অমীমাংসিত ।। উম্মে হাবিবা

 
অমীমাংসিত
উম্মে হাবিবা
 
সকালটা মেঘলা ছিল। জানালার কাঁচ বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ধীরে ধীরে নেমে আসছিল। নিপা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সেদিকেই তাকিয়ে ছিল। বাইরে আকাশটা যেমন ভারী, তার মনটাও যেন তেমনই অকারণে ভার হয়ে ছিল। হঠাৎ রান্নাঘর থেকে মায়ের গলা ভেসে এল- “নিপা! এই নিপা! কোথায় গেলি? ভেতরে আয় তো, আমার কাজে একটু হাত লাগা।” নিপা জানালা থেকে সরে এসে রান্নাঘরে ঢুকল। মা তখন এক হাতে সবজি কাটছে, আর অন্য হাতে চুলার হাঁড়ি সামলাচ্ছে। মুখটা রাগে গম্ভীর। নিপা চুপচাপ মায়ের পাশে বসে সবজি কাটতে লাগল। তাদের সংসারে এমন সকাল নতুন কিছু নয়। মা একটু পর বাবার ওপর রাগ দেখাবে, বাবা হয়তো চুপ করে থাকবে, তারপর সন্ধ্যার আগেই আবার দুজনকে পাশাপাশি বসে গল্প করতে দেখা যাবে। এই ছোট্ট সংসারেই নিপার পৃথিবী। বাবা, মা, সাত বছরের ছোট ভাই সফি আর সে। বাবার কাজের কারণে এখন তারা মফস্বলের একটা ভাড়া বাড়িতে থাকে। তবে গরমের ছুটি পড়তেই বাবার কয়েক দিনের ছুটি আর তাদের ছুটি—দুটো একসঙ্গে মিলে গেল। দাদুবাড়ি যাওয়ার কথা উঠতেই নিপার চোখ চকচক করে উঠল। পরদিন তারা ট্রেনে উঠল। সফি সারাক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে কখনো গাছ গুনছিল, কখনো মাঠ দেখিয়ে চিৎকার করছিল। নিপাও হাসছিল। মনে হচ্ছিল, অনেক দিন পর সে নিজের কোনো পুরোনো জায়গায় ফিরছে।
গ্রামে পৌঁছাতে সন্ধ্যা নেমে এসেছিল। পরদিন সকালেই সফিকে ঘুম থেকে তুলে নিপা চাচাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল। পুকুরঘাট, মাঠ, কাঁচা রাস্তা—সবকিছু ঘুরে দেখছিল তারা। সফি আর অন্যরা দৌড়াদৌড়ি করছিল, নিপাও অনেক দিন পর মন খুলে হাসছিল। রাস্তার মোড়ে হঠাৎ জামিল চাচার সঙ্গে দেখা। দূরসম্পর্কের চাচা, অথচ ছোটবেলায় নিপার কাছে খুব আপন একজন মানুষ ছিল সে। তাকে দেখেই নিপার হাসি থেমে গেল। জামিল হাসতে হাসতে এগিয়ে এল—“কবে এলি? কত দিন থাকবি?” সফি স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিতে লাগল। নিপা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। জামিল আরও কাছে এসে দাঁড়াল। তার শরীর নিপার গায়ে ঘেঁষে যেতেই নিপার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। হাতটা যখন তার গায়ে এসে পড়ল, চারপাশের শব্দ যেন মুহূর্তে থেমে গেল। নিপা কিছু বলতে পারছিল না। তার গলা শুকিয়ে আসছিল। হঠাৎ সে ফিসফিস করে বলল, “আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। বাড়ি যাব।” কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে হাঁটা শুরু করল। বাড়ি ফিরে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। বিছানার এক কোণে বসে অনেকক্ষণ হাত দুটো শক্ত করে ধরে রাখল। কাঁদতে চেয়েও কান্না এল না। শুধু মনে হচ্ছিল, বহু বছর আগে চাপা পড়ে থাকা কোনো দরজা যেন আবার খুলে গেছে।
সেই ছুটিটা আর নিপার ভালো কাটেনি। জামিলের সঙ্গে আর দেখা হয়নি, তবু তাকে যেন সব জায়গায় দেখতে পেত। রাস্তার মোড়ে, মাঠের ধারে, পুকুরের পাশে—কোথাও কোনো মানুষ একটু বেশি কাছে এলেই তার বুক ধড়ফড় করত। ছুটি শেষে শহরে ফিরে জীবন আবার আগের মতো চলতে লাগল, কিন্তু নিপা আর আগের মতো থাকল না। কোনো কোনো দিন হঠাৎ চুপ হয়ে যেত। মা জিজ্ঞেস করলে বলত, “কিছু না।” একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে রাস্তার পাশে কয়েকজন ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় একজন বলল, “এই, একটু দাঁড়াও।” নিপা হাঁটতে থাকল। ছেলেটা এগিয়ে এসে তার হাত ধরে ফেলল। মুহূর্তের মধ্যে নিপার শরীরের ভেতর পুরোনো আতঙ্কটা ফিরে এল। সে হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে বাড়ি এল। সেদিন রাতে অকারণে মায়ের পাশে গিয়ে শুয়ে রইল। অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করেও ঘুম এল না। তার মনে হচ্ছিল, কেউ আবার তার হাত ধরে ফেলবে। সময় কেটে গেল। নিপা বড় হলো। কিন্তু তার ভেতরের ভয়টা কোথাও থেকে গেল।
