ফুলজানের মেয়ে ।। আমির হোসেন

 
ফুলজানের মেয়ে
আমির হোসেন
 
আয়! আয়! চুই চুই চু-ই-ই। আয়! আয়! এভাবে মাথা উঁচিয়ে টানা স্বরে সেই কালিসন্ধ্যা কাল হতেই হাঁসগুলিকে ডেকে যাচ্ছে কফিল উদ্দির পুতের বউ ফুলজান বেগম। অন্যান্য দিন ঘরে সন্ধ্যাবাতি জ্বালাবার আগেই হাঁসগুলি কাত কাত খাত খাত শব্দে করে কূর হতে বিরছার আইল বরাবর হেলে দুলে পর পর একটা লাইন করে বাড়ি চলে আসত। আজ ক‘দিন হল কূর লাগোয়া সামনের কূরচোরার লোঙ্গাতে জোয়ারের পানি এসেছে। কূরের পানি আর জোয়ারের পানি এখন মিশে একাকার হয়ে গেছে। নতুন পানিতে স্রোতের কারণে কূরের আবদ্ধ কচুরি পানাগুলি বিচ্ছিন্ন ও বিশৃঙ্খলভাবে সারা লোঙ্গায় ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু কিছু পানা ছোবা ছোবা আকারে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভেসে ভেসে দক্ষিণের ডাঙ্গিতে গিয়েও পড়েছে। এ সময় কখনো কখনো পাতি হাঁসের দল দিগি¦দিক শূন্য হয়ে ভাসমান পানার সাথে ভাসতে ভাসতে ডাঙ্গির মোহনা দিয়ে একেবারে পাগলি নদীতে চলে যায়। সন্ধ্যা হলে তখন আর ওদের ফিরে আসার কোন সম্ভাবনা থাকে না। পথভ্রান্ত হয়ে হয়তো পাগলির কিনারে গিয়ে পানার ভটির (স্তুপ) উপর বা তীরে উঠে পাট ক্ষেতের আইলের কাছে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। তখন চারিদিক হতে ঘনিয়ে আসে আঁধারের প্রলেপ। শেয়ালবহা পাগলির তীরে ছুঁচো, ধাড়ি ইঁদুর, কাঁকড়া ইত্যাদিকে ধরে খাওয়ার আশায় বের হয় শেয়ালের ঝাক। পঞ্চবটির শ্মশান কিংবা নদী তীরের বড় কবরস্থানের ঝোপ-ঝাড়ের গর্ত থেকে সন্ধ্যা হতে না হতেই বের হয়ে আসে ওরা। সারা দিনমান গর্তের মধ্যে দিবানিদ্রায় শায়িত থাকে। সন্ধ্যার পর পরই গর্তের মুখের কাছে দাঁড়িয়ে কান দুটি হরিণের কানের মতো খাড়া করবে। এদিক সেদিক তাকিয়ে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ অবলোকন করবে। এরপর মাথা উঁচিয়ে ঝাকের সকল সদস্য কোরাসে হুক্কা হুয়া কুয়া কুয়া স্বরে তাদের অস্তিত্বের জানান দিবে। শেষে খাদ্যের সন্ধানে পাগলির তীর ধরে হাঁটতে থাকবে বুধি শেয়ালে দল। তখন পুরো পাগলির তীর জুড়ে ওদেরই রাজত্ব। আর সে সময় যদি কচুরি পানার সাথে ভেসে আসা হাঁসের পালকে সামনে পায় তবে কি আর রক্ষা আছে। সামান্যতম প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ব্যতিরেকে ঝাপিয়ে পড়ে গলা কামড়ে ধরে টেনে হিঁচড়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাবে। তারপর মনের সুখে খেয়ে সাবার করে ফেলবে পুরো পালটিকে। একমাত্র আল্লাই জানেন বিধবা ফুলজান বেগমের হাঁসগুলির ভাগ্যে আজ কি ঘটেছে! হাঁসগুলিকে হারানোর আশু সম্ভাবনা বা আশঙ্কা যেন একটা কালোছায়া হয়ে নেমে আসে ফুলজানের সামনের শূন্য মাঠের দিগন্তে। সহসাই তার মনের ভেতর দিয়ে কিঞ্চিত একটা যন্ত্রণাকাতর হাহাকারের সুর করুন রাগিনী বাজিয়ে কালিসন্ধ্যার মগ্ন বাতাসে ভর করে শূন্যের দিকে উড়ে যেতে থাকে ছায়াটি। কিন্তু সহজে নিরাশ হয় না ফুলজান। তার অবচেতন মন নিরাশ হতে দেয় না তাকে। তাই ভাবনাকাতর মনে আবারও আশার সঞ্চার করে লাগাতার স্বরে ডাকতে থাকে-আয়! আয়! আয়! চুই চুই চু-ই-ই। আয়! আয়!
