রুপালী জোছনার কালো ছায়া ।। হাসান রুহুল

 


রুপালী জোছনার কালো ছায়া
হাসান রুহুল
 
যাবে যাবে করে এখনো বই মেলায় যেতে পারেনি সৌরভ। আজ মেলার শেষ দিন। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ মেলায় যাবেই। শুক্রবার। অফিস ছুটি থাকায় ব্যস্ততা কম।
জেলা প্রশাসন ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের যৌথ আয়োজনে বগুড়া খেকন পার্কচত্বরে জমে উঠেছে একুশের বই মেলা। এই মেলাকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন প্রকাশ পাচ্ছে নতুন নতুন বই। বিকেল তিনটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত পাঠক ক্রেতা ও দর্শক গিজ গিজ করে মেলা প্রাঙ্গণে। পাঠক লেখক ও প্রকাশকের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে এই বই মেলা।
বিকেলে হেঁটে রওনা দেয় সৌরভ। রেল লাইনের পথ ধরে আজিজুল হক কলেজ ক্যাম্পাসের সামান দিয়ে কামারগাড়ি হয়ে সোজা পথে হর্কাস মার্কেটের ভিতর দিয়ে সাতমাথায় চলে আসে সে। পত্রিকা স্টলে কয়েকটি  দৈনিক কাগজ পড়ে চলে যায় খোকন পার্কের বই মেলায়। ফুটপাত দিয়ে অনেক বুকস্টল বসেছে। চিরকুট বুকস্টল সাজিয়েছে শৈল্পিক আঙ্গিকে। তাদের কালেকশনে নতুন কবি লেখকদের বই বেশি। তারা নিজেরাও প্রকাশ করেছে কয়েকটি বই। স্টলগুলোতে উপচে পড়া ভীড়। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া মেয়েরা বেশী । তাদের পিছনে ঘুর ঘুর করছে দুষ্ট ছেলেদের দল। স্টলগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছে সৌরভ। আল-মাহমুদের ‘কবির আত্ম্ন বিশ্বাস’ বইটি কিনে নেয় সৌরভ।
শহিদ মিনার মঞ্চ সাজানো হয়েছে নান্দনিক ভাবে। আছে আধুনিক মিউজিক আর লাইটের ব্যবস্থা। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন তাদের পরিবেশনা উপস্থাপন করছে সাধ্য মত। সৌরভ অনুষ্ঠান দেখার জন্য পার্কে ঢুকল।
আমরা ক জন শিল্প গোষ্ঠির নৃত্য শিল্পরা সুন্দর ভাবে নৃত্য পরিবেশন করছে। খুব ভাল লাগছে। সবাই এক তালে ঢেউয়ের মত বাতাসে যেন দুলছে। প্রজাপতির মতো রঙিন পাখা মেলে উড়ে যাবে নীল আকাশের কোন অজানায়। এর পর মঞ্চে আসে কণ্ঠসাধন আবৃত্তি সংসদ। মেয়েরা পরেছে ফেরোজা রঙ্গের শাড়ি আর ছেলেরা সাদা পাঞ্জাবী। অপূর্ব লাগছে। সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা দিয়ে শুরু করল “ আমি জন্মেছি বাংলায় ”এত সুন্দর ভাবে বিভিন্ন কবিতা গ্রন্থনা করেছেন ভাবতেই অবাক লাগে। স্ক্রিপ্ট রাইটার ও নির্দেশক শরীফ মজুমদারকে মনে মনে ধন্যবাদ দিয়ে বাসার উদ্দ্যেশে রওনা দেয় সৌরভ।
