কোন মুমিন ব্যক্তি জাহেলী আইনের অধীনে কখনো সুখে ও নিশ্চিন্তে দিন যাপন করতে পারেন না। জাহেলী আইন ব্যবস্থায় মদ সিদ্ধ, কিন্তু ইসলামী আইন ব্যবস্থায় তা নিষিদ্ধ। বিজ্ঞানও স্বত:স্ফুর্তভাবে স্বীকার করে যে, মদ শুধু বুদ্ধিভ্রম ঘটায় না, মদ শরীরের অভ্যন্তরে কিডনী, লিভার পাকস্থলী ও হার্টের উপরও অত্যন্ত ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে। মহা বিজ্ঞানময় আল্লাহতাআলা মদকে হারাম ঘোষণা করেছেন। এমনিভাবে মানবতার কল্যাণের জন্যই সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহরব্বুল আলামীন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যেসব নিয়ম কানুন বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন এবং তা যখন কোন মানব সমাজ, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিধিবদ্ধ করে নেয়, কেবল তাঁর অধিনেই একজন মুমিন জীবন যাপন করে স্বস্তি পাবে। আর যখন বিপরীত আইন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পায় তখন মুমিনের অন্তর্জ¡ালার সীমা থাকে না।
মুমিন
প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেন আল্লাহর দুনিয়াতে আল্লাহর দেয়া নীতি নিয়ম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কিভাবে কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা যায়। কিন্তু সবার পক্ষে একইভাবে সেই চেষ্টা করা সম্ভব হয় না।
আল্লাহতালা বলেছেন, ‘তোমরাই সর্বোত্তম দল, তোমাদেরকে মানুষের হেদায়াত ও সংস্কারের জন্য কর্ম ক্ষেত্রে উপস্থিত করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখবে।’ আল ইমরান:১১০।
আবু সাঈদ আল খুদরী রা. বলেন, ‘আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, ‘তোমাদের কেউ যখন কোন খারাপ কাজ হতে দেখে সে যেনো তা হাত দিয়ে [শক্তি প্রয়োগে] বন্ধ করে দেয়। যদি সে এ ক্ষমতা না রাখে তবে যেনো মুখের কথার দ্বারা [জনমত গঠন করে] তা বন্ধ করে দেয়। যদি সে এ ক্ষমতাটুকু না রাখে তবে যেনো অন্তরের দ্বারা [পরিকল্পিত উপায়ে] এটা বন্ধ করার চেষ্টা করে বা এর প্রতি ঘৃণা পোষণ করে। আর এটা হলো ঈমানের দুর্বলতম এবং নিুতম স্তর।’
অতএব
দেখা যাচ্ছে জাহেলী কর্মকান্ডের মধ্যে মুমিনদের চুপচাপ বসে থাকার কোন সুযোগ নেই।
চলচ্চিত্র, মঞ্চ, রেডিও এবং টেলিভিষণ ব্যক্তিত্ব ওবায়দুল হক সরকারও চুপচাপ ছিলেন না। তিনি তাঁর নাট্য সংগঠন ও লেখনীর মাধ্যমে অকল্যাণের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। আমরা যদি তাঁকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এমন কি চলমান রাষ্ট্রিয় সংস্কৃতির দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করি তবে তাঁকে সঠিকভাবে বুঝা সম্ভব হবে না।
ওবায়দুল
হক সরকারের শিল্পী জীবনের কর্মকাণ্ড ও তাঁর রচনা পাঠ করলে আদর্শের পথে তাঁর চেষ্টা এবং জাহিলীয়াতের আঘাতে তাঁর রক্তাক্ত অন্তর্লোকের যন্ত্রণা উপলব্ধি করা সম্ভব আর সে যন্ত্রণার স্পষ্ট স্বরূপ ছায়াছবির মতো আমাদের সামনে ভেসে উঠবে যদি আমরা তাঁকে আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝবার চেষ্টা করি। আমরা জানি একটা রুট ‘আইডিয়া’কে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র ও নাটকের শারিরীক কাঠামো বিন্যস্ত হয়। চরিত্রগুলোর আবেগ, তাদের চিন্তা, কাজ ও ঘটনা বিন্যাস হয় সবই ঐ রুট আইডিয়াকে ঘিরে। তেমনি একজন মানুষের সমস্ত চিন্তা, কর্ম এবং তার আবেগ তাড়িত হয় তার নিজস্ব একটা রুট আইডিয়াকে ঘিরে। ওবায়দুল হক সরকারের রুট আইডিয়াটি ছিলোÑ ‘মুসলমানদের চিন্তাগত ও বৈষয়িক উন্নতি সাধন।’ আর সে উন্নতি সাধনের পথে বিরোধীদের যে বাঁধা, শত্র“তা, প্রতিরোধ বা আঘাতÑ তিনি তাকেই প্রতিরোধ করেছেন। পাশাপাশি এগিয়ে যাবার এবং এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছেন।
১৯৫১
সালে তিনি ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক সংসদ’ প্রতিষ্ঠা করেন। তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন এনায়েত উল্লাহ খান, আনোয়ারুল আজিমসহ কিছু তরুণ প্রতিভা। এক এক করে নাটক মঞ্চস্থ করেন ‘জবানবন্দী, নার্সিংহোম, নবান্ন, পথিক, রক্তের ডাক ইত্যাদি।’ সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের নিয়ে প্রথম মঞ্চস্থ নাটকেও তাঁর ছিলো বিশেষ অবদান। বহু অভিনেতা-অভিনেত্রীকে ঘষা-মাজা করে হীরক খন্ডের মতো উজ্জ্বল করে তুলতে সাহায্য করেছেন। তার নিদর্শন চিত্রনায়িকা কবরী, চলচ্চিত্রও নাট্যাভিনেতা আবুল হায়াত, জামাল উদ্দিন, আবুল কাশেম, গোলাম রব্বানী এবং নাটক ও অনুষ্ঠান নির্মাতা শাহ আলম নূর প্রমুখ। যারা তাঁকে ‘ওস্তাদ’ বলে সম্বোধন করতেন।
চলচ্চিত্রের গুণি পরিচালকরা জনাব ওবায়দুল হক সরকারকে মূল্যায়ন করতেন। তাইতো আমরা দেখি, পরিচালক মিতার ‘লাঠিয়াল’ সুভাস দত্তের ‘বসুন্ধরা’ ও ‘আকাংখা’ খান আতাউর রহমানের ‘আবার তোরা মানুষ হ’ শহীদুল হক খানের ‘ছুটির ফাঁদে’ এহতেশামের ‘বন্দিনী’ আমজাদ হোসেনের ‘দুই পয়সার আলতা’ ছবিতেÑ তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। প্রায় পঞ্চাশটির মতো চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। প্রতিটি চলচ্চিত্রই সেই সময় সুধি দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। এবং ওবায়দুল হক সরকার দর্শকদের হৃদয় জয় করেছিলেন।
মঞ্চ,
রেডিও, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্র- এই চারটি মাধ্যমে তিনি তাঁর জীবনের ষাটটি বছর কাজ করে গেছেন। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিভিন্ন মঞ্চে কয়েক হাজার নাটক তিনি পরিচালনা করেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানের বিচারক ছিলেন বেশ কয়েক বছর। পাশাপাশি সরকারী চাকরিও করে গেছেন। ওবায়দুল হক সরকারের এতসব কর্মকান্ডের প্রতি পরতে পরতে জড়িয়ে ছিলো তাঁর অতিতের তিক্ত অভিজ্ঞতা। ইংরেজ আমলের পুলিশ অফিসার পিতা জনাব আলী হুসেন সরকারের ছিলো বদলীর চাকরি। সেই সুবাদে পশ্চিম বঙ্গের হাওড়া, হুগলী, বাঁকুড়া, বীরভূমÑ নদীয়াতে কাটিয়েছেন এমন এক বয়সেÑ যে বয়সে একজন মানুষের মন-মস্তিস্কের ভিত তৈরি হয়। তিনি দেখেছেন মুসলমানদের ওপর হিন্দুদের বৈষয়িক ও মানুষিক নির্যাতন। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে পশ্চিম বঙ্গের বাঁকুড়াতেই তিনি প্রথম নাট্য মঞ্চে অভিনয় করেন। তাঁর শিল্পী মন ছিলো নরম সংবেদনশীল। তখনি পরিবার থেকে, স্বজন থেকে প্রবল বাধা তাঁকে চিন্তা করতে শিখায় মুসলমানদের সংস্কৃতি সম্পর্কে। তিনি তাঁর এক লেখায় বলেছেন, ‘কুরআনপাকে নাটক নিষিদ্ধ কিনা সে সম্পর্কে কোন সুনির্দিষ্ট বিধান না থাকলেও আমাদের ধর্মীয় নেতারা নাচ, গান, নাটক-থিয়েটারকে হারাম বলে ফতোয়া দিলেন।’
