বাঁশি-পাগলি ।। মাহবুবা খন্দকার : পর্ব-১১

 
বাথরুমে গিয়ে রোহান ভাবে, তার রেজাল্টের সংবাদটা নিতুকে জানানোই হলোনা? ক্রমশঃ অন্ধকার নামে। রাত ঘনিয়ে আসে কিন্তু নিতু আর তার চোখের সামনে আসেনা। সেকি ভয়ে না অন্যকোনো কারণে? রাতকাটলো কোনোমতে এপাশ-ওপাশ করে। সংকোচে নিতুও আর রোহানের কাছে আসেনি। কোনোভাবেই চোখের পাতা এক হচ্ছেনা। কোথায় গেল ঘুম? অসহ্য যন্ত্রনা নিয়ে ছটফট করে রোহান। দেয়ালের ঘড়িটার দিকে তাকায়। রাত ২টা। সুনসান নীরবতা চারিদিকে। নিশাচর প্রাণীরা এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করছে। বাইরের আওয়াজ শোনা যায় মাঝে মাঝে। কিচিমিচি শব্দে ছুঁচোর বিচরণ, ঝিঁঝিঁপোকার ডাকও শোনা যায়। কষ্টের রাত যেন পোহাতে চায়না। ঘুমের যে এতমূল্য আগে বুঝিনি তো। আসলে যে জিনিস সহজে পাওয়া যায় তার কদর মানুষ বোঝেনা। আজ যে তার ঘুম আসছেনা, তাই অনুভব করল ঘুমের মূল্য। বেলকুনিতে গিয়ে দেখলো বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শরৎচন্দ্রের একটা বইয়ে দেখেছেআঁধারেরও রূপআছে। হাতে-মুখে পানি দিলে নাকি শরীর ঠাণ্ডা হয়। সে উঠে বেসিনে গিয়ে তাই করে। মুখ-হাত মুছে আবার বিছানায় যায় সে। চুপচাপ চোখবন্ধ করে ১০০ থেকে ১পর্যন্ত উল্টা গুনতে থাকে। একসময় ঘুম এসে যায়। স্বপ্নদেখে রোহান। তার খাটের পাশে নিতু এসে বসেছে। রোহান দেখলো অবগুণ্ঠিত নিতু তার পাশে। তার শরীর সাপের মতো ঠাণ্ডা মনে হয়। হিমশীতল শরীরে যেন বরফের আস্তরণ। অবাক হয় রোহান, নিতু তুমি! এখানে কী করছো? আমাকে বাঁচাও রোহান ভাইয়া। নিতুর চোখে ব্যাকুলতা, হৃদয়ে আকুতি। একী হলো নিতুর! লাফ দিয়ে খাট থেকে নিচে নামে রোহান। কিন্তু কোথায় নিতু! আতিপাতি করে ঘরের মধ্যে খোঁজে। কোথাও নেই নিতু!
                   
ভাবে, এতো স্বপ্ন? স্বপ্নের কোন বাপ-মা আছে! পাশের টেবিল থেকে ঢকঢক করে পানি খায় সে। ভয়ে গলাশুকিয়ে গেছে। আর ঘুম হয়না। লাইটজ্বালিয়ে খাটের ওপর বসে রাত পার করে রোহান। ভোরের আজান হয়। সে নামজসেরে নিয়ে ভাবে, যাক বাবা বাঁচা গেল। এমন কষ্ট যেন জীবনে আর না আসে।
                  
সকালে ড্রয়িং রুমে আসেন রাশিদা বেগম। হাতে রোহানের জন্য খাবার প্লেট। তাকে দেখে রোহান বলে, খালামণি নিতু কোথায়? ওকে তৈরি হতে বলেন। সকালেই আমরা বেরিয়ে পড়বো।
কিন্তু কোনোকথা না বলেই ডাইনিংয়ের দিকে চলে যান রাশিদা বেগম। ব্রেকফাষ্ট এর জন্য ডাইনিং টেবিলে সমবেত হয়েছে সবাই।
- নিতু, রাশেদা বেগম নীরবতাভেঙ্গে কথা বলেন
- জী খালামণি।
- তুমি শাহিনের সংগে যাবে।
- রোহান ভাইয়াকে যে আম্মু পাঠিয়েছে?
- কোথাকার রোহান? ধমক দেন তিনি। নিজের নামটা শুনে রোহান একটু সচকিত হয়ে বসে। দুরুমের  মাঝে যে দরজাটা তাতে শুধু মাত্র একটা পর্দাটাঙানো। ওখান থেকে সব কথাবার্তাই স্পষ্ট শোনা যায়।
- ওদের বাড়ির কাজের ছেলে মামনি। জিতু বলে, কোথায় কুড়িয়ে পেয়ে জাতে তুলেছে।
- আমার সংগেই নিতু যাবে মা, রোহানের সংগে যেতে দিও না, ভেতর থেকে আসতে আসতে শাহিন বলে।
- খালামণি!  নিতু অসম্মতির প্রকাশ ঘটায়।
- আমি যা বলছি তাই হবে নিতু। পথের একটা ছেলের সংগে তোমায় যেতে দেবো, তা হয়না। ধিরিঙ্গি একটা মেয়ে হয়ে গেলে, নিজের ভালো বোঝোনা। তোমাকে নিয়ে কোথায় পালাবে ঠিক নেই। ওরা গোখরোসাপ বুঝলে, দুধকলা দিয়ে পুষলেও ছোবল হানবে একসময়।
- খালামনি! চুপ করুন, নিতু এবার চিৎকার করে ওঠে। খাওয়া আর হয়না। রোহানের অপমান সহ্য করতে না পেওে সে উঠে গিয়ে বেডরুমের দরজা আটকে বিছানায় সটানশুয়ে কাঁদতে থাকে।
                   
