ছড়ায় নতুন সূর্যালোকের স্বপ্ন দেখান স.ম. শামসুল আলম ।। তাজ ইসলাম

 
সমগ্র মানেই হল এক মলাটে একজন লেখকের সৃজন কর্মের বিশাল কিছু পাওয়া।একটি লেখাকে শিল্পীর কলমের ডগায় ফুটানো ফুল ধরা হলে গ্রন্হ হল তার বৃক্ষ।সমগ্রকে আমরা এই অর্থে একটি গ্রন্হ বাগানই বলতে পারি।যে বাগানে সৃজনশীল ব্যাক্তির বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রুচির রচিত প্রকাশিত গ্রন্হের একটি বিশাল সমাহার।সমগ্র পাঠে পাঠকের উপলব্ধিতে ধরা দেয় লেখক সত্তার প্রায় পূর্ণ মেজাজ।কবি,ছড়াকার,গল্পকার . . শামসুল আলম '
" ছড়াসমগ্র " তেমনই একটি ছড়াবাগান।এখানে সন্নিবেশিত আছে গ্রন্হাকারের বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ছড়াগ্রন্হের অনেক গুলো গ্রন্হের সমন্বয়।একজন ছড়া বোদ্ধার জন্য গ্রন্হটি অতীব জরুরী।" ছড়াসমগ্র " ছড়াকারের বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত নির্বাচিত কিছু গ্রন্হ স্হান পেয়েছে।এর শীর্ষে আছে লেখকের "হেসে ফাটে দম "বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের ছড়াসমুহ এখানে লিপীবদ্ধ করা
এই গ্রন্হে ছড়াকার নিজের বিষয় ভাবতে গিয়ে নিজেই হেসে দম ফাটিয়েছেন,আবার ঢাকাকে মেগাসিটি বানাতে বলেছেন "জ্ঞানের কথা,কখনো আবার আপন খেয়ালে ব্যান্ড শো-তে শিখেছেন গান।এভাবেই নিজের চিন্তার জমিনে চাষাবাদে তিনি মগ্ন হয়েই অনুভব করেছেন ঘরহীন মানুষের ঘরের প্রয়োজনীয়তার কথা
যার থাকবার মত এক প্রস্হ নিরাপদ আশ্রয় নেই তার কাছে ঘর কত প্রয়োজন সেই কেবল বুঝে।রোদ বৃষ্টি ঝড় থেকে নিশ্চিন্ত নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যই প্রয়োজন ঘর।কারো ঘর পাকা,কারো ঘর টিনের।কিন্তু যার ঘরই নাই তার প্রয়োজনীয়তার কথা কবি প্রকাশ করেন " ঘর প্রয়োজন সব মানুষের / হোক না ছনের ছাওয়া/ ছনের ঘরও কারো কাছে/ অনেক বড় পাওয়া।"(ঘর পৃষ্টা ৪১)
কবি ছড়াকার . . শামসুল আলম ছড়ায় রূপকের আশ্রয় নেন।রূপকের মাধ্যমে বলতে পছন্দ করেন অনেক কিছু।অসম যুদ্ধে চর্ম চোখে দূর্বলের পরাজয় দেখলেও পরাজয়ের মাঝেই জয় দেখেন ছড়াকার গরু আর বাঘের লড়াই মুলত প্রায় অসম্ভব।যদিও মনে হয় সেক্ষেত্রে বাঘের জয়ই সুনিশ্চিত।কিন্তু কবি বা ছড়াকারগণ দেখেন কল্পনার চোখে।তাদের কল্পনার বিস্তৃত জালে ধরা পড়ে অনেক কিছু। সে সবের কিছু আমরা জানতে পারি তাদের রচিত পঙক্তি পাঠে।আগ্রহী পাঠক যখন পাঠ করে "খবর আছে জরুরি-/ বাঘের সাথে লড়াই করে/ ঠ্যাং ভেঙেছে গরুরই।/ (খবর) এটিই স্বাভাবিক।বাঘের সাথে লড়াইয়ে গরুর ঠ্যাং ভাঙার খবরই শুনতে প্রস্তুত পাঠক।কিন্তু শেষ ফলাফলে যখন শুনি "কাঠবিড়ালি ঘোষণা দেয়/ জয় হয়েছে গরুরই-/খবর কিন্তু জরুরি।() "তখনই জরুরি খবরের অন্তর্নিহিত বিষয়টি আমাদের অনুভবে নাড়া দেয়।১৯৯৭ সালে প্রকাশিত
