বাঁশি-পাগলি ।। মাহবুবা খন্দকার : পর্ব-১৪

 
শিউলিদের গ্রামটা নিতুর কাছে খুব ভালোলাগে। গ্রামের সাদাসিধে মানুষগুলোর মধ্যে কত আন্তরিকতা। শহরের মানুষগুলো নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে সারাক্ষণ। রবীন্দ্রকুঠির আম্র্রকাননে ওদের বিকেল কাটে। আজ তিনদিনমাত্র এসেছে। অবশ্য আগামীকালই চলে যাওয়ার কথা। দুর্বাঘাসের গালিচায় বসে পড়ে ওরা। একটি মহিলা ওদের দিকে এগিয়ে আসে।
- পাগলিটা আবার এদিকে আসছে কেন ? শিউলি বললো।
- পাগলি দেখলে কিন্তু আমার খুব ভয়লাগে।
- তেমন পাগলি নয়, নিতু।
- এই যে ডাক্তার এসে গেছো দেখছি, শিউলির দিকে তাকিয়ে মহিলাটি বললো।
- হ্যাঁ এসেছি।
- আমার ছেলেকে ডাক্তারীই পড়াবো বুঝলে?
- ঠিক আছে পড়াবে। এখন যাও তো এখান থেকে।
- তোমার পাশে বসে আছে, মেয়েও কি ডাক্তার?
- হ্যাঁ, আমার বান্ধবী।
- ওকে আমার বৌমা বানাবো, বুঝলে ডাক্তার। আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে ওকে।
- যাও তো এখান থেকে বাঁশি-পাগলি, বাজে বকবে না।
 
এতক্ষণ একদৃষ্টিতে পাগলির দিকে তাকিয়ে ছিল নিতু। কার সাথে যেন ওর চেহারার মিল রয়েছে। বুকের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এমনই প্রশস্ত কপাল। চিবুকের বামপাশে তেমনি একটি কালোতিল যেমনটি রোহান বলেছিল। হাসিটার সাথে মিল আছে অদ্ভূতভাবে। মহিলাটির শুষ্কমলিন মুখে প্রিয়জনের মুখখানি যেন ছায়া ফেলেছে। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিতু।
- পরে পস্তÍাবি, বলে চলে গেল পাগলি। নিতু পাগলির গমনপথের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। হৃদয়ের গহীনে ভালোবাসা জেগে উঠলেও চেপে যায় নিতু। শুধু দীর্ঘশ্বাসের সাথে ভার নেমে যায় দিগন্তের দিকে। পাগলি চলে যাওয়া অবধি তাকিয়ে থাকে নিতু। তবে রেখে গেল কিছুমায়া। পাগলির জন্য ওর মন পোড়ে কেন!
 
- কীরে নিতু!  সবসময় ওকে ভাবিস কেন বলতো। বেড়ানোর সময় না হয় আনন্দে থাকলি।
- মহিলা কে রে ?
- ওহ! ওর ওপর মায়া হলো নাকি ?
- না এমনিই।
- ওর একটা ছেলে ছিল। ছেলেটা মায়ের কাছে বাঁশিকেনার জন্য পয়সা চেয়েছিল। বিধবা মা আর ছেলে। ুজনের সংসার। দরিদ্রতার কারণে মা পয়সা না দিয়ে বকেছিল। অমনি অভিমানি ছেলেটা বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। সেই যে চলে গেল আর ফিরে আসেনি।
- অভাগী মা! দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে নিতু।
- বুঝলি নিতু ছেলেটা চলে যাওয়ার পর থেকে মহিলা পাগল হয়ে যায়। কোথা থেকে একটা বাঁশিকিনে ঐযে আঁচলে বেধে রেখেছে, ছেলে ফিরে এলে তাকে দেবে। সেই থেকে সবাই ওকে বাঁশি-পাগলি বলে ডাকে।
 
শিউলীর কথাশুনে নিতুর মনের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়। বলে, শাহজাদপুরের কুঠিবাড়ীর মেলায় বেড়াতে যেয়ে রোহান ভাই আমার হাতের বাঁশিটি নিয়ে বিনম্রমুখে এমন করুণসুরে কিছুক্ষণ বাজালো যে, কী বলবো? এতসুন্দর বাজানো শুনে আমি তো অবাক। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে শিউলী, বাঁশি-পাগলির সাথে ওর কোনো.......
- দুর! ত্ইু যে কী আবোল-তাবোল বকিস্।
- না রে থাকতেও তো পারে
শিউলী নিতুর হাত ধরে বললো, ওদিকটা ঘুরবি চল
- ঠিক আছে চল
 