বার কয়েক ডেকে কান পেতে উৎকর্ণ হয়ে হাঁসের আগমন বার্তা শোনার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে ফুলজান। কিন্তু হাঁসগুলির কোন সারা শব্দ মেলে না আশে পাশে। সন্ধ্যার আবছা ভাবটার উপর ইতোমধ্যেই অন্ধকারের একটা হালকা-ঘন আবরণ কালো পতাকার মতো নেমে এসেছে। পিছনের পাড়াটা কখন যেন অস্পষ্টতায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তার দৃষ্টি সীমা থেকে। কি করবে ফুলজান! বাড়ির দিকে চলে যাবে! নিজের অজান্তেই মনের মধ্যে বিকল্প একটা কিঞ্চিত আশার সঞ্চার করে সে। হাঁসগুলি কি আজ অন্য কোন পথ দিয়ে ততক্ষণে বাড়ি চলে গিয়েছে? কিভাবে যাবে? কূর বা লোঙ্গা হতে বাড়িতে যাওয়ার জন্য তো আর বিকল্প কোন পথ বা রাস্তা নেই। একবার তার মেয়ে রাজিয়ার উপর তার দুর্ভাগ্যজনিত সমস্ত রাগগুলি জমাটবদ্ধ হয়ে ফুলে উঠে ফুলজানের। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে কটমট করে আবছা আলো-আঁধারির ভেতর বির বির করে নিজের মেয়েকে উদ্দেশ্য করে অশ্লিলভাবে গালাগাল দিতে থাকে সে-রাখ আজগা বাড়ি গিয়া লয়। তাইর শাওয়াডা যুদি আজগা আমি না ভাঙছি। মাগির ঘরের মাগি। ঝিয়ের ঘরের ঝি। দিন দিন বুড়ি অইতাছে না তাইয়ে ঘুড়ি অইতাছে। অত বড় ডাঙ্গর মাইয়া তাইয়ে তাইর নাঙ্গেরার লগে পাড়া বেড়াইয়া আশ মিটে না। সারাডা দিন ড্যাং ড্যাং কইরা মাগির খালি হাইছ-কোণা ঘোরা আর পাড়া বেড়ানো। বাপছাড়ার ঝিয়ের ঘরের মইদ্যে যে ভাতের জায়গায় ফেনও জুডে না সারাদিন হেই খবর ত তাইর নাই। বুন্নির ঘরের চুন্নির ঝিয়ে যুদি বির”ালি থাইক্কা হাইঞ্জা অইবার আগে বাচ্চাওয়ালা ছাগলডারে পেট ভরাইয়া খাওইয়া বাড়ি নিয়া আইত। তাইর আন্ধা দাদাডারে লাঠিত ধইরা ঘরে আইন্না হাইঞ্জা চেরাগডা ধরাইত। তাইলেই ত আমি হাঁসগুলিরে সয়-সবারে কূর থাইক্কা ডাইক্কা বাড়িত নিয়া আইতে পারতাম। মরার ঝাকে যে তাদের কোন নাঙ্গের বাইত গিয়া উঠছে কেডা জানে। নাকি মরবার লাগি ভাসতে ভাসতে ডাঙ্গি দিয়া পাগলিতে গিয়াই পড়ছে আল্লা মালুম। তাইলে ত সব কইডা অকালে যাইব হিয়ালের পেডে অই। এসব কথা ভাবতে ভাবতে ফুলজান শেষ বারের মতো অভ্যাসবসত স্বরে ডেকে উঠে- চুই চুই চু-ই-ই। আয়! আয়!
চুই চুই ডাক শেষ হতে না হতেই লোঙ্গার পাড় দিয়ে আলপত ধরে এগিয়ে একেবারে ফুলজানের কাছাকাছি চলে এসেছে জমির আলী। সারাদিন তার দাওয়ালরা প্রায় ডুবে যাওয়া বোরো ধান কেটেছে। শেষ বিকালে ধানের মুড়িগুলি লোঙ্গার পাড় ঘেষে আইলের মধ্যে বাথি দিয়ে রেখেছিল। সেগুলির উপর পাতলা পাতলা দুই চার ছোবা কচুরি পানা ছড়িয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরছিল জমির আলী। ফুলজানের চুই চুই ডাকের শব্দরেখা লক্ষ করেই এদিক চলে এসেছে সে। তার উদ্দেশ্য যে ভাল না একথা অনেক দিন আগে থেকেই জানে ফুলজান। তার স্বামী শাহাবুদ্দি মারা যাবার পর হতেই কোন না কোন ছলে ফুলজানের সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করে আসছে সে। বিশেষ করে তার শরীরের প্রতি জমির আলীর আগ্রহের কথা অজানা নই ফুলজানের। আর আজ তো তার একেবারে পোয়াবারো অবস্থা। পাড়া থেকে এতদূরে এ অন্ধকারের মধ্যে লোঙ্গার পাড় ফুলজানকে একা পাওয়া যেন জমির আলীর জন্য বেহেস্তি মেওয়া হাতে পাওয়া।
তখনও জমিরের আগমন টের পায়নি ফুলজান। তার মনের সমস্ত অংশ তখন হাঁসগুলিকে খুঁজে পাওয়া-না পাওয়ার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় ভরপুর। একেবারে তার গা ঘেষে এসে দাঁড়াল জমির আলী। কম্পিত স্বরে বলল, কেডা গো তুমি কফিল চাচার পুতের বউ না। হাঁসগুলি বুঝি আজ এখনো বাড়ি ফিরে নাই। আহারে আলিক্কির ঝাকে না আবার কচুরি পানার ছোবার সাথে ভাসতে ভাসতে ডাঙ্গি পাড় হইয়া পাগলিতে চইলা গেছে!
