জুলাই প্রদীপ ।। সামিয়া আক্তার সাফা
ধুলোর ঝঞ্ঝার, তিক্ত বায়ু, উদ্যানহীন-নির্জীব শহর। কোথাও কেউ নেই, আছে তবে সব, নেই তবু রুখে দেখার ফুরসত। চলন্ত রেলগাড়ী ছুটছে দিগন্ত দাঁড়াঁতে তার সদা মানা। সময় এখানে কেবলই একটি সংখ্যা; তীব্র ব্যস্ততার চোরাবালিতে কেউ কাউকে গোনে না।
সবুজ ধরণীর দিগন্ত পেরিয়ে ভাটার টানেই আসে শহরে, তবে এ টানের পিছনেও যে নাড়ির টান রয়েছে তা তাকে পিছু ডাকে। রুক্ষ শহরের বুকেও যেন ফুটে উঠেছে এক টুকরো তার নিজস্ব গুলবাহার।
: “সাঈদ, শিগগিরি আয়, দেখে যা কত মানুষের ঢল নেমেছে রে রাস্তায়।”
মাথায় বাদামের ঝুড়ি চড়িয়ে রাজুর অকস্মাৎ ডাকে হুমড়ি খেয়ে দৌড় দেয় সাঈদ। তার অক্ষিপটে বিশাল সমাবেশের ঝাঁক ছুটছে; শত শত মানুষের ঢল।
বয়স মাত্র পঁচিশ, এই নাতিদীর্ঘ জীবনে এত বড় মানবস্রোত সে কখনো দেখেনি। এ স্রোতের একটি ধুন আছে,যা সবাই মিলে সমস্বরে গলা মিলিয়ে গাচ্ছে। সে কণ্ঠ কোনো কোকিলের কুহুতান নয়, তা যেন এক বুকফাটা দ্রোহের ঝংকার! প্রতিটি স্লোগান ঢাকা শহরের আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। পথচলতি মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই দৃশ্যের দিকে চেয়ে রইল।
সম্মোহন কাটতেই সাঈদ আবার তার বাদামের ডালা নিয়ে বাস্তবের রুক্ষ পথে নেমে পড়ল।
“এই বাদাম... বাদাম... গরম গরম বাদাম... বাদাম নিবেন, বাদাম”
গ্রামে থাকতে মাঠের নিরালা শান্ত পরিবেশে লাঙল টানত সাঈদ। কিন্তু অভাবের সংসার তো আর মায়ার চাঁদরে ঢাকা থাকে না বিধায় পাঁচ পেট চালাতে ঢাকা শহর পাড়ি দেওয়া।
ঢাকা শহরের বিভীষিকাময় অট্টালিকায় ঘুরে ঘুরে বাদাম বেচতে নেমেছে নওজোয়ান সাঈদ। বয়সী রাজুর হাত ধরেই এই ব্যবসায় হাতেখড়ি।
হাঁক পাড়তে পাড়তে গলায় বেজায় তৃষ্ণা লেগেছে তার। চোখ মেলতেই দেখল মরিচা পড়া-স্যাতস্যাতে দেয়ালের একটি টঙের দোকান।
সেখানে পর্যবেক্ষণ করল এক বিশাল মৌমাছির ঝাঁক। প্রতিটি কাপে আর চুমুকে রাজনীতির তুমুল ঝড় উঠেছে লোকমুখে।
অগত্যা হাঁফিয়ে উঠে একজন বলে উঠল-
“আজকালকার পোলাপাইনরা এক্কেরে বেদ্দপ হইছে, ময়মুরুব্বিগোর কোনো তোয়াক্কাই করে না। খালি এ দাবি ও দাবি এডা দাও ওইডা দাও কইরা কইরা রাস্তায় নামি পরে বেহুদা। রাস্তা আঁটকায় থোয় শালাগুলা। এডির লাইগগা এ চিপা শহরে লড়নচড়ন করান যায় না।”
মামুন মিয়া, চেয়ারম্যান সাহেবের বিশেষ লোক। চাটুকারিতা করেই দিনাতিপাত যায় তার। হক কথা জবানে না চললেও হক মেরে খেতে তার জুড়ি মেলা ভার। উপস্থিত জনতার মধ্য হতে এক আগন্তুক প্রতিবাদী সত্তা মাথা চাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল-
