গানের বিষয়ের সাথে হৃদয়ের গভীরতা থাকলেই তা উত্তীর্ণ গান হয়ে উঠে ।। সিরাজুল ইসলাম

 
আজ কবি গীতিকার সিরাজুল ইসলামের সাথে আমার দুই কি তিনবার সা্ক্ষাৎ হয়েছে। একটি কবির সাক্ষাৎকার আনতে। বাকী দুটি কবিকে সাইমুমের অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে দাওয়াত দিতে পরে কার্ড দিতে। আমার প্রিয় কবির জন্মদিনে ১৯৮৮ সাথে গৃহিত সাক্ষাৎকার যা সাইমুম সংকলনে ছাপা হয়েছিল তা পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরলাম -আবুল হোসাইন মাহমুদ
 
আল্লাহু আল্লাহু/তুমি জাল্লে জালালুহু বা নবী মোর পরশমনি নবী মোর সোনার খনি গান দুটি দেশের সাধারণ মানুযের মুখে মুখে উচ্চারিত হতো, এখনো হয়। আমরা, অনেকেই জানিনা গান দু'টির গীতিকার কে। শুধু দু'টিই নয়। যার অসংখ্য গান যেমন 'হলুদিয়া পাখি সোনারি বরণ/পাখিটি ছাড়িল কেঅথবা 'তোমার দুহাত ছুয়ে শপথ নিলাম/থাকবো তোমারে আমি কথা দিলাম--" এসব গানও এদেশের সঙ্গীত প্রিয় মানুষের হৃদয়ে তান তুলেছিল। এসব গানের গীতিকার হলেন আজীবন প্রচার বিমুখ গীতিকার সিরাজুল ইসলাম।
গীতিকার সিরাজুল ইসলাম ১৯৩০ সালে কেরানীগঞ্জের রসুলপুরে জন্মগ্রহণ করেন পিতার নাম মুহমাম্মদ নূরুল ইসলাম মার নাম মোসাম্মৎ আসাদুন্নেছা দু'বছর বয়সে মাকে হারান। বাপের কাছেই তিনি বড় হন। বাবার ব্যবসা কেন্দ্র ছিল রাজশাহীর গোপালপুরে।সেখানেই তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু। গোপালপুর স্কুল থেকে প্রাইমারী পাশ করে বিভিন্ন স্কুলে লেখাপড়া করেন। বাবার ব্যবসায়ের কারণে বিভিন্ন স্থানে থাকতে হয়েছে।  প্রবেশিকা পর্যন্ত রাজশাহীতে ছিলেন।  সেখানেই তার লেখার খাতেখড়ি।  ‘প্রভাত ভানুলিটল ম্যাগাজিনে তার প্রথম লেখা ছাপা হয়।তখন তিনি  গানের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।
রাজশাহীতে একদিন তিনি গ্রামোফোনে একটি গান শুনেছিলেন- ‘ পাগলা তোর মনটারে বাধ" গান শুনে তার গান লেখার প্রতি আগ্রহ জন্মে তখন থেকেই গান লিখতে শুরু করেন এবং 'নবযাত্রী' নামে একটি গজল পার্র্ট গঠন করেন তাঁর বাবাও অবসর পেলে গান গাইতেন।
১৯৫৪ সালে সিরাজুল ইসলাম রেডিও টিভি' নিয়মিত গীতিকার হন। তখন তাঁর অনেক গান রেডিও, টিভিতে প্রচারিত হয়। সময়টাতে তমুদ্দুন মজলিশের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তমুদ্দুন মজলিশের মুখপত্রসৈনিকে' তার গান ছাপা হয়েছিল রেডিও টিভিতে তার প্রায় দুই/আড়াই হাজার গান ব্রডকাস্ট হয়েছে ১৯৭৭ থেকে রেডিও টিভিতে গান দেন না। এখনো তাঁর গান প্রচারিত হয়। গীতিকার কবি হিসেবে তিনি অনেক পুরস্কার পেয়েছেন।
সিরাত মিশন ১৯৮৬ইং সম্বর্ধনা, লেখক কল্যাণ সংস্থা ১৯৮৬ইং সন্বর্ধনা, গীতি কবি সংসদ ১৯৮৬ সম্বর্ধনা।
কেরানীগঞ্জে তার নামে একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তার গানের ডিক্স রেকড বেরিয়েছে ১৫/১৬টি। লং প্লে একটি।
 তার প্রকাশিত বই আটটি (১৯৮৮ পর্যন্ত) সবগুলোই গীতি কবিতা রক্তিম আলিম্পন ১৯৭২, রক্ত পলাশ ১৯৭২, যে গান অনির্বাণ ১৯৭৬, হলুদিয়া পাখি ১৯৭৬, দুটি পাখি একটি নীড় ১৯৭৬, সত্যের সৌরভ ১৯৮৬, সময়ের নীল সাঁকো ১৯৮৭, আকাশ, মাটি, মানুষ, মন ১৯৮৭।
ব্যক্তিগত জীবনে জনাব ইসল' একজন একাউটেন্ট। শ্ত্রীও দু'ছেলে দু'মেয়ে নিয়ে ছায়া ঢাকা পাখি ডাকা স্বগ্রাম কেরানীগঞ্জের রসুলপুরে নিভূতে বসবাস করছেন
আমরা জনাব ইসলামের কাছে কতগুলো প্রশ্ন নিয়ে উপস্থিতি হয়ে ছিলাম। তিনি আন্তরিকতার সাথে আমাদের প্রশ্নগুলোর জবাব দেন। নিম্নে তার সাক্ষাৎকারটি পত্রস্থ করা হলো।
 