প্রতিদিনের মতো আজ কাজের চাপ নেই। শুক্র শনিবার দুই দিন অফিস ছুটি। সৌরভ জামিলনগরের একটা ফ্ল্যাটে একাই থাকে। বাসার কাজসহ রান্নার কাজ সে নিজেই করে। আধুনিকের ছোঁয়ায় রান্না এখন অনেক সহজ হয়েছে। রাইচ কুকারে ভাত উঠিয়ে দিয়ে বেলকোনীতে বসে সাযীদ আবু বকরের ‘কাগজ কুসুম’  কবিতার বই পড়ছিল। রসায়ন বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে জারণ-বিজারণ, ইলেকট্রন বিণ্যাস, পর্যায় সারনী, আর বিক্রিয়ার সীমা ছেড়ে এখন সাহিত্য রসের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে সৌরভের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ, ড. রফিক রইচ, ও কবি এ কে আজাদ এরাই উৎসাহের প্রাণ কেন্দ্র। বইটির পাঁচটি কবিতা শেষ না হতেই বিদ্যুৎ চলে গেল। কখন যে আসবে তার ঠিক নেই। ক্ষুধায় সৌরভের পেট ঁেচা ঁেচা করছে। তাই  চার্জার অন করে তরকারী কাটাকুটা শুরু করে সে। সৌরভ সব কাজ কমফরটেবলী করে কিন্তু মাছ আর পিঁয়াজ কাটার সময় তার অবস্থা খারাপ। অবশেষে বিদ্যুত এলো। রাতের খাবার খেয়ে সৌরভ লেখা-লেখির কাজ করে। এছাড়া সময় সে সময় পায়না।
 
ছোটবেলা থেকেই লেখা-লেখির  অভ্যেস আছে সৌরভের। সম্পাদককে কথা দিয়েছে আগামীকাল ভোরে লেখা  ই-মেইল করবে। তাই মনোযোগ দিয়ে দ্রুত একটি গল্প কম্পোজ করছে। সৌরভ ইদানিং সেল ফোন সাইলেন করে রাখে। ঘড়ির কাটা রাত বারোটা ছুই ছুই করছে । মোবাইলের কল লাইট জ্বলছে , তাজকিয়ার ফোন।
      - আসসালামু আলাইকুম। স্যার কেমন আছেন?
      - আলহামদুলিল্লাহ, ভাল আছি।
      - এখনো জেগে আছেন। আমি ভাবছিলাম ঘুমাচ্ছেন।
     - একটু কাজ করছিলাম, কালতো অফিস নেই দীর্ঘক্ষণ ঘুমানো যাবে। আচ্ছা এখন বলেন এই গভীর রাতে কেন ফোন করেছেন ? অফিসের কোন কাজের প্রবলেম। কাজ বুঝতে কোন সমস্যা হচ্ছে?
     - আরে না কাজ বুঝে নেওয়ার জন্য সারা দিন অনেক ডির্স্টাব করি তাই বলে কি এই দ্বি প্রহর রাতেও....। আজ সারা দিন অফিসে খুব ব্যাস্ত ছিলেন, আপনার নিকট যেতে ভয় লাগছিল তাই যাইনি। কেমন আছেন? এই আরকি ।
     - আপনি হয়তো এই কয় দিনে ভালো ভাবেই বুঝে গেছেন যে বৃহঃপতি আর রবিবার কাজের চাপ বেশি থাকে। কিছ ুদিন যাক, যখন দায়িত্ব কাধে এসে পরবে তখন আপনিও ঠিক বুঝবেন ব্যাংকের চাকুরি কেমন আজব প্যারার চাকরি ।
    -   যাই হোক মি. সৌরভ এতো রাত জেগে কি করছিলেন?
