ইসলামিক দৃষ্টিকোণে বিবাহবিচ্ছেদ : কারণ ও প্রতিকার ।। আশরাফুল ইসলাম শিমুল
একটু গভীরভাবে ভেবে দেখলে বোঝা যায় ইসলাম আমাদের শেখায় কিভাবে একটা সংসারকে জান্নাতের টুকরো বানানো যায় ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় একটা ঘর হয়ে উঠতে পারে প্রশান্তীর নীর। কিন্তু আমাদের চারপাশের বাস্তবতার দিকে তাকালেই দেখি আমরা সমাজ আজ এত অশান্ত। কেন প্রতিদিন আমাদের চোখের সামনে হাজারো সংসার এত সহজেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। আজকের এই বিশ্লেষণে আমরা কোরআন ও সুন্নাহর মূল উৎসগুলো ঘেঁটে ঠিক এই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব। শুরুতেই আমাদের একটা খুব রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। আবু দাউদ শরীফের একটি হাদিস আমাদের একদম স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে তালাক বা ডিভোর্স হলো আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপ্রিয় হালাল কাজ। হ্যাঁ, এটা ইসলামে অনুমোদিত। কিন্তু আল্লাহ এটা এতটাই অপছন্দ করেন যে এর আধ্যাত্মিক পরিণতি কিন্তু প্রচণ্ড ভারী, এবং এই বিষয়টা আমাদের শুরুতেই মাথায় গেঁথে নেওয়া খুব জরুরি। তাহলে প্রশ্ন হলো কেন তৈরি হয় এই দাম্পত্য কলহ? এক্ষেত্রে নেপথ্যের মূল কারণগুলো একটু এক নজরে দেখে নিতে হবে। দাম্পত্য কলহের প্রধান তিনটে কারণের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, প্রথমত, অহংকার আর ধৈর্যের চরম অভাব। আজকাল খেয়াল করলেই দেখা যায় সামান্য একটু বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে মারাত্মক ঝগড়া বেঁধে যায়। কেউ কাউকে এক বিন্দু ছাড় দিতে রাজি না। দ্বিতীয়ত, স্বামী বা স্ত্রীর নিজ নিজ অধিকারগুলো আদায়ে অবহেলা করা। ইসলাম উভয়পক্ষকেই নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও অধিকার বেঁধে দিয়েছে। এবং সেসকল অধিকার আদায়ে হীনমন্যতা দেখালেই সংসারে তিক্ততা দেখা দেয়। এবং তৃতীয় কারণ হলো বাইরের মানুষ বা তৃতীয় পক্ষের অযাচিত হস্তক্ষেপ। সত্যি বলতে এই তিনটে জিনিসই একটা সুন্দর সাজানো গোছানো সংসারকে একেবারে ধ্বংসের কিনারায় ঠেলে দেয়। কিন্তু এই তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের পেছনে একটা অদৃশ্য বা আধ্যাত্মিক ব্যাপারও আছে। সহীহ মুসলিমের একটি ভয়ঙ্কর হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ইবলিশ, শয়তান ও তার অনুসারীদের মধ্যে তারাই সবার শীর্ষে, যারা কিনা দাম্পত্য জীবনের দুই দম্পতির মাঝে সুখ-শান্তির বিনাশ ঘটিয়ে পারিবারিক অশান্তি ও কলহের সৃষ্টি করে। আর শয়তানের চোখে সেই শ্রেষ্ঠ যে একটি দম্পতির মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিতে পারে। কাজেই এটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মত বিষয় যে সংসার ভাঙার পেছনে শয়তানের প্ররোচনা কতটা জোরালো। আর একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার এই লড়াইটা আসলে কতটা বড় একটা আধ্যাত্মিক যুদ্ধ। এবার ঐতিহাসিক কিছু প্রেক্ষাপটের দিকে তাকাই। নবী রাসূল ও সাহাবীদের জীবনের অনুপ্রেরণামূলক গল্পগুলি থেকে আমরা কী কী শিখতে পারি?
