শেষ বিকেলের শূন্যতা ।। আকিবুল হাসান

 

পশ্চিমাকাশে তখন দিনের শেষ আলোটুকু মিলিয়ে যাচ্ছে। সূর্যটা টুকটুকে লাল আভা ছড়িয়ে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। এদিকে টেবিলের ওপর খোলাই পড়ে রইল সাহিত্যের মোটা বইটা। রাত পোহালেই টার্ম পরীক্ষা, কিন্তু এখন পড়ায় মন কিছুতেই বসাতে পারছি না।

মনটা একটু হালকা করার জন্য তাই বেলকনিতে এসে দাঁড়ালাম। এক কাপ কড়া চা এই মুহূর্তে ভীষণ প্রয়োজন ছিল। দিন শেষের এই সময়টুকু কেন যেন আমাদের মতো ক্যাম্পাস-বন্দি ছাত্রদেরও বড্ড বেশি ভাবুক করে তোলে।

ঠিক তখনই নিচের চেনা গলিটার দিকে চোখ গেল। গোধূলির আবছা আলোতেও মানুষটাকে আলাদা করে চিনতে ভুল হয় না। মেরুন রঙের একটা মার্জিত পাঞ্জাবি, পরনে সাদা পায়জামা, আর চোখে ক্লাসিক মেটাল ফ্রেমের চশমা। ওনার হাঁটার রাজকীয় ভঙ্গি আর পোশাক-পরিচ্ছদই বলে দেয়, তিনি আর দশটা সাধারণ বৃদ্ধের চেয়ে আলাদা, বেশ রুচিশীল আর স্মার্ট একজন মানুষ। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সাড়ে চারটা বাজলেই ওনার এই চেনা অবয়বটা গলির মোড়ে দেখা যায়।

আগে প্রতিদিন এই সময়ে ওনার পাশে একজন বৃদ্ধা থাকতেন, যাঁর হাতটি ধরে উনি পরম নিশ্চিন্তে হেঁটে যেতেন। সম্ভবত ওনার সহধর্মিণী। বিকেল হলেই তাঁরা দুজন পাশাপাশি হেঁটে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরের সবুজ ঘাসে বসতেন; দুজনে মিলে প্রকৃতির সান্নিধ্য নিতেন, হয়তোবা নিজেদের ক্যাম্পাস লাইফের কোনো ফেলে আসা সোনালী দিনের গল্প করতেন। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরেই আমি খেয়াল করছি, ওনার সেই বাম পাশটা একদম খালি। কেউ আর ওনার হাতে হাত রেখে পা মেলাচ্ছে না, কেউ ওনার ধীর গতির সাথে মিলিয়ে নিজের গতিকে কমিয়ে আনছে না।

দাঁড়িয়ে শুধু ভাবছিলাম, আসলে জীবনের এই শেষ বিকেলে এসে মানুষের একজন মনের মতো মানুষের বড্ড বেশি প্রয়োজন হয়। টাকা-পয়সা, ব্যাংকের ডিপিএস কিংবা বৈষয়িক কোনো সাফল্য তখন অর্থহীন মনে হয়। তখন প্রয়োজন হয় এমন কেউ, যে কোনো শর্ত ছাড়াই, কোনো বিরক্তি না দেখিয়ে সব কথা শুনবে।

আমরা এই যুগের তরুণরা, যারা সারাদিন ক্যারিয়ার আর জিপিএ নিয়ে ছুটছি, তারা অনেকেই হয়তো কখনো কখনো বিরক্তির সুরে বলে ফেলি, “বয়স্ক মানুষরা বড্ড বেশি কথা বলেন, একই গল্প বারবার করেন!” কিন্তু আমরা কি একবারও গভীরে গিয়ে বুঝেছি, তাঁরা আসলে তাঁদের ভেতরের জমে থাকা পাহাড়সম একাকিত্বকে আড়াল করতেই কথার আশ্রয় নেন?

আজ আর নিজের ভেতরের তীব্র কৌতূহল আর এক অজানা কষ্টটাকে চেপে রাখতে পারলাম না। দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলাম। গলির মোড়ে এসে ওনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওনার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, সুশ্রী মুখের দিকে তাকিয়ে বিনীতভাবে সালাম দিলাম। তিনি একটু থমকে দাঁড়ালেন, ওনার চশমার ফ্রেমটা আঙুল দিয়ে একটু ঠিক করে নিয়ে ক্লান্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন। ওনার সেই চাউনি দেখে আমি একটু দ্বিধা জড়ানো কণ্ঠে, খুব সাবধানে জিজ্ঞেস করলাম, “উমম... আচ্ছা দাদু, কিছু মনে করবেন না প্লিজ, আমি এই পাশের হলেই থাকি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষে আছি। প্রতিদিন বিকেলে আপনাদের দুজনকে একসাথে দেখতাম। ওনাকে তো গত কয়েক দিন ধরে আপনার পাশে দেখছি না? উনি কোথায়? শরীর খারাপ নাকি?”

প্রশ্নটা শেষ হতেই ওনার সেই শান্ত, গম্ভীর চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে টলটল করে উঠল। গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হলো। তিনি কিছু একটা বলতে চাইলেন, মার্জিত ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল, কিন্তু কণ্ঠস্বর কান্নায় জড়িয়ে গেল।

তবুও বুকের ভেতরের জমে থাকা বুকফাটা কষ্টটা একটু সামলে নিয়ে, ওনার সেই পকেট থেকে বের করা ধবধবে সাদা রুমাল দিয়ে চোখটা মুছে, শূন্য দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, “উনি আমার স্ত্রী বাবা... ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ক্যাম্পাসেই আমাদের পরিচয় হয়েছিল, দীর্ঘ চল্লিশ বছরের সংসার আমাদের। গত কয়েক দিন হলো উনি আমাকে একা ফেলে ওপারে চলে গেছেন। সবাই বলে উনি আর নেই। কিন্তু আমার এই মন তো তা মানে না বাবা! তাই প্রতিদিন ঠিক এই সময়ে আমি এখানে এসে হাঁটি, মল চত্বরের সেই চেনা গাছটার নিচে গিয়ে বসি। ওনার রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলোকে একটু ছুঁয়ে দেখতে চাই, বাতাসে ওনার চিরচেনা অস্তিত্ব অনুভব করতে চাই। মনে হয়, এই বুঝি উনি আমার হাতটা শক্ত করে ধরলেন...”

ওনার কাঁপা কাঁপা কণ্ঠের কথাগুলো শুনে আমার বুকটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠল। চোখের কোণটা আমারও ভিজে এলো। চারপাশের কোলাহলপূর্ণ শহরটা যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। মনে হলো, যুগের পর যুগ ধরে মানুষ ভালোবাসার যে সংজ্ঞা খুঁজে বেড়ায়, এটাই তো তবে সেই সত্যিকারের ভালোবাসা! বয়স, সময় কিংবা মৃত্যু, কোনো কিছুই এই বন্ধনকে ছিন্ন করতে পারে না।

তিনি আবার ধীর পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে চললেন। আর ওনার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে আমার হৃদয়ের গভীরে ভেসে উঠল পল্লীকবি জসীমউদ্দীন-এর সেই চিরন্তন, কালজয়ী ‘কবর’ কবিতার অবিনশ্বর লাইন দুটো,

“ওইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম-গাছের তলে,

তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।”

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.