ওবায়দুল
হক সরকার তাঁর একটি রচনায় অভিনয় সম্পর্কে একটি ঘটনা ব্যক্ত করেছেনÑ এখানে সে বিষয়ে উল্লেখ করাটা অপ্রাসঙ্গিক হবে নাÑ ঘটনাটা তাঁরই জবানীতে উল্লেখ করছি, ‘... আমাদের বাসায় এক আলেম এলেন, আমাকে আদর করলেন। যেই জানলেন আমি নাটক করি অমনি বলে উঠলেন, ‘অস্তাগ ফিরুল্লাহ, অস্তাগ ফিরুল্লাহÑ না না ঐ শয়তানের ফেরে পড়লে সব যাবে। না না অভিনয়ের ধারে কাছে যাবে না, তা হলে একেবারে ‘হাবিয়া দোযখ’। আমি বললাম, ‘হজুর আপনিইতো ওয়াজে বললেন অভিনয় করতে। তিনিতো আসমান থেকে পড়লেন। আমি বললাম, ‘বললেন না, আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে মুনাজাত করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। চোখে পানি না এলেও চোখ মুখে কান্নার মতো ভঙ্গি করবে।’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ বলেছি, তা এর সাথে অভিনয়ের সম্পর্ক কী?’ আমি বললাম, ‘ঐ ভং ধরাইতো অভিনয়। কান্না না এলেও কান্নার মতো ভঙ্গি করাÑ আল্লাহই তো অভিনয় করার কথা বলেছেন।’ শুনে হুজুরের মুখে আর কথা নেই। এতো গেলো স্বজাতির বাঁধা। তৎকালীন সময় মুসলমানরা ছিলো বর্ণহিন্দুদের কাছে ঘৃণার বস্তু। ঐ সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুসলিম বিরোধী কবিতা হিন্দুদেরকে মুসলমানদের ঘৃণা করতে উৎসাহ যোগাতো, যেমনÑ ওবায়দুল হক সরকার উল্লেখ করেছেনÑ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেনÑ
শোনরে যবন শোনরে তোরা
যে জ্বালা হৃদয়ে জ্বালালি যবে
সাক্ষী রলেন দেবতা তার
এর প্রতিফল ভুগিতে হবে।
দ্যাখরে যবন, দ্যাখরে তোরা
কেমনে এড়াই কলঙ্ক-ফাঁসী
জ্বলন্ত অনলে হইবো ছাই
তবু না হইব তোদের দাসী।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মুসলমানদেরকে যবন বলতেন। [যবন অর্থ: বনিষ্ঠির আশ্রমদ্রোহী বিশ্বমিত্রের কামধেনু, একটি গাভী। যার যোনিদ্বার হতে মুসলমান জাতি উৎপন্ন হয়েছে। ‘নাউজুবিল্লাহ’ Ñ আশুতোষ দেব, নতুন বাঙলা অভিধান]
মুসলমানদের উপর চরম ঘৃণা এবং লাঞ্ছনার শেষ সময়ে ওবায়দুল হক সরকারের নাট্যমঞ্চে উত্থান। তিনি দেখেছেন কিভাবে প্রখ্যাত অভিনেতা কাজী খালেক ‘স্বপন কুমার’ নাম নিয়ে ‘মানুষের ভগবান’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করছেন। কারণ কোনভাবেই মুসলমানদেরকে হিন্দুরা সহ্য করতো না। অথচ তাদের সর্বভারতীয় সংগঠন কংগ্রেস উল্টো মুসলমানদেরকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে প্রচার চালাতো। এই কারণেরই মওলানা আকরম খাঁ কংগ্রেস ত্যাগ করেন এই বলে যে, ‘তারাই সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক। অথচ অসাম্প্রদায়িক মুসলামনদের উপরই তারা এই দোষটা জোর করে, ছলচাতুরি করে চাপিয়ে দিচ্ছে।’
ওবায়দুল
হক সরকার তখন ষোল বছরে পা দিয়েছেনÑ এই সময় চলচ্চিত্র পরিচালক ঈসমাইল মুহাম্মদকেও নাম বদল করে উদয়ন চৌধুরী নাম নিয়ে তার চলচ্চিত্র মুক্তি দিতে হয়েছিলো। তাতেও পরিচালক রেহাই পাননিÑ রাজনৈতিক মতবাদের ভিন্নতার কারণে উদয়ন চৌধুরী ও তার কয়েকজন সহকারীকে কারাবরণ করতে হয়।
