গত মাসে সায়েম এর চাকরির প্রমোশন হলো, মোটামুটি সেলারি ভালোই বেড়েছে, আজকাল বাজারের যে অবস্থা সবকিছুর দাম বাড়ে বৈকি কমার নাম নেই। একলা ব্যচালার থাকা আর সংসার নিয়ে থাকার মাঝে বিস্তার তফাৎ। যদিও বা মৌমিতা তেমন উচ্ছাভিলাসী না, তারপরেও একটা সংসারে, কিনা লাগে? দু'জন হোক কিংবা সাতজন। সায়েম আর মৌমিতার বিয়ে হলো দু'বছর চার মাস। পছন্দ করে পারিবারিক সম্মতিতে বিয়ে।
একবছর হলো সায়েমের মা গ্রামে থাকেন। আগে সায়েম আর মৌমিতার সাথে শহরেই ছিলো। তার নাকি শহর ভালো লাগে না, দম বন্ধ হয়ে আসে। তাই মৌমিতার বারন স্বত্বেও একপ্রকার জোর করে গ্রামে চলে যায়।
সারাদিন সায়েমের অফিস, এদিকে মৌমিতা বাসায় একা, পড়াশুনা শেষ জব করতে চেয়েছিলো সায়েম নিষেধ করলো, নিষেধের কারন, মৌমিতার কষ্ট হবে ভেবে,খুব ছোট বেলা থেকে মৌমিতার এ্যজমার সমস্যা। ধুলাবালি, গাড়ির ধোঁয়াতে এলার্জি, সায়েম চায়না মৌমিতার কোনো সমস্যা হোক। তাই মৌমিতাও আর জব করবে বলে জোর করলো না।
সাংসারিক ঝুটঝামেলার মাঝেও ভালোই চলছে সায়েম মৌমিতার টোনাটুনির সংসার। দু'জনের বোঝাপড়া খুব ভালো, সায়েম শান্ত স্বভাবের, তবে মৌমিতা অনেকটা অভীমানি, চঞ্চল, যা বলবে সরাসরি, অল্পতেই মন খারাপ করে আবার অল্পতেই ঠিক হয়ে যায়, সায়েম মৌমিতাকে খুব ভালো করে বুঝে, যার দরুন মৌমিতার মনের গতিবিধি খুব ভালো করে জানা।সায়েম মৌমিতাকে আদর করে মৌরানী বা মৌ বলে ডাকে।
২.
দিন দিন কাজের প্রেশার বেড়ে যাওয়ার ফলে সায়েমকে অনেকটা রাত করেই বাসায় ফিরতে হয়, যার ফলে বেশির ভাগ দিনই বাহিরে থেকে খেয়ে আসে। এদিকে অনেকটা সময় বাসায় একা থাকতে হয় মৌর। বোরিং ফিল করে, সায়েম রাতে আসলে যে একটু গল্প করবে সে মুড থাকে না সায়েমের, এ নিয়ে মৌ এর ভীষন মন খারাপ। মৃদু অভিমান করে, কিন্তু তা প্রকাশ করে না। মৌ দিন দিন লক্ষ্য করলো সায়েম কেমন জানি বদলে যাচ্ছে, আগে যেমন অফিস থেকে আসার সময় মৌর জন্য যে কোনো কিছু একটা নিয়ে আসতো অন্তত একটা চকলেট কিংবা একগুচ্ছ বেলী। এখন প্রায়ই সায়েমের ফোনে অনামিকা" নামের একটা মেয়ের কল আসে, সায়েম জানালো অফিসের কলিগ।
মৌ এসবে ভ্রুক্ষেপ করে না, সে সায়েমকে যতটা না ভালোবাসে তার চেয়ে বহু গুন বেশি বিশ্বাস করে। তারপরও দিনকে দিন মনের কোনে একটু একটু করে সন্দেহের দানা বাঁধে। এক শুক্রবার ছাড়া মৌ সায়েমকে ঠিক মতো কাছেই পায় না। এবার ছুটির দিনে মৌর আবদার...
