নাটক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম: তাওফিক আল-হাকিমের অনবদ্য নবি চরিত ।। ড. কামরুল হাসান

 
একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ চরিত্রের নাম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। যে চরিত্রের নমূনা কিংবা তুলনা কেবল তিনিই। এই চরিত্রের উপমা একটিই। এবং এটি অবশ্যই অদ্বিতীয়। নানান বিশেষণ এবং অভিধায় বিশেষায়িত এমন চরিত্রের আধার সকল জামানার শ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি সকল বিশ্বের নবি। সকল নবিরও নবি তিনি। বিস্ময়ের সাথে একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়- তাকে নিয়ে কবি ও সাহিত্যিকদের বন্দনার কোনো অন্ত নেই। তাকে নিয়ে স্তুতি রচিত হয়েছে আরবে, আজমে, বিশ্বের সকল প্রান্তে। তার স্তুতিতে আরবি সাহিত্য ঋদ্ধ হয়েছে অতিমাত্রায়। বাংলা ভাষায়, উর্দু ভাষায়, পশতু ভাষায়। বরং বলতে হবে পৃথিবীর প্রায় সকল ভাষায়। তার প্রতি স্তুতি জ্ঞাপন করে ধন্য হয়েছেন তার অনুসারিরা। একইসাথে তার বিরোধী পক্ষ কিংবা শত্রু পক্ষ কিংবা তার আদর্শের বাইরে যারা তারাও। সকল ধর্মের, বর্ণের মানুষ তার স্তুতি করেছেন, তার স্তুতি করে আপন নৈতিকতার দায় শোধ করে তৃপ্ত হয়েছেন। তাকে নিয়ে লিখা হয়েছে গান, কবিতা, গল্প, কথিকা, ছোটগল্প, উপন্যাস, ছড়া আরো কত কি? আসলে তাকে নিয়ে লিখা হয়নি কী?
সাহিত্যের এমন কোনো অনুষঙ্গ নেই যে অনুষঙ্গে তাকে নিয়ে কলম ধরেনি সাহিত্যবোদ্ধারা। নাটক, নাটিকা, একাঙ্কিকা ইত্যাদি রচিত ও লিখিত হয়েছে তাকে নিয়ে। দশক তিনেক আগে তাকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে বিখ্যাত মুভি দ্য ম্যাসেজ। সাড়া ফেলেছে গোটা দুনিয়ায়। আলোচনা বা সমালোচনাও হয়েছে কম-বেশি। বিক্রয় বিবেচনায় মুভিটি ছিল বেস্ট সেলারের তালিকায়।
এখানে লক্ষ্যযোগ্য বিষয়টি হচ্ছে- পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যাদেরকে নিয়ে স্তুতিগাঁথা বা শোকগাঁথা রচিত হয়ে থাকে। সেটি স্বাভাবিকও বটে। তবে সেটি অবশ্যই হয়ে থাকে তার মৃত্যুর পরে। কদাচ মৃ্যুর আগেও হয়ে থাকে। কিন্ত কারো জন্মের আগে তার স্তুিিতগাঁথার কৈানো খবর আমাদের জানা নেই। নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যতিক্রমি বিষয়টি এখানেই। তাকে নিয়ে স্তুতি, প্রশংসা কিংবা বন্দনা যেমন লিখিত, রচিত, আবৃত্তি ও সুরারোপিত হয়েছে তার জন্মের পরে। তেমনি তা হয়েছে তার জন্মের আগেও। এটিই সাধারণত হয়ে থাকে। বিস্ময়ের যে বিষয়টি আমরা যারা নবিভক্তদের আনন্দিত করে তা হলো- তাকে নিয়ে তার প্রশংসাগীত উৎসর্গিত হয়েছে তার জন্মের পূর্বেও। আল-হামদুলিল্লাহ!
