সকাল
বেলা। গোসলটা সেড়ে রান্না-
বান্নার
কাজে লেগে গেল আফসানা।
এখনো ভেজা ভেজা স্লিকের
মত নরম কোমল চুল
গুলো পরে আছে পীঠের
উপর।
কে
যেন এসে একটা টিঠি
হাতে ধরিয়ে দিল।
চিঠিটা
পড়ে মনটা বিগড়ে বিব্রতজালে
জরিয়ে গেল।
অগত্যা
একা একা আর ভালো
লাগছে না । কষ্ঠ,
ব্যথা,
সহমর্মিতা হ্নদয়ের গহীনে স্থায়ী নীড় গড়েছে। সে
নিজেও জানেনা সুখের সিঁড়ি পেড়িয়ে আজ তার জীবন
কোথায় ছুটে চলেছে। কোন
অজানা মরুর সর্পিল পথে।
এই কি ছিল ভাগ্যের
পরিহাস?
নিয়তীর নির্মম লেখনি?
হঠাৎ
কোন এক কাল বৈশাখী
ঝড় এসে তার বুক
থেকে ছিনিয়ে নিল আসাদকে। ভেঙে
গেল সুখের লীলা। হাড়িয়ে গেল নারীত্বের অলংকার।
একদিন আফসানা আসাদকে নিয়ে যে সুখের
স্বপ্ন এঁকেছিল। আজ তা জলহীন
নদীর চর হয়েছে বুকের
প্রবাহে। যাপিত জীবনের বাঁকে বাঁকে সঙ্গি হয়েছে অনাথ দুঃখ কষ্টের
হাতছানি।
আফসানা
হাতের কাজ ফেলে দৌড়ে
আসে বেডরুমে। রবি বিছানায় গভীর
ঘুমে আচ্ছন্ন। কি হয়েছে আজ
ওর?
আফসানা স্নেহের পরশ বুলিয়ে স্নেহাদ্র
কন্ঠে ডাক দেয়। তারপর
কোলে তুলে নিয়ে যায়
বাথ রুমে।গোছল করিয়ে বসে দেয় খাবার
টেবিলে। রবি খাবার প্নেট
হাতে নিয়ে মাকে জিজ্ঞেস
করে।"
মা,
সবার বাবা
আছে। আমার কেন বাবা
নেই?
সুমির বাবা সুমির জন্য
অনেক খেলনা কিনে আনে। আদর
করে,
কোলে নেয়,
চুমো
খায়। আমার বাবা কোথায়?
আমার জন্য কেন খেলনা নিয়ে
আসেনা?
আমায় কোলে নেয়না,
আদর করে না?"
আফসানার
মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। মুহুর্তের
মধ্যে
গোটা পৃথিবীটা উল্টে পাল্টে গেল। কি জবাব
দিবে ছেলেকে?
কি বলে ছেলেকে
সান্তনা দিবে?
পৃথিবী যেন আজ তার
সমস্ত সান্তনার বাক্য লুটে নিয়েছে। হ্নদয়ের
দু'
পাড় ধুসে পড়ল।
চোখের পর্দা ফেটে অসহ্য কান্না মুষরে
দু'
ফোটা অশ্রু গড়িয়ে
পড়ল। আফসানা নিজেকে সামলিয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে সান্তনা
দিল।
"
বাবা,
ওসব থাক। তোর বাবা
বিদেশে গেছে। কিছু দিনের মধ্যে
ফিরে আসবে। তুই এখন ভাত
খা। তোর স্কুলের সময়
হয়েছে।"
রবি
নাছর বান্দা। সে মায়ের দুর্বল
সান্তনা মেনে নিতে পারল
না। জিদ ধরে বসল।
"
মা,
তুমি মিথ্যে বলছ। সবাই বলে,
আমার বাবা নেই। আমি
পিতৃহীন। বল মা,
আমার
বাবা কোথায়?
আমাকে বাবার সঙ্গ সুখ হতে
দুরে রেখেছ কেন?