জমির আলীর আগমন হেতু হঠাৎ ছেবরা খেয়ে উঠে ফুলজান। অন্ধকারের ভেতরই সহসায় ব্লাউজবিহিন শরীরের অনাবৃত অংশটুকু রং ওঠে যাওয়া ফিকে ধূসর শাড়ির আঁচলে ঢাকার চেষ্টা করে সে। তারপর বলে, জ্বি ভাইছাব। আমি ফুলজান। রাজিয়ার মা। দেখেন না আমার শেষ সম্বল হাঁসগুলি আজ অহনও বাড়ি ফিরে নাই।
হাঁসগুলি যে তোমার শেষ সম্বল সে কথা কি আর আমি বুঝি না ফুলজান। তোমার কষ্ট যে আমি সইতে পারি না হেই কথা কি আর আমি তোমারে কম কইছি। হাঁসগুলি না পাইলে তোমার যে কষ্ট আরও বাড়বে হেই কথা আমার থেকে বেশি আর কেডা জানবে। তই কপালের ফের না যায় খন্ডান। কপাল খারাপ না অইলে কি তোমার মতো ভরা যৌবনের সুন্দরী মাইয়া মানুষের শইলে এমন অকালে সাদা শাড়ি ওডে। তোমার এ বিধবা বেশ যে আমি একেবারেই সইতে পারি না একথা ত আমি তোমারে অনেক বারই জানাইছি। তুমি তোমার মনের সাথে বুঝাপড়া কইরা কুলাইয়া উঠতা পার নাই। হেইডা কি আর আমার দোষ। তই অহন আর এই আন্ধাইরের মইদ্যে দাঁড়াইয়া ডাকাডাকি কইরা লাভ নাই। কথায় আছে না-‘যা আছিল কপালে, কাইড়া নিছে গোপালে।’  অভাবের সংসার তোমার। যদি সত্যিই হাঁসগুলি বেদিশা অইয়া হারাইয়া গিয়া থাকে তই তুমি আর কি করবা। চিন্তা কইর না। আমি ত আছি। ট্যাহা পয়সা যা যখন দরকার লাগে কইও। চালামুনে। ফেরত দেওয়া লাগবে না। তুমি আমার প্রস্তাবডা একবার ভাইববা দেইখ্য খালি। একথা বলে মওকা বুঝে ফুলজানের একটা হাত ধরে টান মেরে তাকে একেবারে নিজের শরীরের সাথে প্রায় মিশিয়ে নেয় জমির আলী। এরপর বলে,  চল ফুলজান। বাড়ি চল।
-হাত ছাইড়া আডেন ভাইজান। আমার দুর্ভগ্যের কপাল না হইলে কি আর আপনার ভাইয়ে এমন অকালে এক্সিডেন কইরা মরে।
-এ দুর্ভাগ্যরে দুর্ভাগ্য ভাইববা সারা জনম কষ্টের জীবন যাপন করা বুদ্ধিমানের কাম না ফুলজান। এ জন্যই তোমারে আমার প্রস্তাবডার কথা ভাইববা দেখবার কথা আমি আবারও কই। তুমি ত জান আমার এত বড় গিরস্তি। বছর জুইড়া ভাডির বোরা জমি,  উজানের সব সবজি ক্ষেত। এরপর আবার গ্রামের সরদারি-মাতাব্বরি। মেম্বার সাব ত অহন আমারে ছাড়া বুঝেই না। এসব কথা ত তোমরা সবাই জান অই। আমারে ছাড়া কি গ্রামের কোন বিচার-আচার অহন অয়? অত বড় সংসার আমার। তার উপর তোমার ভাবিছাবের কথা কি কইতাম। হের অইছে গিয়া বছইরা খাঞ্জা। বছর বছর ছেলে-মেয়ের বিয়ান শেষে আইসটা শইলে তার বাসা বানছে সুতিকা। হুগাইয়া অইছে কাট্টা। এ কঙ্কাল শইল নিয়া আমারে সময় দিবার তার না আছে ফুসরৎ না আছে তার শইলের কোন হেকমত। এতগুলি কথা বলতে বলতে জমির আলী পথ হাঁটছে ঠিকই কিন্তু তখনও হাত ছাড়েনি ফুলজানের। যদিও এরই মধ্যে বেশ ক‘বার মৃদু আপত্তি জানানোসহ তার হাত হতে ছাড়া পাবার চেষ্টা চালিয়েছে ফুলজান। জমির আলী যেন ফুলজানের সে আপত্তির কথা শুনতেই পায়নি বা হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টাটা টেরই পায়নি এমন ভাব করেছে সারাক্ষণ। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে একেবারে কফিল উদ্দির বাড়ির বিরচালির কাছে চলে এসেছে তারা। ফুলজান হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, আপনে বাড়ি যান ভাইছাব। লোকে দেখলে শরম অইব। বড় রকমের কেলেঙ্কারি অইয়া যাইব। গ্রামে মুখ দেখাইতে পারুম না।
হ ফুলজান আমি এখন বাড়ি চইলা যামু ঠিক অই। তই আমার প্রস্তাবডার কথা তোমারে আমি আবারও মনে করাইয়া দিয়া যায়। গভীর ভাবে ভাইববা দেইখ্য। জীবন মানুষের একটা অই। জীবনভর কষ্ট করার কোন মাইনে অই না। ফুলজান জমির আলীর এসব কথার কোন উত্তর না দিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। জমির আলী ফুলজানের চলে যাওয়া পথের দিকে কিছুক্ষণ নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে থেকে নিজের বাড়ির পানে কিছুটা জড়িয়ে যাওয়া কদমে হাঁটতে থাকল।     