"হেসে ফাটে দম " নামক গ্রন্হটিতে এমন মজার প্রায় আটত্রিশটি ছড়া আছে এই সমগ্রে
সমগ্রে গ্রন্হিত কবির প্রথম গ্রন্হটি উৎসর্গ করেছেন তার স্নেহের সন্তান আনন আর উফাকে।দ্বিতীয়টির উৎসর্গ কার নামে তা জানার কৌতুহল মিটবে উৎসর্গপত্র পাঠে।"সব মানুষের বুকের ভেতর / কে লুকিয়ে থাকে? / নিশ্চয়ই তার মা।/ তাক ধিনা ধিনতা/' আনন উফার ছড়া ' দিলাম/ আনন উফার মাকে/"
এই গ্রন্হের ২৩ টি ছড়া গ্রন্হিত আছে সমগ্রে।সবগুলো ছড়াই শিশু মনে তুলবে ছন্দের ঝংকার,স্বপ্নের বিস্তারে রাখবে অনন্য ভূমিকা।পুরো বইটিই আনন আর উফাকে ঘিরে আবর্তিত।ছড়ার শিরোনামেই তা অনুমেয়।যেমন, আনন উফার ছড়া,উফার জন্মদিন,আননের মুখ,উফার জ্বর,উফামণির বায়না,উফার পুতুল,আননের পোষার জগৎ,পিচ্চি উফার প্রশ্নগুলো।যে সব ছড়ায় শিরোনামে আনন উফা অনুপস্হিত ঘোরেফিরে সেগুলোতেও তাদের বিচরনই লক্ষ করা যায়।পড়তে পারেন "এইতো উফা উপুড় হলো,/ এই তো মিঠে হাসে/ ছোট্র ঘরের চাঁদে),অথবা আনন সোনা দুই বছরে পা দিয়েছে এই সেদিন,/ এখনই সে করছে কী তাল! যুগের হাওয়ায় নেই সেদিন।( পাগল পাগল গান)" বস্তুত পৃথিবীর সব বাবা মারই হৃদয়ের পৃথিবী সাজানো থাকে তার সন্তানদের নিয়ে।কবির পৃথিবী সাজানো থাকে কবিতার ফুলে।
. . শামসুল আলম একজন পিতা এবং কবি।কবিপিতা হিসেবে তার সন্তানদের জন্য এক অমূল্য কাব্য উপহার তার পক্ষ থেকে।
আধুনিক যান্ত্রিকতার যুগে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যিক অনেক কিছু।পালকি তারই একটি।কিন্তু সচেতন শিল্পী মন সযতনে তুলে ধরেন সেসব তাদের সৃজন কর্মে। "চার বেহারার চৌদোলে/ লাল টুকটুক বউ দোলে/ (চৌদোলে বউ দোলে)" এটি একজন ছড়াশিল্পীর ঐতিহ্যিক সচেতনতার লক্ষণ। তার ছড়ায় গ্রামবাংলার আবহ বিরাজ করে।এবং তিনি স্বাচ্ছন্দবোধ করেন গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক পরিবেশ ফুটিয়ে তুলতে নিজের ছড়ায়।তার স্বগর্ব ঘোষণা "পাংশা থেকে একটু দূরেই/ গাঁয়ের নামটি শিকজান/ সেই গাঁয়ের এক দস্যি ছেলে আমিই সবার ঠিক যান।/( চিনুক)"প্রায় কুড়িটি শিশুতোষ ছড়া আছে "ব্যাঙ বেড়ালের ছড়া "গ্রন্হে।যার প্রকাশকাল ছিল। ২০১৩ সাল।সমগ্রে সূচিপত্রের ক্রমে তার স্হান তিন