এটি প্রশংসিত নবি মুহাম্মদের প্রশংসা অধ্যায়ের ব্যতিক্রমি ও বিশেষ দিক। বিশ্বের আর কোনো মণীষির ক্ষেত্রে এমন সম্ভাবনা ঘটার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তদানীন্তন আরবের ইয়াহুদি পণ্ডিত ওয়ারাকা বিন নওফেল নবির জন্মের বেশ পূর্বেই তার প্রশংসা করে লিখেছিলেন-
আমি খুঁজেছি তারে
স্মরেছি বারংবার
উৎকণ্ঠিত হয়ে খুঁজেছি আমি
ফুপিয়ে কেঁদেছি দিন রাত।।
খাদিজা মুখে শুনেছি কথা তার
যত বৈশিষ্ট্য ও গুনের ছিল সমাহার।।
অপেক্ষা দীর্ঘতর বেটি
তুমি দিলে সন্ধান তার।।
হিব্রু ভাষার পণ্ডিত তাওরাত মারফত শেষ নবির আগমন সম্পর্কে জানতেন। তার জন্য অপেক্ষমান ছিলেন। তারই স্তুতিতে তিনি লিখেছিলেন দীর্ঘ কবিতা। মাত্র দু‘টি শ্লোকের অনুবাদ আমরা উপরে উল্লেখ করেছি। উল্লেখ্য এ কবিতাখানি তদানীন্তন মদিনার জনসাধারণের মুখে মুখে উচ্চারিত হতো।
এই ছিল শেষনবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মান ও শান। অত্যুক্তি হয় না যদি বলা হয়- মানবিক মানব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে যত গল্প, কবিতা, গান ও তার জীবনী লিখা হয়েছে, এতটা আর কোনো মানুষকে নিয়ে লিখা হয়নি। সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি।
তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়, প্রতিটি পর্ব হোক তা নবুওতের পূর্বে বা পরে এমন ঐতিহাসিকভাবে অকাট্য যুক্তি ও প্রমাণ সহযোগে সংরক্ষিত ও নিস্কন্টক করে রাখা গেছে যা পৃথিবীর কোনো মানুষের জন্য করা যায়নি। ঐতিহাসিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনী সংরক্ষণ দুনিয়াবাসীর জন্য আরেক বিস্ময়।
আল-হাদিস আল-নববির সুবিশাল সম্ভার, শামাইলে নবি, দালাইলে নবি, মাগাজি, সিরাত, ইসলামি ভাষ্যকারদের জবানি প্রভৃতি আকর এবং আধারে নবির জীবনী হীরার অক্ষরে খোদিত রয়েছে জ্বলজ্বলায়মানরূপে। হীরকের চেয়েও প্রোজ্জ্বল এ হরফ কোনোদিনও মুছে ফেলা যাবে না। বিশেষত দেড় হতে দু‘লক্ষ তার প্রিয়তর অনুরক্ত তার জীবনগাঁথাকে যেভাবে স্মরণ রেখে পরবর্তি প্রজন্মের জন্য বর্ণনা করে গেছেন তার উৎপাটন সম্ভব হবে কী করে?
আমরা নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনী নিয়ে সাহিত্য প্রচেষ্টা ও প্রয়াসের কথা বলছি। ঐতিহাসিকতার ভিত্তিতে তাকে নিয়ে সিরাত বিশেষজ্ঞগণ তার জীবনের নির্মোহ উপস্থাপনা আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন। গল্প-উপন্যাসের মাধ্যমে চিত্রিত হয়েছে তার জীবনের নানান দিক। কখনো-বা পূর্ণাঙ্গ জীবনকেও উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তাকে নিয়ে নাটক রচনার সংবাদ পাওয়া যায়নি।
আরবি সাহিত্যে নাটকের পুরোধা ব্যক্তিত্ব তাওফিক আল-হাকিমের দৃষ্টিতে আসে বিষয়টি। নবি জীবনের ইতিহাসের এই শুন্যস্থানটি পূরণের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তিনি। দীপ্ত সাহসে এগিয়ে আসেন এ মহান উদ্যোগকে সফল করতে। উদ্যোগ, সিদ্ধান্ত এবং সম্পাদন সবই ছিল আপনার। যথারীতি আলোর মুখ দেখে নাটকটি। নাম দেওয়া হলো- মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
বিগত শতাব্দির চতুর্থ দশক। ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত নাটকটি তখন সবার হাতে হাতে। বিষয়ের নতুনত্বে এবং নাট্যকারের কৌশল নিরীক্ষার্থে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় নাটকটি। নিমিষেই বিশ্বের নানান ভাষায় অনুবাদ হয় নাটকটির। মিডিয়ার কল্যাণে বিশ্বের তাবৎ অঞ্চলের প্রায় সবাই জেনে যায় এ নাটকের সংবাদ। আর যায় কোথায়?