অন্ধকার রাত। ছন উঠে যাওয়া চাল জোড়ার নিচে পাটখড়ির ভেরার ঘর। ঘরের মেঝেতে ভাঙ্গা চাটায়ের উপর তেল চিট চিটে বালিশের মধ্যে শুয়ে অনেক্ষণ ধরে এপাশ ওপাশ করছে ফুলজান বেগম। ঘুম আসছে না তার। মনের বারান্দা দিয়ে খঁচ খঁচ শব্দ তুলে বারবার আসা-যাওয়া করছে কেবল তার হাঁসগুলি। আহারে কত কষ্ট কইরাইনা কুরছি মুরগিডারে মাসাধিকাল খাঁচায় বসাইয়া রাইখা চৌদ্দডা হাঁসের ডিম ফুডাইয়াছিল ফুলজান। মুরগিডা হুগাইয়া আঞ্জিলা অইয়া গেছিলগা। এরপর রিপু চিলে থাবা মাইরা নিয়া গেল চাইরডা বাচ্চা। আর বাকি আছিল দশডা। হেই সময়ও ঘরের এ নডি বিডিরে কইছি, দেখ নডি বেডি আসের বাচ্চাগুলারে যেন কোন ভাবেই চিলে ছোবল মাইরা নিতে না পারে হেদিকে খেয়াল রাখিছ। নডি বেডির হে দিকে খেয়াল থাকলে কি আর চাইরডা বাচ্ছা দুষ্টু চিলে ছোবল মাইরা নিয়া যাইতে পারে। আর আইজ ত তুলেমূলেই গেল। এজন্যই নডির ঝিয়ের শাওয়াডার মইদ্যে দিছি ক‘ডা গুতা। গুতা খাইয়া বাপছাড়ার ঝিয়ে অহন কানতে কানতে না খাইয়া অই ঘুমাইছে। খাইছ বাপছাড়ার ঝি। কই থাইক্কা তর খাওন আইয়ে দেখুমনে। তর নাঙ্গেরা নি তরে খাইতে দে হেইডা আমি দেখুম। মনে মনে দশ বছরের মেয়ে রাজিয়ার উদ্দেশ্যে এসব অশালিন-আবক্তালি ছেড়ে এপাশ ওপাশ করছে ফুলজান। নিজেও রাতে কোন কিছু মুখে দেয়নি। সাত বছরের ছেলে রাজুও আজ না খাইয়া অই ঘুমাইছে। বুকের ভেতরটা কেবল ছ্যাত ছ্যাত করে জ্বলতেছে ফুলজানের হাঁসগুলির জন্য। চোখে ছানি পড়া তার শ্বশুর কফিল উদ্দিও বেড়ার ওপাশে খুক্কুর খুক্কুর করে কাশছে। কাশিটা মনে হয় আইজ একটু বাড়ছে অই বুইড়া বেডার। মরার কাশি বেডারে কবরে নিয়া অই ছাড়ব মনে অইতাছে। 
হাঁসগুলি নিরুদ্দেশের দিন হতে শুরু করে টানা তিনদিন তিনরাত ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি হল। রাত শেষে প্রতিদিন সকালে খোয়ার থেকে দশটি ডিম পাতিলে তুলে রাখত ফুলজান। আগামীকাল ভোরে খোয়ারটি শূন্য পড়ে থাকবে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে আর এপাশ ওপাশ করতে করতে কখন যেন দু‘টি চোখের পাতা তার এক হয়ে গিয়েছিল কি না আর তখনই পাটখড়ির ফাঁক দিয়ে হু হু করে ঝড়ো বাতাস প্রবেশ করছিল ফুলজানের ঘরে। কিছু বুঝে উঠার আগেই বাতাসের প্রবল বেগে হঠাৎ করে উড়ে গেল তার ঘরের এক অংশের পুরানো ছানি। উড়বে না কেন? শাহাবুদ্দি মারা যাবার পর তো ঘরের চালে নতুন ছন আর লাগাতে পারেনি ফুলজান। ঘরখানিও ঝড়ো হাওয়ার প্রবল ধাক্কায় নড়ে উঠল কয়েকবার। বাঁশের পুরানো খুটিগুলি মটমট করে উঠল। আর ছন উড়ে যাওয়ায় বাকি রাতটুকু উল্লা পানি খেতে খেতে নির্ঘুম কাটিয়ে দিতে হল সেসহ তার পরিবারের চারটি প্রাণির। কাথা-বালিশ ভিজে একাকার হল। রাত তখন প্রায় শেষের পথে যখন ফুলজানের মনে পড়ল রশিঘর লাগোয়া গোসালাঘরে বেধে রাখা দুধেল ছাগলটির কথা। মনে হতেই আশঙ্কার আরেকটি কালোছায়া পাখা বিস্তার করে দ্রুত বেগে পাড় হয়ে গেল তার মনের বারান্দা। বিপদ যখন আসে তখন নাকি চারদিক থেকে সমানেই আসে। এমন ঝড়ের রাতে তো সারা রাতই ছাগলটির উচ্চ স্বরে মে মে করে ডাকা ডাকি করার কথা। গোসালা থেকে তো ছাগলের কোন শব্দই কানে আসছে না। কেবল ছোট বাচ্চা দুটির ক্ষীণ স্বরে মে-এ-এ, মে-এ-এ শব্দ শোনা যাচ্ছে। দ্রুতলয়ে ফুলজান চোখ মুখ কচলাতে কচলাতে গিয়ে গোসালা ঘরের বেন্দা দিয়ে আটকে রাখা উলুছনের দরজার পাটিটি খুলে ফেলল। ভেতরে প্রবেশ করে যা দেখল তা দেখে তার নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে কষ্ট হল। প্রতিদিন যে ছাগলটি আধসের-তিনপোয়া দুধ দেয় সে ছাগলটি পা চারটি সামনের দিকে ছড়িয়ে দিয়ে মরে পড়ে রয়েছে। গলার রশিটি তখনো খুঁটির সাথে বাঁধা। চক বাজারে বিক্রির দুধ যেন না খেতে পারে সে জন্য অদূরে উগার (সামান্য উঁচু মাচা) তলে বেধে রাখা ক্ষীণ স্বরে মে মে মে-এ করে যাচ্ছে বাচ্চা দুটি। দুই হাত মাথায় দিয়ে গোসালা ঘরের আইতনা পিড়ায় লেট্টা দিয়ে বসে পড়ে কুয়ান তুলে কাঁদতে লাগলে ফুলজান। ততক্ষণে বাইরে ঝড় খানিকটা থেমেছে। আশপাশের ঘর হতে দুই একজন জা-বুবাইরা এসেছে। শুভাকাঙ্ক্ষি হয়ে শান্তনা দিতে থাকল তারা। বিপদে দৈর্য হারা হইতে নাই ফুলজান। নসিবে তর যা আছিল তা-ই অইছে। বিপদ-আপদ আল্লাই দেয়। আবার আল্লাই আছান করে। বাল্লা তর মালের উপর দিয়া গেছে। জানের উপর দিয়ে গেলে কি করতি? গিয়ে দেখ একরাতের ঝড়-তুফানে ডাঙ্গির পানি বাইড়া গেছে পাঁচ আত। যা আমরার বাপ-দাদার চৌদ্দ গুতেও দেখি নাই। তর সবজির বির”ালিতেও এখন আডু(হাঁটু) পানি। বুঝতে পারে ফুলজান, তার পুইশাকের, ডাটাশাকের ও দেড়শের বির”ালিটা ডুবে গেছে জোয়ারের পানিতে। যা থেকে কিছু কিছু সবজি প্রতিদিন সকালে দুধ-ডিমের সাথে দিয়ে রাজিয়া ও রাজুকে পাঠাত গ্রামের চক বাজারে। আল্লার বাল্লা একরাতের মধ্যেই ফুলজানকে নিঃশ্ব করে দিয়ে গেছে এ কথা আর বুঝার বাকি নেই কারোর।
