বিষাদ সিন্ধু : মীর মশাররফ হোসেন_উদ্ধার পর্ব : ৬১তম প্রবাহ


নি­শার অব­সান না হই­তেই উভয় দলে রণ­বা­দ্য বা­জি­তে লা­গিল, এক পক্ষে হা­নি­ফার প্রা­­বি­নাশ, অপর পক্ষে এজি­দের পর­মায়ু শেষ দুই দলে দুই প্র­কার আশা। দা­মে­স্ক নগ­­বা­সী­রা কে কোন পক্ষের হিতৈষী, তা­হা সহ­জে বু­ঝি­বার সা­ধ্য নাই। কা­রণ মো­হা­ম্মদ হা­নি­ফার পক্ষে কেহ কোন কথা বলি­লে, জয়নাল আবে­দী­নের জন্য কেহ দু­ঃখ করি­লে, সে রা­­দ্রো­হী মধ্যে গণ্য হয়, কো­তোয়ালের হস্তে তা­হার প্রাণ যায়- অব­স্থায় সক­লেই সন্তু­ষ্ট, সক­লেই আন­ন্দিত। কেহ দূরে, কেহ অদূরে, কেহ নগর-প্রা­চী­রে, কেহ কেহ উচ্চ বৃ­ক্ষো­­রি থা­কিয়া উভয় দলের যু­দ্ধ দে­খি­বার প্রয়াসী হইল। মো­হা­ম্মদ হা­নি­ফার পক্ষ হই­তে জনৈক আম্বা­জী সৈন্য যু­দ্ধা­র্থে রণ­প্রা­ঙ্গ­ণে আসিয়া দণ্ডায়মান হই­লেন। প্র­তি­যোধ না পা­ঠাইয়া উপায় নাই। মারওয়ান বা­ধ্য হইয়া বা­ল্ল­কীয়া না­মে জনৈক বী­­কে আম্বা­জীর মস্তক শি­বি­রে আনি­তে আদেশ করি­লেন। যেই আজ্ঞা-সেই গমন।সক­লেই দে­খিল উভয় বীর অস্ত্র চা­­নায় প্র­বৃ­ত্ত হইয়াছে, অস্ত্রে শস্ত্রে সং­­র্ষ­ণে সময়ে সময়ে চঞ্চ­লা চপ­লাবৎ অগ্নি­রে­খা দে­খা দি­তে­ছে। অনে­­ক্ষণ যু­দ্ধের পর আম্বা­জী বল্ল­কীয়া হস্তে পরা­স্ত হইল। পরা­ভব স্বী­কার করি­লেও বল্ল­কীয়া অস্ত্র নি­ক্ষে­পে ক্ষা­ন্ত হই­লেন না। সক­লেই দে­খি­লেন, ইস­লাম শো­ণি­তে দা­মে­স্ক-প্রা­ন্তর প্র­­মে রঞ্জিত হইল-এজি­দের মন মহা­­র্ষে না­চিয়া উঠিল
বল্ল­কীয়া উচ্চৈঃস্ব­রে বলি­তে লা­গিল, "আয় কে যু­দ্ধ করি­বি, আয়! শু­নিয়াছি আম্বা­জী­রা বি­খ্যাত বীর। আয় দে­খি! বী­রের তর­বা­রির নি­­টে কো­ন্ মহা­বীর আসি­বি আয়!"
আহ্বা­নের পূর্বেই দ্বি­তীয় আম্বা­জী বল্ল­কীয়ার সহিত যু­দ্ধ করি­তে উপ­স্থিত হই­লেন। কি­ন্তু তাঁহা­কে অধি­­ক্ষণ যু­দ্ধে ব্যা­পৃত থা­কি­তে হইল না। উষ্ণীষ সহিত দ্বি­তীয় আম্বা­জী-শির ভূমি­তে গড়াইয়া পড়িল।ক্র­মে সপ্ত­জন আম্বা­জী বল্ল­কীয়া-হস্তে শহীদ হইল
এজি­দ্ হর্ষে­­ফু­ল্ল-বদ­নে বলি­তে লা­গিল, "মারওয়ান! আজ কি দে­খি­তেছ? এই সকল সৈন্যই তো তো­মা­দি­­কে পরা­স্ত করিয়াছে, শৃ­গাল কু­কু­রের ন্যায় তাড়াইয়া আনিয়াছে! তা­হা­রাই তো ইহা­রা?"
