এবনে গোলাম সামাদ- সাংস্কৃতিক সীমানার পাহারাদার ।। মোহাম্মদ আবদুল মান্নান
।।১।।
এবনে গোলাম সামাদ বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ।
বিজ্ঞানী। গবেষক। সমাজ বিজ্ঞানী। পন্ডিত।
শিল্পী হতে চেয়েছিলেন। হলেন উদ্ভিদ বিজ্ঞানী।
উদ্ভিদের রোগতত্ত্ব ও জীবাণুতত্ব বিষয়ে কিতাব লিখেছেন।
বিশেষজ্ঞের সম্মান ও মর্যাদা পেয়েছেন।
শিল্পকলার ইতিহাস আর ইসলামী শিল্পকলা নিয়ে তার বই মূল্যবান।
মার্কসবাদ বিষয়ে গ্রন্থ লিখেছেন। সেখানেও তার চিন্তার গভীরতা অসামান্য।
ইসলাম সম্পর্কে বিভিন্ন লেখায় তিনি তার বয়ান খোলাসা করেছেন।
‘বাংলাদেশে ইসলাম’ বিষয়ে তার গ্রন্থ অনেকের ধারণা সহজে পরিচ্ছন্ন করবে।
দলীয় রাজনীতির সংশ্রব বিশেষ রাখেননি।
তবু তিনি রাজনীতির ঘাত-প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে নিছক ‘পন্ডিত’ ছিলেন না।
বাংলাদেশের গরমিলের রাজনীতি আর ভূরাজনীতির টানাপোড়েন—
জটিল আবর্তে বাংলাদেশের অবস্থা ও অবস্থান তিনি স্পষ্ট করেছেন।
সাংবাদিক না হয়েও নিয়মিত বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকীর পাতায়
কলামিস্টরূপে ছিল এ শিক্ষাবিদের দীর্ঘ দিনের নিয়মিত সরব উপস্থিতি।
তাকে দেখে মনে পড়েছে হাবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী, মুজিবুর রহমান খাঁর কথা।
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আবুল মনসুর আহমদ, জহুর হোসেন চৌধুরীর কথা।
খন্দকার আবদুল হামিদ, আখতারুল আলম, আবু জাফর শামসুদ্দিন কিংবা আহমেদ হুমায়ুন।
পাঠক নন্দিত প্রভাবশালী কলাম লেখক হিসাবে তাদেকেও তিনি স্পর্শ করেছিলেন।
এবনে গোলাম সামাদের বুহুমাত্রিক সাধনা ও জ্ঞানচর্চা
বিশেষায়ন যুগের বিশেষ কোন খোপে বন্দী নয়।
তাকে দেখে মনে পড়ে আট শতকের আবূ ইউসুফ (৭৩১-৭৯৮) থেকে মাওয়ার্দীর (৯৭৪-১০৫৮) কথা।
মধ্য যুগের জাগরণপর্বে তারা স্বর্ণযুগ সমাহৃত করেছেন।
এবনে গোলাম সামাদকে সেই সব যুগ-মানবের অবিস্মরন ঐতিহ্যের প্রতিবিম্ব মনে হয়।
আমাদের সময়ের ইবনে খালদুন বলতে চান।
আমার কাছে তা অযথার্থ মনে হয় না।
অনুভবে ও অনুধ্যানে ছিলেন ধ্যানি চিন্তাবিদ। সময়ের ফলভারসমৃদ্ধ মহীরুহ।
দীর্ঘ জীবনের অনন্ত জিজ্ঞাসা আর বাস্তব অভিজ্ঞানের অকৃপণ উতসমুখ তিনি।
জাতীয় জীবনের নানা সংকট ও বিভ্রান্তির মুখে লোলচর্ম বার্ধক্যের বাঁধ ডিঙিয়ে
নবতিপর বয়সেও তিনি ছিলেন নির্ভীক কলম সৈনিক।
পুন্ড্র-বরিন্দ-বঙ্গ-সমতট নিয়ে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ (শা ১৩৪২-১৩৫৮) চৌদ্দ শতকে
বাঙ্গালা ও বাঙ্গালীর নতুন পরিচয় ঘোষণা করেন।
সেই বাংলাদেশের একটি পল্লীমুখি এলাকায় এবনে তার জন্ম।
স্কুল সার্টিফিকেট অনুযায়ী জন্ম তারিখ ২৯ ডিসেম্বর, ১৯২৯ সাল।
জন্ম নিবন্ধনের বিধান তখন ছিল না; তার আসল জন্ম তারিখ তাই নিশ্চিত নই।
সে সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে উপনিবেশিকদের শোষণ-শেকল কিছুটা আলগা হতে চলেছে।
নওয়াব সলীমুল্লাহ, সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী আর ফজলুল হকেরা মিলে