তিনদিন ধরে চলল থেমে থেমে ঝড় ও বৃষ্টি। চুলাতে আগুন জ্বলল না বললেই চলে। রান্নাঘরের লাকড়িগুলি ভিজে কেমন দমে গেছে। চুলার আশপাশটা স্যাতচার পানিতে ভিজে একাকার। পাতিলের ভেতর রাখা কতগুলি মুড়ি ছিল, সেগুলিও পুতাইয়া গেছে। পুতানো মুড়িগুলি বুড়া শ্বশুর ও ছেলে-মেয়ে দুটিকে নিয়ে চিবিয়ে খেয়েছে ফুলজান। ছাগলের বাচ্চা দুটিকে ভাতের ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বাশি মাড় ছিনাই দিয়ে কুড়িয়ে কুড়িয়ে খাইয়িছে। কিন্তু শেষ রক্ষা করা গেল না।
 
তিনদিন তিনরাত উনা-উপোষে কাটাবার পর একেবারে নেতিয়ে পড়েছে ফুলজান। ছোট ছেলেটার দিকে তাকানো যাচ্ছে না। ছাগলের দুধ, হাঁসের ডিম আর বির”ালির সবজি চক বাজারে বিক্রি করে যে ক‘টি কড়ি ঘরের মারুলের সাথে টাঙানো শিকেয় রাখা ঢুলিতে জমিয়েছিল ফুলজান, সে টাকা ক‘টি এই ক‘দিনে সামান্য চাল-ডাল ও কেরোসিন তেল কিনতেই শেষ হয়ে গেছে। বৃদ্ধ শ্বশুরের ঔষধ শেষ হয়ে গিয়েছে। আয় রোজগারের সব পথই তো বন্ধ হয়ে গেল তার। কি দিয়ে চলবে ঘরের চারটি প্রাণির পেট। চালে ছন লাগাবে কোথা থেকে। উপায়হীন কিংকর্তব্যবিমূঢ় চোখে সাগর দেখতে পায় ফুলজান। আর সে সাগরের জলের উপর ভেসে আসতে দেখে খড়কুটোর মতো কিছু একটা। এ খড়কুটোটা কি জমির আলী! মুহূর্তেই তার কাছে মনে হয় সেটা খড়কুটো নয়, বিষাক্ত সাপের মতো কি যেন একটা ফণা তুলে এগিয়ে আসছে তার দিকে। পরক্ষণেই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের আভা কেটে গিয়ে পরিস্কার হয়ে যায়। সে খড়কুটোটা আর কেউ নয়, সেটা জমির আলী ভাইছাব। যিনি কালিসন্ধ্যার পর লোঙ্গার পাড়ে তার হাত চেপে ধরে বার বার বলেছিল, ট্যাহা-পয়সার কাম লাগলে আমারে জানাইও ফুলজান। আমি যে তোমার কষ্ট কোন ভাবেই সইতে পারি না। আর আমার প্রস্তাবডাও একবার ভাইববা দেখ্যও।
এসব কথার সত্যি-সত্তা এখন পুঙ্খানুরূপে ভাববার বা যাচাই করার সময় কোথায় ফুলজানের। ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’। এই গদ্যময় জগতে এত সাত-পাঁচ ভেবে বসে থাকলে চলে না। পেটের জ্বালা যে ভীষণ জ্বালা। এ জ্বালার যন্ত্রণাকাতর পরিস্থিতিতে যে পড়েছে তার কাছে ইজ্জত-সম্মান তখন গৌণ হয়ে যায়। পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে উঠে ঝলসানো রুটি। তাই নিজে ছাড়াও ঘরের আরো তিনটি প্রাণির মুখের দিকে তাকিয়ে জমির আলীর বাড়ির দিকে পা বাড়ায় ফুলজান। জমির আলী ফুলজানকে বৈঠক ঘরের চকিতে বসতে দিয়ে হাসি হাসি মুখে বলল, তাহলে তোমার মনে এতদিন পর সুবুদ্ধির উদয় হয়েছে বুঝি ফুলজান? দুনিয়াতে বাঁচার জন্য এত পথ খোলা থাকতে অভাবের যন্ত্রণায় কষ্ট করে মরার মতো এমন নির্বদ্ধিতা আর নেই। তুমি নির্বোধ নও। আজই আমার কাকরল ক্ষেতে কাজে লাই¹া যাও। সকাল-বিকাল কাকরল ফুলের পরাগায়ন ঘটানো, কাকরল পেড়ে সংগ্রহ, করলা, শশা সংগ্রহসহ সবজি বাগানের যত্ন-আত্নীর জন্য ত তোমার মত একজন লোকের আমার দরকারই। ভালই বেতন দেব তোমায়। চারজনের সংসারে খাইয়া-পইড়া বাঁচতে কোন অসুবিধা অইব না তোমার। তুমি কাজের ফাঁকে ফাঁকে আড়ালে আবডালে আমার দিকে একটু আধটু নজর রাইখ্য কেবল। কইছিলাম না। তোমার ভাবিছাব ত আর পারে না। ওই শুকনা খাটাসটা দিয়ে কি আর জীবন চলে। আমার জীবন-যৌবনের খাদিমদারীর জন্য দরকার তোমার মতো খুবসুরৎ ও যৌবনবতী মেয়ের। বলে বেহায়ার মতো দাঁত বের করে হাসতে থাকে জমির আলী। এরপর ঘরের মাচাং-এ রাখা বাক্স থেকে একটি পাঁচশ টাকার নোট বের করে এনে ফুলজানের হাতে গুজে দেয়ার অছিলায় হালকা করে একটি চাপ দেয় এবং বলে, তোমার একমাসের বেতন অগ্রিম দিলাম। আগে ত চাল-ডাল কিন, উড়ে যাওয়া চালে নতুন ছন লাগাও। তারপর না কাজ। এর পরও ট্যাহা-পয়সা নিয়া তুমি কোন চিন্তা কইর না। লাগলে আরো দিমু।
পাঁচশত টাকার নোটটি হাতের মুটোই চেপে ধরে রেখে অনুরোধের স্বরে বলে ফুলজান, ভাইছাব একটি কথা কইবার চাইছিলাম।
-আবার কি কথা?