অবজারভার পত্রিকার সদ্য প্রয়াত সম্পাদক ওবায়দুল হক ছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক। তিনি ‘দু:খে যাদের জীবন গড়া’Ñ নামে চলচ্চিত্রটি মুক্তি দেবার সময়ও বাধ্য হয়ে নাম পরিবর্তন করেছিলেনÑ ‘হিমাদ্রী চৌধুরী’। তবুও তিনি মুক্তি পাননিÑ তার ছবিতে হিন্দু মুসলমানের দাঙ্গার যে দৃশ্য ছিলো তা কেটে ফেলতে হয়েছিলো।
বিখ্যাত
অভিনেতা ফতেহ লোহানীর নাম বদলে ফেলে ‘কিরণ কুমার’ নাম রাখা হয়।
যখন পাকিস্তান স্বাধীন হলোÑ ওবায়দুল হক সরকার লিখেছেন, ‘১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর মুসলমানদের দেশ পাকিস্তানে জনাব ওবায়দুল হক আরো কয়েকটি ছবি করেছিলেনÑ তখন আর হিন্দু নাম নিতে হয়নি, স্বনামেই ছবি রিলিজ দিয়েছিলো।’
আমরা
জানি কাজী খালেক, ফতেহ লোহানী, ঈসমাঈল মুহাম্মদ এরাও মুসলমান নাম নিয়ে মুসলমানদের দেশে কাজ করে গেছেন।
স্বচক্ষে দেখা, স্বহৃদয়ে অনুভব করা কর্মকান্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ এবং নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার যে অভিজ্ঞতা আর সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আÍসমালোচনা করে নিজেকে, দেশকে ও জাতিকে বিশ্লেষণ করার যে দৃষ্টিভঙ্গি তা ওবায়দুল হক সরকারের ছিলো। ছিলো বলেই তিনি কলম হাতে তুলে লিখেছিলেন, প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিলেন। যেমনটি হয়েছিল ১৮৭০ সালের পরবর্তি বছরগুলিতে।
১৭৫৭
সালে নবাব সিরাজদৌলার পতনের সঙ্গে সঙ্গে যখন মুসলমানদের পতন হলোÑ তারপর থেকে মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে রাষ্ট্রিয় শাসনতন্ত্র থেকে ইসলামের সমস্ত আইন কানুনকে বিদায় করে জাহেলী আইন কানুন জারী করা হলোÑ এ উপমহাদেশে মুসলমানরা হয়ে পড়লো বঞ্চিত, লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত এক জাতি। তাদের বেঁচে থাকার সমস্ত উপায় উপাদান কেড়ে নেয়া হলো। অস্তিত্ব তখন বিলুপ্তির পথে, ১৮৫৭ তে একবার স্বাধীন হয়ে বেঁচে থাকার জন্য মাথা তুলতেই অত্যন্ত নিষ্ঠুর নির্দয়ভাবে সে মাথা গুড়িয়ে দেয়া হলো। কিন্তু আর কতো! ১৮৭০ সালের পর কতিপয় লেখক-সাহিত্যিক হাতে কলম তুলে নিলেনÑ কতিপয় রাজনীতিবিদ কৃতদাসের জীবন থেকে মুসলমানদের উদ্ধার করার জন্য এগিয়ে এলেন। শুরু হলো সমিতি, সংগঠনের ভিত্তি স্থাপন, শুরু হলো লেখালেখি। যদিও মুসলমানদের সমিতি সংগঠন তৈরি করতে দেখে হিন্দুরা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছিলো। ‘সোম প্রকাশ’ নামের একটি পত্রিকায় লেখা হলোÑ ‘নগরবাসি সদ্বিদ্বান ও সম্ভ্রান্ত যবনেরা স্বজাতির হিত বন্ধনার্থে এক সভা স্থাপন করিয়াছেন।’ এই সব ব্যঙ্গ-বিদ্রুপকেÑ বিদ্রুপ করে এগিয়ে গিয়েছিলেন মুসলমান লেখকরা। বলা হয়ে থাকে কবি সাহিত্যিকরা আজ যা ভাবে আগামীতে রাজনীতিবিদরা সফল সংগ্রামের মাধ্যমে সেই ভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত করে রাষ্ট্রিয় নীতিতে। যেমনটি ইউরোপে হয়েছে। মৌলবাদী খ্রীষ্টানদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে সে সময়ের কবি সাহিত্যিকরা যা ভেবেছিলো পরবির্ততে রাজনীতিবিদরা তাদের ভাবনাকেই রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করেছে।
উপরোক্ত