বিশ্বব্যাপি শুরু হয় হৈ-হুল্লোড়। প্রতিবাদের ঝড়। বিক্ষোভের উম্মাতাল। বক্তৃতা, বিবৃতি আর ফতোয়ার ছড়াছড়ি। নাট্যকার তাওফিক আল-হাকিমকে নিয়ে নিরন্তর কুটবাক্য, অন্তহীন ফতোয়া। হেন গালি নেই যা তাকে জর্জরিত করেনি। অবস্থা বেগতিক। যেন সামাল দেওয়াই মুস্কিল। সবাই বেসামাল। কিন্ত তাওফিক আল-হাকিম নির্বিকার।
এবার তিনি আয়োজন করেন সাংবাদ সম্মেলনের। নির্ধারিত দিন-তারিখে যথাসময়ে সাংবাদিকবৃন্দ হাজির। উষ্ণ আলোচনায় হলঘর গরম। তাওফিক আল-হাকিমের হলরুমে প্রবেশে কিয়দ বিলম্ব। তাতে হলের উষ্ণতা যেন আরো বেড়ে যায়। অবশেষে নাট্যকার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। সাংবাদিকমহলের প্রশ্নের যেন শেষ নেই। একের পর এক প্রশ্ন। কেবল প্রশ্ন আর প্রশ্ন। তাদের প্রশ্নের মূল জায়গাটি ছিল- মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে নাটক লিখেছেন তো বেশ। বলুন তো তার চরিত্রে অভিনয় করবে কে?
 
তাওফিক আল-হাকিম এতসব প্রশ্নের জবাবে দু‘একটি বাক্য বলেই তার জবাবের পরিসমাপ্তি টানেন। তিনি বিনয়ের সাথে বলেন- নাটকের জন্য মঞ্চায়ন আবশ্যক, এটি তো শেষ কথা নয়। নাটক পড়েও তো বিনোদন লাভ করা যায়। এ জবাবের পর সকল সাংবাদিক ‘থ’ বনে যান। তাদের কথা বন্ধ হয়ে যায়। তাওফিক আল-হাকিম সম্মেলন কক্ষ ত্যাগ করেন। এভাবেই নাট্যকারের নাট্যখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। নবি জীবনের ঐতিহাসিক পূর্ণতা আরো এক ধাপ এগিয়ে যায়।
আমাদের তাওফিক আল-হাকিমের মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাটকটি ছিল নাট্যরূপে তার জীবনের পূর্ণরূপ। জন্মের পর হতে রিসালাতের জিন্দেগি এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি অধ্যায় এতে সংযোজিত হয়েছে ঐতিহাসিক সত্যাসত্য অনুসন্ধানের নিরিখে।
উল্লেখিত নাটকে তিনি রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনকে প্রস্ফুটিত করেছেন বাচনিক ঢঙে। আজ হতে প্রায় শতাব্দিকাল পূর্বের এ প্রয়াস নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জিং একটি ব্যাপার ছিল। যে কারণে নাটকটি প্রকাশিত হবার পর গোটা দুনিয়ায় ঝড় ওঠে। রাসুল চরিতের পবিত্রতা রক্ষায় মুসলিম বিশ্ব এক কাতারে দাঁড়িয়ে সমকণ্ঠে এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। অবশ্য সে প্রতিবাদের ঢেউ বেশিদিন তরঙ্গায়িত হয়নি। রাসুলের জীবন নিয়ে রচিত ও প্রকাশিত এ নাটক বেস্ট সেলারের মর্যাদা পায়। আমরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাটকটির (আরবি মুদ্রণের) পরিচিতি উপস্থাপন করছি।
এক নজরে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাটক
নাটকের নাম                    : মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
নাটকের প্রকাশকাল          : ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ
