বই পড়ার অভ্যাস এবং ডিজিটাল সময়ের তরুণ সমাজ ।। শাহরিন আক্তার ইপা
পবিত্র
আল-কোরানে বলা হয়েছে,
যারা জানে আর যারা
জানে না তারা এক
নয়। বই পড়ার
মাধ্যমে সেই ‘জানা’ তথা
জ্ঞানার্জনের কাজটি সর্বশ্রেষ্ঠরূপে সাধিত
হতে পারে-এ কথা
বলাই বাহুল্য। তবে
জ্ঞানার্জনের জন্য নিয়মিত বই
পড়তে হয়। যদিও
চাকরি প্রত্যাশীগণ এক্ষেত্রে সবথেকে এগিয়ে থাকবেন,
কারণ তারা নিয়মিতই পড়েন। বাংলা ভাষার
সার্থক প্রবন্ধকার প্রমথ চৌধুরী লাইব্রেরিকে
মনের হাসপাতাল বলেছেন। তিনি
আজকের দিনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
লাইব্রেরি দেখেন নি।
দেখলে তিনি লাইব্রেরিকে মনের
হাসপাতাল না বলে বিসিএস
কারখানা বলতেন। বাস্তবতা
আসলেও প্রমথ চৌধুরীর আমল
থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত খুব
একটা বদলায়নি। তখনও
নিখিল বঙ্গদেশে বিদ্যা অর্জনকে ধন
উপার্জনের মাধ্যম মনে করা
হতো, যেমন ‘পড়া লেখা
করে যে গাড়ি ঘোড়া
চড়ে সে’ এখনও তাই। বাংলাদেশের জনসংখ্যার
অনেক বড় একটা অংশ
ধন ও মন উভয়ের
দিক থেকেই প্রায় দেউলিয়া। প্রায় সকল
শ্রেণির লোকই সন্তানদের পড়ালেখা
করায় এই আশায়, তারা
বড় হয়ে অনার্স, মাস্টার্স
পাশ করে চাকরি করবে
আর সংসারের অভাব ঘুচাবে।
মোটাদাগে সন্তানের শিক্ষার পেছনে ইনভেস্টের কারণ
প্রফিট অর্জন করা।
খেয়েপড়ে বেঁচে থাকা এবং
ভবিষ্যতে সংসারের হাল ধরা, এই
তাদের মাকসদ। যার
কারণে আজকের দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের
লাইব্রেরিগুলিতে চাকরি প্রত্যাশীদের প্রথমবর্ষ
থেকেই আনাগোনা শুরু হয়।
লাইব্রেরির সিট দখলের প্রতিযোগিতা
তাদের মাঝে থাকে ততদিন,
যতদিন না একটা মনমতো
চাকরির বন্দোবস্ত হয়। একবার
চাকরিতে ঢুকলে বইপত্র সব
শিকেয় তুলে দিয়ে, জীবন
উপভোগে তারা মনোনিবেশ করে। এর বাইরে
বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা এই
শ্রেণির লোকে খুব একটা
অনুভব করে না, করলেও
পড়ে না।
নব্বই
দশকে কিংবা তারও আগে
মানুষ যেভাবে বই পড়তো,
এখন এই আধুনিক যুগে
সেভাবে কেউ আর বই
পড়ায় সময় ব্যয় করে
না। সেকালে অবসর
যাপনের মাধ্যম ছিল অল্প। সেই গুটিকয়েক
মাধ্যমের একটি ছিল বইপড়া। এখন অবসর
যাপনের অনেক মাধ্যম রয়েছে। ইন্টারনেট আর
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এখন হাজারো
বিনোদনের ভীড়ে বই পড়ার
ফুসরত হয় না।
এযুগের জীবন তাই ডিজিটালমুখি। সময় যেন
তড়িৎগতিতে পার হয়।
যেন পৃথিবী সূর্যকে আগের
থেকে দ্রুতগতিতে প্রদক্ষিণ করছে- এমনটাই মনে
হচ্ছে। আর এই
ডিজিটাইলেশন এ যুগের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলে
আক্রান্ত।
এবারে,
এই যুগের তরুণ সমাজ
দেখতে কেমন সেই প্রসঙ্গে
আসা যাক। এরা
সবজান্তা হতে চায়, এদের
অবস্থা এমন- লধপশ ড়ভ
ধষষ ঃৎধফবং, সধংঃবৎ ড়ভ হড়হব!
