সুখ ।। মোহাম্মদ লিয়াকত আলী

 
ইলেকট্র্রনিক  মিডিয়ায় প্রায়ই একটি গান শোনা যায় :
সবাই সুখী হতে চায়, কেউ পায় কেউ পায় না
কপাালে সবার নাকি সুখ সয়না
 
সুখ পাখির পিছে ছুটতে ছুটতে সবাই ক্লান্ত। নাগালের বাইরেই থেকে যায় সে। সকলের মুখে শুধু আফসোস ও হতাশার করুন সুর:
সুখের লাগিয়া বেধেছি যে ঘর, অনলে পুড়িয়া গেল।
আতিকুর রহমান সাহেবের অভ্যাস, কারো সাথে দেখা হলেই তার সুখ দুঃখের খোজ খবর নেয়াঃ
-ভাই, কেমন আছেন? বিবি বাচ্চারা ভালো আছেতো?
 
ইদানিং সেই পুরানো সুন্দর জবাবটা খুব কম শোনা যায়ঃ
-আল্লাহর দয়া ও আপনাদের দোয়ায় ভালই আছি।
 
এখন বেশীর ভাগ মানুষই জবাব দেয়ঃ
-আর কইয়েন না ভাই, মনে সুখ নাইরে, সুখ খুইজা মরি। সুখের সন্ধানে শুধু পথে পথে ঘুরি।
পথে পথে ঘুরলে কি সুখ খুজে পাওয়া যায়? দুনিয়ার সুখ শান্তি ও আখেরাতের মহামুক্তির যে পথ দেখিয়েছেন মহান আল্লাহ ও তার রাসূল(সা.), সে পথে চলতে চায়না হতভাগা মানুষ। অথচ সে সুখ পেতে চায়।
 
স্কুল জীবনে পড়া আলেকজান্ডার পোপ এর “হ্যাপি দি ম্যান” কবিতাটি এখন বার বার মনে পরে তার।
 
মাত্র তিনটি সাধারন অনুগ্রহ যে পেয়েছে, সেইতো প্রকৃত সুখী।
 
নিজের  পরিশ্রমে উপার্জিত সামান্য রুটি,নিজ বাগানের গাছের সুশীতল ছায়া এবং রাতে গভীর ঘুম। সুখের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।
কিন্তু হতভাগা মানুষ এতটুকু নিয়ামতে সন্তুষ্ট নয়। তার আরো চাই,আরো চাই। মানুষের এই খাই খাই স্বভাবই অশান্তির মুল কারণ। অল্পে তুষ্ট মানুষই সুখী মানুষ। এই সহজ কথাটাই মানুষ ভুলে গেছে।
স্বনামধন্য দার্শনিক বার্নাডশ বলেছিলেন ঃ
-বর্তমান বিশ্ব দুটি বস্তুর পিছনে ছুটছে । সবাই চিৎকার করছেঃ
-হয়ার পীস এন্ড হ্যাপিনেস।
এই চিৎকারের সাথে সুর মিলাচ্ছে গ্রাম বাংলার মানুষও। কথায় কথায় তারা বলেঃ
-শান্তির মায় মইরা গেছে, সুখ পাখি উইড়া গেছে।
  বার্নাডশ আরো একটি সাংঘাতিক সত্য কথা বলেছেনঃ
-বিলুপ্ত এই সুখ-শান্তি ফিরে পেতে হলে আমাদের আবার ফিরে যেতে হবে প্রোফেট মুহাম্মাদ(সা.) এর প্রতিষ্ঠিত আদর্শের দিকে। তার মত মহানায়ক যদি আবার একনায়ক হয়ে পৃথিবীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তবেই হয়তো শান্তি ও সুখের মুখ দেখতে পাবে বিশ্ববাসী।
বার্নাডশর বক্তৃতা ও আলেকজান্ডার পোপের কবিতায় অনুপ্রানিত হয়ে সম্প্রতি আমেরিকায় গঠিত হয়েছে একটি সংস্থা “্
“ইনসার্চ অব হ্যাপিনেস”
এই সংস্থা বাংলাদেশের এক অজো পাড়া গাঁওয়ে সুখের সন্ধান পেয়েছে। সংস্থার অনুসন্ধানী স্বচিত্র প্রতিবেদন প্রচারিত হয়েছে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়। এখনও গ্রাম বাংলায় গ্রামোফোন রেকর্ডে গান শুনা যায়ঃ
-দেখে যাও, ও পথিক ভাই, আমার পাড়া গাঁও।
 