    - “শীত কালের  বিদায়ী ঘন্টা আর ঋতুরাজ বসন্তের আগমনের পদধ্বনির আওয়াজে কানপেতে আছে সবাই। দিনের সব কাজের শেষে ক্লান্ত মানুষ সব রাতের কোলে পরম মমতায় ঘুমাচ্ছে। শ্রান্তির বুকে মাথা রেখে বিশ্রামরত সকল ব্যস্ততা,  এমন কি রাতও নিজেকে সপে দিয়েছে ঘুমের বুকে। মাঝে মাঝে প্রহরী কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ আর্তনাদের সুর হয়ে বাতাসে ভাসছে। থেমে গেছে সব কোলাহল। স্তব্ধ-শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। এই পোড়া দুই চোখে ঘুম আসে না। দ্বি-প্রহর রাত, চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে নব যৌবনা যুবতীর রূপের মতো। বসন্তের আগমন বার্তায় হৃদয় আঙিনায় নেচে উঠে আনন্দের মৌরি। ফাগুনের মৃদু হাওয়া জানালার ফাক দিয়ে এসে দেহে পরশ বুলায় আর হৃদয়ে ছড়িয়ে দেয় রোমাঞ্চ। যৌবিক শিহরোণে জেগে উঠে মনের আঙিনা। ফাগুনের মাতাল হাওয়ার হাতছানি যৌবনের অপ্রতিরুদ্ধ অগ্নিশিখা আরো প্রজ্জ্বলিত করে তুলছে। মনের ভেতর  শুরু হচ্ছে নানা রঙের জলের ঢেউ। যৌবন সেতো নিষিদ্ধের নেশায় মাতাল। চারদিক থেকে ইশারায় ডাকে ভয়াল সর্বগ্রাসী অন্ধকার জগতের অলিগলিগুলো। ছাব্বিশ বসন্তে অনাহারী যৌবনের দেহ খোঁজে তার ক্ষুধার্তের রঙিন আহার। অবগাহন করতে চায় কোন নবীয়সীর খরস্রোতময় দেহের ভাজের প্রপাতের জলে। রক্তের অসম ছুটাছুটির তাড়নায় বেহায়া এই মন হুট করে বসে উলট-পালট কান্ড। যৌবনের পাগলা ঘোড়ার লাগাম যায়না টেনে ধরা।”
একটা গল্প কাল সকালেই জমা দিতে হবে। এতোক্ষণ যা বলছি সেই গল্পের অংশ বিশেষ। গল্পটা কম্পোজ করছিলাম। এ কথা বলে সৌরভ থামে। ওপাশ থেকে তাজকিয়া বলে।
-              গুড, ভেরী গুড। সুন্দর হয়েছে। চালিয়ে যান। চর্চা অব্যহত রাখেন। আরো ভালো হোক, আরো পাঠক প্রিয়তা পাক আপনার গল্প। আমি কিন্তু আগে থেকেই আপনার গল্পের পাঠক। খুব ইচ্ছা ছিল আপনাকে দেখার। কারন, আপনি লেখায় চলমান বাস্তবতাকে তুলে ধরেন। যখন পড়ি লেখার ভেতর ঢুকে যাই। আমার মনের কথাগুলোই বলছেন। তখন গল্পের চরিত্র জীবন্ত হয়ে উঠে। গল্পের কাহিনী হৃদয় ছুঁয়ে যায়। কী সৌভাগ্য আমার যাঁর লেখা পড়ে দেখার জন্য মন আকুপাকু করছে এখন তাঁর সাথেই জব করি। ভালো লাগে, আপনার মতো পাঠক প্রিয় কথাসাহিত্যিকের কলিগ হতে পেরে। যাইহোক, আপনাকে ফোন দেওয়া সার্থক হলো। এখন ঘুমাতে যান। গুড নাইট।
সৌরভ তাজকিয়াকে গুড নাইট দিয়ে আবার লেখায় মনযোগি হল। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে ব্যাংক ম্যানেজমেন্টে এমবিএ করে তাজকিয়া এখন সোনালী ব্যাংক বগুড়া কর্পোরেট শাখার লোন এন্ড রিক্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সিনিয়র অফিসার। একই ব্যাংকের একই শাখার বৈদেশিক বাণিজ্য বিভাগের ইনচার্জ সৌরভ। অনেক দিন থেকে বগুড়ায় আছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন শাস্ত্রে লেখা পড়া শেষ করে  সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্ম জীবন শুরু করে সোনালী ব্যাংকে। কর্মদক্ষতা আর সততার গুণে অল্প সময়ে বেশ সুনাম অর্জন করে সৌরভ।
 খুব ঝামেলায় আছে তাজকিয়া। ক্লাইন্টগুলো খুব ধান্দাবাজ। ঋণ পরিশোধ করতে চায় না। আজকাল ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এদের মধ্যে রাঘব বোয়ালের সংখ্যা বেশী। যারা ভালো মানুষের মুখোশ পরে দেশ পরিচালনা করছে। তারাই ঋণ খেলাপির শীর্ষে। ব্যাংকগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ সরকারী ব্যাংকের অবস্থা আরও খারাপ। ব্যাংক চুরি, ডাকাতি, লুট, কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায় রেমিট্যান্স আত্মসাত ইত্যাদি অনিয়ম দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিছু লোকের জন্য আজ সরকারী ব্যাংকের এই অবস্থা। তাই গ্রাহকরা প্রাইভেট ব্যাংকের দিকে বেশী ঝুকছে।
তাজকিয়া বলে
-              সৌরভ স্যার, আমি বড় সমস্যায় পরেছি। এই ফাইলগুলো দেখেন, কী অবস্থা। অনেক ইনফরমেশন গ্যাপ , কী ভাবে লোন পাশ হল বু     ঝতে পারছি না।
সৌরভ ফাইলগুলোতে চোখ বুলিয়ে তাজকিয়াকে বলে, কী আর করবেন ম্যাডাম। দুই নাম্বার কাজ। ঘুষ বাণিজ্য। এর মধ্যে অনেক কাহিনী আছে যেভাবে চলছে সে ভাবে চলতে দেন। কিছু করতে গেলে চাকরিতো যাবে যাবেই সাথে জীবন নিয়ে টানা টানি। কিছুই করার নেই। উপর মহলকে ম্যানেজ করে এসব কুকাজগুলো করে তারা। ইচ্ছা করলে পদক্ষেপ নেয়া যায় না । পেটের দায়ে মুখ বুজে  সহ্য করতে হয়।’
     -  একটা আবেদন করতে পারি?