অনেক কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে, ঘন আঁধার পর্দা সরিয়ে
পূর্ব বাঙলায় ১৯২১ সালে একটা বিশ্ববিদ্যলয় কায়েম করে ফেলেন।
আর সেই ১৯২১ সালেই কাজী নজরুল ইসলাম ‘বিদ্রোহী’ লিখে
গ্রাম বাঙলার ফসলের মাঠে নতুন শিহরণ জাগিয়ে দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফিলিয়েশনের আওতায় আনতে দেয়া হয়নি।
ফলে এবনে গোলাম সামাদের স্কুল-কলেজ ছিল
‘বৈদেশীর ফরমাশে সৌখিন ফুলের মতো বেড়ে ওঠা’
উপনিবেশিক রাজধানীর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে তখনকার অবিভক্ত বাঙলায়
১৯৩৭ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয় কৃষক-প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগ।
কৃষক-জনতার মাঝে লুন্ঠিত স্বশাসন আর ছিনতাই হওয়া জমির দলিল ফেরত পাবার
স্বপ্ন ও আকাংখার বিস্ফোরণ ঘটে। ।
এমন এক আশা জাগানিয়া সৌভাগ্যের সিঁড়ি বেয়ে
শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের পথ হাঁটেন এবনে গোলাম সামাদ ।
স্কুল-কলেজের তরুণদের কন্ঠে কন্ঠে তখন নবজারণের গান।
তার কন্ঠেও সুর বাজে: নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা!
।।৩।।
এবনে গোলাম সামাদের কর্মজীবন কাটে রাজশাহীতে।
রাজধানী থেকে দূরে থাকায় অনেকের মনিষা পাদ-প্রদীপের আলো থেকে বঞ্চিত হয়।
কিন্তু সারা জীবন বাধার দেয়ালভাঙা মানুষ এবনে গোলাম সামাদ।
মফস্বল গন্ডির হালকা দেয়াল আর পাতলা ওড়নার কারণে তার আলো আটকায়নি।
প্রদীপ্ত মনীষার আলোর মিনারকে পর্বতের কাছে যেতে হয়নি।
পর্বত ছুটেছে ধ্রূবজ্যোতির কাছে।
আপন বিভায় তিনি জাতীয় মানসকে আলোকিত করেছেন।
উপনিবেশিক যমানা থেকে ‘আলিম’ ও ‘জ্ঞানী’র মাঝে তোলা কৃত্রিম দেয়ালের অর্গল ভেঙে
যুগের ভ্রূ-কুঁচকানোর পরওয়া না তার কল্যানের দান স্পর্শ করে সকলকে।
আধা শতকের বেশি সময় তাকে জেনেছি একজন প্রধান চিন্তাবিদ হিসাবে।
মৃদু ও কোমলভাষী কিন্তু তেজস্বী ও গভীর প্রভাব-বিস্তারক।
আমাদের কালের প্রচলিত বহু মিথ আর ভ্রান্তি ও বিভ্রান্তির জাল ছিন্ন করে
ভেজাল তথ্যের আগাছা-জঙ্গল সাফ করে তিনি ফলদ বাগান সাজান।
আমাদের জাতিসত্তা ও আত্মপরিচয় নিয়ে মতলবি প্রচারণার শেকড় উপড়াতে
তার তুলনা এ সময়ে নযীরহীন।
এবনে গোলাম সামাদ এ সুবিধাবাদকে জাতীয় কর্তব্যের বরখেলাফ মনে করেন।
এ দিক থেকে তার স্বাতন্ত্রের তুলনা কবি ফররুখ আহমদের সাথে।
তার দেশপ্রেমী চৈতন্যের শক্তিশালী রাডারে
জাতির সাংস্কৃতিক সীমানা অনিরাপদ করে তোলার আলামতগুলি সহজে ধরা পড়ে।
একজন সৎ বুদ্ধীজীবীর কর্তব্যবোধ নিয়ে যুগের হাওয়ার তোয়াক্কা না করে
অকুন্ঠ সাহসে তিনি সতর্ক ও জাগ্রত করেন, পথ দেখান।
সে সময়ও সব কিছুতে তার নযর ছিল দেশপ্রেমিকের সজাগতায়।
অভিজ্ঞতার অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে ।
স্বাধীন বাংলাদেশে জাতীয় স্বার্থের প্রতিটি প্রশ্নে ছিলেন তন্দ্রাহীন পাহারাদার।
সাংস্কৃতিক সীমানা কিংবা জাতীয় স্বার্থের অন্য যে কোন বিষয়ে
সত্য কথনে ছিলেন অসংকোচ সোচ্চার।
