বেকারত্বের কবলে বর্তমান সমাজ ।। ফারজানা

 

বেকারত্ব বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক একটি সামাজিক সমস্যা। বেকারত্ব আসলে কী, এর পেছনের কারণগুলো কী এবং এই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায়ই বা কী হতে পারে—এসব প্রশ্ন আমাদের সামনে বারবার উঠে আসে।

একজন মানুষ কাজ করার সামর্থ্য ও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যখন উপযুক্ত কোনো কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এবং নিজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে না, তখন সাধারণত তাকে বেকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন বেকার ব্যক্তি অনেক সময় নিজের যাবতীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অভিভাবক বা পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে বেকারত্ব শুধু একজন ব্যক্তির অর্থনৈতিক সমস্যাই নয়, বরং পরিবার ও সমাজের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বেকারত্বের কয়েকটি ধরন রয়েছে। যেমন—শিক্ষিত বেকারত্ব, অশিক্ষিত বেকারত্ব, মৌসুমি বেকারত্ব, প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব ইত্যাদি। বর্তমান বাংলাদেশে এসবের মধ্যে শিক্ষিত বেকারত্বের বিষয়টি বিশেষভাবে দৃশ্যমান। একজন শিক্ষার্থী প্রায় ষোল বছর বা তারও বেশি সময় ধরে পড়াশোনা করে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে। পড়াশোনার বিভিন্ন উদ্দেশ্য থাকলেও বাস্তব জীবনে এসে সে মূলত নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান ও উপার্জনের সুযোগ প্রত্যাশা করে। কিন্তু দিন শেষে অনেক শিক্ষিত তরুণ-তরুণী তাদের যোগ্যতা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ খুঁজে পায় না। জীবনধারণের তাগিদে তাদের অনেকেই যোগ্যতার তুলনায় কম অবস্থানের চাকরি বা কাজ করতে বাধ্য হয়, যা কখনো কখনো তাদের মধ্যে হতাশা ও হীনমন্যতার সৃষ্টি করে।

সম্প্রতি বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও আলোচনায় শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় যে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রতি ১০০ জনে ৩৬ জনই বেকার।বাকি ৬৪ জন অন্যের উপর নির্ভরশীল না হয় এমন কাজ করে যা তার যোগ্যতার চেয়ে কম অবস্থানেের। বিপুল সংখ্যক তরুণ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কেউ পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকছে, আবার কেউ নিজের যোগ্যতার তুলনায় কম অবস্থানের কোনো কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।

বেকারত্বের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,

১,কর্মসংস্থানের তুলনায় অধিক জনবল

২,শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের শুধু সরকারি চাকরির পেছনে ছোটা

৩,বাস্তবিক জ্ঞানের অভাব।অর্থাৎ শিক্ষাজীবনে তাত্ত্বিক পড়াশোনা শেষ করে এসে কর্মজীবনে বাস্তব জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব অনুভব করে

৪,কৃষিতাত্ত্বিক সমাজ।যদি আমাদের সমাজ কৃষিনির্ভর না হয়ে শিল্পনির্ভর সমাজ হতো।বেকারত্বের হার অনেকাংশে কমে যেতো।

৫,প্রযুক্তি ও অটোমেশন।বর্তমান যুগে মানুষ হাতে- কলমে করতো, সে কাজ এখন প্রযুক্তি করে দিচ্ছে।ফলে আয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে।

৬,বিনিয়োগের অভাব।বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ কম হচ্ছে বলে ও শিল্প কারখানা স্থাপিত হচ্ছেনা।ফলে কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি হচ্ছেনা।

৭,উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা ও অনীহা ইত্যাদি এর অন্যতম।

আমাদের সমাজের জন্য বেকারত্ব নিঃসন্দেহে একটি অভিশাপ। প্রশ্ন হলো—আমরা কি এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে পারি? কখনো কখনো বেকারত্ব থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে গিয়েও নতুন ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ, নিম্ন আয়ের পরিবারের একজন সন্তান নিরলসভাবে পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে একটি চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখে। তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় সে নিজে থেকে ব্যবসা শুরু করার সুযোগও সবসময় পায় না। আবার মধ্যম আয় বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন শিক্ষার্থীরও অনেক সময় একই লক্ষ্য থাকে—একটি ভালো, বিশেষ করে সরকারি চাকরি পাওয়া। ফলে ভিন্ন আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান থেকে আসা অসংখ্য তরুণ একই সীমিত সংখ্যক চাকরির জন্য প্রতিযোগিতায় নামে। যোগ্যতা, সুযোগ বা অন্য কোনো সুবিধার মাধ্যমে একজন চাকরি পেলেও অন্যজন বেকার থেকে যায় অথবা নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ খুঁজে পায় না

বর্তমান বাংলাদেশে এমন ঘটনা অহরহই ঘটছে।

তাহলে বেকারত্ব থেকে উত্তরণের পথ কি একেবারেই সীমিত? তা নয়। কিছু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এই সমস্যা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। যেমন—কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা প্রদান করা, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগাতে পারে; ফ্রিল্যান্সিং ও অন্যান্য বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রতি তরুণদের উদ্বুদ্ধ করা; ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা; বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে যুবসমাজকে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া, যাতে তারা নিজেদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিজেরাই করতে পারে।এছাড়াও কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পশুপালন এবং অন্যান্য কৃষিভিত্তিক কার্যক্রমকে উৎসাহিত করলে গ্রামীণ পর্যায়েও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পেতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, বেকারত্ব নিঃসন্দেহে একটি প্রকট সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। এই সমস্যার সঙ্গে দারিদ্র্য, হতাশা, পারিবারিক নির্ভরশীলতা এবং আরও অনেক সামাজিক সমস্যার উত্থান ঘটে। তাই বেকারত্ব দূরীকরণে ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ধীরে ধীরে হলেও পরিকল্পিত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করার চেষ্টা অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে।



⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN

🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

#গ্রন্থালোচনা
#বইআলোচনা
#বইপত্র
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#Molakat
#Book_Review
#Book_Discussion
#Literature
#Bengali_Literature
#বোরহান_মাসুদ
#মনসুর_আজিজ

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.