জামেদ আলীর উপন্যাস: মুনীরা ।। মাহমুদ হাফিজ

 
কথা সাহিত্যে আমাদের তখা বাঙালি মুসলমান লেখকদের পশ্চাৎপদতার কথা সর্বজ্ঞ বিদিত সৈয়দ। ওয়ালিউল্লাহর পরে বর্তমান দুতিন দশকে তেমন কোন মুসলিম লেখক কথা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেননি। বর্তমান দশকেও যারা সাহিত্যের কলকাঠি নাড়ছেন, কথা সাহিত্যে তাদের পদচারণ খুব ক্ষীর্ণ। ভবিষ্যতে এক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানদের অবদান কেমন হবে সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না।
অবশ্য সাহিত্যের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে ইদানীং বেশ আশার আলো দেখা যাচ্ছে। লেখকরা হাঁটি হাঁটি পা পা করে অনেক দূরে এগিয়ে গেছেন। ইতিমধ্যে অনেকেই বেশ উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এদের মধ্যে জনাব জামেদ আলী উল্লেখযোগ্য লেখক। উপন্যাস গল্পের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন।
আলোচ্য মুনীরা গ্রন্থটি তার একটি বিশিষ্ট উপন্যাস। ইতিপূর্বে প্রকাশিত তাঁর আরো কয়েকটি উপন্যাস পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। প্রত্যেকটি রচনাই চমৎকার কাহিনীতে বর্ণিত। আকর্ষণীয় চরিত্রে ভরপুর। তাঁর কাহিনী উপস্থাপনা চরিত্র চিত্রণে শব্দের যে মাধুর্যময় দ্যোতনার ব্যবহার, তা অতি সহজেই পাঠকদের মুগ্ধ করতে পারে।
মুনীরা এক অতি সুন্দরী শিক্ষিত তরুণী। রূপ, গুণ চরিত্র মাধুর্যে অনন্য। তাঁর লাবণ্যময়ী তন্বীদেহ, আকর্ষণীয় ফিগার, হরিণাক্ষী চোখের চাহনি, হাসি কথা বলার সাবলীল ভঙ্গি যে কোন যুবককে পাগল করার মত। রূপ-লাবণ্যে অপরুপ মুনীরা চরিত্র মাধূর্যেও অনন্যা। শহরের শিক্ষিত ষোড়শী হিসাবে যেমনটি উচ্ছৃঙখল, নিলর্জ্জ আর বেয়াদব হওয়া স্বাভাবিক, সে রকমটি তো নয়ই; বরং নম্্র, ভদ্র, বিনয়ী। লজ্জাবতীর মত লাজুক প্রকৃতির এক রূপের রাণী মুনীরা।
পাশের পাড়ায় লজিং মাষ্টার গরীবের ছেলে অথচ কলেজের সেরা ছাত্র মাহতাবের সাথে মুনীরার চোখা-চোখি। তার পরই হয়ে যায় ওদের বিয়ে। বিয়ের পর বাপ-মা হারা মুনীরাকে আদরের আশ্রয়স্থল বড় ভাই-ভাবীর সংসার ছেড়ে রাজধানীতে মাহতাবের বাসায় চলে যেতে হয়। এখানে বাঁ হাতের আয়ে শিক্ষিত মাহাতাব হয়ে যায় অন্ধ। টাকা-পয়সার অজস্রতায় জৈবিক লালসার প্রভাবে গড়ে সে অপসংস্কৃতির গোলাম হয়ে যায়। পর্দানশীল রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে লজ্জাশীলা মুনীরাকে নামাতে চায় জনসমক্ষে। ওর তন্বী দেহের ভাজে ভাজে কি গোপন মজা লুকিয়ে আছে অর্ধোলঙ্গ কাপড়-চোপড় পরিয়ে মানুষের সামনে তার প্রদর্শনী করাতে চায় মাহতাব। নিজের বৌ এর দেহকে  মানুষের সামনে উন্মেচিত করে গর্ব করতে চায় ও।
স্রষ্টার প্রতি অনুগত মুনীরা স্বামীর সকল হুকুম যথাসাধ্য রক্ষা করে। এক পর্যায়ে তার ধৈর্যের সীমা অতিক্রান্ত হলে মাহতাবের সংসার ছেড়ে পালিয়ে আসে মুনীরা। ভাইয়ের বাসায় আশ্রয় নেয়। সেখানে প্রসূত মাহতাবের সদ্যজাত সন্তানকে বুকে নিয়ে কাল কাটাতে থাকে মুনীরা।