নাটকের সাইজ                 : বুক সাইজ
নাটকের মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৮০ পৃষ্ঠা
নাটকের বিন্যাস      : একটি ভূমিকা, তিনটি অধ্যায় বা পর্ব ও একটি উপসংহার। ভূমিকায় আটটি দৃশ্য, প্রথম অধ্যায় বা পর্বে ছত্রিশটি দৃশ্য, দ্বিতীয় অধ্যায় বা পর্বে কুড়িটি দৃশ্য, তৃতীয় অধ্যায় বা পর্বে তেইশটি দৃশ্য এবং উপসংহারে আটটি দৃশ্যের অবতারনা করেছেন।
ভূমিকার মধ্যে আটটি দৃশ্য রয়েছে। দৃশ্যসমূহের শুরুতেই একটি বক্তব্য রয়েছে।
প্রথম দৃশ্যে কোনো এক রাত্রিতে মদিনার কতিপয় বিচক্ষণ ব্যক্তি নগরীর এক কাচারী ঘরে সমবেত। আকস্মিক তারা মদিনার আকাশে এক বিশেষ প্রোজ্জ্বল নক্ষত্র দেখতে পায়। তারা ইয়াহুদিদের ডেকে বলে- এই নক্ষত্রই তো আহমদ। যা আমরা তাওরাতে দেখেছি।
দ্বিতীয় দৃশ্যে মুহাম্মদের দাদা আব্দুল মুত্তালিব কাবার পাশে অবস্থানকালে এক রমণী এসে তাকে মুহাম্মদের জন্ম সংবাদ শোনায়। সংবাদ শোনামাত্রই নিদ্রায় দেখা তার এক অতিত স্বপ্ন স্মৃতিতে ভাস্বর হয়। তার মনে হয়- এ যেন তার দেখা সে স্বপ্নেরই প্রতিফলন। তার নিজ বর্ণনায় স্বপ্নটি ছিল এমন-
আমি কি এমন স্বপ্ন দেখিনি যে, আমার শরীরের পেছন অংশ হতে শিকলের মতো কী যেন বের হয়ে যাচ্ছিল। যার একপ্রান্ত ছিল আসমানে আর অন্যপ্রান্ত ছিল জমিনে। যার একপ্রান্ত ছিল প্রাচ্যে। অন্যপ্রান্ত ছিল প্রতীচ্যে। যেন তা বৃক্ষ সদৃশ। যার প্রতিটি পত্র-পল্লব ছিল আলোকিত। প্রাচ্য-প্রতীচ্যের সবাই যেন তার সাথে ছিল সন্বিষ্ট। সবাই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল।
তৃতীয় দৃশ্যে ছিল উকায মেলার চিত্রপট। হালিমার দত্তকে মুহাম্মদের স্থানান্তরের আনুপূর্বিক ঘটনাবলীর বর্ণনা। এখানে সকল বর্ণনার পাশাপাশি এক অলৌকিক ঘটনারও উল্লেখ করা হয়েছে।
চতুর্থ দৃশ্যে সিরিয়ার পাদ্রী বুহাইরার আশ্রমে কুরাইশি বাণিজ্য কাফেলার সাক্ষাতের বিবরণ রয়েছে। সে কাফেলায় মুহাম্মদও ছিল। এ সফরে মুহাম্মদের বিশেষ গুনাবলী ও অলৌকিকত্বের সুক্ষè সুক্ষè ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে যথা সতর্কতায়, আল-হাদিস আল-নববি ও সিরাতের বর্ণনার প্রতি লক্ষ্য রেখে।
ঐ সকল ঘটনার মধ্যে রয়েছে- বুহাইরা মুহাম্মদকে দেখেই চিনতে পারা, বুহাইরার সেবক নিসতাসকে তা জানিয়ে দেওয়া, বাণিজ্য কাফেলাকে বিরল বলে চিহ্নিত করা ইত্যাদি। কাফেলাকে ছায়দানকারী মেঘখণ্ড দেখেই বুহাইরা বুঝতে পারে এই ছেলেই হবে আগত নবি। মুহাম্মদকে দেখেই তার এ প্রতিতি নিশ্চিত হয়। মুহাম্মদের নানা বিষয়ে সে কাফেলার নেতা আবু তালিবের সাথে আলাপচারিতায় নিমগ্ন হয়। এ সব জিজ্ঞাসাবাদে মুহাম্মদ যে প্রতিশ্রুত নবি এ বিষয়ে আর কোনো সংশয় তার মধ্যে থাকে না। শেষত বুহাইরা আবু তালিবকে বলেন- শীঘ্র এই ছেলে নবি হবে। তুমি এই ছেলের প্রতি খেয়াল রেখ। কেউ যেন তার কোনো ক্ষতি করতে না পারে।
আবু তালিব বুহাইরাকে জিজ্ঞেস করে- নবি? নবি আবার কী?