    - এভাবে বলছেন কেন? অফিসে এসেছি কাজের জন্যে। এখানে সবাই সবইকে কাজে সহযোগিতা করবে। এটাই স্বাভাবিক।
      - আপনি কি কাজ ছাড়া কিছু বোঝেন না? অন্য কথাও তো থাকতে পারে।
      - তা ঠিক বলছেন। আচ্ছা বলেন। আপনার জন্যে আর কি করতে পারি?
     - আগামীকাল শুক্রবার বিকেলে দয়া করে সাতমাথায় আসবেন। কোনো রেষ্টুরেন্টে আড্ডা                    দেওয়া যাবে।
আর দেরি না করে এ কথা বলে তাজকিয়া তার রুমে চলে গেল।
সৌরভ বাসায় এসে ভাবতে থাকে এই ভাবে তাজকিয়া কোন দিনও আসতে বলেনি। কারনটা কী ? সৌরভ মনভুলা টাইপের। এই জন্যে তাকে কেউ কেউ ভোলানাথ বলে ডাকে।
আজ দুপুর থেকে মাথার ভেতর ঘুরপাক করে চিন্তাগুলো তাজকিয়া কেন ডাকলো।
সৌরভের সেল ফোন বেজে উঠে। ওপাশ থেকে তাজকিয়া বলে
-              সৌরভ সাহেব আপনি কোথায়?
আসতেছি বলে সৌরভ ফোন কেটে দেয়।
 
আকবরিয়া প্লাসে বসে দু’জন আড্ডা দিচ্ছে। এমন সময় তাজকিয়া টিপনি কেটে বলে মেয়েরাতো সব সময় দেরী করে আর ছেলেরা সব সময় আগে আসে। আপনি তার উল্টো। আজ আমার বার্থ ডে। তাই আপনাকে ডেকেছি।
‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’ বলে সৌরভ বলল,
-              এই কথা আগে বললেই হতো। তাহলে তো..। আর কোন কথাই বলতে দিলনা তাজকিয়া। আসলে স্টাফদের মধ্যে আপনাকেই বিশ্বাস করি
চাঁদোয়া স্নাত মনোমুগ্ধকর রাত। রূপালী আলোয় চক চক করছে পৃথিবী। গ্রীল ধরে বাহিরের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সৌরভ। ঘটে যাওয়া স্মৃতিগুলো হৃদয়পটে ভেসে উঠছে অবিরাম। সৌরভ ভাবে - ‘আমি কেন তাজকিয়াকে মিস করি। তাকে না দেখলে মনটা আনচান করে উঠে। ছুটি নিয়ে বাড়িতে গেলে ভালো লাগে না। তার ব্যবহার, কথা বলার ধরন, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, নতুন পরিবেশে ম্যাচ হওয়া এবং উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা সো মাচ কিউট। দিন দিন আমি ওর প্রতি দূর্বল হচ্ছি। এভাবে চলেেল তো মনের সমস্যা আরো প্রোকট হয়ে উঠবে। না, তা হতে দেওয়া যাবে না । যে ভাবেই হোক নিজেকে কন্ট্রোল করতে হবে।’
সৌরভ সবসময় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। অফিস আর সাহিত্য নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখছে। তাজকিয়াকে কাছে আশার সুযোগ দিচ্ছে না। তাজকিয়াকে দেখলে বিভিন্ন ভাবে নিজেকে ব্যস্ত দেখায়। তাজকিয়া ভাবে, ‘সে কি আমার উপর রাগ করেছে। বার বার ফোন করছি কিন্তু রিসিভ করছে না। দেখা করতে গেলে বিভিন্ন ব্যস্ত দেখায়। কেন রাগ করবে। রাগ করার মতো কোন কিছু করিনি।’