কি অপরাধ
আমার? "
মায়ের
আঁচল ধরে কাঁদতে থাকে
রবি।
বলে
"
মা,
সত্যি যদি আজ বাবার
কথা না বল। তাহলে
ভাত খাবনা।"
চোখের জলে একসময় ভেসে
যায় ওর বুক। এ
কিসের কান্না সত্য উপলদ্ধির না মায়ের মিথ্যে
সান্তনার। সে কিছুই বলতে
পারে না।
রবির
কান্না আফসানার সহ্য হয় না। চোখের
জল পাতা ভরে বৃষ্টি
আকারে ঝরে পড়ল।ছেলের বয়স
দশ হয়েছে। সত্য মিথ্যাকে
বুঝতে শিখেছে। উপলদ্ধি করতে শিখেছে পৃথিবীকে।
শত সান্তনা দিয়েও আজ ওর মনের
ক্ষত পূরণ হবে না।
অবশেষে আফসানাকে সব খুলে বলতে
হল। ছেলেকে বুকে জরিয়ে ধরে
বলল, "
বাবা সত্যি তোর বাবা
আজ আমাদের মাঝে বেঁচে নেই।"
"
তোর
বাবা ছিল সত্যের সাধক। ন্যায়ের
পুজারি। দেশের শান্তি শৃংখলা ফিরানোর অগ্র সৈনিক। আন্দোলন
করত সেকুলারিজমের বিরুদ্ধে। দেশের মানুষ যখন হাড়িয়ে ফেলেছে
ভোটের অধিকার। হাড়িয়ে ফেলেছে বাক স্বাধীনতা। দেশের
উচ্চ আদালত নিম্ন আদালত সহ গোটা বিচার
বিভাগ যখন শাসকদের কব্জাগত।
বিচারের নামে চলত দেশের
মানুষের উপর প্রহসনের চাবুক।
সকল মিডিয়ার গলায় বসেছিল শাসকের
কালো হাত । দিন
দিন সত্য যখন ঢাকা পড়ল
রাতের আঁধারে। দেশে চলতে লাগল
একদলীয় স্বৈরশাসন। সমাজের রন্ধে রন্ধে অনিয়ম। রাতারাতি ব্যাংকের
কোটি কোটি টাকা
গায়েব। পাওয়ার পাটির লোকদের অলীক শিহরন আর
মেকি গর্জনে সাধারন মানুষের কান ভারী হল।
গাজুরি হঠকারিতায় অতিষ্ট হল মানুষের মন।
সত্য
ও ন্যায়ের
কথা কেউ বলতে পারত
না।সমাজে সত্যকে আঁকড়িয়ে কেউ চলতে চাইলে
তাঁকে স্তব্ধ করা হত বিভিন্ন
কৌশলে। গুম-
খুন তো
নিত্য
দিনে চলনসই ব্যাপার।
প্রতিনিয়ত চলত সমাজ অঙ্গনে
সাপের সাথে বেজির লড়াই।
তখন
এসব দেখে তোর বাবা
বসে ছিল না। পরিবারের
মায়ায় আমি তাকে ঘরে
ধরে রাখতে পারিনি। সে ছুটল মাঠে
ময়দানে। দলের পিচনে ।
তোর বাবার উপর চোখ পড়ল
শাসক গোষ্টির ।পুলিশের হয়রানি পিচনে তাড়া করত। আততায়ী
মামলা সামনে পিচনের গলি দিয়ে এসে
ঘিরে ফেলত। তবুও গর্বে বুক
উচু করে অকুতোভয় সৈনিক
বেশে তিনি তার কাজ
চালিয়ে গেলেল। আমি বহুবার আত্নগোপন
করতে বলেছি । কিন্তু তিনি
তা কখনোই কর্নপাত করেননি। তিনি আমাকে প্রমোধ