এ দেশের মানুষ তখনো প্রতিবাদ করেছেন।
উনিশ শ পঁচাত্তর সালের এপ্রিলে ফারাক্কার ‘উতসর্গ’ অনুষ্ঠানে
ফারাক্কার অবধারিত প্রতিক্রিয়ায় পদ্মা শুকিয়ে যায়।
মওলানা ভাসানী ফারাক্কামুখি লংমার্চ করেন নবেম্বরে।
এবনে গোলাম সামাদ এ প্রতিবাদের সকল মিছিলে সোচ্চার ছিলেন।
আমাদের জাতীয় আকাংখার কন্ঠস্বর এবনে গোলাম সামাদ।
জাতীয় গন্তব্যের তিনি দিক নির্দেশক। জাতীয় আকাংখার কন্ঠস্বর। চেতনার বাতিঘর।
তিনি ছিলেন অরক্ষিত সাংস্কৃতিক সীমানায় জাগ্রত সিপাহসালার।
জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদার প্রশ্নে সংকটের সকল সড়কে জাতিই তার ‘আত্মপক্ষ’।
তার তত্ব-তথ্য-যুক্তির চৌম্বক টানে আত্মবোধবিমুখ মানুষ সম্বিত ফিরে পায়।
।।৫।।
এবনে গোলাম সামাদকে ঘনিষ্টভাবে জানার সুযোগ পেয়েছি দুই দশক ধরে।
তার সাথে প্রথম একমঞ্চে বসার নসীব হয় ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সেমিনারে রাজশাহী থেকে ঢাকা আসেন তিনি।
সভাপতি ছিলেন মওলানা আমীনুল ইসলাম;
ঢাকায় মোগল রাজধানীর স্থপতি ইসলাম খানের নামে প্রতিষ্ঠিত ইসলামপুরের
ইসলামিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম তিনি।
সত্তরোর্ধ প্রবীন এবনে গোলাম সামাদ পাঠ করেন ছোট্ট নিবন্ধ।
অল্প ক’টি বাক্যে তিনি যা বললেন সে তুলনায় মনে হলো আমি কত কম জানি!
জীবনের শেষ সময়ে নবতিপর বয়সেও তার বড় ভাবনা ছিল
তৌহিদপ্রবণ কোমল জাতির সাংস্কৃতিক সীমানার হেফাজত নিয়ে।
বয়সের ক্লান্তিকর সীমাবদ্ধতা তুচ্ছ করে সেই অরক্ষিত সীমানার পাহারাদাররূপে
তিনি যুদ্ধের মাঠে শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত জাগ্রত ছিলেন।
তিনি তার কলিজার ঘামের কালীতে দেশপ্রেমের দায় শোধ করেছেন।
পনেরো শতকের নূর কুতুবুল আলম (১৩৫০-১৪৪৭), বা সতেরো শতকের শায়খ আহমদ সরহিন্দী (১৫৬৪-১৬২৪);
জাতির ক্রান্তিকালীন সাংস্কৃতিক প্রতিরক্ষার অতীত লড়াইগুলিতে
তারা দাঁড়িয়েছিলেন সামর্থের সবটুকু নিয়ে ।
তাদের সকল সংগ্রামের ঐতিহ্যে চলেছে এবনে গোলাম সামাদের জীবনের লড়াই।
তার চিন্তা ও কর্মের আলোয় এই পবিত্র যমিনের হাজারো মুহাফেজ মুজাহিদ জাগবেন।
এবনে গোলাম সামাদ বেঁচে থাকবেন সেই সদা জাগ্রত সংগ্রামশীলতার মাঝে।
তিনি বেঁচে থাকবেন প্রেরণার মশাল ও গন্তব্যের বাতিঘর হয়ে।
***
এবনে গোলাম সামাদকে নিয়ে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশিত হবে।
উদ্যোক্তাগণ লেখা চেয়েছেন। শাহাদাত সরকার তাগাদা দিচ্ছিলেন।
আমিও প্রবাসের নানা সীমাবদ্ধতার মাঝে লেখাটি নিয়ে রাত জাগছিলাম।
লিখতে লিখতে শেষ রাতে চোখ বন্ধ করেছি।
ফজরের নামাজের বিছানাতেই মাকসুদা জানালেন খবর।
আমার লেখা শেষ করার আগেই এবনে গোলাম সামাদ রবের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন।
ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
তার জন্য দোয়া করলাম।
বেশি দোয়া করলাম নিজেদের জন্য।
আমাদের জাতি যে আজ সত্যি এতিম হয়ে গেল!
আমাদেরকে এখন কে ডাক দিয়ে বলবেন:
‘জাগো বাহে, কোণ্ঠে সবাই’ !!
No comments