 এভাবে কিছু দিন যাওয়ার পর তাজকিয়া সৌরভের মোবাইলে মেসেজ দেয়। সৌরভ সাহেব আপনার কী হয়েছে। কোন ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিয়েন। যে কদিন অফিসে আছি অন্তত কথা বলেন। হঠাৎ করে কথা বলা বন্ধ করলে স্টাফসহ অন্যরা ব্যাড কিছু মনে করবে। সময়ের ব্যবধানে আমি আপনি কোথায় চলে যাব তার ঠিক নেই। প্লিজ কথা বলেন। আসুন আগের মতো চলি। মেসেজ পড়ে সৌরভ ভাবে, ‘ঠিকই তো অফিস স্টাফ অন্য কিছু মাইন্ড করতে পারে। আসলে দোষ তার না। এটা সৌরভের নিজের ব্যাপার। নিজের মনকে শক্ত করলেই হলো।’
ভোর ৫.৫১ । মোবাইলের মেসেজ টোনে সৌরভের ঘুম ভেঙে যায়। ইনবক্স ওপেন করে তাজকিয়ার মেসেজ দেখতে পায় ‘রাজ সিংহাসন থেকে নয় , হিমালয়ের পাদদেশ থেকে নয়, সাত সমুদ্র তের নদীর ওপার থেকে নয়, আমার মনের ছোট্ট কুঠির থেকে আপনাকে জানাই হ্যাপি বার্থ ডে’র  শুভেচ্ছা। সো হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ।’
মেসেজ দেখে সৌরভের মনে পরে আজ তার জন্মদিন। কেই উইশ করলে সৌরভের খুব ভালো লাগে। সৌরভ ফজরের নামাজ পড়ে হাঁটতে বের হয়। সকালের সতেজ বাতাস, ফ্রেশ অক্সিজেন তার মনভরে উঠে আনন্দে। তাজকিয়াকে ফোন করে সৌরভ।
     -  আসসালামু আলাইকুম। গুড মর্নিং। কেমন আছেন?
     - উইশ করার জন্য ধন্যবাদ। আজ আমার জন্মদিন এটা মনে করে দেবার জন্য আরও বেশি            ধন্যবাদ।
     - ওয়েলকাম, হ্যালো স্যা, মন কার কাছে লিজ দিয়েছেন যে কিছুই মনে থাকে না। হবু ভাবির কাছে নিশ্চয়?
      - আরে না ম্যাডাম, তাকে কোথায় পাবো।
      - আর ন্যাকামো করতে হবে না। এ রকম গুণি মানুষকে সব মেয়েরা পেতে চায়। যাই হোক, ‘বলেন লজ্জা পাচ্ছি’, বলব না।
     - রিয়েলি আই হ্যাভ নো বিলাভার। সারা জীবনে যখন ঐসব হয়নি আর এখন এ বয়সে হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
     - না সৌরভ সাহেব আপনার সাথে একমত নই। মন সব সময় চির সবুজ। প্রেমের জন্য কোন বয়স লাগে না। লাগে একটা সুন্দর মন। বিশাল উদার হৃদয়, তাছাড়া আধুনিকতার ছোঁয়ায় সব পরিবর্তন হয়েছে। দেখেন না, শীতকালের গাছের পাতা ঝরে বসন্তকালে, বসন্তের কোকিল ডাকে গ্রীষ্মে। প্রকৃতির যখন এতো পরিবর্তন। তখন মনের পরিবর্তন হলে সমস্যা কি? পছন্দ মত একটা জীবন সঙ্গি বেছে নিন।
     - আমাকে খুব পরামর্শ দিলেন। তার মানে আপনি লাইফ পার্টনার ঠিক করে রেখেছেন। সেই সৌভাগ্যবান কে? তিনি কী করেন? যে আপনার মতো সুহাসীনিকে হৃদয় রাজ্যের রানী আসনে বসাতে পারবে। কন্গ্রাচলেশন তাকে।
     - দুষ্টমী কি বেশি হচ্ছেনা?