অর্থাৎ, এরা রাজনীতি, অর্থনীতি,
সাহিত্য, দর্শন ধর্ম ইত্যাদি
সকল বিষয়ে আধো আধো
জানে, কোনো বিষয়েই পুরোপুরি
জানে না। জানার
চেষ্টাও করে না।
এই ডিজিটাল যুগের এখন এক
বড়ো বালাই হচ্ছে ‘রিলস’। মাত্র ১৫
থেকে ৩০ সেকেন্ডের (বা
তার কিছু কম/বেশি)
ছোট ছোট রিলস বিভিন্ন
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে আছে।
একটার পর একটা স্ক্রল
করতে করতে, ঘন্টার পর
ঘন্টা সময় চলে যায়
কখন টেরই পাওয়া যায়
না। এ যেন
কোনো এক রূপকথার মায়াজাল,
যে জাল থেকে আমাদের
তরুণ সমাজ থেকে শুরু
করে প্রবীণ সমাজ কেউই
মুক্ত নয়। আমাদের
তরুণ সমাজের ওপর এর
প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
আগেরদিনে রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে
ফজরের সময় বা ভোরের
আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে
ঘুম থেকে ওঠার একটা
রেওয়াজ ছিলো। অনেকে
রাত জেগে পড়তো সাহিত্য
গল্প, কবিতা কিংবা উপন্যাস। এখনকার তরুণ
সমাজ রাত জেগে দেখে
রিলস, কিংবা সিরিজ।
আর ভোরের আলোর ফোটার
পর ঘুমুতে যায়।
তাই এরা কবির “আমি
হব সকাল বেলার পাখি”
না হয়ে রাতজাগা পেঁচার
রূপ ধারণ করেছে।
সারাদিন ঘুমিয়ে দুপুরে উঠে
ভাত খেয়ে কিছু অল্প
বিস্তর কাজ কারবার করতে
না করতেই সন্ধ্যা, সন্ধ্যা
পেরিয়ে রাত। রাতজেগে
স্ক্রিনে পড়ে থেকে আবার
সকাল। সকালে আবারও
ঘুমিয়ে সারাদিন কাবার। এভাবেই
চলতে থাকে। এক
শুক্রবার গিয়ে পরের শুক্রবার
চলে আসে অথচ প্রোডাক্টিভ
কোনো কাজ করা হয়
না। অতঃপর তারা
টের পায় না দিন-সপ্তাহ-মাস-বছর
কোন ফাঁকে চলে গেলো। তাই তাদের
জীবনে সময় দ্রুত বেগে
ছুটে চলছে বলে মনে
হয়। সময়ের এই
চক্রবূহ থেকে তরুণ সমাজের
নিস্তার কিরূপে মিলবে-সেটাই
এখন প্রশ্ন।
ছাত্রদের
অবস্থাতো আরো করুণ।
অন্তত পক্ষে পরীক্ষার চাপ
না থাকলে অধিকাংশ ছাত্রই
পড়ার টেবিলে বসে না। এমনকি পরীক্ষার
আগের দিন পড়ে সম্পূর্ণ
সিলেবাস একরাতে শেষ করার
বিশাল ও অসম্ভব দায়িত্ব
নিয়ে থাকে অনেকে।
কেউ কেউ তো আরেক
কাঠি সরেষ। রাতে
ভাবে সকালে পড়বে আবার
সকালে ভাবে রাতে পড়বে। এমনি করে
পড়ার বিষয়টি তাদের ভাবনা
থেকে বের হয়ে বাস্তবে
পদার্পণ করে না।
আমাদের শিক্ষকগণের অবস্থাও তথইবচ। তরুণ
শিক্ষকগণ ক্লাসে এসে যেসমস্ত
কিংবদন্তী শিক্ষকগণের ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য
তাদের হয়েছিলো বলে গর্ব করেন,
তারা নিজেরাও বুকে হাত দিয়ে
বলতে পারবেন না যে
তারাও তাদের শিক্ষকগণের মতো
মহান হতে পেরেছেন অথবা
তাদের মতো শিক্ষক হওয়ার
করসরত করছেন। এই
জেনারেশনের শিক্ষকগণ আগের জেনারেশনের শিক্ষকদের
মতো অতো পড়াশোনায় নিমগ্ন
