টেবিল প্রবন্ধ- নারীর সাথে যোগসূত্র ।। আহসান হাবিব
মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু বস্তু আছে, যাদের উপস্থিতি এতটাই স্বাভাবিক যে, তাদের নিয়ে আমরা কখনো ভাবিই না। টেবিল তেমনই এক বস্তু। গুটিকয়েক পায়াবিশিষ্ট, একটি সমতল পাটাতন—ব্যস, এতটুকুই তার বাহ্যিক পরিচয়। অথচ এই সামান্য কাঠামোটিই কখনো হয়ে উঠেছে ভোজনের আয়োজন, কখনো বিদ্যার আসর, কখনো কর্মের জায়গা, আবার কখনো ক্ষমতার কেন্দ্র।
মানুষ টেবিলের ওপর বই রাখে, খাবার রাখে, কাগজপত্র রাখে; আবার কখনো টেবিলের চারপাশে বসেই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। টেবিল তাই নেহাতই একটি আসবাব নয়; এটি মানুষের জীবনযাপন, সম্পর্ক ও ক্ষমতার এক নীরব সাক্ষী। তবে টেবিলের সবচেয়ে বিস্ময়কর গুণ বোধহয় তার স্থিরতা। তাকে যেখানে বসানো হয়, সেখানেই সে পড়ে থাকে—প্রয়োজনে সরানো হয়, ব্যবহার করা হয়, আবার কাজ শেষে ফিরিয়ে দেওয়া হয় আগের কোণে।
কিছু কিছু সমাজে এর ব্যতিক্রমী একপ্রকার উপমা লক্ষ করা যায়। সেই সমাজের সমাজপতিরা ভাবে, নারীরা হবে টেবিলের মতো; ঘরের এক কোণে হবে যাদের স্থান। চেয়ারের তো তবু একটু নড়াচড়া করার উপায় থাকে, কিন্তু টেবিল সেদিক থেকে খুব দারুণ ও করুণভাবে নিরুপায়। কালেভদ্রে বছরে দুই-একবার অতিথি আপ্যায়নের জন্য টেবিলদের উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তরিত করা হয় এবং আপ্যায়ন শেষে সেই পূর্বের অবস্থানেই তাদের বহাল করা হয়। ঠিক যেমন একজন নারী কালেভদ্রে ঘরের-বাড়ির কোণ থেকে কিছুক্ষণের জন্য গোচরে আসেন।
শেষ পর্যন্ত টেবিলকে যতই নিরীহ আসবাব বলে মনে করা হোক, তার চার পায়ের নিচে লুকিয়ে আছে মানুষের সভ্যতার বহু গল্প। সে দেখেছে পরিবারের ভোজ, শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, কর্মচারীর পরিশ্রম, ব্যবসায়ীর হিসাব, রাজনীতিকের সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতাবানদের গোপন-প্রকাশ্য আলাপ। তার ওপর রাখা হয়েছে বই, খাবার, ফাইল ও চুক্তিপত্র; আবার তার চারপাশেই নির্ধারিত হয়েছে কে কথা বলবে, কে শুনবে এবং কে সিদ্ধান্ত নেবে। তবু টেবিলের নিজের কোনো সিদ্ধান্ত নেই। সে কেবল বহন করে—মানুষের প্রয়োজন, মানুষের বোঝা, মানুষের আয়োজন। প্রয়োজন ফুরালে তাকে সরিয়ে রাখা হয়, নতুন টেবিল এলে পুরোনোটিকে ভুলে যাওয়া হয়। কখনো তার একটি পা ভাঙে, কখনো তাকে ইট দিয়ে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়; তবুও সে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পায় না।
হয়তো এটাই টেবিলের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি, আবার সবচেয়ে বড় রসিকতাও। যে টেবিলের চারপাশে বসে মানুষ স্বাধীনতা, সমতা ও ক্ষমতার আলোচনা করে, সেই টেবিল নিজেই সারাজীবন স্থির ও পরাধীন। আর হয়তো এখানেই টেবিল আমাদের সমাজের আয়না—কেউ টেবিলে বসে সিদ্ধান্ত নেয়, কেউ টেবিল সাজায়, কেউ টেবিলের ওপর নিজের স্বপ্ন রাখে; আর কেউ কেউ, দুটি পা থাকা সত্ত্বেও, সারাজীবন ঘরের এক কোণেই পড়ে থাকে। কিছু অদৃশ্য শেকলের কারণে চাইলেও বাইরে আসার ফুরসত নেই তার। এভাবেই তার সারাজীবন কেটে যায় অন্যের কথা ভেবে, অন্যের জন্য কাজ করে। যে কাজের স্বীকৃতি জোটে না এই ইহকালে। এভাবেই সভ্যতার শুরু হতে আজ পর্যন্ত সবকিছুর পেছনে নারীর অবদানকে বেশিরভাগ সময় পরিহাস করা হয়।
No comments