সামরিক, অর্থনেতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন: চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি মুসলিম উম্মাহ ।। ড. এ কে এম আজহারুল ইসলাম

 
বর্তমানে মুসলিম উম্মাহ্ বহুবিধ সমস্যার মুখোমুখি। প্রকৃতপক্ষে ঊনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে দীর্ঘকাল ধরে তারা নানাবিধ চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে লড়ছে। সে সময়কার মুসলিম পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গের মতে মুসলমানদের সমূহ সমস্যার কারণ হচ্ছে পশ্চিমা জাতিগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব। তাদের মতে এই রাজনৈতিক প্রভাব-বলয়ের পরিসমাপ্তিই কেবল বয়ে আনতে পারে সকল সমস্যার সমাধান। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সমাপ্তি লগ্ন থেকে প্রায় সব মুসলিম জনগোষ্ঠী দেশী-বিদেশী শাসনের নিগড় থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। তথাপি তাদের সমস্যাগুলোর সমাধান তো দূরে থাক, আজও তা জাজ্ব¡ল্যমান জটিলতা নিয়ে বিরাজ করছে।
সম্প্রতি ইসলাম এবং মুসলিম জাতি তার ঐতিহাসিক শত্রুদের কাছ থেকে এক বিষময় ভয়াবহ আদর্শিক আক্রমণের শিকার হচ্ছে। গত কয়েক বছরে বিশেষ করে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পর থেকে তা প্রকট রূপ লাভ করেছে।ইসলাম ঘৃণা, সহিংসতা ধর্মীয় যুদ্ধবিগ্রহকে উস্কে দেয়’- জাতীয় কুধারণা পাশ্চাত্য জগতে বদ্ধমূল হচ্ছে এবং সম্ভবত তা ভাষ্যকার, ধর্মীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রেণীর মানুষ যারা এসব সম্পর্কে কিছুই জানতো না তাদের কাছেও এখন পূর্বের যে কোন মাত্রার চেয়ে তা তীব্র ব্যাপকভাবে পরিচিত। তথাকথিতশীতল-লড়াই’-এর অবসানের পর থেকে ইসলামের প্রতি পাশ্চাত্যের মনোভাব নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং ইসলামকে তারা বর্তমানে নিয়ন্ত্রক ইলেকট্রনিক মাধ্যম টিভি চ্যানেলগুলো যা তাদের গেলায় তাকেই তারা পরমনিষ্ঠ নিশ্চিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করে। সাধারণত আর সব ধর্মের মতোই ইসলামকেও উপস্থাপন করা হয়, তাতে ইসলামকে একটি হুমকি এবং অনমনীয় গোঁড়া ধর্ম হিসেবেই দেখানো হয়। ইসলামের মৌলিক শিক্ষাগুলোকে কদাচিৎ- কোনরকম বিকৃতি বা পরিবর্তন ছাড়া উপস্থাপন করা হয়।
আজ বিভিন্ন দেশের মুসলমানগণ বিভিন্নমুখী সমস্যার মোকাবিলা করছে যার কিছু তাদের নিজেদের ভুলের কারণে, কিছু ওআইসি জাতিসংঘের অকর্মণ্যতা অযোগ্যতা এবং কিছু পশ্চিমা শক্তিধর দেশের গৃহিত অপকৌশলের কারণে। উদাহরণস্বরূপ ধরা যেতে পারে, ফিলিস্তিন ইরাকের ভবিষ্যতের কথা কিংবা আলজেরিয়ায় সংঘটিত সেই গোলযোগ-মৃত্যু-ধ্বংস যা শক্তিশালী দেশগুলোর বদান্যতায় ঘটিয়ে জোরপূর্বক দেশটির গণতন্ত্রের পথে অগ্রযাত্রা স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছিল।
গণতন্ত্রপ্রেমী পশ্চিমা জনগণের নেতারা ইরানের গণতন্ত্রকেও শান্তিতে রাখেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সাথে সমস্যা রয়েছেইরানের অবৈধ শাসকের’ (সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিজা রাইস কর্তৃক ব্যবহৃত শব্দ; বিবিসি ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০০৬) ইরানে যুক্তরাষ্ট্র তাদেরনিজস্ব ধাঁচের গণতন্ত্রচালু করার নীতি কার্যকর করতে লক্ষ লক্ষ ডলার ব্যয় করছে এবং ইরানী শাসনের পতন ঘটাতে দেশের বাইরে অবস্থানরত ইরান বিরোধী দলীয় সদস্যদের ব্যবহার করছে।
