বিষাদ সিন্ধু : মীর মশাররফ হোসেন_উদ্ধার পর্ব : ৬০তম প্রবাহ
হুতাশনের দাহন আশা, ধরণীর জলশোষণ আশা, ভিখারীর অর্থলোভে আশা, চক্ষুর দর্শন আশা, গাভীর তৃণভক্ষণ আশা, ধনীর ধনবৃদ্ধির আশা, প্রেমিকের প্রেমের আশা, সম্রাটের রাজ্যবিস্তার আশার যেমন নিবৃত্তি নাই, হিংসাপূর্ণ পাপহৃদয়ে দুরাশারও তেমনি নিবৃত্তি নাই-ইতি নাই। যতই কার্যসিদ্ধি, ততই দুরাশার শ্রীবৃদ্ধি। জয়নাবের রূপমাধুরী হঠাৎ এজিদ্-চক্ষে পড়িল, অন্তরে দুরাশার সঞ্চার হইল। স্বামী জীবিত,-জয়নাবের স্বামী আবদুল জাব্বার জীবিত; অত্যাচার, বলপ্রকাশ মাবিয়ার নিতান্ত অমত, অথচ জয়নাব-রত্ন লাভের আশা। কি দুরাশা! সে কার্যও সিদ্ধ হইল, কিন্তু আশার ইতি হইল না। সে রত্নখচিত সজীব পুষ্পহার দৈবনির্বন্ধে যে কণ্ঠে শোভা করিল-হৃদয় শীতল করিল-সেই কণ্টক। এজিদ্-চক্ষে হাসান বিষম কণ্টক; তাঁহার জীবন অন্ত করিতে পারিলেই আশা পূর্ণ হয়। তাহাও ঘটিল; কিন্তু আশার ইতি হইল না। যাহার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে, তাহার জীবন-প্রদীপ নির্বাণ না করিলে মনের আশা কখনোই পূর্ণ হইবে না। ঘটনাক্রমে কার্বালা-প্রান্তরে প্রভাত হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত রক্তের স্রোত বহিয়া তাহাও ঘটিয়া গেল। সৈন্যসামন্ত প্রহরী পরিবেষ্টিত হইয়া সে মহামূল্য জয়নাবরত্ন দামেস্ক নগরে আসিল, কিন্তু আশার ইতি হইল না।
বৃদ্ধ মন্ত্রী হামান কথার ছলে বলিয়াছিলেন, "যে আমার নয়; আমি তাহার কেন হইব।" এ নিদারুণ বচন কি আঘাতিত হৃদয়মাত্রেরই মহৌষধ? না-রূপজ মোহ যে হৃদয়কে সম্পূর্ণরূপে অধিকার করিয়া বসিয়াছে, সে হৃদয় যথার্থ মানব হৃদয় হইলেও সময়ে সময়ে পশুস্বভাবে পরিণত হয়। প্রথম কথাতেই জয়নাবের মনের ভাব এজিদ্ অনেক জানিতে পারিয়াছেন, সুতীক্ষ্ণ ছুরিকাও দেখিয়াছেন। সে অস্ত্র তাঁহার বক্ষে বসিবে না, যাহার অস্ত্র, তাঁহারই বক্ষ, তাঁহারই শোণিত,-কিন্তু বিনা আঘাতে, বিনা রক্তপাতে, তাঁহার হৃদয়ের রক্ত আজীবন শরীরের প্রতি লোমকূপ হইতে যে অদৃশ্যভাবে ঝরিতে থাকিবে, তাহাও তিনি বুঝিয়াছিলেন।তবে আশা?-আছে। দুরাশা কুহকিনী, এজিদের কানে কয়েকটি কথার আভাস দিয়াছে,-তাহাতেই এজিদের অন্তরে এই কথা-এ কি কথা? কমলে গঠিত কোমলাঙ্গীর হৃদয় কি পাষাণ? কোমল হস্তে লৌহ অস্ত্র! কমল-অক্ষিতে বজ্র দৃষ্টি? কোমল-বদনে কর্কশ ভাষা? কোমল-প্রাণে কঠিন ভাব? অসম্ভব! অসম্ভব! সম্পূর্ণ অসম্ভব এবং বিপরীত! অবশ্যই কারণ আছে। জয়নাল, হানিফা প্রভৃতি জীবিত। সেই কি মূল কারণ? নিশ্চয় তাহারা ভব-ধাম হইতে চিরকালের জন্য সরিলে নিশ্চয় এ বিপরীত ভাব কখনোই থাকিবে না। নিশ্চয়! নিশ্চয়!! নিশ্চয়!!! চিরকালের জন্য সে সময় সে পদ্ম-চক্ষুতে এজিদের ছায়া ভিন্ন আর কোন ছায়া আসিবে না। সে হৃদয়ে সদা সর্বদা এজিদ্-রূপ ব্যতীত আর কোনরূপ জাগিবে না। নিশ্চয়ই কমলে কমল মিশিয়া-কোমল ভাব ধারণ করিবে। আপাদ মস্তকে অন্তরে, হৃদয়ে, প্রাণে, শরীরে উত্তাপবিহীন সুকোমল বিজলীছটা সবেগে খেলিতে থাকিবে।"