বুহাইরা জবাবে বলেছিল- নবি তো সে যে আসমান হতে অহি পায়। জগতের মানুষকে তা জানিয়ে দেয়।
পঞ্চম দৃশ্যে কাবা গৃহের পূণ-নির্মাণের পরিপ্রেক্ষিতে ছোট-খাট নানান ঘটনার অবতারনা ও উল্লেখ করা হয়েছে। কাবা গৃহে হাজরে আসওয়াদ প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত জটিলতার শান্তিপূর্ণ নিরসনের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। সে সময় নজদের শাইখ সেজে শয়তান মক্কাবাসীকে ধোঁকা দিতে চাইলে আবু উমাইয়ার দূরদর্শিতায় এ যাত্রায় মক্কাবাসী তার হাত হতে রক্ষা পায়। মুহাম্মদের বুদ্ধিদীপ্ততায় মক্কাবাসী সন্তুষ্টি প্রকাশ করে।
ষষ্ট দৃশ্যে খাদিজার প্রত্যাশা ও পছন্দে মাইসারার প্রস্তাবে আবু তালিবের সম্মতিতে মুহাম্মদ খাদিজার বাণিজ্যিক কাফেলার সামগ্রিক দায়িত্ব গ্রহণ করে পরিবারের দৈণ্য ঘুচাতে সচেষ্ট হবার বর্ণনা এখানে রয়েছে। বাণিজ্য কাফেলার পরিচালনায় সঠিক নেতৃত্ব এবং দায়িত্ব পালনের সফলতায় নবি মুহাম্মদের সবিশেষ সাংগঠনিক প্রজ্ঞার স্ফুরন মক্কাবাসীর নজর কাড়ে।
সপ্তম দৃশ্যে ব্যবসায় ব্যাপক মুনাফা, মুহাম্মদের ব্যক্তিত্বে খাদিজার মুগ্ধতা ও তৎপ্রতি বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর প্রসঙ্গ আলোচনা করা হয়েছে।
অষ্টম দৃশ্যে নাফিসা কর্তৃক বিয়ের প্রস্তাব ও তাঁকে বিবাহের আগ্রহী করে তোলবার প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। মুহাম্মদের সাথে খাদিজার বিবাহের একটি ইতিবাচক পট তৈরী হয়েছে।
এভাবেই শেষ হয়েছে ভূমিকার আলোচনা।
এরপর শুরু হয়েছে নাটকের প্রথম পর্ব। এ পর্বে ছোট-বড় মোট ছত্রিশটি দৃশ্য রয়েছে।
প্রথম দৃশ্যে হেরা পর্বতের চিত্রায়ন, হেরা গুহায় মুহাম্মদের যাতায়াত, দীর্ঘ সময় অবস্থান, একাগ্র ইবাদাত ও অর্চনা, ধ্যানমগ্নতা, মানবতার মুক্তির পথ অন্বেষনে মুহাম্মদের পেরেশানি, আল্লাহর দূত জিবরিলের আগমন, শেষত প্রত্যাদেশ লাভ ইত্যাকার বিবরণে সমাপ্ত হয়েছে। প্রথম প্রত্যাদেশে অবতীর্ণ অহি ছিল এমন- اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ- خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ- اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ- الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ- عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ অর্থাৎ- পড়ো, তোমার রবের নামে। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাটবাধা রক্তপিণ্ড হতে। পড়ো, তোমার সম্মানিত রবের নামে। যিনি মানুষকে শিখিয়েছেন কলমের মাধ্যমে। যিনি মানুষকে শিখিয়েছেন যা সে জানত না। ৯৬: ০১-০৫;
দ্বিতীয় দৃশ্যে মুহাম্মদ আল্লাহর প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হয়ে সন্ত্রস্ত, প্রকম্পিত ও দুরু দুরু মনে বাড়ি ফেরা, উষ্ণতা রোধে কম্বল মুড়ি নেওয়া, মুহাম্মদকে খাদিজার পিতৃব্য ওয়ারাকা ইবনু নওফেলের কাছে নিয়ে যাওয়া ইত্যাকার বর্ণনার মধ্য দিয়ে এ দৃশ্যের সমাপ্তি হয়েছে।
ওয়ারাকা ইবনু নওফেলের কাছে খাদিজা ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলে ওয়ারাকা ঘটনার বিবরণ শুনে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন- এমন বিরল ঘটনা আমি কখনও শুনিনি। এমন অনবদ্য মানুষের আগমন কখনও প্রত্যক্ষ করিনি। হায়! যদি তার বিপদের সময় আমি বেঁচে থাকতাম তবে অবশ্যই তাকে যথাসাধ্য সাহায্য করতাম। এভাবেই শেষ হয় তৃতীয় দৃশ্যের অবতারনা।
