মুসলিম উম্মাহ একটি দেহতুল্য ।। মারজানা আক্তার


একবার দেহের কিছু অংশে সংক্রামক রোগের আবির্ভাব ঘটে। সারা শরীরে এজন্য কষ্ট ভোগ করতে হয়। আমার তন্দ্রা পালিয়ে ছিল, তাই যামিনীকে দীর্ঘ মনে হতো। পরিস্থিতি যখন অসহনীয় লাগত, কেঁদে কেঁদে মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতাম। দেহের এই কিছু অংশের অসুস্থতা আমাকে সম্পূর্ণ অসুস্থ করে তোলে। খাওয়া-দাওয়া, পড়াশোনা—কিছুই ঠিকঠাকভাবে করতে পারতাম না। দেহের অসুস্থতা আমাকে ভাবতে শেখায় বিভক্ত মুসলিম উম্মাহ সম্পর্কে। যা আজ দেহসমতুল হয়েও শত টুকরো মানচিত্রের মতো।
রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, ‘সব মুসলমান একটি দেহের মতো, যদি তার চোখ অসুস্থ হয় তাহলে পুরো শরীর অসুস্থ হয়ে যায়; যদি তার মাথা অসুস্থ হয় তাহলে পুরো শরীর অসুস্থ হয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৭৫৪)
একটি দেহের কোনো একটি অংশ যখন ব্যথায় কাতর হয়ে ওঠে, তখন শরীরের অন্য অংশগুলোও সেই ব্যথা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে পারে না। একইভাবে মুসলিম উম্মাহর কোনো একটি অংশ যখন দুঃখ-কষ্ট, নিপীড়ন কিংবা সংকটের মধ্যে থাকে, তখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বসবাসকারী মুসলমানদেরও সেই কষ্ট অনুভব করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা কি তাই? আমরা কি সত্যিই একে অপরের ব্যথা অনুভব করি? নাকি নিজেদের ছোট ছোট স্বার্থ, মতপার্থক্য ও সংকীর্ণতার দেয়ালের মধ্যে নিজেদের আবদ্ধ করে রেখেছি?
আমি কেমন করে ভালো থাকতে পারি এটা জেনে যে আমার নিরীহ ফিলিস্তিনি ভাই-বোনগুলো বছরের পর বছর যুদ্ধের দহন-যন্ত্রণা সহ্য করে যাচ্ছে! এটা জেনে যে ওলামায়ে কেরামদের মাঝে মতানৈক্য বিরাজ করছে! এটা জেনে যে আমাদের সাধারণ মুসলমানের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও দ্বন্দ্ব-কলহ লেগেই আছে!
আমরা যখন কোনো অসুস্থ মানুষকে দেখি, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার সুস্থতার জন্য দোয়া করি। কিন্তু উম্মাহর অসুস্থতার ক্ষেত্রে আমাদের সেই ব্যাকুলতা কোথায়? কোথায় সেই পারস্পরিক মমতা, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা? আমরা কি ভুলে গেছি যে একজন মুসলমানের দুঃখ অন্য মুসলমানের হৃদয়েও আলোড়ন সৃষ্টি করার কথা? আমাদের হৃদয় যদি অন্যের কষ্টে কাঁদতে না পারে, তাহলে আমাদের ভ্রাতৃত্ববোধের দাবি কতটুকু সত্য?
ঙহপব গধৎঃরহ খঁঃযবৎ করহম ংধরফ, “ও যধাব ধ ফৎবধস ঃযধঃ ড়হব ফধু বাবৎু াধষষবু ংযধষষ নব বীধষঃবফ, বাবৎু যরষষ ধহফ সড়ঁহঃধরহ ংযধষষ নব সধফব ষড়,ি ঃযব ৎড়ঁময ঢ়ষধপব রিষষ নব ঢ়ষধরহ, ধহফ ঃযব পৎড়ড়শবফ ঢ়ষধপবং রিষষ নব সধফব ংঃৎধরমযঃ, ধহফ ঃযব মষড়ৎু ড়ভ ঃযব খড়ৎফ ংযধষষ নব ৎবাবধষবফ, ধহফ ধষষ ভষবংয ংযধষষ ংবব রঃ ঃড়মবঃযবৎ.” ঞৎঁষু ংঢ়বধশরহম, ও যধাব ংঁপয ধ ফৎবধস যিবৎব যবধৎঃং রিষষ বসনৎধপব রহংঃবধফ ড়ভ যধঃব, ধহফ ফরভভবৎবহপবং রিষষ ভধফব ধধিু রহ ঃযব ষরমযঃ ড়ভ নৎড়ঃযবৎযড়ড়ফ.