"মহা­রাজ! ইহার কি­ছুই কা­রণ বু­ঝি­তে পা­রি­তে­ছি না। আমা­দের এক­টি সৈন্য হস্তে মো­হা­ম্ম­দীয় সাত জন সৈন্য কোন যু­দ্ধেই যম­পু­রী দর্শন করে নাই। সক­লই মহা­রা­জের প্র­সা­দাত, আর দা­মে­স্ক প্রা­ন্ত­রের পবি­ত্র­তার গু­ণে।"
এজি­দের পক্ষে উৎসা­হসূচক বা­­নার দ্বি­গুণ রোল উঠিয়াছে। বল্ল­কীয়ার সম্মু­খে কে­হই টি­কি­তে­ছে না! হা­নি­ফার সৈন্য­শো­ণি­তেই রণ­প্রা­ঙ্গণ রঞ্জিত হই­তে­ছে!-এজি­দ্ মহা সু­খী!
গা­জী রহ­মান মো­হা­ম্মদ হা­নি­ফা­কে বলি­লেন, "বা­­শা না­­দার! প্র­কা­রের যোধ শত্রু-সম্মু­খে পা­ঠান আর উচিত হই­তে­ছে না। বু­ঝি­লাম দা­মে­স্ক রা­জ্যের সৈন্য­বল একে­বা­রে সা­মা­ন্য নহে।"
মস্হাব কা­ক্কা, ওমর আলী, প্র­ভৃ­তি বল্ল­কীয়ার যু­দ্ধ বি­শেষ মনো­যো­গে দে­খি­তে ছি­লেন। একা বল্ল­কীয়া কত­­গু­লি সৈন্য বি­নাশ করিল দে­খিয়া তাঁহা­রা সক­লেই যু­দ্ধে গমন করি­তে প্র­স্তুত হই­লেন
মো­হা­ম্মদ হা­নি­ফা বলি­লেন, "ভ্রা­তৃ­গণ! আমার সহ্য হই­তে­ছে না, সমুদয় শরী­রে আগুন জ্বা­লিয়া দিয়াছে। আর শি­বি­রে থা­কি­তে পা­রি­লাম না। তো­­রা আমার পশ্চাৎ রক্ষা করি­বে, গা­জী রহ­মান শি­বি­রের তত্ত্বা­­ধা­নে থা­কি­বে, সৈন্য­দি­গের শৃ­ঙ্খ­লার প্র­তি দৃ­ষ্টি রা­খি­বে। -আমি চলি­লাম। আমি হা­নি­ফার অস্ত্র আর এজি­দের সৈন্য, দুইয়ে এক­ত্র করিয়া দে­খিব বে­শি বল কা­হার।"
হা­নি­ফা কথা বলিয়া অশ্বা­রো­হণ করি­লেন এবং যু­দ্ধ­ক্ষে­ত্রে যাইয়া বলি­লেন, "বী­­বর! তো­মার বী­­­নায় আমি সন্তু­ষ্ট হইয়াছি। কি­ন্তু তো­মার জী­­নের সাধ সক­লই মি­টিল। ইহাই আক্ষেপ!"
বল্ল­কীয়া বলি­লেন, "মহাশয় আর এক­টি সা­ধের কথা বা­কী রা­খি­লেন কেন?"
"আর কি সাধ?"