ইষ্টিকুটুম,বিশাল চতুষ্পদ,আঁটুবাঁটু,হাই- ফাই,তেলের কেঁড়ে দুধের কেঁড়ে, এগুলো মুলত ছড়ার শিরোনাম। এছাড়াও আছে আরো কিছু ছড়া।মোট বিশটি ছড়া উদ্ধার করতে পারবে "আঙুল কেটে আড়ি " ছড়া গ্রন্হের পেট থেকে।আর সমগ্রে তার অবস্হান চারএ।শিশুবেলার প্রকাশিত ছড়াগ্রন্হটির প্রকাশকাল ২০১৫। প্রচ্ছদ দেখলেই বুঝা যায় এটি শিশুদের জন্য লিখা একটি সুন্দর গ্রন্হ।তবে এটি শুরুই হয়েছে নীতুর সাথে আড়ি দিয়ে।এই আড়িই ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে ব্যবধানের দিকে।এক সময় এই ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখনই ছড়াকার বলে ওঠেন "তোমার আছে অট্রালিকা,/ আমার ছনের কুটির-/ আকাশ পাতাল রয় ব্যবধান/ বসত বাড়ি দুটির।/ তবে শেষ পর্যন্ত তিনি আর সেই ব্যবধান জিঁইয়ে রাখতে রাজি নন।তিনি হেঁটে চলেন সমাধানের দিকে।এবং বলেন "সব ব্যবধান নেই প্রয়োজন/ এত ঘাঁটাঘাঁটির-/ তুমি ফলের মালিক হলে/ মালিক আমি আঁটির।( ব্যবধান)" যদিও এটি ব্যাজ্ঞার্থই বহন করে।
"ভূতের সাথে ভেলু মামার/ অন্য রকম মিতালি-/ এমন একটি খবর শুনে / দিচ্ছি সবাই কী তালি/(ভূতের সাথে ভেলু মামা)" আরে ভাই তালি দেয়ার আগে জেনে নিন কোথা হতে আসলো ভেসে খবর? খবর লিখা আছে . . শামসুল আলম ' " ভূতের বেগার খাটি "গ্রন্হে।এটি তিনি প্রসব করেছেন পূর্বের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০১৬ সালে।আর এই যাত্রায় রঙবেরঙের ২২টি ছড়া পড়তে পারবেন ১৩১ পৃষ্ঠা থেকে ১৫৫ পৃষ্ঠার চাদরে।এবং শেষে আপনি দেখে অবাক হবেন" কাণ্ড কেমন ভূতুড়ে "তখন যদি বলে বসেন কি সব অং বং চং। আমরা অবাক হবনা।কেননা আপনার কথা মিলে গেছে আমাদের সাথে।আমরাও আপনার জন্য পরিবেশন করছি ছড়াকারের বয়ানে " অং বং চং " নামক ছড়াগ্রন্হ। আরো আছে" গয়নার নাও " "বলতে পারি কথা" "হুমড়ি খেয়ে পড় " "গাধার হাসি " " গল্প নাচে ছড়ার গাছে " গ্রন্হগুলোর আকর্ষনীয় ছড়াসমুহ
শামসুল আলম ছন্দ সচেতন।ছন্দের তাল লয় মাত্রার খেলায় তিনি দক্ষ।কখনো কখনো দক্ষতার ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে দুয়েকটি ছন্দ পতন।তবে সচেতন পাঠক না হলে একমাত্রার পতনের আওয়াজ তাদের কানে না বেজেই গড়গড় করে পড়ে ফেলবে "মা- বাবা, দাদা- দাদি, ছয় ভাই - বোন, / কাজের বুয়াকে নিয়ে মোট কত জন / (বিশ্বকাপ সমর্থক)" মা- বাবা তে যে একমাত্রা কম এটি পড়ার চালাকিতে অনেক সময় পারপেয়েও যেতে পারে।বোন এর সাথে জন এর অন্তমিলকেও দূর্বল হলেও চলে আরকি বললে বলা যায়।তবে তিনি ছন্দের নানা ভাঙন- গড়নের খেলা খেলে পরীক্ষায় নেমেছেন অন্তমিল বিহীন ছড়া লেখার প্রয়াসে।লিখেছেন "বিজ্ঞাপনের গদ্যছড়া ' মত ছড়া। এতে অন্তমিল না থাকলেও আছে ছন্দের নাচন।