ইসরাইলের প্রতি মার্কিন সহযোগিতা রাখঢাকহীন, খোলামেলা, অথচ সম্মত শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে রয়েছে মার্কিন সহযোগিতার অভাব। যে কেউ অনুমান করতে পারেন যে, যদি কোন অতি নাটকীয় ঘটনা না ঘটে তবেগাজাকে জনশূন্য করা হবে এবং পরিণত করা হবে বিস্তীর্ণ কারাগারে। যেখানে এই নব্য বার্লিন দেয়াল ক্রমে ফিলিস্তিনীদের জীবনকে শ্বাসরুদ্ধ করে তুলবে এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরকে বর্ণবাদী আগ্রাসী ইসরাইলী প্রশাসন ছিঁড়ে খুঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। অধিকৃত এলাকার সড়ক এবং এসব বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডগুলো ফিলিস্তিনীরা ব্যবহার করতে পারছেনা এবং জেরুযালেমে মুসলিম খ্রিস্টানদের এলাকাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে খ্রিস্টান সংখ্যাধিক্য তিমুরের অংশ পূর্ব তিমুর মাত্র দুই বছরে স্বাধীনতা পেয়েছে কিন্তু একই সহযোগিতার অভাবে মুসলমানরা ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, কসোভো প্রভৃতি জায়গায় বহু দশক ধরে অপ্রাপ্তির বেদনায় অবসন্ন হয়ে পড়ছে।
ফিলিস্তিনে অবাধ গণতান্ত্রিক নির্বাচনে হামাস-এর বিপুল বিজয়কে স্বীকৃতি দেয়নি ইসরাইলের একান্ত অনুগত মিত্র আমেরিকা। ফিলিস্তিনী নির্বাচন পর্যাবেক্ষক সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারল্যারি কিং লাইভঅনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘হামাস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি আদায়ের দাবি রাখে। গ্রুপটির সশস্ত্র ইতিহাস থাকা সত্বেও ফিলিস্তিনের এই নতুন নেতৃবৃন্দ সহিংসতা থেকে ফিরে দাঁড়াতে পারে।তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যদি সারা পৃথিবীতে নির্বাচনগুলোকে স্পন্সর করি কিংবা গণতন্ত্র স্বাধীনতার উত্তরণ ঘটাই, আর তখন যদি জনগণ তাদের নিজেদের নেতাদের ব্যাপারে নিজেরাই সিদ্ধান্তে পৌঁছে তবে আমার ধারণা সকল সরকারই প্রশাসনকে স্বীকৃতি দেবে এবং তাদেরকে সরকার গঠনের সুযোগ দেবে। ফিলিস্তিনী জনগণ ইতোমধ্যেই ইসরাইলী দখলদারী নির্যাতনের শিকার। আবার তাদের স্কুল-শিক্ষক, পুলিশ, জনকল্যাণকর্মী স্বাস্থ্য কর্মীদের বেতন এবং জনগণকে খাবার দেয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত। তিনি আরো বলেন যে, আমেরিকার উচিৎ নয় ফিলিস্তিনী জনগণের প্রতি সহযোগিতা বন্ধ বা হ্রাস করা, বরং উচিৎ জাতিসংঘের মতো তৃতীয় কোন পক্ষের মাধ্যমে সেই সরবরাহ অব্যাহত রাখা।
একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনে হামাসের বিজয়কে এই অজুহাতে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি যে, মার্কিন যুদ্ধাস্ত্রসজ্জিত ইসরাইলীদের আগ্রাসনের মোকাবিলার অংশ হিসেবেই হামাস সশস্ত্র যুদ্ধে জড়িত ছিল। তাদের অপরাধ হচ্ছে এই যে, তারা ইসরাইলী দখলদারী প্রতিরোধ করেছিল এবং তারা দখলদারদের স্বীকৃতি দেয় না। জায়নবাদী সাবেক নেতাদের কথা কারো ভুলে যাওয়া উচিৎ নয় যারা বিশিষ্ট বৃটিশ ফিলিস্তিনীদের হত্যার দায়ে অভিযুক্ত এবং যারা পরবর্তীতে ইসরাইলী সংসদ বা সরকারের অংশ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। ১৯৪৮-এর ডিসেম্বর নিউইয়র্ক টাইমস সংখ্যায় প্রকাশিত এক চিঠিতে ইহুদী বংশোদ্ভূত বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন এবং আরো ১৮ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির ভাষায়, ‘আমাদের সময়ের সবচেয়ে গোলযোগপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাটি হচ্ছে নবগঠিত রাষ্ট্র ইসরাইলে ফ্রিডম পার্টির (Tnuat Haherut) আত্নপ্রকাশ। এই রাজনৈতিক দলটির সংগঠন পদ্ধতি, রাজনৈতিক দর্শন সামাজিক আবেদনের সাথে ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে নাৎসী ফ্যাসিবাদী দলগুলোর। ফিলিস্তিনের সন্ত্রাসী দক্ষিণপন্থী উগ্র-স্বদেশী সাবেক সংগঠন (Trgun zvaileumi) এর সদস্যদের নিয়ে দলটি গঠিত হয়।
জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া একতরফাভাবে ইরাকে অনুপ্রবেশের কারণ যাই হোক না কেন, মার্কিন নীতি নির্ধারকগণ প্রায় সকলে একমত হয়েছিল যে, ইরাক দখলের প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জসমূহ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের মারাত্মক অযোগ্যতার ফলেই ইরাকে বিশাল বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। আবু গারিব কারাগারে যুদ্ধবন্দি আচরণের সকল বিধি উপেক্ষা করে ইরাকীদের উপর মার্কিনীদের যে নির্যাতন তা সারা বিশ্বে বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোতে মার্কিন ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।
ইরাকে সর্বশেষ যুদ্ধেই মৃত্যু ঘটেছে হাজার হাজার নিষ্পাপ ইরাকী নর নারী শিশুর, যাদের এই সংঘাতে কোন রকম ভূমিকাই নেই। এই দেশটি তার বিপুল তেল সম্পদ দিয়ে হতে পারতো একটি সমৃদ্ধশালী দেশ। তা না হয়ে একনায়কতন্ত্র, অবৈধ যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং বিদেশী দখলদারিত্বের কারণে অভ্যন্তরীণ স্থাপনা ধ্বংসের মধ্য দিয়ে এখন দেশটির প্রায় সকল সম্ভাবনাই দূরীভূত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের বেশ ভিতরে হামলা করছে। এতে নিরস্ত্র নিরীহ ব্যক্তির মৃত্যু ঘটছে। জানুয়ারি ২০০৬- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের বেশ ভিতরে আল কায়েদার নেতা মনে করে জনৈক ব্যক্তির ওপর হামলা চালালে নিহত হন নিরস্ত্র নিরীহ ১১জন গ্রামবাসী। এর আগে মার্কিনীরা আফগানিস্তানের এক গ্রাম্য বরযাত্রীদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে মেরে ফেলে ৩৩ জন নর নারী শিশুকে। এটা সত্যি দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, কেউ চাইলেই অন্য একটি দেশের সীমানা লঙ্ঘন করতে এবং কোন রকম দায়বদ্ধতা জবাবদিহিতা ছাড়াই নিরীহ লোককে খুন করতে পারে।
/১১ হামলার পর কয়েকশ সস্ত্রাসীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিশ্বব্যাপী একটি যুদ্ধ কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। এসব বিষয়ে তারা অযৌক্তিকভাবেইসলামিস্টপরিভাষাটি ব্যবহার করছে এবং সাধারণ ইসলামপন্থীদেরকে মার্কিন জনগণ তাদের স্বার্থের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবেই ধরে নেয়া হয়েছে। পাকিস্তানের সাবেক বিদেশ সচিব তানভীর আহমদ খান মর্মে মনোযোগ আকর্ষণ করেন যে, প্রতিরোধের ধারায় খণ্ড খণ্ড বহু সহিংস পক্ষ তৈরী হচ্ছে যা রাষ্ট্র বা কোন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
 
