কিছু কিছু লেখক আছেন যাদের বই পাঠ করা মাত্র মন হাজারো জিজ্ঞাসায় ব্যাকুল হয়ে ওঠে; অসীম উৎসাহে মন ভরে যায়। আর একই সঙ্গে প্রকট হয়ে ওঠে নিজের উদাসীন অপূর্ণতাগুলো; অবদমিত কিংবা বিস্মৃত প্রায় আকাঙ্ক্ষাগুলো যুগপৎ নতুন উৎসাহে ভেতরে ভেতরে কেশর দুলিয়ে গর্জন করে, মনে হয় এই বিশাল পৃথিবীর নিরন্তর কর্মযজ্ঞে আমিও একটু অংশ নিই; স্বার্থপরের মতো শুধুই না নিয়ে, যাবার আগে আমিও কিছু দিয়ে যাই জননী পৃথিবীকে। পৃথিবীর প্রকৃতি, প্রাণী ও মানুষের প্রতি নিদারুণ মমতার ঢেউ তুলে আমাদের জাগিয়ে দিয়ে যায়। সেই বইয়ের সোনালি উজ্জ্বল শব্দমালা।
ডাঃ লুৎফর রহমান তেমনি একজন লেখক যার বইয়ের পাতায় পাতায় দীপ্ত হয়ে আছে অমনি ধরনের অসংখ্য রত্নরাজি। যারা নবীন পাঠক, অফুরান কৌতুহল ও প্রশ্নের অতৃপ্ত ভার যাদের হৃদয় দখল করে আছে-এর বই তাদের সে কৌতুহল নিবারণ করবে, খুলে দেবে মানবিক জীবনের অগণিত সম্ভাবনাময় দরজা; যে নির্ভয় পথে এগিয়ে গেলে মানুষ নিজেই হয়ে ওঠে এক একটি সম্পন্ন প্ৰদীপ, যে প্রদীপের আলোয় সে নিজে তো আলোকিত হয়ই, একই সঙ্গে আলোকিত হয়ে ওঠে পরিপার্শ্বও।
‘উন্নত জীবন’ ডাঃ লুৎফর রহমানের মানসিক উৎকর্ষধ্যর্মী প্ৰবন্ধ গ্ৰন্থসমূহের অন্যতম। বাংলাভাষায় এমন সরল ও অলংকারবিহীন গদ্যে, এমন স্বতঃস্ফূর্ত ও কথোপকথনের ঢঙে মানব কল্যাণমুখী দার্শনিক চিন্তা-ভাবনা সম্বলিত গ্ৰন্থ বিরল। তিনি যা লিখেছেন, তাকে সত্য বলে বিশ্বাস করেই লিখেছেন, যে কারণে তার উক্তির মধ্যে নিৰ্ভীক দৃঢ়তা আমরা সহজেই লক্ষ্য করি। বইটি থেকে দু’একটি উদ্ধৃতি দিলেই উক্তিটার সত্যতা ধরা পড়বে:
‘কোন সভ্য জাতিকে অসভ্য করার ইচ্ছা যদি তোমার থাকে, তাহলে তাদের বইগুলো ধ্বংস কর, সকল পণ্ডিতকে হত্যা কর, তোমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে।’
‘জাতি যখন দৃষ্টিসম্পন্ন ও জ্ঞানী হয়, তখন জাগবার জন্য সে কারো আহ্বানের অপেক্ষা করে না, কারণ, জাগরণই তার স্বভাব।'
‘তুমি তোমার ব্যক্তিত্বকে দৃঢ় করে তোল। কেউ তোমার উপর অন্যায় আধিপত্য করতে পারবে না।’
‘যারা কাপুরুষ তারাই ভাগ্যের দিকে চেয়ে থাকে। পুরুষ চায় নিজের শক্তির দিকে। তোমার বাহু, তোমার মাথা তোমাকে টেনে তুলবে, তোমার কপাল নয়।’
এই হচ্ছে ডাঃ লুৎফর রহমান। এখানে তাঁর রচনাশৈলীর একটি বৈশিষ্ট্যের কথা প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যায়; তার গ্রন্থগুলো কেবল এ জাতীয় উদ্দীপ্ত উপদেশবাণীর সমষ্টি বলে ভাবলে ভুল হবে। তাঁর প্রতিটি কথার সত্যতা ও যথার্থতা আরো বাঙ্ময়। পাঠক তার অভিজ্ঞতার অনুষঙ্গী হিসেবে যাতে সেগুলো গ্ৰহণ করতে পারে সে জন্যে তিনি প্ৰত্যেকটি চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন একেকটি ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা, যে কারণে তাঁর উক্তিসমূহকে ন্যূনতম অবহেলা করাও আমাদের পক্ষে প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। পড়তে পড়তে মনে হয় Sometimes it is nearly a serman, sometimes it is
nearly a short story. Serman কেন? –‘ধর্ম জীবন' নামক অন্য একটি গ্রন্থ থেকে একটি মাত্র উদ্ধৃতি দিলেই কিঞ্চিৎ কৌতূহল নিবৃত হবে:
‘পাপ, মিথ্যা, অন্যায়, অত্যাচার-এদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চাই, এই-ই ধর্ম। পাপের বিরুদ্ধে সংগ্ৰাম কর। ঈশ্বরের সৈনিক হও। ঈশ্বরের রাজ্য বিস্তার কর...’