“তবে ভাই, পোলাপাইন তো ভুল কিছু চায় নাইকা, এতো খাইটাখুইটা পইড়া যহন দেখব অল্প বেতনের চাকরীডাও লুইটাপুইটা নিতাছে কোটাধারীরা অথচ ও ব্যাটার যোগ্যতা থাহা সত্ত্বেও পাইলো না, হ্যাতের তো শইল পুড়বোই। ৫৬% ই যদি আন্নের কোটাওয়ালাগো দিয়া দেয় তাইলে বাকিডি এতো খাইট্টা করবডা কি, এর বিহিত তো করান লাগবই তাই না? কোটা রাহুক তবে পার্সেন্টেজডা কমাইলেও তো”
“আরে রাখো মিয়া! এ সরকার পদ্মা বিরিজ করছে, মেট্টো করছে, কত উন্নয়ন করছে আর তোমরা দেহি সরকারের পিছেই লাইগগা থাকো, তোমরা তো দেহি আসলেই রাজাকারের বাচ্চা।”
তৎক্ষণাৎ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়ে যায় টঙের দোকানখানি।
আগপিছ মাথা না ঘামিয়েই সাঈদ পানির গ্লাসখানিতে কয়েক ঢোক গিলেই রওনা হলো আরেক না জানা নিরুদ্দেশে।
অদূর ঝোপের ধারে বাঁশবাগানের কংক্রিটের উপর বসে, মায়ামোহ জ্যোৎস্না গায়ে মাখছিলো। কি শীতল আর নীরব রাত্র যেনো তার ক্ষীণ আর ভীতু দেহকে জড়িয়ে মুড়িয়ে রেখেছে। ক্লান্তি দেহে শান্তির মেলা মিলাতেই সে এবার তার বাড়ির দিকে রওনা হলো...
পথ চলতে চলতে নীলক্ষেত মোড়ে এসে থামল। দানবীয় খোক্কসেরা গ্রোগ্রাসে গিলছে একের পর এক রক্তে মাংসে গড়া মানুষগুলোকে। কি অট্টহাসি তাদের মুখে যেন সপ্তাকাশ ছুঁই ছুঁই। কিন্তু তাদের মারছে কেনো? কি দোষ তাদের?
প্রশ্নের পায়তারা করতে যে মন্ত্রণা এসেছিলো, তা তার বাদামের ঠোঙায় মুড়িয়ে ফেলে দিলো। সে বাড়ির পথে আবারও হাঁটা দিলো অতৃপ্ত মন নিয়ে।
প্রভাতের ঝিলিমিলি আলো ঘরের ফুটো জানালা দিয়ে চোখে মুখে ধরাছোঁয়া খেলছিলো। দিবার শুরুতেই বাদাম নিয়ে আবারো ছুটে চলে যায় ঢাকার অলিগলিতে।
সে অপলক দৃষ্টিতে দেখল
এক রাশ ছাত্রজনতা তোরণ থেকে টিএসসির মোড় পর্যন্ত উচ্চস্বরে স্লোগান দিতে দিতে ঢাকা শহরের ব্যস্ত সময়কে থমকে দিচ্ছে। সকলের মুখে একটিই স্লোগান
কোটা না মেধা? মেধা... মেধা!
তবে এবারের দৃশ্যপট ভিন্ন আঙ্গিকে রূপ নিলো। সে অধিকার চাওয়া ছাত্রদের উপর ক্রোধের আকাশ ভেঙে দিলো তাদেরই মতো আরো কিছু ছাত্র। কিন্তু এরা কেমন ছাত্র? নিজ হাতেই বেদম পিটাচ্ছে তারই সাথে পড়া সহপাঠীকে। রক্তে রাজপথ লাল হয়ে গেলো মুহূর্তের মধ্যেই।
রাস্তায় সাই সাই করে ছুটে আসতে লাগল গাড়ির বাহার। নীল রঙের গাড়ি, তারই ভিতর থেকে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত শকুনের দল। অথচ যাদের বিরুদ্ধে তাক করা হলো তাদের হাতে তো কিছু নেই তবে লড়াই কোথায় বা বরাবর হলো?