একজন আসিয়া বলিল, "বাদশা নামদারের জয় হউক। কতকগুলি সৈন্য নগরাভিমুখে আসিতেছে।" এজিদের মুখভাব কিঞ্চিৎ মলিন হইল।
কিছুক্ষণ পরে আর একজন আসিয়া বলিল, "আমি বিশেষ লক্ষ্য করিয়া আসিয়াছি, যাহারা আসিতেছে তাহারা দামেস্কের সৈন্য।"
কিছুক্ষণ পরে সংবাদ আসিল; "বাদশা নামদার! প্রধান মন্ত্রী মারওয়ান এবং প্রধান সৈন্যাধ্যক্ষ অলীদ মহামতি আসিতেছেন।"
মারওয়ান ওত্বে অলীদ সহ দামেস্কাভিমুখে আসিতেছে, এজিদ্ও মহাহর্ষে সৈন্যগণসহ বিজয়ী বীরদ্বয়ের অভ্যর্থনা হেতু অগ্রসর হইতেছেন, মারওয়ান কখনোই পরাস্ত হইবে না, মারওয়ান পৃষ্ঠ দেখাইয়া কখনোই পলাইবে না, কার্য উদ্ধার না করিয়া দামেস্কে আসিবে না,-এই দৃঢ় বিশ্বাস-এই এজিদের দৃঢ় বিশ্বাস, তাহাতেই এত আশা। অল্প সময় মধ্যেই পরস্পর দেখা সাক্ষাৎ হইল। এজিদ্ বিজয়-বাজনা বাজাইয়া বিজয় নিশান উড়াইয়া উপস্থিত হইল। মারওয়ানের অন্তরে আঘাত লাগিতে লাগিল, ম্লানমুখ আরো মলিন হইল।
এজিদ্ অনুমানেই বুঝিল-অমঙ্গলের লক্ষণ! কি বলিয়া কি জিজ্ঞাসা করিবে? কুকথা কুসংবাদ যতক্ষণ চাপা থাকে ততক্ষণই মঙ্গল! মন্ত্রীবরের গলায় রত্নহার পরাইবার কথা বিপরীত চিন্তায় চাপা পড়িয়া গেল! বিজয়-বাজনা স্বভাবতঃই বন্ধ হইল। মারওয়ানের মুখে কি কথা অগ্রে বাহির হইবে শুনিয়া এজিদের মহা আগ্রহ জন্মিল।
মারওয়ান নতশিরে অভিবাদন করিয়া বিনম্রভাবে বলিল, "মহারাজ! আর অগ্রসর হইবেন না।শত্রুদল আগত!"
এজিদ্ সদর্পে বলিল, "যাঁহার জন্য আমাকে বহুদূর যাইতে হইত, ঘটনাক্রমে নিকটেই পাইলাম। চিন্তা কি? মারওয়ান এত আশঙ্কা কি? চালাও অশ্ব-এখনি আক্রমণ করিব।"
ওদিকে গাজী রহমান আপন সুবিধামত স্থানে শিবির নির্মাণের আদেশ দিয়া গমনে ক্ষান্ত হইলেন। মোহাম্মদ হানিফা, মস্হাব কাক্কা প্রভৃতি গাজী রহমানের নির্দিষ্ট স্থান মনোনীত করিয়া অশ্ব হইতে অবতরণ করিলেন। সৈন্য সামন্ত, অশ্ব উষ্ট্র ইত্যাদি ক্রমে আসিয়া জুটিতে লাগিল। বাসোপযোগী বস্ত্রাবাস নির্মাণ হইতে আরম্ভ হইল। গাজী রহমানের আদেশে দক্ষিণে, বামে, সম্মুখে, সীমা নির্দিষ্ট করিয়া তখনি সামরিক নিশান উড়িতে লাগিল। মারওয়ানের চিন্তা বিফল হইল। সমর-ক্ষেত্র,-উভয় দলের সম্মুখ ক্ষেত্র! এজিদ্ পক্ষেও যুদ্ধ নিশান উড়িল, শিবির নির্মাণের ত্রুটি হইল না-প্রভাতে যুদ্ধ।
⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN
🔗 MY OTHERS CHANNELS
🔗 FOLLOW ME
Facebook: facebook.com/molakat
Facebook: facebook.com/afsarnizam
Instagram: instagram.com/molakat
Instagram: instagram.com/afsarnizam
Twitter: twitter.com/afsarnizam
🔗 MY WEBSITE
🔗 CALL ME
+8801819515141
🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com
#উপন্যাস
#অনুবাদ
#মোলাকাত
#মোলাকাত
#Molakat
#Novel
#Translation
#BanglaLiterature
#Literature
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#বাংলাসাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#সাহিত্য
#বিষাধসিন্ধু
#মীর_মশাররফ_হোসেন

No comments