এত সুন্দর সুন্দর কথা যিনি শুনিয়েছেন, এত সফল ও তাৎপর্যময় যার গ্রন্থসমূহ-তার ব্যক্তিগত জীবন এবং অভিজ্ঞতাও তেমনি সংগ্রাম ও বৈচিত্র্যে ভরা।
যশোর জেলার মাগুরার অন্তৰ্গত পারনান্দুয়ালী গ্রামে ১৮৯১-এ তাঁর জন্ম। পরিবেশ ছিল শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত এবং সচ্ছল। গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত কুমার নদী। সনাতন শিক্ষা, সম্ভ্রান্ত পারিবারিক পরিবেশ ও সচ্ছলতার উর্ধ্বে কুমার নদীর মতোই এক ভিন্নতর প্রবাহের বীজ লুৎফর রহমানের শৈশবেই রোপিত হয়েছিল যার স্বাতন্ত্র্য সংকেত খুব শিগগিরই তার পরিবার লক্ষ্য করে শিহরিত হয়। বৃত্তিসহ এন্ট্রান্স পাস করে কোলকাতায় গিয়ে ইন্টারমেডিয়েটে ভর্তি হন তিনি। তিনি থাকতেন টেলর হোস্টেলে। এই সময়ে অকস্মাৎ তিনি অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ঘরের এক মেয়ে আয়েশা খাতুনের প্রেমে পড়েন এবং পিতার বিনা অনুমতিতে তাকে বিয়ে করেন। খবর পাওয়া মাত্র তিনি ত্যাজ্যপুত্র হন। বন্ধ হয় পড়াশোনার ব্যাপারে পিতার আর্থিক সহযোগিতা। জীবনের শুরুতেই বেঁচে থাকার জন্যে তাকে নামতে হয় সংগ্রামে। অধ্যবসায়, পরিশ্রম, বিশ্বাস ও সহিষ্ণুতা নামের প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, “জগৎ ও সমাজ যারা গড়ে তুলেছেন, তারা যে সব প্রতিভাবান, অসাধারণ, বিশিষ্ট ক্ষমতায় ভাগ্যবান ছিলেন তা নয়। তাঁরা ছিলেন পরিশ্রমী, সহিষ্ণু, সাধক৷ ” এই লেখা তিনি যে কেবল একটি অনুন্নত জাতির উচ্চতর বোধ সৃষ্টি করার জন্যই নির্মাণ করেছিলেন তা নয়-নিজের সারা জীবন দিয়ে তিনি এগুলো উপলব্ধি করেছিলেন। কোন ভাগ্যদেবী কিংবা কোন নিয়তি তার সৌভাগ্যের দরোজা খুলে দিয়ে যায় নি। সংগত কারণেই তিনি পাস করতে পারেন নি ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষা। পড়াশোনা ছেড়ে কিছুদিন শিক্ষকতা করতে হয় তাকে। কিন্তু দারিদ্র্যের তীব্ৰতা তাকে অনাহারের পর্যায়ে ঠেলে দিলে একসময় টেলর হোস্টেলের অদূরবর্তী খৃস্টান মিশনারীদের কাছে তাকে যেতে হয়। এই মিশনারীরা তাদের কাজকর্ম, আচরণ ও কথাবার্তায় দারুণভাবে লুৎফর রহমানকে আলোড়িত করেছিল। সমাজের নীচু স্তরের মানুষজনকে, বিশেষ করে নির্যাতিত নারী ও প্রবঞ্চিত পতিতাদেরকে পর্যন্ত তারা মানবিক প্ৰেমে গ্ৰহণ করে সমাজে সম্মানীয় আসনে ওঠানোর প্রচেষ্টায় যেভাবে জীবন উৎসর্গ করে যাচ্ছিলেন তার দৃষ্টান্ত লুৎফর রহমানকে আমূল নাড়িয়ে দেয়। শোনা যায় শুধু ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় তিনি মিশনারীদের কাছে যান নি, খৃস্টান ধর্মে দীক্ষা নেবার জন্যও গিয়েছিলেন।