বিভাজনের খেসারত গাজা লেবাননে অনুপ্রবেশ
মুসলিম উম্মাহর বিভাজনের খেসারত দিচ্ছে গাজা পশ্চিম তীরের দুর্ভাগা ফিলিস্তিনীরা। নিরীহ বেসামরিক মানুষ হতাহতের বিষয়টি হয়ে উঠেছে নৈমিত্তিক ব্যাপার। সাম্প্রতিক মারাত্মক যুদ্ধ অপরাধের ঘটনার বছরখানেক আগে ২০০৬ সালের জুনে সাগরতীরে বনভোজনরত ঘালিয়া পরিবারের সবাইকে খুনের ঘটনা যুদ্ধবাজ ইসরাইলীদের সংহারী রূপকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এভাবেই ইসরাইলী সৈন্যদের দখলদারী এবং বহু সংখ্যক ফিলিস্তিনী মন্ত্রী এমপির গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে সহিংসতার চাকা ঘুরতেই থাকে। জনাকীর্ণ সড়কে ক্ষেপনাস্ত্র হামলার ফলে স্বভাবতঃই সাধারণ মানুষের হতাহতের ঘটনা ঘটে, কেননা ডানে বায়ে নির্বিচারে ছুড়ে মারা বোমায় যে কেউ আক্রান্ত হয়। আর এভাবেই সমগ্র মুসলিম উম্মাহ মুখোমুখি হচ্ছে বহুবিধ সমস্যা করুণ পরিণতির, যা বিশ্বের চলমান ঘটনা প্রবাহের সাথে সম্পৃক্ত। এই পরিণতি আরা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে মুসলমানদের অনৈক্যের মাধ্যমে।
নবী মুহাম্মদ সা. আল্ল¬াহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালার কাছ থেকে একমাত্র ইসলামই এনেছিলেন। কিন্তু শত শত বর্ষব্যাপী ইসলাম সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞানী-বুদ্ধিজীবী মহলের বিভিন্নমুখী চিন্তা-ব্যাখ্যার বদৌলতে আজ তৈরী হয়েছে ইসলাম মতাবলম্বী দল-উপদল। প্রতিটি ফেরকা বা তরিকার অনুসারীরা নিজেদেরকে ইসলামের সঠিক অনুসারী বলে দাবি করলেও অধিকাংশ ইসলামী চিন্তাবিদের মতে এসব উপদলের কোন কোনটি ইসলামের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী। এভাবেই মুসলিম বিশ্ব আজ সম্পূর্ণরূপে দ্বিধাগ্রস্থ ঐক্যবর্জিত। একতার অভাব, ইসলাম সম্পর্কে দ্বিধা, ক্ষমতার লোভে পরস্পর হানাহানি (যেমন ইরাকে বহিরাগত দখলদারের প্রভাবে পারস্পরিক সংঘাত বিদ্যমান), প্রয়োজনীয় জ্ঞান দক্ষতার অভাব, স্রষ্টাপ্রদত্ত সম্পদের অপপ্রয়োগ ইত্যাকার নানাবিধ কারণে আজকের মুসলিম বিশ্ব উন্নয়নের সর্বনিম্ন অবস্থানে এসে পৌঁছেছে।
বিশ্ব আজ মুসলমানদের বিভক্তি প্রত্যক্ষ করছে। অবশ্য এটাও সত্য যে, মুসলিম বিশ্বের অনেকখানিই ছিল উপনিবেশের অধীন। ঔপনিবেশিক শাসনামলে মুসলমানরা মোকাবিলা করেছেডিভাইড এ্যান্ড রুল’ (বিভাজনের মাধ্যমে শাসন করো) নীতির। আজো তারা সেই অচলায়তন ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়নি। ধর্মীয়, রাজনৈতিক, নৃতাত্বিক, সাংস্কৃতিক, গোষ্ঠীগত, ভাষা দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই মুসলমানরা বিভক্ত। এই বিভক্তি আরো গড়িয়েছে উপবিভক্তি, মর্যাদা, সম্পদ, খ্যাতি নিয়তি অবধি, যা মুসলমানদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব নির্ণয় করে দিয়েছে। বর্তমান অচলাবস্থার মূলে প্রধানত এই বিভক্তি বা অনৈক্যই দায়ী। বহু রাষ্ট্রপ্রধান তুচ্ছ স্বার্থের বিষয়েই কেবল ভাবেন এবং তাঁরা যে একে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হন, প্রণোদিত হন শাস্তি ভোগ করেন সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র উদ্বেগও তাঁরা বোধ করেন না। . হাবিব সিদ্দিকীর ভাষায়: “পূর্বে ইন্দোনেশিয়া থেকে পশ্চিমে কসোভো সেনেগাল পর্যন্ত বিস্তৃত গোটা মুসলিম জাতির রক্তক্ষরণ চলছে। নিশ্চয়ই মুসলমানদের মারাত্মক বিচ্যুতি ঘটে গেছে।