‘ধবল জোছনার সম্রাট’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি এক মহাবিস্ময় ।। আবু রাইহান
বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহৎপ্রাণ মানুষ মহানবী সা: মহান স্রষ্টার এক বিস্ময়কর সৃষ্টি! মানুষ হিসাবে তিনি ছিলেন সর্বগুণে গুণান্বিত সমগ্র মানবজাতির জন্য আদর্শ এক ব্যক্তিত্ব! স্বয়ং স্রষ্টা আল-কোরআনে বলেছেন- ‘হে রাসুল আমি আপনাকে পাঠিয়েছি সারা বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ, আপনার খ্যাতিকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছি! রাসুল সা: কে অনুসরণ করার জন্য মানবজাতিকে নির্দেশ দিয়েছেন! যাতে এই আদর্শ মানুষকে অনুসরণ করে মানবজাতি সঠিক পথের সন্ধান পেতে পারেন! আল-কোরআনে তাঁকে আলোকবর্তিকা, মানবজাতির শিক্ষক হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে! সেই কারণেই রাসুল সা:এর যুগে তাঁর গুনে ও চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে তাঁর অনুগামীরা রাসুল প্রশস্তি মূলক কবিতা রচনার সূত্রপাত করেন!খলিফা আবু বকর রা., ওমর ফারুক রা., ওসমান রা. ও আলী রা. থেকে শুরু করে আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব, কাব ইবনে যুহায়র, হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব, আয়েশা সিদ্দিকা, ফাতেমাতুয্ যোহরা, হাস্সান বিন সাবিত, আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা, কাব ইবনে মালিক প্রমুখ সাহাবা-কবিগণ রাসূল-প্রশস্তি মূলক কবিতা লিখেছেন। তাঁদের মধ্যে হাসসান বিন সাবিত সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।রাসূলুল্লাহ স. তাঁকে ‘রাসূলের কবি’ উপাধিতে সম্মানিত করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ স. তাঁর জন্য মসজিদে নববীতে একটি মিম্বরও তৈরি করেছিলেন, যেখানে বসে তিনি রাসূলের সামনে তাঁর শা’নে কবিতা রচনা ও আবৃত্তি করতেন। রাসূলুল্লাহ স. তা শুনতেন এবং প্রশংসা করতেন।রাসুল প্রশস্তি মূলক কবিতা রচনার ধারা আজও প্রবহমান।আল-কোরআনের বিভিন্ন আয়াতই সাহাবা-কবিদের রাসূল-প্রশস্তি মূলক কবিতার মূলভিত্তি।জগৎ-বিখ্যাত কবি শেখ সাদী, ওমর খৈয়ম, জালালুদ্দীন রুমী, ফরিদ উদ্দীন আক্তার, হাফিজ, আকবর এলাহাবাদী, আমির খসরু দেহলবী, আলতাফ হোসেন হালী, ইসমাইল শহীদ, কাশেম নানতুবী, জোশ মালিহাবাদী,মীর্যা আসাদুল্লাহ গালীব, মুহম্মদ ইকবাল, শাহ আব্দুল আজীজ দেহলভী, শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী, সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী প্রমুখ।রাসুল সা:র জীবদ্দশায় সাহাবা-কবিদের মাধ্যমে রাসূল-প্রশস্তির যে ধারা সূচিত হয়, সারা বিশ্বে ইসলাম প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমান্বয়ে সর্বত্র মুসলিম সমাজে তা বিস্তার লাভ করে। বাংলায়ও ইসলাম প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে রাসূল-প্রশস্তির ধারাটি সুস্পষ্ট রূপ লাভ করে।