শিলাইদহ কুঠিবাড়ীর অভ্যন্তরিন অনেককিছুই দেখে ওরা। বিশ্বকবির তিনতলা বাড়ির মধ্যে দর্শনার্থীদের জন্য অনেক দুর্লভতথ্য ছবি দেয়ালে শোভা পাচেছ। পরিবারের সাথে একান্তে কবি। বিজ্ঞানী আইন্যাস্টাইনের সাথে কবির ছবি। একটা আটবেহারার পালকি আর একটি ষোলবেহারার পালকি। শিউলি বললো, জানিস নিতু, কবি যখন রাস্তা দিয়ে চলতেন তখন বেহারারা পালকি নিয়ে পাশে চলতো। কবি ইচ্ছে করলে দাঁড়ানো অবস্থায় পালকিতে চড়তেন।
- তুই জানলি কী করে শিউলি?
- আমার দাদু বলেছিল। কারণ কবি তো অনেকলম্বা ছিলেন।
 
কবিবাড়ীর তৃতীয়তলায় ওঠে ওরা। সেখানে সংরক্ষিত আছে একটা চপলাবোট (নৌকা) স্টিলের তৈরী নৌকা। কবি বোটে করে পদ্মায় বেড়াতে যেতেন আর লিখতেন কবিতা। সোনার তরী এখান থেকেই রচনা করেছেন তিনি।
- চল নিতু আমরা কবির কাচারীবাড়ি দেখে আসি। কুঠিবাড়ি দেখলাম কাচারী দেখবিনা তা কি হয়?
 
নিচে নেমে ওরা যায় দীঘির পাড়ে বকুলতলায়। বকুলগাছের নিচে বসে শানবাধানো ঘাটে। এমন পরিবেশ কবিতালেখার জায়গা বটে। বকুলফুল কুড়িয়ে হাতে নেনিতু, তোর মন ভালো হয়ে যাবে। কত নিষ্পাপ ফুলের কলি অকাতরে গন্ধবিলায়। আমরাও একদিন প্রস্ফুটিত হবো। আর বিলিয়ে যাবো সুগন্ধ প্রান্তরে প্রান্তরে। দেশ আর অসহায় মানুষের জন্য থাকবে আমাদের ভালোবাসা এই আশা আমি সবসময় লালন করি, নিতু।
- তোর কথাগুলো আমার খুব ভালোলাগলো শিউলি, আমারও তেমনই ইচ্ছে। অনেক দেখা হলো, চল এবার ফেরা যাক।
- কেন রে তাড়াহুড়া করছিস্, কাচারীবাড়ি দেখবি চল।
              
এককিলো উত্তরে পদ্মানদীর তীরে কাচারীবাড়ি। ইজিবাইকে রওনা হয় ওরা। রাস্তার দুইধারে কবির নিজহাতে লাগানো কড়ইগাছগুলো কালের সাক্ষী হয়ে আছে। কাচারীতেও আছে অনেক পুরাতন বৃক্ষরাজী। খুবই মনোরম পরিবেশ। দ্বিতলভবনের নিচতলার কয়েকটি কক্ষ এখন সরকারি তহশিল অফিস হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অদুরেই পদ্মানদী। প্রমত্তাপদ্মার স্রোতের গর্জন দূর থেকেই শোনা যায়। নদীর ধারে হাঁটে ওরা। গাঙশালিকের কিচিমিচি চিৎকার। কলসিকাঁখে গ্রাম্যবধুর নদী থেকে পানিনেয়া-সবমিলিয়ে সুন্দর একটি প্রাকৃতিক পরিবেশ।
 