প্রশ্ন : একজন সফল গীতিকারের কি কি গুণ থাকা উচিৎ বলে আপনি মনে করেন?
সিরাজুল ইসলাম : একজন সফল গীতিকার হতে হলে তাকে প্রথমে একজন কবি হতে হবে। কবিতা না হলে তা গান হয় না। কবিতার ছন্দ, মাত্র, বিষয় -এদিকগুলো তো অবশ্যই লাগবে এক কথায় সব গানই কবিতা। এরপর তাকে সুর সম্পর্কে জানতে হবে। কবিতার নীল দিগন্ত ছাড়িয়ে যখন তা হাদয়ের কাছাকাছি আসে, তখন তা তান তোলে।এই তানের সাথে মিল রেখে ঘে কাজটি হয় তা- গান। সুর হলো গানের বাহন। মোটামুটি একজন গীতিকারকে গানের সুরের ক্লাসিক দিকগুলো সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে। তাইলেই একজন সফল গীতিকার হওয়া সম্ভব
 
প্রশ্ন : একটি উত্তীর্ণ গানের জন্য গীতিকার সুরকার- দুয়ের মধ্যে কার অবদান সবচেয়ে বেশী বলে মনে করেন
সিরাজুল ইসলাম : উত্তীর্ণ গানের জন্য শুধু গীতিকার সুরকারই নন শিল্পীর অবদানও সমানভাবে স্বীকৃত। এই তিন তারের সমন্বয়ে একটি গান হয়ে উঠে। তবে সুরকারের অবদান সবচেয়ে বেশী কারণ তাকে গানের ধারা বুঝে সুর দিতে হয়। গানটা কি মেলোডী, না পেথস তা তাকে বের করতে হয়। যে কেউ সুর করলেই গান হয় না। কিছু বিশেষ টেকনিক সুরকার গ্রহণ করেন।এজন্য তাঁর অবদানই বেশী।
 
প্রশ্ন : নজরুল, ফররুখ গোলাম মোস্তফা_এঁরা অনেক গান লিখেছেন। কিন্তু বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত কবি আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান তেমন একটা গান লিখছেন না। প্রচলিত ধারনা আছেতাঁরা গান লিখলে গানের ভান্ডার আরো সমৃদ্ধ হতো। ব্যাপারে আপনার মতামত বলবেন কি?
সিরাজুল ইসলাম : কেন, শাসসুর রাহমান তা গান লিখছেন। আসলে এটা ঠিক যে কবিরা যদি গান লিখেন বা লিখতে তাহলে গানের ভাণ্ডার নিঃসন্দেহে আরো সমৃদ্ধ হতো। বর্তমানে সাড়ে তিনশ মতো গীতিকার রয়েছে তারাও তো লিখছেন। তবে পরিচিত লেখক খুব কম।
 
প্রশ্ন : রেডিও টিভিতে আমরা অনেক সময় নকল সুরের গান শুনতে পাই। প্রবনত। রোধে গীতিকারের কি ভূমিকা হওয়া উচিৎ বলে আপনি মনে করেন ?
সিরাজুল ইসলাম : নকল সুর প্রতিকারে গীতিকারের করার কিছুই নাই। তবে আমার মনে হয় নকল সুরের কারণে আমরা অনেক পিছিয়ে গেছি। নকল সুর কাম্য নয়। সবারই উচিৎ নতুন সুর করা যারা চিহ্নিত নকল সুরকার হিসেবে- তাদেরকে গীঠিকাররা গান না দেয়া উচিৎ- বলে আমি মনে করি। একজন গীতিকার তার গানকে নকল সুরে গাইতে না দেয়া- নকল সুর রোধে সহায়ক হতে পারে।
 
