শিশু-কিশোর সাহিত্যে শামসুর রাহমান ।। কাঞ্চনা চক্রবর্তী
শিশু-কিশোর সাহিত্যে শামসুর রাহমান
সেই বৈশিষ্ট্যটি অতি স্বচ্ছ, সহজ আর সরল।যাতে নেই কোন দুর্বোধ্যতা। যার ফলে তিনি সকল পাঠকদের কাছে সমাদৃত হয়েছেন। এক পরম মমতায় তিনি সাহিত্যের রাজ্যের ছবি এঁকেছেন। যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই এঁকেছেন স্বপ্নের ছবি। যে ছবি দেশের মানুষের কথা বলে, সাম্যের কথা বলে আর স্বাধীনতার কথা বলে। তাই তাঁকে স্বাধীনতার কবিও বলা হয়।
কবি শামসুর রাহমান তাঁর কাব্যচর্চ্চার সাধনা করেছেন একাগ্র চিত্তে ও পরম নিষ্ঠা ভরে। আর অর্জন করেছেন নিজের শ্রেষ্ঠত্বের স্থান। কবি ও সাহিত্যিক রাশেদ রউফ -এর মতে, “বহু দুর্গম ও কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে শামসুর রাহমান পৌঁছেছেন তাঁর গন্তব্যে। পরম নিষ্ঠা, সাধনা আর একাগ্রতার মাধ্যমে তিনি অর্জন করেছেন তাঁর অবস্থান। অলংকৃত করেছেন শ্রেষ্ঠ কবির মোহনীয় আসন। তাঁকে বলা হয় কাব্য দেশের রাজপুত্তুর। যদিও তাঁর রূপ ঝলসানো পোশাক ছিল না, কিন্তু তিনি ছিলেন আকর্ষণীয়। তাঁর ডানাঅলা পক্ষীরাজ ঘোড়া ছিল না, তবে উড়ে এবং ঘুরে বেড়ানোই ছিল তাঁর শখ। ” সত্যিই এই কাব্য দেশের রাজপুত্রের ডানাঅলা পক্ষীরাজ ঘোড়া ছিল না কিন্তু তাঁর কাছে ছিল কল্পনার ঘোড়া আর কলমের মত তরবারী। বাংলা সাহিত্যের সকল শাখায় যেমন কল্পনার ঘোড়াকে নিয়ে বিচরণ করেছেন তেমনি ছড়া সাহিত্যেও তিনি দিগ্বিবিজয়ী। তাঁর এই অবদান অসাধারণ মহিমায় অম্লান। শিশু কিশোরদের জন্য তিনি তাঁদের উপযুক্ত ছড়া ও কবিতা লিখেছেন। তিনি তাঁর কল্পনাতে সমাজচিন্তা, স্বদেশ ভাবনা ও প্রকৃতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।শিশুদের মনোজগতের ভাবনাকে তাঁর ছন্দের যাদুকরী মাধুর্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। সহজ সরল ভাষার রীতিতে ছন্দের মাধুর্যতায় সৌন্দর্যের অন্বেষা সৃষ্টিতে তিনি শিশুসাহিত্যে মাটি ও মানুষকে তুলে ধরেছেন। যা তাঁর সৃষ্টিকে শুধু আলোকিত করেননি এক মোহনীয় আকর্ষণে শিশুদের আবিষ্ট করে রেখেছেন। তাঁর ছড়ার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হল– আমাদের দেশের ঋতুর পট পরিবর্তন ও রাজনৈতিক এবং সামাজিক পট পরিবর্তনের ভাঙা গড়াকে তিনি সময়ের প্রয়োজনে বারবার ভেঙে গড়ে নতুন করে সাজিয়েছেন। তাইতো তাঁর শিশু সাহিত্য আমাদের বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারের এক অমূল্য সম্পদ।
শামসুর রাহমানের ছড়া ও কবিতার বই গুলি হল— ”এলাটিং বেলাটিং”, ”ধান ভানলে কুঁড়ো দেব”, “গোলাপ ফোটে খুকির হাতে”, ” আমের কুঁড়ি জামের কুঁড়ি ”, ” তারার দোলায় ”, ” লাল ফুলকির ছড়া ’’, ” দীপিকা ”,