-শুনো না, তুমি তো সবসময়ই ব্যস্ত থাকো, আজ হলিডে চলো বাহিরে কোথাও ঘুরতে যাই।
-আজ হলিডে, ক্লান্ত লাগছে, ভাবলাম সারাদিন ঘুমাবো, প্লিজ অন্যকোনো দিন যাই?
-প্রতিদিনই তো ঘুমাও...
-প্লিজ লক্ষ্মী টা রাগ করে না।
মৌ অভিমান করে সায়েমের সামনে থেকে উঠে গেলো...
ভাবতেছে বিয়ের প্রথম বছরের দিনগুলোর কথা, মৌ যেতে চাইতো না তবুও সায়েম প্রতিসপ্তাহে বউ নিয়ে ঘুরতে বের হতো। একবার পহেলা বসন্তে সায়েম মৌমিতার জন্য একটা গাড় নীল রংএর শাড়ী এনে নিজ হাতে মৌকে পরিয়ে দিয়েছিলো, যদিও পহেলা বসন্তে সবাই হলুদ আর বাসন্তী সাজে কিছু মৌ নীলপরি সেজেছিলো।
৩.
মৌ নিজেকে সামলে নিয়ে চলতে থাকে, এদিকে সায়েম আরো নির্জীব হয়ে যায়, আগের মতো মৌ কে সময় দেয় না, প্রয়োজন ছাড়া কথাও বলে না। অফিস থেকে ফিরে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, মৌ নিরবে কাঁদে, সায়েম এর কি হলো বুঝে উঠতে পারে না। এটা সত্য যে সায়েম অফিসের কাজে প্রচন্ড ব্যস্ত থাকে, তাই বলে প্রিয় মানুষটিকে অবহেলা করবে? সেদিন রাতে সায়েম যখন অফিস থেকে ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে শুয়, মৌ নিঃশব্দে সায়েমের পাশে শুয়ে একটা হাত সায়েমের বুকের বাম পাশে রেখে মৃদু স্বরে জিঙ্গেস করে
-তোমার কি হয়েছে আমায় বলবে কি?
-কই না তো কিছু হয়নি।
-না প্লিজ, তুমি জানি কেমন হয়ে গেছো।
-আরে পাগলী অফিসে অনেক কাজ তাই রাত হয়।
-সেটা নয়, তোমার মনের ভিতর কি চলছে আমায় বলো না?
-সত্যি বলছি কিছু হয়নি, রাত জেগো না, তুমি ঘুমাও।
৪.
চার দিন বাদে মৌমিতার জন্মদিন, সায়েমের সাথে সম্পর্ক হওয়ার পর থেকে যে কয়টা জন্মদিন গেছে সবকটা জন্মদিন'ই ছিলো মৌমিতার কাছে বেষ্ট। এবার মৌমিতা ভাবে আগে থেকে কিছুই বলবো না দেখি সায়েম আমার জন্মদিন মনে রাখে কিনা। যথারীতি মৌমিতার জন্মদিন ঘনিয়ে এলো, অন্যসব দিনের মতোই সায়েম সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে অফিসে গেলো। মৌ কিছুটা কষ্ট পেলো, গত জন্মদিনে সায়েম অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সারাদিন মৌ কি নিয়ে ঘুরেছিলো।
"তবে কি আজ সত্যিই সায়েম আমার জন্মদিন ভুলে গেলো"?