কতশত গোলাবারুদ একটিও তার চেনাপরিচিত নয়। পাশে থাকা রাজু ঢাকা শহরের বেশ পুরাতন ।নয়া সাঈদের সামনে গর্ব আর জ্ঞান প্রকাশার্থে সবগুলির নাম আওড়াচ্ছিল।
: “এ দ্যাখ ব্যাটা! তারা টিয়ারসেল, রাবার বুলেট, গোলাবারুদ, ট্যাংকসহ ব্যাকটি অস্ত্র লইয়া আইছে হ্যাগোর উপর মারার লাগি।”
: “কিন্তু রাজু ভাই! এরা তো আমাগোরই লোক। এ দেশেরই ছাওয়াল। এদের বিরুদ্ধে এবা তাক কেনো? যে অস্ত্র দিয়া দেশ রক্ষা করবার কথা, হেই অস্ত্র কিনার টাকা তো আমাগো ট্যাক্সেই আহে! তবে আমাগো ট্যাকায় কিনা গুলি আমাগো বুকেই বিঁধতাছে?”
কথাটার মাঝে ঝংকার আছে। এ কি সেই সাঈদ যে গ্রাম থেকে অবুঝ অবস্থায় এসেছিলো। ও আজ এতো বড় কথা এ দুদিনে কি করে বলে উঠল? চিন্তার জগতের মোহনা রাজুকে ঘিরে ধরে।
সাঁঝ নেমে এলো, সাঈদ নিজেকে ক্লান্ত উপলব্ধি করল। ক্লান্তি মেটাতে টঙের দোকানে গেলো দুকাপ চা খেয়ে চাঙ্গা করে আবারও কাজে নামতে।
দোকানের টেলিভিশনে দেখাচ্ছে- দেশের বিরাট উন্নতির বাম্পার ফলন চলছে, আয় উন্নতিতে ভরপুর- পুরো দেশ থৈ থৈ করছে। সরকার বিরোধী কোনো খবরই তার নজরে পড়ল না। অথচ নিজের চোখের সামনেই একের পর এক তাজা রক্ত ঝরতে দেখে এসেছে আজ।
সকালবেলায় ছড়িয়ে পড়ল, দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পুরো দেশ থেকে ইন্টারনেট সংযোগ ছিন্ন করে সকলকে ঘরকুনো করে দেওয়া হয়েছে।
থমথম পরিবেশ অথচ কিছুদিন আগেও তো এ ব্যস্ত শহরে একজনের মাথা আরেকজন খেতো।
দুটিদল একে অপরের বিপক্ষে লড়ে যাচ্ছে।
বেলা গড়িয়ে এলো। নিজ নাড়ি বড্ড কাঁদাচ্ছিলো তাকে। মুঠোফোন থেকে নিজ গ্রামের বাড়ির নাম্বারে সংযোগের চেষ্টা করতেই প্রথম রিং ধরে ফেলল তার আদুরে ছোট্ট পাখিটা।
বাবার সাথে কতদিন দেখা নাই, বাবা ছাড়া তার দুনিয়া নেহাত খালি। সাঈদও তার ছোট্ট সোনামণির সাথে খিলখিল করে হাসে আর কথা বলে। এরই মাঝে ছোট্ট সোনামনি কথা বলতে বলতে বাড়ির আঙিনায় গিয়ে সরলপ্রীতি মনে বলতে লাগল-
“বাবা দেখো, পাখি!”
মেয়ে বাবাকে পাখি দেখালো কিন্তু বাবা যেন মুঠোফোনের পারেই রক্তাক্ত দুঃস্বপ্ন দেখল। এ পাখিই তার গতি টেনে ধরল।মুহূর্তেই গা হিম হয়ে গেলো। অশ্রুধারায় আবহ বিষণ্ন হয়ে উঠল।
অকস্মাৎ বজ্র প্রকম্পিত হলো, চারিপাশে হাওয়া গোমোট হয়ে আসলো, মেয়ে আর রা করে না। নাহি খিলখিলিয়ে হাসে। তবে ক্রন্দনরোল বাতাসকে ভারী করে তুলেছে।
“ও গো তোমার মাইয়্যার শইল্লে বন্দুকের গুলি ছুড়ে মারিছে আকাশ থিকা হেলিকপ্টারে।
ও গো- এ আমার কি হলো গো!