দিয়ে কোরআনের বানী শুনাত-
مااصاب من مصيبۃ الا باذ ن الله
অর্থ--"
আল্লাহর অনুমতি ব্যতিত
কোন বিপদ কারো উপর
আরোপিত হয় না।" [
তাবাগুন
১১]
পারি
নি তাকে কোনমতে সে
পথ হতে ফিরাতে।
তিনি
আরো বলতেন-
وما كان لنفس ان تموت الا باذ ن الله كتبا موءجلا
অর্থ
--"
আল্লাহ তায়ালার অনুমতি ব্যতিত
কখনো কারো মৃত্যু হতে পারে
না। আর মৃত্যুর সময় তো
পুর্ব নির্ধারিত।" [
ইমরান ১৪৫]
যার
যেভাবে মৃত্যু লেখা হয়েছে। তার
মৃত্যু
সেভাবেই হবে। মৃত্যুর ভয় করে
আত্নগোপন করা মুমিননের কাজ
নয়। সত্য ও ন্যায়ের পথে জেল জুলুম
সহ্য
করাই সত্যের আদর্শ।"
আমিই
তার কথায় হেরে যেতাম।
থেমে যেত আমার মানষিক
শক্তি।
এমনি
ভাবে স্রোতের টানে বয়ে যেতে
লাগল দিন। ভোটের সময়
ঘনিয়ে এল। বাতাসে সত্য
জয়ের পূর্বাভাস ভাসতে লাগল। সবার মুখে মুখে
ছুটল দিন বদলের গুঞ্জন।
বিভিন্ন এলাকা হতে তোর বাবাকে
পৌর সভার ইলেকশন করার
প্রস্তাব দিল। দলের কেন্দ্রীয়
সিদ্ধান্ত ও হল তোর
বাবার পক্ষে।
ফলে
তোর বাবা পতিত হল
এই সত্য মিথ্যার রসানলে।
ভোটের
দিন ঘনিয়ে এল। তোর বাবার
জনপ্রিয়তায় শহরে টইটুম্বুর। বিজয়
সুনিশ্চিত। তা দেখে বিরোধী
দল হতাশ। নির্বাচনের দু'
দিন পুর্বে
রাতে বাড়ি ফিরছিল। সাথে
দলের কিছু লোকজন ও
ছিল। হঠাৎ সময় তার
মৃত্যুর
দাবী নিয়ে উপস্থিত হল।
শীতের
রাত। কুয়াশায় ঢাকা। পরিচিত কন্ঠে আততায়ী বেশে পথের পাশে
পিচন হতে কে একজন
ডাক দিল। তিনি ডাকে
সাড়া দিল । একটু
পিচনে গেলে আততায়ী দল
তার বুকে ছুরি বসিয়ে
পালিয়ে যায়। শেষ হল
তার কাজ। মুক্তি পেল
দেশের মানুষ!
সেইদিন আমি পৃথিবীর সব
কিছু দিয়েও সময়ের দাবীকে খালি হাতে ফিরে
দিতে পারিনি। আমার হ্নদয় সিংহাসন
শূন্য
করে তাকে বিদায় দিতে
হল। দেশের শান্তি শৃংখলা ফিরিয়ে আনার জন্য তোর বাবা
রক্ত দিয়েছেন। বাবা,
তুই শান্ত হ।
তোর বাবার ফেলে রাখা কাজ
তো তোকেই করতে হবে। কাল
দুর দুরন্ত হতে লোকজন আসবে।
তোর বাবার কবরের পাশে সভা হবে।
শ্রদ্ধা জানাবে। এই দ্যাখ ওরা আমাদেরকে
চিঠি দিয়ে আমন্ত্রন করেছে।
আমরাও যাব। তোর বাবার
জন্যে
দোয়া করব।
রবির