আলোচনা প্রাসঙ্গিকভাবেই এসে যায় যখন আমরা ওবায়দুল হক সরকার সম্পর্কে আলোচনা করি। তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে মুসলমানদের শত্র“দেরকে চিনিয়ে দিয়েছেনÑ তাঁর সাহসী কলম কাউকে পরোয়া করেনি। কারণ তাঁর রুট আইডিয়া ‘মুসলমানদের চিন্তাগত ও বৈষয়িক উন্নতি সাধন’Ñ তাঁর সুদীর্ঘ তিক্ত অভিজ্ঞতায় আরো পুষ্ট হয়েছে।
তিনি
লিখেছেন, ‘এক হাজার মসজিদের শহর ঢাকা এখন পরিনত হয়েছে একহাজার মুর্তির শহরে।’ তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম এবং ইসলামের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-ফিতর বাংলাদেশের বৃহত্তম জাতীয় উৎসব। অথচ ২১ অক্টোবর ২০০৪, দৈনিক ইনকিলাবে মান্নান ভূঁইয়া বলেছেন, ‘দূর্গা পূজা এখন জাতীয় উৎসবে পরিনত হয়েছে।’Ñ তিনি লিখেছেন, ‘মুসলমানদের অনুষ্ঠান কুরআন পাকের তেলওয়াতের মাধ্যমে শুরু হয়Ñ অথচ মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে ‘উৎসের সন্ধানে’ শীর্ষক থিয়েটার উৎসবের উদ্বোধন করেন কবি বেগম সুফিয়া কামাল।’ তিনি এমনিভাবে তৎকালীন বাংলাদেশের [২০০১] প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান এবং [১৯৯৬] তৎকালীন প্রধান মন্ত্রি শেখ হাসিনার মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠান উদ্বোধনের বিরুদ্ধে লিখেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে, ‘হিন্দু গৃহস্থ বাড়িতে প্রতি সন্ধায় তুলসী তলায় মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে মঙ্গল কামনা করা হয়, দূর্গা পূজা ও অন্যান্য পূজা-পার্বনে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো হয়। তা হলে মুসলমানরা কেনো পবিত্র কুরআন তেলওয়াত বর্জন করে হিন্দু সংস্কৃতি গ্রহণ করবে!’ এ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেনÑ ‘নীরদ চৌধুরীর দি অটোবায়োগ্রাফি অব এ্যান আননোন ইনডিয়ান’ গ্রন্থের কথা, যেখানে লেখক মুসলমানদেরকে ‘হিন্দুর সেবাদাস’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ওবায়দুল হক সরকার তাঁর চলচ্চিত্রিক মনের পর্দায় মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো দৃশ্যকে সেই সেবাদাসেরই ছায়া দেখেছেন। ‘হিন্দুর সেবাদাস মুসলমান’Ñ নীরদ চৌধুরীরর এই কথাটা যেনো সত্য হয়ে না যায় এই চিন্তায় তিনি শঙ্কিত হয়েছেন আতংকিত হয়েছেন।
ওবায়দুল
হক সরকারের মুসলিম হৃদয়ের পাত্র ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে যখন তিনি স্মরণ করেছেন, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর তার রচিত ‘সরোজীনি’ নাটক যা মুসলিম বিদ্বেষে ঠাসা, তা মঞ্চস্থ হওয়ার সময়ে যখন হিন্দু দশর্করা ‘মারমার কাটকাট’ বলে আসন ছেড়ে ওঠে। ঐ নাটকের গানগুলো রচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
এমনিভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এবং মুসলমানদের চিন্তাগত ও বৈষয়িক উন্নতিতে যখনি কেউ আঘাত করেছে তা ওবায়দুল হক সরকারের দৃষ্টিতে পতিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার প্রতিবাদ করেছেন তাঁর লেখনির মাধ্যমে।
কারণ