"হা­নি­ফার মস্ত­­চ্ছে­দন। দো­হাই আপ­নার, আপ­নি ফি­রিয়া যা­উন। কেন আপ­নি আপ­নার সঙ্গী ভ্রা­তৃ­গণ সদৃশ অসময়ে জগৎ ছাড়িবেন। আপ­নি ফি­রিয়া যা­উন। বল্ল­কীয়ার হস্তে রক্ষা নাই। আমি হা­নি­ফার শো­ণি­­পি­পা­সু! আপ­নি ফি­রিয়া যা­উন।"
"তো­মার সাধ মি­টি­বে। আমা­রই নাম মো­হা­ম্মদ হা­নি­ফা।"
"সে কি কথা? এত সৈন্য থা­কি­তে মো­হা­ম্মদ হা­নি­ফা সম­­ক্ষে­ত্রে!-ইহা বি­শ্বা­স্য নহে। আচ্ছা এই আঘাত!"
সে আঘাত কে দে­খিল? পরে যা­হা ঘটিল তা­হা­তে এজি­দের প্রা­ণে আঘাত লা­গিল। বল্ল­কীয়ার শরী­রের দক্ষি­­ভা­গে দক্ষিণ হস্ত­সহ এক দি­কে পড়িল, বাম ঊরু, বাম হস্ত, বাম চক্ষু, বাম কর্ণ লইয়া অপ­রা­র্ধ ভাগ অন্য দি­কে পড়িল
এজি­দ্ অলী­­কে জি­জ্ঞা­সা করি­লেন, "ওহে, বলি­তে পার সৈন্যের নাম কি?"
অলী­দ্ মনো­যো­গের সহিত দে­খিয়া বলি­লেন, "মহা­রাজ! ইনিই মো­হা­ম্মদ হা­নি­ফা।"
এজি­দ্ চম­কিয়া উঠি­লেন, কি­ন্তু সা­­সে নি­র্ভর করিয়া উচ্চৈঃস্ব­রে বলি­তে লা­গি­লেন, "সৈন্য­গণ!অসি নি­ষ্কো­ষিত কর, বর্শা উত্তো­লন কর, যদি দা­মে­স্কের স্বা­ধী­­তা রক্ষা করি­তে চাও, মহা­বে­গে হা­নি­ফা­কে আক্র­মণ কর। এমন সু­যোগ আর হই­বে না। তো­মা­দের বল বি­ক্র­মের ভা­লরূপে পরিচয় পা­­তে হা­নি­ফা যু­দ্ধ­ক্ষে­ত্রে আর আসি­বে না! নি­শ্চয় পলাইয়া প্রা­­­ক্ষা করি­বে। যাও, শী­ঘ্র যাও, শী­ঘ্র হা­নি­ফার মস্ত­­চ্ছে­দন করিয়া আন। তো­­রাই আমার দক্ষিণ বা­হু, তো­­রাই আমার বল বি­ক্রম, তো­­রাই আমার সা­হস, তো­­রাই আমার প্রাণ। ঘোর বি­ক্র­মে হা­নি­ফা­কে আক্র­মণ কর। হয় বন্ধন-নয় শি­­চ্ছেদ, এই দু­­টি কা­র্যের এক­টি কা­র্য করি­তে আজ জী­বন পণ কর। বী­­গণ! বী­­­র্পে চলিয়া যাও। তো­মা­দের পা­রি­তো­ষিক আমার প্রাণ, মন, দেহ-মণি­মু­ক্তা হী­রক আদি অতি তু­চ্ছ কথা।"
সৈন্য­গণ অসি­­স্তে মার মার শব্দে সম­রা­ঙ্গ­ণে যাইয়া হা­নি­ফা­কে আক্র­মণ করিল। এজি­দের চক্ষু হা­নি­ফার দি­কে। এজি­দ্ দে­খি­লেন হা­নি­ফার তর­বা­রি ক্ষ­­স্থায়ী বি­দ্যু­তের ন্যায় চা­ক্চি­ক্য দে­খাইয়া ঊর্ধ্বে, নি­ন্মে, বা­মে, দক্ষি­ণে ঘু­রিল এবং লো­হিত রে­খায় তা­হার পূর্ব চা­ক্চি­ক্য কি­ঞ্চিৎ মলিন ভাব ধা­রণ করিল। সম্মু­খের এক­টি প্রা­ণীও নাই। চক্ষুর পল­কে যেন স্থির বায়ুর সহিত মি­শিয়া অশ্ব হই­তে অন্ত­র্ধান হইল