সারাটা দিন চলে গেলো, সায়েম একটা বার ফোনও দিলো না, তবুও মৌ আশায় বুক বেঁধে আছে, সন্ধ্যায় স্নান সেরে একটা মেরুন কালারে শাড়ী পরলো, হাতভর্তি সোনালী রংএর চুড়ী কপালে কালো টিপ। মৌ কে আজ অপ্সরীর মতো লাগছে, নিশ্চই সায়েম আজ মৌ কে দেখে চোঁখ ফেরাতে পারবে না। আজ তেমন একটা দেরী হলো না ৮ টা নাগাদই বাসায় ফিরলো সায়েম দরজা খুলতেই একটু চমকে গিয়ে টাই খুলতে খুলতে সায়েম বলতেছে।
-আজ আমার মৌরানীর কি মন টা খুব ভালো, অমন পরীর মতো সাজলো যে"
মৌ কিছু বলছে না খুব কষ্ট পাচ্ছে মনে মনে, সায়েম এটা কি করে ভুলে যেতে পারলো?
৫.
সায়েম ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে বসলো, সাথে মৌমিতাও আজ ভালো ভালো রান্না হলো, সায়েম খাবার শেষ করে একটা বই হাতে নিয়ে খাটে হেলান দিয়ে বসলো, মনোযোগ সহকারে বই পড়ছে, এদিকে মৌ ভিতরে ভিতরে জ্বলে যাচ্ছে, মেয়েটা রেগে গেলে চোখদু'টো রক্তবর্ণ হয়ে যায়, কাপল থেকে টিপ খুলে ফেলে দেয়, হাত থেকে চুড়িগুলো খুলে বিছানায় ফেলে, আর নিজেকে সামলাতে না পেরে সায়েমের কাছে গিয়ে মুখের সামনে থেকে বইটা সরিয়ে সায়েমের চোখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে...
-কি হলো মৌরানী, এন ইউর প্রবলেম?
-সমস্যা কি তোমার হু?
-আমার তো কোনো সমস্যা নেই, তোমার?
-আজ কয় তারিখ
-আজ, হুম্মমম, ওহহ আজ ২৩ জুন, তো?
-তো মানে??
এমন ভাবে অসহায়ের দৃষ্টিতে মৌ তাকানো মনে হচ্ছে এই বুঝি কেঁদে দিলো... ঠিক তাই বেশি দেরি হলো না, চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে আর বলতেছে
-"তুমি আমায় একটুও ভালোবাসোনা, সব ভুলে গেছো, আজ আমার জন্মদিন ভুলেই গেলে"....
সায়েম স্থির দৃষ্টি মৌর দিকে তাকিয়ে, মৌর কাছে এসে দু' হাত দিয়ে দু'গাল বেয়ে পড়া অশ্রু মুছে দিয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়,
ড্রেসিং টেবিল থেকে নতুন আরেকটা টিপ এনে নিজ হাতে মৌর কপালে পরিয়ে দেয়, বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চুড়ীগুলো যত্ন করে তুলে দু'হাতে পরিয়ে দেয় সায়েম, আর বলে...
-পাগলী আমার, সারাদিন বলোনি কেনো? আজ তোমার জন্মদিন, এত্ত অভিমান আমার উপর? আমি একটু ব্যস্ত আছি, একটু মনে করিয়ে দিবে না?
-কেনো মনে করিয়ে দিবো? এই তোমার ভালোবাসা? সামান্য আমার জন্মদিনটাই ভুলে যাও।
-আচ্ছা সোনা সরি, এই কানে ধরলাম... আর হবে না, চলো বাহিরে যাই।
-এত রাতে কই যাবো? দরকার নেই আমি কোথাও যাবো না।
-প্লিজ এমন করো না, শাড়ীটা ঠিক করে পরে নাও, তুমি খুব রেগে গেলে তোমার শাড়ীর কুচিগুলো ঠিক থাকে না, হা হা হা।
৬.