অবুঝ মন সব কিছু
বুঝেও অবুঝ হয়ে যায়।
সব কিছূ শুনেও কিছুতেই
কান্না থামাতে পারেনা। নিজেকে নিজের মাঝে সামলাতে পারে
না। মায়ের বুক টেবিলের খাবার
সব কিছু ফেলে ছিটকে
বেড়িয়ে আসে বাইরের বাড়ান্দায়
। আজ যেন তার
কাছে পৃথিবী মিথ্যে একাকার হয়েছে। প্রকৃতির নিয়ম কে সে
মানতে পারল না।
আফসানা
ছেলের অভিমানে স্থির থাকতে পারল না। মুহুর্তে
কোথায় যেন হাড়িয়ে গেল।
শরীরের রক্ত ক্রমশঃ জমাট
বাঁধল। পাথরের মত নির্বাক হয়ে
জানালার পাশে এসে দাঁড়াল।
মৃত্যের
মত চারিদিক তাকিয়ে এই শূন্যতারই হাত ধরল সে।
তারপর সর্বস্ব হাড়ানো মানুষের মত খোলা জানালার
ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে
তাকাল। দুরে একটা শিমুল
বৃক্ষ। তার শুকনো ডালে
একটি কাক। একাকী একেলা
সাথী হারা হয়ে জীবনের
করুন আর্তনাদ করছে।
চৈত্রের
শেষাশেষি। প্রচন্ড রোদ। হু হু
বাতাস। সেই নিঃসঙ্গ কাকটির
দিকে তাকিয়ে আফসানা কাঁদতে লাগল। তার মনে পড়ল
প্রথম জীবনের কথা।
এই
তো সেদিন। কলেজের এক ফাংশনে আসাদের
সাথে প্রথম সাক্ষাৎ হল তার। আফসানা
তখন সবে মাত্র দ্বিতীয়
বর্ষের ছাত্রী। আর আসাদ ডিগ্রী
ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। আসাদ কে মনে
ধরল আফসানার। ভাল লাগল তার
কথা বার্তা। আসাদ রাজনীতি করে।
এক
দিন আফসানা কাজী অফিসে ঢুকল।
তখন হৃলকা আঁধার ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে।
কাজী অফিসে আসাদ ছাড়া আর
কেউ নেই। সে মাথা
হেট করে পত্রিকা পড়ছে।
আফসানা আস্তে আস্তে নিঃশব্দে কাছে আসল আসাদের।
:
আরে তুমি?
:
কেন আমার আসতে নেই
নাকি?
:
ঠিক তা বলিনি,
তবে এত তাড়াতাড়ি
এখানে?
:
মনের অজান্তেই।
:
তাই নাকি। বস তাহলে।
:
কেউ এখন আসবেনা তো?
আসাদের মুখো
মুখি বসতে বসতে বলল
আফসানা।
:
আরে না,
কেউ আসবেনা। কাজী
সাহেব অফিস তো বন্ধ
করে চলে গেছে। রাতে
আসবে।
:
তাহলে,
তুমি বসে আছ কেন?
:
তাতো বুঝতেই পারছ। আমার মনে রোদ
মাখা চাঁদের আলো ঝড়ছে।
:
আফসানা একটু লজ্জা পেল। আসাদের রঙমাখা
কথা গুলো ওর বেশ
ভালো লাগল।
:
আসাদ একটু ভেজা কশ্ঠে বলল,
তোকে তো বেশ সুন্দর
লাগছে দেখতে?