স্বল্পকালীন শিক্ষকতা ছেড়ে সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে এবং সেইসঙ্গে সাহিত্যে মনোযোগ দেবার জন্য তিনি কোলকাতার মির্জাপুর স্ট্রীটে হোমিওপ্যাখী ডাক্তারী শুরু করেন। কিন্তু মানুষের জন্যে যার প্রাণ কাঁদে, তার হাতে অর্থ এলেও সচ্ছলতা কতটুকু আসে সেটি বিচাৰ্য ব্যাপার। মির্জাপুর ট্রীটে যে বাড়িতে তিনি থাকতেন সেই বাড়িতেই নারীদের বিশেষ করে পতিতাদের মঙ্গলার্থে তিনি ‘নারীতীর্থ’ ও ‘নারীশিল্প শিক্ষালয়’ নামে দুটি কেন্দ্ৰ খোলেন। ‘পাপের পঙ্কিল আবর্ত থেকে উদ্ধার করে পতিতাদের মধ্যে স্বাধীন জীবনযাপন করার মোহ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং সমাজে তাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্যই তিনি এ ঝুঁকি গ্ৰহণ করেছিলেন।’ নারীর মুক্তির লক্ষ্যে ‘নারীশক্তি' নামে একটি পত্রিকাও তিনি প্ৰকাশ করেছিলেন কিছুকাল। এর মাঝেই চলতে থাকে তাঁর নিজস্ব লেখা। আর্থিক দুরবস্থার কারণে অচিরেই তার ‘নারীতীর্থ’, ‘নারীশিল্প শিক্ষালয়' এবং ‘নারীশক্তি' বন্ধ করে দিতে হয়। আর শেষ পর্যন্ত এই দারিদ্র্যই নিয়ে আসে তার জন্য এক দুরারোহণীয় দুর্ভেদ্য কালো ব্যাধি-যক্ষ্মা। নিদারুণ দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে, ক্ষয়রোগের রূঢ় আঁচড়ে নিঃশেষিত হয়ে তিনি মাত্র ৪৭ বছর বয়সে পিতৃত্যাজিত জীবন ত্যাগ করে চলে যান ১৯৩৬ সালে। কষ্ট এবং যন্ত্রণার কাছে মাথা নত না করার এই শক্তি ও দৃঢ়তা তার গ্রন্থের পাতায় পাতায় বিভিন্ন অনুষঙ্গে ছড়িয়ে আছে।
‘উন্নত জীবন' ছাড়াও ডাঃ লুৎফর রহমানের আরো কিছু মূল্যবান প্ৰবন্ধ গ্ৰন্থ রয়েছে যা বাংলা সাহিত্যের মূল্যবান সম্পদ। ‘মহৎ জীবন’, ‘মানব জীবন', 'সত্য জীবন', 'ধর্ম জীবন', ‘মহাজীবন' এবং ‘উচ্চ জীবন’। সেগুলোর অন্যতম। এছাড়াও তাঁর কিছু উপন্যাস, কবিতা, ছোটগল্প এবং অনুবাদ গ্রন্থ রয়েছে, কিন্তু উপরোক্ত প্ৰবন্ধ গ্ৰন্থসমূহের উৎকর্ষ ও সাফল্যের পাশে এগুলো ম্লান।
আমরা বর্তমান গ্রন্থটির সঙ্গে সঙ্গে ডাঃ লুৎফর রহমানের অন্য প্ৰবন্ধ গ্রন্থগুলোর প্রতিও পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। তাঁরই লেখা উন্নত জীবন গল্পের একটি মূল্যবান কথা দিয়ে এই আলোচনা শেষ করি:
‘উন্নত, ত্যাগী, শক্তিশালী, প্রেমিক, সত্য ও ন্যায়ের প্রতি শ্ৰদ্ধাবান মানুষ বিদ্যাহীন বা অল্পশিক্ষিত মানুষের মধ্যে পাওয়া যায় না। মানুষকে বা জাতিকে বড় হতে হলে সব সময়েই তাকে জ্ঞানের সেবা করতে হবে।’
MY OTHERS CHANNELS
🔗 FOLLOW ME
🔗 MY WEBSITE
🔗 CALL ME
+8801819515141
🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com
#গ্রন্থালোচনা
#বইআলোচনা
#বইপত্র
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#Molakat
#Book_Review
#Book_Discussion
#Literature
#Bengali_Literature
#শহিদুল_আলম
#ডা_লুৎফর_রহমান
No comments