মৌমিতা কে বাইকের পিছন বসিয়ে সায়েম এই রাতে উদ্দেশ্যহীন ভাবে চলতে লাগলো, মৌ বার বার জিঙ্গে করতেছে "কই যাচ্ছি আমরা" সায়েম বলে "দেখি না কতদুর যেতে পারি" আধঘন্টা পর বাইক একটা জায়গায় গিয়ে থামলো, জায়গাটা খুব অন্ধকার চেনাই যাচ্ছে না, সায়েম মৌমিতার হাত ধরে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে একটা জায়গায় বসতে বললো, মৌর বিরক্ত লাগছে কিন্তু প্রকাশ করছে না। মৌমিতার হাত ধরে সায়েম ও বসলো, পকেট থেকে মোবাইল টা বের করে টাইম দেখলো, ১১. ৫৫ বাজে, মোবাইলের মৃদু আলোয় সায়েম মৌর কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলতেছে, ১২ টা বাজার পাঁচ মিনিট বাকি আছে, এখনো তোমার জন্মদিন বাকি, চোখটা বন্ধ করো লক্ষ্মীটা, "অন্ধকারই
তো চোখ বন্ধ করার কি আছে" "আহা করো না" মৌমিতা চোখ বন্ধ করলে সায়েম মৌর একটা হাত চেপে ধরে আলতো করে কানের নিচে গলায় চুমু দিলো, মৌ হালকা কেঁপে উঠলো, সায়েম বললো "এবার চোখ খোলো। চোখ ধাঁধানো আলোয় মৌ অবাক হলো, ওরা একটা ছোট্র দেওয়াল ছাড়া বাংলোতে বসে আছে, চারপাশে বিভিন্ন রং এর বাতি, বেলুন আর ফুল, অসম্ভব সুন্দর করে সাজানো বাংলোটা,
মৌর সামনে একটা কেক চারপাশে নানা রংএর মোমবাতি, সায়েম অনেকগুলো বেলীফুল হাতে নিয়ে মৌর সামনে হাটু গেড়ে জন্মদিনের উইশ করলো" মৌ অবাক হয়ে বলতেছে
-"তুমি তাহলে ভুলে যাও নি?"
-"জ্বি না মহারানী, চাচ্ছিলাম আপনি নিজ থেকে বলুন আমাকে"
-উফফফ, তুমি আসলেই বদলাওনি, তবে এ কয়দিন আমার সাথে অমন করলে কেন?
-দেখতে চাইলাম, তুমি আমার জন্য কতটা ছটফট করো?
-আমাকে কষ্ট দিয়ে তুমি পরিক্ষা করছিলা?
-না গো ওভাবে বলো না, তবে আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছি কেন জানো?
-কেনো?
-"তুমি আমায় অনেক বিশ্বাস করো, অনামিকা রাত বিরাতে এতবার ফোন দিত অথচ তুমি আমায় একটা বারও এ নিয়ে প্রশ্ন করোনি।
-ভালোবাসি তো, কেন সন্দেহ করবো তোমায়?
তবে কষ্ট পেয়েছি।
-সরি লক্ষ্মীটা আর এমন হবে না আমায় ক্ষমা করো।
-ক্ষমা করবো এক শর্তে আজ আমরা বাসায় যাবো না সারারাত এখানে থাকবো,
-ঠিক আছে মহারানী।
দু'জন মিলে মোমবাতি গুলো জ্বালিয়ে কেক কাটলো, সায়েম জানালো আরেকটা সারপ্রাইজ আছে এই বলে মৌর চোখে হাত দিয়ে বাংলোর বাহিরে নিয়ে আসলো তারপর চোখ থেকে হাত সরিয়ে আকাশের দিকে তাকাতে বললো, মৌমিতা কল্পনাও করিনি, এমনটা দেখবে, আকাশে রঙ্গিন আতশবাজি, তাতে লেখা হ্যপী বার্থডে মৌরানী" আনন্দ আর লজ্জায় মৌ সায়েমের বুকে মাথা লুকায়...
⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN
🔗 MY OTHERS CHANNELS
🔗 FOLLOW ME
🔗 MY WEBSITE
🔗 CALL ME
+8801819515141
🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com
#গল্প
#ছোটগল্প
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#Molakat
#ShortStory
#Story
#Literature
#Bengali_Literature
#সালমা_বিনতে_শামছ
No comments