ও আল্লা গো... এ কি দিন দেহাইলা আমায় গো, এর আগে আমায় নিয়া গেলা না ক্যা খোদা।
ও আল্লাৃআমি এহন কি নিয়া থাউম রে। ও সোনা রে, ও ময়না রে উঠ মা উঠ, চোখ দুইডা খুল রে।”
সাঈদ বোবা বুনে যায়। তিমির আঁধার যেনো কাটতেই চাচ্ছে না। শোক যখন পাথরের মতো ভারী হয়ে যায়, তখন তা বিস্ফোরক হয়ে ওঠে।
পরক্ষণে খবর পেলো- “পরশু নয় কালই হবে লংমার্চ টু ঢাকা।”
দেশজুড়ে গণজোয়ারের উত্তাল। কারফিউ ভেঙে রাজপথে নেমে এসেছে কোটিপ্রাণের মানুষ।
কেউবা লকডাউন ভেঙে বেরিয়ে হায়নার ক্রোধে পুড়ে হারিয়েছে জীবন আবার কেউবা পানি বিলাতে গিয়ে বন্দুকের গুলিতে ক্ষীণ করেছে আয়ু। জালিমের কুকুরের সামনে বুক পাততেও দ্বিধা করেনি যুবক। একের পর এক ছাত্র-শিক্ষককে শিকারের মতো করে তুলছে পুলিশ ভ্যানে। কেড়ে নিচ্ছে কারোর সন্তান, ভাই, এমনকি মা-বোনও। গোলাবর্ষণ, টিয়ারসেল, রাবারবুলেট এমনভাবে ছুটছে যেনো খেলনা দিয়ে খেলছে তারা, অট্টহাসি তাদেরকে ঘিরে রেখেছে এ কুকর্মে।
সাঈদ শূন্য চোখে হাঁটতে হাঁটতে নীলক্ষেত মোড়ে এসে থামল। ঝোড়ো বাতাসে একটি বইয়ের ছেঁড়া পাতা উড়ে এসে তার পায়ের কাছে পড়ল।
আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে
শহরের পথে কেমন নিবিড় হয়।
কখনো মিছিলে কখনো বা
একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়- ফুল নয়, ওরা
শহিদের ঝলকিত রক্তের বুদবুদ, স্মৃতি গন্ধে ভরপুর।
একুশের রক্তচূড়া আমাদের চেতনারই রং।
কবিতার চরণগুলো দাবানলের আগুনে দাও দাও করে জ্বলছিলো। এ বুঝি আরেক ফেব্রুয়ারি না হয় ঊনসত্তর। কিছুতেই নিজের হৃদয়ের বহ্নিশিখাকে নিভাতে পারছে না সাঈদ।
তার অন্দরমহলের ‘আমি’ সত্তা গর্জিয়ে উঠলো। সে এখন অবিশ্রান্ত কালো দীর্ঘশ্বাস; থমকে রাখা দায়।
চিন্তাখোরাকের উপ্রে উঠে, জনতার ঢলে মিশিয়ে দিলো নিজেকে।
সমস্বরে বলতে লাগল-
“১দফা- ১দাবি”
এতোটাই উন্মাদনা মাথায় চড়ে বসেছিলো যে, শকুনেরা উড়ে এসে বসেছিলো তারই পাতাশূন্য গাছটায়। বুকের তেজ এতোটাই প্রখর হয়েছিলো যে তা ভেদ করে কিছু প্রবেশ করেছে তা আর বুঝার বোধ হয়নি তার।
দেশ ও দশের মাতৃভূমি রক্ষায় যে হনহন করে বেরিয়েছিলো নিরাপদ কুঞ্জন থেকে সে মাটিই তাকে আপন করে নিয়ে লুটিয়ে দিলো তারই নিথর দেহখান।
মালাকুল মউতের মালিক শুধু এটুকু শুনার সুযোগ দিয়েছিলো যে- “পালাইছে রে... পালাইছে... স্বৈরাচার পালাইছে! স্বৈরাচার দেশ ছাইড়া পালাইছে!”