ইতিহাসের পাতা থেকে একদম আবেগঘন একটা মুহূর্তের কথা আমাদের মনে করা উচিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তার জীবনের একেবারে চরম সংকটের মুহূর্তগুলোর মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন খাদিজা রাদি আল্লাহু আনহা আগে কেমন পরম সান্ত্বনা আর অবিচল ভরসা দিয়েছিলেন, তা তো আমরা সবাই জানি। তাই, স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক যে একে অপরের জন্য সবচেয়ে বড় ঢাল হতে পারে, বিপদের দিনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটা কিন্তু আমাদের ঠিক সেই শিক্ষাই দেয়। ইতিহাসের আরেকটি ঘটনা আমাদের নিকট ব্যক্তিগতভাবে ভীষণ মিষ্টি আর আকর্ষণীয় মনে হয়। একটু কল্পনা করুন সেই দৃশ্যটা। আয়েশা রাদি আল্লাহু আনহা পান পাত্রের বা গ্লাসের ঠিক যে জায়গাটাতে মুখ রেখে পানি পান করতেন, আমাদের প্রিয় নবী ভালোবেসে ঠিক সেই একই জায়গায় মুখ রেখে পানি পান করতেন। সুবহানাল্লাহ! এই ছোট ছোট সূক্ষ্ম কিন্তু ভীষণ গভীর রোমান্টিক আচরণগুলো এগুলোই কিন্তু একে অপরের প্রতি রাগ গুলিয়ে দিতে আর নিজেদের মধ্যে নিখাদ ভালোবাসা বাড়িয়ে তুলতে আলোর বেগের ন্যায় কাজ করে। অথচ আজকের দিনের মানসিকতার সাথেই যদি আমরা নবীর আদর্শের তুলনা করি তাহলে আকাশ পাতাল একটা তফাৎ চোখে পড়ে। আজকাল আমরা সামান্য একটু ভুল ত্রুটি হলেই ইগো বা অহংকার দেখিয়ে তর্ক করে পুরো সম্পর্কটাকেই বিষাক্ত করে ফেলি। কিন্তু নবীর আদর্শ কী ছিল, আলী এবং ফাতিমা রাদি আল্লাহু আনহুমার মাঝে কখনো যদি সামান্য মন কষাকষিও হতো তবে রাসূলুল্লাহ নিজে গিয়ে অসম্ভব ভালোবাসার সাথে তাদের মিল করিয়ে দিতেন। পরিবারের ভেতরে এই যে প্রো একটিভ মধ্যস্থতা বা এগিয়ে এসে সমাধান করে দেওয়া, এটারই আজ আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় অভাব। তো অতীতের এই চমৎকার গল্পগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার চলুন দৈনন্দিন জীবনে ফিরে আসি। সংসারে মহব্বত বা ভালোবাসা বাড়ানোর কিছু সুন্নত উপায় দেখে নেওয়া যাক।
এখানে একজন মানুষের চরিত্রের এক শক্তিশালী মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তিরমিজির হাদিসের নবীজী বলছেন, তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। মানে একজন মানুষের চরিত্র কত ভালো ও তার ইমান কতটা মজবুত সেটা সরাসরি নির্ভর করছে সে তার জীবনসঙ্গী আর পরিবারের সাথে কেমন আচরণ করছে ঠিক তার উপর। এটা কিন্তু আসলেই ভীষণ পাওয়ারফুল একটা মেট্রিক যা দৈনন্দিন জীবনের জন্য খুব সাধারণ, কিন্তু দারুণ কার্যকরী কিছু সুন্নতী অভ্যাস আছে। যেমন ধরুন-
১. একে অপরের সঙ্গে উপযুক্ত সময় কাটানো। ২. একে অপরের ছোট ছোট কাজের বা গুণের প্রশংসা করা। ৩. একে অপরের দেখাদেখি মুচকি হাসি দেওয়া। ৪. সাধ্যমত ছোটখাটো কোনো উপহার দেওয়া। শুনতে খুব স্বাভাবিক হলেও দাম্পত্য জীবনে মাধুর্যের বিস্তার ঘটাতে ও প্রফুল্ল মন নিয়ে বাঁচতে ইত্যাদি উপায় অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই। এছাড়াও জীবনসঙ্গীর করা ছোটো ছোটো ভুলত্রুটির উপর ক্ষিপ্ত হওয়ার পরিবর্তে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা ও সঠিকভাবে সংশোধনের পরামর্শ দেওয়াও একটি নৈতিক গুণাবলি। পবিত্র কুরআনে সূরাহ আন নিসার ১৯ নম্বর আয়াতে এই ব্যপারে দারুণ এক মনোস্তাত্ত্বিক আলোচনা রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, “তোমাদের স্ত্রীদের কোনোদিক অপছন্দ হলেও সদ্ভাবে থেকো। হয়তো আমি এতেই কল্যাণ রেখেছি”।
তবে দাম্পত্য কলহ চরম পর্যায়ে পৌছালে তা নিরসনের ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে করণীয় কী? এক্ষেত্রে অবশ্যই লক্ষ্য রাখা উচিত যে রাগের মাথায় হোক বা অন্য যে উদ্দেশ্যেই হোক না কেন তালাক শব্দটি ব্যবহার করা যাবে না। মস্তিষ্কে চরম উত্তেজনা বিরাজমান করলে হয়তো শব্দচয়ন ঠিক থাকে না, কিন্ত আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে। কাজেই রাগ নিয়ন্ত্রণ হতে পারে কলহ নিরসনের চাবিকাঠি। কিন্ত কলহ একেবারে চরম পর্যায়ে চলে গেলে এর সমাধান হিসেবে সূরাহ আন নিসার ৩৫ নম্বর আয়াত অনুসারে একটি সুন্দর ও গঠনমূলক পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে স্বামীর পরিবার হতে একজন ও স্ত্রীর পরিবার হতে একজন সালিশকারী বা মধ্যস্থতাকারী নিয়োজিত করা হবে। পরিবারের সদস্যদের দ্বারা এই মধ্যস্থতাই হতে পারে সম্পর্কে ফাটল ধরাকে রুখে দেওয়া ও চূড়ান্ত সমাধান নিয়ে আসার এক অন্যতম মাধ্যম। আর এই সকল যৌক্তিক চেষ্টার পাশাপাশি সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো আধ্যাত্মিক সম্পর্ক ও প্রচেষ্টা। সূরা আল ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াতের কথা ভাবুন, যেখানে দাম্পত্য জীবনে প্রশান্তি বয়ে আনার জন্য মহান আল্লাহ তার বান্দার উদ্দেশ্যে তার প্রতি দোয়ার জন্য বলেন, যার ফলে কোনো এক ব্যক্তির জন্য তার স্ত্রীরা ও সন্তানেরা তার চোখের শীতলতা হতে পারে। অতএব হাজারো প্রচেষ্টার মাঝেও প্রথম ও প্রধান শর্ত হিসেবে এই আশা মনে গেঁথে রাখতে হবে যে, চূড়ান্ত ফয়সালা আসে কেবলমাত্র এক ও অদ্বিতীয় মহান আল্লাহর মাধ্যমে।
No comments