     - কিসের দুষ্টমী, যা সত্য তাই বললাম।
     - না মি. সৌরভ, আপনার চিন্তাটা ভুল। আইবিএ থেকে পড়া-লেখা শেষ করে আবার চাকরির প্রস্তুতির জন্য লেখা-পড়া। তারপর চাকরি। সময় পেলাম কোথায়? জীবনটাকে উপভোগ করার সময় পেলাম না। কেমন যেন রোবটের মতো যৌবনের আনন্দঘন আবেগময় দিনগুলো পার করছি। আচ্ছা যাই হোক আপনি কি করছেন?
    - দৌড়াচ্ছি। আপনার জন্য, মানে আপনি বলেন যে ভুড়ি বেড়ে যাচ্ছে তাই। আজ বিকেলে সাতমাথায় আসেন। আমার প্রিয় বার্গার খাওয়ার নিমন্ত্রণ ।
- এটা আমার সৌভাগ্য। আপনার নিমন্ত্রণে কি না আসে পারি? আসবো মি. সৌরভ।
 
আমি পুরো বার্গার খেতে পারব না এই বলে অর্ধেক তুলে দিতেই সৌরভের হাতের স্পর্শ লাগে তাজকিয়ার। তখন দু’জনের চোখে চোখ পরে। তারা যেন কোন হারানো মানিক চোখের গহিন অরণ্যে খুঁজতেছে। সৌরভের একটু স্পর্শে তাজকিয়ার হৃদয়ে রোমাঞ্চ আর ভালো লাগার শিহরনে উচ্ছ্বাসিত তরঙ্গমালা ঢেউ খেলে। গ্রীষ্মের খরতাপে পিপাসিত মনে মেঘের সঞ্চার ঘটে। আনন্দের স্নিগ্ধতায় ভিজে ওঠে মন। তাজকিয়া নিরবতার ভেঙ্গে সৌরভের হাতে গিফট্ পেপার মোড়ানো একটি ছোট্ট বক্স তুলে দেয় ।
সৌরভ ভবিছে কী আছে এর ভেতরে। বার বার ইচ্ছে করছে খুলতে। কিন্তু তাজকিয়ার নিষেধ আছে। সে বলেছে বাসায় গিয়ে খুলে দেখতে। বাসায় এসে খুলে দেখে সুন্দর একটি মানিব্যাগ। অনুচ্চারিত কণ্ঠে সৌরভ বলে সো থ্যাংকস্ তাজকিয়া।
এভাবে চলছে তাদের অপ্রকাশিত না বলা ভালোবাসার দিনগুলো। দু’জন দু’জনকে কাছে পেতে চায়। আবদ্ধ হতে চায় পবিত্র বন্ধনে।
সৌরভ ভাবছে আর মাত্র কয়েকদিন বাঁকি। তারপর ভ্যালেনটাইন ডে তাজকিয়াকে কি গিফ্ট দেয়া যায়।
সৌরভ জলেশ্বরীতলা অঙ্গন গিফ্ট কর্ণার থেকে একটি গিফ্ট কিনল। কিন্তু দেবে কি ভাবে, কোথায় দেবে, কিছুই ঠিক করতে পারছেনা। অবশেষে লাঞ্চ ব্রেকে সৌরভ তাজকিযার রুমে গেল। তাজকিয়া বলল কী ব্যাপার হঠাৎ আমার রুমে, বসেন।
-              না বসবনা। অনেক কাজ জমে আছে। এই বক্সটা রাখুন, বাসায় গিয়ে খুলবেন। আর মনোযোগ দিয়ে শুনুন ‘হ্যাপি ভ্যালেনটাইন ডে।’
 
মাহফুজুর রাহমান আখন্দকে নিয়ে সৃষ্টির একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ হবে। সম্পাদক জিহাদ হোসেন বার বার ফোন করছে। লেখা পাঠানোর জন্য ।
ড. আখন্দের লেখা ‘তোমার চোখে হরিণমায়া’ ছড়া নিয়ে একটি সমালোচনা লেখা শেষ করে ঘুমাতে যাবে সৌরভ। এমন সময় তাজকিয়ার ফোন।