শিউলি বললো, নিতু জানিস, শিলাইদহ নামকরণ নিয়ে নানাজনশ্রুতি প্রচলিত আছে। কেউ কেউ মনে করেন যে, মধ্যযুগে এখানে শিলাদেবীর মন্দির ছিল বলে স্থানটির নাম শিলাইদহ। ১৮০০ সালে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এতদঞ্চলের জমিদারী খরিদ করেন। তিনি শেলী নামক একজন নীলকরের নিকট থেকে কুঠি ক্রয় করে এখানে জমিদারের বাসস্থান তৈরী করেন। পুরানভবন নদীগর্ভে বিলীন হলে ১৮৬২ সালে নতুনভবন তৈরী হয়, যা শিলাইদহ কুঠিবাড়ি নামে পরিচিত। অত্র এলাকায় প্রচলিত কিংবদন্তি হতে জানা যায়, শেলী সাহেব ঘোড়াছুটিয়ে আসতে একটা গর্তে পড়ে ঘোড়ার পাভেঙ্গে যায়। সেই থেকে সবাই বলতো শেলীরদহ। তা থেকেই হয়তো বা শিলাইদহ নামের উৎপত্তি হতে পারে। সেই গর্ত বা দহ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।                                         
- অনেক দেখলাম এবার যেতে হবে শিউলি।
- কেনরে নিতু, আরো দেখবি গোপীনাথ মন্দির, মঠ, শাহ্ মখদুম মৌলুক                                     খোরশেদ রহ. এর মাজার শরীফ।
- চল যাই তাহলে। অটোভ্যানে ওরা রওয়ানা দেয়।
- এই যে আমরা মাজার শরীফের কাছে এসে গেছি নিতু। আয় ভেতরে গিয়ে দেখি।
 
জনশ্রুতি আছে, দরবেশ মৌলুক খোরশেদ রহ. নৌকায় চড়ে এইপথে পাবনায় যাচ্ছিলেন। মাঝনদীতে এসে মাঝি টাকা চাইলে তিনি টাকা দিতে পারেননি। টাকা না থাকায় মাঝি তাঁকে নদীর মাঝে নামিয়ে দেয়। পদ্মা তখন অনেক প্রশস্ত ছিল অর্থাৎ এই পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দরবেশ সাহেব নামার সংগে সংগে নদী শুকিয়ে এই এলাকা চর হয়ে যায়। এলাকার নাম হয় খোরশেদপুর। বিশালাকৃতির বটগাছের সাথেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অনেক কোলাহলপূর্ণ এলাকা। রাস্তার দুইধারের নৈসর্গিক পরিবেশ খুব ভালোলাগে। রাস্তার পাশে সর্ষেফুলের ক্ষেত। কী অপুর্ব! আগে কখনও দেখেনি নিতু। একটু এগিয়ে রানীভবানীর মন্দির, পাশে মঠ। মধ্যযুগের স্থাপত্যনিদর্শন বর্তমান। নির্মাণশৈলী নিখুঁত এবং চমৎকার।
- তোদের এলাকার গ্রামীন পরিবেশ আর স্থাপত্য অনেক ভালোলাগলো। এবার ফেরা যাক শিউলি।
- চল্ যাই নিতু
- বুঝলি শিউলি রোহান ভাই কখনো অবচেতন মনে শিলাইদহের কথা বলার চেষ্টা করে। কখনো সে স্বপ্নাবৃত হয়। জেগে উঠে তার মায়ের কথা বলার চেষ্টা করে। তার গ্রাম , মা-বাবা, ভাই-বোন এসব বিষয়ে আম্মু প্রশ্ন করতেন। কিন্তু রোহান ভাইয়া উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলে অস্থির মনে হতো। তবে মায়ের প্রসঙ্গ উঠলে মুখটা কেমন যেন হয়ে যেত। আমাদের মনে হয়, তার স্মৃতিভ্রম হয়েছে। সবটুকু সে মনে করতে পারেনা। একবার মায়ের সাথে আমরা শাহজাদপুরে রবীনদ্রমেলায় গিয়েছিলাম। রোহান ভাইয়া আমাকে দিয়ে একটা সুন্দরবাঁশি কিনিয়ে মেলা থেকে ফেরার পথে রাস্তার পাশে একটি জীর্ণকুঠিরে প্রবেশ করে কাকে যেন খুঁজছিল। আমি এমন অবস্থায় তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কাকে খুঁজছে। আমার কথায় আমতা আমতা করে বলে, এখানে কে যেন তার পরিচিত ছিল। এমন কথা শোনার পর তাকে নিয়ে আমার আগ্রহ বেড়ে যায়। তাহলে রোহান ভাইয়ার মা-বাবা বেঁচে থাকতে পারে।
 
নিতুর লম্বাকথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শিউলী বললো, রোহান ভাইয়ার পড়ালেখা তো শেষ; এবার  তোরা...

⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN

🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

#উপন্যাস
#অনুবাদ
#মোলাকাত
#Molakat
#Novel
#Translation
#BanglaLiterature
#Literature
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#বাংলাসাহিত্য
#সাহিত্য
#বাঁশিপাগলি
#মাহবুবা_খন্দকার

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.