ওদিকে মুনীরার অবর্তমানে মাহতাব ওর স্যারের মেয়ে অত্যাধুনিকা জিনিয়ার সাথে অবৈধভাবে নিজের বাসায় অবস্থান করতে থাকে। সাথে সাথে অফিসের মহিলা স্টেনোর প্রতিও আকৃষ্ট হয়। ষ্টেনো নন্দিতা অফিসের অন্য একজন অফিসার গজনফরের সাথে চক্রান্তের মাধ্যমে মাহতাবের সাথে ছলনার আশ্রয় গ্রহণ করে। এই নন্দিতার চক্রান্তেই মাহতাব দশ হাজার টাকা উৎকোচ গ্রহণের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড প্রাপ্ত হয়।
দীর্ঘ পাঁচ বছর কারাবাসের প্রাক্কালে মাহতাব নিজের জীবনের ভুলচুক খতিয়ে দেখে। এই পৃথিবীতে টাকা-পয়সা. শান-শওকত, মদ-নারী, বিলাস-বাসন সবই তার কাছে অনর্থ মনে হয়। তখন মুনীরার পুতপবিত্র চরিত্রই তার কাছে সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয়। জেল থেকেই খাঁটি আল্লাহর বান্দা হয়ে যায় মাহতাব। মুক্ত হওয়ার পর তাই মুনীরার কাছেই ফিরে যায় ও।
সংক্ষেপে এটাই হলো জামেদ আলীরমুনীরাউপন্যাসের মূল কাহিনী।
এই কাহিনীকে উপন্যাসে রূপ দিতে গিয়ে তিনি আরো বেশ কয়েকটি চরিত্র উপস্থিত করেছেন। প্রত্যেকটি চরিত্রই আপন বৈশিষ্টে অনন্য। তিনি সুন্দর করে প্রতিটি চরিত্রকে স্থাপন করেছেন। জামেদ আলী কল্পনার ফানুসে ওড়েন না। তাই তার গল্প-উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রই হয় বাস্তবসম্বত।
শুধু তাই নয়। জামেদ আলীর লেখার একটা আলাদা বৈশিষ্ট রয়েছে। তাঁর শব্দ চয়ন, বর্ণনা, ভঙ্গী, একেবারে ঝরঝরে। নতুন কোন উপন্যাস পাঠকেরও তার বুঝতে অসুবিধা হয় না। যে কোন সাদামাটা জিনিসকে তিনি এমন সুন্দরভাবে বর্ণনা করতে পারেন তাতে পাঠকের মন অভিভূত না হয়ে পারে না।
‘... দক্ষিণের জানালাটা হাটি করে খোলা। বাতাবী গাছের ওপর দিয়ে দূরে স্বচ্ছ নীল আকাশটা শুধু চোখে পড়ে। গোটা দুই শঙ্খচিল ডানা মেলে চক্রাকারে উড়ছে। কয়েক খণ্ড সাদা মেঘ আকাশের ওপ্রান্তে শুভ্র কাঁশফুলের মতন থোকায় থোকায় ভাসছে।’ (পৃষ্ঠা: ১৯৮)
‘... দক্ষিণের জানালাটার ধার ঘেঁষে বাতাবী লেবুর গাছ। তার ঘন সবুজ পাতার ভেতর একটা পাতি ঘুঘু এতক্ষন একটানা সুরে ঘু ঘু করছিল। দমকা হাওয়ায় ওর পালকগুলি চুলবুলিয়ে উঠতেই পাখিটি মুনীরার চোখের ওপরই ডাক ভুলে নিশ্চুপ হয়ে গেল।’ (পৃষ্ঠা ১১২)
‘... ঘরটাতে কেমন আলো-আধারির ছায়াচ্ছন্নতা। ছাদের সাথে লেগে আছে এখানে-সেখানে সবুজ-গোলাপী আলোর বাল্ব। তার নি¯প্রভ আলো ঘরটাকে কেমন আলো-আধারিতে রহস্যময় করে তুলেছে। একটা লাল মুখো গোবদা গাবদা লোক বুক সমান অর্ধ বৃত্তাকার টেবিলের ওপাশে বসে যেন মিট-মিট করে তাকাচ্ছে। মুনীরার সিট থেকে লোকটাকে পরিস্কার দেখা যাচ্ছে।’ (পৃষ্ঠা: ২৩)
এগুলোই হলো জামেদ আলীর ঝরঝরে ভাষা বর্ণনার উদাহরণ। এমনিভাবে তিনি অনর্গল বলে গেছেন কাহিনীর পর কাহিনী।