পরের দৃশ্যসমূহে মুহাম্মদ খাদিজার গৃহে প্রত্যাবর্তন, মক্কার উপত্যকায় যাতায়াত, চাচা আবু তালিব, চাচাতো ভাই আলির সাথে কথোপকথন, আলির ইসলাম গ্রহণ, আবু বকর ও উসমানের সাথে সাক্ষাৎ, তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত পেশ, দাওয়াতের কর্মপন্থা অবলম্বন ইত্যাদির দৃশ্য অঙ্কন করা হয়েছে।
এ সময় আল-কুরআন আল-কারিমের একটি বিশেষ আয়াত অবতীর্ণ হয়। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সাফা পর্বতের পাদদেশে চিন্তামগ্ন ছিলেন। জিবরিল আমিন আলাইহিস সালাম অহিসহ আগমন করেন। অবতীর্ণ হয় নিম্নের আয়াতে কারমাখানি- وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ- وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ অর্থাৎ- তুমি তোমার নিকট আত্মীয়দের সতর্ক করো। আর মুমিনদের যারা তোমাকে অনুসরন করে তাদের প্রতি বিনম্র হও। ২৬: ২১৩-২১৪;
এরপর তিনি সাফা পর্বতের উপরে ওঠে ইসলামের দাওয়াত দেন। তৎপ্রতি সবাইকে আহ্বান করেন। সতর্ক করেন। আবু লাহাব দাওয়াতের বিরোধীতা করে। তার উদ্দেশ্যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুরা লাহাব তেলাওয়াৎ করেন-
تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ- مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ- سَيَصْلَى نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ- وَامْرَأَتُهُ حَمَّالَةَ الْحَطَبِ- فِي جِيدِهَا حَبْلٌ مِنْ مَسَدٍ-
এরপর পর্বত হতে নেমে পড়েন। এভাবেই শেষ হয় সপ্তম দৃশ্যের।
পরবর্তি দৃশ্যগুলোতে ইসলামি দাওয়াতের বিভিন্ন পর্যায়, পরিক্রমা, মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি, ইমানদারদের উপর নির্যাতন প্রভৃতি বিষয়ের অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও ঐতিহাসিক বিবরণ আল-হাদিস আল-নববি ও সিরাতের ভাষ্যের আলোকে বর্ণিত হয়েছে। মক্কার কাফিরদের নানান বৈঠক, সওয়াল জওয়াব, ইসলাম প্রতিহতকরণে কুরাইশদের অপকৌশল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দৃঢ়তা, কুরাইশদের অত্যাচারে মুসলমানদের হাবশায় হিজরত, হামজার ইসলাম গ্রহণ, উমরের আত্মসমর্পণ, আকাবার শপথ, হিজরতের পট তৈরী ইত্যাদি বিষয়ের নিখুঁত ইতিহাস উপস্থাপিত হয়েছে তেত্রিশতম দৃশ্য পর্যন্ত।
চৌত্রিশতম দৃশ্য হতে হিজরতের প্রস্তুতি, হিজরতোদ্দেশ্যে ইয়াসরিবের উল্টো পথে যাত্রা, গারে ছাওরে যাত্রা বিরতি, দুর্বিসহ কয়েক ঘণ্টা অতিক্রম, পুণরায় যাত্রারম্ভ, মদিনায় পৌঁছা এভাবেই ছত্রিশতম দৃশ্যের পরিসমাপ্তির মাধ্যমে নাটকের প্রথম পর্বের চিত্রায়ন শেষ হয়েছে।
এবারে নাট্যকার তাওফিক আল-হাকিম দ্বিতীয় পর্বে অনুপ্রবেশ করেছেন। এ পর্বেও কুড়িটি দৃশ্যের চিত্রায়ন রয়েছে।
ইতোমধ্যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা হতে ইয়াসরিব পৌঁছেছেন। মদিনার সকল আনসার আপন আপন বাহনে ইয়াসরিবের প্রবেশ তোরনে অপেক্ষমান। উদ্দেশ্য রাসুল মুহাম্মদকে সম্ভাষন জানানো। রাসুলকে দেখেই মদিনার নারী, পুরুষ, বালক, বালিকা সমস্বরে চিৎকার করে বলতে থাকে- এসেছেন আল্লাহর নবি! আল্লাহর নবি এসেছেন আমাদের মাঝে! নবি মুহাম্মদ মদিনায় পৌঁছেই এক টুকরো জমি কিনে একটি মসজিদ নির্মাণ ইত্যাদি দৃশ্যের সন্নিবেশ করেছেন এ পর্বের প্রথম ও দ্বিতীয় দৃশ্যে। তৃতীয় দৃশ্যে রাসুলের জুমআর ইমামতি ও খুৎবার এক চমৎকার বর্ণনা হাজির করেছেন ঐতিহাসিক বর্ণনার নিক্তিতে।