এসবের কারণ এই যে, মুসলমানরাঅদূরদর্শীহয়ে পড়েছে। তিনি আরো জোর দিয়ে বলেন যে, মুসলিমগণ তাদের সাংস্কৃতিক বৈজ্ঞানিক মেধা বিকাশের চেয়েভোক্তার গুণাগুণবৃদ্ধির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে মুসলিম নেতৃবৃন্দের অযোগ্যতা অসহায়ত্ব এতটাই স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে যে, তারা যেন সত্যিকার অর্থে নিজেদেরও চালনা করতে পারছেন না।
বিখ্যাত কলামিস্ট এস. নিহাল সিং লিখেছেনট্রাজেডি হচ্ছে এই যে, আরবদের একক বা সম্মিলিত কোন বক্তব্য নেই এবং মুসলিম বিশ্বের বাকি অংশ খুবই দুর্বল এবং বিভক্ত, যা আজকের পরিণতির জন্য উপযুক্ত বটে তিনি আরো লিখেছেন-সাম্প্রতিক সময়ে প্রায়শঃই আরববিশ্ব তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভীষণ হতাশ যোগসূত্রহীন হয়ে পড়েছে। গন্তব্যের একমাত্র ফলক বা নির্দেশিকা হিসেবে যা সে দেখতে পাচ্ছে তা হলো আগ্রাসী মার্কিন ইচ্ছায় দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি। এভাবেই এসব অঞ্চলকে ওয়াশিংটনের স্বার্থে ব্যবহারের প্রয়োগ চলছে। মার্কিন ছল-চাতুরী রোডম্যাপের ফন্দি-ফিকিরই ফিলিস্তিনে স্থায়ীভাবে একটি সত্যিকার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্তরায় হয়ে আছে। অযোগ্য অসমর্থ আরবদের নিয়ে একত্রে মিলেমিশে একটি বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার যোগসাজস চলছে।
 
সামরিক, অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক হামলা
যে সব ঘটনা নিচয়ের মধ্যে আরবরা ব্যাপৃত, তাতে প্রকৃত অর্থে তাদের নিজস্ব কোন পছন্দ বা অভিমতের সুযোগ খুবই সীমিত। ফিলিস্তিন বিষয়টির অস্তিত্ব যেন শুধু এক বাগাড়ম্বর। আগের যে কোন সময়ের তুলনায় অধিক শক্তিশালী এক ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আরব এতদঞ্চলে পুলিশীগিরি করছে-আরবরা তা বুঝতে পারছে। তারা এখন এটাও বুঝতে সক্ষম যে ইরাকে হামলা এবং দখল নেয়ার পর মার্কিন প্রশাসন গণতন্ত্রের ছল করে ওয়াশিংটনের স্বার্থ সংরক্ষণে আরব শাসকদের ওপর জোর খাটাচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জোরপূর্বক সরকার পদ্ধতি বদলাতে চাইছে, চাইছে তাদের পছন্দনীয় সরকারগুলোর ওপর নিজেদের ইচ্ছা ফলাতে; ইসরাইলও তাইওয়ানের পক্ষে প্রতিনিধিত্বমূলক লড়াই করছে; প্রতিরোধ করতে কিংবা পাল্টা হামলা চালাতে অক্ষম এমন দেশগুলোতে আক্রমণ করে স্থাপন করছে উপনিবেশ; শক্তি প্রভাবহীন দুর্বল গরিব দেশগুলোর বিরুদ্ধে আরোপ করছে অর্থনৈতিক অবরোধ; আত্মসম্মানবোধ নিয়ে কোন জাতি বা দেশ মাথা তুলে দাঁড়ালেই তাকে হুমকি দিচ্ছে এবং নাক গলাচ্ছে অপর সব দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে।’ ‘ওসামা বিন লাদেনগ্রন্থের লেখক জনাথন ্যান্ডাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে সবচেয়ে হাতশাব্যঞ্জক মন্তব্যটিই করেছেন যে, দেশটি উম্মাদের ন্যায় সারা পৃথিবী দাবড়ে বেড়াচ্ছে অথচ ক্ষয়িষ্ণু পচনশীল ফিলিস্তিন কাশ্মীরে সুষ্ঠু অবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
