দিনটা ছিল বুধবার ।। মাহফুজা হক প্রীতি

রাত্রিবেলা। এশার আজানের পরপর আম্মুর প্রসববেদনা উঠল। আব্বু বাসায় ছিলেন না। নানা আর মামারা মিলে আম্মুকে উপজেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।
আব্বুকে জানানো হলো। তিনি তার কাজ ফেলে তার বহুকষ্টে জমানো টাকায় কেনা সাইকেলে চেপে হাসপাতালে ছুটে এলেন। তখন রাত ১০টা। এসে শুনলেন, তার স্ত্রীর অবস্থা ভালো না। তাঁর অনাগত সন্তান এখনো পৃথিবীর আলো দেখেনি। জটিলতা দেখা দিয়েছে। মা ও সন্তান দুজনের জীবনই ঝুঁকিতে। আব্বু ধাক্কা খেলেন যেন। ডাক্তারকে বললেন,
দরকার হলে সি সেকশনে নেন, তবুও উভয়কে বাঁচান। ডাক্তার বললেন, চেষ্টা করা হচ্ছে নরমালেই ডেলিভারি করার। তবে দরকার হলে অপারেশন করা হবে। আপনারা দোয়া করেন।
“দোয়া করেন...” কথাটা শুনে আব্বুর চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আব্বু আর নানা টেনশনে পায়চারি করছেন। সেই সময়, স্ত্রীর ডেলিভারির সময় স্বামীর ভেতরে থাকার নিয়ম নেই।
একটু পরে মামা নানিকে নিয়ে আসলেন।
“আমার মেয়েটার কী অবস্থা গো বাবা?”
আব্বু বললেন,
“চিন্তা করবেন না আম্মা, আপনার মেয়ে ঠিক আছে। ডাক্তাররা দেখছেন।”
কিন্তু নানি আব্বুর চেহারা দেখে চিন্তা না করে থাকতে পারলেন না।
একটু পরে ভেতর থেকে আম্মুর বেদনাভরা চিৎকার আর আহাজারি শোনা গেল।
একবার, দুইবার, আবার...
আব্বু সহ্য করতে পারলেন না। তার চোখ ভরে পানি নেমে আসল। কিছু না করতে পারার অসহায়ত্ব তাঁকে ভেঙে দিচ্ছে। সবাই দেখল সেটা। কেউ কিছু বলল না। শুধু নানা বললেন,
“দুইটা পানির বোতল কিনে নিয়ে আসো তো বাবা, গলাটা শুকিয়ে গেছে।”
নানা বুঝেছিলেন আব্বুর মনের অবস্থা। আব্বু সারাজীবন এই ঘটনা মনে রেখে নানার প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন।
আব্বু বাইরের করিডোরে এসে দেখেন বৃষ্টি হচ্ছে। হালকা ঝিরঝিরে বৃষ্টি। অন্ধকার, ভেজা বাতাস, আশেপাশে কেউ নেই তেমন। তিনি আর অশ্রু আটকে রাখলেন না।
গ্রাম থেকে আমার দাদা দাদি আত্মীয়-স্বজনের কল আসছে বারবার। তিনি কারও কলই রিসিভ করছেন না। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার মতো মানসিক শক্তি এখন নেই।
বেশ খানিকটা সময় চলে গেছে। আব্বু চোখ-মুখ ধোয়ার জন্য করিডোরের শেষ মাথার বেসিনের কাছে গেলেন।
মুখ পানি দেওয়ার সময় শুনলেন কারও চাপা কান্নার শব্দ। আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজলেন।
একটা লোক বসে আছে বারান্দার সিঁড়ির উপর। ভেজা ছেঁড়া গেঞ্জি আর জীর্ণ লুঙ্গি পরা।
একটু দ্বিধা নিয়ে কাছে গিয়ে আব্বু জিজ্ঞেস করলেন,
“ভাই... কোনো সমস্যা? আপনি কাঁদতেছেন যে?”
লোকটা ফোঁপাতে ফোঁপাতেই আব্বুর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। কান্নার রেশ কমে এলে বলল,
“ভাইজান, দুদিন থাইক্যা কিসু খাই না। প্যাডে বড় জ্বালা হইছে। বিষ্টিতে রিসকা
চালায়ে ইনকাম হয়না ভাইজান। গেরামে বউ ব্যাটা রাইখ্যা আসছি। ট্যাকা পাডাইতে পারি না। অরা কী খাইছে না খাইছে আল্লাহ মাবুদ জানে ভাইজান।” গেটের বাইরে রিকশাটা দেখলেন আব্বু। ভিজে জবজবে।
লোকটার চোখে আবার পানি আসে। কাঁধের গামছা দিয়ে চোখ মুছল। যত যাই হয়ে যাক, মানুষের সামনে কোনো পুরুষই নিজের অশ্রু দেখাতে চায় না।
আব্বুর মায়া হলো। খুব ইচ্ছা করল লোকটাকে সাহায্য করতে। কিন্তু, তারও তো সেরকম সামর্থ্য নেই যে কিছু টাকা হাতে গুঁজে দেবেন। তবে একবেলা পেটভরে ভাত তো খাওয়াতেই পারেন। আব্বু বললেন,
“ভাই চলেন, সামনের হোটেল থেকে এক প্লেট ভাত খেয়ে আসি। রাত তো ভালোই হলো।”
রাত তখন ১২টা।
হাসপাতালের সামনের ভাতের হোটেলটা খোলা। মানুষজন নেই খুব একটা।
রিকশাওয়ালা ভাইটা বড় বড় লোকমা নিয়ে ভাত খাচ্ছে। আব্বু হাসিমুখে দেখছেন। মাঝে একবার খাওয়ার ফাঁকে লোকটা জিজ্ঞেস করল,
“আপনি খাবেন না ভাইজান?”
“না ভাই আমি একটু পরে খাবো। আপনি আরেক প্লেট নেবেন?”
চওড়া হাসি দিয়ে লোকটা বলল, “জি ভাইজান, আরেক পেলেট দিলে খাইতে পারতাম।”
আরেক প্লেট ভাত এল। পাঙ্গাশ মাছের তেল দিয়ে ভাত মেখে খেল। তৃপ্তির সাথে পানি খেয়ে লোকটা বলল, “ভাইজান আপনি ফেরেশতা। আল্লাহ আপনার হাত দিয়া আমারে রিজিক পাডাইসে। আল্লাহ আপনার জীবনের হক্কল সমস্যা অসুবিধা বিপদ আপদ দূর কইরা দেন, আমীন।”
আব্বু হাসলেন। কিছু বলার আগেই আব্বুর ফোনটা বেজে উঠল। শ্বশুরমশাইয়ের কল। ভয়ে ভয়ে কলটা রিসিভ করলেন।
“অভিনন্দন জামাইবাবা, তোমার তো মেয়ে হয়েছে! আর তোমার স্ত্রীও ভালো আছে। তুমি কোথায়? তাড়াতাড়ি আসো!”
উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে আমার নানা বললেন।
আনন্দেও আতিশয্যে হাত থেকে ফোন পড়ে গেল আব্বুর। চমকে উঠে রিকশাওয়ালা মামা জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হইছে ভাইজান?”
আব্বু হেসে বললেন, “ভাই! আপনার দোয়া কবুল হয়েছে ভাই!”
সেই বৃষ্টিভেজা রাতে, ১১ মে ২০০৫, বুধবার, ঠিক রাত ১২টা ৩৮ মিনিটে—আমি পৃথিবীর আলো দেখি।

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.