নিঃশ্বাস ত্যাগের সাথে সাথেই সাঈদের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বেহেস্তি তৃপ্তির হাসি। নিজের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে সে জ্বালিয়ে দিয়ে গেল এক নতুন সূর্যোদয়।
সবুজ ধরণীর দিগন্ত পেরিয়ে ভাটার টানেই আসে শহরে, তবে এ টানের পিছনেও যে নাড়ির টান রয়েছে তা তাকে পিছু ডাকে। রুক্ষ শহরের বুকেও যেন ফুটে উঠেছে এক টুকরো তার নিজস্ব গুলবাহার।
: “সাঈদ, শিগগিরি আয়, দেখে যা কত মানুষের ঢল নেমেছে রে রাস্তায়।”
বয়স মাত্র পঁচিশ, এই নাতিদীর্ঘ জীবনে এত বড় মানবস্রোত সে কখনো দেখেনি। এ স্রোতের একটি ধুন আছে,যা সবাই মিলে সমস্বরে গলা মিলিয়ে গাচ্ছে। সে কণ্ঠ কোনো কোকিলের কুহুতান নয়, তা যেন এক বুকফাটা দ্রোহের ঝংকার! প্রতিটি স্লোগান ঢাকা শহরের আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। পথচলতি মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই দৃশ্যের দিকে চেয়ে রইল।
সম্মোহন কাটতেই সাঈদ আবার তার বাদামের ডালা নিয়ে বাস্তবের রুক্ষ পথে নেমে পড়ল।
“এই বাদাম... বাদাম... গরম গরম বাদাম... বাদাম নিবেন, বাদাম”
ঢাকা শহরের বিভীষিকাময় অট্টালিকায় ঘুরে ঘুরে বাদাম বেচতে নেমেছে নওজোয়ান সাঈদ। বয়সী রাজুর হাত ধরেই এই ব্যবসায় হাতেখড়ি।
হাঁক পাড়তে পাড়তে গলায় বেজায় তৃষ্ণা লেগেছে তার। চোখ মেলতেই দেখল মরিচা পড়া-স্যাতস্যাতে দেয়ালের একটি টঙের দোকান।
সেখানে পর্যবেক্ষণ করল এক বিশাল মৌমাছির ঝাঁক। প্রতিটি কাপে আর চুমুকে রাজনীতির তুমুল ঝড় উঠেছে লোকমুখে।
অগত্যা হাঁফিয়ে উঠে একজন বলে উঠল-
আগপিছ মাথা না ঘামিয়েই সাঈদ পানির গ্লাসখানিতে কয়েক ঢোক গিলেই রওনা হলো আরেক না জানা নিরুদ্দেশে।
অদূর ঝোপের ধারে বাঁশবাগানের কংক্রিটের উপর বসে, মায়ামোহ জ্যোৎস্না গায়ে মাখছিলো। কি শীতল আর নীরব রাত্র যেনো তার ক্ষীণ আর ভীতু দেহকে জড়িয়ে মুড়িয়ে রেখেছে। ক্লান্তি দেহে শান্তির মেলা মিলাতেই সে এবার তার বাড়ির দিকে রওনা হলো...
প্রভাতের ঝিলিমিলি আলো ঘরের ফুটো জানালা দিয়ে চোখে মুখে ধরাছোঁয়া খেলছিলো। দিবার শুরুতেই বাদাম নিয়ে আবারো ছুটে চলে যায় ঢাকার অলিগলিতে।
সে অপলক দৃষ্টিতে দেখল
এক রাশ ছাত্রজনতা তোরণ থেকে টিএসসির মোড় পর্যন্ত উচ্চস্বরে স্লোগান দিতে দিতে ঢাকা শহরের ব্যস্ত সময়কে থমকে দিচ্ছে। সকলের মুখে একটিই স্লোগান
কোটা না মেধা? মেধা... মেধা!
রাস্তায় সাই সাই করে ছুটে আসতে লাগল গাড়ির বাহার। নীল রঙের গাড়ি, তারই ভিতর থেকে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত শকুনের দল। অথচ যাদের বিরুদ্ধে তাক করা হলো তাদের হাতে তো কিছু নেই তবে লড়াই কোথায় বা বরাবর হলো?
: “এ দ্যাখ ব্যাটা! তারা টিয়ারসেল, রাবার বুলেট, গোলাবারুদ, ট্যাংকসহ ব্যাকটি অস্ত্র লইয়া আইছে হ্যাগোর উপর মারার লাগি।”
সাঁঝ নেমে এলো, সাঈদ নিজেকে ক্লান্ত উপলব্ধি করল। ক্লান্তি মেটাতে টঙের দোকানে গেলো দুকাপ চা খেয়ে চাঙ্গা করে আবারও কাজে নামতে।