আরববিশ্বকে বাগে রাখতে এবং তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভীতি প্রদর্শনের বহু জুজু রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ইসরাইল তার প্রধান শত্রু হিসেবে বিবেচনা করতো ইরাককে। তাইতো আমেরিকা ২০০৩ সালে সাদ্দামকে উৎখাত করলে ইহুদী এই দেশটি খুশি হয়। এখন সে তার অপর দুই প্রধান শত্রু দেশ সিরিয়া ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেলে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দুটি দেশকেই চাপে রাখছে-প্রথমটিকে (সিরিয়া) লেবাননে অপমানিত করার মাধ্যমে সেখান থেকে সিরীয় সৈন্যদের সরিয়ে দিয়ে এবং দ্বিতীয়টি তেহরানের পারমাণবিক অভিলাষের জন্য ভয়াবহ হুমকি দেয়ার মাধ্যমে।
কে.এম. কামেলের বিশে¬ষণ মতে মুসলিম বিশ্বের সাংস্কৃতিক, ভূ-কৌশলগত এবং সামাজিক সীমানা পুনঃনির্ধারণের কাজ চলছে ওয়াশিংটন লন্ডনে। Civil Democratic Islam: Partners, Resources, Strategies শীর্ষক একটি রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই এই বিশে¬ষণ। রক্ষণশীল স্মিথ রিচার্ডসন ফাউন্ডেশনের আর্থিক আনুকূল্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জঅঘউ কর্পোরেশন উক্ত রিপোর্টটি প্রস্তুত করে। এই ট্রাস্টের তহবিল থেকে গবেষণা সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রতি বছর দশ কোটি ডলারেরও অধিক অর্থ সহযোগিতা প্রদান করা হয়। সমাজবিদ রিল বেনার্ড এই পলিসি পেপার প্রস্তুত করেন। ইতোপূর্বে তিনি Moghul Buffet and Veiled Courageসহ নারী বিষয়ক কিছু উপন্যাস প্রকাশ করেন। এসব উপন্যাসে ধর্মীয় নেতাদের উপহাস করা হয় এবং মুসলিম নারীদের দেখানো হয় সর্বতোভাবে পুরুষশাসিত এবং পিতৃপ্রধান নিয়মের অধীনে বসবাসকারী নির্যাতিত একজন হিসেবে।
এইপলিসি পেপারউৎসর্গ করা হয়েছে মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমাদের সামরিক, অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক প্রবল আক্রমণের প্রসার কামনা করে। সাবেক জঅঘউ বিশে¬ষক লরেন্ট মুরউয়িক ২০০২ সালের মাঝামাঝি এক ব্রিফিং- সৌদি আরবকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধেশয়তানের হাড্ডি, নাটের গুরু এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রতিপক্ষহিসেবে উলে¬ করেন। তিনি মর্মে আহবান জানান যে, মার্কিন প্রশাসনের উচিৎ সৌদি আরবকে সন্ত্রাসবাদের প্রতি সমর্থন বন্ধের দাবি জানানো, অন্যথায় সে দেশের তেলক্ষেত্রগুলো ছিনিয়ে নেয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাদের যে অর্থ সম্পদ রয়েছে তা তাদের হারাতে হতে পারে। তিনি এও পরামর্শ দেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে বহু পর্যায়ে পরিকল্পিত তৎপরতা চালাতে হবে যার সূচনা হবে ইরাককে দিয়ে (সৈন্য-সমাবেশের কেন্দ্র বিন্দু) এবং সৌদি আরব (সময় কৌশলের কেন্দ্রস্থল) পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে তা চূড়ান্ত হবে মিসরে (যেটা হবে প্রকৃত পুরস্কার)