দ্বিতীয় পর্বের একাধিক অঙ্কে ততোধিক ঐতিহাসিক চরিত্রের উপস্থাপন করেছেন। সালমান ফারেসি, শাময়িল, বিলাল, ফানহাদ, হুছাইন, পাদ্রী ইত্যাদি। এ পর্বের তৃতীয় দৃশ্যে জনৈক পাদ্রীর সাথে রাসুলের এক চিত্তাকর্ষক বিতর্কের উল্লেখ করেছেন। যা যেকোনো পাঠককেই বিমুগ্ধ করবে।
পরের দৃশ্যগুলোতে মুহাজির আনসার সৌভ্রাতৃত্ব, নতুন ইয়াসরিবের পূণর্গঠন, ইয়াসরিবের মদিনা নামকরণ, মদিনা সনদ প্রণয়ন ইত্যাদি বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে। প্রথিতযশা নাট্যকার এবার ইসলামের যুদ্ধসমূহের নানান প্রসঙ্গ তুলে এনেছেন ইতিহাস ও সাহিত্যের ভিন্ন মাত্রিকতায়।
বদর যুদ্ধের প্রাণ শীতলকারী বর্ণনা, আবু জেহেলের নির্মম মৃত্যু, কুরাইশদের দম্ভ চূর্ণের প্রাণস্পর্শী বর্ণনা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাটককে সুউচ্চে আসীন করেছে। যুদ্ধ পরবর্তি সময়ে আয়েশার সাথে মুহাম্মদের মিষ্টি আলাপন, নির্মল রাত যাপন, সুমধুর খুনসুটির বর্ণনা দিতেও নাট্যকার বিস্মৃত হননি। একটি সফল নাটকের অনিবার্য কোনো উপাদানেরই কমতি হয়নি এ নাটকে।
একে একে সকল যুদ্ধের প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় অংশ বিধৃত করেছেন নাট্যকার বিভিন্ন অঙ্কে। উহুদ যুদ্ধে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিনদা শহিদ হামজার লাশের সামনে যে নির্মম উল্লাস ও কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন তার উল্লেখ করতে নাট্যকার ভুলে যাননি। কী দীর্ঘ ছিল চিৎকার ধ্বনি-
আজ তব সম্পন্ন হলো বদরের প্রতিশোধ
যুদ্ধের পর যুদ্ধ, তাতেই হয় প্রতিশোধের বধ
আমার জন্য তা অসহ্য, ছিল না ধৈর্যের বাধ।।
নয় আমার ভাই, নয় তার চাচা, কিংবা কন্যা মোর
প্রতিশোধ করেছি পূর্ণ, শান্ত তবেই আত্মা মোর
ওয়াহশি! তুমিই মেরেছ তাকে, পুরেছ তৃষা অন্তরের
কৃতজ্ঞতা ওয়াহশি তোমাকে, আমার জীবনভর
যবে না চূর্ণ হবে হাড্ডি আমার, সমাধির পর।।
উহুদের প্রান্তরে কুরাইশদের সবাই এ কবিতা আবৃত্তি করতে থাকে। বড্ড লোমহর্ষক ছিল সে দৃশ্য। হৃদয় বিদারক ছিল সে সকল শ্লোক।
এভাবেই প্রাণবন্ত করে তুলেছেন তাওফিক আল-হাকিম ধারাবাহিক সকল যুদ্ধের বর্ণনা। খন্দক, আহযাব, মুতা, হোনাইন, মক্কা বিজয়। নাট্যকারের সচিত্র বর্ণনায় মূর্ত হয়েছে প্রতিটি যুদ্ধ চিত্র।
এমনি করে কুড়িটি দৃশ্যের চিত্রায়নে সমাপ্তি টেনেছেন দ্বিতীয় পর্বের।
নাটকের তৃতীয় পর্বটি আগের দুই পর্ব অপেক্ষা ক্ষুদ্র। এ পর্বে তিনি তেইশটি অঙ্কের অবতারনা করেছেন।
এ পর্বের বিভিন্ন অঙ্কে ইফকের ঘটনার নাতিদীর্ঘ বর্ণনা, আব্দুল্লাহ ইবনু উবাই কর্তৃক রাসুলকে হত্যার ষড়যন্ত্র, ইসলামি দাওয়াতে আরবের বাইরে দূত প্রেরণ, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসলামের পরিচিতি ও দাওয়াত প্রেরণ, রাজন্যবর্গের ইসলাম গ্রহণ, ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টানদের সাথে বোঝা পড়া ইত্যাদি বিষয়ের নিখাঁদ বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন নাটকের ধাঁচে। ইতোমধ্যে পুত্র ইবরাহিমের মৃত্যু সংবাদে শোকাহত হন নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। মুসলমানদের মক্কা বিজয়ের অনবদ্য দৃশ্যের রূপায়ন ও চিত্রায়নের মাধ্যমে তেইশতম অঙ্কের পর্দা টেনে সমাপ্ত করেছেন তৃতীয় পর্বের সমগ্র বর্ণনা। ঘটনার শেষে নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেলাওয়াৎ করেছেন সুরা নাসর।