প্রশ্ন : আপনি একটি বিশেষ ধারায় তথা ইসলামী গান রচনা করেছেন এর অনুপ্রেরনা আপনি কোথা থেকে পেলেন?
সিরাজুল ইসলাম : দেখুন, ধর্মীয় অনুভতিটা হাদয়ের ব্যাপার ইসলাম আমার ধর্ম। আমি মুসলিম। তাই স্রস্টা, রাসুল, দ্বীনের আহকামাত সম্পর্কে আমার চিন্তা চেতন প্রসারিত হয়েছে।  যার ফলে আমার লেখাতেও তা এসেছে তবে গানে অনুপ্রেরণা পাই নজরুলের লেখা পড়ে, গান শুনে কিন্ত গান লিখতে গিয়ে নজরুলের অনুসরণ করিনা। চেষ্টা করি প্রভাব যাতে না পড়ে। তবে, অবচেতনভাবে এসে যেতে পারে।
 
প্রশ্ন : আগনার প্রিয় কয়েকজন গীঠকারের নাম বলুন।
সিরাজুল ইসলাম : কবি নজরুল, রবি ঠাকুর, আবু হেনা, আর নতুনদের মধ্যে রফিকুজ্জামানের গান আমার ভাল লাগে।
 
প্রশ্ন : 'আল্লাহ আল্লাহু'... নবী মোর পরশমণিগান দুটি লেখার সময় আপনার মনোভাব কেমন ছিল?
সিরাজুল ইসলাম : আমার একান্ত ইচ্ছা ছিল এমন কিছু গান লেখা দরকার যা বেঁচে খাকবে। এজন্য আমি তাহাজ্ছুদের সময় উঠে আল্লাহর ধ্যান করে লিখতে বসতাম। আমার খুব কান্না পেতো বিশেষ করে দু'টি গান লেখার সময় আমার প্রচণ্ড কান্না পেয়েছিল। কেন কেঁদে ছিলাম তা বলতে পারবো না। ফজর হওয়া পর্যন্ত অবস্থাই ছিল
 
প্রশ্ন : আপনি সাধারণত কিভাবে, কখন গান লিখেন?
সিরাজুল ইসলাম : আমার বিশেষ সময় রাত্রে। তবে সাধারণত চলতে ফিরতে গুনগুনিয়ে স্থায়ীটা বের করে ফেলি। তখন কাগজ কলম থাকলে লিখেও ফেলি না হয় পরে ওটাকে পূর্ণতা দান করি।
 
প্রশ্ন : রেডিও, টিভিতে আপনার ইসলামী গান ছাড়া অন্য কোন্ কোন্ গান জনপ্রিয়তা পেয়েছে?
সিরাজুল ইসলাম : সবতো বলা যাবে না। তবে কয়েকটি বলছি। জনপ্রিয় গানের মধ্যেতোমার দুহাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম, থাকবো তোমারে আমি কথা দিলাম, আলতো পায়ে ছন্দ তুলে সাঝের বেলা গাঙের কুলে জলকে বধু যায়।দুটি পাখি একটি নীড়, একটি নদী দুটি তীর দুজনে দুজনার। হুলুদিয়া পাখি সোনারই বরণ, এরপর- ডাক পিয়নের একটি ডাকে, আমি মুক্ত বলাকা মেলে দিই পাখনাইত্যাদি গান জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
 
প্রশ্ন : নতুন গীতিকারদের প্রতি আপনার উপদেশ ?
সিরাজুল ইসলাম : বললে হয়তো মনন্ষু্ন হবেন। আমরা যেখানে শেষ করছি, সেখানে থেকেই নতুনের যাত্রা শুরু তবে বেশী বেশী পড়াশুনা অধ্যাবসায় থাকা দরকার যে বিষয়ে তার আগ্রহ বেশী সে বিষয়েই লেখা উচিৎ।জীবন জটিল তাই সময়ের সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে আর মুসলমান হিসেবে দায়িত্বটা ভুলে গেলে চলবে না।
 
(সাক্ষাৎকারটি ১৯৮৮ সালে গ্রহণ করা হয়।)

⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN

🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

#সাক্ষাৎকার
#মোলাকাত
#Molakat
#Interview
#Literature
#Bengali_Literature
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#সিরাজুল_ইসলাম
#আবুল_হোসাইন_মাহমুদ

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.