২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর নিপা আবার দাদুবাড়িতে। সকালে হঠাৎ খবর এল-জামিল চাচা মারা গেছে। ক্যান্সারে অনেক দিন ভুগছিল। খবরটা শুনে নিপা অবাক হয়ে বুঝতে পারল, তার ভেতরে কোনো শোক নেই। আবার আনন্দও নেই। শুধু একটা অদ্ভুত শূন্যতা। বাড়ি কাছেই ছিল বলে সে দেখতে গেল। ঘরভর্তি মানুষ। কেউ কাঁদছে, কেউ মৃত মানুষটার গুণের কথা বলছে। একসময় কারও মুখে ভেসে এল—“ভালো মানুষ ছিল।” নিপার বুকের ভেতর শব্দটা গিয়ে আটকে রইল। ভালো মানুষ? তার চোখ সামনে শুয়ে থাকা মুখটার দিকে স্থির হয়ে গেল। এ কি সেই মানুষ, যে ছোটবেলায় তাকে মাঠে নিয়ে যেত, চকলেট কিনে দিত, যার হাত ধরে সে নিশ্চিন্তে হাঁটত? নাকি এ সেই মানুষ, যার কথা মনে পড়লেই তার শরীর শক্ত হয়ে যায়? সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। বাড়ি ফিরে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল।
বিছানায় বসতেই বহু বছর আগের সেই বিকেলটা আবার ফিরে এল। তখন নিপার বয়স সাত কি আট। জামিল চাচাকে সে খুব বিশ্বাস করত। একদিন মাঠে ঘুরতে নিয়ে গিয়ে লোকটা তাকে ঝোপের আড়ালে ডেকে নেয়। সেখানে তার শিশুসুলভ বিশ্বাসের সুযোগ নেয়। নিপা কেঁদেছিল, বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তাকে চকলেটের লোভ দেখানো হয়েছিল, ভয় দেখানো হয়েছিল কাউকে কিছু না বলার জন্য। এরপরও কয়েকবার তাকে একইভাবে একা ডেকে নেওয়া হয়েছিল। ছোট্ট নিপা বুঝতে পারেনি, যাকে সে সবচেয়ে আপন মানুষদের একজন ভাবত, সে কীভাবে তার জন্য এত ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। সে কাউকে কিছু বলেনি। হয়তো ভয়েই, হয়তো লজ্জায়, হয়তো তখনও বুঝতে পারেনি যে অন্যায়টা তার নয়। সেই ছোট্ট মেয়েটা নিপার ভেতরে কোথাও চুপ করে বেঁচে ছিল এত বছর। সেদিন ঘরের নীরবতায় হঠাৎ তার মনে হলো, মেয়েটা যেন তার সামনে বসে আছে। চোখে ভয়, ঠোঁটে কোনো কথা নেই। নিপা চোখ বন্ধ করে খুব আস্তে বলল, “তোর কোনো দোষ ছিল না।” কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ বেয়ে পানি নেমে এল। এত বছর পর প্রথমবার সে বুঝল—সেদিনের শিশুটিকে সে এতদিন ধরে নিজের মধ্যেই একা রেখে দিয়েছে।
জামিল মারা গেছে। তার বিচার হয়নি। সে ক্ষমা চায়নি। নিপা তাকে ক্ষমা করেছে কি না, সে জানে না। হয়তো কোনো কোনো অন্যায়ের জন্য ক্ষমা একটা বাধ্যতামূলক শেষকথা নয়। কিছু ঘটনা ভুলে যাওয়া যায় না, কিছু মানুষকে ক্ষমা করাও যায় না। তবু সেই মানুষটির করা অন্যায়কে নিজের পুরো জীবন বানিয়ে রাখারও কোনো মানে নেই। নিপা ধীরে ধীরে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আয়নায় যে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে, সে আর সেই সাত বছরের শিশু নয়। তার চোখে এখনও ভয় আছে, কিন্তু সেই চোখেই আজ প্রথমবার নিজের জন্য মায়াও দেখতে পেল। বাইরে থেকে মায়ের ডাক এল—“নিপা, খেতে আয়।” নিপা দরজার কাছে গিয়ে থামল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, দরজাটা খুললে আবার সেই পুরোনো পৃথিবীতে ফিরে যাবে। তারপর সে কপাটটা খুলে দিল। বাইরে আলো ছিল। নিপা জানত, সে কিছুই ভুলে যায়নি। হয়তো কোনো দিনই ভুলবে না। কিন্তু আজ সে প্রথমবার বুঝল—শৈশবের একটা অংশ তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, পুরো জীবনটা নয়। সে বাইরে বেরিয়ে এল। পেছনে রয়ে গেল বন্ধ ঘর, পুরোনো স্মৃতি আর বহু বছরের নীরবতা। সামনে ছিল তার নিজের জীবন।

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.