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ- وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا- فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا-
নাট্যকার তাওফিক আল-হাকিম নাটকের ভূমিকা পর্বের মতোই নাটকে যুক্ত করেছেন উপসংহার পর্ব।
এ পর্বেও নাট্যকার অঙ্কন করেছেন আটটি দৃশ্য। প্রকৃতই নাটকের এ ধারা অনুপম। এ পর্বে রাসুলের বিদায় হজ্জ শেষে মদিনায় প্রত্যাবর্তন, বিদায় হজ্জের ভাষণ, নবির অসুস্থতা ইত্যাদি বিষয়ের সুনিপূণ বর্ণনায় সমৃদ্ধ হয়েছে প্রথম থেকে ষষ্ঠ অঙ্ক।
সপ্তম অঙ্কে মৃত্যু শয্যায় রাসুলের স্বাভাবিকতা, তার উপলব্ধি, জাতির জন্য উৎকণ্ঠা প্রভৃতি বিষয়কে নাটকীয় বচনে একটি ইতিহাসকে জীবন্ত করে তুলেছেন নাট্যকার তাওফিক আল-হাকিম। শেষতম অঙ্কে সাহাবিদের গ্রুপে গ্রুপে জানাজার দুআর মাধ্যমে নাটকের যবনিকা টেনেছেন। নাটকের সর্বশেষ দৃশ্য ছিল এমন- আবু বকর ও উমর প্রাণস্পর্শী দুআয় নিমগ্ন। আর সমবেত জনতা চিৎকার করে একস্বরে একসাথে বলছিল- আমিন! আমিন!!
সংক্ষিপ্ত পরিসরে এই ছিল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাটকের দৃশ্যকল্প। এ নাটকের আরবি ভাষ্যের পঠন থেকে আমাদের নিশ্চিত উপলব্ধি এটি একটি সুখপাঠ্য নাটক। নাটকটিতে নাট্যচারিতা রয়েছে তবে তা কোনো অর্থেই ইতিহাসকে খাটো করে নয়। নাটকটিতে নান্দনিকতা রয়েছে তবে তা কোনোভাবেই আল-হাদিস আল-নববির প্রমাণিত কোনো ভাষ্যকে সুঁচবিদ্ধ করে নয়।
অন্যভাবে এই নাটকে ইতিহাস এবং আল-হাদিস আল-নববির সংশ্লেষ রয়েছে, রয়েছে তার উদ্ধৃতিও। তবে কোনো বিশ্লেষণেই তা নাট্য চরিত্রকে কলঙ্কিত করে নয়। এই অপূর্ব সক্ষমতার জন্যই তাওফিক আল-হাকিম এতটা জনপ্রিয় লেখক, কথা সাহিত্যিক এবং নাট্যকার।
এই নাটকের এক বিশেষ সম্মোহনী শক্তি রয়েছে। তাহলো- যে ব্যক্তি যতবার এ নাটক পাঠ করবে, অধ্যয়ন করবে, গভীর অভিনিবেশে এ নাটক নিয়ে চিন্তা করবে ততই তার ইমান বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এটি নাট্যকারের আন্তরিকতা এবং নির্দোষ নবি চরিত্রের অলৌকিকতা।
অদ্যাবধি নাটকটি কোথাও মঞ্চায়িত হয়নি। কোনো লিখা নাটক প্রমাণিত হবার জন্য তা আবশ্যকও নয়। তবে বাংলাভাষীদের এ নাটকের নাট্যরস আস্বাদনে এর যুৎসই অনুবাদ অতিব জরুরি। প্রবন্ধকার এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন ইতোমধ্যে। আমরা তার সক্ষমতার জন্য রবের দরবারে বিনম্র প্রার্থনা করি।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেঁচে থাকবেন তার সিরাতে, মাগাজিতে, শামাইলে, দালাইলে। তিনি বেঁচে থাকবেন তাকে নিয়ে লেখা গল্প, কবিতা, গান ও নাটকে। তিনি অমরত্ব লাভ করবেন তার নীতি ও পদ্ধতির অবিরত ও অব্যাহত অনুসরনে, অনুশীলনে। তার স্মরণ উচ্চকিত থাকবে কিয়ামত অবধি ও তারপরেও। তিনি অমরত্ব লাভ করবেন তার অযুত, নিযুত, বিলিয়ন ভক্তবৃন্দের অকৃত্রিম ভালোবাসায়। তার জন্য আমাদের হৃদয় নিংড়ানো ভক্তি মিশ্রিত উচ্চারণ- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.