ইনসার্চ অফ হ্যাপিনেস টিম উপকূলীয় এক জনপদে দেখতে পায়, ছেলেমেয়েরা খেলছে নানা রকম খেলা | গোল্লাছুট, দারিয়াবাধা,কানামাছি, রশিফvল, এক্কাদোক্কা, আরও হরেকরকম গ্রামীণ খেলা| গ্রামের ছেলে মেয়েরা সাদা চামড়ার মানুষের সাথে তেমন পরিচিত নয়| তাই এক n«vশ কৌতুহল নিয়ে ছুটে আসে তাদের দিকে|
 
টিমের গাইড তাদেরকে বাংলায় বুঝিয়ে দেন:
-এরা তোমাদের সাথে খেলবে। তাদেরকে খেলা শিখিয়ে দাও এবং একসাথে খেল।
কিছুক্ষণ খেলে একজন মন্তব্য করলেন -
- তোমাদের খেলাধুলা খুবই আনন্দমুখর ও স্বাস্থ্যবান্ধব।  আমাদের সন্তানরা মোবাইল ফোন আর ল্যাপটপ নিয়ে সারাক্ষণ ভিডিও গেম খেলে।চোখ ও ব্রেনে চাপ পড়ে। অল্প বয়সে দৃষ্টি ও মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ে। এই সুখ ও আনন্দ ছেড়ে বেশি মডার্ন হওয়ার চেষ্টা করো না। মোবাইল নিয়ে খেলতে যেওনা।
 
একজন গ্রাম্য কিশোর সুন্দর জবাব দেয়ঃ
-আমরা গরীব দরীব মানুষ ফরিং বেইচা খাই। কপালে তিনবেলা খাওন জুটেনা আবার মোবাইল কিনমু? লাফালাফি করে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে গেছে টিম সদস্যরা। এখন দরকার একটু বিশ্রাম ও খাদ্য গ্রহণ।
 
 
বেগ থেকে  স্যান্ডউইচ, পিৎজা,  বার্গার, চিকেন বের করে একজন বলেঃ
- আজ আমাদের এই খাবার তোমরা খাবে।আর তোমাদের বাড়ি ঘরের তৈরি খাবার আমরা খাব।  তোমরা রাজি আছো?
-দারুন মজা অইবো। ফরেন মেমানগো লগে খাইমু।
-তবে একটু রয়ে সয়ে খেও। বেশি খেলে পেটে গোলমাল হবে।
-তাতে অসুবিধা নাই আমাগো পাটক্ষেতে দৌড়াদৌড়ির অভ্যাস আছে।
-পাটক্ষেত মানে?
-আমাগো বাথরুম। জোঙ্গঁল আর পাটক্ষেত। বাংলায় যারে কয় পাবলিক টয়লেট।
 
-তুমিতো দেখছি বাংলা ও ইংরেজি গুলিয়ে ফেলছো। আমরা চিনি ও পানি গুলিয়ে সরবত খাই। বাংলা ও ইংরেজি গুলায়া কি খামু? তবে আপনারা আবার মজা পাইয়া বেশী খাইয়া  ঝালে মইরেন না।
-খেলাদুলার মত তোমাদের কথাবার্তাও বেশ মজার।
 
ভাপা পুলি, চিতই পাটি সাপটা পিঠা খেয়ে যেমন মজা পায়, তার চেয়ে বেশী মজা পায় পিঠা তৈরীর কাজে গ্রামের মহিলাদের সা‡থ হাত মিলিয়ে। পানিতে চালের গুরি মিশানো,নারিকেল কোরানো, শিল-পাটায় evটনা পাটা, বটিতে কুটনা কুটা,  সবকিছুতেই এক ভিন্ন রকম আনন্দ।
 