:
ওমন করে বললে চলে যাব
কিন্তু।
:
আসাদ মায়াবী সুরে বলল। চলে
গেলে তো যাও। কিন্তু
আসতেই হবে তোমাকে। আমার
জন্যে
নয়,
তোমার ফেলে যাওয়া মনের
টানে।
অনেক
গল্প হল। কাজী সাহেব
আসল। দুজনে প্রনয় বাঁধনে আবদ্ধ হল। নির্জনে আসাদ
আফসানাকে বুকে জরিয়ে ধরল।
কপোলে একটা আলত চুম্বন
দিল। এই তাদের জীবনের
প্রথম আলিঙ্গন। ভাল লাগল তাদের
দু '
জনকে। কেন যেন হ্নদয়ের
সব কটি বাঁধন খুলে
গেল। আবেগের স্রোতে ভেসে গেল ওরা
দু'
জনই।
শুরু
হল সংসার জীবন। দলের ঘাত প্রতিঘাতে
বয়ে গেল জীবন। কিছু
দিনের মধ্যে সুখের জীবনে আনন্দের বান ডেকে আনল
রবি।আফসানা আসাদের আর আনন্দ ধরে
না। যেন ওরা আকাশের
চাঁদ কুড়ে পেল। দিন
যায় মাস আসে। ঘড়ির
কাটা পেন্ডুলিয়ামের ঘুর্ণিয়মানে ঘুরে। রবি আস্তে আস্তে
বড় হয়। আফসানার আশা
আকাংঙ্খা উদ্ভিদের মত দিন দিন
বাড়তে থাকে। ছেলে লেখা পড়া
শিখবে। বড় হবে।দেশের সেবা
করবে। এভাবে ওদের জীবনে বছরের
পর বছর ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতে থাকে।
আসাদ দল ছাড়ে না।
দলই তার জীবন। দরিদ্র
মানুষের ব্যথায়
আসাদের হ্নদয় কেঁপে উঠে। ঝর ঝর
করে চোখ হতে জল
ঝরে। পাজর গুলো মোচর
দিয়ে ঢেউ খেলে। তাই
ছুটে যায় অসহায় মানুষের
পাশে। ১৯৭১ সালে দেশ
স্বাধীন হয়। কিন্তু সাধারন
মানুষ গোলামীর হাত হতে মুক্ত
হয়না। যে ধর্মের জন্য
দেশ বিভক্ত। সে ধর্ম আজ
অবহেলিত। গোলামী কুড়াচ্ছি অন্যের।
মসজিদের শহরের সংস্কৃতি পূর্ণ হয়েছে ভাস্কর্য্যে।
ভাতের অধিকারে ভোটের অধিকার চাপা পড়েছে। কর
আদায়ের নামে শোষিত হচ্ছে
পুরো দেশ। এর মুক্তি
দিতে হবে। এই ছিল
আসাদের পন।
অবশেষে
একদিন নিয়তীর কলম আফসানার কপালে
হোচট খেল। দুই হাজার
আঠার সালের আটাশে ফেব্রুয়ারি। আসাদ ইউ এন
ও অফিস হতে বাড়ি
ফিরছিল। পায়ে হেঁটে বাড়ি
ফিরছিল। সাথে দুএকজন লোকও
ছিল।বিদঘুটে অন্ধকার।পথের চার পাশে বাশঝাড়।
আকাশ ফেটে পড়ছে কুয়াশার
পাতলা চাদর। পিচন থেকে পথের
ধারে কে যেন ডাক
দিল। আসাদ দাঁড়িয়ে পিছনে
ফিরল। মুখো মুখি হল
একাকী। তারপর আর কিহল কেউ
জানলনা। বুক হতে তাজা
রক্ত ঝড়ল। তাল তাল
রক্ত। দম বন্ধ হয়ে
এল। পা দুটো ঝিমিয়ে
পড়ল । বুকটা চিপে
ধরে সাথীদের ডাক দিল।
সব
চেষ্টা ব্যর্থ
হল। রক্তের নহর ছুটছে। আসাদ
বুঝতে পারল। জীবনের পথ মনে হয়
এখানে শেষ। স্ত্রী পুত্রের
মুখ হয়তো আর দেখতে
পারবেনা। তাই হল। দেখেত
দেখতে মাটির কোলে ঢলে পড়ল।
হাড়িয়ে গেল সংজ্ঞা।
তখন
রাত গভীর । আফসানা
ছেলে কে নিয়ে অপেক্ষা
করছে আসাদের জন্যে। মনটা কেন যেন
চঞ্চল উরন্তপনা। চারিদিক হতে বিজয়ের সংবাদ
দ্রুত কানে আসছিল। তবুও
নানা কল্পনায় আহত মনটা। কোন
কাজে স্থির হল না। বদ্ধ
ঘরে শুধু ছটপট করছে
। অনেক সময় পেড়িয়ে
গেল। এখনো আসাদ ঘরে
ফিরছেনা কেন?