-আমি চাইছিলাম কি।
-কি চাইছিলা?
-না চাইছিলাম, আমার রাজিয়ার ত এখন বয়স দশ পার হইয়া এগারতে পরেছে। ঘরে আমার শ্বশুর ত চখে দেখতে পায় না। পাড়াতে কত ইতর-বখাটে ছেমরা পোলাপান আছে। এক পাড়া থেকে আরেক পাড়া কাম করতে আইয়া পড়লে সোমত্ত মায়াডার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করতাছি।
-আমি ত আর সবজির বাগানে দুইজনেরে কাজে লাগাতে পারুম না।
-না ভাইছাব অরে আপনার কোন বেতন-মজুরি দিতে অইব না। হেই এমনি এমনিতে আমার সাথে থাকব।
এমনি এমনি থাকব, এ কথাতে মনে মনে মুখ বাঁকা করে ভেংছি কেটে স¦গতোক্তি করল জমির আলী। মনে মনে ভাবল, এ মেয়ে ত তার মায়ের কাছে ফেউ-এর মত লেগে থাকবে। তখন আড়ালে-আবডালে ফুলজানের শইলের স্পর্শ-স্বাদ কেমনে গ্রহণ করবে সে। আবার ভাবে, একথাতে যদি রাজি না হয়ে তাহলে যদি কামে যোগ না দেয় ফুলজান। সেসব হিসেব-নিকেশ করে নিমরাজি হয়। বলে, ঠিক আছে ফুলজান তুমি বাগানে কাজ করবা আর তোমার মেয়েটা না হয় মাঝে মাঝে বাগানে এবং মাঝে মাঝে বাড়িতেও কাজ করবে। তোমার ভাবিছাবের ফুট-ফরমাইশ শুনবে।
ফুলজান কাজে যোগ দেওয়ার পর জমির আলীর সবজির বিক্রি-বাট্টা আরো বেড়ে গেল। এতবড় বাগানের সব সবজি তো আর গ্রামের বাজারে বিক্রি করা সম্ভব হয় না। তাই প্রতিদিন ভ্যান গাড়ি করে দূরের গঞ্জের হাটে নিয়ে যায় জমির আলী। ফুলজানের বেতনের টাকা-পয়সা দেওয়া ছাড়াও বাগানের দু‘একটি সবজিসহ এটা-সেটা উপহার হিসেবে দেয় জমির আলী। এভাবে জোড়াতালি দিয়ে কোন রকমে চলে যাচ্ছিল ফুলজানের সংসার। কিন্তু তার শরীরের প্রতি লোভটা জমির আলীর দিন দিন বেড়েই চলছে। তার হাত হতে নিস্তার পেতে একেকবার কাজটি ছেড়ে দেবার কথা ভাবে ফুলজান। কিন্তু কাজ ছেড়ে দিলে চলবে কেমন করে? আবার ভাবে জমির আলী যদি রাজিয়ারও সামান্য একটা বেতন ধরত তাহলে কয়েক মাসের মধ্যেই তার সংসারের নিত্য খরচ মিটাইয়া কিছু টাকা জমাইতে পারত। জমানো টাকা দিয়া ছনের ঘরটি ঠিক করে আরেকটি দুধেল ছাগল কিনতে পারলে, বির”ালির জমিটাতে একচালা মাটি ফেলতে পারলে ও কয়েকটি হাঁস কিনতে পারলেও ত আগের মত খুড়িয়ে খুড়িয়ে হলেও চলতে পারত। তখন জমির আলীর সবজি ক্ষেতের হাড়ভাঙ্গা কাজ ছেড়ে দিতে পারত। আর জমির আলীর লোভের কবল থেকে নিজের ইজ্জত-সম্মানও বাঁচাত পারত।
ফুলজানের ভাবনার কথা কি বুঝতে পেরেছে কি না জমির আলী কে বলবে? পরের দিন কাজে গেলে জমির আলী ফুলজানকে একটি নতুন প্রস্তাব করে। সে তার মেয়েটিকেও একটি নির্ধারিত বেতন দিতে চায়। তবে এমনি এমনিতে না। প্রতিদিন সবজির ভ্যান নিয়ে তো জমির আলীকে একা একা গঞ্জের হাটে যেতে হয়। একা একা ক‘দিক সামলানো যায়? বিক্রিত সবজির মাপা-মাপি ও টাকা-পয়সা গুনে নেয়ার সময় ভিরের মধ্যে ভ্যানের দিকে খেয়াল রাখতেও তো একজন লোকের দরকার। বাজারের মিন্তি-কুড়ানী-টোকাইগুলি যে হাড়ে হাড়ে বজ্জাত। চোখটা সামান্য এদিক সেদিক হলেই দেখা যাবে বজ্জাতের হাড্ডিগুলি একটি করলা, পটল বা কাকরল ছুঁয়ে মেরে নিয়ে ঢুকিয়ে ফেলছে সাথে রাখা থলেতে। সেক্ষেত্রে ফুলজানের মেয়ে রাজিয়া সাথে থাকলে এসমস্ত চোর-চামাড়দেরও খেয়াল রাখতে পারবে এবং ততক্ষণাৎ সামান্য ফুট-ফরমাইশও করতে পারবে। রাজিয়াকেও দেখা গেল তার জমির চাচার সাথে ভ্যানে চড়ে সবজি বিক্রি করতে গঞ্জে যেতে আগ্রহ আছে। সব দিক বিচেনা করে ফুলজানের কাছে জমির আলীর এ প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্যই মনে হল।
প্রতিদিনকার মতো গঞ্জের হাটে সবজি বিক্রি করে রাজিয়াকে ভ্যানে বসিয়ে বাড়ি ফিরছিল জমির আলী। তবে সেদিন যেন ইচ্ছে করেই সবজির বিক্রি-বাট্টা শেষ করতে দেরী করছিল সে। তার দেরী দেখে দু‘একবার তাগাদাও দিয়েছে রাজিয়া। বড় কাকা আজ যে অত দেরী করতাছেন, বাড়িত যাইবেন কোন সময়? গঞ্জের মধ্যেই দেখি হাইঞ্জা অইয়া যাইতেছেগা।