দোকানের টেলিভিশনে দেখাচ্ছে- দেশের বিরাট উন্নতির বাম্পার ফলন চলছে, আয় উন্নতিতে ভরপুর- পুরো দেশ থৈ থৈ করছে। সরকার বিরোধী কোনো খবরই তার নজরে পড়ল না। অথচ নিজের চোখের সামনেই একের পর এক তাজা রক্ত ঝরতে দেখে এসেছে আজ।
সকালবেলায় ছড়িয়ে পড়ল, দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পুরো দেশ থেকে ইন্টারনেট সংযোগ ছিন্ন করে সকলকে ঘরকুনো করে দেওয়া হয়েছে।
থমথম পরিবেশ অথচ কিছুদিন আগেও তো এ ব্যস্ত শহরে একজনের মাথা আরেকজন খেতো।
দুটিদল একে অপরের বিপক্ষে লড়ে যাচ্ছে।
বেলা গড়িয়ে এলো। নিজ নাড়ি বড্ড কাঁদাচ্ছিলো তাকে। মুঠোফোন থেকে নিজ গ্রামের বাড়ির নাম্বারে সংযোগের চেষ্টা করতেই প্রথম রিং ধরে ফেলল তার আদুরে ছোট্ট পাখিটা।
বাবার সাথে কতদিন দেখা নাই, বাবা ছাড়া তার দুনিয়া নেহাত খালি। সাঈদও তার ছোট্ট সোনামণির সাথে খিলখিল করে হাসে আর কথা বলে। এরই মাঝে ছোট্ট সোনামনি কথা বলতে বলতে বাড়ির আঙিনায় গিয়ে সরলপ্রীতি মনে বলতে লাগল-
অকস্মাৎ বজ্র প্রকম্পিত হলো, চারিপাশে হাওয়া গোমোট হয়ে আসলো, মেয়ে আর রা করে না। নাহি খিলখিলিয়ে হাসে। তবে ক্রন্দনরোল বাতাসকে ভারী করে তুলেছে।
“ও গো তোমার মাইয়্যার শইল্লে বন্দুকের গুলি ছুড়ে মারিছে আকাশ থিকা হেলিকপ্টারে।
ও গো- এ আমার কি হলো গো!
ও আল্লাৃআমি এহন কি নিয়া থাউম রে। ও সোনা রে, ও ময়না রে উঠ মা উঠ, চোখ দুইডা খুল রে।”
পরক্ষণে খবর পেলো- “পরশু নয় কালই হবে লংমার্চ টু ঢাকা।”
কেউবা লকডাউন ভেঙে বেরিয়ে হায়নার ক্রোধে পুড়ে হারিয়েছে জীবন আবার কেউবা পানি বিলাতে গিয়ে বন্দুকের গুলিতে ক্ষীণ করেছে আয়ু। জালিমের কুকুরের সামনে বুক পাততেও দ্বিধা করেনি যুবক। একের পর এক ছাত্র-শিক্ষককে শিকারের মতো করে তুলছে পুলিশ ভ্যানে। কেড়ে নিচ্ছে কারোর সন্তান, ভাই, এমনকি মা-বোনও। গোলাবর্ষণ, টিয়ারসেল, রাবারবুলেট এমনভাবে ছুটছে যেনো খেলনা দিয়ে খেলছে তারা, অট্টহাসি তাদেরকে ঘিরে রেখেছে এ কুকর্মে।
সাঈদ শূন্য চোখে হাঁটতে হাঁটতে নীলক্ষেত মোড়ে এসে থামল। ঝোড়ো বাতাসে একটি বইয়ের ছেঁড়া পাতা উড়ে এসে তার পায়ের কাছে পড়ল।
আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে
শহরের পথে কেমন নিবিড় হয়।
কখনো মিছিলে কখনো বা
একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়- ফুল নয়, ওরা
শহিদের ঝলকিত রক্তের বুদবুদ, স্মৃতি গন্ধে ভরপুর।
একুশের রক্তচূড়া আমাদের চেতনারই রং।
কবিতার চরণগুলো দাবানলের আগুনে দাও দাও করে জ্বলছিলো। এ বুঝি আরেক ফেব্রুয়ারি না হয় ঊনসত্তর। কিছুতেই নিজের হৃদয়ের বহ্নিশিখাকে নিভাতে পারছে না সাঈদ।
তার অন্দরমহলের ‘আমি’ সত্তা গর্জিয়ে উঠলো। সে এখন অবিশ্রান্ত কালো দীর্ঘশ্বাস; থমকে রাখা দায়।
চিন্তাখোরাকের উপ্রে উঠে, জনতার ঢলে মিশিয়ে দিলো নিজেকে।
সমস্বরে বলতে লাগল-
দেশ ও দশের মাতৃভূমি রক্ষায় যে হনহন করে বেরিয়েছিলো নিরাপদ কুঞ্জন থেকে সে মাটিই তাকে আপন করে নিয়ে লুটিয়ে দিলো তারই নিথর দেহখান।
মালাকুল মউতের মালিক শুধু এটুকু শুনার সুযোগ দিয়েছিলো যে- “পালাইছে রে... পালাইছে... স্বৈরাচার পালাইছে! স্বৈরাচার দেশ ছাইড়া পালাইছে!”
No comments