একটি কাজে হাত লাগাতে সতর্ক করে দিয়েছে মহিলারা। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতে হবে। হাত লাগালে খবর আছে।
 
অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে মুড়ি ভাজা পদ্ধতি।বড় চুলায়  গরম হচ্ছেবালু, প্লাস্টিক  অ্যালুমিনিয়ামের বদলে বিশাল মাটির হাঁড়িতে ছোট ছোট ছিদ্র। গ্রাম্য ভাষায় যার নাম জাইনজর kvবানী।তারা সহজেই বুঝতে পারে হেভি ট্রেন্ট আপ মহিলা ছাড়া মুড়ি ভাজা সম্ভব নয়। এক পাতিলের চাল ভাজতে হয়। ভাজা চালে লোনা পানি ছিটাতে হয়। নুন একটু বেশি হলে মুখে দেয়া যাবেনা। একটু কম হলে আলুনি হবে। ভাজা চাল গরম বাডলিতে ফেলে দূরত ঝাকাতে হবে। তা না হলে সব মুড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। তার আগেই জাইনজরে  ফেলে বালু ছেঁকে নিতে হবে।
 
পরিশ্রমে তৈরি মুড়ি খেতে তো নিষেধ নেই। এক মুষ্টি  হাতে নিয়ে মুখে দেয়, কিন্তু স্বাদ পায় না।
 
 ভাRতে যেমন পরিশ্রম,স্বাদ পেতেও তেমন  পরিশ্রম।
ঘানি ভাঙা সরিষার তেলে কাঁচা মরিচ পিঁয়াজ আদা চটকে মুড়িতে মাখিয়ে প্লেটে  সাজিয়ে দিলেন এক মহিলাঃ
-এইবার খাইয়া দেহেন।
 
 সরিষার তেল ও পেঁয়াজের ঝাঁজে কয়েক দফা হেচ্চো হেচ্চো  করে। হাwPর চোটে নাক চোখ দিয়ে পানি ঝরে। এক মহিলা মাথার তালুতে কয়েকটা থাপ্পড় মারে।
-এইরহম বেউন গেলে মাথা থাবড়াইবেন।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যায়।
-এখন কেমন লাগছে?
- বেশ লাগছে, গলা পরিষ্কার, মাথা হালকা।
 
সার্চিং টিমে একজন ডাক্তার ও ছিল।
 সে বলল-
-মাঝে মাঝে হuvwP দেওয়ারও প্রয়োজন আছে। ইচ্ছে করে নাকে সুড়সুড়ি দিয়ে হuvPতে হয়। কিছু রোগজীবাণু নাক-কান-গলার জংশন পয়েন্টে কিছুদিন আটকে থাকে। হuvwPiসাথে তা বেরিয়ে যায়।
 
আতিকুর রহমান সাহেব সার্চিং টিমের প্রেসক্রিপশনকে মূল্যায়ন করেন অন্যভাবেঃ
-হuvwP দিয়ে মানুষ একটি ছোট্ট দোয়া পড়ে আলহামদুলিল্লাহ।
মানুষ তো ভালো কিছু শুনলে বা পেলে আলহামদুলিল্লাহ বলে। যারা শুনে তারা বলে ইয়ারহামুকুল্লাহ। হuvwPর মতো একটা বিরক্তিকর কাজ করে আল্লাহর প্রশংসা ও শুকরিয়া জ্ঞাপন এর মানে কি?
 
আতিকুর রহমান সাহেব পরিচিত অপরিচিত মানুষকে একটা কথাই বলেনঃ
-আলেকজান্ডার পোপের কবিতা, বার্নারডশর বক্ত„তা, সার্চিং টিমের  প্রতিবেদন গেটে সুখ খুঁজে লাভ নেই। আল্লাহ ও তাঁর নবীর তরিকায় সামান্য হuvwP দিলে ও myL পাওয়া যায়।

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.