ছন্দের ঝংকার, বিষয়ের বৈচিত্রতা,ভাবনার বহুমাত্রিক সম্মিলনে .. শামসুল আলম ' ছড়ার জগতকে করেছেন বর্ণিল।ছড়ায় তিনি রসাত্মক উপস্হাপনায় প্রকাশ করেন রূঢ় বাস্তবতা।পাঠক অবাক বিস্ময়ে পাঠ করেন "বাহাদুরি ঠাট আছে/ তিন পায়া খাট আছে/ এক পায়ে ইট, / শুতে গিয়ে মাঝে মাঝে / পড়ে হই ফিট।/( সম্পদ)" আমরা সহজে মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্তের কঠিন বাস্তবতাটা উপলব্ধি করি খুব ভাল ভাবেই
গ্রামবাংলার বিশাল মনোরম দৃশ্য,হারিয়ে যাওয়া পালকি,সবুজ বনবনানী,গৃহপালিত অতি পরিচিত পোষা প্রাণী গরু,বিড়াল ছানা,হাতি,বাঙালী জাতীর অহংকার একুশে ফেব্রুয়ারী,১৬ ডিসেম্বর এই সবই . . শামসুল আলমের ছড়ার বিষয়।তার ছড়ার বিষয় বিস্তর।যা কিছু দৃশ্যমান সবই সে বিষয়ের অন্তর্গত।ছড়ার ভাষা সহজ সাবলীল।শিশুর সরলতায় উপস্হাপন করেন নিজের বক্তব্য। নিজে স্বপ্ন দেখেন।সে স্বপ্নের বীজ ঢেলে দেন শিশুর নিস্পাপ মনজমিনে।দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দিতেও ভুল করেন না তার স্বপ্নের কথা।স্বপ্নের মাঠে কুড়িয়ে পান মহারাজের তাজ।সেই তাজের মহিমায় তিনি প্রজা কষ্টের কারণে মন্ত্রিকে করেন চাকরিচ্যুত,বস্তিকে রূপান্তরিত করেন প্রাসাদে,রাজ্য থেকে দূর করেদেন অভাব,আরো কত কী।সেই স্বপ্নের রেশ তার শেষ হয়নি তাই বলেন "ধড়ফড়িয়ে জেগে আমি/ মেলেই দেখি চোখ,/ জানলা দিয়ে দিচ্ছে উঁকি/ নতুন সূর্যালোক।/( মহারাজের তাজ)" আমরাও আশাবাদী এই নতুন সূর্যালোকের, এই নতুন ভোরের।
শিল্পীর স্বপ্ন পূরণের মাধ্যমে এগিয়ে যাক দেশ সত্য সুন্দর শান্তির দিকে।৩৩২ পৃষ্টার বিশাল বইটির সুন্দর ছাপা,উন্নত কাগজ,মজবুত বাঁধাই বইটিকে আরো একধাপ পাঠক মুখী করে তুলেছে।বইটি সংগ্রহে রাখার মত মূল্যবান একটি বই।আমরা বইটি প্রচার কামনা করি।
ছড়াসমগ্রঃস. . শামসুল আলম
প্রথম প্রকাশঃ২০১৭,প্রচ্ছদঃধ্রুব এষ।প্রকাশনায়ঃইত্যাদি গ্রন্হ প্রকাশ।মুল্য ৫০০ টাকা

🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

#গ্রন্থালোচনা
#বইআলোচনা
#বইপত্র
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#Molakat
#Book_Review
#Book_Discussion
#Literature
#Bengali_Literature
#তাজ_ইসলাম
#__শামসুল_আলম

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.