অত বাড়ি বাড়ি করিছনাত ছেড়ি। ধমক দেয় জমির আলী। বাড়িত কি আমরা না গিয়া থাহুম? এ বাজারে কি থাহার জায়গা আছে? বাড়িত ত যাইমু অই। ধমক খেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে রাজিয়া। শেষ পর্যন্ত ভ্যান নিয়ে যখন তারা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয় তখন সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে আসছে। ঈশান কোণে কালো এক ফালি মেঘ জমতেও দেখা গেল। এরপরও জমির আলী অন্যান্য দিনের মতো এত দ্রুত গতিতে ভ্যান চালাল না। তার মধ্যে যেন বাড়ি ফেরার কোন তাড়াই নেই। কেবল গরিমসী। কেমন উদাসিন মন নিয়ে পেডেলে পা রাখছিল সে। ইতোমধ্যেই ঈশান কোণের কালো মেঘের খন্ডটি আরো ঘন হয়ে ধেয়ে আসতে থাকলো ঝড়ো হাওয়া হয়ে। দিগন্তজোড়া মাঠের মধ্যে বাতাসের শু শু শব্দ। সামনে পিছে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। রাজিয়া ক্ষীণ স্বরে বলল, বড় কাকা আমার ভয় করছে। ঝড় বাড়তে থাকলে আমরা বাড়ি যাইতে পারব ত।
-ভয় কিরে? আমরা কি আর এই মাঠের মইদ্যে রাত কাটাব? বাড়িত ত যাইম্ ুঅই। তই চল এখন রাস্তার পাশে বামদিকের ডিপ মেশিনের পরিত্যাক্ত ঘরটাতে ঝড় কাটার আগ পর্যন্ত কিছুক্ষণের জন্য আশ্রয় নেয়। ঝড় কেটে গেলেই আবার ভ্যান চালাইয়া বাড়ি চইলা যামু। রাজিয়া জমিরের কোন কথার উত্তর দিল না। কেবল ভীতু চোখে তাকিয়ে থাকল। সিজন শেষে ডিপ মেশিনের মেইন যন্ত্র-পাতি ইস্কিম ম্যানেজার খুলে নিয়ে গেছে। ছোট্ট ঘরটির দরজাটিতেও কোন তালা দেয়া ছিল না। জমির আলী কেবল জিআই তারের বাধন খুলে ঘরটিতে আশ্রয় নিল। ঘরটির একটি পাশে মাটি দিয়ে উঁচু করা এক চিলতে স্থান। সিজনে এ স্থানটিতে ডিপের লাইনম্যান রাত্রি যাপন করে। এ স্থানটিতে একটি পরিত্যাক্ত ছলার চট বিছিয়ে বসে জমির আলী। রাজিয়াকেও বসায়। তারপর কোমরের টাকার খুতি হতে একটি পাঁচশত টাকার নোট রাজিয়ার হাতে গুজে দিয়ে বলে, নে রাজিয়া তুই না একটি দুধেল ছাগল কিনবি। লাগলে আরো দিব। তই টাকাটা অহনই তর মাকে দেখাস না। সাবধানে ঘরের কোন ঢুলিতে লুকাইয়া রাখবি। এসব বলতে বলতে ততক্ষণে রাজিয়াকে এক প্রকার নগ্ন করিয়েই ফেলছে জমির। বাইরে ঝড়ের বেগও বেড়েছে বিস্তর। ঝড়ের বেগের সামনে যেমন গাছ-পালার বাধা ধোপে টিকতে পারেনা তেমনি জমিরের শরীরের ঝড়ের কবলেও বিধ্বস্ত হয় রাজিয়া। কোন প্রকার বাধাই নিরস্ত করতে পারে না জমিরকে। সে কেবল রাজিয়াকে বলতে থাকে, কইছি না তরে আরো ট্যাহা দিমু। তুই কেবল এসব কথা কারো কাছে প্রকাশ করিস না। ততক্ষণে রাজিয়ার কিশোরী শরীরের ভেতর দিয়ে বইয়ে যাচ্ছিল যন্ত্রণামিশ্রিত অনাস্বাদিত আনন্দের তির তিরানির অজানা একটি স্রোত। দ‘চোখ বন্ধ করে রাখা রাজিয়ার মুখ দিয়ে অস্পষ্ট শব্দে কেবল গোঙানির স্বর শোনা যাচ্ছিল। আর সামান্য পর পর হেচকির মতো করে ঢোক গিলে যাচ্ছিল। তার এ ঢোক গিলা কি আনন্দের না কষ্টের তা বুঝতে পারছিল না জমির। জমির যখন রাজিয়ার কিশোরী শরীর-রাজ্য জয় করে দ্বিগি¦জয়ী মহাবীর আলেকজান্ডার তখন বাইরেও ঝড়ের বেগ কমে এসেছে। রাজিয়া উঠে দাঁড়িয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল, কাকা রাইত অইয়া যাইতেছে না। মায়ে ত বকাবকি করবে। ঠিক অই কইছস। আর দেরী করা যাইব না। তর মারে কইবি আমরা ত সন্ধ্যার সাথে সাথে অই ফিরতাম। ঝড়-তুফানের কারণে নে দেরী অইছে। বলে রাজিয়াকে আদর করে ভ্যানের উপর বসিয়ে পেডেলের উপর জুড়ে জুড়ে চাপ দিতে থাকল জমির আলী।