ঘোরতর ইসলামবিদ্বেষী সমাজবিদ বেনার্ড নিজেই মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমাদের সাংস্কৃতিক আক্রমণের অনেকগুলো উদাহরণ। ইসলামী শরীয়াহর বিশেষজ্ঞ না হয়েও তিনি পর্দা বিষয়ে রায় প্রদান করেছেন। ফ্রান্সের পাবলিক স্কুলগুলোতে মাথায় স্কার্ফ পরিধানের ওপর বিতর্কিত ফরাসী নিষেধাজ্ঞার প্রতি বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মুসলিম মহিলা প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিলেন। কিন্তু এই মহিলা 'ঈযৎরংঃধহ ঝপরবহপব গড়হরঃড়ৎ' পত্রিকায় লিখেন যে, এই নতুন আইনটি মহিলা অধিকার আদায়ে একটি ইতিবাচক জোর পদক্ষেপ। তাঁর ভাষায়: মুসলিম বিশ্ব জুড়ে মেয়েরা প্রায়শ হিজাব পরিধান করে, কেননা তাদেরকে তা করতে বাধ্য করা হয়। পর্দা হচ্ছে মূলত বাধা-নিষেধ ভীতির প্রতীক। তিনি জনৈক অজ্ঞাত মিসরীয় লেখকের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যেখানে দাবী করা হয়েছে, মাথায় স্কার্ফ দেয়া কোন বাধ্যতামূলক বিষয় নয়-এটা কুরআনের অপব্যাখ্যা থেকে উদ্ভূত।
আরব দেশগুলোতে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ ভীতিই শুধু নয়, নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়ার ভীতিও যথেষ্ট বিদ্যমান। তারা আটকে পড়েছে উভয় সংকটে; জলে কুমির, ডাঙ্গায় বাঘ। পাকিস্তানের বিদেশ বিষয়ক সাবেক সচিব তানভীর আহমদ খানের পর্যবেক্ষণ হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আরবরা তাদের ওপর যে হুমকি হয়ে রয়েছে, সে সম্পর্কে সত্য কথাটাই উচ্চারণ করতে পারে না। তিনি আরো যোগ করেন- বিশ্বব্যাপী ঐকমত্য রয়েছে যে, বর্তমান ঘটনা প্রবাহের প্রকৃত সন্ধিক্ষণ হচ্ছে /১১ বিপর্যয়। ইসলামী ব্যক্তিবিশেষ মাত্রই ভালোভাবে জানেন যে, দীর্ঘকালব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সতর্কতার সাথে উদ্দেশ্য প্রণোদিত যে নীতিসমূহ চালিয়ে আসছিল ঘটনা ছিল তারই এক শক্তিশালী বিস্ফোরণ। আর তাতেই ওয়াশিংটনের নয়া রক্ষণশীল ক্ষমতাসীনরা বিশ্বব্যাপী তাদের বিজয় প্রভাব বিস্তারে এই সর্বশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আরববিশ্ব বহির্জগতের বহু বিশে¬ষক এই অভিমতের অনুরণন তুলেছেন। সংক্ষেপে আর এক ভাষ্যকারের মতামত এই যে, ‘যুক্তরাষ্ট্র সমগ্র মুসলিম বিশ্বে দীর্ঘ মেয়াদী সামরিক, অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক দখলের ভিত্তি স্থাপন করেছে।বিশ্বে শান্তি আনয়নে এবংচরমপন্থীদেরকার্যক্রম যাতে আর কোন ভিত্তি না পায় সেই লক্ষ্যে মুসলিম বিদ্বেষ অন্যায় অবিচারের ইস্যুগুলো সারা বিশ্বের মনোযোগের আওতায় আনা উচিত।
  
ভিসি, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম এবং প্রফেসর, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN

🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

#সংস্কৃতি
#বাংলাদেশী_সংস্কৃতি
#ইসলামী_সংস্কৃতি
#মঞ্চনাটক
#মোলাকাত
#Molakat
#Culture
#Bangladeshi_Culture
#Islamic_Culture
#Literature
#Bengal_Literature
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#__কে_এম_আজহারুল_ইসলাম

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.