বাংলা কাব্যে রাসূলের নামাঙ্কিত বিভিন্ন কবিতা কীভাবে রচিত হয় সে প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সাহিত্য গবেষক আব্দুল মান্নান সৈয়দ লিখেছেন :“মধ্যযুগে হিন্দু ও মুসলমান বাঙালি-কবিরা প্রায়ই একই সঙ্গে (একটু আগে-পরে) লিখতে শুরু হিন্দু কবিরা কাব্যগ্রন্থের সূচনায় দেব-দেবীদের বন্দনা করতেন, মুসলমান কবিরা কাব্যগ্রন্থের শুরুতে ‘হামদ’ ও ‘নাত’-এ আল্লাহ ও রাসূলের প্রশংসা কীর্তন করতেন। উল্লেখ্য, ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই আরবি-ফারসি গদ্য-পদ্যে সমস্ত গ্রন্থের শুরুতেই এই রীতি অনুসৃত হয়ে এসেছে। বাঙালি মুসলমান কবি-সাহিত্যিকেরা বাংলা সাহিত্যে সেই রীতিই অনুসরণ করেছেন। এইভাবে মুসলমান কবির হাতে প্রথম থেকেই রাসূল-প্রশস্তি শুরু হ’য়ে বাংলা সাহিত্যে শুরু থেকেই প্রায় প্রত্যেক মুসলিম কবিই রাসূল-প্রশস্তিমূলক কবিতা, গান, কাব্য ইত্যাদি রচনা করেছেন। এঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলেন : শাহ মুহম্মদ সগীর, সৈয়দ সুলতান, আমির জৈনুদ্দীন খান, দৌলত উজির বাহরাম খাঁ, সৈয়দ আলাওল, আব্দুল হাকিম, হেয়াত মামুদ, ফকির গরিবুল্লাহ, সৈয়দ হামজা, তাজউদ্দীন, মুনশি মালে মোহাম্মদ, খোন্দকার শামসুদ্দীন মোহাম্মদ সিদ্দিকী, লালন শাহ, হাসন রাজা, মীর মশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ, মোজাম্মেল হক, মুনশি মেহেরুল্লাহ, মোহাম্মদ দাদ আলী, শাহাদাৎ হোসেন, গোলাম মোস্তফা, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, বেনজীর আহমদ, বন্দে আলী মিয়া, আ.ন.ম. বজলুর রশিদ, ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেন, ব’নজীর আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, আব্দুর রশিদ ওয়াসেকপুরী, আব্দুল আজীজ আল-আমান, আশরাফ সিদ্দিকী, ফজল শাহাবুদ্দীন, আল মাহমুদ প্রমুখ। মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১১), দাদ আলী (১৮৫২-১৯৩৬), কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১), মোজাম্মেল হক (শান্তিপুর) (১৮৬০-১৯৩৩), মুনশি মেহেরুল্লাহ (১৮৬১-১৯০৭) এঁদের রাসূল-প্রশস্তি মূলক রচনা বা মৌলুদ শরিফ এককালে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।কবি গোলাম মোস্তফার (১৮৯৫-১৯৬৪) বিভিন্ন না’ত ও মিলাদশরিফ বাংলাভাষী সকল মুসলমানের নিকট এখন ও অসম্ভব জনপ্রিয়।বাংলা সাহিত্যে রাসূল-প্রশস্তি মূলক রচনায় কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) অবদান সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য।
তূরের পবিত্র ধ্বনি নেমেছিল আলোর প্লাবনে,
সুদূর নীলিমা থেকে নেমে এলো নূরের সেপাই
মৃত্যুর কাফন ছেড়ে উঠে এল মরুর জমিন!
কুটিল গুহায় ঝরে অবিরাম পবিত্র কালাম
পাহাড়ের গাত্র ফেটে নেমে আসে কওসরের ঢল
কালো কাক হয়ে গেল বসন্তের মোহন কোকিল
জ্যোছনায় গোসল সেরে রাত হল জ্যোতির মহল!
-রসূলুল্লাহ সা:
বিনয়ে বিপুল হয়ে
দিল গড়ে
সবুজ বাগান
একটি আশা
মেঘ হয়ে এল ভেসে
বুকে নিয়ে
সহজিয়া গান-
-একটি জীবন
অলৌকিক জলের স্রোত নেমে এল
কোথা থেকে মনের উপলে
মুক্তায় ভরে গেল অফলা জমিন
হঠাৎ পলকে
আবহাওয়ায় জাগে এক মহাবিস্ময়
অজন্মার আঁধার ঠেলে ভেসে ওঠে
ধবল জ্যোছনা
সেই মহাআলোর ছোঁয়ায়
লোকালয়ের সব কিছু
লোকান্তর ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়!
-লোক লোকান্তর
ভালোবাসা বুনে দিলে অন্তরঙ্গ সোহাগে!অঙ্কুরিত দোজখী জমিনে বেহেশতী সবুজ, লাউয়ের ডগার মত সজীব উল্লাসে!
রোদ আড়াল করা মমতার হাতে, শাখারা নুয়ে গেল ফুলে!