হঠাৎ
বাইরে কট মট শব্দ।
কে বা কারা বাইরের
দরজা খূলে ভিতরে আসছে।
আফসানার হ্নদয়টা শিকারীর গুলিতে আহুত পাখির মত
উড়ে গেল। হঠাৎ ছটপট
করে উঠল। দৌড়ে গিয়ে
ছেলেকে কোলে তুলে নিল।
মুহুর্তে সম্পুর্ণ মুখটা পাংশু বর্ণ ধারন করল
। কিছু বুঝে উঠতে
পারে না সে। হর
মর করে কয়েকজন লোক
ডাকতে ডাকতে ঘরের দরজার কাছে
আসল। ওরা কেউ নয়
দলের লোকজন। শুষ্ক কন্ঠে কয়েকটা কথা বলে চলে
গেল। বলল,"
ভাবী,
আসাদ ভাই হাসপাতালে।"
আকাশ
ভেঙ্গে মাথায় পড়ল আফসানার। সাথে
সাথে বাড়ির প্রদীপ গুলো নিভে এল।
চোখ দুটোর সামনে কুচকুচে কালো অন্ধকার ভেসে
আসল।
আফসানা
যখন হাসপাতালে তখন রাত একটা।
ত্রস্ত পদে ছেলেকে কোলে
করে এসে দাঁড়াল আসাদের
শয্যা
পাশে। চোখের জল ঝর ঝর
করে শারীর আঁচলে জমা হল। তারপর
একটা শান্ত সুশীতল কন্ঠে ডাক দিলো।
"
ওগো,
দ্যাখো
আমি তোমার পাশে এসেছি। এই
দ্যাখো
তোমার রবি এসেছে।"
আসাদ
বেদনায় আড়ষ্ট। মুখে কিছু বলতে
পারল না। শুধু ফ্যাল
ফ্যাল
করে তাকিয়ে রইল। চোখ জুরে
ঝরল কয়েক ফোটা অশ্রু।
মৃত্যু
যন্ত্রনায় পাঞ্জা লড়ছে আসাদ। আফসানা
আসাদের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
"
ওগো
কথা বলছ না কেন?"
আসাদ
বির বির করে অস্পষ্ট
স্বরে বলল, "
মিমি,
তোমার জন্য আমি কিছুই করতে
পারিনি। যা করেছি,
এদেশের
মানুষের জন্যে করেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা
কর।"
আফসানা
বাঁধা দিয়ে বলল,
"
না,
তুমি যা করেছ আমার
জন্যে
করেছ। তুমি যা করেছ,
সবার জন্যে করেছ। দেশের জন্যে করেছ। এর চেয়ে আমি
আর কি পেতে পারি?
আমি যা চেয়েছি,
তোমার
কাছ থেকে তাই পেয়েছি।
এর চেয়ে আমার আর
কি পাওয়ার আছে?"
তারপর
আর কিছু হলনা। শুধু
আসাদের মুখে একটা মৃদু
হাসি খেলে গেল। আর
আফসানা!