ওদের সব কথোপকথন শুনতে পায় রোহান। পায়ের তলার মাটি যেন সরে যায় ওর। শহরের মানুষগুলো শুষ্কইটের ঘরে বাস করে এমন নির্দয় হয়ে গেছে! এই  নিষ্ঠুর সমাজে কীভাবে, কেন যে সে এলো? আর নয়। অভিমানে কাউকে না বলেই সোজা বাসস্টান্ডে চলে আসে রোহান। বাস থেকে দেখা যায় দূরে গ্রামের মানুষগুলোকে। গ্রামের সহজসরল মানুষগুলো কত হৃদয়বান। গ্রাম্য একটা বালিকা শশুরবাড়ি যাচ্ছে বোধয়। কত মেয়ে ওকে গাড়িতে উঠিয়ে দিতে এসেছে। মেয়েটির সেকী কান্না! উপস্থিত সবার চোখেই পানি। সবাই তো তার আত্মীয় নয়। তবুও সবাই কাঁদছে। গ্রামের আন্তরিকতা পরিমাপ করা যায়না। গ্রামের লোকদের প্রতি ওর আন্তরিকতা কেন তাও বুঝতে পারে না। বাস পাবনা ছেড়ে চলে যায়। ভাবনার সমুদ্রে থাকলে বুঝি পরখ করা যায় না সময়। এতপথ অতিক্রান্ত হলো, এত দীর্ঘসময় পেরিয়ে গেলেও টের পায়নি সে। মন যে ভাবনার অতলান্তে আজ। জেগেই ঘুমাচেছ বলে টের পায়নি যে কত দূরত্ব অতিক্রম করেছে। বাসের কন্ডাক্টর জিজ্ঞেস করলো, আরে ভাই কোথায় যাবেন?
- আমি পাবনা যাবো
- পাবনা যাবেন মানে? আমরা তো পাবনাছেড়ে অনেকদূর চলে এসেছি। এটা নাটোর। আগে বলবেন না?
                     
রোহান বাইরে জানালা দিয়ে দেখলো দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা দিঘাপতিয়া, নাটোর। ঠিক আছে ভাই, নামিয়ে দিন আমি ফিরে যাবো, বললো সে। বিভিন্নজনে ভিন্নভিন্ন পরামর্শ দিল ফিরে যাওয়ার। দুষ্টলোকেরা হাসলোও খুব। নেমে পড়ে সে। দুরুদুরু বুকে পা ফেলে এবার। আবার কখন যেন কোনো কাণ্ড হয়ে না যায়! বেলা প্রায় এগারটা। গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যউঁকি দিচেছ। আসার সময় খবরাখবর রাখতে সাময়িকভাবে একটা মোবাইল দিয়েছিল ফিরোজা বেগম, তার চার্জও এমনিতেই শেষ। ফিরোজা বেগমের যুক্তি, এইচএসসি পাশের আগে সন্তানদের হাতে মোবাইল দেওয়া উচিত নয়। তাই বাসার নিয়মানুযায়ী নিতু বা তার কারুরই মোবাইল নেই। 
                    
আবার পাবনাগামী বাসে উঠে বসে রোহান। ঘন্টাদেড়েকের মধ্যে বাস পাবনায় চলে আসে। বাস থামার সংগে সংগে যে যার মতো নেমে গেছে।
- আরে ভাই আপনি নামছেন না যে? কন্ডাক্টর অবাক হয়।
- ওহ, তাই তো! অন্যমনস্ক রোহান জবাব দেয়। বাসের লোকেরা ওর কাণ্ডদেখে এবারও হোহো করে হেসে ওঠে। বাস থেকে নেমে রিক্সার অপেক্ষায় অনতিদূরে দাঁড়িয়ে থাকে সে।
- এই যে ভাই একটু সাইড দেন, অনবরত হাত নাড়তে থাকে ট্রাকের হেলপার। রানা যেন কিছুই শুনছেনা। অগত্যা চলন্ত ট্রাকটি ওকে ধাক্কা দিয়েই চলে যায়। ফলে ---একবার মাত্র চিৎকার।
       
এরপর জনশূন্যস্থান জনবহুল হয়ে যায়। একব্যক্তি ওর নাড়ি পরীক্ষা করেন। বলেন, বেঁচে আছে এখনও। এক্ষুণি হাসপাতালে পাঠানো জরুরি। অচেনালোকেরাই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং ইমারজেন্সিতেও ভর্তি করা হয় তাকে। অপরিচিত ছেলের কোনো অভিভাবক না পাওয়ায় ডাক্তার নোমান নিজের তত্ত্বাবধানেই ওকে ভর্তি করলেন। বললেন, আপাততঃ এখানেই থাক সে। দেখে তো মনে হয় ভদ্রঘরের ছেলে। পরে খোঁজখবর পেলে দেখা যাবে। জীবন তো আগে বাঁচুক।

⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN

🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

#উপন্যাস
#অনুবাদ
#মোলাকাত
#Molakat
#Novel
#Translation
#BanglaLiterature
#Literature
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#বাংলাসাহিত্য
#সাহিত্য
#বাঁশিপাগলি
#মাহবুবা_খন্দকার

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.