আরবী বালির ঝড় থেমে গেছে, স্তব্ধ সিমুম
সহসা পুলকে,আত্মার বিস্তার হল আযানের মত
সান্ধ্য-কুলায় আজ পাখিদের সুখী সংসার,
অন্তরঙ্গ হয়ে আছে ফণা আর ভালোবাসা সিজদার গৌরবে!
-সিজদার গৌরব
মিলাদে!সমরের হলে প্রয়োজন জড়ো হই
মসজিদে,যেন ভীত মেষ! দোয়া মাগি
কোন মতে, তারপর অবাক করা মোজেজার
তরে, তাকাই আসমানে, অবশেষে পিছু হটি
নিরাপদ ব্যবধানে! যেন তাবুকের আহবানে
আমরা শঙ্কাতুর মাদানী!
-আর এক হিজরত
নেমে এলো তারার আলো,মহাজাগতিক
মহান সংগীত,আর উজ্জ্বল অবাক
আধ্যাত্মিকতা!
মাটির মানুষ বিস্ময়ে নির্বাক
সেই দুটি হাত
বিপুল বিশাল হয়ে বিশ্বকে করেছে বেষ্টন
আপন সোহাগে!মহাকাল বিদীর্ণ করে
সেই দুটি হাত
উঠে গেছে কত দূর! সেই দুটি
হাতের ছোঁয়ায়
পার্থিব সব কিছু অলৌকিক সোনা হয়ে যায়!
-দুটি হাত
সহসা
কা'বার আকাশ হতে এক ফালি মেঘ
হেরার চূড়া ছুঁয়ে ভেসে যায় দূর মদিনায়
তারপর ব্যাপ্ত হয় বিশ্বচরাচরে!
সেই মেঘ হতে
এক সমুদ্র টলটলে সুশীতল পানি
ধরা আছে এই –নবজীবন-প্রবাহ,
পান করো আকণ্ঠ!
-মহাজীবন
সংগ্রাম নেমে এল মনের মাটিতে
শুরু হল আরেক লড়াই
কর্ম বন্দী হল বিবেকের হাতে
সংযমে নিভে গেল রিপুর আগুন
চিন্তার পথ হল দূর প্রসারিত!
-কাবার দুয়ার হতে সেই পদক্ষেপ
চেতনার রাজ্য জুড়ে ছড়ায় সংগ্রাম!
শুরু হলো অবশেষে আরেক লড়াই
আত্মার সাথে চেতনার
মানুষেরা খুঁজে পেল জ্যোতির আঙিনা!
-সংগ্রাম
ধ্বংসের যাত্রীদল গেয়ে ওঠে জীবনের নতুন বেহাগ
ফেরাউনী সেনারা ডোবে তীরে জাগে অসিয়ার আলোকিত সাধ
নমরুদী অগ্নি নেভে ফুটে ওঠে অলৌকিক ফুলের বাগান!
-অঙ্কুরিত ভোর, আপ্লুত মনের ভূভাগ
ঘন হলো ভালোবাসা,কুলে পারানী তরী, ওপারে সোনালী স্বপন
আদিম খোলস ছেড়ে তারার আলোয় জাগে ক্রান্তদর্শী মাটির আদম!
-তারার আলোয় জাগে
রাসূলকে নিবেদিত কবিতায় কবি আবদুল আজিজ আল আমান- নূরের সেপাই,কওসরের ঢল,মোহন কোকিল, জ্যোছনায় গোসল, ধবল জোছনা, বেহেশতী সবুজ, ভীত মেষ, অবাক আধ্যাত্মিকতা, জ্যোতির আঙিনা, আলোকিত সাধ, অঙ্কুরিত ভোর এর মত ব্যঞ্জনাময় সফল কাব্যিক উপমা ব্যবহার করে বেশিরভাগ কবিতাকে রসোত্তীর্ণ করতে যে সমর্থ হয়েছেন এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়!
MY OTHERS CHANNELS
🔗 FOLLOW ME
Facebook: facebook.com/molakat
Facebook: facebook.com/afsarnizam
Instagram: instagram.com/molakat
Instagram: instagram.com/afsarnizam
Twitter: twitter.com/afsarnizam
🔗 MY WEBSITE
🔗 CALL ME
+8801819515141
🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com
#গ্রন্থালোচনা
#বইআলোচনা
#বইপত্র
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#Molakat
#Book_Review
#Book_Discussion
#Literature
#Bengali_Literature
#আবু_রাইহান
#আবদুল_আজিজ_আল_আমান
No comments