কবি শামসুর রাহমান নিজের ছড়া সম্বন্ধে বলেছেন— ” ছড়ার সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক দিন পরে , যখন একটু বড় হয়েছি। ছেলেবেলায় যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ছোটদের লেখা ” হাসিখুশি ” বইটিতে হারাধনের দশটি ছেলে বিষয়ক একটি ছড়া পড়েছিলাম। তখন মনে পড়ে কেমন করেছিলো ছেলেবেলার জন্য। একটু বড় হতেই কত যে লোকজ ছড়া, ছেলেভোলানো ছড়া, রবীন্দ্রনাথ , সুকুমার রায়, অবনীন্দ্রনাথ , অন্নদা শংকর রায়, লীলা মজুমদার আরো অনেকের ছড়া পড়েছি আপন মনে। তখন থেকে ছড়া লেখার প্রতি আমার আগ্রহ। ছড়া লেখার মধ্য দিয়ে অনেক সময় সামপ্রতিক সময়ের ছড়া আমার মনে ঠাঁই করে নিয়েছে। শুধু বাস্তব ঘটনাবলীই আমার ছড়ার বিষয় হয়ে উঠেনি। কল্পনার রাজ্য বিচরণ করা অনেক কথাও আমার ছড়ায় উঠে এসেছে ”। শামসুর রাহমানের প্রতিটি লেখাতেই শিশুর মনের কথা যেন ফুটে উঠেছে। তিনি বাংলা শিশু সাহিত্যের নতুন ধারার স্রষ্টা। তাঁর ছড়ায় উঠে এসেছে স্বদেশ চেতনা, মাটি, মানুষ , ফুল, পাখি, নদী ও মুক্ত আকাশ ও শিশুতোষ ভাবনার বিভিন্ন চিত্রাবলী। যার ভাষা ছিল সহজ, সরল ও মৌলিক। তাঁর ছড়ায় ফুটে উঠেছে স্বদেশ প্রেমের চেতনা, আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন ও মহান ভাষা আন্দোলন । তিনি লিখেছেন —
ডালিম গাছে জল ঢেলেছে খুকুমণি কাল।
তোতা পাখি লেজ নাচাল, ডালিম গাছে মৌ
হঠাৎ দেখি ডুব দিয়েছে লাল শালিকের বৌ।
লাল -শালিকের বৌ এর মাথায় মুক্তো জমে ঐ
মুক্তো নিল হাওয়ার রাজা, আমরা চেয়ে রই। ”
আবার আমি যাবো আমার পাড়াতলি গাঁয়ে—-
” আজব দেশের ধন্য রাজা দেশজোড়া তাঁর নাম
বসলে বলেন, “হাঁটরে তোরা, চললে বলেন ” থাম ”।
(রূপকথা)
আমার ছড়ার এ- বই পড়তে দেবে তাঁদের,
ট্রেন চলেছে ট্রেন চলেছে ট্রেনের বাড়ি কই? ”
আলমারিটা তেমন নিঝুম কেবল তুমি নেই যে কাছে। ”
কেন যে হায় মাছ রাঙাটা এত্তো দূরে এলো
নদীর মায়া ছেড়ে এসে এখানে কি পেলো?
যেমন—
এখান থেকে অনেক দূরে / যদি আমি যেতাম উড়ে / প্রজাপতির মতো / কেমন মজা হতো? ”
নয়না তার দাদাভাইকে কাশতে দ্যাখে খকখক।
এই শহরে বেইলি রোডে এসেছে ভাই অনেক কাক—
ওদের কেউ মেরো নাকো বেঁধো না ভাই শক্ত জালে। ”
নয়কো মতি নয়কো পুঁতি, স্বপ্ন করে ফেরি।”
তাইতো তিনি বাংলা শিশু সাহিত্যের মহানায়ক। আবারও কবি রাশেদ রউফ -এর উদ্ধৃতি টানতে চাই। তাঁর মতে, ‘বিষয় বক্তব্যে বৈচিত্র্যে উপস্থাপনায় শামসুর রাহমানের ছড়াগুলো আমাদের শিশু সাহিত্যের উজ্জ্বল সম্পদ। তাঁর ছড়া যেমন শিশুদের ঘুম পাড়ায়, স্বপ্ন দেখায়, তেমনি ঘুম ভাঙায় এবং সামনে অগ্রসর হতে শেখায়। তিনি যেমন আমাদের সামগ্রিক সাহিত্যের এক গর্বিত পুরুষ, তেমনি আমাদের শিশুসাহিত্যেরও অহংকার।’

No comments