জামেদ আলী ন্যায়ের কথা বলেন, অন্যায়কে প্রতিহত করার কথা বলেন। তিনি এই উপন্যাস লিখতে গিয়ে এমন সব প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন যাতে করে তাকে একজন দক্ষ সাংবাদিক হিসাবে চিিহ্নত করা যায়। বর্তমান সমাজ রাজনৈতিক পেক্ষাপটে যে অপসংস্কৃতির বিভীষিকা বিদ্যমান, যে অরাজকতা বিরাজমান, এতে তার মনপ্রাণ বিষিয়ে ওঠে। এর বিরুদ্ধে বলার জন্য আকুপাকু করে তার হৃদয়। কিন্তু কিভাবে বলবেন তিনি? তিনি তো আর সাংবাদিক নন যে, পত্রিকায় লিখে মনের ঝাল ঝাড়বেন। তার উপন্যাসের মধ্যে এমনভাবে সে কথা বলে ফেলেন যা বেমানান লাগে না। অপ্রাসংগিকও মনে হয় না।
জামেদ আলী ব্যক্তিগতভাবে একটি আদর্শের অনুসারী। নিজের জীবনের যে আর্দশকে বিশ্বাস করেন তিনি, তাঁর সাহিত্যেও দেখা যায় সেই বিশ্বাাসের প্রতিফলন। বিশ্বাস কর্মের সাথে অসংগতিপূূর্ণ সাহিত্য তার অপছন্দ। আমাদের দেশের লেখকরা যা বিশ্বাস করেন তাদের সাহিত্যে তার প্রতিফলন নেই। বা যে বিশ্বাস কর্মে তারা বিশ্বাসী সাহিত্যে তার উল্টোটি লিখে যান। লেখকের এই বিরাট ফাঁকির ফলে পাঠক তার রচনায় সাহিত্য রস খুঁজে পান না। এক্ষেত্রে জনাব জমেদ আলীর উপন্যাস এক অনন্য বৈশিষ্ট্যর অধিকারী তার লেখার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তিনি একটি কাহিনীকে এমন কৌশলে উপস্থাপন করে পাঠক লোভ সংবরণ করতে না পেরে ক্রমাগত সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বস্তুত একজন লেখকের লেখার কৃতিত্বও সেটাই।মুনীরাএকটি অনন্য সুন্দর উপন্যাস। এর গল্প বর্ণনাশৈলী, শব্দ চয়ন চরিত্র চিত্রণ চমৎকারীত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যে কোন; পাঠক মাত্রই বাস্তবসম্মত কাহিনী পড়ে মুগ্ধ হবেন। তাঁর মাঝে মাঝে এক আধটু অতিরঞ্জন কাহিনীর ভারসাম্যহীনতা পড়ে চমৎকারীত্ব কিছুটা স্তিমিত করেছে। বইটির প্রকাশক বাংলা সাহিত্য পরিষদ। উল্লেখ্য :বাংলা সাহিত্য পরিষদের প্রকাশিত আরো বই আমাদের হাতে রয়েছে। সংস্থাটি নতুন হলেও ইতিমধ্যেই প্রকাশনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বর্তমান বইটি লেখক কাগজে মুদ্রিত। বিখ্যাত শিল্পী হামিদুল ইসলামের আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ চার রঙা অফসেটে ছাপা, সুন্দর বাঁধাই সব মিলে গ্রন্থটির প্রকাশনার দিকটাও বেশ চমৎকার। একবার হাতে নিলে কিনতে ইচ্ছে হয়। সমস্যা অবশ্য একটা আছে সেটা হলো মূল্যের। তবে বইটি এক দেখাতেই পছন্দ হয়ে যাবার পর কোন ক্রেতা যদি শোনেন এর দাম একান্ন টাকা বোধ করি তবুও বইটি লুফে নেয়ার জন্য পকেট উজাড় করতে কাপর্ণ্য করবেন না।
যাহোক লেখক জামেদ আলী যে নতুন ধারায় নিজের বিশ্বাস কর্মের ভিত্তিতে সাহিত্য রচনা শুরু করেছেন এটা ভবিষ্যতে জামেদ আলীর স্টাইল হিসেবেও পরিচিতি লাভ করতে পারে। কে জানে আজকের জামেদ আলীই ভবিষ্যতে এক নতুন ধারায় দিকপাল হবে না? আমরা বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।

🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

#গ্রন্থালোচনা
#বইআলোচনা
#বইপত্র
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#Molakat
#Book_Review
#Book_Discussion
#Literature
#Bengali_Literature
#মাহমুদ_হাফিজ
#জামেদ_আলী

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.