আমারও এমন একটি স্বপ্ন আছে—একদিন মানুষের হৃদয় ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসায় পূর্ণ হবে। মতের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু সেই পার্থক্য আমাদের পরস্পরের শত্রুতে পরিণত করবে না। আমরা একে অপরের মতকে সম্মান করতে শিখব। ভুল হলে সংশোধন করব, কিন্তু ভুলের কারণে মানুষকে ঘৃণা করব না। মতের অমিল থাকবে, কিন্তু হৃদয়ের বন্ধন ছিন্ন হবে না। ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু বিভেদ থাকবে না।
যতদিন না সংকীর্ণতার গণ্ডি থেকে আমরা বের হব, ততদিন আমাদের মাঝে ভেদাভেদ বিরাজ করবে। আবার, যতদিন না আমরা অন্যকে আপনার মতো ভাবতে শিখব, সকল ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে গিয়ে ততদিন আমার সংকীর্ণতার শৃঙ্খলেই আটকে থাকব। মহাত্মা গান্ধী যেভাবে পুরো ভারতবর্ষের লোকদের আপন ভেবে সবাইকে একই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। আমরা কি পারি না সেভাবে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম বঙ্গদেশে সম্প্রীতি বজায় রাখতে?
আমরা গাছের গোড়া ছেড়ে আগায় পানি ঢালাতে ব্যস্ত, ফলে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে। আমাদের লক্ষ্য মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটানো। আমাদের লক্ষ্য বিভক্ত দেহসমতুল মুসলিম উম্মাহকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করা। আমরা পাপকে ঘৃণা না করে পাপীকে ঘৃণা করতে বসেছি, কিন্তু নিয়ম ছিল—পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়। ফলস্বরূপ, আমরা মানবতার দ্বার থেকে অনেক দূরে আছি।
আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট বোধহয় এখানেই—আমরা নিজেদের সংশোধনের চেয়ে অন্যকে সংশোধন করতেই বেশি আগ্রহী। অন্যের ভুল আমাদের চোখে খুব সহজেই ধরা পড়ে, অথচ নিজের ভুলগুলো দেখার জন্য আমরা আয়নার সামনে দাঁড়াতে চাই না। আমরা অন্যের বিশ্বাস, মত, আচরণ ও চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলি; কিন্তু নিজের অন্তরের অন্ধকারকে প্রশ্ন করি না। অথচ আত্মশুদ্ধি ছাড়া কোনো সমাজের প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
আমরা যেদিন থেকে নিজেরা ভাবতে শিখব, “ও যধাব হড় ড়হব ঃড় যধঃব, নঁঃ ও যধাব বাবৎুড়হব ঃড় ষড়াব।” সেদিন থেকে বিভেদ দূর হতে শুরু করবে। আমরা যখন নিজেদের শত ত্রুটিতে দেখতে পাই, তখন কীভাবে অন্যের ত্রুটি খুঁজে পাব? এই ক্ষণিকের ভবনে আমি-আপনি সবাই মুসাফির। জানা নেই কার ভ্রমণের কখন সমাপ্তি ঘটে। তাই বিনয়ী হোন এবং অপরকে ক্ষমা করতে শিখুন আপনার পরবর্তী জীবনের মুক্তির জন্য।
জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী। আজ যে মানুষটি আমাদের পাশে আছে, কাল হয়তো সে আর থাকবে না। আজ যে মানুষটির সঙ্গে আমাদের মতের অমিল, কাল হয়তো তার জন্যই আমাদের হৃদয় কাঁদবে। মৃত্যুর সামনে গিয়ে আমাদের পদবি, পরিচয়, দল, মত কিংবা অবস্থানের কোনো মূল্য থাকবে না। সেখানে মূল্যবান হবে আমাদের আমল, আমাদের চরিত্র, আমাদের হৃদয়ের পবিত্রতা এবং মানুষের প্রতি আমাদের আচরণ।
তাই আসুন, আমরা বিভেদের দেয়াল না তুলে ভালোবাসার সেতু নির্মাণ করি। মতের অমিলকে শত্রুতায় পরিণত না করে পারস্পরিক বোঝাপড়ার সুযোগ হিসেবে দেখি। অন্যের ভুল দেখলে তাকে অপমান না করে ভালোবাসা দিয়ে সংশোধনের চেষ্টা করি। নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস অর্জন করি এবং অন্যকে ক্ষমা করার মানসিকতা তৈরি করি। কারণ, ক্ষমা দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং ক্ষমা করার মধ্যেই মানুষের হৃদয়ের মহত্ত্ব প্রকাশ পায়।
আর এভাবেই আমরা একটি সুস্থ দেহসমতুল মুসলিম উম্মাহ গঠনের স্বপ্ন দেখতে পারি। যে উম্মাহর এক অংশের ব্যথায় অন্য অংশ ব্যথিত হবে, এক অংশের আনন্দে অন্য অংশ আনন্দিত হবে। যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হবে না; যেখানে ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু ভালোবাসা হারিয়ে যাবে না। মহান আল্লাহ আমাদের হৃদয়কে সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করুন, পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতা দান করুন এবং একটি ঐক্যবদ্ধ, সুস্থ ও মানবিক মুসলিম উম্মাহ গঠনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.