কি! কারণ এই হাদীসটির মধ্যেই নিহিতÑ ‘সমগ্র মুসলিম উম্মাহ একটি শরীরের ন্যায়, শরীরের এক স্থানে একটি ফোঁড়া হলে যেমন সমস্ত শরীরটি যন্ত্রণা দগ্ধ হয় তেমনি উম্মাহর কোন একজন বিপদগ্রস্থ হলে সমস্ত মুসলিম সমাজের দেহটি যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকবে।’
ওবায়দুল
হক সরকার একজন মুসলিম ছিলেন, রসূলুল্লাহ সা.-এর একজন উম্মত ছিলেন। মুসলমানদের বৈষয়িক এবং মানসিক সংস্কৃতির উন্নয়ন চেয়েছিলেন। এতো গভীরভাবে চেয়েছিলেন যে তাঁর অন্তর্লোকের দরজা খুলে তাঁর চিন্তার নির্যাস বের হয়ে এসেছে। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করা উদ্দেশ্য নয়Ñ ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন করাই ছিলো উদ্দেশ্য’।
আজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এবং বাংলাদেশকে নিয়ে বহির্বিশ্বে যা ঘটছেÑ যদি আমরা ওবায়দুল হক সরকারের উক্ত মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করি তবে বিরোধী শক্তির সমস্ত তৎপরতার আসল উদ্দেশ্য আমাদের সামনে উদঘাটিত হবে।
একজন
ওবায়দুল হক সরকারÑ যিনি একাধারে চলচ্চিত্র, নাটক, রেডিও এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্বÑ তাঁকে চর্চা করার উদ্দেশ্য এটাই যে, তাঁর মতো সাহসী পদক্ষেপে প্রজন্মকে এগিয়ে যেতে হবে।
শ্রদ্ধেয় মাহবুবুল হক ভাইয়ের একটা লেখায় পড়েছিÑ তাঁর কাছে ওবায়দুল হক সরকারের অর্থনীতির অধ্যাপিকা কন্যা ফ্লোরা সরকার বলেছেন, ‘আব্বার লেখাগুলো মাঝে মাঝে আমার কাছে সাম্প্রদায়িক দোষে দুষ্ট বলে মনে হতো। কোন কোন লেখা সৌজন্যের সীমানা অতিক্রম করেছে বলে মনে হতো, অনেকে আমাদের কাছে এসব নিয়ে অনুযোগও করতো।’ আব্বাকে বললে তিনি জবাব দিতেন, ‘আমি তো রেফারেন্স ছাড়া কোন কিছু লিখিনি, আড়াল করা সত্যকে আমি প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেছি মাত্র।’
‘চিলে কান নিয়ে গেছের মতো অবস্থা।’ চিলের পিছনে দৌড়ানো। অর্থাৎ ‘সাম্প্রদায়িকতা’Ñ বলে বলে তা নিয়েই নিজেকে অবপরাধী ভাবা, কিন্তু আসল সত্যকে আমরা চিনতে চেষ্টা করি না। ওবায়দুল হক সরকার সেই সত্য চিনতে সাহায্য করেছেন।
তাঁকে
চর্চা করার এই মুহূর্তে আমরা তাঁর কর্মকান্ডের দলিল সংরক্ষণ, তাঁর রচিত পুস্তক সংরক্ষণ ও প্রচার এবং অপ্রকাশিত পাণ্ডলিপিগুলোকে প্রকাশ করার আশা ব্যক্ত করতে পারি। তাঁর বাড়ির পাশের রাস্তাটিকে তাঁর নামে নামকরণসহ নাটকের ক্ষেত্রে তার নামে কোন সংগঠন যদি পুরস্কার প্রবর্তিত করে তবে তা হবে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্তÑ যা নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করবে, প্রেরণা ও শক্তি যোগাবে। এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে আমরা মহান আল্লাহর দরবারে ওবায়দুল হক সরকারের রূহের মাহফেরাত কামনা করি। আমিন।
⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN
🔗 MY OTHERS CHANNELS
🔗 FOLLOW ME
🔗 MY WEBSITE
🔗 CALL ME
+8801819515141
🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com
#সংস্কৃতি
#বাংলাদেশী_সংস্কৃতি
#ইসলামী_সংস্কৃতি
#মঞ্চনাটক
#মোলাকাত
#Molakat
#Culture
#Bangladeshi_Culture
#Islamic_Culture
#Literature
#Bengal_Literature
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#শেখ_আবুল_কাশেম_মিঠুন
#ওবায়দুল_হক_সরকার
No comments