সে কি যেন
বুঝে আকাশ পাতাল ভেদ
করা আত্ন চিৎকার দিয়ে
লুটিয়ে পড়ল আসাদের রক্ত
সিক্ত রঞ্জিত দেহের উপর। আর সেই
থেকে নেমে এল তার
জীবনে আমাবশ্যার অন্ধকার। ফাগুনের সাথে তার হদয়
আঙ্গিনার লাল কৃষ্ণচূড়া অনেক
দুঃখে শুকিয়ে গেল। জীবনে নেমে
এল কলির সন্ধ্যা।
আফসানা
জানালার পাশে দাড়িয়ে আছে।
চোখ থেকে ঝরঝর করে
কয়েক ফোটা অশ্রু কপোল
বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। আবেগে মনে মনে আসাদ
কে বলল, "
ওগো,
আজ তোমার
ছেলে কে শান্ত কর।
ওকে তুমি সামলাও। ওর
কান্না আর আমার সহ্য
হয় না। "
পরের
দিন আফসানা রবিকে নিয়ে গেল ডোমার
বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। ওখানে হাজার হজার দলীয় লোক
সমেবেত হয়েছে। মঞ্চ সাজিয়েছে। কিছুখনের
মধ্যে
সভার কাজ শুরু হল।
প্রারম্ভে দলের লোকেরা সবাই
মিলে আফসানাকে সম্মান দিয়ে সভাপতির আসনে
আসীন করল। হাতের তালিতে
মুখরিত হল সভা মঞ্চ।
প্রধান মেহমান হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন দলের জেলা কমিটির
সম্মানিত সভাপতি মহোদয়। তাঁকে ফুলের তড়া দিয়ে সৌহার্দ্য
পূর্ণ অভিন্দনে বরন করা হল।
কোর আন তেলাওয়াত হল।
তারপর বক্তব্যের পালা। একে একে অনেকে
বক্তব্য
প্রদান করল। দেশের সার্বিক
সমাচার আলোকপাত হল। যার যা
বলার ছিল সকলে বলল।
প্রধান মেহমান তার বক্তব্যে আসাদের প্রসংশা
করল। তার সংগ্রম কে
সাফল্যের
মুখ দেখাতে সবাই কে এক
কাতারে দাঁড়িয়ে কাজ করার মুক্ত
আহ্বান করল। আসাদের মাগফেরাত
কামনা করল। পরিশেষে আফসানার
বক্তব্য
দানের পালা।
আফসানার
কিছুই বলতে মন সড়ছেনা।
তবুও বলতে হল। আজ
ওর অনেক কিছু বলার
আছে। ধীরে ধীরে মাইকফিচ
হাতে নিয়ে দাঁড়াল। সবাইকে
সালাম জানিয়ে বলতে শুরু করল।
বন্ধুগন,
আমি আপনাদের মত একজন দরিদ্র
মানুষ। আপনাদেরই মা বোন। এই
শহরের একজন দরিদ্র লোকের
স্ত্রী। এত বড় সম্মান
পাওয়ার কোন যোগ্যতা আমার নেই।
বরং আপনারা আমাকে অনেক বড় সম্মান
দানে ঋণী করেছেন। আমি
আপনাদের ঋণে চির কৃতজ্ঞ।
সে
যাক,
আমরা স্বাধীন হয়েও
আজ পরাধীন। আজ আমাদের ভোটের
অধিকার নেই। এই শহরের
ভোটারের সংখ্যা ছাড়িয়ে অনেক বেশী ভোট
পুল হয়েছে। শতকরা একশত ছিয়ানব্বই
শতাংশ
ভোট পুল হয়ে আঙ্গালু
মার্কা বিজয় হয়েছে। আপনারা
দর্শক বেশে তা দেখেছেন।
আমার
বাড়ির পাশের এক মহিলা ভোট
কেন্দ্র হতে ফিরে এসেছে
। সে ভোট দিতে
পারে নি। কেন্দ্র হতে
বাড়ি গিয়ে হরিশ মনে
কাঁদছিল ।তার কান্না শুনে
আমি এগিয়ে এলাম। জিজ্ঞেস করলাম "
বুবু এভাবে কাঁদছেন
কেন?