     - আসসালামু আলাইকুম। ধন্যবাদ সুন্দর একটি গিফ্ট দেবার জন্য। আপনি কেমন করে জানলেন সিরামিকের জুয়েলারী বক্স আমার পছন্দের । আপনি সাইকোলজি জানেন। এক্সিলেন ।
     - ওয়েলকাম ম্যাডাম। না কোন সাইকোলজি জানি না। হয়তো কাকতালিয় ।
     - গুড নাইট ভালো থাকবেন। ফি আমানিল্লাহ ।
     -ওকে গুড নাইট ।
সারারাত সৌরভের আর ঘুম আসেনা। চোখ বন্ধ করলেই তাজকিয়ার হাস্যজ্জল চেহারা ভেসে ওঠে হৃদয়ের পর্দায়। মন চলে যায় কল্পনার রঙিন রাজ্যে। সৌরভ ভাবতে থাকে, ‘তাজকিয়াকে যদি জীবন সঙ্গি করা যায় তবে সংসার ভরে উঠবে সুখের আবেসে। সে সুন্দর করে আগলে রাখবে আমাদের সংসার। ভালোবাসায় ভরে দেবে আমার হৃদয়। পরম মমতায় বুকে আকরে ধরে রাখবে আমাকে।’
 
রাত প্রায় তিনটা। মনকে আর ধরে রাখতে পারছেনা সৌরভ। তাজকিয়াকে ফোন দিল ।
হ্যালো, সৌরভ আপনি এত রাতে ফোন দিলেন, কোন সমস্যা?
     - না মানে আপনি এখনো জেগে আছেন। কী করছেন?
    - কেন জানি ঘুম আসছেনা, মনে পড়ছে পিছনে ফেলে আসা অতীত স্মৃতিগুলো। চাকরিতে জয়েন, আপনার মতে। একজন ভালো সহকর্মী পাওয়া। অল্প সময়ে কখন যে আপন করে নিয়েছেন বুঝতে পারিনি। সত্যি কি জানেন মি. সৌরভ। সমাজে কিছু ভালো মানুষ থাকে । তাঁরা হৃদয় উজার করে ভালোবেসে আপন করে নিতে জানে। আপনি সেই দলেরই একজন। আর যারা আমার মতো অবিবেচক তারা সেই ভালো মানুষদের কষ্ট দেয়। আপনার কাছ থেকে রজনীগন্ধার ফুলের মতো সুবাস নিয়েছি স্বার্থপরের মতো বিনিময়ে কিছুই দিতে পারিনি ।
     - হ্যালো তাজকিয়া আপনি কি সব যাতা বলছেন। কিসের আপন করে নেয়া, কিসের সুবাস, কিসের দুঃখ। মাথা ঠিক আছে তো? আচ্ছা ঠিক আছে এখন ঘুমান।
 
সৌরভের বলা হলো না সেই বিশেষ কথাটি। সে ঠিক করল আগামীকাল অফিসে লাঞ্চ আওয়ারে বলবে।
ব্যাংকে এখন প্রচন্ড কাজের চাপ। জুন ক্লোজিং চলছে। সব কর্মকর্তা নিজ নিজ হিসাবের ব্যালেন্স সিট মিলাতে ব্যস্ত। সৌরভের উপর বাড়তি দায়িত্ব হল শিক্ষানবীশ অফিসারদের ফাইল নিরীক্ষা করা। কাজ জমে আছে। আরো দুই হাতের প্রযোজন। এমন সময় তাজকিয়া এসে বলে, ‘সৌরভ সাহেব অফিস স্টাফকে নিমন্ত্রণ করা শেষ। এই কার্ড আপনার জন্য। দোয়া করার জন্য অবশ্যই আসবেন।  মি. সৌরভ, পহেলা জুলাই আমার বিয়ে।

 

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.