এর চোখেমুখের খুশির ঝিলিকে নিজের ভিতর যেন এক নতুন আলোর দিশা খুঁজে পায় মর্জিনা।

⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN

🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

#গল্প
#ছোটগল্প
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#Molakat
#ShortStory
#Story
#Literature
#Bengali_Literature
#সায়মা_ইসলাম

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.