থাকেন না। তাদের
মতো কঠোর অধ্যবসায়ে জ্ঞানার্জনে
লিপ্ত থাকেন না।
গবেষণা করেন না।
ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনায় ও জ্ঞানার্জনে আকৃষ্ট
করা কিংবা তাদের মনস্তত্ব
বুঝে সময় উপযোগী শিক্ষা
দিতে যে কৌশল অবলম্বন
করা প্রয়োজন তা তারা করতে
ব্যর্থ হয়েছেন বলে মনে
হয়। তাই তাদের
ক্লাসেও ছাত্রছাত্রীরা শুধু ঐ এটেনডেন্সের
জন্যই যায়। এভাবে
করে এই ডিজিটাল যুগের
তরুণ সমাজ জ্ঞানার্জনের নিমিত্তে
বই পড়ার অভ্যাস থেকে
এক প্রকার ইস্তফা দিয়ে
বসে আছে। অনেকে
তো জ্ঞানার্জনের প্রয়োজনও অনুভব করছে না। অথচ এযুগে
বই আরো সহজলভ্য হয়েছে। কাগুজে বইয়ের
পাশাপাশি ই-বুক, পিডিএফসহ
বিভিন্ন মাধ্যমে নানাবিধ বই পড়া যায়। বই পড়া
যায় অনলাইনে অফলাইনে যেকোনো সময়ে যেকোনো
জায়গায়। কিন্তু পড়ে
ক’জন? যারা পড়ছে
তারা সত্যি মহান হয়ে
উঠছেন। পৃথিবীকে পরিচালনা
করছেন।
সাহিত্যচর্চা
এমন একটা বিষয়, যা
মানুষের মনোজগতকে উন্নত করে।
জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে
দেয়, জ্ঞানচক্ষু খুলে দেয় এবং
মনের বিকাশ ঘটায়।
মনের বিকাশ হওয়া এজন্যই
গুরুত্বপূর্ণ যে, একটা জাতির
উন্নতির জন্য সে জাতিকে
বড় মনের অধিকারী হতে
হয়। সংকীর্ণমনা জাতি
শুধু একে অপরকে পেছন
থেকে টেনে ধরে রাখে। সে জাতির
উন্নয়ন হয় না।
এ প্রসঙ্গে প্রমথ চৌধুরী বলেছেন,
‘যে জাতি মনে বড়
নয়, সে জাতি জ্ঞানেও
বড় নয়।’ তাই
একটি জাতির মনের বিকাশ
হওয়া অত্যাবশ্যক। আর একটি
জাতির মন ও মননশীলতার
বিকাশ ঘটাতে সাহিত্যচর্চা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাহিত্যের
মধ্যে আছে জ্ঞান-বিজ্ঞান,
ধর্ম, দর্শন, মানুষের জীবনের
চিন্তা-ভাবনা, আনন্দ-বিরাগ
সকল অনুভূতি আর বিবিধ বিষয়ের
সংমিশ্রণ। তাই সাহিত্য
পড়লে একসাথে অনেকগুলো বিষয়ের
ভিন্ন ভিন্ন পার্সপেক্টিভ বোঝা
যায়। তাই সাহিত্যচর্চা
করতে হবে এবং নিয়মিত
বই পড়ার অভ্যাস থাকতে
হবে। কিন্তু পড়তে
হবে সচেতনভাবে, অচেতনভাবে নয়। যাকে
বলা হয় অধ্যবসায়।
বই পড়তে হবে চিন্তন
দক্ষতার সাথে। নিগূঢ়পাঠ
বা ক্রিটিক্যাল রিডিং। যে
জাতি যতবেশি ক্রিটিক্যাল রিডিং
এ অভ্যস্ত হবে, সেজাতি ততো
ক্রিটিক্যাল থিংকিং করতে পারবে। এই ডিজিটাল
যুগে ক্রিটিক্যাল থিংকিং টাই সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সমাজের
লোকেরা কেবলই স্থূল বিনোদন,
স্থূল বিষয়াদি আর ভাসা ভাসা
ধোঁয়াশা পূর্ণ জ্ঞান নিয়ে
পড়ে থাকে। তাই
তাদের স্ক্রিন টাইমকে ফাঁকি দিয়ে
মোটা অংকের ডলার কখন
বিদেশের পকেটে চলে যায়
তারা তা টের পায়
না। তাই দেশ,
সমাজ, বিশ্বরাজনীতি, বিশ্বের দ্রুত পরিবর্তন ও