মারওয়ান বলিল, "বা­­শা না­­দার! দে­খি­লেন অলীদ সহ­জে মদি­নার পথ ছাড়িয়া দেয় নাই।এই যে হা­নি­ফার অস্ত্র চলিল, আম­রা পরাজয় স্বী­কার না করি­লে অস্ত্র আর থা­কি­বে না, দি­বা­রা­ত্র সমান ভা­বে চলি­বে, হা­নি­ফার মন কি­ছু­তেই টলি­বে না, রক্তের স্রোত বহিয়া দা­মে­স্ক প্রা­ন্তর ডু­বিয়া গে­লেও সে বি­শাল হস্তের বল কমি­বে না,-অবশ হই­বে না;-তর­বা­রির তেজ কমি­বে না, ক্লা­ন্ত হইয়া শি­বি­রেও যা­­বে না।"
এজি­দ্ রো­ষে জ্ব­লি­তে­ছে। পু­­রায় পূর্ব­প্রে­রিত সৈন্যের দ্বি­গুণ সৈন্য হা­নি­ফা বধে প্রে­রণ করিল।সৈন্য­গণ মহা­বী­রের সম্মু­খে যাইয়া এক­যো­গে না­না­বিধ অস্ত্র নি­ক্ষেপ করি­তে লা­গিল। যে যেরূপ অস্ত্র নি­ক্ষেপ করিল, ঈশ্ব­রে­চ্ছায় হা­নি­ফা তা­হা­কে সেই অস্ত্রেই যম­পু­রী পা­ঠাইয়া দি­লেন। এজি­দের ক্রো­ধের সী­মা রহিল না।পু­­রায় চতু­র্গুণ সে­না পা­ঠা­ইল। সে­বার এজি­দ্ হা­নি­ফা­কে তর­বা­রি হস্তে তাঁহার সৈন্য­­ণের নি­কট যা­­তে দে­খিল মা­ত্র। পর­ক্ষ­ণেই দে­খিল যে, প্রে­রিত সৈন্যের অশ্ব­­কল দি­গ্বি­দি­ক্ ছু­টিয়া বেড়াই­তে­ছে, এক­টি অশ্ব­পৃ­ষ্ঠেও আরো­হী নাই
এজি­দ্ যু­দ্ধ­ক্ষে­ত্রে স্বয়ং যা­­তে প্র­স্তুত হইল। মারওয়ান কর­যোড়ে বলিল, "মহা­রাজ! এমন কা­র্য করি­বেন না, আজ মো­হা­ম্মদ হা­নি­ফার সম্মু­খে কখ­নোই যা­­বেন না। এখনও দা­মে­স্কের অসং­খ্য সৈন্য রহিয়াছে, আম­রা জী­বিত আছি; আমা­দের প্রাণ শে­ষে যা­হা ইচ্ছা করি­লেন। আম­রা জী­বিত থা­কি­তে মহা­রা­­কে হা­নি­ফার সম্মু­খীন হই­তে দেব না।"
এজি­দ্ মারওয়ানের কথায় ক্ষা­ন্ত হইল। সে দিন আর যু­দ্ধ করিল না। সে দি­নের মত শেষ বা­­না বা­জাইয়া, নি­শান উড়াইয়া মারওয়ান সহ শি­বি­রে আসিল। মো­হা­ম্মদ হা­নি­ফাও তর­বা­রি কো­ষে আব­দ্ধ করিয়া অশ্ব­­ল্গা ফি­রাইয়া শি­বি­রে গমন করি­লেন

⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN

🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

#উপন্যাস
#অনুবাদ
#মোলাকাত
#Molakat
#Novel
#Translation
#BanglaLiterature
#Literature
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#বাংলাসাহিত্য
#সাহিত্য
#বিষাধসিন্ধু
#মীর_মশাররফ_হোসেন

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.