সে আমায় পেয়ে
গলা জড়িয়ে আরও
ডুকরে কাঁদতে লাগল। আমি তো মহা
বিপদে। এ কোন জ্বালায়
পড়লাম রে বাবা। সহজে
গলাও ছাড়েনা,
কিছু
বলেও না। শুধু কাঁদছে
তো কাঁদছে। আমার পীড়াপীড়িতে এক
সময় মুখ খুলল। বলল,
"
ভাবী,
মোর ভোটটা তো
দিবার পানু না,
তো
পানুনা। তোর ভাই একবছর
আগে মারা গেছে। সে
এসে ভোট দিয়া গেছে,
তাকেও এক নজর দ্যাখুনু
না । কি আদর
করে লোকটা মোক। একটা বাদাম
কিললেও মোক থুইয়া খায়
না। সেই লোকটা কষ্ট
করে ভোট দিবার আসিয়া
মোক না দ্যাখিয়া চলি গ্যালো। এই দুঃখে মুই
কান্দছো বুয়া। মনটা তো মানে
না। চৌখের পানিও থাকে না।"
বন্ধুরা,
এই হল আমাদের স্বাধীনতা।
স্বাধীনতার প্রাপ্য ফসল। স্বাধীনতার জন্যে
রক্ত দিয়েও আমরা গোলাম। দু'
লক্ষ নারী সম্ভ্রম হাড়িয়েও
নারীদের ব্যক্তিত্ব
আজ বিলীন। হায়না হাড়গিলার খাদ্য পন্যে পরিনত আজ নারী সমাজ।
নারীরা ক্ষমতা পেয়েও নারীদের শ্লীলতাহানী পুরুষদের বিনোদনের খোরাক।
বন্ধুরা,
আর নয়। অনেক হয়েছে।
আপনারা আপনাদের দাবী আদায়ে সক্রিয়
হন। তৈরী করতে হবে
নতুন সমাজ। গড়তে হবে নতুন
দেশ। শোষনের মুখে চাপা দিতে
হবে। অত্যাচারের
হাত ভাংতে হবে। ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঐক্য গড়তে হবে। নিশ্চিত
করতে হবে সকলের জন্য
অবাধ স্বাধীনতা।
শত
শত জনতার মধ্যে শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হল গোটা সমাবেশ।
আফসানা একটু নিরব থেকে
আবার বলতে লাগল।
বন্ধুরা,
আপনারা যে পথে পা
বাড়িয়েছেন। তা কোন পিচ্ছিল
পথ নয়। যে পন্হা
অবলম্বন করেছেন তা শান্তিময় ও
সুখবোধ নয়।
নিজেদের
পদযুগল শক্ত করে,
সামনে
এগিয়ে চলুন। বিজয় হাতেছানি দিচ্ছে।
রাত পৌহালে নিশ্চিত সোনালী সকাল। রক্তিম সূর্য অপেক্ষা করছে। প্রত্যেক মানুষের জীবন সুন্দর মাধুর্য্যতায়
ভরে উঠুক। কুসুমাস্তীর্ণ হোক আপনাদের চলার
পথ। এই কামনা বাসনা
রেখেই শেষ করছি।
-
আল্লাহ
হাফেজ।
চারিদিক
হতে আবারও জয়ের ধ্বনি প্রতিধ্বনি
হতে লাগল। আফসানার কথা গুলো সকলের
হ্নদয় ছুয়ে দিল।
আফসানা
মঞ্চ ছেড়ে নেমে আসল।
দেখতে দেখতে সমস্ত মানুষ বিদায় নিল। ফাঁকা হল
বিস্তৃত মাঠ। মাঠের পাশে
মসজিদ। তার পিচনে কবর
স্থান। এই কবর স্থানে
সমাহিত করা হয়েছিল আসাদকে।
আফসানা ছেলেকে নিয়ে
আসাদের
সমাধী স্থলে উপস্থিত হল। কবর জিয়ারত
করল। তারপর হাত তুলে দোয়া
করল। এক সয়য় রবি
কান্না সংবরণ করতে পারল না।
তার বাবার কবরের উপর লুটিয়ে গড়াগড়ি
দিল। আফসানা রবির হাত ধরে
তুলতে চেষ্টা করল। কিন্তু রবি
কিছুতেই তার বাবার কবর
ছেড়ে উঠল না। সে
তার বাবার কবরের মাঝে মিশে যেতে
চাইল। আফসানাও নিজেকে ধরে রাখতে পারল
না। অবুঝ শিশুর মত
কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। দুজনের চোখের
পানি আসাদের কবরের উপর বারবার আচার
খেয়ে পড়ল। কে আগে
শান্ত হয়ে কাকে নিয়ে
বাড়ি ফিরবে। রবি না আফসানা
ওরা কেউ জানে না।
No comments