দিন যায়। রাত আসে। এমন করে চোরের ঘাটে নৌকা বেধে সাত-আটটি মাস পার করেছে ফুলজান বেগম। তার শরীরের প্রতি টানটাও যেন কিছুটা কমে এসেছে জমির আলীর। ফুলজান তার পুরানো স্বপ্নে বিভোর হয়। ছনের ঘরটি মেরাতম করা, একটি দুধেল ছাগল, দশ-বারটি পাতি হাঁস, বির”ালিতে সবজির চাষ ইত্যাদি কত কথা। এমনি একদিন বিকেল বেলা রাজিয়াকে দেখা গেল রান্না ঘরের সামনে হঠাৎ বমি করতে। রাজিয়ার এ অসময়ে বমি করাকে স্বাভাবিক মনে হয়নি ফুলজানের কাছে। রাতের খাবার সময় তাকে এ অস্বাভাবিক বমি করার বিষয়ে সন্দেহের কথা বলে জিজ্ঞেস করে ফুলজান। প্রথমে সত্য-মিথ্যার আশ্রয়ে সত্য কথাটি এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলেও প্রকৃত সত্যটা বের করে আনতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি ফুলজানকে। চুলের মুটি ধরে ঘরের ভেতর টেনে হিচড়ে এলোপাতাড়ি উষ্টা-লাতি মেরে অকথ্য-অশালীন ভাষায় গালাগাল দিয়ে যখন পা দিয়ে মুখের উপর চেপে ধরল তখন বের হল আসল কথাটি। এক হাতে চুলের মুটি টেনে ধরে আরেক হাতে থুতনীর উপর চেপে ধরে বলল, ক’ হারামির বাচ্চা নডির ঘরের নডি, তুই কোন সময় তর কোন নাঙ্গের লগে ঘুমাইছস। ঘুমাইয়া পেডের মইদ্যে কার বা””া বাজাইছস? হারামজাদি বেশ্যা মাগি তুই তর বংশের মুখে চুন-কালি মাখাইছস। তরে অহন তর কোন নাঙ্গে বউ বানাইব? এলোপাতাড়ি মার আর টর্চারের মুখে ভ্যান গাড়ি করে গঞ্জ থেকে ফেরার পথে ঝড়ের সন্ধ্যায় জমির আলীর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার সবিস্তার বর্ণনা করল রাজিয়া। সব শুনে স্তদ্ধ হয়ে গেল ফুলজান। যে জমির আলীর এত দিনের নজর ছিল তার নিজের শরীরের উপর। তার হাত হতে নিজের ইজ্জত-সম্মান বাঁচাতে কত কৌশলই না করতে হল তাকে। লুইচ্চা জমির আলী তুই ফুলজানকে না পেয়ে নজর দিলি ফুলজানের মেয়ের শরীরের দিকে!  অবশেষে ইজ্জত লুটলি তার কিশোরী মেয়ে রাজিয়ার। রাগে দুঃখে ক্ষোভে সারা শরীরে কাঁপন উঠল ফুলজানের। হাঁপাতে হাঁপাতে আবারও চুলের মুটি ধরে টান মেরে ঘাড়-গলায় চেপে ধরল রাজিয়াকে। বলল, ক‘ হারামির বাচ্চা এমন কাম করতে তুই কেমনে রাজি অইলি? মার খেতে খেতে রক্তাক্ত রাজিয়া বলল, আমি রাজি অই নাই মা। আমারে জমির কাকা অতগুলি ট্যাহা দিয়ে কইল আরো ট্যাহা দিব, কারো কাছে যেন না কই। কইলে আমার এবং তোমার দুই জনেরই কাজ বন্ধ কইরা দিব। তখন রাগের যন্ত্রণায় হিতাহিত জ্ঞান শক্তি যেন লোপ পেয়ে গেল ফুলজানের। ঠোঁট-মুখ বাঁকা করে বলল, অ ট্যাহার লাগি তুই ছড়াইয়া দিতে গেলি বেশ্যা বেডি। নিজের জীবনডার চিন্তা একবার অ করলি না। কই তর ট্যাহা? আন দেখি তর বেশ্যাগিরির ট্যাহা কই রাখছস। রাজিয়া আহত ও রক্তাক্ত নাক-মুখ নিয়ে গিয়ে ঢুলির ভেতর গোপনে লুকিয়ে রাখা টাকার পুটলিটা তার মায়ের হাতে দিল। ফুলজান বেগম পুটলি খুলে দেখল সেখানে পাঁচ হাজারেরও উপরে টাকা আছে। টাকা গুণে হাতের মুটিতে ধরে সৃষ্টিকর্তার প্রতিও কেমন বিরক্ত হয়ে ওঠে। আক্ষেপ করে বলে, আল্লারে আল্লা তুই বুঝি এইরকম দুর্ভাগ্যের লেখা লেইখ্যা রাখছিল আমার কপালে। তুই কি পারতি না আমরা মা-মেয়ের জন্য সৎ পথে একটি কাজের ব্যবস্থা কইরা দিতে? শ্রষ্টার ওপর তার আক্ষেপ ঝেড়ে পরে মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলে, নে পেটলাগানির ঝি। ট্যাহা পাইয়া যখন লুই জমিরার লগে পেট লাগাইয়া পেট বাজাইছস। তই দুই একদিনের মইদ্যেই তরে লইয়া গঞ্জে যামু। সেইখানে হাসপাতাল অইতে তর এই ট্যাহা দিয়া তর পেট খসাইয়্যা আনুম গিয়া।
এরপর আর রাজিয়াকে মার-দরও করল না, বকা-বাদ্যও করল। কেবল উপুর হয়ে শুয়ে বালিশের উপর মাথা রেখে হু হু করে কান্নায় ভেঙে পরল ফুলজান বেগম। সকালে কাকের কা কা শব্দে আর মানুষের শুরগোলে ঘুম ভাঙল ফুলজানের। বায়মুখে পড়নের এলোমেলো কাপড় ঠিক করতে করতে পশ্চিমের মোল্লা বাড়ির পুকুরের উত্তর পাড়ের গাব গাছটির নিচের ভীর ঠেলে এগিয়ে গেল ফুলজান। দেখতে পেল গাব গাছের পাতার অন্ধকারের দিকে মুখ করে ঝুলে আছে রাজিয়া। গলাই পেঁচানো ওড়নাটার চাপে কামড়ে ধরা জিহবাটা তার বের হয়ে আছে খানিকটা।

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.