তাতে আমাদের করণীয় কি
তা বুঝতে হলে ক্রিটিক্যাল
থিংকিং অত্যাবশ্যক। আর ক্রিটিক্যাল
থিংকিং আসবে ক্রিটিক্যাল রিডিং
থেকে। ক্রিটিক্যাল রিডিং
এর শুরুটা করতে হবে
সাহিত্য পড়া ও সাহিত্য
চর্চার মধ্য দিয়ে।
এরজন্য নিয়মিত বই পড়ার
অভ্যাস থাকা বাধ্যতামূলক।
লাইব্রেরির
পর লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেও কোনো লাভ
নেই যদি না আমাদের
লাইব্রেরিগুলোতে চাকরির প্রস্তুতিই প্রাধান্য
পায় আর প্রকৃত জ্ঞানচর্চা
না হয়। চাকরি
অবশ্যই জরুরি কিন্তু জ্ঞানচর্চার
মাধ্যমে উন্নত মননশীলতার চর্চা
করাও কম জরুরি নয়। চাকরির বই
পড়ে যিনি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছেন,
তিনি পরবর্তীতে দেশকে কতটুকু মানসম্মত
সেবা দিবেন তা নির্ভর
করবে তার ব্যক্তিত্ব ও
মানসিকতার ওপর। এক্ষেত্রে
দক্ষতা ও যোগ্যতাকে আমি
দ্বিতীয় সারিতে রাখবো।
এই কারণে যে এ
যাবতকাল দক্ষ ও যোগ্য
লোক থাকা সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক
দুর্নীতিতে আমাদের দেশ বিশ্বসেরা
হয়েছে। তারা যদি
উন্নত ব্যক্তিত্ব ও উন্নত মনের
অধিকারী হতেন তাহলে সিস্টেমের
অংশ না হয়ে সিস্টেমকে
ভাঙার চেষ্টা করতেন।
কমপক্ষে ইনসাফ কায়েমের চেষ্টাটুকু
করতেন। একই কথা
রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু
করে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী, কর্পোরেট অফিসার ইত্যাদি সকল
পেশাজীবীর জন্য প্রযোজ্য।
কারণ, এই প্রতিটি পেশাতেই
দুর্নীতির সমারোহ আছে কম-বেশি। তাই
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বানিজ্য থেকে
শুরু করে সকল ক্ষেত্রে
আমরা মানহীন সেবা দেখতে
পাই। এই সকল
খাতেরই ভীষণ করুণ অবস্থা। এই প্রতিটি
খাত যারা চালায় তারা
যদি সৎ হতো, যদি
নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে
পালন করতো, তাহলে দেশটা
স্বর্গ হতো। কিন্তু
তা হবে কেন ? প্রতিটি
খাতেই অসাধু লোকজন দিয়ে
ভরা যাদের একমাত্র লক্ষ্যই
হলো অর্থ উপার্জন, আরো
বেশি অর্থ উপার্জন।
সবার শুধু চাই চাই
আর চাই। এই
অতিরিক্ত অর্থলিপ্সার কারণ তারা ধনের
নয় মনের দিক থেকে
গরীব, চির অভাবি।
এদের মন সংকীর্ণ, আত্মার
ভেতরটা অন্তঃসারশূন্য। তাই এই
সংকীর্ণতা ঘোচাতে চাই আত্মার
বিকাশ, মনের বিকাশ।
মনের দিক থেকে উন্নত
হলে, প্রতিটি খাতে দুর্নীতি প্রবণতা
কমবে। সুশাসন কায়েম
হবে। আর মনের
বিকাশের জন্য যে জ্বালানী
প্রয়োজন তা আসবে জ্ঞানার্জন
ও সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে।
যার জন্য এই ডিজিটাল
যুগে তরুণ সমাজ তো
বটেই সকল শ্রেণিপেশার মানুষের
নিয়মিত বইপড়ার অভ্যাস থাকা
আবশ্যক।
No comments