বাংলাদেশের রাজনীতি: প্রশ্নহীন আনুগত্য বনাম সচেতনতা ।। মেফতাহুন মেহরীন

 
বাংলাদেশের রাজনীতি যেন এক গভীর সমুদ্র যার উপরিতলে ঢেউ ওঠে দল, নির্বাচন, নেতা ও ক্ষমতার দৃশ্যমান টানাপোড়েনে কিন্তু তার গভীর গহ্বরে অন্তর্নিহিত স্রোত বয়ে চলে ইতিহাস, মতাদর্শ, সামাজিক কাঠামো ও স্বার্থের এক অদৃশ্য স্রোত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন যেন সেই সমুদ্রের প্রথম শক্তিশালী স্রোত যাকে ১৯৫৪, ১৯৬৬, ১৯৬৯ ও ১৯৭০ উত্তালভাবে প্রবলতর করে ১৯৭১ সালে বিশাল এক জোয়ারে পরিণত করে। পরবর্তীকালে স্বাধীনতার পরও সেই সমুদ্র থেমে যায়নি বরং সময়ের সাথে সাথে স্রোত নতুন নতুন বাঁক সৃষ্টি করেছে। ১৯৯১ এর গণতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তন, ২০০৭-০৮ এর জরুরি অবস্থা এবং পরবর্তী পর্যায়ের রাজনৈতিক আন্দোলনসমূহ সমুদ্রের ঢেউ; যা সেই সমুদ্রেই তলদেশে বহুদূর ধরে সঞ্চিত ক্ষোভ, প্রতিক্রিয়া, ব্যর্থতা, আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক প্রশ্নকে ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান এর মাধ্যমে ফের প্রতিফলিত করেছে। ২০২৪ এর ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থান এর পর স্বাভাবিকভাবেই রাজনীতি নিয়ে জনমানুষের আগ্রহ, প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা নতুনতর রূপ লাভ করে তবে এখানেই দাঁড়ায় সেই অনিবার্য প্রশ্নটি বাংলাদেশের রাজনীতি কি তবে প্রশ্নহীন আনুগত্যের দিকে এগোচ্ছে?

আনুগত্য নেতিবাচক বিষয় নয় বরং গণতন্ত্রে যেকোনো নাগরিক যেকোনো দল, মতাদর্শ বা নেতার প্রতি সমর্থন রাখতেই পারেন। বস্তুত সমস্যার উৎপত্তি হয় তখন যখন ব্যক্তির দেশ, যুক্তি ও বিবেকের চেয়ে দল বা নেতার প্রতি আনুগত্য বড় হয়ে যায়। তাই, অন্ধঅনুসরণের পরিবর্তে স্বাধীন চিন্তারচর্চা একান্তই আবশ্যক।

যেখানে রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ দলকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মূল্যায়ন করার কথা, সেখানে ‘শত্রু’ হিসেবে দেখার প্রবণতা এখনও দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিদ্যমান। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামো, নেতৃত্ব, নির্বাচনে, দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রার্থী মনোনয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের বাহ্যিক কাঠামো দৃশ্যমান হলেও প্রাণশক্তি যেন ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু।

রাজনৈতিক দলের অন্ধ সমর্থীরা দেশের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সুবিধা, ক্ষমতা, স্থানীয় প্রভাব, রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক প্রভৃতিকে গুরুত্বারোপ করে; যার ফলশ্রুতিতে রাজনীতির সমুদ্রে বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ে। বাংলাদেশের রাজনীতির অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিতিতে প্রয়োজন সচেতনতা। এই রাজনৈতিক সচেতনতা নাগরিকদের রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ ও চর্চার পাশাপাশি প্রশ্ন সিস্টেমকে প্রশ্ন করতে শেখাবে, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল হতে শেখাবে, তথ্য-প্রমাণ ও যুক্তির ভিত্তিতে মত পরিবর্তনের মানসিকতার বিকাশ ঘটাবে, সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে নেয়ার ক্ষমতার বিকাশ ঘটাবে, বিবেকবোধ জাগ্রত করবে এবং দেশের স্বার্থে নাগরিকদের নীতিবোধকে সজাগ রাখবে। এতে রাজনীতির সমুদ্রের ঢেউ বদলালে বা ক্ষমতার নাবিক বদলালেও তলদেশের স্রোত তথা ন্যায়, স্ব স্বাধীনতা ও জনগণের ক্ষমতার প্রশ্ন চিরকাল সুরীয় ধারায় প্রবাহিত হবে।


No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.